দাহশয্যা পর্ব ৯৩ (২)
Raiha Zubair Ripti
ফজরের আজান কানে ভেসে আসতেই মেহরিনের ঘুম ভেঙে যায়। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায় সে। ধীরে ধীরে পাশ ফিরতেই তার দৃষ্টি থেমে যায়। বিছানার পাশটা খালি। মুহূর্তেই তার ভ্রু কুঁচকে যায়। চোখ ছোট হয়ে আসে। যেন কিছু মিলাতে পারছে না। হাত বাড়িয়ে পাশে স্পর্শ করে। জায়গাটা ঠান্ডা। অনেকক্ষণ ধরেই কেউ নেই সেখানে। হঠাৎই তড়িঘড়ি করে উঠে বসে মেহরিন।
“সুলতান সাহেব…?” মৃদু স্বরে ডাকে, কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে সে। ওয়াশরুম, বারান্দা,সব জায়গায় খুঁজে দেখে। কোথাও নেই সোলেমান। অস্থির হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। সিঁড়ির দিকে এগোতেই পায়ের শব্দ ধুপধাপ করে বাজে পুরো বাড়িতে।
নিচে বসার ঘরে বাশার সুলতান আর মোতালেব ভুঁইয়া সোফায় বসে ছিলেন। দু’জনই মসজিদে নামাজ পড়তে বের হবেন। পায়ের আওয়াজ শুনে দুজনেই সিঁড়ির দিকে তাকায়। মেহরিন প্রায় দৌড়ে নামছে। মেয়ের এমন তড়িঘড়ি অবস্থা দেখে মোতালেব ভুঁইয়া ছুটে গিয়ে ধরে ফেলেন তাকে।
মোতালেব ভুঁইয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। মেয়ের কাঁধ শক্ত করে ধরে, কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন-
“এইভাবে নামছো কেনো মা? আস্তে! ডাক্তার কি বলেছিল ভুলে গেছো?”
কিন্তু এসব কথা যেন মেহরিনের কানে ঢুকছে না। তার দৃষ্টি ছুটে বেড়াচ্ছে চারপাশে—কারো খোঁজে
বাশার সুলতান এগিয়ে এসে থমকে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ লক্ষ্য করলেন মেয়েটার চোখের ভাষা।
তারপর ধীরে বললেন-
“কি হয়েছে মা? কাকে খুঁজছো?”
মেহরিন এক ঝটকায় তার দিকে তাকায়।
“চাচা… উনি কোথায়?”
বাশার সুলতান একটু থামে। বুঝতে চেষ্টা করে।
“উনি? কে মা?”
মেহরিন বিরক্ত হয়ে শ্বাস ফেলে, যেন এত সহজ প্রশ্ন কেন করা হচ্ছে তাকে?
“সুলতান সাহেব! উনি কোথায় গেছেন? সকালে উঠে দেখি নেই।”
এই কথাটা শুনে দু’জনই থমকে যায়। একটা ভারী নীরবতা নেমে আসে। বাশার সুলতান ধীরে ধীরে বললেন-
“ মেহরিন… তুমি ঠিক আছো তো?”
মেহরিন কপাল কুঁচকে তাকায়-
“এই প্রশ্নের মানে কি? আমার কি হবে? আমি ঠিকই আছি। উনি কোথায় গেছেন বলুন!”
মেহরিনের কণ্ঠে এবার অস্থিরতা বাড়ছে।মোতালেব ভুঁইয়া ধীরে ধীরে বললেন-
“মা, চলো… রুমে চলো।”
“রুমে যাব কেনো বাবা? উনি কোথায় বলো না। লাইব্রেরি তে? নাকি বাগানে? হু? কোথায় গেছে? তুমি জানো রাতে উনি এসেছিলেন। আমার পাশে ছিল… আমার সাথে ঘুমিয়েছিল। সকালে উঠে দেখি নেই। কোথায় গেলো উনি?”
কথাগুলো বলতে বলতে ভেঙে পড়ার উপক্রম মেহরিন।
বাশার সুলতান এগিয়ে এসে মেয়েটার মাথায় হাত রাখলেন। গলায় গভীর মমতা-
“এটা তোমার ভ্রম, মা। সোলেমান আর এই পৃথিবীতে নেই। সে কীভাবে আসবে বলো?”
“ ভ্রম কেনো হতে যাবে চাচা?”
বাশার সুলতান একটু এগিয়ে এসে নরম গলায় বললেন-
“তুমি বলছো… সোলেমান রাতে এসেছিল?”
“এসেছিল! আমার সাথে কথা বলেছে… আমার পাশে শুয়েছিল। আপনি বিশ্বাস করছেন না?”
“মেহরিন, ভালো করে মনে করো। তুমি কি স্বপ্ন দেখোনি?”
“না!” প্রায় চিৎকার করে ওঠে সে। “আমি স্বপ্ন আর বাস্তব বুঝি না? উনি ছিলেন! আমার হাত ধরে ছিলেন!”
মেহরিনের চোখে পানি জমতে শুরু করেছে,সেই সাথে রেগেও যাচ্ছে।
বাশার সুলতান এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিছুটা কঠিন হয়েই বললেন-
“তাহলে একটা কথা বলো,সে যদি আসতো, আমাদের সাথে দেখা করতো না?”
মেহরিন থেমে যায়। চোখের পলক পড়ে ধীরে।
বাশার সুলতান আবার বলেন-
“আমাদের সাথে কথা না বলে… শুধু তোমার কাছে এসে আবার চলে যেত?”
মেহরিন এবার দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ঠোঁট শুকিয়ে আসে। কথা আটকে যায়। ভুল কিছু তো বলেননি বাশার সুলতান।
“মা… সত্যিটা মেনে নেওয়া কঠিন। কিন্তু সত্যি বদলায় না। সোলেমান আর নেই।”
এই কথাটার ওজন অনেক। মেহরিন বইতে পারে না। মাথা নাড়ে। ধীরে ধীরে পিছিয়ে যায় এক পা। তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে-
“না… না… আপনি ভুল বলছেন…আমি অনুভব করেছি… উনি ছিলেন…”
বাশার সুলতান এবার একেবারে কাছে এসে মাথায় হাত রাখেন-
“শোক মানুষকে অনেক কিছু অনুভব করায়, মা। মনে হয় মানুষটা আছে… পাশে আছে। কিন্তু বাস্তবতা আলাদা। তুমি সত্যিটা মেনে নাও। এখন আর তুমি একা না মা… তোমার ভেতরে আরেকজন আছে। আমার সোলেমানের অংশ আছে। তার অবহেলা অযত্ন করো না। সোলেমান কষ্ট পাবে তো। ”
চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। এইবার আর সে তর্ক করে না। মোতালেব ভুঁইয়া মেয়ের হাত ধরে ধীরে বলেন-
“চলো মা… একটু রুমে গিয়ে বসো।”
এইবার মেহরিন বাধা দেয় না। ধীরে ধীরে পা বাড়ায়। মোতালেব ভুঁইয়ার হাত ধরে ধীরে ধীরে রুমে ঢোকে মেহরিন। রুমে ঢুকতেই সে থেমে যায়।চোখ পড়ে বিছানার দিকে। এক মুহূর্তে তার দৃষ্টি বদলে যায়। চোখের মণি কেঁপে ওঠে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় বিছানার কাছে… হাত বাড়িয়ে সেই জায়গাটায় স্পর্শ করে, যেখানে সে ভেবেছিল কিছুক্ষণ আগেও কেউ ছিল। নিঃশ্বাস আটকে আসে।
মোতালেব ভুঁইয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মেয়েকে দেখছিলেন। ডাকতে গিয়েও ডাকেন না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ দরজাটা টেনে বাইরে বেরিয়ে যান। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা যেন মেহরিনের ভেতরের শেষ ভরসাটাও ভেঙে দেয়।
ধীরে ধীরে বিছানায় বসে পড়ে সে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে। তারপর,হঠাৎই মুখ চেপে ধরে কাঁদতে শুরু করে। প্রথমে চাপা কান্না… তারপর সেটা বাড়তে বাড়তে হাউমাউ করে ওঠে।
“আপনি কেনো গেলেন…? আমাকে একা রেখে কেনো গেলেন…?”
বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে সে। কাঁধ কাঁপতে থাকে। বুকের ভেতর জমে থাকা সব কষ্ট যেন বের হয়ে আসতে চায়। কিছুক্ষণ পর কান্নার দমকটা একটু থামে। সে চুপচাপ শুয়ে থাকে। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে কানে, চুল ভিজে যায়।
হঠাৎই তার হাতটা ধীরে ধীরে নিজের পেটের ওপর চলে যায়। স্পর্শটা পড়তেই সে থেমে যায়।কান্নার মাঝেও নিঃশ্বাস আটকে আসে। কানে বাজে চাচার কথাটা। সোলেমানের অংশ। তার অযত্ন অবহেলা করতে নিষেধ করলেন। চোখ বন্ধ করে ফেলে মেহরিন। তারপর আবারও চোখ ভিজে ওঠে তার।
দুপুরের দিকে মোতালেব ভুঁইয়া দরজায় নক করেন। মেহরিন তখনো শুয়ে ছিলো।
“ আম্মা, রেডি হও। ডাক্তারের কাছে যাবো।”
মেহরিন প্রথমে কোনো উত্তর দেয় না। তারপর ধীরে উঠে বসে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
চোখ লাল, মুখ ফ্যাকাশে। কিছুক্ষণ নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে মুখ ধুয়ে নেয়, ওড়না ঠিক করে। একটা চাপা স্থিরতা এসে বসেছে তার ভেতরে। বোরকা টা পড়ে রেডি হয়ে বের হয় বাবার সাথে। হাসপাতালে ঢুকতেই সেই পরিচিত গন্ধ, সাদা দেয়াল ব্যস্ততা সবকিছু আবার মনে করিয়ে দেয় গত কয়েকদিনের ভয়ংকর সময়গুলো। মেহরিনের চেক-আপ শেষ হতেই মোতালেব ভুঁইয়ার আনা রিপোর্টগুলো ডাক্তারের হাতে নেন।
ডাক্তার মনোযোগ দিয়ে সব দেখতে থাকেন। মাঝে মাঝে ভ্রু কুঁচকে যায়, আবার স্বাভাবিক হয়।
মেহরিন চুপচাপ বসে থাকে। তার দৃষ্টি নিচের দিকে। হাত দুটো একসাথে জড়িয়ে ধরা।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার মুখ তুলে তাকান।
“দেখুন, এখন অবস্থা স্টেবল। কিন্তু খুব সেনসিটিভ সময় যাচ্ছে।”
মোতালেব ভুঁইয়া আগ্রহ নিয়ে ঝুঁকে আসেন-
“ডাক্তার সাহেব… কোনো সমস্যা আছে?”
ডাক্তার একটু থেমে মেহরিনের দিকে তাকান। তারপর ধীরে বলেন-
“মা, আপনাকে খুব সাবধানে থাকতে হবে। কোনো রকম মানসিক চাপ নেওয়া যাবে না। স্ট্রেস নিলে সেটা সরাসরি বাচ্চার ওপর প্রভাব ফেলবে।”
মেহরিন মাথা তোলে। ডাক্তার আবার বলেন-
“ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করবেন, বিশ্রাম নিবেন। আর সবচেয়ে জরুরি। নিজেকে শান্ত রাখতে হবে। পজিটিভ থাকতে হবে।”
মেহরিন খুব আস্তে মাথা নাড়ে। বাসায় ফিরে সে আর সরাসরি রুমে যায় না। ড্রয়িংরুমে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশে তাকায়। সবকিছু আগের মতোই, অথচ কিছুই আগের মতো না। তারপর ধীরে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। নিজের চোখের দিকে তাকায়।পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটি নাকি মেহরিন ছিলো! যেই তাকে দেখতো সেই বলতো মেহরিন নাকি ভাগ্যবতী। যদি তাই হয় তাহলে কেনো আজকে তার জীবনটা এমন এলোমেলো? তার সন্তান এখন বাবার আদর,বাবার ভালোবাসা ছাড়া বড় হবে! যেখানে মেহরিন সর্বদা বাবার স্নেহে আদর ভালোবাসায় বড় হয়েছে। সেই মেয়ের সন্তানের ভাগ্য কি এতটাই দুঃখের! মেহরিন ফ্লোরে বসে পড়লো। কাটতেও নাকি এখন মানা। ডক্টর নিষেধ করেছে। একটা ভাঙা মানুষ না হয় সন্তানের কথা ভেবেই ধীরে ধীরে নিজেকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করবে।
মাহি কে হসপিটাল থেকে রিলিজ দেওয়ার পর এজওয়ান তাকে নিয়ে তার বাড়িতে ফিরে। বউয়ের সেবা যত্ন করে খুব এজওয়ান। নিজ হাতে খাবার রান্না করে। টাইম টু টাইম ঔষধ খাবার খাইয়ে দেয় নিজ হাতে। এমন কি ভেজা টাওয়াল দিয়ে শরীর ও মুছে দেয় মাহির। মাহির তখন কি যে লজ্জা লাগে। ইচ্ছে করে তার ফ্লোর ফাঁক করে ঢুকে যেতে। এজওয়ান বেয়াদব লজ্জা দিতে ভুলে না। অবসর সময়ে এজওয়ান মাহি কে নিয়ে বেলকনিতে বসে ইংরেজি ডার্ক রোমান্টিক নোভেল পড়ে। কান গরম হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয় মাহির। মাঝেমধ্যে তো মাহি জোর করে বইটা কেঁড়ে নিয়ে বন্ধ করে দেয়। আর এজওয়ান হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যায়।
তো এক বিকেলে মাহি তার নতুন ফোনটা দিয়ে বাতাসি কে ফোন করে। ফোন বন্ধ। রুমাইসাকে কল করে। অনেক দিন ধরে কারো সাথে কথা হয় না। রুমাইসার ফোনও বন্ধ। মাহি এবার মেহরিন কে ফোন করলো। ফোন বেজে বেজে কেটে যাচ্ছে বারবার।
এজওয়ান গরম স্যুপ বাটিতে করে রুমে নিয়ে আসতেই মাহি ফোন টা সাইডে রেখে বলল-
“ রুমাইসার ফোন বন্ধ বলছে কেনো? ফেসবুকেও মেসেজ দিলাম সেন্ট হলো কেবল। বাতাসির ফোনও বন্ধ। মেহরিন কে কয়েক বার দিলাম। বেজে কেটে গেলো। ”
এজওয়ানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো রুমাইসার কথা মনে পড়ায়। এজওয়ান ধীর পায়ে এগিয়ে সাইডে স্যুপের বাটিটা রেখে ভারী গলায় বলল-
“ রুমাইসা আর নেই। ”
মাহি বুঝলো না কথাটার মানে।
“ নেই মানে?”
এজওয়ান আশেপাশে তাকালো। কন্ঠ ধরে আসছে তার। নিজেকে সময় নিয়ে ঠিক করে বললো সবটা। সবটা শুনে মাহি স্পিচলেস হয়ে গেলো। তার বিশ্বাস হচ্ছে না রুমাইসার আর নেই পৃথিবীতে। তার সাথে এত কিছু হয়ে গেছে! চোখ দিয়ে জল গড়ালো মাহির। কি আদুরে মিষ্টি একটা মেয়ে ছিলো। তাদের মধ্যে বয়সের পার্থক্য খুব একটা ছিলো না। মাঝেমধ্যে ফোন দিয়ে এজওয়ানের হয়ে তাকে বুঝাতো। সেই মেয়েটা এভাবে চলে গেল! সোলেমানের কি অবস্থা! আর মেহরিন! আফিয়া সুলতান!
“ সোলেমান সাহেবের কি অবস্থা? আর মেহরিন? আন্টি? আঙ্কেল?”
“ ভাইজানের মৃত্যুর খবর শুনে চাচি ব্রেইন স্টোক আর ভাবি হার্ট অ্যাটাক করছিলো। এখন সুস্থ আছে।
মাহি আবার চমকে উঠলো। কি হচ্ছে এসব? এজওয়ান এসব কি বলছে!
“ ভাইজানের মৃত্যুর খবর শুনে মানে? সোলেমান সাহেবও কি মা….”
“ এখন হয়তো বাংলাদেশে আছে। ”
বাংলাদেশ গত কয়েক দিন ধরে নারী পাচারের ঘটনা টা তীব্র ভাবে বেড়ে চলছে। চলন্ত রাস্তা থেকে নারী দের উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের যেন এখন ভয়াবহ গরম খবর এটাই। নিউজ চ্যানেল অন করলেই কেউ না কেউ নিখোঁজ এই খবরটা পাওয়া যেন আবশ্যক।
আফিয়া সুলতান ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। পুরোপুরি না হলেও, আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো। তাই সিদ্ধান্ত হলো তাকে নিয়ে যাওয়া হবে নওগাঁ সুলতানপুরে, নিজের বাড়িতে। পরিচিত পরিবেশ, পরিচিত মানুষ হয়তো তাতে মনটাও কিছুটা শান্তি পাবে। মোতালেব ভুঁইয়াও মেহরিনকে নিয়ে নওগাঁ চলে এলেন। ইমনের সাথে এবার দেখা হলো মেহরিনের। ইমনের খুব কথা বলতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু কি দিয়ে শুরু করবে বুঝে উঠতে পারলো না। কেবল দুজনের চোখাচোখি হলো ব্যাস। মেহরিন চোখ নামিয়ে চলে গেলো। আর ইমন তাকিয়েই রইলো। তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে মেহরিনের এই অবস্থা দেখে।
ইমন বাসায় আসলো। ইতি বেগম তখন সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাই করছেন। ইমন গিয়ে মায়ের পায়ের কাছ টায় বসে উরুতে মাথা ঠেকালো। ইতি বেগম হাতের কাজ থামিয়ে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ কিছু হইছে আব্বা? ”
“ আম্মা,মেহরিন আর চাচা আসছে। ”
“ ওহ্ আচ্ছা। ”
“ আম্মা একটা কথা বলি?”
“ বল। ”
“ মেহরিন রে আমি বিয়ে করতে চাই। তুমি কথা কইবা? আল্লাহ হয়তো আমারে একটা সুযোগ দিছে আম্মা। আমি এই সুযোগ হারাইতে চাই না। আজ না হোক। ৫-১০ বছর পর হলেও আমি মেহরিন রে বিয়া করতে চাই। ও একা কিভাবে থাকবে? একজন কে তো দরকার। সেই একজন আমি মা আমি। সেই ছোট থেকে ওরে চেয়ে আসছি। খোদার হয়তো আমার উপর দয়া হইছে এইবার। আমি মেহরিনের একটুও অযত্ন অবহেলা করবো না। সোলেমান সাহেব আর মেহরিনের অনাগত সন্তান কে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসবো,আদর করবো। কথা দিচ্ছি কেউ বলতে পারবে না ইমন তার সৎ বাবা। একটু দেখো না আম্মা এটা। তুমি তো জানো আমি কতটা ভালোবাসি মেহরিন কে। ”
ইতি বেগম দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললেন অবিলম্বে। ছেলেটা তার মেহরিনের অপেক্ষায় আজও বিয়ে করছে না।
“ আচ্ছা দেখবো বিষয়টা। তুই ওঠ। খাওয়া দাওয়া করছিস না ঠিক মতো ক’দিন। খাবার বেড়ে দিচ্ছি খেয়ে নে। ঊর্মি কে নিয়ে হাসপাতালে যাইতে হইবো। সকাল থেকে ৫ বার কল দিছে ইব্রাহিম। ”
ইমন সায় জানালো। বসা থেকে উঠে ঘুরতেই দরজার কাছে ঊর্মি কে চমকে উঠলো। ঊর্মি অদ্ভুত এক চোখে তাকিয়ে আছে। ঐ চোখের ভাষা বলে দিচ্ছে ঊর্মি সবটা শুনে ফেলছে। অস্থির পায়ে এগিয়ে আসলো।
“ ভাইয়া তুমি মেহরিন কে….”
ইমন থামিয়ে দিলো হাত উঁচু করে।
“ এই কথা যেন বাড়ির বাহিরে বের হয়ে মেহরিন দের বাড়ি অব্দি না যায় খবরদার। ”
ঊর্মি মাথা নত করলো। সে ধারণা করেছিল তার ভাই কাউকে ভালোবাসে। কিন্তু সেটা যে মেহরিন হবে বুঝে নি।
গ্রামের পরিবেশে প্রথম কয়েকদিন মেহরিন চুপচাপই ছিল। কথা কম বলত, নিজের মাঝেই ডুবে থাকত। তবে আগের মতো অস্থিরতা নেই সে এখন নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। হয়তো লোক দেখানোর জন্য। নিয়ম করে খাচ্ছে, বিশ্রাম নিচ্ছে। রাতে আবার ভেঙে পড়ছে। এক রাতে হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে আসে।
দমকা হাওয়া, বিদ্যুৎ চমকায়, তারপর শুরু হয় তীব্র ঝড়। পুরো গ্রাম যেন কেঁপে ওঠে সেই ঝড়ে। টিনের চাল উড়তে থাকে, গাছ ভেঙে পড়ে, মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে যায়। সেই ঝড়ের মধ্যেই ঘটে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। ভয়ংকর ঝড়ে গ্রামের মাদ্রাসার একটি দালান ভেঙে পড়ে। দেয়াল ধসে যায়, টিন ছিঁড়ে উড়ে যায়। ভাগ্য ভালো ঝড় টা রাতে হয়েছে। দিনে হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো।
সকালে পুরো গ্রাম জুড়ে শোক আর উৎকণ্ঠা।ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিশাল। মাদ্রাসা আবার দাঁড় করাতে অনেক টাকার প্রয়োজন। এমনিতেই পুরোনো মাদ্রাসা তার উপর এমন ঘটনায় মাদ্রাসায় নিজ ছেলেমেয়েদের কে পাঠানো বন্ধ করে দিলো বাবা মা। মাদ্রাসা আগে পুরোপুরি ঠিক হবে তারপর পাঠাবে। অনেক বাবা মা তার সন্তানদের অন্য মাদ্রাসায় ভর্তি করাচ্ছে। এলাকার মেম্বার আর চেয়ারম্যানকে খবর দেওয়া হয়।মাদ্রাসার শিক্ষকরা গিয়ে বারবার অনুরোধ করেন। কিন্তু রাজনীতি ঢুকে যায় কথার ভেতর।
মেম্বার বলেন-
“এখন বাজেট নাই, পরে দেখা যাবে।”
চেয়ারম্যান বলেন-
“সরকারি প্রসেস আছে, সময় লাগবে।”
মেহরিন বাবার মুখে সবটা শুনে একদিন নিজেই বাবার সাথে গেলেন গ্রামের সেই মাদ্রাসায়। যেই মাদ্রাসার বারান্দা টা ছোটছোট ছেলে মেয়েদের সমাগমে ভরে থাকতো সেই মাদ্রাসা আজ নিশ্চুপ। কোনো ছাত্র ছাত্রী নেই। কিছু হুজুরও চলে গেছে। মাদ্রাসা বন্ধ থাকলে তাদের রোজগার ও বন্ধ। আর রোজগার বন্ধ থাকলে সংসার চলবে কিভাবে? কেউ কেউ অন্য এলাকার মাদ্রাসায় ছুটলো রোজগারের জন্য। মসজিদের বড় হুজুর একা একা বসে আছেন বারান্দায়। মোতালেব ভুঁইয়া কথা বললেন তার সাথে।
বাড়ি ফেরার পথে মেহরিন ধীর গলায় জিজ্ঞেস করে –
“ আব্বা… মাদ্রাসাটা যদি এভাবে পড়ে থাকে তাহলে দুঃস্থ বাচ্চাগুলো কোথায় পড়বে? ওদের তো এই মাদ্রাসা টাই ছিলো পড়ার শেষ সম্বল।
মোতালেব ভুঁইয়া নিঃশ্বাস ফেলে-
“চেষ্টা তো চলছে মা… কিন্তু টাকার দরকার। মেম্বার চেয়ারম্যান তো তালবাহানা করছে। কি যে হবে কে জানে।
মেহরিন বাড়ি ফিরে তার আলমারির ভেতর থেকে একটা খাম বের করে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সেটার দিকে। তারপর শক্ত করে ধরে বাইরে এসে বাবার সামনে দাঁড়ায়। নরম কণ্ঠে ডাকে-
“ আব্বা..”
মোতালেব ভুঁইয়া তাকান-
“কিছু বলবা আম্মা?”
মেহরিন খামটা এগিয়ে দেয়।
“ এটা নাও। ”
মোতালেব ভুঁইয়া তাকিয়ে দেখলেন চেকের মতো কিছু একটা।
“ কি এটা আম্মা?”
“এটা আমার কাবিনের চেক। এটা দিয়ে মাদ্রাসার কাজ ধরতে বলো বড় হুজুর কে।”
মোতালেব ভুঁইয়া থমকে যান। চোখ বড় হয়ে যায়-
“না মা, এটা হয় কি করে? এটা তোমার কাবিনের টাকা। তোমার নিজের তো ভবিষ্যৎ আছে আম্মা। তুমি রাখো এটা। কোনো না কোনো একটা ব্যবস্থা ঠিক করে দিবে আল্লাহ। ”
মেহরিন শান্ত গলায় বলে-
“আমার ভবিষ্যৎ! আমার তো কোনো ভবিষ্যৎ নেই আব্বা। আমি এত টাকা পয়সা দিয়ে আর কি করবো? এখন যদি এইটা দিয়ে মানুষের উপকার হয়… তাহলে ক্ষতি কিসে? কত গুলো মানুষের ভালোমন্দ জড়িয়ে আছে বলো তো? আমি জানি আমার এই কাজে উনিও খুশি হবেন।”
কথাগুলো বলার সময় মেহরিনের চোখে জল চিকচিক করে। মোতালেব ভুঁইয়ার গলা ভারী হয়ে আসে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ… তারপর ধীরে চেকটা নেন। পরদিন তারা ব্যাংকে যায়। সব প্রক্রিয়া শেষ করে টাকা তুলে ব্যাংক থেকে বের হতে হতে বিকেল হয়ে যায়।
রাস্তার একপাশে এসে দাঁড়ায় দুজন। মেহরিনের পানি তেষ্টা পাওয়ায় মোতালেব ভুঁইয়া বললেন-
“ তুমি দাঁড়াও মা, আমি দোকান থেকে পানির বোতল নিয়ে আসছি। এখানেই দাঁড়ায় থাকবা। বাবা যাবো আর আসবে। ”
মেহরিন মাথা নাড়ে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।চারপাশে হালকা গরম বাতাস, সন্ধ্যা হয়ে আসায় রাস্তায় মানুষজনের আনাগোনা কমে যাচ্ছে। মেহরিন আশেপাশে তাকাতে তাকাতে একটু দূরে তাকাতেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়। কিছুটা দূরে… রাস্তার ওপাশে সোলেমান দাঁড়িয়ে। পরনে সাদা লুঙ্গি,সাদা শার্ট। মেহরিনের নিঃশ্বাস থেমে যায়। লোকটা লুঙ্গির কোণা তুলে ধরে হেঁটে একটা গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
মেহরিনের চোখ মুখে বিস্ময়। এটাও কি ভ্রম? মেহরিন চোখ ডলে। ফের আবার তাকায়। না ভ্রম না। ঐ তো সুলতান সাহেব। মেহরিন জোরে ডাকে।
“সুলতান সাহেব!”
কোনো সাড়া নেই। হয়তো গাড়ির হর্ণের শব্দে পৌঁছাতে পারছে না তার আওয়াজ ঐ লোক অব্দি।
সোলেমান গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করে দেয়।মুহূর্তেই দৌড়াতে শুরু করে মেহরিন।
“ সুলতান সাহেব! দাঁড়ান! প্লিজ দাঁড়ান!”
গাড়িটা স্টার্ট নেয়। মেহরিন আরও দ্রুত দৌড়ায়। গাড়িটা গতি বাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যায়। মেহরিন হাঁপিয়ে উঠে। মাঝরাস্তায় থেমে যায়। তারপর আবার দৌড়াতে যায়। ঠিক তখন পেছন থেকে কয়েকজন লোক ঝাঁপিয়ে পড়ে। একজন তার মুখ চেপে ধরে। আরেকজন দুই হাত পেছনে চেপে ধরে। মেহরিন ছটফট করতে থাকে। শব্দ বের করতে পারে না। চোখ বড় বড় হয়ে যায় ভয়েতে। তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটা গাড়ির দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই দরজা খুলে তাকে ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলা হয়। গাড়ি স্টার্ট নেয়। মেহরিন কে নিয়ে চলে যায় ঐ গাড়ি। সবকিছু ঘটে কয়েক সেকেন্ডে। রাস্তা আবার আগের মতো হয়ে যায়।
এইদিকে মোতালেব ভুঁইয়া পানি নিয়ে ফিরে এসে চারপাশে তাকান। মেহরিনের নাম ধরে ডাকেন। কিন্তু কোথাও নেই তার মেয়েটা। তিনি এদিক ওদিক তাকান। মেহরিন মেহরিন করে ডাকেন। রাস্তা দিয়ে যে দু একজন মানুষ যাচ্ছে তাদের দাঁড় করিয়ে করিয়ে জিজ্ঞেস করছেন। কেউ দেখে নি মেহরিন কে। কেঁপে ওঠে তার বুকটা। হাতের বোতল পড়ে যায় মাটিতে। তিনি দৌড়াতে শুরু করেন।
দাহশয্যা পর্ব ৯৩
“মেহরিন মা আমার কোথায় তুমি। আম্মা শুনতে পাচ্ছ বাবার ডাক? সাড়া দাও আম্মা…মেহরিন ও মেহরিন..”
চারপাশের মানুষ তাকায় কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারে না। মোতালেব ভুঁইয়া পাগলের মতো খুঁজতে থাকে তার আদরের মেয়েটাকে। কিন্তু মেয়ের ছায়াটাও অব্দি দেখতে পাচ্ছেন না তিনি।
