বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৬ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি
হাসপাতালের তিনতলার এই ওপেন-এয়ার রুফ গার্ডেনের চারপাশটা স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। যার ওপারে তাকালে মনে হয় আস্ত কাঠমান্ডু শহরটা উপত্যকার কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।
দূরে নাগার্জুন পাহাড়ের সারি নীলচে কুয়াশায় ঢাকা, আর তার মাথার ওপর পেঁজা তুলোর মতো মেঘেরা অলস ভঙ্গিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। বাগানের মাঝে মাঝে সাজানো জাপানিজ ম্যাপল আর কয়েক জাতের ফার্ন। পাহাড়ের হিমেল হাওয়ায় মৃদু দুলছে গাছগুলো। এক কোণে ছোটো একটা কফিশপ থেকে রোস্ট করা কফি বিনের কড়া গন্ধটা বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বাগানের পশ্চিম কোণের একটা কাঠের বেঞ্চে পাতা। পাশাপাশি বসে আছে আশফি আর মিরান। সামনের পাহাড়গুলোর ওপর সকালের রোদ এসে পড়ায় সেগুলোকে এখন ঝকঝকে রুপোলি মনে হচ্ছে। অথচ এই দুই মানুষকে দেখে লাগছে যেন মেঘ জমে আছে তাদের চেহারায়।
আশফির দুহাতের তালুর মাঝে ধরা একটা পেপার কাপ। কফির ধোঁয়া অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে, কিন্তু ওটা সে ঠোঁটে ছোঁয়ানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। ওর চোখের নিচে কালচে ছোপ আর ফ্যাকাসে চেহারায় কেমন এক ধরনের শূন্যতা মিশে আছে। যা ভোরের এই উজ্জ্বল আলোর সঙ্গে লাগছে বড্ড বেমানান।
নাগার্জুন পাহাড়ে আশফির স্থির হয়ে থাকা চোখের দিকে এক পলক তাকাল মিরান। নীরবতা ভেঙে খুব নিচু স্বরে বলল ওকে, “কফিটা ঠান্ডা হয়ে বরফ হয়ে গেছে। খাস না কেন?”
কাপের দিকে একবার তাকাল আশফি। তারপর আবার পাহাড়ের দিকে চোখ ফেরাল। উদাস গলায় বলল, “চার বছর ধরে আমি দুটো প্রশ্নের উত্তর হাজারবার খুঁজে বেরিয়েছি, আজও খুঁজছি। চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছিলই, কেন সেই দিনটাতেই গেল সে — যে দিনটাতে ওকে আমার স্বামীর অধিকার নিয়ে আপন করার কথা ছিল?”
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল তারপর, “আমার ওর ভালোবাসা নিয়ে প্রগাঢ় সন্দেহ হয় রে৷ আমি চাই না, তবু হয়। ও যদি আমার জন্যই নিজের সম্ভ্রমকে অন্য পুরুষের কাছ থেকে রক্ষা করে, তাহলে সেই আমার কাছে এই চার বছরে কি একটাবারও ফেরার সুযোগ পায়নি? একবারও আমাকে দেখতে ইচ্ছে হয়নি?”
এক মুহূর্ত থামল সে। ভগ্নস্বরে বলল তারপর, “আমাকে ছেড়ে ও অন্য কারও ঘর করছে। তবু আমি ওকে না দেখে থাকতে পারিনি, ভাই। মনকে কতবার, কতভাবে বাঁধতে চেষ্টা করেছি। তিন মাস … চার মাস, সর্বোচ্চ পাঁচ মাস৷ তারপরই ছুটে গিয়েছি আবার৷ কিন্তু ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহসটা আর হয়নি। অন্য পুরুষের সঙ্গ ঘনিষ্ঠভাবে দেখব, এই দৃশ্য বারবার দেখার মতো সাহস আমার ছিল না৷”
শেষ কথাটার পরই আশফি মিরানের দিকে চাইল, “ওর সামনে যেতে এমনিতেও আমার ভয় করত। তোর তো মনে আছে। ওর বিয়ের খবর জানার পর যখন আমি ছুটে গিয়েছিলাম তোদের বাড়ি, মেয়ে আর নতুন জামাইকে নিয়ে তোর বাবা তো তখন তোদের নতুন ভিলাতে পার্টি করছিল। তাও তোকে দিয়ে খবর পৌঁছালাম মাহির কাছে। কিন্তু ও এল না। তুই প্রচণ্ড রাগ নিয়ে আমাকে কল করে বললি, এক্ষুনি দেশে ফিরে আসতে। আর যেন ভুলেও কোনোদিন ওর নাম মুখে না নিই। এর কিছুক্ষণ পরই সিকিউরিটি আমাকে সম্মানের সাথে চলে যাওয়ার অনুরোধ করল। আর আমি অনুরোধ করেছিলাম, ম্যানশনের অ্যাড্রেসটা আমাকে দিতে। দিল না ওরা। তুইও তো দিলি না।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মিরান। দৃষ্টিজোড়া ঝুঁকে গেল ওর, “আমি নিজেও কি তখন জানতাম? সেদিন আমার আর কোনো কলই তো রিসিভ করেনি কেউ। আর এসব কথা আজ তুলছিস কেন? ভুলে যা, ভাই। নয়তো একসঙ্গে দুজন থাকবি কী করে?”
“ভুলে যাওয়া সহজ, মিরান? এরপর আমি তোদের ওই ম্যানশনের অ্যাড্রেস নিজেই কালেক্ট করে আবারও যখন ওর কাছে গেলাম, সেদিন জানলাম…”
বলতে গিয়ে বুকের ভেতরের নিদারুণ যন্ত্রণাটা ফুটে উঠল ওর চোখে-মুখে, “দে ওয়েন্ট অন আ হানিমুন। কোথায় গেছে, তা আর সিকিউরিটি জানাল না আমাকে। তবু কদিন অপেক্ষা করলাম। ফিরল না ও। অথচ দেশে ফিরে আসার পরই তোর কাছে কল এল ওর। আর ওইদিনের ওই দুটো কথা আমি গোটা চারটা বছরেও ভুলতে পারিনি। ‘আশফি কে… হু অন আর্থ ইজ দ্যাট? তিন মাস আগের ওই বিয়ের কোনো স্বীকৃতি নেই ওর কাছে। এই কথাগুলোর পর আমার জায়গায় সেদিন তুই থাকলে কী স্টেপ নিতি?”
এ পর্যায়ে মিরান নিরপেক্ষতা থেকেই জবাব দিল, “কী করতাম তা না বললেও তোর কী করা উচিত ছিল সেটা তোকে বারবার বলেছিলাম। বলেছিলাম, নিজেও যোগ্য কাউকে বিয়ে করে সেটেল কর। শুনিসনি আমাদের কারও কথা। ওর জন্য মনে তোর রাগ, ক্ষোভ, কষ্ট থাকলেও ঠিকই বারবার ইস্তাম্বুল ছুটতি। আর যখন যেতিই, একটু সাহস করে ওর সামনে গিয়েও দাঁড়াতি।”
“সাহস করেছিলাম না?” এক অস্বাভাবিক শীতল কণ্ঠে বলতে লাগল আশফি, “সেদিন যখন অন্য এক পুরুষ ওকে জড়িয়ে ধরে সবার সামনে চুমু খেলো, তা দেখার পর আমার … আমার মনে হচ্ছিল ওর সঙ্গে কথা বলার সমস্ত শক্তি আমি হারিয়ে ফেলেছি৷ দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে পা দুটোতে কেমন বল পাচ্ছিলাম না, জানিস? আর বুকের ভেতরটায় … বুকের ভেতরটায় মনে হচ্ছিল হৃৎপিণ্ডটা যেন কেউ নিষ্ঠুরভাবে খামচে ধরে রেখেছে৷ আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কী যে কষ্ট, ভাই! ওই কষ্ট কোনোদিন কোনো প্রেমিক পুরুষের না হোক। ওর সামনে আর কোনোদিন দাঁড়াবার ইচ্ছেটা সেদিনই মরে গেল আমার। বলা ভালো, সাহস চলে গেল। আমি তো অতটাও কঠিন ধাতুর না রে, ভাই। আর আমি সেদিন দেখতে পাচ্ছিলাম ও হ্যাপি। অথচ আমার বাসর রাতে কী অধীর অপেক্ষায় ছিলাম আমি, আমার বউটার জন্য! আমার গুরাসকে আমার নামে পাওয়ার পর আমার বউ সাজে ওকে দেখার কী আকুলতা ছিল আমার …! কিন্তু আমার সেই অপেক্ষা আর ফুরোলো না। আমাকে ছেড়ে, আমাকে না জানিয়ে চলে গেল আমার ছোট্ট গুরাস। আমি আমার বউকে আর দেখতে পেলাম না! আমি যতবার তোদের বাড়ি অবধি গিয়েছি, ততবার ও ইচ্ছে করেই আমার সঙ্গে দেখা করেনি। সেটা তুইও জানিস। আমার সমস্ত কল ইগনোর করত, কেবল ফুপুর কল ছাড়া৷ তাই ফুপুর ফোন থেকে যতবারই ওর সঙ্গে আমি কথা বলতে চেষ্টা করেছি, ততবারই কী চড়া মেজাজে চিৎকার চেঁচামেচি করে বসত ফুপুর সঙ্গে, তোর সঙ্গে। আমাকে বারবার অপমান করে কথা শোনাত তোদের কাছে। আমি কি তা বুঝতাম না? কেবল মানুষটা মাহি ছিল, মিরান। এজন্যই আমার ইগো, আমার সেল্ফ রেসপেক্ট যতটা কঠিন হওয়ার কথা, ততটা ছিল না। ডেনিজের সঙ্গে দেখার পর সেদিনই রিয়েলাইজ করলাম — এরপরও আমি যদি ওকে আমার কাছে ফেরার আকুতি জানাই, তবে আমার চেয়ে হীন, নির্লজ্জ, আত্মসম্মানহীন পুরুষ আর পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।”
শেষ কথাটা বলেই একটুখানি ম্লান হেসে ফেলল সে, “তবু আমি নির্লজ্জ, বেহায়ায়। শেষ দু বছরেও চারবার ছুটেছি ইস্তাম্বুল। আমার চেনা সেই আদুরে, বদমেজাজি, ছোট্ট গুরাসকে যতবার দেখেছি — সে এক অন্য নারী! দেখতে লাগত একদম ওসমান বারিশ সুলতানের সুযোগ্য সন্তান মারিশা বারিশা সুলতান। এজেন্সি থেকে যে নারী বের হত ফরমাল স্যুট-প্যান্টে এক গম্ভীর বিজনেস উইম্যান হয়ে। তাকে আমার গুরাস লাগত না। তবু দেখে শান্তি পেতাম।”
শুনতে শুনতে আরও একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল মিরান। একজন ভাই, একজন বন্ধু হয়ে আশফির মনের অমোচনীয় ব্যথাটা ঠিকই অনুভব করতে পারল সে। কিন্তু সে যে আজ নিরুপায়। কিছুটা স্বার্থপরও হয়ে গেছে। মারিশার অপরাধটা অমার্জনীয় কিনা, তা বিচারের দায় সৃষ্টিকর্তাই করবেন। কিন্তু সে কেবল চায়, আর কোনো কষ্ট না পাক ওর বোনটা৷
মনে মনে কথা গুছিয়ে নিয়ে বলল মিরান, “কষ্টের ভাগ যদি নেয়া যেত, তবে আমি তোর সবটুকু কষ্ট নিয়ে নিতাম। তোদের বড়ো ভাই হয়ে এ মুহূর্তে আমি শুধু এটাই চাই, সব কিছু ভুলে তোরা এক সঙ্গে থাক … ভালো থাক৷ প্রায় তিনটা বছর ধরে যে জাহান্নামে জ্বলেছে আমার বোন, সেই ব্যথার টনিক একমাত্র তুই। সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছিসই ওকে অ্যাক্সেপ্ট করবি, তখন আর পেছনের কষ্টগুলো মনে রাখিস না, প্লিজ! ওই দিনগুলোকে আর টেনে আনিস না নিজেদের মাঝে।”
শান্ত, অথচ গম্ভীর দৃষ্টি তুলে তাকাল আশফি। মনস্তাপে ভারী হওয়া কণ্ঠে সে দৃঢ় সুরে বলল, “চার বছর ধরে পৃথিবীর এই কোনা থেকে ওই কোনায় একটুখানি শান্তি খুঁজে বেরিয়েছি শুধু। ওকে ভুলতে, ওর দেওয়া আঘাতকে সারিয়ে তুলতে মনকে টেনে ধরে অন্যদের সঙ্গ নিতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু শান্তি আর আমার ক্ষতের মলম কারও কাছেই পেলাম না৷ আমার হারিয়ে যাওয়া চারটা বছর আর ফিরে পাবো না, জানি৷ কিন্তু সবটা নতুন করে শুরু করার আগে আমাকে এতটা ভোগানোর একটা যৌক্তিক কৈফিয়ত আমি সবার কাছ থেকে চাইব। তাই সরি, ভাই। এ মুহূর্তেই ভুলে যাওয়া সম্ভব না।”
গম্ভীরতা ভর করল মিরানের মাঝেও। স্বভাবজাত কপালের মাঝে ভাঁজ ফেলে সে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে তুই কী চাচ্ছিস? আমার বোনের এই সিচুয়েশনেও তুই ওর সঙ্গে এই অতীত নিয়ে হিসাব-নিকাশ করতে বসবি?”
“এই সিচুয়েশনে কেন করব? ওকে সুস্থ করে তোলার পরই দুজনের মাঝে যতরকম দ্বিধা-দ্বন্দ, অভিমান জমা আছে — সব ক্লিয়ার করব। আর আমার কৈফিয়ত চাওয়াটা তো অন্যায় নয়৷ আমার পূর্ণ অধিকার আছে কৈফিয়ত চাওয়ার৷ সেটা নিয়ে রিয়্যাক্ট করার কোনো কারণ দেখছি না।”
“আমি তো রিয়্যাক্ট এজন্য করছি না। তোর যা হিসাব-নিকাশ করার, যা কৈফিয়ত চাওয়ার তা আমার কাছে চা। এ মুহূর্তে বাবা যেহেতু অচল, তাই তার বদলে আমিই ওর লিগ্যাল গার্ডিয়ান। কিন্তু ওকে কেন চার্জ করবি? ও চারটা বছর কিসের মধ্যে দিয়ে গেছে, তা তো তোকে বললামই। সেসব নিয়ে ওকে বারবার প্রশ্ন করা মানে ওকে ট্রমাতে ফেলা আবার।”
“আমি তো ট্রমাতে ফেলার মতো অ্যাগ্রিসভলি প্রশ্ন করব না। আর ওর মেনটাল হেলথ যদি এখনো আনস্টেবল থাকে, তাহলে ওকে নিয়ে ইমিডিয়েটলি আমি সাইক্রিয়াটিস্টের কনসাল্টেশন নেব।”
এবার মিরান না চাইতেও উত্তেজিত স্বরে ধমকাল, “মানে… তবুও তোর ওকে কাঠগড়াতে দাঁড় করাতেই হবে, তাই না? ওকে শান্তি দিবি না একদম! আমি কি ওকে তোর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে ফেরত পাঠিয়েছি?”
আশফির ভ্রুজোড়া বেঁকে গেল আর চোখের দৃষ্টিতে সন্দেহ ঘনীভূত হলো। এভাবে হঠাৎ করে মিরানের চটে যাওয়ার কারণটা ঠিক স্বাভাবিক লাগল না ওর। প্রথমে জিজ্ঞেস করল, “তুই ফেরত পাঠিয়েছি বলতে কী বোঝাচ্ছিস আসলে? ও কি নিজের ইচ্ছেতে আসেনি আমার কাছে? মানে তোর পারমিশন পাওয়ার পর ও আমার কাছে আসতে পেরেছে না-কি?”
তারপর জানতে চাইল, “আর ওকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারব না কেন? আমার তো সবার আগে ওর কাছ থেকেই জবাব চাই। কারণ, ও আমার বউ। সঠিক সময় বুঝে আমি ওকে অবশ্যই প্রশ্ন করব, ভালোবাসা অটুট থাকলে কেন চার বছরে একবারও আমাকে একটা মেসেজ পর্যন্ত করেনি? ওকে তো ঘরবন্দি করে রাখতে পারেনি ডেনিজ। তাহলে কেন সুযোগ থাকতেও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি?”
চোখে-মুখে প্রচণ্ড শঙ্কা আর দুশ্চিন্তা প্রকট হলো মিরানের। আশফির চোখ থেকে চোখদুটো সরিয়ে নিল সে। ঠিক এই ভয়টাই কাজ করত ওর। আশফি সব কিছু ছাড় দিলেও এই প্রশ্নের জবাব ও চাইবেই — তা তো নিশ্চিতভাবেই জানত। কিন্তু মিথ্যা বলা ছাড়া উপায় কী? মিথ্যা দিয়ে যদি দুজন আবার দুজনকে ফিরে পায়, তবে মিথ্যার আশ্রয়ই সে নেবে।
কিন্তু তার পূর্বেই আশফি সাফ সিদ্ধান্ত জানাল, “শুনতে খারাপ লাগলেও আমি তোকে স্ট্রেইট বলে রাখছি, মিরান। যতক্ষণ না আমি আমার সকল প্রশ্নের জবাব পাবো, ততক্ষণ তোর বোনের কোনো রেহাই নেই আমার প্রশ্ন থেকে।”
কথাটা শুনেই মিরান এবার ধৈর্যহারা হলো। সটান দাঁড়িয়ে পড়ল আর কড়া গলায় জানাল সে, “দেন… পরশু দিনের ফ্লাইটেই আমি মাহিকে নিয়ে ইস্তাম্বুল ফিরছি। যার কাছে থাকলে আমার বোনের মেনটাল স্ট্রেসে পড়তে হবে, আমি কখনোই তার দায়িত্বে আমার বোনকে রাখব না।”
তীক্ষ্ণ চোখে চাইল আশফি। ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়াল সেও, “ওয়েল… তুই মে বি ভুলে গেছিস। অথবা গুরুত্ব দিচ্ছিস না আমার সেদিনের কথাটা।”
সরু চোখে তাকাল মিরানও, “কোনদিনের কোন কথা?”
“ওকে”, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল আশফি, “লেট মি রিপিট দ্যাট। মাহিকে খুঁজে পাওয়ার আগে আমি তোকে বলেছিলাম, যদি ওকে জীবিত ফিরে পাই তো, সেদিনের পর থেকে…”
এক মুহূর্ত থেমে সে কথাগুলোর ওপর জোর দিয়ে বলল, “ওর ওপর তোদের কারও কোনো অধিকার থাকবে না আর।”
“হু দ্য হেল আর ইউ”, মিরান তীব্র মেজাজে বলল, “থাকবে না কেন?”
কড়া গলাটা শোনাল ওর হুমকির মতো, “ডোন্ট ইউ ফরগেট ইট, ব্রো, তুই ওর হাসবেন্ড হওয়ার আগে আমি ওর ভাই। ওসমান বারিশ সুলতান ওর বাপ। আমাদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার কে রে তুই?”
“বোকা ছেলে…”, তেরছা ঠোঁটে হেসে ফেলল আশফি, “আমি কে, তা তো তুই জেনেই আমার কাছে ওকে পাঠিয়েছিলি, তাই না? তাও যখন জিজ্ঞেস করছিসই, দেন লেট মি মেনশন ইট।”
এবারও সে কথাগুলোতে আলাদাভাবে এক জোর দিয়ে বলে উঠল, “আই অ্যাম দ্য অনলি ম্যান ইন দিস ওয়ার্ল্ড হু ক্যান বি মাহিস হাসব্যান্ড, অ্যান্ড নো ওয়ান এলস এভার উইল বি। গট ইট?”
মিরানের গলা চড়ে গেল, “কিন্তু তুই ওকে ভালো রাখবি, তার গ্যারান্টি তো পাচ্ছি না আমি! তুই ওকে ভালো রাখতে পারিসইনি। যেটার ফল আজ ও এভাবে ভুগছে।”
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৬
তবু একচুল বিকার ঘটল না আশফির মাঝে। সে মিরানের চেয়েও আরও উত্তেজিত স্বরে বলল, “তোরাও তো ভালো রাখিসনি। যাকে আমি বিয়ে করেছিলাম, সেই মেয়েটা আর আজকের এই মেয়েটার মধ্যে আকাশ–জমিন ফারাক, মিরান বারিশ। একদম ধ্বংস করে দিয়েছিস ওর প্রকৃত অস্তিত্বকেই। এখন যাকে ফেরত পেলাম, সে একটা দুমড়ানো মোচড়ানো পায়ের নিচে পিষে যাওয়া নষ্ট ফুলের মতো। কীভাবে ওর এই হাল হলো? কেন আমার জীবনের চার বছর শেষ করে দেওয়া হলো? তার কৈফিয়ত না পেলে তোদের বাপ-ছেলেকে ছেড়ে দেব ভেবেছিস? তোর বোনও ছাড় পাবে না… এবং ফিরে যখন এসেছেই, দ্বিতীয়বার আমাকে ছেড়ে যাওয়ার অধিকারও সে পাবে না। ওসমান বারিশ সুলতানকে তৈরি থাকতে বলিস। আমি আবার বলছি, চারটা বছর আমার জীবনের সুখ শান্তি শেষ করার শাস্তি আমি তাকে পাই টু পাই দেবই, মিরান। মার্ক মাই ওয়ার্ডস!”
