Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯৩ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৯৩ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৯৩ (৩)
Raiha Zubair Ripti

রাত হয়ে আসছে অথচ স্বামী আর মেয়েকে এখনও বাড়ি ফিরতে না দেখে চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে সানজিদা বেগম। মোতালেব ভুঁইয়া কে ফোনের উপর ফোন করে যাচ্ছে কিন্তু রিসিভ করছে না।
বাতাসি তাকে অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করতে দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-
“ আপু আর চাচা এখনও ফিরে নাই?”
সানজিদা বেগম স্বামী কে আবার ফোনে ট্রাই করতে করতে বলল-
“ না রে। তোর চাচা ফোনটাও ধরছে না। এই শরীর নিয়ে কি মেয়েটাকে নিয়ে এত রাত অব্দি বাহিরে থাকাটা ঠিক? বাতাস টাতাস গায়ে লাগলে তখন তো আরেক বিপদ। ”
কথাটা বলতে বলতে শেষবার কল করতেই রিসিভ হলো। সানজিদা বেগম রেগেমেগে বলতে শুরু করলো-

“ কোথায় আছো তুমি মাইয়াটারে নিয়া? জানো না এই অবস্থায় বেশি রাত করে বাহিরে থাকতে নাই? তাড়াতাড়ি এক্ষুনি বাড়ি আসো মেয়ে নিয়ে। ”
মোতালেব ভুঁইয়া ফোন কানে নিয়ে রাস্তায় পা মেলে বসে পড়লো। কপাল চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো-
“ ও মেহরিনের মা,আমার মেহরিন রে আমি খুঁজে পাচ্ছি না। কই গেলো আমার মেয়েটা? আমি তন্নতন্ন করে খুঁজছি বক চত্বর টা। আমি পাইলাম না আমার মেয়েটারে। ”
সানজিদা বেগম তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলে বাতাসি ধরে ফেলে। সোফায় বসাতেই সানজিদা বেগমের শরীর কাঁপতে থাকে। ধরা গলায় বলতে শুরু করে –
“ কি কইতাছো কি এগুলা? ও সেরিন দেখ তোর বাপ কি বলতাছে এগুলা। আমার মাইয়া তো আমার সাথেই ছিলো। পাইতাছো না মানে কি? আমার মেয়ে নিয়ে তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরো মেহরিনের বাপ। ”
সেরিন মেয়েকে কোলে নিয়ে এগিয়ে আসতেই সানজিদা বেগম সেরিনের দিকে ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
“ দেখ তোর বাপ কি বলতেছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বল মেয়ে নিয়ে। ”
সেরিন কানে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ কি হইছে আব্বা?”

মোতালেব ভুঁইয়া কোনো রকমে বলল মেহরিন কে খুঁজে না পাওয়ার কথাটা। সবটা শুনে সেরিন নিজেও বাকরুদ্ধ। মোতালেব ভুঁইয়া ফোন কেটে দিতেই সেরিন অনিক কে ফোন করলো। তার বাপের কাছে এক্ষুনি যেতে বললো।
এদিকে ইমনদের বাড়িতে চলে গেছে মেহরিনের নিখোঁজ হওয়ার খবরটা। ইমনের দিশেহারা অবস্থা। মোতালেব ভুঁইয়া কে খুঁজে নিয়ে থানায় ছোটাছুটি করলো।
এদিকে পুলিশও বসে নেই। সিসিটিভি ফুটেজ জোগাড় করা হলো একটা অস্পষ্ট ফুটেজে দেখা গেল দূরে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। মেহরিনের মতো কাউকে দ্রুত টেনে তোলা হচ্ছে ভেতরে।
গাড়ির নম্বরপ্লেটটাও পরিষ্কার নয় ইচ্ছে করেই যেন মাটি, আর রং দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।
ফুটেজের ঠিক ওই অংশে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলও অদ্ভুতভাবে ব্লার হয়ে যায়। আরও কয়েকটা ক্যামেরা চেক করা হলো। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে গাড়িটা যেন কিছুদূর গিয়েই হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। কোনো টোল প্লাজা নেই,কোনো পরিষ্কার ট্রেস নেই,কোনো নির্দিষ্ট রুট নেই। লোকেশনটা পুরোপুরি ধোঁয়াশা।
পুলিশের ধারণা আরও জোরালো হলো এটা সাধারণ ঘটনা না। পরিকল্পিত। পেশাদার কাজ। কোনো নারী পাচারকারী গ্যাং এর খপ্পরে পড়েছে। ইদানীং দেশে এটাই ঘটছে বেশি। কিডন্যাপিং কেইস হলে এতক্ষণে মুক্তিপণ চাইতো।

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই একটা জিনিস ঘটে। কেউ খেয়ালই করে না। মেহরিনের শ্বশুরবাড়িতে এখনো খবরটা পৌঁছায়নি।
কারো মাথায় আসেনি,কারো মানসিক অবস্থাও ছিল না সেই খবর দেওয়ার। ভোরের দিকে ফোন করা হয় আমিরুল সুলতানকে। সবটা খুলে বলেন মোতালেব ভুঁইয়া। আমিরুল সুলতান বসে পড়ে কথাটা শুনে সোফায়। কি হচ্ছে কি তার পরিবারের সাথে এটা! প্রথমে মেয়ে,তারপর ছেলে। এখন ছেলের বউ আর তার অনাগত সন্তান!
আমিরুল সুলতান বাশার সুলতান কে ফোন করলো। কিন্তু ফোন ঢুকছে না। কয়েকবার চেষ্টা করলো। তারপর আর চেষ্টা না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে
তদন্ত সংশ্লিষ্ট মানুষ,সবাইকে একে একে ফোন করতে শুরু করেন তিনি। মেহরিনকে খুঁজে বের করতে হবে… যেভাবেই হোক। আর সেটাও জীবন্ত।
মোতালেব ভুঁইয়া পুলিশের ভরসায় থাকতে পারেন নি। বাড়িতে আর না ফিরেই রাত থেকে শুরু করে পরের দিন পুরো মহাদেবপুর টা খুঁজলেন পায়ে হেঁটে মেয়ের ছবি হাতে নিয়ে, রাস্তার মানুষজন কে দাঁড় করিয়ে করিয়ে, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তিনি তার আদরের মেয়েটা কে আর খুঁজে পেলেন না….

মাহি আগের তুলনায় কিছুটা বেটার ফিল করছে এখন। তবে বেশি নাড়াচাড়া করলে ব্লিডিং হয়। এজওয়ান কোথায় কোথায় যেন মাঝেমধ্যে চলে যায়। এই তো দুপুরের দিকে বের হয়েছে বিকেল হচ্ছে কিন্তু আসার নাম নেই। রুমের ভেতর একা একা বোর হচ্ছিলো বলে মাহি বাহিরে আসলো। বাগানে কিছুক্ষণ হাঁটা চলা করে রাস্তায় আসলো। তাদের এই বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে দুটো বাড়ি আছে। আর সামনে বিস্তার খোলা সবুজ মাঠ। মাহিকে দেখে এক বৃদ্ধা মহিলা এগিয়ে আসলো। জিজ্ঞেস করলো-
“ এই বাড়িতে তোমরা নতুন আসছো নাকি? কবে আসছো? আসলে তিন মাস হবে আমি আমার মেয়ের কাছে গিয়েছিলাম লন্ডন। আমি এইতো পাশের বাড়িটাতে থাকি। ”
মাহি ভ্রু কুঁচকালো এ কথা শুনে। মাহি যতদূর জানে এই বাড়িটা এজওয়ানের। এখানেই থাকে। আর দেড় বছরের বেশি সময় তো এজওয়ান বাংলাদেশেই ছিলো।
“ আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি নতুন তবে এই বাড়ির লোক তো আগে থেকেই এ বাড়িতে থাকতো। মানে এজওয়ানের কথা বলছি। উনি দেড় বছর বাংলাদেশে ছিলো। সেজন্য হয়তো আপনি জানেন না। আপনিও নতুন?”
“ কিহ! এই বাড়ি তো আজ ৫ বছর ধরে তালা মারা ছিলো। কাউকেই থাকতে দেখি নি। আর আমি ৭ বছর ধরে এখানে থাকি। এ বাড়িতে আগে আসলেই কেউ থাকতো না। ”

“ আর ইয়্যু শিওর?”
“ ইয়েস অ্যাম শিওর। বিশ্বাস না হলে ঐ বাড়িতে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো। এই বাড়ি বন্ধই ছিলো আগে। মালিক তো দূর,ভাড়াটিয়াও ছিলো না। ”
বৃদ্ধা মহিলা টা চলে গেলো। মাহি ভাবনায় পড়ে গেলো। ৫ বছর ধরে তালাবদ্ধ ছিলো এ বাড়ি! তাহলে এজওয়ান কবে থেকে এ বাড়িতে উঠেছে! আর আগে ছিলোই বা কোথায়? নাকি নতুন কিনেছে?
ধূর সব প্যাচ লেগে যাচ্ছে। মাহি বাড়িতে ফিরে আসলো। এজওয়ানের মায়ের ছবিটা সে হারিয়ে ফেলছে। সব ঝামেলা একই সাথে হওয়ার কথা! মাহি ফ্রান্সের সেই এতিমখানায় ফোন করে ফ্রান্সির কাছে ছবি চাইলো। ফ্রান্সি অ্যালবাম টা এনে ছবি বের করতে গিয়ে দেখে ছবিটা গায়েব। ছবিটা নেই। মাহিকে বলতেই মাহিও চমকালো। কি আশ্চর্য ছবিটা নেই মানে! এত বছর তো ছবিটা অ্যালবামেই ছিলো। তাহলে এখন হুট করে নাই হয়ে গেলো যে! কে আছে এসবের পেছনে? কে চাচ্ছে না এমিলা সুলতানের বিষয়টা সামনে আসুক? কে সেই ব্যক্তি? মাহি তাহলে এখন এমিলা সুলতানের ছবি পাবে কোথায়? ফেইসটা মনে আছে কিছুটা কিন্তু তার মনে থাকা দিয়ে কি আর এজওয়ান দেখতে পাবে?

মাহি পকেট থেকে ফোন টা বের করে স্কেচ আর্টিস্ট কে ফোন করলো। ফোন করে জানালো দু একের ভেতর মাহি যাবে তার কাছে। গিয়ে একটা মুখের বর্ণনা দিবে। সেই বর্ণনা অনুযায়ী তাকে একটা মুখ বানিয়ে দিতে হবে।
ASIO-এর টপ সিক্রেট কনফারেন্স রুমে অল্প আলো, চারদিকে বড় বড় স্ক্রিনে বিশ্বের মানচিত্র ভেসে উঠছে। স্ক্রিনে বারবার লাল চিহ্ন জ্বলছে—বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা অজানা অপরাধ নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত।
একজন সিনিয়র অফিসার ভারী গলায় বলল-
“আমরা যার বিরুদ্ধে লড়ছি, সে সাধারণ ক্রিমিনাল না… তার নাম মনস্টার, শ্যাডো মনস্টার। ছায়ার মতোই ধ্বংস করে যাচ্ছে সব। ”
মনস্টার একজন কুখ্যাত আন্তর্জাতিক অপরাধী, যাকে ২৮টা দেশ থেকে খুঁজতে খুঁজতে এখন সেটা বেড়ে ৫০টা দেশ হয়ে গেছে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ,মানি লন্ডারিং, নারী পাচার, অর্গান ট্রাফিকিং, অস্ত্র চোরাচালানসহ সব ধরনের ভয়াবহ অপরাধ।
অফিসার টেবিলে একটি রিপোর্ট রাখল-

“সে এখন অস্ট্রেলিয়ার দিকে নজর দিয়েছে। আমরা একটি এনক্রিপ্টেড ই-মেইল পেয়েছি।”
স্ক্রিনে ই-মেইলটি খুলে দেখানো হলো।
কিন্তু সমস্যা একটাই লোকেশন ট্র্যাক করা যায়নি।
কারণ মনস্টার নিজের তৈরি করা একটি প্রাইভেট এনক্রিপ্টেড নেটওয়ার্ক, যেখানে ট্রেসিং প্রায় অসম্ভব। কোনো সাধারণ স্যাটেলাইট বা সাইবার ট্র্যাকিং কাজ করে না।
একজন সাইবার অফিসার বলল-
“এটা নরমাল এনক্রিপ্টেড ওয়েব না… এটা আলাদা লেয়ার, আমরা এখনো পুরোটা ম্যাপ করতে পারিনি।”
হঠাৎ দরজাটা খুলে গেলো। ভিতরে ঢুকলো এজওয়ান। তাকে সাধারণ অফিসার বলা যায় না।
সে ASIO-এর একটি সিক্রেট অপারেশন ইউনিটের সদস্য, যার অস্তিত্বই খুব কম মানুষ জানে।
সিনিয়র অফিসার বলল-

“এজওয়ান, তোমাকে আর্জেন্ট ডাকা হয়েছে কারণ এই কেসটা আমাদের স্ট্যান্ডার্ড ইউনিট দিয়ে কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না।”
একজন আরেকজন যোগ করল-
“মনস্টার এবার শুধু বাইরে থেকে আঘাত করবে না… সে অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে বড় স্কেল অস্থিতিশীলতা তৈরি করার পরিকল্পনা করছে।”
এজওয়ান মনোযোগ দিয়ে সব শুনছে। তার চোখ স্ক্রিনের মানচিত্রে স্থির। তারপর একজন অফিসার প্রশ্ন করল-
“তোমার মতামত কী?”
এজওয়ান একটু থেমে বলল-
“ যাকে এতগুলো দেশ মিলেও খুঁজে বের করতে পারলো না। আপনাদের কি মনে হয় সেখানে আপনারা পারবেন তাকে খুঁজে বের করতে? ”
“ কোনো না কোনো দেশ কে তো পারতেই হবে। আর তুমি থাকতে আমাদের এত চিন্তা দ্বিধা আসবে কেনো? আমরা অবশ্যই পারবো। ”

“ আমাকে নিয়ে আপনাদের একটু বেশিই ওভার কনফিডেন্স। এটা না করাই ভালো। এজওয়ান চাইলেই সব করতে পারে না এটা মেনে নিন। তবে আমি চেষ্টা করবো যাতে আপনারা মনস্টার অব্দি পৌঁছাতে পারেন। আপনারা বললেন সে প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। যদি সে সত্যিই প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে, তাহলে সে শুধু নিজেকে লুকাচ্ছে না… সে আমাদের রিয়েল টাইম সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করছে। আমরা যদি তাকে ধরতে চাই, তাহলে তার নেটওয়ার্ক ভাঙার আগে… তার আচরণ বোঝা জরুরি সে আসলে কোথায় কোথায় আঘাত করতে চায়। তার সম্পর্কে যতগুলো ফাইল আছে সব গুলো আমায় দিন। আমি সবটা খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করে দেখবো। তার সম্পর্কে আমার খুব একটা স্ট্যাডি করা নেই। আগে করি তারপর আপনাদের দিক নির্দেশনা দিচ্ছি। ”
“ অবশ্যই। তবে একটু তাড়াতাড়ি করো। ”
এজওয়ান বাড়ি চলে গেলো। অফিসার মনস্টারের নামে জমানো ইয়া বড় একটা ফাইলের স্তুপ এজওয়ানের বাড়ি পাঠিয়ে দিলো।

চোখের বাঁধন খুলতেই প্রথমে কিছুই দেখতে পেল না মেহরিন। চোখ জ্বালা করতে লাগলো। মাথা ভারী, শরীর অবশ। ধীরে ধীরে দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। সে একটা স্যাঁতসেঁতে, জানালাবিহীন ঘরে পড়ে আছে। তার চোখে বাঁধা কাপড়টা কেউ খুলে দিয়েছে, কিন্তু হাত দুটো শক্ত করে বাঁধা পেছনে, পা-ও দড়ি দিয়ে চেপে ধরা। মুখে কাপড় গোঁজা ছিল শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
চোখটা একটু মানিয়ে নিতে না নিতেই বুকটা কেঁপে উঠলো। এটা কোনো ঘর না, এটা যেন একটা অন্ধকার গর্ত। চারপাশে তাকাতেই সে জমে গেল। তার মতোই আরও অনেকগুলো মেয়ে কেউ দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে বসে আছে, কেউ কাঁদছে নিঃশব্দে। সবার হাত-পা বাঁধা, মুখে আতঙ্কের ছাপ।
মেহরিনের বুকের ভেতরটা ধকধক করতে লাগলো। নিজের পেটের দিকে তাকালো তার অনাগত সন্তান…চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো, কিন্তু সে চিৎকার করলো না।
পরনের নিকাব খুলে গেছে। শুধু হিজাবটা কোনো রকম ঝুলে আছে। বোরকা জায়গায় জায়গায় ছিড়ে গেছে। একটু পর পাশে থাকা এক মেয়ের সাথে চোখাচোখি হলো। মেয়েটার বয়স খুব বেশি না। ঠোঁট কাঁপছে, চোখে ভয়। মেহরিন খুব আস্তে করে ইশারা করলো ভয় পেও না।

তারপর ধীরে ধীরে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। ঘরটা পুরোপুরি বন্ধ না। উপরে একটা ছোট ভেন্টিলেটর আছে। দরজাটা লোহার, বাইরে পাহারার শব্দ শোনা যাচ্ছে মাঝেমধ্যে লোকজনের অশ্লীল কথা হিংস্র হাসি।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুললো। একজন লোক ঢুকে এসে তাদের গুনে দেখলো। মোট ৯ জন আছে। মেহরিন কে নিয়ে ১০ জন। একজন কম হয়েছিল বলেই মেহরিন কে ধরে আনা। চলে যাওয়ার সময় বলে গেলো কালকেই তাদের পাচার করা হবে সুইডেনে।
দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। মেহরিন বুঝে গেলো তাদের হাতে সময় খুব কম। আজই কিছু করতে হবে। তার বাপ টা হয়তো খাওয়া দাওয়া ভুলে তাকে পাগলের মতো খুঁজে চলছে। ধীরে ধীরে সে হাতের বাঁধনটা নাড়ানোর চেষ্টা করলো। শক্ত করে বাঁধা, কিন্তু দড়িটা একটু পুরনো। সে দেয়ালের খসখসে অংশে ঘষতে লাগলো দড়ি। ব্যথায় হাত কেটে যাচ্ছে, তবুও থামলো না। একসময় দড়িটা একটু ঢিলে হলো। পাশের মেয়েটা বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। মেহরিন চোখ দিয়ে ইশারা করলো- শব্দ করো না।

কয়েক ঘন্টার চেষ্টায় অবশেষে এক হাত খুলে ফেলতে পারলো সে। তারপর দ্রুত নিজের পা খুললো, মুখের কাপড় সরালো। এক এক করে পাশের মেয়েটার বাঁধন খুলতে লাগলো। ধীরে ধীরে তারা কয়েকজন মিলে বাকিদের খুলতে শুরু করলো। সবাই মুক্ত হতে না হতেই মেহরিন ফিসফিস করে বললো-
“একসাথে বের হলে ধরা পড়বো। দুই দলে ভাগ হই। কেউ শব্দ করবে না হু? ”
তারপর দরজার পাশে গিয়ে সে কান পাতলো।বাইরে দুজন লোক কথা বলছে। ঠিক সেই সময় এক মেয়ে হঠাৎ কেঁদে উঠতে চাইলো, মেহরিন দ্রুত তার মুখ চেপে ধরলো।
“চুপ করো… কেঁদো না…”

কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেই হঠাৎ বাইরের পায়ের শব্দ দূরে সরে গেল।
মেহরিন সেই সুযোগটাই নিলো। দরজার নিচে একটা ভাঙা লোহার টুকরো ছিল। সম্ভবত আগে কখনো দরজার অংশ ভেঙে পড়ে ছিল। সে সেটা তুলে নিলো। দরজাটা বাইরে থেকে লক করা, কিন্তু পুরোপুরি শক্ত না। পুরনো ল্যাচ সিস্টেম। দরজার পাশে ছোট একটা ফাঁক। মেহরিন ধীরে ধীরে লোহার টুকরোটা সেই ফাঁক দিয়ে ঢুকালো। হাত কাঁপছে… তবুও থামলো না।
ধীরে, খুব ধীরে, ল্যাচটা খোঁচাতে লাগলো।
কয়েক মিনিট। তারপর দরজা একটু খুলে গেল।
মেহরিন ধীরে দরজা ঠেলে বাইরে উঁকি দিল। লম্বা করিডোর। ম্লান আলো। ডান পাশে সিঁড়ি। সে হাত দিয়ে ইশারা করলো,চলো। সবাই পা টিপে টিপে এগোতে লাগলো। একটা মেয়ে দ্বিধা আর ভয় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“আমরা… আমরা কি আদোও বের হতে পারবো?”
মেহরিন ধীরে বললো-

“চেষ্টা না করলে নিশ্চিত মরবো… চেষ্টা কর দেখি, হয়তো বা বাঁচবো।”
হঠাৎ পেছন থেকে শব্দ শোনা গেলো।
“এই! ওরা পালাইতেছে! ধর শালি দের ধর। ”
সর্বনাশ লোকগুলো জেনে গেছে। পেছন থেকে ভারী পায়ের শব্দ, দৌড়ের আওয়াজ আর বিশ্রী গালি ভেসে আসছে।
“ধর বান্দির বাচ্চা দের! একটা ও যেন পালাতে না পারে!”
মেয়েগুলো দিশেহারা হয়ে দৌড়াতে লাগলো।
কেউ ডানে, কেউ বাঁয়ে।
মেহরিনও দৌড়াতে লাগলো। শ্বাস কাঁপছে, বুক ধড়ফড় করছে, পেট ব্যথা করছে তবুও থামছে না।
সে বুঝতেই পারলো না কখন বাকিদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে। সে দৌড়াতে দৌড়াতে করিডোর থেকে আরও ভেতরের দিকে চলে গেছে। এই সাইডটা অন্ধকার আর আলোর মিশ্রণে। খুব একটা কক্ষ নেই বললেই চলে। মেহরিন ভয়ে ভয়ে ছুটছে সামনের দিকে। সামনেই ডানে আর বামে দুটো করিডর। মেহরিন ডান দিকে গেলো।
পেছন থেকে পায়ের শব্দ আসছে। তারা এদিকটাতেও হয়তো চলে আসছে।

মেহরিন হঠাৎ একটা রুমের দরজা আধখোলা দেখে সেটার ভেতরে ঢুকে পরলো। কিন্তু এটা তো কোনো রুম না। মনে হচ্ছে এটা আরো ভেতরে যাওয়ার কোনো রাস্তা। মেহরিন আগে পিছে বারবার তাকাতে তাকাতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করলো। আর ততই অদ্ভুত এক বিশ্রী গন্ধে তার পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। হিজাবের এক কোনা নিয়ে মুখ চেপে ধরলো। সিঁড়ি বেয়ে নেমে করিডরে পা রাখতেই কিছুর সাথে পা টা বেঁধে গেলো। মেহরিন তাকিয়ে খেয়াল করলো চারিদিকে মানুষের হাড়,মাথার খুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দেওয়ালে রক্তের দাগ। ফ্লোরে রক্তের ছুপছুপ জমাট বাঁধা থেকে ভেসে আসা বিশ্রী দুর্গন্ধ।

মেহরিন আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। বমি আসতে চাইলো। পেছন থেকে পায়ের আওয়াজ আরো কাছে ভেসে আসতেই মেহরিন আবার ছোট লাগালো। করিডরটা যেন শেষই হচ্ছে না। তার শ্বাস ভারী হয়ে আসছে, পায়ের নিচে রক্তমাখা মেঝে পিছলে যাচ্ছে বারবার। সে দৌড়াতে দৌড়াতে একটা কক্ষের পাশ দিয়ে যেতেই,
হঠাৎ করে তার চুলের মুঠি পেছন থেকে কেউ জোরে টেনে ধরল। মেহরিনের পুরো শরীর ব্যথায় কেঁপে উঠল। চোখে অন্ধকার নেমে এলো এক মুহূর্তের জন্য। তাকে টেনে ধরে সেই কণ্ঠটা গর্জে উঠল-
“ধরছি বান্দির বাচ্চা টাকে… কত বড় সাহস! পালাতে চেয়েছিলো!”
মেহরিন ব্যথায় চোখ মুখ খিঁচে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশ ফিরে তাকানোর সময় খুলে থাকা দরজার দিকে চোখ পড়তেই সাথে সাথে দু জোড়া চোখের সাথে মেহরিনের চোখাচোখি হলো। মেহরিনের শরীর টা তৎক্ষনাৎ জমে গেলো বরফের মতো। চোখ মুখে কি যে অবিশ্বাস্য চাহনি! মনে হলো সে তার চোখে এবারও ভুল দেখছে। হ্যাঁ এটা ভুলই। ভ্রমই। আসল হতে পারে না।
মেহরিন চোখের পলক ফেললো। সাথে সাথে বাকি মেয়েদের কেও ধরে এনে মেহরিনের পাশ কাটিয়ে ঐ কক্ষে ছুঁড়ে ফেলা হলো। আর বলতে লাগলো-

দাহশয্যা পর্ব ৯৩ (২)

“ স্যার এই মাগিরা পালাতে চাইছিলো। ধরে আনছি। মাগিদের কত বড় সাহস এই মৃত্যুপুরী থেকে নাকি পালাবে! ঐ যে ঐ মাগিটাই সব কলকাঠি নাড়ছে। ঐ পালাতে সাহায্য করছে। ”
কথাটা বলা শেষ হতে না হতেই কষিয়ে চড় পড়লো লোকটার গালে।
মেহরিনের অবিশ্বাস্য চাহনিতে এবার নোনা জল এসে গড়ালো। এটা তার ভ্রম না। এটা সত্যি। হ্যাঁ এটা সত্যি! সামনে থাকা মানুষ টি এবার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে মেহরিনের চুল টেনে ধরা লোক দুটিকেও কষিয়ে চ’ড় মারলো। তারপর মেহরিন কে ধরতে গেলে মেহরিন পিছিয়ে যায় । হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে নোংরা ফ্লোরে। আর বলতে থাকে-
“ ছোঁবেন না, ছোঁবেন না আমাকে ঐ নোংরা হাত দিয়ে…

দাহশয্যা পর্ব ৯৩ (৪)