Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩৩

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩৩

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩৩
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

কালের চক্রাকারে ক্যালেন্ডারের পাতা হতে মুছে গেল পুরো একটি মাস। আজকে সেই মাসের অর্থাৎ রমাদানের শেষ দিন। এই রমজান মাসটা একটু বেশিই বিশেষ ছিল মির্জা পরিবারে কাছে। কেননা এ বছর রমজানে গুনে গুনে ত্রিশটা রোজাই রেখেছে বাড়ির সবচেয়ে ছন্নছাড়া, অবাধ্য ও বখাটে ছেলে কৃশান মির্জা। প্রথম দু’একটা রোজা তার কষ্ট হলেও বাকিগুলো বেশ স্বাভাবিক ভাবেই চলে গেছে। এমনকি এই রমজানের উছিলায় নিজের সকল বদ অভ্যাস থেকেও বিরত থেকেছে সে। দিনের বেলা বন্ধুদের সাথে আড্ডায় যোগ হলেও রাতে ইফতার শেষে আর আড্ডায় যাওয়া হয়ে উঠেনি তার। হাতে গণা দু’ একদিন রাতে বাইরে গিয়েছে তাও কোনো জরুরি কাজ পড়লে। নয়তো বাকি সময় রুমেই শুয়ে বসে কাটিয়েছে।

তবে আজকের দিনটায় একটু ভিন্নতা এসেছে, সেই যে সকালে দশটার দিকে ঘর থেকে বেরিয়েছে কৃশান- দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে অথচ এখনো বাড়ি ফেরার নাম নেই তার। মানুষটার অনুপস্থিতিতে বিছানায় মিঠুকে নিয়ে বসে আছে হুমায়রা। নিজের মতো প্রাণীটির সাথে সময় কাটাচ্ছিল ঠিক তখনি রুমে এলেন ইয়াসমিন বেগম। চোখ তুলে সেদিকে চাইল। ইয়াসমিন বেগমের হাতে স্থান পেয়েছে একটা মাঝারি সাইজের গিফ্ট বক্স। সেটা হাতে নিয়ে হুমায়রার নিকট এগিয়ে এলেন তিনি। সামনে এসে প্যাকেট টা হুমায়রার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
“ নাও তোমার পার্সেল! ”
‘তোমার পার্সেল’ কথাটা কর্নপাত হতেই ভ্রু জোড়া বেঁকে গেলো মেয়েটার। সন্দিহান চোখে একবার পার্সেল টার দিক তাকিয়ে বলল,
“ আমি তো কোনো পার্সেল অর্ডার করিনি আম্মু! ”

“ এখানে তোমারই নাম। তুমি করোনি হয়তো কৃশান করেছে। নাও রাখো এটা আমি নিচে যাচ্ছি। ”
বলেই কক্ষ ত্যাগ করলেন তিনি। এইদিকে পার্সেল টা হাতে নিয়ে অনড় হয়ে বসে রইল হুমায়রা। মাথায় ঘুরতে লাগল হাজারও প্রশ্ন- কৃশান অর্ডার করবে তার জন্যে? তাও আবার না জানিয়ে? নাকি অন্য কারোর টা ভুলে তার কাছে চলে এলো! মেয়েটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেটা দেখতে লাগল। তখনি চোখে পড়ল একটা ছোট্ট চিরকুট। অর্ডারকারির সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার আশায় মনে হাজার দ্বিধাদ্বন্দ থাকতেও সেটার ভাঁজ খুলে চোখের সামনে মেলে ধরল, দৃষ্টিগোচর হলো কারো অগুছালো হাতে লিখা গুটি গুটি অক্ষররের কিছু মনোমুগ্ধকর বাক্য-
এক অসংজ্ঞায়িত রমণী,
প্রিয় কিংবা অপ্রিয়, সুখ কিংবা দুঃখ, ভালোবাসা কিংবা বিরক্তি- সবকিছু মিলিয়ে তুইময় এক অন্যরকম আসক্তি..!!!
যেই আসক্তির মায়াজাল থেকে আমি ছাড়া পেতে গিয়ে আরও গভীর ভাবে আটকে পড়েছি। না আসক্তি ছাড়তে পেরেছি, না নিজেকে সামলাতে পেরেছি- সবশেষে আমার আমিটা তোর মাঝেই মরতে বসেছি। যার দরুণ আমার মরণ কাঠি হিসেবে এই উপহার খানা আজ তোর হাতে তুলে দিয়েছি।
“-শাড়ির প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে তুমি সাজিয়ে নিও তোমায়
এই আমিটা বড্ডো বেসামাল হয়ে পড়লে একটু সামলে নিও আমায়-”

ইতি
প্রিয়ার প্রিয়তম পুরুষ
স্তব্ধ হলো হুমায়রা, অপলক নেত্রে তাকিয়ে রইল চিরকুট টির পানে। না শুরুতে কোনো সম্বোধন, না শেষে কোনো পরিচয়! প্রথমে তুই, শেষটা ফের তুমিময়- এ কেমন তাজ্জব চিরকুট দাতা! মনে হচ্ছে তার অনুভূতি গুলো যেন সে নিজেই এখনো বুঝতে পারছে না। বেনামী অনুভূতির ভিড়ে সে নিজেই যেন অগুছালো হয়ে পড়েছে।
কিছুক্ষন বস্তুটি নিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে রইল মেয়েটা। পরপর সিদ্ধান্ত নিল কৃশান না আসা অব্দি খুলবে না। আগে জেনে নিবে যে, এটা আসলেই তার কিনা। পার্সেল এর প্যাকেটিং খুলল না সে। ওভাবেই ওয়ারড্রপ এর উপরে নিয়ে সেটা রেখে দিল।

সন্ধ্যার একটু আগে বাসায় ফিরল কৃশান। হুমায়রা তখন রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত। শূন্য কক্ষে প্রবেশ করা মাত্রই তার চোখ গেলো ওয়ারড্রপের উপরে থাকা বস্তুটির দিকে। এগিয়ে এসে জিনিসটাকে সম্পূর্ণ প্যাকেটিং অবস্থাতেই দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল ছেলেটার। অতিষ্ট কণ্ঠে বলল,
“ হুজুরনী তো হুজুরনীই জানতাম এমনটাই করবে! ”
“ এটা কি আপনি অর্ডার করেছেন? ”
মাত্রই রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে নিচ্ছিল কৃশান। তখনি পিছন থেকে ভেসে আসলো কাঙ্ক্ষিত রমণীর স্বর। কৃশানকে দেখা মাত্রই কাজ ফেলে রুমে ছুটে এসেছে হুমায়রা। মেয়েটার হাতে তখনো বেসন লেগে আছে, চেহারায় বিদ্যমান ঘামের বিন্দু বিন্দু ফোটা। ওভাবেই মানুষটার দিক কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে এলো। ফের কৌতূহলী স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ এটা আপনি অর্ডার করেছেন? ”
“ আমি কেন তোর জন্য শাড়ি অর্ডার দিতে যাবো? ”
কৃশানের উত্তর শুনে কৌতূহলী মুখটা মুহূর্তেই নিভে গেল মেয়েটার। পরক্ষনেই কিছু একটা মনে পড়তে কপাল কুঁচকে বলল,

“ আপনি কিভাবে জানলেন এটার ভিতরে শাড়ি আছে? ”
থতমত খেয়ে গেল বেচারা! তৎক্ষনাৎ কথা ঘুরাতে বলল,
“ চিরকুটে পড়েছিলাম। ”
“ ওহ, আচ্ছা তাহলে একটা কাজ করি- এটা আম্মুর কাছে দিয়ে আসি কেউ সাহায্য চাইতে আসলে দিয়ে দিতে বলবো। ”
“ মানে! ”
চমকানো স্বর কৃশানের। কিছুটা ভরকে গেল মেয়েটা। নিজেকে ধাতস্থ করে উত্তর করল,
“ আমিতো জানিনা এটা কার তরফ থেকে এসেছে। না জেনে এটা কিভাবে গ্রহণ করবো আমি? কে না কে অর্ডার দিয়েছে! ”
“ কে না কে অর্ডার দিয়েছে সেটা জেনে তোর লাভ কি! তোর জন্য এসেছে এটাই প্রধান বিষয়। তোকে এতকিছু ভাবতে বলেছে কে? ”

“ তাই বলে আমি না জেনে না শুনে যার তার দেওয়া কাপড় পড়ে নিবো? ”
“ হুম পড়বি! শুধু পড়বিই না বরং বছরের সবচেয়ে সুন্দরতম দিনটা আগামীকাল তুই এটা পড়েই কাটাবি! ”
চোখ ছোট ছোট হয়ে গেল মেয়েটার। অবাক কণ্ঠে বলল,
“ আপনি কি চিরকুট পড়ে বুঝতে পারেননি এটা কোনো পুরুষের তরফ হতে এসেছে। আর আপনি বলছেন এটা আমি পড়তে? তাও আবার ঈদের দিনে! ”
“ হুম বলছি, আর আমি বলেছি মানে তুই সেটা শুনতে বাধ্য। ”
“ যদি উপহার টা আপনি দিতেন তাহলে একদিন না বরং প্রতিদিনই শাড়িটা পড়তে আপত্তি ছিল না আমার। কিন্তু এটা তো অন্য কারোর তাহলে এমন কেন করছেন আপনি? ”
“ ধরে নে, আমিই দিয়েছি। ”

মনে মনে অনেককিছু আন্দাজ করতে পারলেও সেটা প্রকাশ করল না হুমায়রা। উল্টো লাপাত্তা ভাবে বলল,
“ ধরে, মনে করে অঙ্কের সমাধান হয়। বাস্তব জীবনে এসব দিয়ে কিচ্ছু হয়না। ”
বলতে দেরি অথচ মেয়েটাকে নিজের আয়ত্ত্বে আনতে দেরি হলো না কৃশানের। হুমায়রার এক হাত উল্টো করে পিঠ পিছে আটকে ধরল সে। শক্ত কণ্ঠে বলল,
“ বড্ডো বেড়ে গেছিস না? ঐ বরং এর পরের লাইনগুলো যে এখনো সম্পন্ন করিসনি মনে আছে? ধরলে সবকিছুর উসুল একসাথে করে ছাড়বো বলে দিলাম। ”
এবেলায় এসে চুপসে গেল হুমায়রা। সেদিন রাতে কৃশান যখন বলেছিল- তোর কচুর কথা আর বলা লাগবে না। তারপর থেকে এ বিষয়ে আর কখনোই কথা উঠেনি। সে তো ভেবেছিল মানুষটা হয়তো কবেই ভুলে গেছে ওসব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বাকিটুকু সম্পূর্ণ না করা অব্দি তিনি কখনোই ভুলবেন না সে কথা। মেয়েটা প্রসঙ্গ পাল্টে বলতে নিল,

“ রোজা রেখে বউকে মারা কিন্তু……”
পথিমধ্যেই তাকে থামিয়ে দিল একটা গম্ভীর স্বর,
“ তোকে মারছি আমি? ”
নিরুত্তর রইল হুমায়রা। বলার মতো কিছু না পেয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালাল। ওমনিই হাতে জোর প্রয়োগ করে তাকে একেবারে সন্নিকটে নিয়ে এলো কৃশান। কিছুটা ঝুঁকে অদ্ভুত স্বরে বলল,
“ রোজা রেখে বউকে মারা যায় না তাহলে কি করতে হয় হুম? ভালোবাসতে হয়? ”
কাঙ্ক্ষিত পুরুষটির এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আচরনে হতবিহ্বল হয়ে গেল মেয়েটা। হৃদয়ে সৃষ্টি হলো অবাধ্য তোলপাড়। জবান লুপ পেল আপনা আপনিই। এলোমেলো দৃষ্টি লুকাতে মাথা নিচু করে নিল। ফের কর্ণকুহরে পৌঁছাল সেই কণ্ঠ,
“ বল, বাসবো ভালো? ”
“ ছ..ছাড়ুন, রান্নাঘরে সবকিছু পুড়ে যাচ্ছে। ”
“ আর এইদিকে যে সকল নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পুরো আস্ত একটা মানুষকে দিনদিন পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিচ্ছিস তার বেলা! ”
আপনমনে কথাটুকু বিড়বিড় করে হুমায়রাকে ছেড়ে দিল কৃশান। সাথে সাথেই ত্রস্ত পায়ে কক্ষ ত্যাগ করল হুমায়রা। বাইরে এসে কয়েকদফা বড় বড় শ্বাস টেনে নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করল। পরপর হাঁটা দিল রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে।

রুমের মধ্যে মলিন মুখে বসে আছে ইকরা। ইফতারের পর মায়ের নাম্বারে ভিডিও কল করেছিল সে। বরাবরের মতোই সালাম চুকে খবরাবর জিজ্ঞেস করেছে। তারপর চাঁদ রাত মোবারক জানিয়ে আরও বিভিন্ন কথা বলেছে এবং প্রিয় সখির সাথেও কথা বলেছে। তবে এতে মন ভালো হওয়ার পরিবর্তে আরও খারাপ হয়ে বসে আছে। এই প্রথম মা- বাবাদের ছাড়া ঈদ কাটাবে মেয়েটা- ভাবলেই কেমন খারাপ লাগা কাজ করছে।
তবে খারাপ লাগার উর্ধ্বে গিয়ে তার একমাত্র সুখ হয়ে রুমে প্রবেশ করল উমর। তাকে দেখতেই মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল ইকরা। পরক্ষনেই মানুষটার হাতে শপিং ব্যাগ দেখে কিছুটা ভ্রু কুঁচকাল। ঈদের জন্য তো সবকিছু আরও আগেই কিনে দিয়েছে। তাহলে এখন আবার কি আনলো? কৌতূহল দমাতে না পেরে প্রশ্ন করল,
“ আবার কি এনেছেন? ”
কোনোরূপ উত্তর না দিয়ে ইকরার দিক এগিয়ে এলো উমর। সামনে এসে শপিং ব্যাগ হতে দুটো মেহেদি বের করে স্ত্রীর হাতে ধরিয়ে দিল। বলল,
“ নিন এবার এই মেহেদির রঙ দিয়ে আপনার মসৃন হাত দ্বয় রাঙিয়ে তুলুন। সাথে ভিতরের সকল মলিনতা দূর করুন। ”

মুচকি হাসল ইকরা। যে হাসির ভিতরে কোনোরূপ ভেজাল রইল না শুধু স্থান পেল এক পশলা সুখময় অনুভূতি।বাঁ হাত হাঁটুতে রেখে ডান হাতে একটা মেহেদি নিয়ে বসল। মেহেদিতে চাপ দিতে যাবে ঠিক তখনি উমর বাঁধা দিল। পা ভাঁজ করে বসে পায়ের উপর একটা বালিশ রেখে বলল,
“ এখানে হাত রেখে মেহেদি দিন। ”
অবাক দৃষ্টিতে একবার তার মুখপানে তো আরেকবার সেদিকে তাকাল ইকরা। বলল,
“ সমস্যা নেই, আমি এভাবেই দিতে পারবো। ”
“ আপনার সমস্যা না হলেও আমার সমস্যা! আপনি এখানে হাত রেখে মেহেদি দিতে থাকুন আর আমি আপনাকে দেখতে থাকবো। ”
বেশ লজ্জা পেল মেয়েটা। কথা না বাড়িয়ে তৎক্ষনাৎ স্বামীর আদেশ মোতাবেক কাজ করল। অতঃপর সে মেহেদি দিতে ব্যস্ত থাকল আর উমর তাকে দেখতে লাগল।

হুমায়রার চাঁদ রাত কিংবা ঈদ কাটে অনেকটা ভিন্ন নিয়মে। বেশিরভাগ সময়ই মা- বাবাকে ইয়াদ করে কাটিয়ে দেয় সে। চেয়েও সেই স্মৃতিচারণ থেকে বেরিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারেনা। অবশ্য তার মামনির অত্যাচারে তা হয়ে উঠার সুযোগও ছিল না। উল্টো মামির কান্ডে আরও বেশি তাদের কথা মনে পড়ত। হৃদ গহীন হতে বাবার প্রতি নিংড়ে আসতো হাজারো অভিযোগ।
কিন্তু এবারের দিনগুলো খানেক আলাদা। সবকিছু যেন ঘটে যাচ্ছে কল্পনার বাইরে গিয়ে। একটু আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল কৃশান। তবে যাওযার আগে তার ঘটানো কান্ডে এখনো বিস্মিত হয়ে আছে মেয়েটা। বারবার মানস্পটে ভাসছে বেরোনোর আগে দরজার কাছে গিয়ে মানুষটার সেই ফিরে তাকানোর দৃশ্য, সাথে ছুঁড়ে দেওয়া আদর্শ স্বামীর কিছু শব্দ,

“ কিছু লাগবে তোর..? ”
বাক্য খানা কর্ণপাত হওয়ার মিনিট খানেক তো নিজের কানকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না হুমায়রার। বারবার মনে হচ্ছিল নিজের কল্পজগতে বোধ হয় ভুল করে পা রেখে ফেলেছে সে। তবে তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো যখন ফের শুনতে পেল কণ্ঠটি,
“ কি হলো, কথা বলছিস না কেন? কিছু লাগবে তোর? ”
“ জ্বি? না না কিছু লাগবে না। ”
হকচকিত বদনে উত্তর করল হুমায়রা। অতঃপর চলে গেল মানুষটা। তবে ঘরময় এখনো রয়ে গেল সেই বিস্ময়ভাব।
সহসা সকল বিস্ময়ভাব কাটিয়ে মুচকি হেসে উঠল হুমায়রা। চোখ বুজে শুকরিয়া আদায় করল রবের উদ্দেশ্যে। পরক্ষনেই কিছু একটা মনে ভরার ভঙ্গিতে ব্যস্ত পায়ে ছুটল কৃশানের পড়ার টেবিলের দিক। তবে সেখানে এতো এতো বইয়ের ভিড়ে কাঙ্ক্ষিত জিনিসের দেখা মিলল না। অগত্যা মানুষটার ভার্সিটির ব্যাগে হাত দিল। ব্যাগের চেইন খুলতেই সেখানে দেখা মিলল কাঙ্ক্ষিত বস্তুটির। হাত বাড়িয়ে অবহেলায় পড়ে থাকা খাতাটা বের করে আনলো হুমায়রা। পৃষ্ঠা উল্টিয়ে চিরকুট টা এনে সেখানে রাখল। ওমনিই খাপে খাপ মিলে গেল ভিন্ন পেজের দুটো লিখার ধরন। সন্দেহ এবার রূপ নিল নিশ্চয়তায়। বুঝতে আর বাকি রইল না পার্সেলটা কার তরফ থেকে পাওয়া।

ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে ক্রমান্বয়ে রাত বেড়েই চলছে। তবে শহরের সরবতায় তা ঠাহর করা মুশকিল। চারপাশের মানুষ তখন মেতে আছে চাঁদ রাতের খুশিতে। কেউ রাস্তাঘাটে আবার কেউ বা বাড়ির ছাদে বাজি ফুটাচ্ছে। আকাশ জুড়ে ছড়াচ্ছে রঙ বেরঙের কৃত্রিম আলো।
বন্ধুদের সাথে পরিচিত সেই বটগাছের নিচে এসে আজ অনেকদিন পর বসল কৃশান। তবে মনোযোগ তার সেখানে নেই। আসার সময় রাস্তার ধারে ফুলের দোকানে ঝুলিয়ে রাখা বেলিফুলের গাজরাগুলো সব মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে তার। সেগুলো চোখে পড়তেই সর্বপ্রথম সেদিন সূর্যমুখী ক্ষেত থেকে ফেরার সময় হুমায়রার বলা সেই কথাটা মনে পড়ল- ঐ যে মার্কেটে দেখেন না কি সুন্দর গাজরা! নিশ্চই মেয়েটার এইগুলো খুব পছন্দ। আর এমনিতেও শাড়ির সাথে চুলে বা হাতে ফুলের শোভা পেলে হয়তো আরও সুন্দর লাগবে মেয়েটাকে। তবে চিন্তা হচ্ছে এখান থেকে যেতে যেতে দোকান খোলা থাকবে তো? এখন তো বন্ধুদের সামনে কেনাও যাবে না।
কিছুক্ষন ঠায় চিন্তায় ডুবে থেকে সহসা উঠে দাঁড়াল কৃশান। বন্ধুদের প্রশ্নসূচক দৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে বলল,
“ এতক্ষণ তো আড্ডা দিলাম। আজকে নাহয় এখানেই বিরতি নেই। ”
“ এসব কি মামা, আজকেও চলে যাবি তুই? ”
“ লাফাঙ্গারা সারাদিন রোজা ছিলাম আমি, তোদের মতো অতো তেজ নেই শরীরে। ”
কৃশানের জবাব শুনে আর কোনো প্রশ্ন করল না রবি। বাকিরাও চুপ রইল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখে তৎক্ষনাৎ স্থান ছাড়ল কৃশান। তার যাওয়ার পানে নিবদ্ধ রইল তিন জোড়া অবাক দৃষ্টি। যে কৃশান একদিন নেশা না করে থাকতে পারত না সেই কৃশান কিনা আজকে পুরো একটা মাস ধরে নেশা জাতীয় দ্রব্য ছুঁয়েও দেখেনি!

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩২

সতর্ক পায়ে বাড়িতে প্রবেশ করল কৃশান। ড্রয়িং রুমে কারো উপস্থিতি দেখতে না পেয়ে লুকায়িত গাজরা দুটো প্রকাশ্যে আনলো। ধীর পায়ে কক্ষে পৌঁছাতেই দেখতে পেলো স্ত্রীর ঘুমন্ত কায়া। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল কৃশান। ঘুমিয়ে আছে ভালোই হয়েছে। জেগে থাকলে অগণিত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো তাকে। একবার হুমায়রাকে পর্যবেক্ষণ করে গাজরা দুটো ফ্রিজে রেখে দিয়ে আসলো।
অতঃপর রুমে এসে নিজেও হুমায়রার পাশে শুয়ে পড়ল। রমণীর মুখপানে চেয়ে থেকে ভাবল- তার দেয়া শাড়িতে কেমন লাগবে মেয়েটাকে? নিশ্চয়ই কোনো হুরের ন্যায়! অপেক্ষায় রইল সেই ক্ষণের যখন নিজের পুরো মাস নেশা না করে, জমানো টাকা থেকে কিনে দেওয়া শাড়িতে দেখতে পাবে তার হুজুরনী কে।

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩৪

10 COMMENTS

  1. Taratari diye din alada kore porte vlo lage na ager porbe ki hoyechilo setai vule jai

  2. Ki bepar apu.. episode ki r upload diben na…?? Ajk 4 din hoye gelo akn o akta o episode upload dilen na??

Comments are closed.