Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৪

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৪

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৪
ইনান হাওলাদার

ঘড়িতে দুইটা বেজে পাঁচ মিনিট। তূর্য এখনো চেম্বারে । ফিরতে ফিরতে রাত হবে ।এখনো অনেক রোগী দেখা বাকি — লম্বা সিরিয়াল।
এদিকে তাসিন-নাবিল একাধারে কল করে পাগল করে দিচ্ছে। হয়তো দেখা করতে বলবে — যেটা তূর্য চায় না। এজন্যে ওদের কলও রিসিভ করছে না।একবার রিসিভ করলে যেকোনো উপায়ে দেখা করিয়ে ছাড়বে। বাধ্য হয়ে ওয়াইফাই অফ করে অ্যারোপ্লেন মুড অন করে রেখেছে। লাঞ্চ টাইমে অ্যারোপ্লেন মুড অফ করে ওয়াইফাই অন করতেই হুরহুর করে নোটিফিকেশন বারে একগাদা ম্যাসেজ আর কল এসে জড়ো হলো।সবার সকল টেক্সট কল উপেক্ষা করে একজনের কল ব্যাক করলো ও। রিসিভ হতে সময় লাগায় কপাল গোটালো তূর্য।পরপর আরেকবার সেই নম্বরে ডায়াল করলো।এবারে সাথে সাথে রিসিভ হলো।এবং উতলা কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

” কখন থেকে কল করছি,তূর্য ভাই।বন্ধ বলছে কেন?”
আহির উতলা কণ্ঠস্বরে হাসির দেখা মিললো তূর্যের গালে।স্বাভাবিক গলায় বলল,
” কি হয়েছে এখন বল ”
” তাসিন ভাইয়া আর আলিয়া আপু এসেছে।কখন আসবেন আপনি ? ”
ওদের নাম শুনতেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো তূর্য। কল রিসিভ করেনি দেখে বাড়ি চলে এসেছে। পাগল করে ছাড়বে অসভ্যগুলো।পরপর কিছু একটা মাথায় আসায় দ্রুত প্রশ্ন করলো সে,
” ওরা এখন কোথায়?”
” আছে।কেন? ”
” আচ্ছা শোন, ওদের সামনে যাস না তুই।আর গেলেও সাবধানে। আই মিন সকালে যেভাবে বেরিয়েছিলি । ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট আ’ম ট্রাইং টু স্যে, রাইট? ” তড়িঘড়ি করে কথাগুলো বলতেই ওপাশ থেকে তাসিনের কন্ঠস্বর ভেসে আসলো,

” ও না বুঝলেও আমরা বুঝেছি ভাই ”
চোখ বন্ধ করে ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো তূর্য। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত পোহায়। জীবনে এই বন্ধুগুলোকে যত ভয় পেয়েছে আজ পর্যন্ত আর কাউকে এতটা ভয় ও কোনোদিন পায়নি। ভয়ের একটাই কারণ যেখানে-সেখানে অস্বস্তিকর কথা বলে ফেলা।সে ওদের সম্পর্কে অবগত হলেও আহি তো না।মেয়েটা তো লজ্জা পাবেই । একটু সেরে সাবধানে কথা বললেও হয়।কিন্তু ওরা সেটা করবে না। অগত্যা ও আহির উপরেই চটলো,
” ইডিয়ট ! ওদের সামনে বসে কথা বলছিস ,আবার স্পিকারে রেখে দিয়েছিস? ”
” ও ইচ্ছা করে রাখেনি ।আমরা বলেছি রাখতে ” আহির হাত থেকে মোবাইল নিয়ে বলল আলিয়া।
” আমার ফিরতে রাত হবে।কি চাই তোদের? ” কাঠখোট্টা কন্ঠস্বর তূর্যের।
” তাসিনের ফ্ল্যাটে ফিরিস তাহলে।সবাই ওখানে থাকবে ”
” আমি আজকে মিট করতে পারবো না।তোরা আড্ডা দিস। ”
তাসিন আলিয়ার হতে মোবাইল নিয়ে বলল,

” বউ পাইছো নতুন নতুন , বন্ধুদের সাথে আড্ডা কেন দিবা? আমরা সিঙ্গেল মানুষ আমরাই দিবো ” বলে কপট মন খারাপের নাটক করলো সে।সাথে একটা হতাশার নিঃশ্বাস ফেললো।
ওদের নাটক সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা আছে তূর্যের।সেই প্রথম থেকে দেখে আসছে।ও গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” আহির কাছে দে ”
আলিয়া তাসিনের হতে মোবাইলটা দিয়ে আগে স্পিকার বাটন অফ করলো।তারপর আহির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
” নেও আহি ”
আহি তখন থেকে থমথমে মুখে বসে আছে। কিন্তু নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক দেখানোর বৃথা চেষ্টা করে বলল,
” আর কি বলবো আপু ! রেখে দিন ”
” তোমার কাছে দিতে বলল তূর্য ” বলে মোবাইলটা জোর করে আহির হাতে ধরিয়ে দিলো আলিয়া। নিজে রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে সাথে তাসিনকে ইশারা দিলো বেরিয়ে আসার জন্যে। আর আহিকে বলল ড্রয়িং রুমে আড্ডা দিচ্ছে তারা কথা শেষ করে আসতে। তাসিন আলিয়ার ইশারা অনুযায়ী ওর পিছন পিছন বেরিয়ে এলো। প্রশ্ন করল আলিয়াকে,

” এভাবে ইশারা দিলি কেন? তূর্যকে আরেকটু শায়েস্তা করে আসতাম। ”
” এমনিতেই হবে শায়েস্তা ”
” কিভাবে? ” তাসিন সন্দিহান কন্ঠে প্রশ্নটা করেই আবার উৎফুল্ল চিত্রে বলল,
” এই ভাই,কোনো প্ল্যান আছে তোর?”
” আমি কি প্ল্যান করবো? আহিই করবে শায়েস্তা। মনে হচ্ছে অভিমান করেছে মেয়েটা ” বলে মৃদু হাসলো আলিয়া।এ কথা শুনে তাসিন খুশিতে সপ্তম আকাশে। মুখ বাঁকিয়ে বলল,
” শা’লা ভাঙা এখন বউয়ের রাগ, কেমন পারিস। বেশি ভাবওয়ালা না ও? এইজন্যে একটা প্রিটি লিটল বেইবি পেয়েছে । যখন-তখন রাগ করবে আর ওয় রাগ ভাঙাবে ”
তাসিনের কথায় আনমনে হাসলো আলিয়া।অন্যমনস্ক হয়ে বলল,
” তূর্য ঠিক কীভাবে রাগ ভাঙাবে? আদেও পারবে? নাকি উল্টে রেগে যাবে? আমাদের ফ্রেন্ডশিপে কখনো তেমন ঝামেলা না হলেও মাঝে মধ্যে টুকটুক তো হতোই বল? ও কখনো সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামায়নি।সবাই কথা বন্ধ রাখলেও কখনো কাউকে একটাবার কল তো দূরে থাক টেক্সটও দেয়নি।উল্টে আমরাই নিজে থেকে কল করে মিট করতাম।আমরা যে রাগ করেছি সেটাও ওকে ভেঙে বলতাম তারপর ও বুঝত।বুঝে কি বলতো?
‘ তোরা রেগে ছিলিস আমি বুঝতে পারিনি ‘ তবুও একটাবার স্যরি বলতো না ।সেই মানুষটা বউয়ের রাগ কীভাবে ভাঙাবে? আমার না খুব জানতে ইচ্ছা করছে তাসিন ”

মেয়েটার এত এত আবেগঘন কথার কিছুই তাসিনের মাথায় ঢুকলো কিনা কে জানে। ও মাথা চুলকাতে চুলকাতে উল্টে প্রশ্ন করলো,
” কিন্তু ভাই, আহি রাগ করলোটা কি নিয়ে? আর তুই-ই বা বুঝলি কেমনে রাগ করেছে?আমি তো জীবনেও কারো রাগ-অভিমান বুঝবো না ”
আলিয়া ওর দিকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাঁকালো। মাথায় একটা চাটি মে’রে বলল,
” এইজন্যেই জীবনে একটা গার্লফ্রেন্ড টেকেনি তোর ”
” গার্লফ্রেন্ড না টিকুক , বউ টিকবে সিওর ” খুব গর্ব করে বলল সে।
” ঘোড়ার ডিম টিকবে ” বলে মুখ ভেংচালো আলিয়া।
” টিকবেই টিকবে ভাই। রোমান্সের মধ্যেও জিজ্ঞেস করব ‘ রাগ করেছ বেইবি ? ‘ ”
কিছু একটা বিড়বিড় করলো আলিয়া।তাসিন তা খেয়াল করেনি।সে ফের বলল,
” বিশ্বাস না হয় একটা সুযোগ দিয়েই দেখতে পারিস ”

সাথে সাথে পা থমকে গেল আলিয়ার। আশ্চর্য দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো। ওর সাথে সাথে তাসিনও থেমে গেল। ও অপ্রস্তুত হয়ে তাঁকালো আলিয়ার দিকে। কিছুক্ষণ গালকে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে থতমত খেয়ে বলল,
” এমনিই বললাম ভাই।তোকে বিয়ে করলে রোমান্স তো দূরে থাক একটা চু’মু খেতে গেলেই হেসে ফেলবো।আমি তো আর নাবিল নই ”
” নিজেরটা বল।অন্যের ফিলিংস ধরে কেন টান দিচ্ছিস।এটা কেমন স্বভাব তাসিন?” বলে বড়বড় পা ফেলে হাটা শুরু করলো আলিয়া।
” ভাই,আমি কি সেভাবে বলেছি নাকি? মজার ছলে বলেছি।রাগ করলি নাকি আবার? আলিয়া?”
বলতে বলতে ওর পিছু ছুটলো ছেলেটা।
অথচ,এই ছেলেটাই একটু আগে বলছিল সে নাকি জীবনেও কারো রাগ-অভিমান বুঝবে না। সত্যিই কি তাই?

রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষে আজকে আর শয়ন কক্ষে যায়নি আহি। ড্রয়িং রুমে বসে শান্ত-প্রান্তের সাথে ক্যারম খেলছে। ছোট সাইজের হওয়ায় টানা হেঁচড়ায় তেমন কোনো অসুবিধে হয়নি। তূর্যও আজকে দেরি করে ফিরেছে।আহিকে অবশ্য কল করেছিল সে কথা জানাবে বলে ।কিন্ত মহারানী কল রিসিভ করেননি।আর তখনও মুখের উপর লাইন কেঁটে দিয়েছিল।তারপর মাকে কল করে জানিয়েছে সে। পারভিন বেগম আহিকে জানিয়েছেন।
মিনিট দশেক হয়েছে হয়তো বাড়িতে এসেছে তূর্য।ফিরেই বউয়ের অপেক্ষায় সময় গুনছে।দোতলায় যাওয়ার সময় সে অবশ্য দেখেছ আহি ওদের সাথে ক্যারম খেলছে।রুমে আসার সময় ডেকেও এসেছে। যদিও একশো ভাগ নিশ্চিত ছিল আসবে না। আসেওনি ! কিছুক্ষণের অপেক্ষা শেষে অগত্যা সে নিজেই নিচে নামলো। আলগোছে গিয়ে বউয়ের গা ঘেঁষে বসলো। অথচ মেয়েটা ওর দিকে একবার ফিরেও তাকালো না।বরং খানিকটা দূরে সরে বসলো। তূর্য পুনরায় দূরত্ব ঘুচালো ।আহির দিকে নজর নিবদ্ধ রেখে ভাইয়েদের উদ্দেশ্যে বলল,

” খেলা কতদূর? ঘুমোতে যা ”
শান্ত-প্রান্ত দুইজনেই একসাথে আহির মুখের দিকে তাকালো।সে-ই ওদের আটকে রেখেছে।ওদের ভীতু মুখ দেখে আহি বলল,
” এই খেল তো তোরা। কে কি বলল না বললো, সবার সব কথায় কান দিয়ে লাভ আছে? ”
তূর্য দুই ভ্রু কপালে উঠিয়ে আশ্চর্য হয়ে আহির দিকে তাঁকালো । বাহ! ভালোই উন্নতি হয়েছে। দুই দিন বিয়ে হতে পারল না ভয় উধাও। তার এমন সাহস দেখে শুধু তূর্যই না শান্ত-প্রান্তও আশ্চর্য হলো।
তূর্য কিছুক্ষণ ধৈর্যশীল হয়ে বসে রইলো।তারপর আহির উদ্দেশ্যে বলল,
” গেইমটা শেষ করলে ভালো হতো ”
মেয়েটা যেন শুনেও শুনলো না।
এমন ভাব যেন অলিম্পিকের চ্যাম্পিয়ন। অথচ, এখনো পর্যন্ত একটা গুটিও পকেট জালে ফেলতে পারেনি। আর স্ট্রাইকার কিভাবে ধরছে সেটা তো বাদই।
তূর্য এবার খিটখিট করে উঠলো ।বলল,

” রুমে চল।পারিস না তো ঘোড়ার মাথাও ”
কথাটা বলেই আবার নিজের উপর বিরক্ত হলো সে। রাগ ভাঙাতে এসে নিজেই রেগে যাচ্ছে। এভাবে কথা বলে ম্যাডামের অভিমান ভাঙা তো দূর,আরো গড়বে। নমনীয় হলো সে। বলল ,
” আই মিন , আমি দেখিয়ে দেই কিভাবে স্ট্রাইকার ধরতে হয়? ”
অতঃপর অভিমানী নারীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো।বোর্ডের উপর স্ট্রাইক ধরে রাখা হাতের উপর নিজের বড়সড় হাতটা রাখলো।মুহূর্তেই ছোট্ট-খাটো হাতের পাতা খানা আড়াল হয়ে গেল। নিশানা ঠিক করতে প্রেয়সীর ডান কাঁধে থুতনি রাখলো সে। খোঁচা খোঁচা দাড়ির স্পর্শ পেতেই সারা শরীর শিউরে উঠল রমণীর।
এতক্ষণে অসহায় স্বামীর দিকে এক সেকেন্ডের জন্যে তাকালো সে। গম্ভীর গলায় বলল,

” লাগবে না শেখানো।আমি পারি ”
” হুঁ,সেটা তো দেখছি-ই ” নিশানা ঠিক করতে করতে জবাব দিলো তূর্য।
শান্ত -প্রান্ত ওদের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে সেটা খেয়াল দ্রুত দূরে সরলো তূর্য। ওরা যে এখানে আছে মাথা থেকে সরেই গিয়েছিল ওর। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে উঠে গেল সে। ই’ডিয়টটার অভিমান ভাঙাতে এসে নিজের মান-সম্মানের শ্রাদ্ধ হয়ে গেল। ও দ্রুত রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। জাস্ট পাঁচ মিনিট দেখবে তারপরেও না আসলে ওর রাগের গুষ্টির ষষ্ঠী পূজা করবে আজ। যেতে যেতে মাঝ সিঁড়িতে মারুফা বেগমের সাথে দেখা হলো ওর। এবারে মুখে হাসি ফুটলো। পিছন ঘুরে একবার আহির দিকে তাঁকালো। পরপর জোর গলায় ডেকে উঠলো,
” আহি? রুমে আয় ফাস্ট ”

অতঃপর শয়তানি হেসে রুমে চলে গেল।এবারে যা করার তার শ্বাশুড়ি আম্মাই করবেন। মিনিটের মধ্যে বউকে রুমে পাবে এখন। হলোও তাই। মারুফা বেগম মেয়েকে বকে-ঝকে শুতে পাঠালেন। থমথমে মুখে রুমে প্রবেশ করলো আহি ।এসেই শব্দ করে দরজা লক করলো। সে কি বুঝে না ওই লোকের চালাকি? সুযোগ বুঝে আম্মুকে দেখেই গলা ফাঁড়তে হলো। বজ্জাত লোক একটা !
তূর্য তখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে । বিনা কারণেই দাঁড়িয়ে আছে।জানে আহি শোয়ার আগে একবার হলেও ড্রেসিং টেবিলের সামনে আসবে। তবে এবারে আর তার আশা পূরণ হলো না।সোজা বিছানার দিকে এগিয়ে গেল আহি। আয়নার প্রতিবিম্বে সেটা স্পষ্ট দেখতে পেল তূর্য। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো প্রেয়সীকে। উন্মুক্ত কাঁধে থুতনি ঠেকালো সে।পরপর ঠোঁট ছুঁইয়ে কৈফিয়ত দিলো,
” এই লাভ বা’ইটগুলো দেখলে ওরা হাসাহাসি করতো খুব। ইভেন করেছেও আজ।আমি নাহয় ওদের এসব বিহেভিয়ারে অভ্যস্ত।বাট তুই তো লজ্জায় পড়তিস বল? এইজন্যেই ….! ” পরপর থেমে গেল ও। আহি পেটের উপর থেকে তূর্যের হাতের বাঁধন ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল ,

” তা জেনে কি করবো আমি? মিলাদ দিবো?” ।তূর্য শক্তি প্রয়োগ করে কাঁধে একটা গাঢ় চুম্বন এঁকে বলল,
” এরপরেও মুখ ফুলিয়ে থাকবি ? ”
তূর্যের ছোঁয়ায় মেয়েটার ভিতর এলোমেলো হয়ে এলেও বাইরের দিক দিয়ে একদম কাঠ হয়ে রইলো। তূর্য এবারে অপশন বি অ্যাপ্লাই করলো,
” রাগ করে না টুনটুনি কিনে দিব ঝুনঝুনি কে বলেছে তুমি বোকা তুমি একটা তেলাপোকা।
বাড়ি ফিরেই তাহির কাছ থেকে মুখস্ত করেছি এটা। ”
তূর্যের মুখে বাচ্চাদের এমন ছড়া শুনে না চাইতেও হেসে ফেললো আহি। মুহূর্তেই আবার মুখে কপট গম্ভিরতা টানলো। থমথমে কন্ঠে বলল,
” শুধু বললেই হয়, তাহির মতো মিষ্টি করে …..” কি ভেবে থেমে গেল সে।চোখ বড়বড় করে লাফিয়ে উঠলো মেয়েটা।খুশিতে চোখ মুখ চিকচিক করে উঠেছে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলল,
” ‘ তুমি ‘ বলেছেন তূর্য ভাই। দুই ,দুইবার তুমি বলেছেন ”
ওর এত খুশি দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল তূর্য। সামান্য তুমি বলাতে মেয়েটা এত খুশি হয়ে গেল? সে ওকে ছেড়ে নিজের দিকে ঘুরালো। হাসিহাসি আদুরে মুখখানা আজলা করে ধরে মিহি কন্ঠে বলল,
” তুমি বলাতে এত খুশি? ”
” হুঁ,কারণ আপনি বলেছিলেন তুমি-টুমির আশা ছেড়ে দিতে।কোনোদিনও বলবেন না।কিন্তু বলেছেন ।আপনি হেরে গেছেন তূর্য ভাই ”

দীর্ঘশ্বাস ফেললো তূর্য। বুক ভরা কপট আফসোস নিয়ে বলল,
” তাহলে হারিয়ে খুশি হয়েছিস? আর আমি ভাবলাম …..থাক বাদ দেই। ডিনার করেছিস? ”
” হুম! আপনি তো করে এসেছেন না? ” কে বলবে এই মেয়ে এতক্ষণ মুখ ফুলিয়ে বসে ছিল? একদম স্বাভাবিক ব্যবহার এখন।
” হ্যাঁ,তাসিনের ওখানে গেলাম।শুয়ে পড় তাহলে।টায়ার্ড লাগছে খুব ”
বলেই বিছানার দিকে এগিয়ে গেল সে। আহি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। শোয়ার কথা শুনে কালকে রাতের স্মৃতিগুলো মস্তিষ্কে ঘিরে ধরেছে। সে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে একাধারে নখ খুঁটতে ব্যস্ত। আজকে সারাটাদিন ঘুরেফিরে ওসব মাথায় এসেছে।আর পাগলের মতো একা-একা লজ্জায় মাখামাখি হয়ে ব্লাশ করেছে। কিছু মুহূর্ত মস্তিষ্ক একটু ঠান্ডা থাকলেও এখন আবার শুরু হয়েছে। তূর্য বোধহয় কিছুটা আন্দাজ করতে পারলো। কাত হয়ে বালিশে কনুই রেখে হাতের তালুতে মাথার ভর দিয়ে লাজুকলতা প্রেয়সীর পানে তাকালো।
কিছুক্ষণ পরখ করে বলল,

” যা হওয়ার হয়েই তো গিয়েছে। এখন লজ্জা পেয়ে কি লাভ বল ? নিরিবিলি শুয়ে পড়।নাহলে আজকের ঘুমও হারাম করে দিবো।”
খুব সাবলীল কন্ঠে কথাগুলো বলে পুনরায় বালিশে মাথা রাখলো সে। চোখ বন্ধ করে ডান হাতটা আড়াআড়ি ভাবে চোখের উপরে রাখলো।
এদিকে আহি চমকে উঠে চোখ বড়বড় করে ফেলেছে । একটা শুকনো ঢোক গিয়ে তড়িঘড়ি করে তূর্যের পাশের বালিশটা দখল করলো। গুটিসুটি মেরে উল্টপাশ ঘুরে শুলো। ওমনি সেকেন্ডের ব্যবধানে একজোড়া বলিষ্ঠ হাত তাকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরলো। এক টানে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো। ইতিমধ্যে মেয়েটার শ্বাস আটকে গিয়েছে।লোকটা কি বলল ,আর এখন কি করছে। তূর্য ওকে ঘুরালো নিজের দিকে।চোখে চোখ রেখে বলল,

” শ্বাস আটকে রেখেছিস কেন? ”
” কই ? না তো ? আপনাকে কে বলল?”থতমত করতে করতে বলল আহি।
” কে বলবে? আমি ফিল করতে পারছি না? পেট একদম স্টীল করে রেখেছিস ” বলে নিজের দিকে ঘুরালো মেয়েটাকে।
” আপনি বলেছিলেন ঘুমাবেন তূর্য ভাই ” মিনমিন করে বলল ও।
” তো ? ঘুমাবোই তো ! একটু ছুঁলেই উল্টাপাল্টা ভাবিস কেন আহি? ছিঃ ! ”
অতঃপর দুজনের আর কেউই বাক্য ব্যয় করলো না। আহি গুটিসুটি মেরে পড়ে রইলো স্বামীর বুকে। তূর্যও নীরব। নিজের এক লাইন বেশি বোঝার দরুণ লজ্জায় ম’রে যেতে ইচ্ছা করছে তার।চারিদিকের পরিবেশ নীরব হতেই আহির কানে ভেসে আসলো তূর্যের বুকের ধুকপুক শব্দ। গলা শুকিয়ে এলো তার। কাল রাতভরও লোকটার হৃৎপিণ্ডের প্রচন্ড গতি অনুভব করেছিল সে। অনেক আগে যখন তূর্য জ্বরে পড়েছিল তখনো। লোকটা যখন তার কাছাকাছি আসে এরকমটা তো তারও হয়।এমনকি এখনো হচ্ছে। তূর্য ভাই তো কার্ডিওলজিস্ট।সে একটাবার প্রশ্ন করেই দেখুক। ভেবেই পরপর নিচু স্বরে ছেলেটাকে ডাকলো ও,

” তূর্য ভাই ?”
সাথে সাথে সাঁড়া ভেসে এলো,
” হুমম ”
” আপনার বুক এমন ধুকপুক ধুকপুক করছে কেন? ”
” এমনি ! ঘুমা ” বলে প্রেয়সীর চুলে হাত বুলাতে লাগলো সে।
” আমারও হয়,এইজন্যেই বলছি। এটা কি কোনো রোগ? ”
তূর্য এবার মনোযোগী হলো। আহিকে বালিশে ফেলে ওর উপর আধশোয়া হয়ে ফিসফিস করে বলল,
” তোর কখন হয়? ”
” আপ ..আপনার কাছাকাছি এলেই ” বলে অন্যদিকে মাথা ঘুরালো মেয়েটা। লজ্জার লাল আভা ভর করেছে দুই গালে।মুচকি হাসলো তূর্য।কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করলো,
” আমারও ! কয়েকটা চুমু খাই? ঠিক হয়ে যাবে ”
বলেই আবার বলল,
” না ! এক কাজ কর তুই খা ”
এহেন কথায় আহি ওড়া-মোড়া খেয়ে উঠলো। বুঝলো লোকটার ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা নির্লজ্জতাকে জাগানো ঠিক হয়নি।সে তো ম’রে গেলেও এমন কাজ করতে পারবে না।
মেয়েটা নিজের উপর ঝুঁকে থাকা বলিষ্ঠ শরীরের পুরুষটিকে দুইহাতে দূরে ঠেলতে ঠেলতে বলল,

” সরুন প্লিজ।আপনি কেমন যেন হয়ে যাচ্ছেন তূর্য ভাই ”
” কেমন হচ্ছি? হাসবেন্ড ম্যাটেরিয়াল। তাই না? বাই দ্য ওয়ে, তুই না খুব টেনশনে ছিলি আমার বউয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে? বউকে ব’কবো, খুব আন’রো’মান্টিক আমি। এখন পালায় পালায় করিস কেন? নে, আর দেরি করিস না তো। যা বলেছি কর দ্রুত।টায়ার্ড লাগছে খুব, ঘুমাবো ”
” ছাড়ুন তূর্য ভাই।আমি ওসব পারি না ” তূর্যকে সরানোর বৃথা চেষ্টা করতে করতে বলল মেয়েটা।
” আমি শিখিয়ে দেই? ”
” না প্লিজ ! আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। ” বলে ঠোঁটে দুই হাত রাখলো মেয়েটা। তূর্য সেই হাত জোড়া খুব সহজেই সরিয়ে ফেললো। চিকন,সরু হাত জোড়া নিজের বাম হাত দ্বারা আটকে নিলো।অন্য হাত গলার পাশ দিয়ে গলিয়ে দিয়ে বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৩

” আসবে না ” অতঃপর নিজের কার্যসিদ্ধিতে ম’রিয়া হলো ।
সে কি আর বাঁধা মানা লোক! বরাবরের মতো ছটফটিয়ে উঠলো মেয়েটা। লোকটা ঘটা করে ঠিকই বলল ‘ দম বন্ধ হবে না ।’ অথচ, শ্বাস আটকে না যাওয়া পর্যন্ত মুক্তি মিললো না মেয়েটার। এটাই ছিল আহিকে দেওয়া সবচেয়ে দীর্ঘ চু’ম্বন তূর্যের। দীর্ঘ সেই যাত্রা শেষে দুজনেই হাঁপড়ের মতো শ্বাস টানতে থাকলো। ঘন নিশ্বাসের মাঝেই ওয়া’র্নিং‌ দিলো মেয়েটাকে,
” তিন মিনিটে ঘুমাবি। আদারওয়াইজ তিন ঘন্টায়ও ছাড় পাবি না ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৫