আমার বোবাফুল পর্ব ২
তৃপ্তি এহসান নাওরা
ছুটে গিয়ে রুবাইয়্যাত কে দু’হাতে জাপটে ধরে খামচে রাখে সুখ। আকম্মাৎ ঘটনায় তাল সামলাতে না পেরে ভদ্রমহিলা কদম দুয়েক পিছিয়ে গিয়ে সামলে নিলেন –নিজেকে ও মেয়েকে।সুখের চোখ উপচে কান্নারা তখন দলা পাকিয়ে আসছিল। ঘনঘন পল্লব ঝাপ্টে অশ্রুগুলো বিলিন করে দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো সে। রুবাইয়্যাত চমকে, আতঙ্কে খনকাল থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন। অতঃপর সুখ সহ বিছানায় গিয়ে বসলেন।মায়ের বুকের কাছে নিঃশব্দে পড়ে রয় সুখ।বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে। চুরমার হয়ে আসতে চাইছে কিছু একটা।মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে রুবাইয়্যাত জানতে চাইলেন আদুরে গলায়,
“ কী হয়েছে আম্মা?দাদু আবার কিছু বলেছে?”
সুখ হঠাৎ মাথা তুললো। স্বচ্ছ জলের ন্যায় চোখ দুটো ক্ষণকালের ব্যবধানে লালচে হয়ে গেছে।ভেজা আঁখি পল্লব দেখে মায়ের আবেগী মন ধ্বক করে উঠে।এ বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ হানিফা বেগম। সম্পর্কে সুখের দাদু।ছোট কাল থেকেই বৃদ্ধা সুখকে তেমন একটা পছন্দ করেননা।তার কাজেকর্মে কোন না কোন ছুঁতো ধরে কটুক্তি করতেও পিছপা হোননা সাহসা। কথা বলতে না পারার দূর্বলতাটাই যেনো কটুক্তির শীর্ষে।
রুবাইয়্যাত পুণরায় কিছু বলতে নেয়,তবে এর আগে সুখ আচমকা তার পেটে হাত রাখে। ঠোঁটে একচিলতে মলিন রেখা,চোখে একরাশ কৌতুহল। ভদ্রমহিলা আশ্চর্য চোখে চাইলেন।সুখ নিজস্ব ভাষায় একবার নিজেকে ইঙ্গিত করে পরপর রুবাইয়্যাতের পেটে হাত ছুঁইয়ে দুহাতের বাচ্চা দুলানোর মতো জানতে চাইলো,
“ আমি কী এখান থেকেই জন্ম নিয়েছি?”
কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরেই রুবাইয়্যাতের শরীরটা অচিরেই ঝেঁকে উঠে অজানা শঙ্কায়।মনে হলো গলায় শ্বাস আটকে গেছে এক মূহুর্তের জন্য।ঢোক গিলে ঠোঁটে হাসি টানলেন তিনি।
“ হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেনো করছো আম্মা?”
সুখ ভুললো না তার সহাস্য কথায়।আবারো তাড়া দিলো অস্থির চিত্তে, “ আমার জন্ম কী এই পেটেই?”
ভদ্রমহিলা অন্যমনস্ক হলেন কিছু সেকেন্ডের জন্য। পরপর আচমকা সুখকে বুকের ভাঁজে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“ তুমি আমার আর তোমার আব্বুর একমাত্র মেয়ে।আমাদের সাত রাজার ধন। আমার বেঁচে থাকার সম্বল। আমার চোখের মণি।আর কিছু জানতে চাও?”
কন্ঠ ধরে আসছিল তার। সুখ দেখার আগেই চোখের কোটরে জমায়েত অশ্রু কণা মুছে নিলেন সন্তর্পণে। এহেন জবাবে সন্তোষ্ট হতে পারে না সুখ।খুব করে মাকে প্রশ্ন বিদ্ধ করলে ইচ্ছে হলো —“তবে বর্ণ ভাই এতো জোর গলায় কেনো বললো আমি আশ্রীতা?জন্ম পরিচয় হীন?কই,বাড়ির অন্য কাউকে তো এমন বিশ্রী অপবাদ দেয়নি?”
তবে সুখ নিশ্চুপ রইলো।প্রতিবাদ না করে চুপটি করে সেঁটে থাকে মায়ের বক্ষস্থলে। বর্ণ ভাই নিষেধ করেছে যে!সেতো সত্যি ই পুরুষটিকে সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসেছে।তাই তার কথা রেখেছে।’
সুখ শান্ত দীঘির মতো নেতিয়ে রয় অথচ হৃদয় হুঁ হুঁ যন্ত্রণায় কাবু।মনটা কিছুতেই মানতে চাইছে না “সে আশ্রীতা,জন্ম পরিচয় হীন।” ভাবলেই তো নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট কীট মনে হচ্ছে।
বেখেয়ালে হঠাৎ দরজার অভিমুখে চোখ গেলো রুবাইয়্যাতের।পর্দার আড়ালে কেউ আছে মনে হলো। ভদ্রমহিলা ডেকে উঠেন,
“ কে ওখানে!”
তখনই পর্দা ফাঁক করে অপ্রস্তুত হেসে বেরিয়ে এলো সাইমা বুয়া। শরীরে মলিন শাড়ি জড়িয়ে,হাতের মুঠোয় চায়ের কাপ। ঠোঁটে জোরপূর্বক হাসি চেপে কাপ বাড়িয়ে দিয়ে আমতা আমতা করে বললো,
“ আপনে চা চাইছিলেন না ছুড়ু ভাবী?এই লন!”
সুখ মুখ তুলে চায়। রুবাইয়্যাতের ভ্রু গুটিয়ে আসে।চা তো সে চাইনি! সচরাচর চায় ও না।খুব প্রয়োজন হলে নিজেই করে নেন। তিনি সন্দিহান চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে বললেন,
“ আমি কখন তোমার কাছে চা চাইলাম?”
“ আপনিই তো চাইছিলেন এট্টু আগেই।ভুইলা গেলেন?”
বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়েই বললো বুয়া। রুবাইয়্যাত কপাল কুঁচকে বললেন,
“ নিশ্চয়ই বড় আপা চেয়েছে!”
হুট করে ঠোঁট এলিয়ে হেসে ফেললো বুয়া। ঘনঘন উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল,
“ হ্ হ্।বড় ভাবীই চাইছে।ভুল কইরা এখানে আইয়া পড়ছি।যাই হ্যাঁ?
তড়িঘড়ি করে সে উল্টো পা ঘুরিয়ে নিলো।একধাপ এগিয়ে আচমকা পিছু ঘুরে সুখের ফোলা নেত্র পল্লব যোগল পরখ করে অমায়িক স্বরে ফের বললো,
“ যাই…!
বর্ণ তখনো স্থিরতা বজায় রেখে ড্রেসিং টেবিলে বসে আছে।পায়ের উপর পা তুলে আয়েশিভঙ্গিমায়।ঘাড়ে লেগে আছে বড় বড় মালার মতো ধবধবে সাদা রঙা হেডফোনটি।পড়নে ব্ল্যাক গেঞ্জি।বুকের মধ্যভাগে মাইক্রোফোন হাতে তারই চিত্র আঁকা।তাতে আবার ইংরেজি লেটারে খচিত একটি শব্দ — Rockstar”!ফর্সা মসৃন পেশিবহুল ফোলে ফেঁপে উঠেছে কাঁধের দুপাশে।এটাই যেনো মেয়েদের নজর আকৃষ্ট করার উপযোগী স্থান।এক ঝলক কালচে ধূসর মণি চোখের ওই তীর্যক চাহনি তাদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিতে যথেষ্ট।ক্লিন শেভ মুখ। বিভিন্ন অঙ্গি ভঙ্গিকে মৃদু হেসে ঠোঁট নেড়েচেড়ে কথা বলার স্টাইল দেখে বার কয়েক খু!ন হতেও দ্বিধা নেই।
মিশ্মি লোভাতুর চোখে একদৃষ্টে চেয়ে রয়।গলা শুকিয়ে আসছে তার। অন্তঃস্থলে অস্থিরতা কাজ করছে। পানির পিপাসা পাচ্ছে বোধহয়।বর্ণ তখন নিম্নাষ্ঠ কামড়ে ফোনে নজর ডুবিয়ে রেখেছে।কুঞ্চিৎ কপাল সমেত ছোট ছোট চোখ।ফলে, দুচোখের কোণও কুঁচকে গেছে ঈষৎ।
যেনো শ্বাসরোধ হয়ে আসে মিশ্মির।নজর ঘুরেফিরে বর্ণ’র ঠোঁটের দিকে চলে যাচ্ছে। নিষিদ্ধ কিছু করে বসার কামনা জাগছে ক্রমশ। কিন্তু বর্ণ?তার স্বভাব চরিত্রে নারী দোষ কখনো দেখা যায়নি। একইসঙ্গে কাজ করার সুবাধে বহুবার নিকটে এসেছে দুজন। কালেভদ্রে নিরিবিলিতে সময় অতিবাহিত করার সুযোগে কখনো কারো প্রতি বাজে দৃষ্টি প্রয়োগ করেনি বর্ণ।সে অবশ্য বহুবার বর্ণকে আকর্ষিত করার চেষ্টা করেছে।এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
গত কাল তো বিয়ের এনাউন্সমেন্ট করে দিল বর্ণ নিজেই।আজ একটা কিস করতেই পারে।মিশ্মি বেড ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় তৎক্ষণাৎ।ধীর পায়ে এগিয়ে আসে বর্ণ’র কাছাকাছি।
বর্ণ ফট করে চোখ তুললো । ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ভ্রু নাচিয়ে হয়তো ‘কী ব্যপার’ জিজ্ঞেসও করলো।তবে উত্তর দেয়ার মনোযোগে নেই মিশ্মি। অপলক দৃষ্টিতে তখনো চেয়ে আছে বর্ণ’র ঠোঁটের ভাঁজে। মেয়েটা নিজের ধ্যানেই নেই। বর্ণ কে ছুঁয়ে দেয়ার নিমিত্তে হাত তুলতেই আচমকা একটি স্বর কানে বাজলো ধপধপ।
“ বর্ণ!”
একপল বর্ণের প্রশ্নাতীত সূচালো চোখের দিকে চেয়ে ভড়কে যাওয়া মুখে অপ্রস্তুত হাসে মিশ্মি।তড়িৎ দূরে সরে এসে দরজার দিকে চায়।আইজা তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকেই চেয়ে আছে।বর্ণ সৌজন্য হাসে,
“ এসো আম্মু!হাতে কী এনেছো?”
ভদ্রমহিলা এলেন ঠিকই।বর্ণর কথার জবাব না করে অদৃশ্য ক্ষেপাটে দৃষ্টিতে মিশ্মির দিকে তাকিয়ে রইলেন।মুখে মেকআপের কড়া প্রলেপে আসল সৌন্দর্য-ই চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। কালচে বাদামী চুলগুলো দড়ির মতো পেঁচিয়ে সামনে ঝুলিয়ে রেখেছে।পড়েছে নীল জামা।সেটারও হাত নেই,পা নেই -কোন রকম টেনেটুনে হাঁটুর উপর অব্দি নিয়ে এসেছে বোধহয়।এসব বিশ্রী পোশাক পরিচ্ছদ কোন ভদ্র মেয়ের হতে পারে? বর্ণ একে কী দেখে জীবনসঙ্গী করার সিদ্ধান্ত নিলো?অবাধ্য ছেলেটা তার নিষেধ মানার প্রয়োজনটাও মনে করছে না।বড় হয়েছে,নাম খ্যাতি কামিয়েছে, এখন রকস্টার সে –মায়ের মতামত নেয়ার কী প্রয়োজন?
বাঁ হাতের তর্জনীতে কপাল চুলকে মায়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে মিশ্মিকে একপল দেখে গলা খাঁকারি দেয় বর্ণ।আইজা বিরস মুখে ছেলের দিকে তাকায়। মুখ গম্ভীর করে হাতের ট্রে খানা পাশে রাখে,
“ ফ্রাইড রাইস করেছি তোমার জন্য ”
ফোন রেখে দিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ঠোঁটে মৃদু রেখা ফুটিয়ে তুললো বর্ণ।আইজা’র হাত ধরতে চাইলে তিনি ঝাড়া মেরে সরিয়ে নিলেন। ক্ষুধার্ত বাঘিনীর মতো ক্ষণে ক্ষণে মিশ্মির দিকে চাইছেন। মেয়েটা অভ্র,তুহফা’র সাথে গার্ডেনেই ছিল এতোক্ষণ।তাদের সেখানে রেখে সিঁড়ি চড়ে উপরে উঠার সময় দেখে ফেলেছেন তিনি। ভাগ্যিস দেখেছিল!তাই তো তড়িঘড়ি করে তিনিও ছুটে এলেন।এই মেয়ের কাছে বর্ণকে এক মূহুর্তের জন্য ছাড়তে ইচ্ছে করে না উনার। সেখানে আর কদিন পর সারাজীবনের জন্য ছেলেটা ….
অধরে মুচকি হাসি ধরে রেখে কানের পিঠে চুল গুঁজে এদিক ওদিক নজর নিক্ষেপ করে মিশ্মি।এ বাড়িতে আরো বেশ কয়েকবার আসা হয়েছে তার। তখন থেকেই বর্ণ’র মা তাকে কেমন আড়চোখে চাইতো। যদিও যত্ন, খাতিরে কমতি রাখেনি কবু। কিন্তু কাল যখন বর্ণ নিজের সাথে আরো একবার নিয়ে এলো এবং বিয়ের কথা জানালো তখন থেকেই ক্ষিপ্র চোখে দেখছে তাকে।
বিরক্ত লাগে মিশ্মির।বর্ণকে নিজের করে পেলে এমন হাজারো দৃষ্টি জাস্ট তুড়িতে উড়িয়ে দেবে। ব্যাস, সঠিক সময়ের অপেক্ষা।
সম্পর্কে যেহেতু বর্ণ’র মা। ভদ্রতা বজায় রাখতেই হয়।মিশ্মি ট্রের’ দিকে হাত বাড়াতে বাড়াতে বললো,
“ আন্টি আমি সার্…
“ এখানে তোমার জন্য আনিনি। শুধুমাত্র বর্ণ’র জন্য!
মাঝপথেই থমকে গেলো মেয়েটার হাত।সেই সাথে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো অধর বাঁকানো হাসি।সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ চোখে প্রথমে বর্ণ’র দিকেই তাকালো। অপমানে, লজ্জায় মুখ থমথমে হয়ে গেছে তার। ভেবেছিল বর্ণ কিছু বলবে। কিন্তু সে ভুল প্রমাণিত হলো।সুখের ভাষ্যমতে নিষ্ঠুর পুরুষটি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে অন্যত্র তাকিয়ে আছে। নিস্তব্ধ, থমথমে পরিবেশে আইজা’র গম্ভীর অথচ ছদ্ম নমনীয় কন্ঠ পুণরায় বেজে উঠল,
“ মিশ্মি মা!তুমি বরং নিচে যাও।সবাই আছে ওখানে। বিশেষ করে তোমার বিগ ফ্যান ‘দাদু’!”
আইজার কথার ধরনে মিশ্মির কন্ঠণালীর ভাষা হারালেও বর্ণ আড়ালে হাসলো বোধহয়। পরপরই গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
“ হ্যাঁ মিশ্মি!তুমি যাও.. আমি আসছি একটু পরই!
ভেতরের আত্মাটা রাগে, দুঃখে, অপমানে টগবগিয়ে উঠলেও উপরের আবরণে শীতলতা বজায় রেখে আইজা’র উদ্দেশ্যে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে মিশ্মি।এরপর বেরিয়ে গেলো রুম ছেড়ে।এই অপমান মনে থাকবে তার।
“ ওর সাথে বেশি মিশতে না করেছিলাম.. তাই আমার দোরগোড়ায় বধু করার দাবিতে হাজির করেছো তাকে? তোমার লাইফে আমার মতামতের কোন ভেল্যু নেই এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছো? ”
“ আম্মু এমন..”
“ থাক.. কিছু শুনতে চাই না আর”
“ কথাটা তো শুনবে ”
চোখ রাঙিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে হম্বিতম্বি করে দরজার দিকে হাঁটা ধরলেন আইজা।ছেলের পাশাপাশি ওই মেয়েকে কল্পনা করলেই মেজাজ খেই হারাচ্ছে তার।বর্ণ দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে পিছু ডেকে খাইয়ে দিতে বললো। কিন্তু ভদ্রমহিলা একেবারের জন্যও থামেনি। ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেলেন নিজ কক্ষের অভিমুখে।
দরজায় খিল এঁটে এতোক্ষণের চেপে রাখা কান্নাগুলো খুব সহজেই উগলে দিলো সুখ।দুহাতে মুখ চেপে গুঙ্গিয়ে কেঁদে ওঠে মেয়েটা।এই কান্নায় উচ্চশব্দ নেই।নেই কোন লাজ । কেবল দুচোখ ভরে আসছে অশ্রুতে। সেগুলো বিরামহীন গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে থুতনি পেরিয়ে। জীবনে প্রথম বার কোনো পুরুষকে মন প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ভালোবেসে সে। কিশোরি মন যাকে দেখে দুলে উঠেছিল প্রথমবার।যার সুরের মাধুরীতে হৃদযন্ত্র থমকে গিয়েছিলো বারেবার।যাকে অপলক দেখতে দেখতে ভুলে গিয়েছিল কথা না বলতে পারার দূর্বলতা।সেই পুরুষটি আজ তাকে ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। চোখে আঙুল তুলে চিনিয়ে দিয়েছে তার দূর্বলতা। সত্যিই তো, একজন বোবা হয়ে রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ’র সামনে ভালোবাসার দাবি নিয়ে যেতে বিবেকে বাঁধলো না কেনো ? যেখানে “ভালোবাসি” শব্দটাই উচ্চারণ করার ক্ষমতা তার নেই।
কন্ঠণালীতে হাত বুলাতে বুলাতে ঠোঁট কামড়ে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিলো সুখ। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে কিন্তু তার যে সেই সাধ্যও নেই!
বর্ণের ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা তিন টুকরো চিরকুটের খন্ড সন্তর্পণে ডায়রির ভাঁজে রেখে দিলো সে। অতঃপর হাতে কলম তুলে নিলো। এবং সেই পাতাতেই লিখলো,
«“এই বোবাফুলকে একটু কী ভালোবাসা যেতো না বর্ণ ভাই?খুব বেশি তো না,ব্যাস এইটুকুনিই!”»
ডায়রি বন্ধ করে একপাশে রেখে দিয়ে সুখ জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়।চোখের অশ্রু মুছে ফেললেও ফিরতি কৌটর ভরে আসছে।সে আশ্রীতা? জন্ম পরিচয় হীন?
জানতে হবে তাকে।কোন কারণ ছাড়া সেতো অভ্রকে জন্ম পরিচয় হীন বলতে পারবে না! যেখানে সে খুব ভালো করেই জানে অভ্র বড় চাচ্চুর ছেলে →বর্ণ’র ভাই।তাকে এই মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার আগে সুখের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসবে। অথচ বর্ণ ভাই কতো সহজেই বলে দিলো ‘ সে জন্ম পরিচয় হীন!’ কথাটাই কিঞ্চিৎ সত্য মিশে না থাকলে এতোটা জোর দিয়ে উনি বলতে পারতেন না হয়তো।
দিনটি বুধবার। কনসার্ট পারফরম্যান্স আছে বর্ণ’র।কেডস্ এ ফিতে লাগিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো সে।হাতে স্মার্টওয়াচ, অভ্যাস অনুযায়ী গলায় হেডফোন লেগে আছে,মাথায় অর্কিড রঙের হুডি,পিঠের অর্ধেকাংশ জুড়ে পড়ে আছে তার প্রিয় গিটার।মুখে সুইংগাম চিবুতে চিবুতে গলার কাছ থেকে সানগ্লাস টেনে অদ্ভুত কায়দায় হাতে ঘুরিয়ে আচমকা চোখে ঠেসে দিলো বর্ণ। চোখে লাগার মতো ছিল সেই দৃশ্য।তার হাঁটার ভঙ্গি;হাতের আঙ্গুলে গাড়ির চাবি ঘুরানোর সেই ধরন;ইশশ্…
সুখ কাঁধে ব্যাগ নিয়ে নিষ্পলক চেয়ে রইলো। আশেপাশের সব ভুলে গেলো কিছু ক্ষণের জন্য।এই মূহুর্তে করিডোরে তারা দুজন ছাড়া বাকি সব যেনো মিথ্যে। ইতোপূর্বে আড়াল থেকে সময়ের পর সময় প্রিয় পুরুষটিকে এভাবে দেখে গেছে সুখ। দুয়েক বার চোখাচোখি হতেই বোকা হেসে পিঠ বাঁচিয়ে পালিয়ে গিয়েছে।
হঠাৎ ঠোঁটের কোণ হতে মুগ্ধময় হাসির রেখা সরে যেতে ধরে সুখের। সেদিনের প্রত্যাখ্যান, অপমানের দৃশ্য মানসপটে ভেসে উঠে রাতের আকাশে ঝলমলে নক্ষত্ররাজির ন্যায়।চাপা শ্বাস ছেড়ে স্বাভাবিক হয়ে চোখ নামিয়ে নেয় মেয়েটা।সে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আর তাকাবে না পুরুষটির দিকে।কখনো তার হবে না যেনেও এমন মুগ্ধ দৃষ্টি বিতরণ করা নির্বোধের সামিল নয় কী? ভালোবাসা নাকি আড়ালেই সুন্দর।সে নাহয় চুপিচুপি ভালোবাসবে!
আমার বোবাফুল পর্ব ১
রুমে যেতে হলে বর্ণকে ভিড়িয়ে যেতে হবে।সুখ চোখ নামিয়ে ধীর লয়ে এগিয়ে চলে।যতো কাছাকাছি আসছে ততোই হৃদস্পন্দন ছুটছে দিকবিদিক। নিজের উপরই ক্ষিপ্র হয় মেয়েটা। পুরুষটি আশেপাশে থাকলেই কেনো হৃদয়কে স্পন্দিত হতে হবে? অবাধ্য, অসভ্য, অভদ্র তৈরি হচ্ছে নাকি? একঝলক চোখ তুলে চেয়ে দ্রুত পা চালায় সুখ।বর্ণকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই আচমকা….
