Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৮

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৮

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৮
জান্নাতি আক্তার জারা

একদিনের মধ্যে বিয়ের এত এত আয়োজন করতে হচ্ছে, মিমের বাবা এবং তিশার বাবা কে সঙ্গে নিয়ে পুরো গ্রাম দাওয়াত দিতে গেলো, আহাদ তালুকদার আর আতিফ শেখের দায়িত্ব গুলো বেশিই পড়ে গেছে, দুজন মিলে গ্রাম টু শহর যাওয়া আসা করছে, বিয়ের বাজার করতে, আহিনের দায়িত্ব পড়ে গেছে মা রাবেয়া তালুকদার আর ফুপি আনহা শেখ কে নিয়ে শহরে শপিং করতে, তাঁদের সাথে অবশ্য মিম দের বাড়ির পাশে কাকি টাও আছে, রুপোলী বেগমের ফ্রেন্ড , এদিকে আনাস এর ঘাড়ে দায়িত্ব পড়ে গেছে, বাড়ির ডেকোরেশনের দিকটা সামলানো, একদিনের ভিতর এতএত কাজ, সবাই মিলে ভাগ করে নিয়ে ছে, আদনান তালুকদার ফোনে গেস্ট দের ইনভাইট করছে, আর তাকবীর, সে একা হাতে ফোনে অফিসের দিকটা সামলাচ্ছে, নূরফিহা গতরাতে আরশ দের সাথে শহরে চলে গেছে, তিশা গ্রামে থেকে গেছে, যদিও সে বাড়ির বড় বউ, তবুও প্রেগন্যান্সি আবস্থায় এতবার গাড়ি তে যাওয়া আসা ঠিক হবে না বিধায় তাঁকে আরশের আম্মু গ্রামে থাকতে বলছে, যেহেতু বিয়ের আনুষ্ঠানের জন্য অনগর শহর টু গ্রাম যাওয়া আসা চলবেই, এতে তিশার প্রেগন্যান্সি ঝুঁকি হতে পারে, গ্রামের বিয়ে বলে কথা, সকাল হতে হতে দলে দলে লোকেরা বিয়ে বাড়িতে আরছে বিয়ে দেখতে, আর বিয়ে দেখতে আসা মানুষ দের পান সুপারি দিচ্ছে আদিবা তালুকদার, আদিবা তালুকদার আর রুপালী বেগম শপিংয়ে যায়নি কারণ বাড়ির মেহমান দের জন্য রান্নাবান্না আছে, সময়টা বিকালের ঘরে, মিমের মেহেদি জন্য গাছ থেকে মেহেদি পাতা তুলে বাটবে, আরাত আইরা আর তিশা মিলে তিশাদের উঠানে মেহেদি গাছ থেকে মেহেদি পাতা তুলছে, মেহেদি পাতার ডালা নিয়ে তিশা দের উঠান থেকে মিম দের উঠানে আসতেই দেখা গেলো, রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ি উঠানে ঢুকতে, আরাত আইরা সেদিকে উৎসাহ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো, কে এসেছে দেখতে, গাড়িটা উঠানে আঁটকাতেই গাড়ি থেকে নেমে পড়লো মায়া আর সন্ধ্যা, দুজন গাড়ি থেকে নামতেই আরাত আইরা কে উঠানে দেখে সন্ধ্যা মায়া খুশিতে উৎফুল্লতা হয়ে দৌড়ে এসে আরাত আইরা কে জরিয়ে ধরলো, আরাত আইরাও খুশি হয়ে জরিয়ে ধরলো, সন্ধ্যা উৎফুল্লতা শহীদ বলে উঠলো,

___” ফাইনালি মিম আরশ এক হচ্ছে।
মায়া বলল,
___” বিশ্বাস কর আমি ভাবতেও পারিনি, এত বছর পড়ে ওঁদের এভাবে পূর্ণতা দেখতে পারবো।
আইরা হাসি মুখে বলে উঠলো,
___” হুম, সত্যিকারের ভালোবাসার কাছে রাগ-অভিমান অতি তুচ্ছ।
আরাত গাড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
___” হানিয়া আপু, আশিক ভাইয়া, হাবীব ভাইয়া, আদিল ভাইয়া বাকি সবাই কই?
গাড়ির বিপরীত পাশ থেকে নেমে এলো, আশিক হাবীব, তাঁদের পিছনে হানিয়া, হানিয়ার কোলে ছোট ফুটফুটে একটা ছেলে সন্তান, যদিও ছেলেটা সন্ধ্যা আর হাবীবের, আর আশিকের কোলে চার বছরের মহুয়া, হ্যাঁ মহুয়া হচ্ছে আশিক মায়ার রাজকন্যা, আশিকের মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টুমির হাসি,
___” এই তো আমরা, আমাদের ছাড়া বিয়ে জমবে নাকি ?
সবাই হেসে উঠলো, আরাত হাসি মুখে আশিকের কোল থেকে মহুয়া কে নিজের কোলে নিতে নিতে বলল,
___” আপনাদের ছাড়া বিয়ে জমবে কি-না জানি না, তবে আমার মামনী কে ছাড়া বিয়ে একদম অসম্পূর্ণ থেকে যেত, ঠিক না মামনী?
মহুয়া আরাতের কোলে উঠে আনন্দ উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলল,

___” মামনী আমি মাহা আপুর কাছে যাবো।
___” যাবে তো মামনী একটু ওয়েট করো।
আইরা চিল্লিয়ে বলে উঠলো,
___” আদিল ভাইয়া, গাড়িটা আমগাছের নিচে পার্ক করে আসেন।
আদিল গাড়ি পার্ক করতে লাগলো, সবাই সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে পুনরায় আইরা হানিয়া কে বলে উঠলো,
___” কেমন আছো আপু?
হানিয়া আইরার কথায় হাসি মুখে উওর করলো,
___”আলহামদুলিল্লাহ তোমরা কেমন আছো?
আরাত উওর করলো,
___” আলহামদুলিল্লাহ আপু আমরাও ভালো আছি, তোমার নতুন জীবন কেমন কাটছে?
আরাতের কথায় হানিয়া কিছু বলতে নিবে, তাঁর আগেই আশিক বলে উঠলো,
___” ভালোবাসা পূর্ণতা পেয়েছে, ওদের নতুন জীবন কেমন কাটবে বুঝতে পারছো না?
আশিকের কথায় সবাই হেঁসে উঠলো, হানিয়া নিজের ভাইয়ের সামনে এমন কথায় খানিকটা লজ্জা পেলো, হাবীব কে হাসতে দেখে হানিয়া লাজুক হেঁসে মুখ অন্য দিকে ফিরালো, হ্যাঁ হানিয়া আর আদিল বিয়ে করেছে, তাঁদের বিয়ে দু বছর হতে চললো, তবুও সবার কাছে তারা নতুন দম্পতি, হাবীব বোন কে লজ্জা পেতে দেখে প্রসঙ্গ পালটে বলল,

___” আরিশা আমান আসেনি?
আইরা বলে উঠলো,
___” না এখনো আসেনি, আজকে আসবে, রাত হবে মেবি।
হাবীব পুনরায় বলল,
___” ওকে, আনাস কে দেখছি না?
___”আপনার বন্ধু বাড়ির ভিতরে ডেকোরেশনের কাজের লোকদের হেল্প করছে, চলেন বাড়ির ভেতরে যাই।
গল্প করতে করতে সবাই বাড়ির ভিতরে চলে গেলো, মিম আরশের বিয়ের কথা শোনা মাএ কেউ আর সময় নষ্ট করে নি, সাথে সাথে বিয়ের শপিং করে একদম তিন-চারদিনের জন্য লাগেজ গুছিয়ে গ্রামে চলে এসেছে,

সন্ধ্যার আলোটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে, চারপাশে ধীরে ধীরে যত অন্ধকার নেমে আসছে আর বিয়ের বাড়ির সাজসজ্জা ততই ফুটে উঠছে , উঠোনজুড়ে ঝুলছে হলুদ আর কমলা রঙের কাপড়, তার ফাঁকে ফাঁকে গাঁদা ফুলের মালা, দরজার সামনে ছোট্ট একটা বোর্ডে লেখা, মেহেন্দি নাইট, আর চারপাশে জ্বলজ্বল করছে ছোট ছোট ফেয়ারি লাইট,
উঠানের মাঝখানে মেহেদি অনুষ্ঠানের জন্য একটি জায়গা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বসার জন্য ছোট ছোট আসন রাখা হয়েছে, যেখানে ছোট ছোট বাচ্চা রা হইহুল্লার করে খেলা করছে, যত রাত বাড়তে লাগছে ততই বিয়ের বাড়িতে গ্রামের বউজি-রা এসে যাচ্ছে, উঠানের একপাশে সাউন্ড বক্স বেজে যাচ্ছে, সাউন্ড বক্সের তালে তালে সাত আট বছরের ছেলেরা নাচানাচি করছে তো কখনো গানের তালে তালে নিজেও উচ্চ স্বরে গেয়ে যাচ্ছে, চারদিকে এতএত আনন্দ উচ্ছ্বাসের মাঝে মিম বেলকনির চেয়ারে বসে ফোনে আরশের সঙ্গে কথা বলছে, মিমদের বাড়ির পাশের এক ভাবি, আরাত আইরার তুলে আনা মেহেদি পাতা পাটায় বেটে নিচ্ছে, যদিও পাতা মেহেদি শুধু আঙ্গুলের আগায় লাগাবে, আর তার চারপাশে গ্রামের মা চাচি-রা বসে তো কেউ দাঁড়িয়ে গীত গেয়ে যাচ্ছে, আদিবা তালুকদার রা সেসব মানুষ দের জন্য রান্না তুলে দিয়েছেন, কেনো না উনারা অনেক রাত পর্যন্ত বিয়ের বাড়িতে থাকবে, গীত গাইবে মজা করবে,আরাত আইরা মায়া আর সন্ধ্যা, চারজন বাড়ির ভিতরে থেকে বাহিরে বের হয়ে এলো, সবাই কমলা রঙের শাড়ি পড়েছে, আরাত তো বরাবরের মতো মাথায় স্কাপ, আর বাকি সবাই কেউ খোলা চুলে তো কেউ বেনী করে তাজা কাঁচা ফুল মাথায় দিয়েছে, তাঁদের চারজনের হাতে মেহেদীর ডালা, তিশা উঠানে আগে থেকেই চেয়ারে বসে ছিলো, মেহেদি ডালা গুলো রেখে দিতেই আশিক এসে বলল,

___” কই বিয়ের কনে কই, হয়ে যাক একটা ডান্স।
মায়া আশিকের কথায় বিরক্ত মুখে বলল,
___” কেন, এমনে মেয়েরা পাত্তা দিচ্ছে না বুঝি, যে ডান্স করে মেয়েদের অ্যাটেনশন নিতে হবে?
আশিক মায়া কে রাগাতে অ্যাটিটিউড নিয়ে বলল,
___” ও হ্যালো,এক বাচ্চার মা, মেয়েরা তোমার হাসবেন্ডের অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে থাকে বুঝতে পারছো?
আশিকের কথায় মায়া তাচ্ছিল্য হেঁসে বলল,
___” যে মেয়ে তোমার অ্যাটেনশন পেতে চায়, বুঝতে হবে সেই মেয়ের রুচির দুর্ভিক্ষ আছে ।
___” হ্যাঁ হ্যাঁ জানি, তোমার রুচির দুর্ভিক্ষ আছে, আর ঘটা করে বলতে হবে না।
কথাটা বলেই আশিক হাসতে হাসতে আহিনের সাথে হাইফাই করলো, মায়া রাগী চোখে তাকিয়ে আছে, সবার মুখেই হাসি, আইরা মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
___” তোরা আর ঠিক হবিনা না?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনরায় আরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” এই আরাত মিম কে ডাক, রাত হয়ে যাচ্ছে।

আরাত মিমের রুমের দিকে তাকিয়ে দেখলো, মিম সবুজ লেহেঙ্গা পড়ে রেডি হয়ে বেলকনিতে বসে ফোনে কথা বলছে, আরাত ডাক ছাড়লো মিম কে বের হতে, মিম ফোন কেটে দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে উঠানের উদ্দেশ্য হাঁটতে নিতেই দেখলো পার্থ সোফাতে বসে বীরাত এর সঙ্গে দুষ্টামি করছে, মিম পার্থর পিছনে এসে মাথায় গাট্টা মেরে হাতে হাত ভাজ করে দাঁড়ালো, পার্থ আজ সবার মতো বেগুনি রঙের পাঞ্জাবি পড়েছে, সকাল থেকে আনাস এর সাথে হাতে হাত লাগিয়ে বাড়ি সাজাতে হেল্প করে বিকাল বেলা টায়ার্ড ফিল করায় ঘুমিয়ে পরছিলো, সেই ঘুম থেকে মাএ উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে সোফায় বসে, কিছুক্ষণ পর বীরাত এসে পার্থর পাশে বসে, এবং টুকিটাকি কথা বলে, সেখান থেকে পার্থ বীরাত কে নিজের কোলে তুলে নিয়ে দুজন মিলে দুষ্টুমি করতে লাগে, দুষ্টুমির মধ্যে হটাৎ মিম মাথায় গাট্টা মারায় পার্থ মাথায় হাত দিয়ে বিরক্ত মুখে পিছু ফিরে তাকায়, মিম কে দেখে পার্থর মুখ ধীরে ধীরে বিরক্ত থেকে স্বাভাবিক হয়ে আছে, পার্থ অতি দ্রুত চোখ অন্য দিকে ফিরিয়ে একটা ঢোক গিলে ছোট কিন্তু গম্ভীর কন্ঠে বলল,

___” তুই?
___” হ্যাঁ আমি, বাহিরে সবাই এনজয় করছে, তুই বাড়ির ভিতরে কী করছিস?
বীরাত এতক্ষণে পার্থর কোল থেকে নেমে বাহিরে দিকে দৌড় দিয়েছে, পার্থ বাহানা দিতে চাইলো,
___” প্রচুর মাথা ব্যাথা, সাউন্ড বক্সের বিট নিতে পারছি না।
___” তোর কোনো বাহানা শুনবো না, চল বাহিরে চল।
মিম জোর করে পার্থর হাত টেনে বাড়ির বাহিরে নিয়ে যেতে লাগলো, পার্থ আর কিছু বলতে পারলো না, চুপচাপ মিমের সাথে উঠানে চলে এলো, আমান আরিশা সন্ধ্যার দিকে এসেছে, আনাস আশিক হাবীব আদিল পার্থ আহিন, ছয়জন মিলে চেয়ার পেতে গ্রামের মেয়েদের গীত শুনছে, বলতে গেলে তারা এর আগে এমন বিয়ে দেখেনি, শহরে তো শুধু সাউন্ড বক্সের গান শুনা যায়, কিন্তু গ্রামে বিয়েতে এমন গীত হয়ে থাকে, তাই সবাই একখানে বসে নিজেরা আড্ডা দিচ্ছে আর এনজয় করছে, এদিকে আইরা মিম কে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে, আর তাঁদের ঘিরে বসে আছে আরাত আরিশা তিশা মায়া সন্ধ্যা আর হানিয়া, সবাই উঠানে গোল হয়ে বসে গল্প করছে হাসাহাসি করছে আর মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে, হটাৎ বক্সে গান বেজে উঠায় সবার মনযোগ নষ্ট হয়ে বক্সের দিকে তাকালো, বক্সের সামনে রাফি কে দেখে সবার অবাক হলো, কেনো না রাফি ছেলেপক্ষ, পরক্ষণে রাফি কে গেটের দিকে দৌড়ে যেতে দেখে সবার নজর গেটের দিকে চলে গেলো, গেটের সামনে আরশ, রাফি, মিরা, নূরফিহা, হানিফ, সবাই হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে, মেহেদি অনুষ্ঠানে বিয়ের বাড়িতে গেটের সামনে নতুন বর কে দেখে সবাই আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠলো, গ্রামের কিছু মুরুব্বী নতুর বর কে আসতে দেখে কটু কথা বলতে অবশ্য ছাড়লো না, কিন্তু তাঁদের কটু কথা ইগনোর করে আরশ গানের তালে তালে তাল মিলিয়ে নেচে উঠলো,

“তেরে ঘর আয়া, হাম আয়া তুজকো লেনে,
দিল কে বাদলে মেঁ দিল কা নজরানা দেনে…
তেরে ঘর আয়া, হাম আয়া তুজকো লেনে,
দিল কে বাদলে মেঁ দিল কা নজরানা দেনে…
মেরি হার ধড়কন কেয়া বোলে হ্যায়, শুন শুন শুন….
সাজন-জি ঘর আয়েএ
সাজন-জি ঘর আয়েএ
দুলহান কিয়োঁ শর্মায়ে হ্যায়
সাজন-জি ঘর আয়েএ
এবার আশিক, আদিল, হাবীব, রাফি, আমান, আর থেমে থাকলো না, সবাই দৌড়ে গিয়ে নাচতে শুরু করলো, মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশ হইহুল্লার হাসাহাসি আনন্দ উল্লাসে মেটে উঠলো, আরাত হাতের তালি দিতে দিতে ওঁদের থেকে কিছু দূরে তিশার পাশে চেয়ার টেনে বসে এনজয় করতে লাগলো, আইরা, মায়া, সন্ধ্যা, হানিয়া, মেহেদি দেওয়া বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো, এবং মিমের পাশে দাঁড়িয়ে মিম কে ইশারা করতে লাগলো নাচার জন্য, মিম অবিশ্বাস্য চোখে আরশ কে দেখছে, কেনো না কয়েক মিনিট আগেও মিম আরশের সাথে ফোনে কথা বলছে, মিম জানতোই না আরশ এখানে এসে এভাবে হটাৎ করে সারপ্রাইজ দিবে , কোন গাড়ির শব্দ কিছুই শুনতে পায়নি মিম, আরশ হাত উঁচু করে নাচতে নাচতে হাসি মুখে মিমের দিকে তাকিয়ে আছে, মিম নিজের অবিশ্বাস্য চাহনি কাটিয়ে সবার জোরাজোরি তে লাজুক হেঁসে আরশের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে গেয়ে উঠলো,

হোওওওওওও আহহহহহহহহয়াআহহহহহহয়া
” আয় দিল চলেগা আব না কোই বাহানা
গোরি কো হোগা আব সাজন কে ঘর জানা
মাথে কি বিন্দিয়া কেয়া বোলে হ্যায়, শুন শুন শুন..
সবাই মিলে একসাথে নাচতে নাচতে,
সাজন-জি ঘর আয়েএ
সাজন-জি ঘর আয়েএ
দুলহান কিয়োঁ শর্মায়ে হ্যায়
সাজন-জি ঘর আয়েএ।
সবাই একসাথে হাত তালিতে মেটে উঠলো, মিম আরশ কে ফিসফিস করে বলল,
___” কয়েক মিনিট আগেই তো কথা হলো, তখন তো বলেননি যে আপনি এখানে আসছেন?
আরশও মিমের মতো ফিসফিস করে কানের কাছে মুখ লাগিয়ে বলল,
___” বললে সারপ্রাইজ থাকতো না ম্যাম, আর আপনার এই মায়াবী মুখের অবিশ্বাস চাহনি দেখার সৌভাগ্যও আমার হতো না।

মিম আরশের কথায় লাজুক হাসলো,আরাত বসে থাকতে থাকতে পার্থ কে লক্ষ করলো, বাড়ির সবাই যখন আনন্দে মশগুল, ছেলেটা একা একা সবার থেকে দূরে বসে গম্ভীর মুখে মিম আর আরশ কে দেখছে, অথচ বাকি সবার থেকে এই বিয়েতে পার্থর বেশি খুশি হওয়ার কথা ছিলো, আরাত বেশ অবাক হলো, মনে মনে কিছু একটা ভেবে নিজের ভাবনায় নিজেই গালি দিলো, রশ্মির কথা মতো পার্থ তো রশ্মি কে ভালোবাসে, এবং পার্থ বাংলাদেশে কখনো আসবে না, পার্থ অন্য মেয়ের সাথে লিভ-ইন এ ছিলো, বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে রশ্মির সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিল, রশ্মি কে নিজের প্রেমের জালে বাংলাদেশ থেকে কানাডায় নিয়ে যাওয়ার বাজিতে, আর যখন রশ্মি কে সামনাসামনি দেখলো, রশ্মিকে ভালো লাগতে শুরু করলো, আর নিজে নিজে উপলব্ধি করলো সে রশ্মি কে চিট করছে, এই একটা কারণে পার্থ আর রশ্মির সামনে দাঁড়ায় নি, নিজের ফোনে শুধু রশ্মি না নিজের ফ্রেন্ডদের এমনকি যে মেয়েটার সাথে লিভ-ইন এর ছিলো তাকে পর্যন্ত সবখান থেকে ব্লক করে দিয়ে কানাডা থেকে আমেরিকা নিজের জন্মভূমিতে চলে যায়, এসব রশ্মি আরাত কে বলেছিল, সেই হিসাবে পার্থ রশ্মি কে ভালোবাসে, কিন্তু পার্থর চাহনি তে আজ আরাত ভিন্ন কিছু দেখছে, আরাত একবার ভাবলো পার্থর সাথে কথা বলবে, পরক্ষণে আহিনের কথায় আরাত মাথা থেকে সব ঝেড়ে ফেলে সেদিকে মনোযোগী হলো, আরশ

___” হাই গাইজ এটেনশন প্লিজ, আমরা এখন গানের কলি খেলবো, সো যারা যারা গানের কলি খেলতে ইচ্ছুক সবাই গোল হয়ে বসে যায়, আর হ্যাঁ আজকের গেইমের রুলস একটু ভিন্ন হবে, চেঞ্জ টা কী হবে ওটা না হয় খেলার সময় জেনে নিবেন তো রেডি সবাই, হারি আপ হারি আপ।
আহিনের কথায় সবাই গোল হয়ে বসে পরলো, পার্থ কে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে মিম পার্থর হাত ধরে নিয়ে এসে খেলায় অংশগ্রহণ বলল, আহিন খেলার রুলস বলে দিলো, তেমন আলেদা কিছু না, ছেলেরা একদল, আর মেয়েরা আরেকদল, তাঁদের মধ্যে আরশ মিমও আছে, তবে খেলার রেফারি হিসেবে আহিন থাকছে, আর আহিন ডিসাইড করবে, কে কোন অক্ষর দিয়ে গানের কলি গাইবে,এদিকে হাতে মেহেদি অসম্পূর্ণ থাকায়, পুনরায় আইরা মিম কে মেহেদি দিয়ে দিতে লাগলো, মায়া সন্ধ্যা কে মেহদি দিয়ে দিচ্ছে, তিশা হানিয়া কে দিয়ে দিচ্ছে, মেহেদি দিতে দিতে খেলা শুরু হয়ে গেলো, কিন্তু খেলার শুরুতে একটা গ্লাসে কয়েকটা ভাজ করা কাগজের টুকরো ছিলো, আশিক সেগুলো ঝাকিয়ে আহিনের সামনে গ্লাসটা ধরল, আহিন প্রথমে একটা কাগজের টুকরো তুলে নিয়ে ভাজ খুলে দেখলো, কী অক্ষর আছে কাগজের ভাঁজে, আশিক আহিন কে জিজ্ঞাস করলো কী অক্ষর লেখা, আহিন কাগজ টা দেখিয়ে বলল,

___” ত, দিয়ে গান গাইতে হবে, বাট আমি যেহেতু খেলার রুলস চেঞ্জ করেছি, তাই আমি যাকে বলব, সেই গাইবে, রিলাক্স গাইজ এত টেনশনের কিছু নেই, যাকে যে অক্ষরে দেওয়া হবে, সে যেকোনো গানের মাঝখান থেকেও গাইতে পারবে, জাস্ট অক্ষরের সাথে ম্যাচ হলেই হবে।
আনাস বলল,
___” বুঝতে পেয়েছি, আর লেট করিস না শুধু কর, কে আগে গাইবে নাম বল?
আনাস এর কথায় আহিন দুষ্টু হেঁসে আনাস এর দিকে ভ্রু নাচাতে লাগলো, আনাস বিরক্ত হয়ে বলল,
___” প্রথমেই আমার পালা?
আহিন দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” নো, তোমার বউ।
আইরা মেহেদি দিয়ে দেওয়া বন্ধ করে চোখমুখ কুঁচকে বলল,
___” আমি, আমি পারবো না, মেহেদি দিয়ে দিচ্ছি অন্য কাউকে গাইতে বলল।
সবাই একসাথে বলে উঠলো,
___” না না না, কেনো বাহানা চলবে না, তোমাকে গাইতে হবে।
আহিন বলল,
___”আইরা আপু, যে গাইবে না, তার জন্য স্পেশাল পানিশমেন্ট রেডি আছে, আপনি কোনটা চুজ করবেন?
আইরা মুখ গম্ভীর করে বলল,

___” পানিশমেন্ট টা কী?
___” তেমন কিছু না, মানুষ বুঝে পানিশমেন্ট রেডি করেছি, আপনি যদি গান না গাইতে চান, তাহলে আপনার শাস্তি হলো, আগামী এক মাস আপনি উপন্যাস পড়তে পারবেন না।
আইরা চোখ বড় বড় করে তাকালো, আনাস আইরার মনের অবস্থা দেখে মুখ চেপে হাসি আটকাচ্ছে, সবাই তারা দিতে লাগলো, আইরা সবাই কে দেখে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা পালন করে আনাস এর দিকে তাকালো, আনাস এর নজর আইরার দিকেই ছিলো, আইরা আনাস এর চোখে চোখ রেখে মুচকি হেঁসে গাইতে শুরু করলো,
তুমি আমার এই জীবনের
শেষ সম্বল!
যার বুকে চিরদিন
আমি নিরাপদ…
“যার বুকে চিরদিন
আমি নিরাপদ…..
আইরা থামতেই সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠে হাততালি দিতে লাগলো, কেউ সিটি বাজাচ্ছে, তো কেউ বলছে দারুণ,সেই হয়েছে ব্লো ব্লো ব্লো আরও কত কী,আইরা আনাসের দিকে চোখের ইশারায় জানতে চাইল, কেমন হয়েছে, আনাস মুচকি হেসে ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,অসাধারণ, দুজন কে চুপিচুপি কথা আদান-প্রদান করতে দেখে আহির বলল,

___” আজকে একটা বউ নেই বলে,এভাবে চোখাচোখি নীরব প্রেম নিবেদন করতে পারছি না দুঃখ।
“কেন রং রোটে প্রেম জোটে না
মামু এভাবেই কাটবে কি তবে
ওদের হয়েছে, কবে আমাদেরও হবে
মামু এভাবেই কাটবে কি তবে
আরে ওদের হয়েছে, কবে আমাদেরও হবে
কবে.. কবে..কবে..মামু আমাদেও হবে
কবে.. কবে..কবে..মামু আমাদেও হবে….
সত্যিই রে ভাই আমাদের কপালে প্রেম জুটবে কবে?
উপস্থিত সবাই অবাকের সাথে নিস্তব্ধ চোখে দেখছে গান বলা মালিক কে, আর তখনই গান বলা মালিক নিজের কাঁধের ব্যাগটা সবার গোল হয়ে বসা মাঝখানে ছুড়ে মারলো, আহিন কয়েক সেকেন্ড হতবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে হটাৎই আলভী বলে আলভী কে বুকে জরিয়ে নিলো, আলভী নিজেও হাসি মুখে আহিন কে দু’হাতে আগলে নিলো, হ্যাঁ গান বলা মালিক টা আর কেউ ছিলো না, আলভী ছিলো, গতকাল যখন আহিন আলভী কে মিম আরশের বিয়ের কথা জানায়, আলভী কাউকে কিছু না জানিয়ে সাথে সাথে বাংলাদেশ ইমারজেন্সি বিমানের টিকেট কেটে ফেলে, আর বর্তমান সে বাংলাদেশে, মিমের বিয়ে তে সবচেয়ে সারপ্রাইজ আর অবাক করা দৃশ্য হয়তো এই আলভী, শুরু মাএ বিয়ে মিস দিবে না বলে একদিনের মধ্যে কানাডা থেকে বাংলাদেশে চলে এলো, বর্তমান সবাই অবাকের রেস কাটিয়ে একে একে সবাই আলভীর সাথে কথা বলতে লাগলো, মুহূর্তের মধ্যে খুশির আমেজ টা আরো বেশি বেড়ে গেলো, আলভী টাও এই সাত বছরে অনেক বড় হয়ে গেছে, আহিন যেমন ন্যাচারাল থাকতে ভালোবাসে, আলভীর পোশাকে বিদেশি ধ্যাচ লেগে আছে, তার স্টাইলিশে ছিলো ক্যাজুয়াল লুক, আলভী আসার কথা শুনে বাড়ির ভিতরে থেকে রাহিমা সুলতানা ছুটে বেরিয়ে এলেন, আলভী রাহিমা সুলতানা কে দেখে হাসি মুখে মায়ের কাছে এসে জরিয়ে ধরলেন, রাহিমা সুলতানার চোখে পানি এসে গেছে, ছেলেটা এই সাত বছরে এত বড়ো হয়ে গেছে যে রাহিমা সুলতানা আজ ছেলের বুকে পড়ে আছে, পরিবেশ টা বেশ থমথমে হয়ে গেলো, আলভী রাহিমা সুলতানা কে বলল,

___” আম্মু কান্না করছেন কেনো, দেখেন সবাই দেখছে, সবাই বলবে, আজকে মিম আপুর না আপনার ছেলের বিয়ে, যদিও আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবো না, আর কান্নাকাটি করেন না।
আলভীর কথায় সবাই শব্দ করে হেঁসে উঠলো, রাহিমা সুলতানা কান্না করতে করতে রাগী গলায় বললেন,
___” আমি হয়তো এই দুনিয়ার একমাত্র হতভাগিনী মা, ছেলেমেয়ে থাকতেও তাদের বুকে পাইনা।
আলভী মলিন হেঁসে বলল,
___” আমি তো এসে গেছি, আর কান্না করবেন না প্লিজ।
___” বিয়ে শেষ হলে তো আবার মায়ের বুকটা ফাঁকা করে চলে যাবি, তাই না?
___” সে তো যেতেই হবে, আপনার ছেলেকেও একদিন বড় হতে হবে।

তাঁদের মা ছেলের আবেগি কথা চলতেই থাকলো, সবাই এদিকে পুনরায় খেলায় মনোযোগী হলো, আনাস আলভী কে ভিতরে গিয়ে ফ্রেশ হতে বলল,আলভী ব্যাগ নিয়ে মায়ের সাথে বাড়ির ভিতরে চলে গেলো, একে একে সবার সাথে দেখা করে ফ্রেশ হতে চলে গেলো, খেলা শুরু হয়ে গেছে, আহিন এবার বেঁচে বেঁচে পার্থ কে গাইতে বলল, পার্থ বরাবরের মতো চুপচাপ বসে ছিলো, এখানে এত এত হয় আনন্দ উচ্ছ্বাস কিছুই কানে পড়ছে না, আহিন পার্থ কে ‘হ, দিয়ে গাইতে বললো,পার্থর দৃষ্টি গেল মিমের দিকে, মিম ইশারায় গাইতে বলছে, চোখে মুখে খুশি লেগে আছে, পার্থ মিম কে এই প্রথম মন খুলে হাসতে দেখছে, সাতটা বছরে মিম কে হাসানোর জন্য পার্থ অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু পার্থ ব্যর্থ, হয়তো মিম হেসেছিল, কিন্তু সেটা মন থেকে ছিলো না, পার্থ খেয়াল করেছে মিম কে, খুব কাছে থেকেই খেয়াল করেছে, আজকের মিম আর পার্থর লেডি গুগলের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ, হাবীর পার্থ কে হালকা ধাক্কা দিলো, পার্থ যেন নিজের হুঁশে ফিরলো, এতক্ষণ হাবলার মতো মিমের দিকে তাকিয়ে নিজের ভাবনায় মগ্ন ছিলো, পুনরায় মিম ইশারা করে গান গাইতে বললে পার্থ মিমের দিকে চেয়ে গেয়ে উঠলো,

হয়তো কোনোদিন
ভুলে যাবে তুমি
ভুলতে কি পারব তোমায়…
তাই তো এসেছি,
আজকে তোমাকে নীরবে জানাতে বিদায়….
এমনি করে চলে, জীবনে মরণে
যাওয়া আসা……
ব্যাস গানের লাইন শেষ হতেই পার্থ জায়গা থেকে প্রস্থান করলো, সবাই পার্থর যাওয়ার দিকে দেখছে, আরশ সবার মনোযোগ পেতে বলল,
___” আহিন গেমস কন্টিনিউ করো।
আহিন এবার সবাই কে একনজর দেখে নিয়ে হানিয়া কে গাইতে বললো, তাও আবার সেই ‘ত,দিয়েই, হানিয়ার মধ্যে কোনো ভনিতা দেখা গেলো না, সোজাসুজি আদিলের দিকে চেয়ে গেয়ে উঠলো,
তোকে পেয়েছি,
জীবনে আমার করে,
কী দারুণ ভাগ্য আমার,
ছাড়বো না দুহাত কোনোদিন,
হোক না যা হওয়ার…..

সবাই এবার পুনরায় হাত তালিতে মাটিয়ে তুলল চারপাশ, আদিল চুপচাপ হানিয়া কে দেখছে, মেয়েটার মনে আদিল নিজের জায়গা করে নিতে পেয়েছে, এটাই আদিলের জীবনের বড় পাওনা, এতগুলো বছর নিজের অনুভূতির কথা হানিয়া কে জানান দিয়েও আদিলের ভয় হতো, মনে হতো হানিয়া কী সত্যি সত্যি মন থেকে তাঁদের সম্পর্ক টা মেনে নিয়েছে, নাকি মনের বিরুদ্ধে গিয়ে শুধু ভালো থাকতে এই তার ডিসিশন, এই কনফিউশনে আদিল এতগুলো বছর হানিয়া কে বেশি বেশি সময় দিয়েছে, যত্ন করেছে, ধীরে ধীরে হানিয়ার মন থেকে তাকবীর কে মুছে ফেলে নিজের জায়গা করে নিয়েছে, সত্যি কী তাকবীরের জায়গায় নিজের জায়গা করে নিতে পেয়েছে , উঁহু একদম না, কাউকে ভুলে তাঁর জায়গা অন্য কে দেওয়া যায় না, হ্যাঁ যেটা করা যায় সেটা হলো কাউকে ভুলে যেতে অন্যর সহযোগিতা লাগে, অন্য কাউকে সময় দিলে হয়তো মনে যে থাকে তাকে ভুলে থাকা যায়, এবং দিনশেষে সামনের মানুষ টা কে ভালো লাগতে শুরু করে, ধীরে ধীরে তাঁর প্রতি মায়া এসে যায়, ভালোবাসতে শুরু করে, একটা মানুষ কে নিজের ভেবে আবার তাকেই পর করে দূরে সরিয়ে দেওয়া, কথা না বলতে বলতে দুজনে আবার অচেনা হওয়া এই বাক্য টা হয়তো খুব যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু একপক্ষীয় ভালোবাসা, যখন তুমি বুঝতে পারবে, তুমি যাকে ভালোবাসো, সে তোমাকে কখনো ভালোবাসা নজরে দেখেনি, তখন কষ্ট হবে, প্রচুর ভেঙে পরবে, সে কেনো ভালোবাসলো না, এই কথাটা ভেবে কান্নায় ভেঙে পড়বে, তখন অন্য কেউ এসে তোমার ভাঙা হৃদয় কে যত্ন করে নতুন করে সাজিয়ে দিবে, দিনশেষে তুমি যত্ন করা পুরুষ টার প্রেমে খুব গভীর ভাবে পড়বে, নতুন করে ভালোবাসায় ডুবে যাবে, মায়ায় পড়ে যাবে তার, আর আদিল ধীরে ধীরে খুব যত্ন করে নিজের ভালোবাসা দিয়ে হানিয়া কে আগলিয়ে নিয়েছে, আর হানিয়া সেই যত্ন করা পুরুষ আদিলের প্রেমে পড়েছে, আদিল মুচকি হেঁসে তার অর্ধাঙ্গিনীর দিকে চেয়ে আছে, আদিল কে এভাবে চেয়ে থাকতে দেখে হানিয়া লজ্জা পেয়ে অন্য দিকে মুখ ফেরালো, আদিল তার বউয়ের লজ্জা পাওয়া লাজুক হাসি মোহময় দৃষ্টিতে চুষে নিলো যেন,

আহিন এবার হানিফ কে গাইতে বললো, হানিফ হানিফ কাচুমাচু করছে, কখনো এমন আড্ডায় সে সামিল হয়নি, তারউপর সবাই কে সে ঠিকমতো চেনে না, কেমন একটা আনইজি লাগছে, যদিও সবার মধ্যে গুটিকয়েক কে চেনে না, হানিফ কে কাচুমাচু করতে দেখে তিশা আহিন কে বলতে যাবে, যে হানিফের বদলে অন্য কাউকে গাইতে বলতে, তিশা মুখ খুলতেই হানিফ মাথা নিচু করে গেয়ে উঠলো,
তুমি আমার প্রিয়তমা
তোমার চোখে আকাশ আমার
চাঁদ উজাড় পূর্ণিমা
ভেতর থেকে বলছে হৃদয়, তুমি আমার প্রিয়তমা
হানিফের গানের গলা সুন্দর হলেও সবাই তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে হানিফের দিকে, এভাবেও যে গান বলা যায় এই প্রথম দেখছে সবাই, একদম মাটির দিকে তাকিয়ে গানটা গাইলো, একদম রসকস হীন মুখময়, তাদের গানের মধ্যেই আলভী ফ্রেশ হয়ে টায়ার্ড শরীর নিয়ে পুনরায় উঠানে এসে কোনোদিকে না তাকিয়ে চেয়ার টেনে বসে পরলো, চোখমুখে ক্লান্তির ছাপ, হটাৎ পাশ থেকে একটা মেয়েলি কন্ঠে ভাইয়া ডাক শুনে আলভী কপাল কুঁচকে পাশে তাকালো,

___” ভাইয়া আমার ওড়না টা?
আলভী পা নূরফিহার ওড়নার উপর, নূরফিহা অনেক টানাটানি করে যখন নিজের ওড়না আলভীর পায়ের নিজ থেকে বের করতে পাড়ছিল না, তখন বিরক্ত হয়ে আলভীর পায়ের নিজ থেকে ওড়না টানতে টানতে বলল কথাটা, আলভীর নূরফিহা কে দেখে কুঁচকানো ভ্রু সোজা হয়ে গেলো, নূরফিহা এখনোও বিরক্ত মুখে ওড়না টানছে, আলভী কয়েক মিনিট যেন থমকে ছিলো, হটাৎ কিছুক্ষণ আগে নূরফিহার মুখে ভাইয়া ডাক টা মনে পড়তেই আলভী নিজের পা সরিয়ে নিয়ে নূরফিহা কে ধমক দিয়ে উঠলো ,
___” এই মেয়ে এই, নিজের জবান হেপাজত করো, আমি তোমার কোন কালের ভাই লাগি হ্যাঁ?
নূরফিহা আর চুপ থাকলো না, একেই তো এই ছেলে তাঁর নতুন ওড়না টা ময়লা করছে, তার জন্য সরি না বলে উল্টো ধমক দিচ্ছে, নূরফিহা তো এই বাজি ছেলে টাকে শুধু মাএ কিছুক্ষণ আগের কথা মনে করে সম্মান দিয়ে কথা বলছিলো, আলভীর এভাবে আসা, সবাই আবেগি হয়ে যাওয়া, এসব দেখে ভেবেছিলো আলভী হয়তো বউ পক্ষের স্পেশাল গেস্ট, তাইতো নূরফিহার ওড়না আলভীর পায়ের নিচে থাকা আবস্থাতে নূরফিহা খুব সুন্দর করে সম্মান দিয়ে ভাইয়া ডেকে উঠলো, অথচ আলভী, নূরফিহা এবার ওড়না ঝাড়া দিতে দিতে রাগী গলায় পাল্টা উওর করলো,
___”আমার জবাব হেপাজত আছে, আপনি আপনার চোখ হেপাজত করেন, আমি আপনার বউ লাগি হ্যাঁ, যে ভাই বলতে পারবো না?
আলভী নূরফিহার কথায় কয়েক সেকেন্ড নূরফিহার দিকে চেয়ে থেকে হটাৎ হেসে উঠলো, নূরফিহা ভরকে গেলো, আলভী কে হাসতে দেখে, আলভী এবার এক চোখ টিপে নূরফিহার মুখোমুখি হয়ে দুষ্টু হেঁসে বলল,

___” ভাইয়া থেকে ছ্যাইয়া ছ্যাইয়া, নট ব্যাড।
___” হোয়াট, কী সব আজেবাজে বকছেন?
আলভীর মুখে আগের ন্যায় দুষ্টু হাসি,
___” তুমি তো ভাইয়া ডেকেছো, সো আমি তো তোমার ছ্যাইয়া কিউটি, যেমন ধরো ভাইয়ের ইংরেজি অক্ষর Vai, আর Vতে ভালোবাসি, এন্ড A তে আপনাকে, অর iতে আমি, সো ভাইয়া মানে এসে দাঁড়ালো, ভালোবাসি আপনাকে আমি,এবার ডাকো ভাইয়া?
___” আজ থেকে আপনি আমার খালু, ধন্যবাদ ।
নূরফিহা বসা থেকে উঠে চলে যেতে নিলেই, আলভী হাত টেনে ধরে, নূরফিহা ঢোক গিলল, চোখে মুখে বিরক্ত তো লেগেই আছে, তবে মুখে কিছুই বলল না, শুধু আলভী হাত ঝাড়া দিয়ে জায়গা ত্যাগ করলো, আলভী নূরফিহা কে হকচকিয়ে যেতে দেখে বাঁকা হেঁসে উচ্চ স্বরে পুনরায় বলল,
___”রিলাক্স কিউটি , এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমি ছেলে খারাপ না।
নূরফিহা বড় বড় পা ফেলে চলে গেলো, আলভী যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিরবির করলো ,

___” বড় ভিতু তো তুমি, ইন্টারেস্টিং।
আহিন বসা থেকে উঠে বলল,
___” থ্যাংকস এভরিওয়ান, তোমরা এনজয় করো, আমি আর নেই।
হাবীব বলল,
___” নেই মানে?
আহিন আলভীর কাছে এসে বসলো, নেই মানে বুঝিয়ে ছে, সে আর গেমস আর খেলবে না, আরাত হাবীবের প্রশ্নে উওর করলো,
___” বুঝতে পারছেন না ভাইয়া, নেই মানে, সে এখন ভন্ডমি করবে, কত’বছর পড়ে আরেক ভন্ড কে কাছে পেয়েছে বলে কথা।
আহিন বলে উঠলো,
___” আপু আমি ভন্ড না, আর যতটুকু হতে পেয়েছি সব তোমার কৃপায়।
আরাত দাঁত কিরমির করে তাকালো আহিনের দিকে, আহিন হাসতে হাসতে বলল,
___” রেগে যাচ্ছো আপু, থাক রাগতে হবে না, কেনো এক শুক্রবারে তোমাদের সাথে থাকলেও আমাকে ভদ্র ছেলে হিসাবে দেখতে পাবে প্রমিস ।
সবাই ভ্রু কুঁচকে তাকালো, আহিন সবাই কে পরক করে নিয়ে ভাব নিয়ে বলে উঠলো,

___” কারণ ওইদিন আমার বিয়ে হবে।
আইরা বলে উঠলো,
___” জীবনে একটা প্রেম করতে পারলি না, আবার বিয়ে করার সপ্ন দেখিস?
আইরার কথায় আহিন অ্যাটিটিউড নিয়ে বলল,
___” মেয়েরা সবসময় ভুল ছেলেদের প্রেমে পড়ে, আমি হইলাম একটা সঠিক ছেলে তাই কেউ আমার প্রেমে পরতে চাই না, নয়তো মেয়ে পটানো এত আহামরি কিছু না।
সন্ধ্যা বিরক্তিকর কন্ঠে বলল,

___” আহিন তোর পাগলামি গুলো বন্ধ কর ভাই, অনেক ভাব নিয়ে ফেলছিস।
আহিন সন্ধ্যার কথায় দূরে তিশার পাশে বসা নূরফিহা কে একনজর দেখে বলে উঠলো,
___” আর কয়েকদিন আমার পাগলামি গুলো সহ্য করো আপু, বেশি না আব্বুর পুত্রবধূ ঘরে আসলেই তোমাদের আর জ্বালাবো না।
আহিনের কথায় সবাই কপাল চাপড়াতে লাগলো, রাত গভীর থেকে গভীর হয়ে যাচ্ছে, সবাই মিলে রাতের খাবার খেয়ে আরশ হানিফ রাফি সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে, তাঁদের সাথে নূরফিহা চলে গেলো, এত রাতে বাড়িতে পৌছাতে পৌছাতে রাত দশটা বেজে যাবে, আগামীকাল আবার গায়ে হলুদ, আরশ রা যাওয়ার পর বিয়ের বাড়ি কিছুটা চুপচাপ হয়ে গেছে, বিয়ের বাড়ি আরো নিস্তব্ধ করে দিতে কারেন্ট চলে গেলো, কারেন্ট যেতেই চারপাশ হইহুল্লা চেচামেচি শুধু হয়ে গেলো কিছু মুহূর্তের জন্য, আশিক অন্ধকারে চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল,
___” আয়রে আয় টিয়া কারেন্ট গেলো নিয়া, এখোন বসে থাকি মোম বাতি জ্বালিয়া
হাবীব পাশ থেকে ব্যঙ্গ করে কবিতার মতো করে বলল,
___”এই দিকে গরমের জালা, আপনার কবিতা আমার লাগচে অনেক ভালা।
আমান বিরক্ত মুখে বলল,
___” আমার দেখা এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি গালি খাওয়া মানুষ হলো লোডশেডিং করানো কর্তৃপক্ষ, বেচারার বউ বাচ্চা সহ গালি খায়।
আনাস কিছুক্ষণ পড়ে সবার উদ্দেশ্য বলল,
___” গাইজ ফলো মি।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৭

আনাস এর যাওয়ার দিকে সবাই তব্দা খেয়ে তাকিয়ে থেকে, ধীরে ধীরে, আশিক, আদিল, আমান, হাবীব আহিন, আলভী, সবাই গেলো, যাওয়ার প্রায় ঘন্টা দুয়েক পড়ে সবাই বাড়িতে ফিরেছে, তবে তারা একা ফিরে নি, তাদের সাথে দুই বাঁধা ডাঁপ নিয়ে ফিরেছে, এতরাতে ডাঁপ নিয়ে ফিরতে দেখে আদিবা তালুকদার অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলল,
___” তোমরা ডাপ চুরি করে নিয়ে এনেছো?
সবাই বেশ ক্লান্ত, কেউ সোফায় তো কেউ মেঝেতে বসে পরলো, তাদের দেখে মনে হচ্ছে, চুরি করতে গিয়ে লোকজনের তাড়া খেয়ে দৌড়ে পালিয়ে এসেছে, আহিন ক্লান্ত কন্ঠ চোখ বুঝে নিয়ে বলল,
___” কাকিমা চুরি করে আনি নাই, না বলে এনেছি।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৯

2 COMMENTS

Comments are closed.