সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬
তানিয়া হুসাইন
রাতে সাফা তার রুমের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশে চাঁদের আলো মিটি মিটি জ্বলছে। হালকা বাতাস বইছে, কিন্তু সাফার মন উত্তেজনায় ধুকপুক করছে।
সে খুব খুশি তার এতো বছরের ভালোবাসা অবশেষে পূর্ণতা পেতে চলেছে।
এর মাঝে সাফার ফোন বেজে ওঠে।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে,
“আদ্রিয়ান কলিং…”
____সাফা ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আদ্রিয়ানের মৃদু হাসির স্বর ভেসে আসে,
ঘুমাচ্ছিলে জান?”
__সাফা হেসে বলে, “না, ঘুম আসছে না। কাল আমার এনগেজমেন্ট, ভাবতেই কেমন জানি লাগছে বেইব।
___আদ্রিয়ান নরম গলায় বলে,
নতুন জীবনের একটা নতুন শুরু, তাই না?
সাফা চুপ করে থাকে, কিছুক্ষণ পর বলে,
তুমি কি খুশি।
___আদ্রিয়ান মৃদু হাসে,
শুধু খুশি ? আমি এত খুশি যে মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটা আমার হাতের মুঠোয়। কিন্তু ভয়ও পাচ্ছি।
___সাফা অবাক হয়ে বলে, “ভয়, কেন?”
___আদ্রিয়ান গভীরভাবে বলে,
জানিনা কেনো অন্যরকম একটা অনুভূতি হচ্ছে।
তুমি জানো, আমি দেখি একটা ছোট্ট শান্তিপূর্ণ সুখের জীবন, যেখানে প্রতিদিন সকালে তোমার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠব। একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করব, অফিসে যাওয়ার সময় তুমি আমার টাই ঠিক করে দেবে। অফিস থেকে ফিরে এসে তোমার হাতের রান্না খাবো, রাতে ব্যালকনিতে বসে গল্প করব।
তোমাকে বুকে জড়িয়ে ঘুমাবো।
আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আমার এই স্বপ্নগুলো সত্যি হতে যাচ্ছে।
___সাফার চোখে পানি চলে আসে।
ওর ওতো এই একটা ইচ্ছা।
এই একটা স্বপ্ন এতটা বছর ধরে ওরা দুজনে দেখে আসছে।
___আদ্রিয়ান হেসে বলে, এখন এগুলো বাস্তবে পূরণ হতে যাচ্ছে।
তোমার মতো মানুষ পেয়ে আমি নিজেকে লাকি মনে করি। আমি চাই না কোনো কিছু আমাদের মধ্যে আসুক।
I Love You,মেরি জান।
___সাফা আবেগী হয়ে পড়ে,
সে ও জানায় ভালবাসার স্বীকারোক্তি।
আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে প্রার্থনাই করি,
যেনো আমাদের জীবনটা আমাদের কল্পনার মতোই সুন্দর হয়।
___আদ্রিয়ান গভীরভাবে বলে,
তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমি তোমাকে সব সময় আগলে রাখব।
___সাফা আর কিছু বলতে পারে না, শুধু লাজুকভাবে হাসে।
এভাবেই চলতে থাকে ওদের প্রেমের আলাপ।
___কাল দেখা হবে, আদ্রিয়ান ফোনের ওপাশ থেকে মিষ্টি কণ্ঠে বলে।
___কাল দেখা হবে,
সাফাও নরম কণ্ঠে জবাব দেয়।
ফোন কেটে যায়, কিন্তু তাদের ভালোবাসার মিষ্টি অনুভূতি বাতাসে রয়ে যায়।
______
দুপুরে সাফা একদম ফ্রেশ মুডে পার্লারে চলে যায়। তার আজকের দিনটা একদম পারফেক্ট হতে হবে।
সবকিছু সে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে।
____আদ্রিয়ান নিজেই ইশায়াকে নিয়ে যায় পার্লারে। সেখানে এসে সে সাফার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে, একটু মজা করে, আর সবার অগোচরে সাফার কপালে একটা ভালোবাসার পরশ একে দেয়,
ফিসফিস করে বলে,
ভালোবাসি।
___সাফা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে, চোখে মিষ্টি হাসি।
___এদিকে, বাড়ি থেকে বের হতেই ইশায়াকে লক্ষ্য করতে থাকে কালো পোশাকের কিছু লোক।
ভীর সোফায় বসে ছিল, চোখ বন্ধ, মাথার পেছনে হাত? রাখা। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঘুরছে তার সামনে। হঠাৎ দরজা ঠেলে ঢোকে এনরিকো।
— “বস, মেয়েরা পার্লারে ঢুকেছে।
____ভীর চোখ খুলল। ঠোঁটে একপাশে বাঁকা হাসি।
— বের হওয়ার অপেক্ষায় থাকো। এক মুহূর্তও যেন হাতছাড়া না হয়।
আজ-ই যা করার করতে হবে।
রাতেই আমরা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিবো।
___সবকিছু যেন প্রস্তুত থাকে.
___সান্তিয়াগো, রিকো মাথা ঝাঁকিয়ে বেরিয়ে যায়, ফোনে দ্রুত কিছু নির্দেশ দেয়।
ইশায়া আর সাফা পুরোপুরি রেডি।
সাফার কিছু ফটোশুট করছে পার্লারের মহিলারা,
তাদের পেজের জন্য।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।
৮:০০ টার আগে তাদের পৌঁছতে হবে।
___সাফা আজ ডিপ অরেঞ্জ কালারের লেহেঙ্গা পড়েছে, যার ওপর সোনালি জরির কাজ করা। তার ওড়না গাঢ় সোনালি, যার একপাশ কাঁধে রাখা, আরেকপাশ কোমরে সেট করা। হাতভর্তি লাল চুড়ি, কানে ঝুমকা, গলায় সোনার হার।
চুল খোলা, সামনের কিছু চুল কপালে এলোমেলোভাবে পড়েছে। চোখে ডিপ কাজল আর হালকা ব্রাউন আইশ্যাডো, ঠোঁটে রেড ম্যাট লিপস্টিক।
সাফার সাজ কমপ্লিট।
___ইশায়া সচরাচর না সাজলেও ভাইয়ের বিয়েতে কোন কমতি রাখেনি।
_ইশায়া পড়েছে বেবি পিঙ্ক রঙের লেহেঙ্গা, যার ওপর সিলভার এমব্রয়ডারি করা। তার ওড়না একদম হালকা নেটের, যাতে সাদা পুঁতির কাজ।
চুল ছেড়ে দিয়েছে, সামনের দিকে হালকা কার্ল দিয়ে একপাশে সেট করা। কানে ছোট্ট টপস, হাতে সিলভার চুড়ি, আর নাকে একটা ছোট্ট নোজ রিং।।
_আর ঠোঁটে পিচ রঙের লিপস্টিক, চোখে হালকা গোলাপি আইশ্যাডো, আর তার চিরচেনা কাজল কালো চোখ যেন আজ আরো গভীর আর মোহময়ী লাগছে।
____সাফা ড্রাইভারকে ফোন দেয় নিচে আসার জন্য।
ড্রাইভার এর সাথে কথা বলা শেষে ওরা নেমে আসে।
এসে দেখে গাড়ি এসে গেছে।
___গাড়ি এখানে পার্ক করা ছিল, ড্রাইভার কাকা চা খাচ্ছিল পাশের দোকানে।
___ওরা তাড়াহুড়া করে গাড়িতে ওঠে এমনিতেই অনেক লেট হয়ে গেছে তাদের।
ঢাকার ব্যস্ত সড়ক।
রাতের আলো ঝলমলে শহর, কিন্তু হঠাৎ করেই এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ইশায়াদের গাড়ি চলতে থাকে, কিছুদূর এগিয়ে যেতেই হঠাৎই চারপাশে কালো রঙের কিছু গাড়ি ছায়ার মতো ঘিরে ধরে তাদের।
একটা, দুইটা নয়
—প্রায় ত্রিশটা কালো এসইউভি যেন শিকারের জন্য অপেক্ষমাণ হিংস্র জানোয়ারের মতো চারপাশে ঘুরতে থাকে।
সড়কের বাতিগুলো হঠাৎ করেই কেনো যেনো ম্লান মনে হতে থাকে।
ইঞ্জিনের গর্জন, টায়ারের ঘর্ষণ, চারপাশের হেডলাইটের আলো—সবকিছুই একটা ভয়ংকর আবহ তৈরি করে।
___ড্রাইভার হালকা ব্রেক কষে কী হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করল।
ঠিক তখনই,
ঠাস! ঠাস! ঠাস!
টায়ারে সরাসরি গুলি চালানো শুরু হলো!
__গাড়ি ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে যায়।
ইশায়া আতঙ্কে সাফার হাত শক্ত করে ধরল।
—আপু কি হচ্ছে এগুলো।
___সাফা ইশায়ার হাত চেপে ধরে শক্ত করে।
ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ও নিজেই ভয়ে ..
___ইশায়া একবার বাইরে তাকায়।
তখন-ই দেখে কালকের মতো ঠিক একই পোশাকের অনেক গুলো লোক।
ইশায়া সাফাকে বলে,
___আপু,
ওরা কালকের ওই গ্যাংস্টার!
___সাফার শরীরও কেঁপে উঠল।
কালকের টিভি নিউজের ঘটনা মনে পড়ে যায়,
__ঢাকার বিভিন্ন স্থানে এক অজানা বিদেশি গ্যাংয়ের উপস্থিতি দেখা গেছে।
এ নিয়ে তোলপাড় চলছে সব জায়গায়।
____গাড়ির চারপাশে কালো পোশাক পরা প্রায় ১০০ জন গার্ড ঘিরে ফেলেছে!
কিছু মহিলা গার্ডও আছে, যারা ওদের দিকে এগিয়ে আসছে।
___ইশায়ার বুক ধড়ফড় করে উঠল।
তার এটাই মনে হচ্ছে কাল সাফার করা কাজের জন্য ওরা সাফাকে মারতে এসেছে।
__ঠিক তখনই সামনের গাড়ির দরজা খুলে গেল।
ধীর পায়ে একটি কালো ছায়া বেরিয়ে এলো।
রাজভীর আলভারেজ।
তার কালো শার্টের বোতাম খোলা, গাঢ় চোখে ভয়ংকর দৃষ্টি, ঠোঁটে এক বাঁকা তাচ্ছিল্যের হাসি।
__সে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো, যেন শিকারি তার শিকারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তার পেছনে নিকো, ডিয়েগো, সান্তিয়াগো, এনরিকো।
আরও কিছু লোক চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে।
ড্রাইভার সাহস করে সামনে দাঁড়িয়ে গেল।
—আপনারা কি চান?
কে আপনারা।
আমাদের পথ কেনো আটকেছেন?
__রাজভীর একপলক তাকাল।
তার চোখ যেন এক জ্বলন্ত অগ্নি।
সে কোমরে গোজা পিস্তল তুলে, তারপর…
“ঠাস!”
একটা মাত্র গু*লি।
ড্রাইভারের মাথায় গু*লি লাগতেই সে ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল!
___
না!!!
ইশায়া আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে!
তার সমস্ত শরীর কাপছে।
___ভীর তাকায় ওই চোখের দিকে।
এই মেয়ে এই মেয়ের জন্য দুইটা দিন সে ছটফট করেছে।
চাইলে সে তখনই ওকে নিয়ে যেতে পারত কিন্তু ও বুঝতে চেয়েছিল ওর সাথে হচ্ছেটা কি।
আর বোঝার পর-ই সে ঠিক করে নিয়েছে এই মেয়েকে সে মেক্সিকো নিয়ে যাবে।
তার রাজ্যে।
___ইশায়ার নিষ্পাপ চোখ এখন কান্নায় ভরা।
রাজভীর তার দিকে তাকিয়ে ছিল, এক দৃষ্টিতে।
___নিকো এগিয়ে এসে সাফার চুলের মুঠি টেনে ধরলো।
— ছাড়ুন!
নাহলে এক্ষুনি পুলিশ ডাকবো ,
কাপা কাপা গলায় বলে সাফা।
অসভ্য জানো*য়ার লোক।
এত ভয় পাওয়ার পর ও সাফার গলার তেজ কমলো না।
__নিকোর ঠোঁট বাঁকা হলো।
“পুলিশ? ”
ঠাস!
একটা জোরে থাপ্পড় পড়ে সাফার গালে।
সাফার ঠোঁট কেটে যায়, রক্ত গড়িয়ে পড়ে।
___তুই জানিস আমরা কে। কার সামনে গলা উঁচু করে কথা বলছিস।
___ সাফার রক্ত দেখে ইশায়া আর সহ্য করতে পারল না!
সে এক দৌড়ে গিয়ে সাফাকে ধরে ফেলল।
ঠিক তখনই রিকো ইশায়ার ওপর হাত তুলতে চাইলে…
“এক ইঞ্চিও নড়বে না!
ভীরের গম্ভীর গলার স্বর।
__Noone touches her! Whoever dares to touch her will be dead in a second.
___রাজভীরের কণ্ঠস্বর শীতল, তবুও তাতে ছিল এক ধরণের কঠোরতা।
___রিকো হিমশিম খেয়ে সরে গেল।
ইশায়া তখনও কাঁপছে।
____তারপর রাজভীর ধীর পায়ে এগিয়ে এলো।
তার চোখে একধরনের আগুন।
এক ঝটকায় তার হাত ইশায়ার কব্জিতে জড়িয়ে ধরল!
— ছাড়ুন আমাকে,
ইশায়া ছটফট করতে লাগল।
রাজভীর হাতের চাপ বাড়িয়ে দিল।
— “তুমি পালাতে পারবে না।”
__ইশায়া আরও জোরে ছুটতে চাইল, কিন্তু রাজভীর শক্ত করে টেনে নিল তাকে!
তার হাতের চাপ এতটাই বেশি যে ইশায়া ব্যথায় কেঁপে উঠল!
___রাজভীর ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে এনে তার খুব কাছ থেকে ফিসফিস করে বলে,
—ওয়েলকাম টু হেল,
তারপর এক নিমেষেই সে ইশায়ার ঘাড়ে চাপ দিল।
ইশায়ার শরীর ঢলে পড়ে!
— “ইশু!!
সাফা চিৎকার করে উঠে, কিন্তু নিকো এক ধাক্কায় তাকে গাড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়।।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫
___রাজভীর তখন এক হাতে ইশায়ার নিথর শরীর কোলে তুলে নিল।
সে শুধু দেখছে ইশায়াকে।
তার ঠোঁটে এক ভয়ংকর হাসি।
“তুমি আর কারো হতে পারবে না।”
সব কালো গাড়ি ফুল স্পিডে ঢাকার ব্যস্ত সড়ক ছেড়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেল…
আজ থেকে ইশায়ার জীবন রাজভীরের হাতে বন্দী হয়ে গেল!
