ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৯
নওরিন কবির তিশা
-‘ নয় মাস আগে। আজ থেকে নয়টা মাস আগে এমনি এক বৃষ্টি ভেজা প্রহরে আমাদের দেখা হয়েছিল।এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে। মনে আছে ক্যাপ্টেন? অথচ…অথচ মাত্র নয়টি মাসের ব্যবধানে আজ আমরা যোজন যোজন দূরে। হয়তো এতটা খারাপ আমার লাগতো না,হয়তো এতটা দমবন্ধকর মুহূর্তের শিকার আমি হতাম না। কেনো করলেন আমার সাথে এমন? ভালো যদি নাই বাসবেন তাহলে কেনো আসলেন এত কাছে? কেনো জড়ালেন এই ম’রণ মায়ায়।
প্রবল বর্ষণমুখর শ্রাবণের দ্বিপ্রহর বিরাজমান; ঘোর বর্ষায় আক্রান্ত সমগ্র সুবর্ণ নগর। ক্ষণে ক্ষণে রুদ্র রোষে নীলিমার বক্ষ জুড়ে বজ্রবিদ্যুতের অট্টহাসিতে ত্রস্ত জনপদ গৃহকোণে সিঁটিয়ে আছে।পুরাতন স্যাঁতস্যাঁতে দোতলা ভবনের পূর্বপার্শ্বের কক্ষটার ঝুল বারান্ধার দরজায় হেলান দিয়ে দূর দিগন্তে শূন্য দৃষ্টি মেলে আনমনে কথা গুলো আওড়াচ্ছিল তৃষা।
নিচে সবাই মহাব্যস্ত আজ। তার পেছনের কারণটাও ব্যাপক তাৎপর্যময় আজ ইংরেজি বর্ষপঞ্জিকায় আগস্টের বারো তারিখ অর্থাৎ তৃষার ১৯ তম জন্মদিন। নিঃসন্দেহে দিনটা নেওয়াজ বাড়ির সকলের জন্য বড্ড বৈশিষ্ট্যসূচক;তাই সবাই সেই তোড়জোড়েই মত্ত।তবে দিনটা সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র স্পৃহা দূর সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রীতে আনন্দের নগণ্যতম রেখাও স্থান পায়নি আজ।
উন্মাতাল পবন জানলার পর্দাগুলোকে অবাধ্য ঝাপটায় উড়িয়ে দিচ্ছে বারংবার। হঠাৎ কক্ষে কারো প্রবেশ অনুভূত হতেই তড়িৎ বেগে চোঁখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া দু ফোঁটা অশ্রুকণা হাতের ওপর পিষ্ট দ্বারা মুঁছে পিছন ফিরলো ও। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিগোচর হলো চঞ্চল ভঙ্গিমায় কক্ষে প্রবেশকারী আরিশাকে। রীতিমতো হাঁপাচ্ছে মেয়েটা। তৃষা ভ্রু কুঁচকে ধীরলয়ে ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে শুধাল,,
-‘ এভাবে ছুটছিলি কেন? কি হয়েছে?
আরিশা জোরে জোরে শ্বাস নিলো কয়েক দফায়; অতঃপর স্বাভাবিক হওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় বলল,,
-‘ তো-তোমার পার্সেল…
ও থামতেই তৃষা কুঞ্চিত ভ্রু যুগল আরো কুঁচকালো,
-‘ মানে?
-‘ মানে আর কি? তোমার পার্সেল আসছে।
কুঞ্চিত ভ্রু যুগল শিথিল হতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই,বিরক্তি ছাপিয়ে একরাশ বিস্ময় গ্রাস করেছে দৃষ্টি। মস্তিষ্ক খুঁজে চলেছে কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তির পরিচয়।তবে ফলাফল শুন্য; দীর্ঘ একটি মাস যাবৎ সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন ও;বড্ড একাকীনি। প্রথমদিকে রাতে টুইংকেলের সঙ্গে আলাপ জমলেও ইদানিং সেটাতেও ভাটা পড়েছে।আর মেহেসানার সঙ্গেও ততএকটা কথা হয়ে উঠে না। তাহলে কে পাঠাবে উপহার? এদিকে হুট করে ওকে এমন ধ্যানে মগ্ন হতে দেখে আরিশা এক ধাক্কা দিয়ে বলল,,
-‘ ওই পিপি? কই হারালা?
আরিশার ধাক্কায় সম্বিৎ ফিরল তৃষার;ঘোরলাগা নেত্রদ্বয় মেলে বিভ্রান্ত স্বরে বলল,
-‘ পার্সেল? আমার নামে? ভুল দেখিসনি তো? হয়তো ভুল করে ভুল অ্যাড্রেসে এসেছে। আমাকে আবার কে পার্সেল পাঠাবে?
আরিশা এবার কপালে হাত দিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
-‘ আরে না রে ভাই! আমি কি অতই কাঁচা কাজ করি? ডেলিভারি বয় স্পষ্ট করে বলল, তৃষা নেওয়াজ। এই অঞ্চলে তৃষা নেওয়াজ নামে তুমি ছাড়া আর কেউ আছে নাকি? খামোখা সন্দেহ করো।
তৃষা তবুও নিশ্চিত হতে চাইল,
-‘ তুই শিওর তো? ভালো করে নামটা দেখেছিস?
আরিশা এবার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ঈষৎ বিরক্তি নিয়ে বলল,
-‘ হ্যাঁ রে বাবা, একশ বার শিওর! পার্সেল নিয়ে লোকটা নিচে দাঁড়িয়ে ঠায় ওয়েট করছে। তোমার যদি বিশ্বাস না হয়, নিজের চোখে গিয়ে দেখে আসো। এখন দ্রুত চল তো দেখি, আমার তর সইছে না।
তৃষার বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। হঠাৎ নিস্তরঙ্গ হয়ে যাওয়া জীবনে আকস্মিক এই পার্সেল বড্ড অনাকাঙ্ক্ষিত। মনের গহিনে এক অজানা কৌতূহল আর সংশয়ের দোলাচল নিয়ে ও ধীর পদক্ষেপে আরিশার অনুগামী হলো।
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে; রান্নাঘরের টিনের চালে বর্ষনের অবিরাম ছন্দপতনের আওয়াজ শ্রুতিমধুর হয়ে কর্ণগোচর হচ্ছে। আরিশার সঙ্গে নিচে নামতেই তৃষার দৃষ্টিগোচর হলো নেওয়াজ বাড়ির সদর দরজার ছাউনির নিচে রেইনকোট পরিহিত হাতে বেশ বড়সড় একটি প্যাকেট ধরে দন্ডায়মান যুবকটিকে। বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচাতে পার্সেলটি পলিথিনে খুব যত্ন করে মোড়ানো।
তৃষাকে দেখেই ডেলিভারি বয় পকেট থেকে একটি রসিদ বের করে এগিয়ে এসে বেশ পেশাদার ভঙ্গিতে শুধাল,
-‘ আপনিই তৃষা নেওয়াজ?
-‘ জি, আমি।
-‘ আপনার একটা পার্সেল আছে ম্যাম। ঢাকা থেকে বুক করা হয়েছে। কাইন্ডলি এখানে একটা সাইন করে দিন।
তৃষা রসিদের ওপর নিজের নামটা দস্তখত করে পার্সেলটা হাতে নিতেই ও এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করল। আয়তনে বড়সড়ো ওজনেও কম নয় প্যাকেটটা। তৃষার একার পক্ষে বহন করা দুরূহ হয়ে ওঠায় আরিশা সহায়তা করলে ওকে। দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পার্সেলটা নিয়ে ভেতরের দিকে প্রবেশ করল ওরা। সকলে রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকার ড্রয়িংরুম জনশূন্য তাই ওরা কোনোরূপ বাক্যব্যয় না করে নির্ঝঞ্ঝাটে সরাসরি তৃষার শয়নকক্ষের দিকে পা বাড়াল।
বিছানার ঠিক মাঝখানে রাখা সুবিশাল সেই প্যাকেটটার দিকে ও নিষ্পলক চেয়ে আছে তৃষা। বাইরে শ্রাবণের অঝোর ধারায় প্রকৃতি তখনও মাতোয়ারা; অথচ তৃষার নির্লিপ্ততা পরিবেশ ভারী করে রেখেছে। এদিকে আরিশার কৌতূহলের পারদ তুঙ্গে ও উত্তেজনায় রীতিমতো ছটফটাচ্ছে। হাতের কাঁচিটা তৃষার সামনে নাচিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠে ও বলল,
-‘ ও পিপি! তুমি কি এভাবে স্ট্যাচু হয়ে সারাদিন বসে থাকবে? আরে খোলো না! আমার তো হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জোগাড়। এত বড় গিফট এই অজপাড়া গাঁয়ে ডেলিভারি হয়েছে, তুমি ভাবতেও পারছো কী এক্সাইটিং ব্যাপার?
তৃষা কোনো কথা বলল না। ও জানালার বাইরে বৃষ্টির ঝাপটার দিকে তাকালো; পরক্ষণেই অত্যন্ত যান্ত্রিকভাবে আরিশার দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল,
-‘ খোলার দরকার নেই রে। হয়তো কেউ মজা করেছে, কিংবা অন্য কারো জিনিস ভুলে আমার নামে এসেছে। তুই রেখে দে।
আরিশা এবার অবাক হয়ে বড় বড় চোখে তাকাল। ও কাঁচিটা বিছানায় ছুড়ে দিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল,
-‘ তুমি কি সত্যিই পাগল হয়ে গেছো পিপি? এই ভরদুপুরে বৃষ্টিতে ভিজে ডেলিভারি বয় তোমার নাম ধরে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে দিয়ে গেল, আর তুমি বলছো অন্য কারো? তোমার কি হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছে?
-‘ দেখ আরু…।
ওর কথাটা পূর্ণতা পাওয়ার অবকাশ পেলো না তার আগেই আরিশা একপ্রকার জোর করে ওর হাতটা টেনে ধরল। কাঁচিটা ওর হাতে গুঁজে দিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-‘ দেখো পিপি, তুমি খুললে খোলো, না হলে আমি একাই চিরে ফেলব সবটা। নিজের জন্মদিনে একটু তো সারপ্রাইজড হতে শেখো! এত মনমরা হয়ে আছো কেন বলো তো? প্লিজ, প্লিজ ওপেন ইট!
তৃষা লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে কাঁচির ফলাটা পলিথিনের ওপর ছোঁয়াতেই এক অদ্ভুত হিরণ্ময় দ্যুতির আভাস পেল। বাইরে তখন মেঘের গুরুগুরু তৃষা কম্পিত চিত্তে পলিথিনের আস্তরণ আর কার্ডবোর্ডের বাঁধন আলগা হতেই আরিশার গগণবিদারী চিৎকার ঘরের স্তব্ধতা চূর্ণ করে দিল। বিছানার ওপর যেন এক টুকরো রামধনু আছড়ে পড়েছে। নীল, রক্তিম, কাঞ্চন আর সবুজের এক মায়াবী সংমিশ্রণে ঝিকমিক করে উঠল রাশি রাশি কাশ্মীরি রেশমি চুড়ি। পাথর বসানো আর সূক্ষ্ম কারুকাজে খচিত সেই চুড়িগুলোর উজ্জ্বলতা বাইরের মেঘলা দিনের বিষণ্ণতাকে এক নিমেষে ধুয়েমুছে দিল।
তৃষা প্রস্তরমূর্তির ন্যায় স্তব্ধ হয়ে রইল। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস যেন গলায় এসে আটকে আছে। ওর স্বপ্নের কাশ্মীরে চুরি এখনো হাতের নাগালে ভাবতেই অজানা আবেশে দুলে উঠছে হৃদয়।আরিশা উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে চুড়িগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে বলল,
-‘মাই গড! পিপি;এগুলো তো কাশ্মীরি চুড়ি! দেখো কী নিখুঁত কাজ! একি! এখানে তো অনেকগুলো!
বলেই আরিশা ক্ষিপ্র হাতে চুড়িগুলো পৃথক করতে শুরু করল। বিছানায় একে একে সাজিয়ে রাখার সময় ও বিড়বিড়িয়ে গুনছে, এক, দুই, তিন…। তৃষার হৃৎপিণ্ডটা বক্ষপঞ্জরে অবাধ্য অশ্বের মতো ঘা মারছে। আরিশার গণনা শেষ হতেই ও রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল,
-‘ পিপি! গুনে দেখো, এখানে ঠিক ১৯ জোড়া চুড়ি আছে! বাট ১৯ জোড়া কেন? আচ্ছা তোমার ১৯তম জন্মদিন বলেই কি ১৯ জোড়া? ও পিপি, কে পাঠাল এটা?
তৃষার কর্ণকুহরে ১৯ সংখ্যাটা প্রতিধ্বনিত হতেই ওর দুচোখের কোণ ছাপিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। ১৯ বছর, ১৯ জোড়া মান অভিমানের সাক্ষী এই কাঁচের কারুকাজ। ও হুট করে খেয়াল করল, ঝকঝকে চুড়িগুলোর স্তূপের ঠিক মাঝখানে একটা নীলচে চিরকুট পড়ে আছে। আরিশা সেটা নেওয়ার আগেই তৃষা এক অদম্য ক্ষিপ্রতায় খামটি তুলে নিল।
খামটি খুলতেই বেরিয়ে এল এক টুকরো নীল কাগজ। অত্যন্ত পরিচিত, কাটাকাটা অথচ বলিষ্ঠ হস্তাক্ষরে সেখানে লেখা,
প্রিয় অভিমানী ম্যাম,
এত অভিমান কোথা থেকে আসে, হ্যাঁ? ভালোবাসি যে বুঝতে পারো না? যাই হোক জন্মদিনের শুভেচ্ছা ম্যাডাম। আপনার ফেসবুক পোস্ট দেখে বুঝেছি কাশ্মীরি চুড়ির উপর আপনার অবশেন একটু বেশিই। বাট টু বি অনেস্ট, আই অ্যাম ফিলিং জেলাস।আমার বউ আমি ব্যাতিত অন্য কিছুতে অবসেস্ট হবে কেন?
ইতি
আপনার ক্যাপ্টেন
চিরকুটটা হাতে ধরা অবস্থাতেই তৃষার নিশ্বাস যেন প্রগাঢ় অরণ্যের নিস্তব্ধতায় হারিয়ে গেল। আর্যর ভরাট কণ্ঠস্বর কাগজের প্রতিটি অক্ষরের ভাঁজ থেকে উঠে এসে ওর কানের কাছে ভ্রমরের মতো গুঞ্জন করছে। ওর বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘ এক মাসের তুষারশুভ্র অভিমান মুহূর্তেই আর্যর লেখনীর উত্তাপে গলতে শুরু করল। ঝাপসা চোখে ও অক্ষরের ওপর আঙুল বোলালো।
তৃষার নোনাজলে চিরকুটের নীল কালি কিঞ্চিৎ লেপ্টে যেতেই আরিশা সচকিত হয়ে উঠল। ও কৌতূহলের আতিশয্যে বাক্সের একদম তলায় লুকানো আরও একটি ক্ষুদ্র চিরকুট ছোঁ মেরে তুলে নিল। ওষ্ঠাধরে এক চিলতে দুষ্টুমি হাসি ফুটিয়ে ও উচ্চস্বরে পড়ে শোনাল,
“অভিমানী মেঘগুলো আজ দূরে কোথাও যাক,১৯ জোড়া চুড়ির রিনঝিন সুরে আমাদের গল্পটা পূর্ণতা পাক।”
তৃষা দ্রুত হাত বাড়িয়ে আরিশার কাছ থেকে দ্বিতীয় চিরকুটটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ততক্ষণে আরিশা এক লাফে বিছানার ওপাশে চলে গিয়েছে। আরিশা চিরকুটটি উঁচিয়ে ধরে টিপ্পনী কেটে বলল,
-‘ ওরে বাবা! আমার পিপি তো দেখছি আস্ত একখানা প্রেমের আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছে! ‘প্রিয় অভিমানী ম্যাম’কী রোমান্টিক বাপ্রে! তা আমার ফুপ্পা তো দেখি সেই; একদম রোমান্টিকতায় ডক্টরেট করা!
তৃষার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই আরক্তিম বর্ণ ধারণ করল। ও ভেজা চোখেও কিঞ্চিৎ কৃত্রিম রাগ ফুটিয়ে বালিশ ছুড়ে মারল আরিশার দিকে,
-‘ আরু! একদম ইয়ার্কি করবি না বলছি। দে ওটা আমাকে, আর তুই ঘর থেকে বের হ তো দুদিন বাদে না তোর এসএসসি যা পড়তে বস!
আরিশা এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। ও খাটের কোণে বসে দুলতে দুলতে বলল,
-‘ যাব, যাব। কিন্তু পিপি, চুড়িগুলো একবার হাতে পরে দেখো না! ১৯ জোড়া কাশ্মীরি চুড়ি, উফ! আমার তো ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
-‘ আরু!
তৃষার বিরক্তি মিশ্রিত গর্জনে আরিশা এবার মুখ কুঁচকে বলল,
-‘ হ্যাঁ হ্যাঁ যাচ্ছি। যত্ত ঢং! একবার শুধু বিয়েটা হতে দাও। আমারও আসবে পার্সেল!
বলেই চিরকুটটা বিছানায় রেখে মুখ ভেঙ্গিয়ে কক্ষ ত্যাগ করলো ও। তৃষা একঝলক সেদিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই দৃষ্টি ঘোরালো; তড়িৎ বেগে চিরকুটটা হাতে নিয়েই পুনর্বার লেখা গুলো পড়ল। ডাগর নেত্র ভিজে উঠলো ওর। লোকটা এমন কেনো? দূরে সরিয়ে দিতে চাইলে দ্বিগুণ মায়ায় জড়িয়ে নিয়ে দশগুণ কষ্ট বৃদ্ধি করে কেনো?তৃষা তাচ্ছিল্যের সহিত হাসলো,
-‘ ভালোবাসেন আমায়?আদতে ভালোবাসেন তো? তাহলে সেটা চিরকুট অবধি সীমাবদ্ধ রাখলেন কেন?কেন নিজে একটিবার এলেন না?
উন্মাতাল বর্ষণ ক্রমে স্তিমিত হয়ে এসেছে। টিনের চালে বৃষ্টির অবাধ্য নূপুর নিক্কন এখন কেবলই টুপটাপ জলপতনের ক্লান্ত শব্দে রূপান্তরিত। জানলার কাঁচের ওপারে জমে থাকা জলবিন্দুগুলোর মতোই স্থির হয়ে বসে ছিল তৃষা। সহসা কক্ষের নিস্তব্ধতা চিরে এক জোড়া বলিষ্ঠ অথচ কম্পিত হাতের স্পর্শ অনুভূত হলো ওর মাথায়। মমতাভরা চিরপরিচিত পরশে ও ধীরলয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল বড় ভাই তৌফিক নেওয়াজ দাঁড়িয়ে আছেন।
রোগব্যাধিতে মানুষটার সেই চওড়া কাঁধ কিছুটা নুইয়ে পড়েছে, ফর্সা মুখশ্রীতে অসুস্থতার কালচে ছায়া স্পষ্ট, তবুও দু-চোখে উপচে পড়ছে বোনের জন্য এক সমুদ্র সমান স্নেহ।তৃষা চট করে জানলার কার্নিশ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ব্যাকুল কণ্ঠে শুধাল,
-‘ ভাইয়া! তুমি এই অবস্থায় উপরে এলে কেন? আমিই তো নিচে যেতে পারতাম। শরীরটা কি খুব খারাপ লাগছে?
তৌফিক সাহেব এক চিলতে ম্লান হাসলেন। বোনের দু-গালে হাত রেখে কপালে ছোট্ট চুমু খেয়ে খুব নরম গলায় বললেন,
-‘ বোনটার আজ জন্মদিন, আর ভাই একতলায় বসে থাকবে? তোর ভাই এতটাও অকেজো হয়ে যাইনি রে বুনডি।
তৃষা এক চিলতে হাসলো; তৌফিক নেওয়াজ এবার প্রশ্ন করে বললেন,
-‘ মন খারাপ তোর বুনডি?
তৃষা মৃদু ঢোক গিলল, ভাইয়ের চোখে চোখ না রেখেই মিথ্যার আশ্রয় নিল,-‘ কই নাতো।
বোনের মিথ্যাচার মুহূর্তেই ধরে ফেললেন তৌফিক নেওয়াজ,-‘ ভাই হই তোর। মিথ্যে কথা বলিস না আমার সামনে যখন জানিস-ই তুই সেটা পারিস না।
তৃষা ঈষৎ শঙ্কিত হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকালো,তৌফিক নেওয়াজ আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই দরজার চৌকাঠে ছায়া পড়ল শায়লা বেগমের। হাতে খাবারের থালা, চোখেমুখে একরাশ প্রশান্তি। উনি কক্ষের গুমোট ভাবটা হালকা করার জন্য কিঞ্চিৎ কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে বললেন,
-‘ কী ব্যাপার? ভাই-বোনের কি আজ না খেয়েই দিন কাটানোর ইচ্ছে? নিচে আম্মা(শায়লা বেগমের মা) সিন্নি রেঁধেছেন, আর আজ তোর প্রিয় সব রান্না হয়েছে তৃষা। চটপট হাত মুখ ধুয়ে আয় তো দুজনে। আর আরিয়ানের আব্বু, তুমি ওকে বেশি কথা বলে ভুলিও না, ওকে নিচে নিয়ে এসো।
তৌফিক সাহেব হেসে বোনের হাত ধরলেন,
-‘ চল পাগলী, আজ কোনো মন খারাপ না। নিচে সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে। অন্তত এই শুভ দিনটার সম্মানে একবার হাস দেখি?
তৃষা ভাইয়ের দিকে চেয়ে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে তুলল। বিছানার সেই চুড়িগুলোর ওপর শেষবার হাত বুলিয়ে ও ভাইয়ার হাত ধরে নিচে নামল।
অলস অপরাহ্ন;মেঘের ঘনঘটা পুরোপুরি কেটে না গেলেও আকাশের এক কোণে এক ফালি ম্লান রোদ্দুর উঁকি দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। গ্রামের মেঠো পথটি সিক্ত কাদা আর বৃষ্টির জলে একাকার। দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাল আর সুপুরি গাছগুলোর পাতা থেকে বৃষ্টির অবশিষ্টাংশ তখনো টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে।
গ্রামের দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে বয়ে চলা নদীটির নাম চিত্রা। শ্রাবণের ঢলে নদীটি এখন কূল ছাপিয়ে যৌবনবতী হয়ে উঠেছে। নদীর ঘাটের শ্যাওলা ধরা সিঁড়িগুলো বৃষ্টির ছোঁয়ায় আরও পিচ্ছিল হয়ে আছে;ঘাটের বাঁধানো চাতালে বসে আজ আড্ডা জমিয়েছে আরিশা, সিয়া, ওহী আর তৃষা। তৃষাকে এক প্রকার জোর জবরদস্তিতে টেনে হিঁচড়ে এখানে এনেছে ওরা তিনটিতে।
একের পর এক বাকবাহুল্যতার জেরে সেখানে টেকা দায় অথচ এত কিছুর মাঝেও তৃষা কোনো উত্তর না দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ নিস্তব্ধতা চিরে মেঠো পথ দিয়ে কারো দ্রুতবেগে হেঁটে আসার শব্দ পাওয়া গেল। বৃষ্টির জমে থাকা জলে কারো পদধ্বনির ঝপাঝপ শব্দ হতেই চারজনেই সচকিত হয়ে ফিরে তাকাল।
ঘাটের ঢালে হুট করে উদয় হলো আরিয়ান;অসময়ে ওকে দেখে সবাই কিঞ্চিৎ অবাক হলো, আরিশা প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি মেলে কিছু বলতে যাবে তার ঠিক পূর্বমুহূর্তেই ওদের কর্ণগোচর হলো অপর প্রান্ত হতে ভেসে আসা গ্রাম্য শোরগোল। সকলে একযোগে তাকালো সেদিকে। তৃষা নিজেও ভ্রু কুঞ্জনপুর্বক একঝলক চাইলো। সঙ্গে সঙ্গে ওর দৃষ্টি আটলো সেখানে।
কোনরূপ পূর্বাভাস ছাড়াই ও দ্রুত পদে এগিয়ে গেলো সেদিকে।পিছে অবাক দৃষ্টি নিক্ষেপপূর্বক সকলে একসঙ্গে প্রশ্ন করে বলল,,
-‘ কই যাস তৃষা?
তৃষা উত্তর না দেওয়ায় ওরাও পিছু ছুটলো ওর।
ভিড়ভাট্টা সরিয়ে এগিতেই তৃষা থ’ মেরে দাঁড়ালো।যা ভেবেছিল ঠিক তাই। শ্বেতশুভ্র গাড়িটা কর্দমাক্ত;তার পাশেই নাক মুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে অফ হোয়াইট সাটিন শার্ট পরিহিত সুঠামদেহী আর্য এহসান। আর্যকে দেখে মুহূর্ত কয়েক স্থবির হয়ে পড়েলো তৃষা। সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।
পরক্ষনেই পাশ থেকে ভেসে আসা প্রৌঢ় কন্ঠে ধ্যান ছুটলো ওর,
-‘ আরে এই গেরামে এতো বড় মাইকোরো! তা বাজান ক্যাডা তুমি? কার বাড়িতে আইছো?
আর্য তখনো ভীড়ের মাঝে থাকা তৃষাকে দেখেনি।ও গম্ভীর স্বরে বলল,,
-‘ মাই সেল্ফ আর্য এহসান।
পাশ থেকে এক বৃদ্ধা বললেন,-‘ ইংরিজি তো ভালোই কইতাছো।আমরা মুখখুশুখখু মানু।অতো ইংরিজি আহে না। তা তুমি কার বাড়িতে আইছো বাছা?
-‘ নেওয়াজ বাড়িটা কোন দিকে?
-‘ তাতো গেরামের শেষ মাথায়।তা তুমি ওদের কে হও?
আর্য অনড় অবস্থানে নিজের পরিচয় দিতে উদ্যত হতেই পাশ থেকে একজন তৃষার উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে বলল,,
-‘ কি রে তৃষা তোগোর আত্মীয় নি?
বলতে দেরি, সকলের দৃষ্টি একযোগে ওর দিকে নিবদ্ধ হলো। আর্য র গাড়ি দুর থেকে দেখেই চিনে ফেলার দরুন এখানে এসেছিল তৃষা।তবে আশঙ্কা সত্যি হয়ে এতো বড় বিপাকে পড়বে সেটা হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি ও।
ভিড়ের আড়াল হতে তৃষার অবয়ব স্পষ্ট হতেই আর্যর তপ্ত দৃষ্টির সাথে তার কম্পিত আঁখিপল্লব একাকার হয়ে গেল। সেই নিস্তব্ধ মুহূর্ত চূর্ণ করে ছোট্ট টুইংকেল তিরের মতো ছুটে এসে তৃষার পা দুটোকে পরম মমতায় জাপটে ধরল। আধো-আধো স্বরে বলল,
-‘ বানি!
তৃষা কম্পিত হস্তে টুইংকেলের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে ললাটে চুমু খেল, আর্য নির্নিমেষ চেয়ে রয়েছে তৃষার দিকে। তার তৃষ্ণার্ত নেত্রযুগল যেন দীর্ঘ পাঁচ মাসের মরু-দহন শেষে এক পশলা সুশীতল বৃষ্টির দেখা পেয়েছে।
আশপাশের উৎসুক জনতার গ্রামীন কানাঘুষা গুঞ্জন তখন আরও তীব্রতর হয়ে উঠেছে।সেই প্রৌঢ় লোকটা ফের গলা খাঁকারি দিয়ে শুধালেন,
-‘ কিরে তৃষা? বাছারে চিনিস? মুখ দিয়ে তো কথা সরে না দেহি! কারে নিয়া আইলি এই মেঘ-কাদায়?
তৃষা কোনোমতে নিজের কণ্ঠস্বর গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তার আগেই আর্য গ্রাম্য স্তব্ধতা চূর্ণ করে স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
-‘ আই অ্যাম হার হাজবেন্ড, আর্য এহসান। অ্যান্ড শ্যি ইজ্য মিসেস এহসান।
মুহূর্তেই ভিড়ের মাঝে এক তীব্র গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। গ্রামের মহিলারা ঘোমটা টেনে উঁকিঝুঁকি দিতে লাগল। কেউ একজন বলে উঠল,
-‘ ওমা! তৃষার জামাই দেহি আস্ত সিনেমার নায়ক! এতো বড় অফিসার!
তৃষার বান্ধবী সিয়া আর ওহী তখন স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে। আরিশা ফিসফিস করে বলল,,
-‘ পিপি! ফুপ্পা তো জাস্ট আগুন! এতো হ্যান্ডসাম! ওনার ছবি তো তুমি দেখাওই নি!
তৃষা লজ্জা বিরক্তির মিশেলে আরক্তিম হয়ে উঠল। লোকটা কি একটুও কাণ্ডজ্ঞান নেই? এভাবে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের ঢাক ঢোল পিটিয়ে পরিচয় দেওয়ার মানে কী? ও টুইংকেলের হাতটা শক্ত করে ধরে কোনো কথা না বলে উল্টো দিকে হাঁটা দিল। আর্যর ওপর জমাটবদ্ধ অভিমানটা মাহেরিন-কাণ্ডের পর যে পাহাড়সম হয়ে আছে, তা স্রেফ এক দেখায় গলে যাওয়ার নয়।
তৃষাকে হনহন করে চলে যেতে দেখে আর্য এক মুহূর্তের জন্য থমকাল, তারপর এক চিলতে বাঁকা হাসি ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে চিৎকার করে বলল,
-‘ মিসেস আর্য এহসান! জামাইকে রেখে কই যান?আরে শুনুন না।এই যে দেমাগওয়ালী ম্যাডাম।
তৃষা আর এক মুহূর্ত দন্ডায়মান রইল না। সকলের সম্মুখে আর্য এমন নির্লজ্জ সম্বোধনে মেজাজ সপ্তমে চড়েছে ওর। টুইংকেল কে সঙ্গে নিয়েই ধুপধাপ ফেলে সেখান থেকে প্রস্থান করল তৃষা। দেখে ওর প্রস্থান পথের দিকে চেয়ে এক চিলতে কৌতুকী হাসলো আর্য। ঠিক তখনই এগিয়ে এলো সিয়া আর ওহী, ওদের মধ্য থেকে সিয়া বলল,,
-‘ দুলাভাই আপনি আমাদের সঙ্গে চলুন। পথ তো চেনেন না।
আজ ওদের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যমূলক হাসলো,-‘ নো,ন্যিড।
সরাসরি আর্যর এহেন প্রত্যাখ্যানে অপ্রস্তুত হয়ে উঠলো ওরা। ঠিক তখনই আরিশা এগিয়ে এসে বলল,
-‘ ফু-ফুপ্পা!আমি আরিশা।
আর্য এক ঝলক আরিশার পানে চাইল। আগে কখনো দেখা না হলেও তৃষার মুখে বহুবার মেয়েটির কথা শুনেছে ও, তাই চিনতে খুব বেশি সমস্যা হলো না।
-‘ আরু?
আরিশা প্রফুল্লচিত্তে সম্মতির সূচক মাথা ঝাঁকালো,-‘চলুন ফুপ্পা মেঘ করেছে বৃষ্টি নামবে বাড়ি যেতে হবে তো দূর আছে বেশ।
আর্যর এক চিলতে হাসলো আরিশার সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তুতির পূর্ব মুহূর্তে আরিয়ানের দিকে তাকালো। ইতিপূর্বে ভিডিও কলেই ওর পরিচয় হয়েছিল আর্য, তাই চিনতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হলো না। আর্য আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল,
-‘ আরিয়ান? তোমার পিপি তো দেখছি ঝড়ের গতিতে পালাল, তারপর তোমাদের রাস্তাটা ও কাদা পানিতে একাকার হয়ে আছে গাড়ি যাবে না। আমাকে একটু হেল্প করবে?
আরিয়ান সহাস্যে মাথা নাড়ল,
-‘ জ্বি ফুপ্পা?
আর্য ড্রাইভারকে ইশারা করে আরিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-‘ আরিয়ান, শোনো। আমি তো এখানকার কাউকেই চিনি না তুমি কিছু ছেলে ধরে গাড়ির পেছনের সিটে আর ডিকিতে থাকা সব পার্সেল আর গিফটগুলো নিয়ে এসো তো। ডিকিটা একটু সাবধানে খুলো, ওখানে বেশ কিছু ডেলিকেট জিনিস আছে। আমি আরুর সাথে এগোচ্ছি, তোমরা মালামালগুলো নিয়ে সাবধানে বাড়িতে আসো। তোমার কিছু করা লাগবে না জাস্ট কিছু ছেলে দেখে এগুলো আনার ব্যবস্থা করো, আমি পেমেন্ট করব।
আরিয়ান সম্মতি সূচক মাথা ঝাকাতেই, আর্য আরিশার সঙ্গে নেওয়াজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
নতুন জামাইয়ের আকস্মিক আগমনের খবর কানে আসতেই নেওয়াজ বাড়ির পরিবেশ মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হলো।উঠানের এক কোণে মোড়ায় বসে শায়লা বেগমের বৃদ্ধা মা এবং গ্রামের কয়েকজন মুরুব্বি নারী গল্প গুজবে লিপ্ত ছিলেন,তাঁরা মুহূর্তেই তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালেন। শায়লা বেগম হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটতে ছুটতে চিৎকার করে উঠলেন,
-‘ ও ভাবি! মেজো খালা! কই তোমরা সব? আরে জামাই আইতাছে! ও কপাল!
রান্নাঘর থেকে শায়লা বেগমের ভাইয়ের বউ এবং মেজো ভাইয়ের মেয়েরা মাথায় ঘোমটা টেনে উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করল। সারা বাড়িতে তখন থালাবাসনের ঝনঝনানি আর ছোটাছুটির ধুম পড়েছে। শায়লা বেগমের ভাইয়ের বউ রিনা বেগম এক হাতে খুন্তি আর অন্য হাতে ওড়না সামলাতে সামলাতে বললেন,
-‘ ও খুদা! শিগগিরি রান্না চাপা শায়লা। মাবুদ না বলে কয়ে!
এদিকে অন্দরমহলের শোরগোলে বেশ বিরক্ত তৃষা ও টুইংকেলের চুল ঠিক করে দিতে দিতে মনে মনে গজগজ করছে,
‘এত আদিখ্যেতার কী আছে? লোকটা কি ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী যে সবাই এভাবে নাওয়া-খাওয়া ভুলে তড়পাচ্ছে?’
ঠিক তখনই শায়লা বেগমের মেজো খালা,তৃষার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে বললেন,
-‘ ওরে ও কুলটা মাইয়া! জামাইরে ওই কাদা-পানিতে ফ্যালাইয়া তুই একলা একলা ঘরে আইসা বইসা রইলি? তোর কি একটু আক্কেল-বুদ্ধি নাই? শহরের পড়ালেখা পইড়া কি সব গুইলা খাইছিস?
তৃষা ফুঁসে উঠে কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই উঠানে মানুষের গুঞ্জন মুহূর্তেই স্তিমিত হয়ে।ইফরা এগিয়ে এসে বলল,,
-‘ আঙ্কেল আইছে আন্টি।
মুরুব্বী মহিলাটি আর কথা বাড়ালেন না। বেরিয়ে গেলেন নতুন জামাইয়ের আপ্যায়নের উদ্দেশ্যে।
-‘ ওমাগো আমাগো জামাই দেহি কুতুবের ধন।
আর্যর আনা উপহারের প্রেক্ষিতে এমনি মন্তব্য করলো উপস্থিত একজন বৃদ্ধা। আরিয়ানের পিছু পিছুএকে একে দশ-বারো জন গ্রাম্য যুবক বিশাল সব কার্টন আর রঙচঙে শপিং ব্যাগ হাতে অন্দরে প্রবেশ করতে দেখে বিস্ময়ে চক্ষু চড়ক গাছ সকলের। সাধারণত গ্রাম বাংলায় জামাইয়ের আগমনে এত উপহার আনার ইতিহাস বিরল।
এদিকে ওনাদের এমন কথায় অপ্রস্তুত হয়ে উঠল আর্য, মনকোণে শঙ্কা জন্মালো,আদেও উপহারগুলো কারো পছন্দ হবে কিনা? এমনিতেই প্রথমবার এসেছে তার ওপর আরিয়ানের কাছ থেকে যতটা বর্ণনা পেয়েছে সেই অনুযায়ী সকলের জন্য উপহার আনার চেষ্টা করেছে ও। ও শঙ্কিত কন্ঠে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই শায়লা বেগম এগিয়ে এসে বললেন,
-‘ কি করেছো কি ভাই? এত এত উপহার কেউ আনে?
আর্য সৌজন্যমূলক হেসে সকলকে একে একে উপহার বুঝিয়ে দিলো। তবে তার মাঝেই কৌশলে আড়াল ইশারায় আরিয়ানকে গোপন ইঙ্গিত দিতেই আরিয়ান বিশেষ উপহারের কার্টুনগুলো বগলদাবা করে উপরে উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো।
নৈশভোজের সমাপনান্তে নেওয়াজ বাড়ির প্রাঙ্গণ নিস্তব্ধ। বৃষ্টির উন্মাদনা এখন শ্রান্ত, কেবল পত্রপল্লব হতে চুঁইয়ে পড়া জলবিন্দুর মৃদু শব্দই চরাচরে বিদ্যমান। তৃষা শয়নকক্ষে টুইংকেলের মাথায় হাত বুলিয়ে গল্পে মত্ত। টুইংকেল হঠাৎ ওর ওড়নার আঁচল নিয়ে খেলতে খেলতে প্রশ্নাত্নক দৃষ্টি মেলে শুধালো,
-‘ একটি কোশ্চেন করি বানি?
-‘ হুম সুইটহার্ট।
-‘ তুমি সেদিন আমাকে রেখে চলে এসেছিলে কেন? মিস করোনি আমাকে?
টুইংকেলের এই নিষ্পাপ প্রশ্নটায় তৃষার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। বিগত এক মাসের বিষাদ স্মৃতি পুনর্বার হৃদয়ে আঘাত হানল। ও কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল, অতঃপর কিছু একটা বলতে উদ্ধত হতেই ওরে দৃষ্টিগোচর হলো দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুঠামদেহী পুরুষটাকে।
অফ হোয়াইট শার্টের হাতাগুলো কনুই অবধি গোটানো আর্যর, যার দরুন ভাসমান শিরাযুক্ত হাতগুলো স্পষ্ট ফুলে উঠেছে,প্রশস্ত ললাটে অবাধ্য কয়েকগাছি চুল এসে লুটোপুটি খাচ্ছে অথচ সেদিকে কোনো হেলদোল নেই ওর। ওর গভীর, তপ্ত নেত্রযুগল অপলক তৃষার দিকে নিবন্ধ; যেন বহু যুগের তৃষ্ণা নিয়ে সে আজ তার প্রেয়সীকে দেখছে।
তৃষা আর্যকে দেখেই চকিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আর্য ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। ওকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখেই তৃষা টুইংকেলকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করল, ততক্ষণাৎ আর্য বিদ্যুৎবেগে ওর পেছনে গিয়ে এক হাতে তৃষার কবজিটা শক্ত করে আটকে ধরল। অজানা শিহরণে কম্পিত হলো তৃষার ক্ষীন কায়া।ও হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ প্রচেষ্টায় ছটফট করত করতে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-‘ হাত ছাড়ুন!অসভ্যতা কেন করছেন?
আর্য ওর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে, তৃষাকে একপ্রকার অগ্রাহ্য করেই নিষ্পাপ টুইংকেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৮
-‘ মাম্মাম,নিচে যাও তো। মামাই ডাকছে তোমায়।
মামাইয়ের নাম শুনেই টুইংকেল চট করে বিছানা থেকে নেমে দৌড়ে কক্ষ ত্যাগ করল। ও বেরিয়ে যেতেই তৃষা আর্যর দিকে অগ্নীশর্মা হয়ে তাকাল। ওর দু-চোখ দিয়ে যেন আক্ষরিক অর্থেই আগুন ঝরছে। ও বেশ চিৎকার করে বলল,,
-‘আমাকে যেতে দিলেন না কেন? হাত ছাড়ুন বলছি!
আর্য এবার কোনো কথা না বলে আচমকা এক ঝটকায় তৃষাকে নিজের একদম কাছাকাছি টেনে আনল। ওদের মাঝখানের দূরত্ব এখন যৎসামান্য। তৃষার তপ্ত নিঃশ্বাস আর্যর গলায় আছড়ে পড়ছে। আর্য ওর কানের কাছে মুখ নামিয়ে ভরাট কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
-‘ আজ রাতে আপনার নিস্তার নেই ম্যাডাম বিগত পাঁচ মাসের শূন্যতা আর গত তিরিশটা দিনের টর্চারের ফাইনাল সেটেলমেন্ট হবে আজ। এই রাতেই সবকিছুর কড়ায়-গণ্ডায় উসুল বুঝে নেব। সো, পালানোর চেষ্টা করে এনার্জি লস করবেন না লাভ হবে না।

Next part apu plz