রুপুর বিয়ে পর্ব ১৫
Bobita Ray
“তুমি কী আমার সাথে রাগ করে এই নিবার্সিত জীবন বেছে নিলে, বেয়াইন সাব?”
অথৈ ভয় জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“আপনি দয়া করে এখন চলে যান। কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”
“তুমি যে আমার সর্বনাশ করেছ। তার বেলায়?”
অথৈ ভ্রু কুঁচকে অয়নের দিকে তাকাল। অস্ফুট স্বরে বলল,
“আমি আবার আপনার কী সর্বনাশ করলাম?”
অয়ন বলল,
“বললে তো বিশ্বাস করবে না বেয়াইন সাব। তাই আর এখন বলতে ইচ্ছে করছে না।”
অথৈ দরজার কাছে যাওয়ার আগেই অয়ন দরজা আগলে দাঁড়াল। ভয়ে অথৈয়ের চোখ-মুখ শুকিয়ে গেল। অথৈয়ের চোখে আষাঢ়ের ঘনঘটা। অয়ন একদৃষ্টিতে অথৈয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল খুব অল্প সময়ের জন্য। অথৈ বলল,
“ প্লিজ কেউ দেখে ফেলার আগে চলে যান আপনি।”
“যাব তো অবশ্যই। তুমি বললে এখুনি চলে যাব। তার আগে তোমাকে যে একটা প্রমিস করতে হবে।”
“কী প্রমিস?”
“প্রমিস করো, তুমি আর কখনো ঘরবন্দী হয়ে থাকবে না।”
“আমি ঘরবন্দী হয়ে থাকলে আপনার কী এসে যায়?”
“অনেককিছুই এসে যায়। তবে তোমাকে বলা যাবে না। শুধু একটা কথা শুনে রাখো, তুমি এভাবে ঘরবন্দী হয়ে থাকলে আমার খুব খারাপ লাগে। তুমি যে আমার উপরে রাগ করে ঘরবন্দী হয়ে আছো। আর কেউ না জানলেও আমি তো জানি।”
“আপনি আমার কে? যে আপনার উপরে রাগ করব আমি। আমার পড়াশোনায় ডিস্টার্ব হয়। তাই ঘরবন্ধ করে পড়াশোনা করি আমি।”
অয়নের মুখে হাসি ফুটে উঠল। অথৈয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি তোমার কে মানে! আমি তোমার একমাত্র বেয়াই সাব।”
অথৈ বিরক্ত হয়ে বলল,
“আপনি এখন যান তো।”
অয়ন চমকপ্রদ কণ্ঠে বলল,
“কী বললে, আমি এখন তোমার জান। ইশ, আগে বলবে তো।”
অয়ন দুহাতে মুখ ঢেকে লজ্জা পাওয়ার ভান করল। রাগে অথৈয়ের শরীর জ্বলে গেল। ভণ্ডামির আর জায়গা পায় না। অসহ্য.. অসহ্য লাগছে।
“আমি এখন চলে যাচ্ছি বেয়াইন সাব। আশা করছি, এরপর থেকে আর সবসময় ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখবে না।”
“দরজা বন্ধ করে রাখলে কী করবেন?”
“দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে তোমাকে ডাকব। বেয়াইন সাব..বেয়াইন সাব ও আমার বেয়াইন সাব। দরজা খুলে দ্যাখো তোমার বেয়াই এসেছে। আমার উপর আর রাগ করে থেকো না গো বেয়াইন সাব বলে বলে চিৎকার করব। আশ্চর্য তুমি হাসছ কেন? আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না। তাই তো? ওকে এখুনি তোমাকে চিৎকার করে ডাকছি ওয়েট।”
“বিশ্বাস করেছি। এবার দয়া করে আপনি বিদায় হোন।”
“ওকে। বাট আমার কথাগুলো যেন মনে থাকে বেয়াইন সাব।”
অয়ন দরজা খুলে চলে গেল। অথৈ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অজানা কারণে অথৈয়ের এখন খুব ভালো লাগছে। তবে অতিরিক্ত লজ্জার জন্য দরজা খুলে রাখতে পারল না মেয়েটা। তখন অয়ন যে বইটা বুকে জড়িয়ে রেখেছিল। অথৈ সেই বইটা আলতো হাতে ছুঁয়ে দিল। অজানা শিহরণে ওর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠল।
বীথি রানী গুনগুন করে কাঁদছে। বিনয় অপরাধী মুখে মাকে এটা-সেটা বোঝানোর খুব চেষ্টা করছে। বীথি রানী ছেলের কোন কথা কানে তুলছে না। মায়ের চোখের জল বিনয়ের সহ্য হয় না। বিনয় ভাবতেই পারেনি সামান্য একটা কারণে মা এতটা কষ্ট পাবে। বিনয় তো আর মাকে ইচ্ছে করে কষ্ট দেয়নি। বাবা বাড়িতে থাকলে খুব ভালো হতো। মাকে সহজেই বুঝ মানিয়ে ফেলতো। বাবা কবে ইন্ডিয়া থেকে আসবে কে জানে!
ঘটনার শুরু আজ থেকে দুদিন আগে। দুদিন যাবৎ রুপু বিনয়ের সাথে কথা বলছিল না। শুধু কী কথা বলা। বিনয়ের দিকে তাকাচ্ছিল না পর্যন্ত। রাতে শুতে গেলেও মাঝখানে ইয়া বড় একটা কোলবালিশ দিয়ে রাখতো। মায়ের ওই ঘটনাটার জন্য রুপু অযথা বিনয়ের সাথে রেগে আছে কেন, বিনয় সত্যিই বুঝতে পারে না। রুপুর খুব জেদ। সেদিন রাতে রুপু খুব কড়া করে বিনয়কে দুটো কথা শুনিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, শুরু থেকেই যদি মায়ের ভুলকে ভুল আর ঠিককে ঠিক বলে ধরিয়ে দিতে তাহলে আজ আর এই দিন দেখতে হতো না। উত্তরে বিনয় রুপুকে বার বার বলার চেষ্টা করেছে। মা ইচ্ছে করে কিছু করেনি। হয়তো আমার কাছে কোন দরকারেই এসেছিল। তুমি এমন ভাবে বিষয়টাকে জল ঘোলাটে করলে। লজ্জা কিংবা ভয়ে মা ঘাবড়ে গিয়েছিল। সেই থেকেই রুপু রানীর রাগ। মায়ের ভুল নাকি বিনয়েরই চোখেই পড়ে না। আশ্চর্য, মায়েরা আবার ভুল করে নাকি। ভুল করলে তবেই না বিনয়ের চোখে পড়বে। বিনয়ের বহু পুরোনো অভ্যাস হলো। বাইরে থেকে এলেই প্রথমে মায়ের ঘরে যাবে। মায়ের সাথে দেখা করবে। কিছুক্ষণ গল্পগুজব করবে। তারপর নিজের ঘরে যাবে। রুপুর রাগ ভাঙানোর জন্য আজ একটু ব্যতিক্রম কাণ্ড করেছে বিনয়। রুপুর জন্য একগুচ্ছ তরতাজা টকটকে লাল গোলাপ ফুল নিয়ে এসেছে। ফুলগুলো নিয়ে মায়ের ঘরে যেতে লজ্জা লাগছিল দেখে সরাসরি নিজের ঘরে চলে গেল বিনয়। মা যে পেছন থেকে বিনয়কে ঘরে যেতে দেখেছে বিনয় একদম খেয়াল করেনি। শুধু বিস্ময় ঝরা চোখে অবাক হয়ে বিনয়ের গমন পথের দিকে তাকিয়েছিল। আর চোখ দিয়ে অঝরে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছিল। বিনয় ভেবেছিল মা বোধহয় ওকে বাড়িতে আসতে দেখেনি। তাই ফুলগুলো ড্রেসিং টেবিলের উপরে রেখে তাড়াতাড়ি মায়ের ঘরে মায়ের সাথে দেখা করতে চলে গেল। গিয়ে দেখল, মা শুয়ে শুয়ে বিনয়ের ছোটবেলার ছবিখানা বুকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। মাকে কাঁদতে দেখে বিনয়ের বুকের ভেতরে ধক করে উঠল। মায়ের একহাত আলতো করে ধরে বলল,
“কী হয়েছে মা তোমার?”
মা বিনয়ের হাতখানা সরিয়ে দিল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“বউকে পেলে সবাই একসময় মাকে ভুলে যায়। ভুলে তো যাবিই। তোদের জীবনে তো এখন আর আমাকে প্রয়োজন নেই। আমি কে, বড় হয়ে গেছিস। এখন আর মাকে দিয়ে কী হবে। তুই কী করে পারলি আমার সাথে দেখা না করেই ঘরে চলে যেতে। তোর বউ শিখিয়ে দিয়েছে নিশ্চয়ই। ডাইনিটা এসেছেই আমার সংসার, আমার সন্তানদের থেকে আমাকে আলাদা করতে। তখন বউয়ের জন্য কী লুকিয়ে লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলি তুই? হে ভগবান.. আমার ছেলে আর আমার নেই। আমার ছেলেকে দুইদিনের মেয়েটা আমার থেকে ছলেবলে কৌশলে কেড়ে নিতে চাচ্ছে। ওই ডাইনিকে তুমি নিঃসন্তান করে দাও ভগবান। আমার ছেলেকে আমার কাছ থেকে আলাদা করার শাস্তি তুমি ওকে দাও।”
বিনয় আহত দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকাল। অস্ফুট স্বরে বলল,
“এসব কী বলছ মা তুমি।”
বীথি রানী উত্তর দিল না। হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগল। আর একমনে রুপুকে শাপশাপান্ত করতে লাগল। ভাগ্যিস আশেপাশে রুপু নেই। নাহলে এখানেই আরেকটা কুরুক্ষেত্র বেঁধে যেত। বিনয়ের ছোট একটা ভুলের জন্য মা শুধু শুধু রুপুকে দোষ দিচ্ছে। অথচ এখানে রুপুর কোন দোষই নেই। মাকেও পুরোপুরি দোষ দেওয়া যাচ্ছে না। বিনয়কে প্রচণ্ড ভালোবাসে মা। বিনয় মায়ের ভালোবাসার যথাযথ মর্যাদা দিতে পারেনি সেই অনুরাগেই কথাগুলো বলে ফেলেছে।
“আমার ভুল হয়ে গেছে মা। আর জীবনেও আমার এইরকম ভুল হবে না। এই আমি তোমার গা ছুঁয়ে কথা দিচ্ছি। প্লিজ আর কেঁদো না মা। তুমি কাঁদলে আমার একটুও ভালো লাগে না।”
“যা..যা শিগগিরই বউয়ের আঁচলের তলায় যা। আমার কাছে বসে থেকে অযথা সময় নষ্ট করছিস কেন?”
“এভাবে বলো না মা।”
“তুই এখন যা।”
“না যাব না। যতক্ষণ তোমার রাগ না ভাঙবে ততক্ষণ আমি তোমার কাছেই বসে থাকব মা।”
বীথি রানী চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। দেখা যাক বিনয় এখানে কতক্ষণ ধৈর্য ধরে বসে থাকতে পারে। বিনয়ের প্রচণ্ড খারাপ লাগছে। ফুলগুলো ফ্যানের বাতাসে নষ্ট হয়ে যাবার আগে রুপুকে দিতে পারলে ভালো হতো। একদিকে মায়ের অভিমান, অনুরাগ অন্যদিকে রুপুর রাগ, জেদ। বিনয়ের নিজেকে খুব ব্যর্থ মানুষ মনে হচ্ছে।
বিনয় টানা ছয় ঘণ্টা একভাবে মায়ের ঘরে বসে রইল। এর মাঝে ময়নার মা দুইবার খেতে ডেকে গেছে। বীথি রানী ঘরেই খাবে। অগত্যা বিনয়কেও মায়ের সাথে বসে খেতে হলো। রুপু একবারও এইদিকে আসেনি। বিনয়ের এখন আর এখানে বসে থাকতে একটুও ভালো লাগছে না। রুপুর কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। মাকে যে কীভাবে কথাটা বলবে। অনেক আগেই মায়ের রাগ পড়ে গেছে। কুটুর কুটুর করে বিনয়ের সাথে গল্প করছে। গল্প করতে করতে নিজেই হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। মায়ের গল্প শোনায় বিনয়ের একটুও মনোযোগ নেই। মা কষ্ট পাবে দেখে, মনোযোগী শ্রোতার মিথ্যে অভিনয় করতে হচ্ছে বিনয়কে। মায়ের আগ্রহ বাড়াতে গল্পের ফাঁকে ফাঁকে কৌতূহলী হয়ে তারপর কী হলো মা? এই ধরনের কথাও বলতে হচ্ছে। মা হাসলে বিনয়কেও হাসতে হচ্ছে। অথচ অবুঝ মনটা মনে পড়ে রুপুর কাছে। কী নিষ্ঠুর মেয়ে। একবারও এইঘরের সামনে এসে বিনয়কে দেখে গেল না। বিনয় নাহয় মায়ের জন্য যেতে পারছে না। ওর কিসের বাঁধা। ও তো ইচ্ছে করলেই আসতে পারে। বিনয় ঘড়ি দেখে বলল,
“মা অনেক রাত হলো। তুমি এখন ঘুমাও। আমিও ঘুমাতে যাই। নাহলে সকালে উঠতে পারব না।”
“তোর ছোটবেলায় খাট থেকে নিচে পড়ে যাবার গল্পটা শুনে যা.. সেদিন কী ভয়ংকর কাণ্ডটাই না হলো। আমি গেছি জল আনতে…
বিনয়ের খুব বলতে ইচ্ছে করল। এই গল্প আমি অজস্রবার শুনেছি মা। এখন আমার আর শুনতে ইচ্ছে করছে না। কথাগুলো মনেই রয়ে গেল। মা কষ্ট পাবে দেখে মুখ ফুটে বলা হলো না।
রুপু অয়ন অথৈ ছাদে বসে আড্ডা দিচ্ছে। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে চা মুড়ি মাখা, বিস্কুটও খাওয়া হয়ে গেছে বেশ কয়েকবার। ওরা ওদের ছোটবেলার গল্প করতে করতে অনেকদিন পর মন খুলে হাসাহাসি করছে।
অয়ন বলল,
“আরেক কাপ চা খাব বউদি।”
“অনেক চা খেয়েছ। এবার ঘুমাতে যাও। আমিও যাচ্ছি।”
“এই শেষ প্লিজ।”
“অথৈ যা-তো বুনু.. রান্নাঘর থেকে এককাপ চা বানিয়ে নিয়ে আয়। আমি এখন আর খাব না। তুই খেলে তোর জন্যও আরেককাপ আনিস।”
রুপুর কথাশুনে অথৈ উঠে গেল। অয়ন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল। অথৈ চোখের আড়াল হতেই অয়ন নিচু কণ্ঠে বলল,
“একটা কথা জিজ্ঞেস করি। প্লিজ খারাপ ভাবে নিও না বউদি।”
“বলো কী বলবে।”
“তোমার সাথে দাদার বনিবনা হচ্ছে না। তাই না?”
রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চমৎকার কণ্ঠে বলল,
“আমি খুব ভালো অভিনেত্রী অয়ন। আমাদের ভেতরে কী চলছে না চলছে বাইরের কেউ আন্দাজও করতে পারবে না। যেই আমাদের দেখবে। সেই মুগ্ধ হয়ে বলবে। এত ভালো কাঁপল এই যুগে সচরাচর দেখা যায় না।”
“তুমি দাদাকে ভালোবাসো না তাই না?”
“জানি না।”
“দাদাটা ছোটবেলা থেকেই মা ভক্ত। অতিরিক্ত কোনকিছুই আমার ভালো লাগে না। তুমি শুনলে হয়তো বিশ্বাস করবে না। একটা সময় পর্যন্ত মাকে নিয়ে আমার আর দাদার ভেতরে খুব দ্বন্দ্ব ছিল। দাদার জন্য যে আমি ছোটবেলায় কী পরিমাণ মাইর খেয়েছি। তোমার কোন ধারণাও নেই বউদি। সে অনেক পুরোনো কথা। মা দাদাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। তোমার জন্য যদি দাদার ভালোবাসা কখনো ভাগ হয়ে যায়। সেই ভয়ে মা তোমাকে দুচোখ পেতে দেখতে পারে না। তোমাকে নিজের শক্র মনে করে।”
রুপু চমকে উঠে অয়নের দিকে তাকাল। অয়ন হেসে ফেলল। বলল,
“অবাক হচ্ছ। আমি কী করে এতকিছু জানি তাই না? একই বাড়িতে থাকছি। অথচ এই বাড়ির কোথায় কী হচ্ছে সেই খবর না জানলে, কী করে হয় বলো। লতাপাতা চেনো তো বউদি? মা দাদাকে লতাপাতার মতো করে বড় করেছে। বড় কোন গাছ দেখলে লতাপাতা যেমন আঁকড়ে ধরে তরতর করে উপরে উঠে। দাদাও সেভাবে মাকে আঁকড়ে ধরেছে। এই শেকড় এত গভীরে চলে গেছে। তোমার জন্য ছেঁড়া অসম্ভব হয়ে যাবে। তবে আজ মা মারা গেলে কাল দাদা ঠিকই তোমাকে আঁকড়ে ধরতে চাইবে। যাইহোক শুনলাম তুমি নাকি মাস্টার্সে ভর্তি হবে। আমার অনুরোধ থাকবে ভর্তির টাকা তুমি যেন আমার কাছ থেকে নাও।”
“বলেছ আমি এতেই খুশি হয়েছি। তোমার টাকা আমার লাগবে না অয়ন।”
“কেউ জানবে না। এতটুকু বিশ্বাস তো তোমার এই ছোট ভাইয়ের প্রতি রাখতেই পারো বউদি।”
“তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ অয়ন। আমার জন্য এতটা ভাবার জন্য। তবে টাকাগুলো আমি নিজেই জোড়ার করে নেব।”
একদল বাচ্চাকাচ্চার চেঁচামেচিতে বীথি রানীর আরামের ঘুম আচমকা ভেঙে গেল। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে চারপাশে তাকাল। বাচ্চাগুলো কোথা থেকে চিৎকার করছে বীথি রানী বুঝে উঠতে পারছে না। মাথায় ভোঁতা অনুভূতি নিয়ে বীথি রানী উঠে দাঁড়াল। ঘর থেকে বের হয়ে দেখল, একদল বাচ্চাকাচ্চা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে এ ফর __ অ্যাপেল বানান করে পড়ছে। দু একটা বাচ্চা আবার খুব ছোটাছুটি করছে। সোফায় লাফিয়ে উঠছে তো আরেকবার নামছে। বীথি রানী রে রে করতে করতে বাচ্চাগুলোকে কঠিন ধমক দিল। বাচ্চাগুলো অবাক হয়ে একবার বীথি রানীর মুখের দিকে তাকাল। তারপর দ্বিগুণ উৎসাহে চিৎকার করে পড়তে লাগল।
“এই এই চুপ চুপ তোরা কে? এখানে কী করতে এসেছিস?”
রুপু ঘর থেকে বের হয়ে এসে বীথি রানীর মুখোমুখি দাঁড়াল। বলল,
“ওরা আমার কাছে পড়তে এসেছে মা।”
“পড়তে এসেছে মানে? তোমার কী মাথা খারাপ। বাড়িটাকে কার অনুমতিতে স্কুল বানিয়েছ তুমি? আর বাচ্চাগুলোকে কোথা থেকে জোগাড় করলে?”
“আপনাদের বাড়ির পাশের যে স্কুলটা আছে না মা। ওই স্কুল থেকে জোগাড় করেছি। আমি আবার খুব ভালো বাচ্চা পড়াতে পারি। ভবিষ্যতে ছাত্র আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে।”
“তুমি.. তুমি.. তুমি তোমার মাথা ঠিক নেই। তুমি নিশ্চয়ই ভুলে যাচ্ছ। তুমি এখন আর তোমার ছোটলোক বাবার বাড়িতে থাকো না।”
“বড়লোক শ্বশুরের বাড়িতে থেকেও তো কোন লাভ হচ্ছে না আমার। সেই তো নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেকেই জোগাড় করতে হবে। আমার বরের তো আর বউকে পড়ানোর মুরোদ নেই।”
“রুপু.. যত বড় মুখ নয়। তত বড় কথা।”
“মা ডিস্টার্ব করবেন না। ঘরে যান। আমি এখন ওদের পড়াব।”
“কিসের পড়াবে। বাচ্চাগুলোকে এখুনি বাড়ি থেকে বের করো তুমি।”
“আশ্চর্য ওরা তো আর আমার কাছে মাগনা পড়তে আসছে না। ওরা টাকা দিয়ে পড়বে। ওদের না পড়িয়ে বাড়ি থেকে বের করব কেন?”
“আমার ভয়াবহ শুচিবায়ু আছে রুপু। এত নোংরা ঘরদোর আমার সহ্য হবে না।”
“না হলেও আমার কিছু করার নেই। আমি যেমন সহ্য করে নিচ্ছি। আপনিও সহ্য করে নিন। আমার মতো আপনারও অভ্যাস হয়ে যাবে।”
“কী বলতে চাইছ তুমি?”
“আমি কী বলতে চাইছি আপনি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন মা। শুধু শুধু আমার সাথে ভান করতে আসবেন না।”
বিনয়ের প্রচণ্ড মন খারাপ। গতরাতে মায়ের ঘর থেকে নিজের ঘরে গিয়ে দেখল, ড্রেসিং টেবিলের উপরে কোন ফুল নেই। ফুলগুলো রুপু ফেলে দিয়ে আরামে ঘুমাচ্ছে। সকালে মা আর রুপুর সাথে একচোট রুপুর ছাত্র পড়ানো নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে। যার ফলস্বরূপ কেউ এখনো রান্নাঘরে যায়নি। মা রাগ করে শুয়ে আছে। আর রুপু একগাদা খাবার অর্ডার দিয়ে বসে আছে। বিনয় রুপুর সাথে কথা বলার জন্য খুব ছটফট করছে। রুপু বিনয়কে পাত্তাই দিচ্ছে না। উল্টো কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছে। আমাদের কথার মাঝে মাকে নিয়ে যদি কথা না বলতে পারো। তবেই আমার সাথে কথা বলতে আসবে। নয়তো না। বিনয় অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে।
বিনয় রেডি হচ্ছে। রুপু বিছানায় বসে দরকারি কাগজপত্র ঘাটাঘাটি করছে। বিনয় বলল,
“আজ বিকালে আমার সাথে বাইরে ঘুরতে যাবে রুপু?”
“আমার সময় হবে না।”
“কেন কী করবে?”
“আজ আমি অথৈ আর অয়ন একটু বের হবো।”
“তোমাদের সাথে আমিও কী যেতে পারি?”
রুপু কঠিন মুখে বলল,
“না।”
বিনয় আহত চোখে রুপুর দিকে তাকাল। বলল,
“কেন?”
“তোমাকে সাথে নিলে আমাদের বেড়ানোর আনন্দই মাটি হয়ে যাবে। গতকাল রাতে নিজের ঘরে আগে গিয়েছিলে দেখে, তোমার মা কী কান্নাটাই না জুড়ে দিল। আমারই দেখে মায়া লাগছিল। আমি ভাবলাম নাও এবার বুঝি আমাদের ঘরেই ভয়াবহ বর্ষা না হয়ে যায়। আজ গেলে তো নিশ্চিত বর্ষা হবে।”
“তুমি কী ভালো করে আমার সাথে দুটো কথা বলতে পারো না?”
“না পারি না। কারণ জন্ম থেকেই আমার ঘাড়ের রগ একটা ব্যাকা। এই শোন, আমার খুব দরকারি একটা জিনিস। আজ একটু এনে দিতে পারবে?”
বিনয় খুশি হয়ে বলল,
“কী জিনিস?”
রুপু বিনয়ের কানে কানে কিছু একটা বলতেই বিনয়ের মুখ শুকিয়ে গেল। রুপু যা আনতে বলছে। সেই জিনিস নিয়ে যদি প্রথমে মায়ের ঘরে যায়। মা যেভাবেই হোক জিনিসটা দেখবে। দেখার পর বলা যায় না। রুপুর সাথে ঝগড়াও বাঁধিয়ে দিতে পারে। বলবে ছিঃ ছিঃ বিনয় তুই দেখি বউয়ের গোলাম হয়ে গেছিস। ডাইনির কাণ্ড দেখ। আর কাউকে পেল না। এইসব জিনিস আমার ছেলেকে দিয়ে আনাচ্ছে। ফেলে দে ফেলে দে এখক্ষণই ফেলে দে। বিনয়ের দ্বারা কখনোই সম্ভব না।
রুপু বলল,
“কী হলো আনতে পারবে না?”
“আজ না অন্যদিন এনে দেব।”
“আমার তো আজই লাগবে।”
“আচ্ছা দেখি কী করা যায়।”
“দেখাদেখির কিছু নেই। জিনিসটা আমার লাগবে। তুমি না এনে দিলে তোমার ভাইকে দিয়ে আনাব।”
“ছিঃ ছিঃ রুপু।”
“এখন ছিঃ ছিঃ করছ কেন? জিনিসটা এনে আমার কাছে দিয়ে তারপর মায়ের ঘরে যাবে। খবরদার জিনিসটা নিয়ে মায়ের ঘরে যাবে না।”
“আমি ফোন করলে তুমি নিচে দাঁড়িও।”
“আমি নিচে দাঁড়াব কেন? তুমি ঘরে এসে আমার হাতে দিয়ে যাবে।”
“মা যদি দেখে ফেলে।”
“দেখুক। তুমি তো আর বাজারি মেয়েদের ঘরে যাচ্ছ না। যে মা দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”
“এসব কী বলছ তুমি? আমি মাকে কথা দিয়েছি। আমি যেখান থেকেই আসি না কেন, আগে মায়ের সাথে দেখা করব। তারপর ঘরে আসব।”
রুপুর বিয়ে পর্ব ১৪
“আমিও তোমাকে কথা দিলাম। জিনিসটা নিয়ে যদি প্রথমে আমাদের ঘরে না আসো। আমি ল্যাংটা হয়ে তোমার মায়ের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকব।”
রুপু কথাগুলো এতটাই স্বাভাবিক ভাবে বলল। বিনয় বাকরুদ্ধ হয়ে রুপুর দিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইল। মা ঠিকই বলে। এই মেয়ে ডেঞ্জারাস।
