বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৮
ইসরাত জাহান দ্যুতি
সকাল পৌনে দশটা। বাইরে পাহাড়ের ঘন কুয়াশাটা পাতলা হয়ে এসেছে অনেকটা। কাঁচের জানালার ওপাশে তেজালো রোদটা এসে আছড়ে পড়ছে হাসপাতাল চত্বরের পাইন গাছগুলোর ডগায়। সূর্যের তীক্ষ্ণ আলোয় পাইন বনের ছায়াগুলো দীর্ঘ হয়ে শুয়ে আছে নিচে ঘাসের ওপর।
মারিশার নাকে এখনো ফিনাইল আর ওষুধের কটু গন্ধটা বিঁধছে। যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে গত তিনদিন ধরে ছটফট করছিল। আজ তার সেই দিন। আজ সে এই চার দেয়ালের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাবে।
তবে মুক্তির আনন্দের চেয়েও বেশি মারিশার মনে গত রাতের তপ্ত মুহূর্তগুলো বারবার হানা দিচ্ছে। বিকেলবেলা করিডোরে বন্ধুদের হাসির শব্দ শোনার ঠিক আগমুহূর্তে আশফি যেভাবে অতর্কিতে ওর ঠোঁটের ওপর নিজের অধিকার বসিয়ে দিয়েছিল, সেই আগুনের রেশ কাটতে না কাটতেই রাত গভীর হওয়ার পর তাকে আরও নিবিড় আর গাঢ় ছোঁয়ায় প্রায় দিশেহারা করে তুলেছিল মিচকে শয়তানটা। এসে একরকম জোরজার করে একটুখানি জায়গা করে নিয়েছিল তার পাশে৷ আপাতদৃষ্টিতে মারিশা তখন রাগ জাহির করলেও আদতে তার ভেতরটা ছিল লজ্জা আর বেসামাল অনুভূতির তাণ্ডবে এলোমেলো।
আশফি হঠাৎ তার খুব কাছে ঝুঁকে এসে, কানের লতিতে উষ্ণ ঠোঁট ছুঁইয়ে, গাঢ় স্বরে ফিসফিস করে অভিযোগ তুলেছিল, “তোমার সব কিছু বদলালেও আমাকে দূরে সরিয়ে রাখার জেদটা তো ঠিক আগের মতোই আছে! ওইটুকু সোফায় আমার ঘুমাতে কষ্ট হয় দেখেও একবার মায়া হলো না তোমার? ঠিক আছে, না হলো। নিজের হক নিজেই বুঝে নিচ্ছি। দেখি আমার বুকে আসো তো এবার। আমার বুকের সবটুকু মায়া তোমার বুকে ট্রান্সফার করে দিই।”
ওর গভীর অভিসন্ধিটা ঠিক টের পেয়েছিল মারিশা। তখন সে লজ্জায় আর আবেশে যেন কুঁকড়ে যাচ্ছিল। ওকে আলতো ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে বিড়বিড় করে বলেছিল, “যাও তো! একদম শয়তানি করবে না। আর এ কদিন কে কাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, কার বুকে কতটুকু মায়া ছিল, সেটা সবাই দেখেছে।”
পুরনো অভিমানটা হঠাৎ করেই আবার বিষাদ হয়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল মারিশার। সে মুখটা গম্ভীর করে অনুযোগের সুরে যোগ করেছিল, “আমি প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিলাম বলেই তো আজ তোমার এত মায়া উথলে উঠল! নয়তো কি আর কাছে আসতে?”
অভিযোগটা শুনে এক অদ্ভুত বিষণ্ণ অথচ মায়াবী হাসিতে ঠোঁটটা ভিজে উঠেছিল আশফির। সে ধীর গলায় বলেছিল, “আহারে মায়া! পরিচয়ের সেই শুরু থেকে এই মায়ায় তো আমাকে তোমার আজীবনের ক্রীতদাস করে রেখেছে। যে বিষাদকে বর্ম বানিয়ে আমি বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম, তোমার এই মায়ার কাছেই তা শুকনো খড়কুটোর মতো তুচ্ছ হয়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।”
অশ্রুতে মারিশার দুচোখ ভরে উঠেছিল তখন। সে মুখটা সামান্য সরিয়ে নিয়ে ধরা গলায় উত্তর দিয়েছিল, “মিথ্যে! এতই যদি মায়া, তবে বারবার আমাকে এতটা কষ্ট দিয়ে অপমান করে দূরে ঠেলে দিয়েছিলে কীভাবে?”
প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে ছিল আশফি। তারপর মারিশার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিয়েছিল, “হাহ্! সেটাই-বা পারলাম কই? যতবার আমি পাষাণ হয়ে তোমার আর আমার মাঝখানে দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলতে চেয়েছি, ততবারই তোমার মায়ার এই অতল টান দুর্বার আকর্ষণে আমাকে তোমার কাছে টেনে নিয়েছে। আমি চাইলেও তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার সাধ্য আমার আর হত না হয়তো।”
এরপর অস্ফুট স্বরে বলেছিল মারিশা, “কিন্তু আমি যদি ওভাবে মরতে না বসতাম, তোমার এই পাথুরে অভিমান কোনোদিনও ভাঙত না, আশফি। আমাকে ভালোবেসেও তুমি কোনোদিন নিজের বুকে টেনে নিতে না, আমি জানি।”
হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে আশফি তখন জড়িয়ে ধরেছিল মারিশাকে। ওর ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা আরও একটু গভীর করে ডুবিয়ে নেশাতুর, গাঢ় কণ্ঠে ফিসফিস করে বলেছিল, “গুরাস… আমার জেদি গুরাস! কত বোকা তুমি! যেদিন আমার সামনে এসে দাঁড়ালে, আমার কাছে এলে। সেদিন তোমার স্পর্শেই তো আমার কয়েক বছরের জমানো সব অভিমান আর কষ্টের পাহাড় ধসে চুরমার হয়ে যেতে লাগল। সেই রাত থেকে শুরু করে আমি কতটা নাজুক হালে, নিয়ন্ত্রণহারা অনুভূতি নিয়ে প্রতিটা রাত পার করে চলেছি, তা তো তুমি জানো না।”
কথাগুলো শেষেই মারিশাকে আর অভিযোগের সুযোগ দিতে চায়নি সে৷ বাইরের হিমশীতল পাহাড় আর শরীরের ভেতরে বয়ে চলা তার আগ্নেয়গিরি যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল তারপরই। এক দুর্নিবার দাবি নিয়ে মূহূর্তেই মারিশার ঠোঁটে নেমে পড়েছিল তার ঠোঁটদুটো৷ ওর ক্ষত স্থান থেকে শরীরের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছিল তার অবাধ্য হাত আর ঠোঁটজোড়া।
সেই গভীর সোহাগের আবেশ নিয়েই আজ মারিশার ঘুম ভেঙেছে। কিন্তু সকাল থেকেই হঠাৎ দেখা নেই আশফির। তার বদলে সব থেকে ঘৃণ্য মুখটা এসে হাজির হয়েছে ওর চোখের সামনে।
এ কদিন দিলিশা নিজেকে তিল তিল করে প্রস্তুত করেছে মারিশার মুখোমুখি হওয়ার জন্য। মনের গহিনে জমে থাকা তিক্ততাটুকু অতি কষ্টে চেপে রেখে আজ সে হৃদয়ের সাথে হাসপাতালে এসে উপস্থিত হয়েছে। উদ্দেশ্য, মারিশার কাছে ক্ষমা চাওয়া। কিন্তু তাকে দেখার পর মারিশাকে বাইরে থেকে যতটা শান্ত আর অবিচল দেখাচ্ছে, ভেতরে ভেতরে ততটাই সে ফেটে পড়ছে উন্মত্ত ক্রোধে। উলটো দিকে দিলিশার ভেতরটা যে হিংসার দাবানলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছিল, তা বলাই বাহুল্য।
তবে এ মুহূর্তে মারিশার সমস্ত চিন্তা কেবল আশফিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। কত বেলা হয়ে গেল! তবু দেখা নেই মানুষটার। চোখের সামনে তাকে না পেয়ে ওর মনে যে অস্থিরতার ঢেউ খেলছে, তা ওর ব্যাকুল চাহনিতেই স্পষ্ট ফুটে উঠল।
মিরান ব্যাগ গোছাতে গোছাতে আড়চোখে ওর এই উশখুশানি লক্ষ করল। শেষমেশ ওর মনের মেঘ কাটাতে সে জানাল, “আশফিকে খুঁজছিস? ও তো সেই অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে গেছে। ফ্রেশ হয়েই সোজা পোখরা এয়ারপোর্টের ওদিকের হেলিপ্যাডে গেছে। একটা চার্টার্ড হেলিকপ্টার রেডি করছে তোর জন্য। পাহাড়ের ওই চড়াই-উতরাই আর আঁকাবাঁকা রাস্তায় তোকে জিপে করে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিটা ও কোনোমতেই নিতে চাইল না। তোর যেন কোনো রকম এয়ার পকেট বা ঝাঁকুনি সহ্য করতে না হয়, তাই পাইলটের সাথে ইন্সট্রাকশন নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধও বাঁধিয়েছে নাকি। দিব্য কল করে জানাল। ওদের ফেরার সময়ও হয়ে এল বলে।”
কথাগুলো শুনে মারিশা ক্ষণকাল স্তব্ধ হয়ে রইল। মনের গহিনে সামান্য অভিমানী মেঘ জমল। যাওয়ার আগে লোকটা কি একবার বলে যেতে পারত না? কিন্তু সেই অভিমান নিমেষেই ধুয়ে মুছে গেল এক সুখকর, প্রগাঢ় অনুভূতিতে। ওর জন্য আশফির সেই চিরচেনা পাগলামি, অতি আহ্লাদ আর অগাধ যত্নটা যে ও এভাবে আবার ফিরে পাবে, তা তো ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেনি। ওর বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষেই বসন্তের দখিনা হাওয়ায় জুড়িয়ে গেল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দিলিশার বুকের ভেতর তখন ঈর্ষার তপ্ত লাভা টগবগ করে ফুটছে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছিল, আশফির দুনিয়ায় তার অস্তিত্ব এখন কতটা ফিকে আর অর্থহীন। মারিশার প্রতি তার এই আকাশচুম্বী উন্মাদনা আর বাড়াবাড়ি ভালোবাসাটুকু দেখে রাগে-অপমানে তার ফর্সা মুখটা নীলচে হয়ে এল। চার বছরের বিচ্ছেদ যন্ত্রণা, রাগ-ক্ষোভ কী করে এত সহজেই ভুলে যেতে পারল আশফি? পরাজয়ের তীব্র গ্লানি আর মারিশার প্রতি আদিম এক হিংসায় তার চোখমুখ কুৎসিত হয়ে এল।
ব্যাগ গোছানো শেষ করে মিরান সোজা হয়ে দাঁড়াল। মারিশাকে বলল, “তুই তাহলে তৈরি হয়ে নে। আমি নার্সকে পাঠিয়ে দিচ্ছি তোকে হেল্প করার জন্য। আর আমি যাই, গিয়ে দেখি ডিসচার্জের কাজ হৃদয় কতদূর এগোল।”
মিরানের কথা শেষ হতে না হতেই দিলিশা অপ্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে এল। মুখে এক চিলতে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে লৌকিকতার সুরে বলল, “নার্সকে পাঠাতে হবে না, ভাইয়া। আমিই হেল্প করছি ওকে। মূলত সেই উদ্দেশ্য নিয়েই তো আজ আসা।”
মিরানের চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছায়া নামল, সে এক পলক মারিশার দিকে তাকাল। কিন্তু মারিশার কণ্ঠস্বর তখন বরফশীতল। সে শান্ত স্বরে সায় দিল, “নার্সকে লাগবে না, ভাইয়া। দিলিশার থেকেই না হয় সাহায্য নিই। তুমি এসো তাহলে।”
মিরান আর দ্বিরুক্তি করল না, তবে যাওয়ার সময় তার চোখে একরাশ খটকা রয়ে গেল। সে কেবিনের ভারী দরজাটা টেনে দিয়ে বেরিয়ে যেতেই ঘরটা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। দিলিশা ধীরপায়ে গিয়ে দরজার ছিটকিনিটা তুলে দিল। মারিশা তখন বিছানার একপাশে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। ওর ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসি, আর চোখের দৃষ্টি স্থির। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দিলিশার দিকে।
কিন্তু ওর এই নিস্পৃহ চাহনি দিলিশাকে খানিকটা অপ্রস্তুত করে তুলল। সে কিছুটা বিভ্রান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি… তুমি কি আমার ওপর একটুও রেগে নেই, মারিশা?”
“আমাকে দেখে মনে হচ্ছে আমি রেগে আছি?” পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল মারিশা। কণ্ঠে ওর তখনো সেই একই রকম মোলায়েম সুর।
দিলিশা যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সে কিছুটা হতভম্ব হয়ে বলল, “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার ধারণা ছিল আমাকে দেখার পর তুমি হয়তো খুব রিয়্যাক্ট করবে, শাউট করবে। কিন্তু তুমি এতটা শান্ত!”
“ভুল বুঝে কেউ ক্ষমা চাইতে এলে তার ওপর কি রাগ করা সাজে?” মারিশার ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার আরও একটু চওড়া হলো।
দিলিশার বিস্ময় যেন আকাশ ছুঁল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “তুমি কী করে জানলে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতেই এসেছি?”
ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে কেমন এক তির্যক দৃষ্টিতে তাকাল মারিশা। মুখে হাসি লেপটে রেখেও চোখের মণি দুটো যেন মুহূর্তেই ধারালো হয়ে উঠল ওর, “কারণ, আশফিকে পাওয়ার নেশায় তুমি যে এত সহজে হাল ছাড়বে না, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। আর এই ক্ষমা চাওয়াটা তো তোমার ওকে পাওয়ারই একটা অংশ, সেটাও জানি। দিলিশা, ভালোবাসার কাছে তুমি ভীষণ শেইমলেস।”
এমন সোজাসাপ্টা আর অপমানজনক কথাগুলে শুনে দিলিশার সমস্ত সাজানো নাটক যেন মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। ফর্সা মুখটা তার অপমানে আর রাগে মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। সে ভাবতেই পারেনি মারিশা তার অভিসন্ধিটা এভাবে চোখের পলকে ধরে ফেলবে। ওর এই উপহাস তাকে যেন চাবুকের মতোই আঘাত করল।
দাঁতে দাঁত চেপে হাতের মুঠো শক্ত করল দিলিশা। চোখে তার অনুশোচনার বদলে হিংসার এক ক্রূর ঝিলিক ফুটে উঠেছে। সে বুঝতে পারল, মারিশাকে যতটা সহজ ভেবেছিল, আসলে মেয়েটা তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি চালাক।
রাগের চোটে সে উঠে দাঁড়াতেই মারিশা তখনই তার হাতটা টেনে ধরে আবার ঠাস করে বসিয়ে দিল, হাসতে হাসতে বলল, “যাচ্ছ কেন? আমাদের কথা এখনো শেষ হয়নি তো।”
বলেই সে খুব নিচু স্বরে যোগ করল, “আমার আর তোমার মধ্যে পার্থক্য কী জানো? আশফিকে পেতে তুমি প্রচণ্ড শেইমলেস হলে আমি প্রচণ্ড ক্রুয়েল।”
শেষ কথা দুটোর মানে বুঝে ওঠার সময়টুকু পেল না দিলিশা৷ সে চোখের পলক ফেলার আগেই বিদ্যুৎবেগে মারিশার হাত দুটো সাপটে ধরল তার গলায় বাঁধা পাতলা সিল্কের স্কার্ফটা। এক মুহূর্তের শান্ত মারিশা যেন পরমুহূর্তেই এক হিংস্র মানবী হয়ে উঠল। স্কার্ফের দুই প্রান্ত হাতে পেঁচিয়ে এমন এক হ্যাঁচকা টানে ওর কণ্ঠনালী রোধ করে ধরল যে, অপ্রস্তুত দিলিশার দম আটকে এল এক লহমায়। বিস্ময় আর অবর্ণনীয় আতঙ্কে ওর চোখদুটো কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল। বাঁচার তাগিদে ও পা ছুড়ে ছটফট করতে লাগল আর দু’হাতে স্কার্ফটা খুলে আনার চেষ্টা করল। কিন্তু মারিশার মুঠো তখন পাথরের মতো অনড়, চোখের চাউনি নির্বিকার। ওর মুখের একদম কাছে ঝুঁকে এল সে। সরল, মায়াবী চোখে এখন কোনো মায়া নেই মারিশার। আছে কেবল এক মেরুপ্রদেশের মতো হিমশীতল শূন্যতা।
দিলিশার দৃষ্টি যখন ঝাপসা হয়ে এল, শরীরটা অবশ হয়ে আসতে লাগল যন্ত্রণায়, মুখটা নীল হতে শুরু করল, ঠিক তখন মারিশা ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে খুব নিচু, কিন্তু হাড়কাঁপানো গলায় বলল, “তুমি আমাকে ঠিকই চিনেছ, ডার্লিং। আমি কারও জান নিতে চাইলে খুব ধীরেসুস্থে, ঠান্ডা মাথায় ভেবে তারপর একদিন খুব সাবধানে তাকে আজরাইল দর্শন করাই। কিন্তু তোমার বেলাতে আমি এতদূর ভাবিইনি সেদিন। এখন ভাবব। অর্থাৎ তুমি নিজেই আমাকে বাধ্য করেছ তোমাকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে।”
দিলিশার শ্বাসনালী তখন বাতাসের জন্য হাহাকার করছে। ও কোনো শব্দ করতে পারছে না, শুধু দুই হাতে মারিশার কবজি খামচে ধরে বাঁচার এক ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
কিন্তু মারিশার কণ্ঠে তখন এক পৈশাচিক শীতলতা ফুটে উঠল, “আশফিকে পাওয়ার জন্য আমিও এখন বহুত নিচে নামতে পারি। শেষবারের মতো বলছি তোমাকে। আমার আশফি থেকে দূরে সরে যেতে যত দেরি করবে, তোমার মৃত্যুর দিন ততই কাছে চলে আসবে। ডোন্ট টেস্ট মি, অলরাইট?”
বলেই সে এক ঝটকায় স্কার্ফটা ছেড়ে দিল। দিলিশা তখন ছিটকে গিয়ে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। কাশির দমকে ওর সারা শরীর কুঁকড়ে যাচ্ছে, ফুসফুস ভরে অক্সিজেন নেওয়ার জন্য ও ছটফট করছে। ওর চোখে তখন এক অকৃত্রিম মৃত্যুভয়! ভাবতেই পারেনি এই সুন্দর, সরল মুখশ্রীর আড়ালে এমন এক ভয়ংকর জানোয়ার বাস করে।
ওর থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মারিশা তখন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল৷ কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা কয়েকটা চুল ঠিক করতে করতে অত্যন্ত মিষ্টতার সাথে বলল, “কী হলো, দিলিশা? পড়ে গেলে কেন? আসলে ইনজুরির পর আমার হাত-পা একটু বেশিই রিঅ্যাক্ট করে ফেলে মাঝে মাঝে। ডোন্ট মাইন্ড, ডার্লিং!”
মেঝেতে পড়ে থাকা দিলিশা তখন থরথর করে কাঁপছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে লেপটে গেছে চুলের সাথে। প্রচণ্ড ঘৃণা আর অবিশ্বাস্য আতঙ্ক নিয়ে অস্ফুট স্বরে ও শুধু বলতে পারল, “তুমি… তুমি একটা সাইকো! একটা জানোয়ার!”
গালিটা কানে যেতেই আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতে আপনমনেই খিলখিল করে হেসে উঠল মারিশা। সেই হাসিটা এইমাত্র ঘটে যাওয়া বীভৎসতার সাথে বড্ড বেমানান। একদম নিষ্পাপ আর মায়াবী। আয়না থেকেই ধীরলয়ে ঘাড়টা ঘুরিয়ে দিলিশার দিকে একবার নির্লিপ্ত চোখে তাকাল সে। গলার স্বরটা অস্বাভাবিক রকমের নিস্পৃহ আর ঠান্ডা ওর, “ঠিকই বলেছ। আমি জানোয়ার। আমাকে পিটিয়ে, দুমড়ে-মুচড়ে জানোয়ারই বানানো হয়েছে।”
পরক্ষণেই অদ্ভুত এক চপলতায় আবার হেসে ফেলল সে। আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে খুব সহজ গলায় দিলিশাকে ফরময়েশ করল, “যাও তো ডার্লিং, ড্রয়ার থেকে আমার লিপবামটা একটু এনে দাও তো। ঠোঁটটা কেমন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে! এমন শুকনো খসখসে ঠোঁটে আশফিকে চুমু খেলে ছেলেটা একদম মজা পাবে না, তাই না?”
দিলিশা তখনো স্তব্ধ হয়ে মেঝেতে বসে নিঃশ্বাস গোছানোর চেষ্টা করছিল৷ ঠিক সেই মুহূর্তেই করিডোরে ভারী বুটের শব্দ আর চেনা এক গম্ভীর কণ্ঠের প্রতিধ্বনি শোনা গেল। আশফি আসছে!
তা বুঝতে পারল মারিশাও৷ নিমেষেই ওর চেহারার সেই পৈশাচিক শীতলতা ধুয়ে-মুছে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল এক চরম আর্তি। আয়নার সামনে থেকে সে ঝড়ের বেগে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রায় আছড়ে পড়ল মেঝেতে থাকা দিলিশার ওপর। কিন্তু সেটা আক্রমণ করতে নয়, বরং খুব যত্ন করে ওকে টেনে তোলার ভান করতে। করিডোর থেকে আশফি যখন দরজার হাতল ঘোরাচ্ছে, ঠিক তখনই মারিশা ব্যতিব্যস্ত গলায় বলতে লাগল, “ওহ খোদা! দিলিশা, তুমি হঠাৎ এভাবে পড়ে গেলে কেন? তোমার কি খুব লেগেছে? নার্স? কেউ কি আছ? দেখো না, দিলিশা মাথা ঘুরে পড়ে গেছে!”
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল আশফি। ওর পেছনেই দিব্য, মিরান আর হৃদয়। রুমে ঢুকেই মেঝেতে দুই তরুণীর এই ল্যাজেগোবরে দশা দেখে আশফির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। মারিশা তখন দুই হাতে দিলিশার কাঁধ জড়িয়ে ধরে ওকে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, আর দিলিশা তখন এক আকাশ সমান বিস্ময় নিয়ে ওর সেরা অভিনয়টা দেখতে মশগুল।
তার ওপর ঝুঁকে পড়ে এমন এক ভান ধরল মারিশা, যেন অকূল পাথারে হঠাৎ খড়কুটো খুঁজে পেয়েছে সে। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে ভীষণ হাঁপাতে হাঁপাতে আর্তনাদ করে উঠল, “আরে, এসেছ তোমরা? দেখো না কী কাণ্ড! দিলিশা আমাকে ড্রয়ার থেকে লিপবামটা এনে দিতে যাচ্ছিল, অমনি ভারসাম্য হারিয়ে ওভাবে পড়ে গেল। আমি ওকে টেনে তোলার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আমার শরীরে তো একদম জোর নেই… কিছুতেই পারছি না ওকে তুলতে!”
কিন্তু ওর এই নাটকীয় আর্তনাদেও আশফি, দিব্য বা মিরান, কেউই নিজের জায়গা থেকে একচুল নড়ল না। মিরানের স্পষ্ট মনে আছে, লিপবামটা সে নিজেই একটু আগে ব্যাগে গুছিয়ে রেখেছে। ওদিকে দিব্যর কাছে দিলিশার উপস্থিতি বরাবরই বিষবৎ। কিন্তু আশফি থমকে দাঁড়িয়ে আছে অন্য কারণে। তার তীক্ষ্ণ নজর আটকে গেছে দিলিশার বিবর্ণ মুখ আর গলার সরু লালচে দাগটার ওপর।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এল হৃদয়ই। দিলিশাকে টেনে তুলতে তুলতে কিছুটা বিরক্ত স্বরেই জিজ্ঞেস করল, “তোমার আবার হঠাৎ কী হলো? এভাবে মাথা ঘুরে পড়লে কেন?”
দিলিশা তখনো আতঙ্কের ঘোরে আচ্ছন্ন। সে ভাবল, এই মুহূর্তে সত্যিটা বললে কি কেউ বিশ্বাস করবে? না-কি উল্টো আশফির চোখে সে আরও নিচে নেমে যাবে?
ঠিক তখনই আশফির সন্দিগ্ধ আর তীক্ষ্ণ চাউনির কবলে পড়ে মারিশা খানিকটা ভড়কে গেল। নিজের অবস্থান শক্ত করতে সে মুহূর্তেই যন্ত্রণাকাতর হয়ে উঠল, যেন পায়ের ক্ষতটা আবার চনমন করে উঠেছে। তা দেখে আশফি আর দেরি করল না। দ্রুত এগিয়ে এসে ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে বিছানায় বসিয়ে দিল। অত্যন্ত কোমল অথচ শাসনের সুরে বলল, “তুমি কেন ওকে তুলতে গেলে ? তোমার নিজেরই তো স্টিচ এখনো কাঁচা।”
বলেই সে হৃদয়কে ইশারা করল, “এই হৃদয়, দিলিশাকে এক গ্লাস পানি দে তো!”
হৃদয় পানির গ্লাসটা বাড়িয়ে দিতেই তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো ঢকঢক করে তা গিলে নিল দিলিশা। এর মাঝেই মিরান এগিয়ে এল ওর কাছে, ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “ঠিক আছ তো তুমি?”
কোনো উত্তর দিল না দিলিশা। কেবল একরাশ ঘৃণা আর ক্রুদ্ধ চাউনিতে আশফির বাহুডোরে থাকা মারিশাকে একবার দেখে নিল। তারপর হাঁসফাঁস করতে করতে হৃদয়কে বলল, “আমাকে একটু বাইরে নিয়ে চলো, হৃদয়। দম বন্ধ হয়ে আসছে। একটু খোলা বাতাসে যেতে চাই।”
এবার যেন হৃদয় আর দিব্যর মনেও খটকা লাগল। দিলিশার আচরণটা বড্ড অস্বাভাবিক ঠেকছে সবার কাছে। তবে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলল না। দিলিশাকে নিয়ে হৃদয় বেরিয়ে যেতেই আশফি মিরানের দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করল, “ও তো এখনো রেডিই হয়নি। তোরা বাইরে যা, আমিই ওকে রেডি করিয়ে আনছি।”
কথাটা শোনামাত্রই দিব্য ভ্রু কুঁচকে কপালে ভাঁজ ফেলে বলে উঠল, “তুই করাবি মানে? নার্স থাকতে তুই কেন করাবি? আশ্চর্য!”
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৭
মুহূর্তেই আশফি ওর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল। ওর সেই রাগী চাহনি আর দিব্যর প্রশ্ন করার অদ্ভুত ঢং দেখে মিরান নিজের হাসিটা আর চেপে রাখতে পারল না। ওদের দুজনের মাঝে নতুন কোনো কথা কাটাকাটি শুরু হওয়ার আগেই দিব্যকে টেনে একরকম জোর করেই ঘরের বাইরে নিয়ে গেল সে।
