লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৫৯
লিজা মনি
ভোরবেলার স্নিগ্ধ আলোয় চারিদিক যখন শান্ত, ঠিক তখনই তানভী এসে দাঁড়ায় সেই পরিচিত সদর দরজায়। দাদামশাইয়ের সাথে দেখা করার তাগিদ থাকলেও, তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ভারাক্রান্ত। একসময় যে বাড়িটা ছিল তার প্রাণের স্পন্দন আজ সেখানেই আসতে তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে।
মেহেরের স্মৃতিগুলো এই বাড়ির প্রতিটি কোণায় বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধে আছে। মেহেরের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো এখন তানভীর কাছে এক সুখস্মৃতি নয়, বরং এক অসহ্য দণ্ড। প্রতিটি পরিচিত বস্তু তাকে মনে করিয়ে দেয় কী ছিল, আর আজ কী নেই। সেই পুরোনো ক্ষতগুলো নতুন করে সতেজ হয়ে ওঠে।
আর তানভীর মনে হয় বুকের বাম পাশটা যেন কোনো এক অদৃশ্য চাপে পিষ্ট হচ্ছে। আজকাল এই পথে আসতে তার মন একদমই সায় দেয় না। চারপাশের পরিচিত পরিবেশ যেন তাকে বিদ্রূপ করে। দাদামশাইয়ের সামনে স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও তানভীর চোখের কোণে জমা হওয়া আর্দ্রতা তার ভেতরের ভাঙচুরকে বারবার প্রকাশ করে দেয়। তার মনে হয় মেহেরের স্মৃতিগুলো এখানে বাতাসের মতো মিশে আছে যা নিঃশ্বাসের সাথে নিতে গেলেই দম বন্ধ হয়ে আসে।
নিস্তব্ধ ভোরে দাদামশাইয়ের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তানভী এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কয়েকবার দরজা ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে যায়। জানতে পারে দাদামশাই বাড়িতে নেই। তানভী দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মেহেরের রুমের দিকে অগ্রসর হয়। বুকের ভেতরে ধুক ধুক করছে। দরজা খুলে ভেতরে ডুকে চোখ বন্ধ করে ফেলে। চারপাশে চোখ বুলায়। চোখের পানি বাঁধ মানছে না। টেবিলের কাছে নজর যায় তার। এই টেবিলের মধ্যেই সে মেহেরকে প্রতিনিয়ত পড়াত। দুষ্টুমিতে মেতে উঠত মেয়েটা। আজ কতদিন হয়ে গেলো সে নেই। তানভী আলতোভাবে ছুঁয়ে দেয় সেই টেবিলের উপরের অংশ। হাতের মধ্যে বাঁধা হয়ে পড়ে তিন -চারটা কাগজের অংশ। তানভী কপাল কুচকে ফেলে। কৌতুহল বশত একটা কাগজ হাতে তুলে নেয়। কাগজের মধ্যে লেখা প্রতিটা বাক্য তানভীর হৃদয় তছনছ করে দিচ্ছিলো।
আমার প্রথম প্রণয়ের পুরুষ,
” তুমি শুনতে পাচ্ছো আমার কথা?অহহ, শুনবে কিভাবে এখন তো তুমি আরেক নারীর ব্যাক্তিগত পুরুষ। একবার ও জানতে চাইলে না এমন একটা কথা শুনার পর আমি কেমন আছি? একবার ও অনুভব করো নি আমি অভিমান করে কেনো তোমার কাছে উত্তর চাই নি। ভালোবাসার এই খেলায় আমাকে এমন নিষ্ঠুরভাবে হারিয়ে দিতে পারলে? একবারের জন্যও খারাপ লাগা কাজ করে নি তোমার? তুমি তো আমার সেই ভালোবাসা যেটা আমার হৃদয়ে প্রথম গেঁথেছিলো। ভালোবাসার এই নিষ্ঠুরতায় আমি হেরে গিয়েছি। দোষ আমি কাকে দিব? নিজের ধ্বংসের জন্য তো নিজেই দায়ী ছিলাম। এতটা অন্ধভাবে কেনো ভালোবাসলাম। সে আমার হলো না। এই কথাটা যতবার মনে হয় ততবার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এক নারী হয়ে কিভাবে আরেক নারীর স্বামীকে ভালোবেসে যাব? বেঁচে থাকাটা আমার জন্য বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। একা এইভাবে দম বন্ধ হয়ে মরে যাচ্ছি। আমি বাঁচতে পারছি না। তার থেকে বরং মৃত্যুকেই গ্রহন করে নিলাম। জানি আত্নহত্যা মহাপাপ। তবুও সেই পাপকেই আমি বরন করে নিচ্ছি। মরার আগে আবার ও বলে যাচ্ছি প্রচুর ভালোবাসি তোমায়। তুমি ছিলে আমার বেঁচে থাকার সেই আলো যার সাথে জীবন বাঁধতে চেয়েছিলাম। তোমাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হোক। সুখ-খুশিতে মেতে উঠো তোমরা। আমাকে শুধু একটু মনে রেখো।
তানভীর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। বাকি চিঠিগুলো আর পড়তে পারছে না। কয়েকটা লাইন পড়েই মাথা ব্যাথা করছে। তাহলে মেহের সেদিন এমনি -এমনি বের হয় নি। সেদিন তবে আত্নহত্যার জন্য বের হয়েছিলো! আত্নহত্য করতে গিয়ে চিলের থাবায় পড়তে হয়েছে।
তানভী ধপ করে বসে পড়ে বিছানায়। চিঠির দিকে তাকিয়ে কান্না করে উঠে,
” এই তুমি কি করলে মেহের। এত বোকা কি করে হয়ে গেলে? ইশ্বর তোমার জন্য ভালো কিছু করতেন। আত্নহত্যাকে কেনো বেছে নিলে তুমি? এই খবর আরিশ স্যারকে জানালে সহ্য করতে পারবেন তো?
তানভী চোখের পানি মুছে চিঠিটা হাতে নিয়ে বের হয়ে যায়। অধিরাজকে জানাতেও সে ভুলে গিয়েছে। মাথার মধ্যে একটা জিনিস এই ঘুরপাক খাচ্ছে।
” সেদিন যদি রুম থেকে বের না হত তবে সব কিছু আজ অন্যরকম হত।
রাত্রির অন্ধকার যখন ফিকে হয়ে আসে তখন পূর্ব দিগন্তের মেঘবালিকা লোহিত আভার আঁচল ছড়িয়ে নতুন দিনের আগমনী বার্তা ঘোষণা শুরু করে দেয়। এরপর ধীরে ধীরে তিমিরবিদারী আলোর ঝরনাধারা পৃথিবীর ঘুমন্ত ললাটে আলতো পরশ বুলিয়ে দেয়। দিগন্তের ওপারে সূর্যের সেই রক্তিম আভা যখন নীলিমার সাথে মিশে এক অদ্ভুত রূপালি আভার সৃষ্টি করে তখন চারপাশের প্রকৃতি যেন এক পবিত্র স্নানে শুদ্ধ হয়ে উঠে।
শিশিরভেজা ঘাসের ডগায় ভোরের প্রথম কিরণ পড়তেই সেগুলো হিরের টুকরোর মতো জ্বলজ্বল করে উঠে প্রতিবার। বাগানের মালতী আর শিউলিরা নিঃশব্দে ঝরে পড়ে ধরণীর ধুলোকে সুবাসিত করেছে। গাছের ডালে ডালে পাখিদের কলতান তখন কোনো নিপুণ ঐকতানের মতো বাতাসের গায়ে হিল্লোল তুলতে থাকে। স্তব্ধ বনানীর নিস্তব্ধতা ভেঙে এক মৃদুমন্দ সমীরণ বয়ে যায় যা লতা-গুল্মের শরীরে জাগিয়ে তুলে এক অদ্ভুত শিহরন। ঠিক তেমন এই এক মিষ্টি সকালের আগমন ঘটে।
স্তব্দ হয়ে বসে আছে নাজলী। রাতের ঘটনা বার বার স্মরণ হচ্ছে। সব তো ঠিক এই ছিলো তবে সে কেনো সব কিছুতে অনুমতি দিলো? তখন জেদ ধরে চলে কেনো আসলো না। নিজের ঠোঁটে হাত দিয়ে স্পর্শ করে চোখ বন্ধ করে ফেলে।
কারোর পায়ের শব্দে নাজলীর ইন্দ্রিয় সজাগ হয়। কেমন রুক্ষ চোখে তাকায় সেদিকে। চোখ দুইটা তার অনেক লাল হয়ে আছে। আরিশ কফির কাপটা বেড সাইটে রেখে ভ্রুঁ ভাঁজ করে তাকায়। নাজলীর চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। কান্না আসছে কিন্তু কাঁদতে পারছে না। আচমকা বসা থেকে উঠে আরিশের টি-শার্ট চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড়ায়,
” কোন অধিকারে স্পর্শ করেছেন আমায়? কেনো এমনটা করলেন?
আরিশ কেমন অদ্ভুত চোখে তাকালে। শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলে,
” রিলাক্স, অতিরঞ্জিত কিছু হয় নি। শুধু ঠোঁট আর গলা পর্যন্তই ছিলাম।
নাজলীর পছন্দ হয় নি এমন খাপছাড়া উক্তি। আরিশের টি- শার্ট আরও শক্ত করে ধরে চেঁচিয়ে উঠে,
” এমন একটা বিষয় নিয়ে হেয়ালি কিভাবে করতে পারেন? হয় নি মি, আরিশ কিন্তু হয়ে যেত। সেই মুহূর্ত আমি যদি না আটকাতাম বুঝতে পারছেন কি করতেন আমার সাথে? নির্লজ্জ, অসভ্য পুরুষ আপনি।
আরিশ দাঁত পিষে তাকায় নাজলীর দিকে। নাজলীর চোখ পানি টুইটুম্বুর। এই পানি তার সহ্য হচ্ছে না? কেনো কাঁদছে? সে সামান্য ছুঁয়েছে বলে? তার জন্য তো ক্ষমা চেয়েছে। এই মেয়ের ধারনা আছে ক্রিমিনাল লিডার আরিশ ইলহাম একটা নারীর কাছে ক্ষমা চেয়েছে। যার ডিকশনারিতে ক্ষমা নামক কোনো শব্দ নেই। তার পর ও কেনো এমন তাচ্ছিল্যতা! আরিশ নাজলীর দুই কাধ চেপে ধরে। কিছুটা রাগ মিশিয়ে বলে,
” নির্লজ্জতা, অসভ্যতামি কোনো পর নারীর সাথে করে নি। নিজের বিবাহিতা স্ত্রীর সাথে করেছি। আর যদি হয়েও যেত তাতে কি যায় আসে? হওয়ার হলে হয়ে যেত! আমি থেমে গিয়েছি বলেই আটকাতে পেরেছিলে। নাহলে তোমার সেই আটকানোর ক্ষমতা ছিলো না।
নাজলী তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” ভুলে যাচ্ছেন কয়েকদিন পর চুক্তি শেষ। তখন রাস্তায় ফেলে আসবেন আমাকে। খুব ভালো করে চিনি আপনাদের মত অসাধু ব্যবসায়ীদের। দুই দিন পর চিনবেন ও না নাজলী নামক একটা মেয়ে ছিলো। কারন আমি আপনার জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় না। তাহলে কিসের এত অধিকার দেখান? ঘৃনা করি আপনাকে আর আপনার জীবনকে। যাস্ট ঘৃনা!
আরিশ ঠোঁট কামড়ালো নিজের। নাজলীর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। কাবার্ড থেকে একটা পেপার আর কলম বের করে টেবিলের উপর শব্দ করে রাখে। এরপর নাজলীর বাহু শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে যায় সেখানে। হাতে কলম ধরিয়ে রাগান্বিত গলায় আদেশ করে,
” সাইন করো। ইফ ইউ ট্যাম্পার উইথ দিস সাইন, থিংস উইল গো ভেরি রং।
নাজলী অবাক হয়ে বলে,
” মানে? সাইন করব কেনো আমি? আর এইটা কিসের পেপার?
আরিশ কিছুক্ষণ তাকায় নাজলীর চোখের দিকে। এরপর খুবই শান্ত মেজাজে বলে,
” তোমার – আমার বিয়ের চুক্তি শেষ। আর মাত্র কয়েকটা দিন হয়ত বাকি। তার আগেই এখানে সাইন করে বিদায় হও। যাতে ভবিষ্যতে কখনো বলতে না পারো তুমি এখনও আমার স্ত্রী। তোমার – আমার বিচ্ছেদের দলিল এইটা।
নাজলী স্তব্দ হয়ে তাকায় সেই কাগজের দিকে। এতটা সহজভাবে বলে দিলো সব কথা? এতদিন যত কেয়ার করেছিলো সব তবে অভিনয় ছিলো? তার ধারনায় ঠিক কুকুরের লেজ কোনোদিন সোজা হয় না। এমন হার্টল্যাসকে ভালোবেসে সে আজ ছন্নছাড়া। রাগে শরীর কাঁপছে তার। সে নাকি স্ত্রীর দাবি নিয়ে আসবে ভবিষ্যতে! মনের কথা মুখে ফুটিয়ে বলে,
” তর মত ক্রিমিনালের বাচ্চার সামনে স্ত্রীর দাবি নিয়ে আসব? এতটা খারাপ দিন আসে নি আমার।
আরিশের কপাল কুচকে ধমকে উঠে,
” থাপরে সোজা করব বিয়াদব। তুই-তুইকারি করছো কাকে? দ্রুত সাইন করো আর শেষ করো এই চুক্তির নাটক।
নাজলী ঠোঁট কামড়ে ধরে। রাগে শরীর শিরশির করছে অথচ চোখে পানির বাঁধ মানছে। শালার রাগ ও হচ্ছে আবার কষ্ট ও কেনো হচ্ছে? নাজলী কাম ডাউন! তাদের জীবন আর তর জীবন এক নয়। ওরা পুরো জীবন রক্তের মধ্যে ভেসে বেড়ায়। আর তুই তো রক্ত দেখলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলিস। তবে কিভাবে এমন একটা পুরুষের জন্য কষ্ট অনুভব করছি? উনি তর থেকে মুক্তি চাইছে। সে যদি তর কাছে মুক্তি চাইতে পারে তবে তুই কেনো কষ্ট পাবি। দ্রুত সাইন কর আর মুখের উপর ছুঁড়ে মার সেই পেপার। নাজলী দাঁতে দাঁত পিষে টেবলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সেও সাইন করে মুখের উপর ছুঁড়ে মারবে। মুক্তি চাইতো? মুক্তি দিয়ে দিব।
নাজলী আর তাকায় নি কোনোদিকে। পুরো শরীর অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। তবুও রাগ আর জেদের কারনে পেপারে সাইন করে দেয়। সাইন করে আরিশের দিকে ফিরে। কাগজটা মুখের উপর ছুঁড়ে দিয়ে বলে,
” আজ থেকে আপনি আপনার রাস্তায় আর আমি আমার রাস্তার।যদি আর কোনোদিন আমার সামনে আসেন তবে আপনাকে খুন করে রক্ত পান করব।
নাজলী চলে যেতে চায় রুম থেকে। আরিশ চেপে ধরে নাজলীর ধনুকের মত বাঁকানো কোমর। আচমকা হামলে পড়ে আরিশের বুকের উপর। নাকে সামান্য ব্যাথা পেয়ে আর্তনাদ করে উঠে। আরিশ পেপারটা খুলে সাইনটার দিকে তাকায়। মুচকি হাসি দিয়ে বলে,
” পথ তখন আলাদা হয় যখন মানুষ দুজন আলাদা হয়। কিন্তু সেই পথ কিভাবে আলাদা হবে যে পথ অনেক কষ্ট করে তুমি জোড়া লাগিয়ে দিয়েছো। স্বামী হিসেবে আমার একটা দায়িত্ব -মায়া আছে। পথ আলাদা কিভাবে করি মিসেস আরিশ ইলহাম!
নাজলী ছটফটিয়ে উঠে। কেমন নাক-মুখ কুচকে শাষিয়ে উঠে,
” একদম ছুঁবেন না আমায়। আমার জন্য বর্তমানে আপনি পর পুরুষ। আর কি বুঝাতে চাইছেন? পথ এক নয় আলাদা করেছি ক্রিমিনাল বস।
আরিশ আরও চেপে ধরে নিজের সাথে। নাজলী অসহায় গলায় বলে,
” ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে আমাদের। তবে এখনও কেনো এমন জোর করছেন? প্লিজ মি, আরিশ ছেড়ে দিন। দুরে কোথাও, কোনো এক প্রান্ত চলে যাব। কোনোদিন সামনে আসব না আপনার।
আরিশ পেপারের দিকে তাকিয়ে বলে,
” ডিভোর্স পেপার নয় বিয়ের পেপার ছিলো এইটা। এই জীবনে তোমার মুক্তি নেই ডার্লিং।
আরিশের কথা কানে যেতেই নাজলী চেঁচিয়ে উঠে,
” কিহহহ! ব… বিয়ের পেপার মানে? ইয়ার্কি করছেন আমার সাথে?
আরিশ ছেড়ে দিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে। আদেশ করে বলে,
” নিজ দায়িত্বে পেপারটা খুলে দেখে নাও।
নাজলী কেমন মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে। কাঁপা হাতে পেপারটা আবার ও খুলে। কাগজের প্রতিটা লাইন যেন বিষাক্ত লাগছে এই মুহূর্তে। ক্ষেপা বাঘিনীর মত তাকায় আরিশের দিকে। আরিশের ডোন্ট কেয়ার ভাব। নাজলী পেপারটা দুরে কোথাও ফেলে দেয়। আবার ও আরিশের টি -শার্ট চেপে ধরে কান্না করতে করতে চেঁচিয়ে উঠে,
” চিট করেছেন আমার সাথে। বলেছিলেন এইটা ডিভোর্স পেপার। চুক্তি শেষ হয়ে গিয়েছে আমাদের।মুক্তি চেয়েছিলেন আমার থেকে। তবে… তবে পুনরায় কেনো এই নরকে আমাকে আমন্ত্রন জানালেন। থাকতে চাই না আমি আপনার সাথে। যে লোক রাতের অন্ধকারে একটা রে*পিস্ট -নরখাদককে সাহায্য করতে পারে তাকে নিজের স্বামী হিসেবে মানি না। ঘৃনা করি আপনাকে আমি। প্রচন্ড ঘৃনা! ছিঁড়ে ফেলব আমি এই বিয়ের পেপার।
আরিশ নাজলীর হাতের দিকে তাকায়। ঠোঁট চেপে চোখে চোখ রেখে বলে,
” যেভাবে তুমি বার বার আমার টি- শার্ট চেপে ধরছো তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে এতক্ষনে হাত কব্দি থেকে আলাদা হয়ে যেত। নিজের অধিকারটা বুঝে নাও।
” চাই না কোনো অধিকার। চলে যাব এখান থেকে।
” ঠ্যাং ভেঙ্গে বিছানায় বসিয়ে রাখব। চুপ থেকে এখন থেকে পতিসেবা শুরু করো। অনেক সওয়াব অর্জন করবে। দিনের বেলা চার বেলা সেচ্ছায় এসে চুমু খাবে। আর রাতের বেলা আমি খাব। চুমুর সাথে আরও কিছু মিক্সড করব।
নাজলীর কান্না পাচ্ছে। কেমন ধোঁকায় পড়লো সে। কতটা খারাপ আর নির্লজ্জ হলে কেউ এইসব বলে।
” চুমু খাওয়ার বদলে রাস্তা থেকে তুলে এনে আবর্জনা খাওয়াব। আর যদি কাছে আসার চেষ্টাও করেন একবার তো লাথি মেরে অকেজো করতে চেয়েছিলাম এখন অন্যটা করব।
আরিশের চোখ ছোট ছোট হয়ে আসে।
” স্বামী আদর করবে এইটা শুনে লজ্জা পাওয়া উচিত ছিলো তোমার। ফালতু চিন্তা রেখে ঘুমাও কিভাবে? লজ্জা কোথায় মুখের?
নাজলী আরিশের গলায় আঙ্গুলে ছুঁয়ে দেয়। দুষ্টু হেসে বলে,
” আপনার কথায় লজ্জা নয় ঘৃনা আর রাগ আসে।
আরিশ হাতটা ধরে বলে,
” এমন নির্লজ্জ থাকলে আমার এই লাভ। সহজে সব কাজ করতে পারব।
নাজলীর চোখ-মুখ বিকৃত হয়ে আসে,
” আপনাকে খুন করে আমি জেলে যাব।
” আর তোমাকে বাঁচিয়ে রাখব আমি? জংলী!
নাজলী শাষিয়ে উঠে,
” খবরদার জংলী ডাকবেন না। ক্ষেপা ষাড় একটা!
আরিশ ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” জংলী না ডেকে ডাকব? বাবু, সোনা, হানি, সেক্সি বেইবি, ডার্লিং!
নাজলী নাক ছিটকে বলে,
” ছিহহ! কেমনে বিশ্রি লাগছে আপনার মুখে। কথায় আছে সবাইকে সব কিছুতে সুন্দর লাগে না।
আরিশ ঠোঁট কামড়ে হাসলো। নাজলীর সম্মুখী দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলে,
” আমি এইসব ডাকব না তাই বিশ্রি লাগছে। আমি তো অন্য কিছু ডাকব।
” ক… কি ডাকবেন?
আরিশ আরও ঝুঁকে পড়ে। কানের কাছে গিয়ে কিছু একটা বলে। সাথে সাথে নাজলী রক্তচক্ষুর ন্যায় তাকায়। আরিশের দিকে এগিয়ে যেতেই আরিশ রুম থেকে বের হয়ে বাহির থেকে দরজা লাগিয়ে দেয়। নাজলী দরজায় শব্দ করে ধ্বাক্কা দিয়ে বলে,
” গজব পড়বে আপনার উপর দেখে নিয়েন।
আরিশ বাঁকা হেসে বলে,
” বদদোয়া পড়ে দিও বেইবি। আজ বাসর রাত আমাদের। এইটা আগে কাটিয়ে নেয় এরপর যা ইচ্ছে বলো।
এনি বিধ্বস্ত অবস্থায় এখনও দেয়াল ঘেষে বসে আছে। চুলগুলো কেমন এলো- মেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। কিছুক্ষন আগের কথাগুলো এখনও আসে কল্পনা করছে। সেদিন পাচার কেন্দ্রে যাওয়ার পর যে হুডি পড়া লোকটা তাকে ক্ষণে ক্ষণে বাঁচিয়েছিলো তবে সেটা উনি ছিলো? যদি উনি আমাকে সেদিন ছায়ার মত বাঁচিয়ে থাকে তবে এত গুলো পুরুষের সামনে নিলামে উঠতে দিয়েছেন কিভাবে? কেনো এত এত টর্চার আর খারাপ ব্যবহার করেছেন আমার সাথে? সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। উনি বহু আগে থেকেই আমাকে আগলে রাখছেন। ইরানে থাকতে পর পর কাটা মাথা আর রক্তাক্ত কলিজা। সব গুলো ছিলো যারা আমার দিকে লুলুপ দৃষ্টি দিয়েছিলো তাদের। সব উনি পাঠাতেন রাতের অন্ধকারে আমার নিকটে। এরপর আমি পাচার হওয়ার পর সেখানে রক্ষা করা! নিলাম থেকে কোটি টাকার বিনিময়ে কিনে নিয়ে আসা। কোনো পুরুষের চোখের সামনে যেতে না দেওয়া। এইসবকে আমি কি ধরে নিব? যদি বলি এইগুলো ছিলো আপনার অদৃশ্য ভালোবাসা । তবে আমাকে যে এত নির্যাতন করেছেন সেগুলো কি ছিলো? কোনটা বুঝব আমি? হায় আল্লাহ এত প্রশ্নের উত্তর আমি কার কাছে পাব? উনি তো কোনোদিন উত্তর দিবেন না আমাকে। তবে কোথা থেকে পাব আমার সব প্রশ্নের উত্তর।
এনির শ্বাস বাড়তে থাকতে। আচমকা থমকে যায় আসে। আরিশের কথা মনে হতেই দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। চোখে-মুখে পানি দিয়ে শরীরে উড়না নিয়ে বের হয় রুম থেকে। সিঁড়ির কাছে যেতেই দেখতে পায় আরিশ প্রায় দরজার কাছে চলে গিয়েছে। এনি কোনো উপায় না পেয়ে গলা ছেড়ে ডেকে উঠে,
” আরিশ ভাইয়া শুনছেন?
এনির কন্ঠস্বর কানে যেতেই দাঁড়িয়ে যায় আরিশ। অবিশ্বাস্য চাহনিতে পিছনে ফিরে তাকায়। এনি মুচকি হেসে দ্রুত সিঁড়ি পার করে নিচে নামে। আরিশের অবিশ্বাস্য নজর দেখে কিছুটা বিব্রত হয়। আমতা আমতা করে বলে,
” সে কোথায়?
আরিশ বুঝেও না বুঝার অভিনয় করে বলে,
” সে কে?
” উনি আরকি।
” কিন্তু সেই উনিটা কে?
এনি অসহায় চোখে তাকিয়ে বলে,
” আপনার বন্ধুর কথা বলছিলাম।
আরিশ হেসে বলে,
” আছে নিজের গন্তব্যের মধ্যেই। তার কাছেই যাচ্ছি আমি।
” আপনার সাথে কিছু জরুরি কথা ছিলো।
আরিশ হেসে বলে,
” সেটা ভেবেই আশ্চর্য হলাম। কি এমন জরুরি কথা যে রুম ছেড়ে বাহিরে চলে আসলে। তোমার স্বামী যদি জানতে পারে আমার সাথে জরুরি কথা বলেছো তবে আমাকে মাটির নিচে পুতে দিয়ে আসবে।
এনি নিজেও ভয়ে হাত কচলায়। ভয়াতুর গলায় বলে,
” উনাকে কিছু বলবেন না। উনি জানবে না কিছু। আপনার সাথে কথা বলাটা আমার প্রয়োজন।
আরিশ শিনা টান টান করে দাঁড়িয়ে বলে,
” কি বলতে চাও দ্রুত বলো। তোমার স্বামীর হাতে মরতে চাই না।
আরিশ কথাটা বলে ডিভানে গিয়ে বসে। এনি হাত কচলাচ্ছে শুধু। আরিশ এক পলক সেদিকে তাকিয়ে ইশারা করে তার সামনে বসার জন্য। এনি জড়তা নিয়ে বসে পড়ে সে জায়গায়। বড় একটা নিশ্বাস টেনে বলে,
” অনেক কিছু জানতে চাই আপনার থেকে।
” কি জানতে চাও? আমার থেকে ভালো তো তোমার জানার কথা।
এনি তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” নতুন করে আপনাকে আবার উনার বর্ননা দিতে হবে? জানেন না উনি কেমন? আমাকে কখনো কোনো কিছুর উত্তর দিবে?
আরিশ সামান্য হেসে বলে,
” গ্যাংস্টার বস পুরো দুনিয়াকে উত্তর না দিলেও তোমাকে দিত এনি। একটু ভালোবেসে বলতে, দেখতে পুরো জীবন কাহিনী তুলে ধরত তোমার সামনে।
এনি থমকায়। পুরো শরীর শিরশির করে উঠে। শান্ত গলায় বলে,
” উনার প্রতি ভালোবাসা আসে না ভাইয়া।
আরিশ শব্দ করে হাসলো। তীর্যক চোখে তাকিয়ে বলে,
” সত্যি ভালোবাসে আসে না? আমি যদি বলি তুমি নিককে তীব্র ভালোবাসো। তবে কি আমার ভুল হবে?
এনি শক্ত গলায় বলে,
” অবশ্যই ভুল। আপনার পুরো চিন্তা -ভাবনা ভুল। আর এমন চিন্তা কখনো করবেন না। কোনো নরপশুকে ভালোবাসার মত পাপ আমি আনাস্তাসিয়া এনি কখনো করব না।
” এতটা ঘৃনা করার কারন?
এনির চোখে পানি টলমল করে উঠে। কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টায় বলে,
” আপনি জানেন না ভাইয়া কেনো ঘৃনা করি? উনি নারী পাচার চক্রে জড়িত। কোমল বাচ্চা গুলোকে নরকে ঠেলে দেয়। পৃথিবীর সব পাপ কাজের সাথে উনার হাত। যার শিরায় শিরায় অন্ধকার। এমন মানুষকে আমি কিভাবে ভালোবাসি? জীবনে কষ্ট তো কম পাচ্ছি না। কান্না তো কম করছি না। উনাকে ভালোবাসার মত পাপ আমি করতে চাই না। হ্যা, উনি আমাকে প্রতিটা পদক্ষেপে বাঁচিয়েছে। তার জন্য আমি অনেক -অনেক কৃতজ্ঞ। কিন্তু উনি কি আমার সাথে জুলুম কম করেছে? আপনি তো ছিলেন ভাইয়া। জ্বলন্ত কয়লার উপর হাটতে বাদ্ধ করেছে আমাকে। আমার অশালীন ভিডিও ধারন করেছে। এইটা পুরো দেশে ছড়িয়ে দিবে এমন থ্রেড দিয়ে উনার নামে কবুল বলিয়েছে। বিয়ের পর কাহিনী গুলো না এই বলি। মানসিক ভাবে মেরে ফেলেছে আমাকে।
উনি আমাকে বাঁচিয়েছে, অস্বীকার করব না। কিন্তু তার থেকেও দ্বিগুন জুলুম হয়েছে আমার সাথে। নারীর ইজ্জত তার অহংকার ভাইয়া। সেই ইজ্জতকে নিলামে তুলেছেন উনি। আমি তো সেদিন ও মরে গিয়েছিলাম যেদিন আমাকে নিলামে তুলে হয়েছিলো। টিভিতে যখন দেখানো হয়েছিলো আমি গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের একশত কোটি টাকার দামের রক্ষিতা। আমাকে মনে করাবেন না সেই দিনগুলোর কথা। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এতট যন্ত্রনা অনুভব হয় যে মাঝে মাঝে ভাবি মরে কেনো যাচ্ছি না। হিংস্র বনপশুর মধ্যে রেখে জীবন্ত মাটির নিচে পুতে রেখেছিলো। উনি যদি আমাকে ভালোবাসত তবে এতটা হিংস্র কেনো হয়েছিলো?
আরিশ এনির প্রতিটা কথা শুনলো। দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে,
” কারন নিক হিংস্র। ওকে পুরো আন্ডারগ্রাউন্ড ভয় পায়। সে তোমার প্রতি আসক্ত। তুমি কি জানো সেদিন পালিয়ে যাওয়ার পর নিকের কি অবস্থা হয়েছিলো?
এনি কাঁপা গলায় বলে,
” ক.. কি হয়েছিলো?
আরিশের ওষ্ঠাধরে এক চিলতে বক্র হাসি ফুটে উঠে। যাতে মিশে ছিল এক প্রচ্ছন্ন বিষাদ। সে অতিশয় ধীরকণ্ঠে উচ্চারণ করে,
” যখন তোমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না তখন গ্যাংস্টার বস পুরো উন্মাদ হয়ে উঠেছিলো। নাক দিয়ে ব্লিডিং হচ্ছিলো প্রচুর। অবস্থা এতটা সূচনীয় ছিলো যে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। জোর করছিলাম চিকিৎসা নেওয়ার জন্য। কিন্তু সে ছিলো তোমাকে খুঁজতে ব্যস্ত। ধারনা করো এনি কতটা মানসিক ভাবে আঘাত পেলে একটা মানুষের নাক দিয়ে ব্লিডিং শুরু হয়। নিকের জীবনে তোমার অবস্থান কতটুকু সেটা অনুমান করে নাও। তুমি ওর সেই হিংস্রতা দেখো নি যা শত্রু পক্ষরা দেখেছে। সেদিন তো ভেবেছিলাম হয়ত তোমাকে খুন করে ফেলবে। ভয় পাচ্ছিলাম খুব। প্রতারনা আর মিথ্যাচার নিক সহ্য করতে পারে না। সেখানে তুমি তো ওকে রেখে পালিয়ে যাচ্ছিলে। শুক্রিয়া করো এনি তোমাকে যাস্ট কিছু মুহূর্তের জন্য মাটির নিচে পুতেছিলো। একবারের জন্য মাটি চাপা দিয়ে মারে নি। তুমি ওর বাহ্যিক হিংস্রতা দেখেছো। ভালোবেসে আগলে নাও দেখবে নিকের মত ভালো প্রেমিক পুরুষ আর একটাও নেই। ও হিংস্র, ও নরপশু কিন্তু ও তোমাতেই উন্মাদ।
এনির ফুসফুস যেন বায়ুশূন্য হয়ে আসছে। এক অসহ্য রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি। তার চিত্ত চঞ্চল হয়ে উঠছে।মনে হচ্ছে উচ্চস্বরে রোদন করলে হয়ত এই তীব্র যাতনা লাঘব হত। এই কলুষিত জীবনে কিসের এত আক্ষেপ? কিসের এই দহন?
এনির অশ্রুসজল নয়নদ্বয় পর্যবেক্ষণ করে আরিশ পুনশ্চ মৃদু হাসল,
” তুমি বলেছো সে কেনো তোমাকে নিলাম থেকে কিনে আনলো। কিনে নিয়ে আসাটা একটা মাধ্যম ছিলো মাত্র। আঠারো জন মাফিয়ার সামনে থেকে তোমাকে নিয়ে আসাটা এতটাও সহজ ছিলো না। তাই সেদিন কিনে নিয়ে আসার অভিনয়টা করেছে। টিভিতে কোনো নিউজ হয় নি এইটা নিয়ে। যারা করেছিলো তাদের কঠিন মৃত্যু হয়েছে। নিউজের মালিকের স্ত্রী -সন্তানকে জেড খুন করেছিলো। আর তুমি জেডকে খুন করেছো। আর নিউজের মালিককে নরক যন্ত্রনা দিয়েছে নিক। তুমি ভাবছো দেশ তোমাকে রক্ষিতা বলছে। কিন্ত বাস্তবতা হলো পুরো দেশ জানে তুমি গ্যাংস্টার বসের বিবাহিতা স্ত্রী। রক্ষিতা তো একদিনের পরিচয় ছিলো মাত্র। যদি বলো অত্যাচারের কথা তবে বলব এইটা অন্যায় ছিলো মানছি। কিন্তু নিক আর পাঁচ জন সাধারন মানুষের মত নয়। কখন অত্যাচার করত তোমাকে? যখন তুমি পালিয়ে যাওয়ার কথা বলছে, ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলতে তখন। অথবা তুমি পালিয়ে গিয়েছিলে তখন। নিক প্রচুর ভয়ানক এনি। সেই হিংস্র পুরুষকে বার বার রাগিয়েছো তুমি। এখনও বেঁচে আছো সেটা আশির্বাদ তোমার জন্য। আর একজন ভিলেন কখনো ছেড়ে দেয় না। বরং নিজের জিনিস ছিনিয়ে নেয়। আর সে ও তোমাকে ছিনিয়ে নিয়েছে। ভালোবেসে আগলে নেওয়াটা তোমার দায়িত্ব। যদি সব মেনে নিতে পারো তবে তোমাদের সংসার সুন্দর হবে। নয়ত এই সম্পর্কের পরিনতি কি আমি নিজেও জানি না।
এনির শ্বাসের গতি তীব্রতর হয়। সে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে নিজের কেশগুচ্ছ টেনে ধরে। । এক অদ্ভুত অস্থিরতা তাকে গ্রাস করছে। রুদ্ধকণ্ঠে সে প্রশ্ন করে,
” রক্তের সাগরে সংসার হয় না ভাইয়া। যদি ডুবে যায় তাহলে তুলবে কে?
” যার সাথে সংসার করবে সে বেঁচে থাকতে ডুবার চান্স নেই। সেই রক্তের সাগরকেও ফুলের বাগান করে তুলবে।।
” ফুলের বাগানের সপ্ন দেখাটা আমার জন্য বিলাসিতা। নিজের বোনের সাথে কথা বললেও উনি হিংস্র হয়ে উঠে। বাহিরে দাঁড়িয়ে বাতাস উপভোগ করতে পারি না। উনার সামনে দাঁড়িয়ে কোনো কিছুর প্রশংসা করতে পারি না। জেলাসি ছেলেদের নিয়ে হয়। কোনো বস্তু, প্রানীকে নিয়ে জেলাসি কাজ করাটা স্বাভাবিক লক্ষণ নয়। উনি সুস্থ নন। উনি একজন সাইকোপ্যাথ। কি করে সামাল দিব সারাজীবন এইসব কাহিনী?
আরিশ খাপছড়া ভঙ্গিতে বলে,
” সেটা তুমি ভালো জানো মিসেস নিক জেভরান। নিজের স্বামীকে কিভাবে শান্ত রাখবে সেটা তোমার ব্যপার। কিন্তু সব কিছুর পর ও বলব তুমি নিককে ভালোবাসো। আর এই হিংস্র পুরুষটার জন্য তুমি বাজেভাবে আসক্ত।
এনি চুপ হয়ে যায়। বুক ফেটে কান্না আসছে তার। ভালোবাসা কি এতটা সহজ? সে -তো কাউকে ভালোবাসতে চায় না। এনি তীব্র বিরোধীতা করে বলে,
” আমি উনাকে ভালোবাসি না। কেনো বুঝতে চাইছেন না এইটা।
” তুমি ওকে ভালোবাসো না মেনে নিলাম। তুমি কি মোনাজাতে ওর জন্য দোয়া করো? একবারের জন্য ও সৃষ্টিকর্তার দরবারে নিকের ভালো চেয়েছো? সত্যিটা বলবে কিন্তু। আমি জানি তুমি মিথ্যে বলো না।
এনি থমকায়। ছলছল চোখে তাকায় আরিশের দিকে। আরিশের এখনও প্রশ্ন বোধক চাহনি। এনি নিশ্বাস টেনে বলে,
” চেয়েছি।
আরিশ অদ্ভুত ভাবে গা কাঁপিয়ে হেসে বলে,
” অন্যকারোর জন্য তো চাইলে না। নিকের জন্য এই কেনো? যাকে ঘৃনা করো তার ভালো চাইলে, ইন্টারেস্টিং! প্রকৃতির কি অদ্ভুত লীলাখেলা। দুইজন দুই প্রান্তের মানুষ। পাপ-পুণ্যের সমীকরণ এইটা। তুমি ঘৃনা করো তবুও তার ভালো চাও। আর সে তোমাকে ভালোবাসে কিন্তু স্বীকার করে না। অথচ সামান্য কিছু হলেই উন্মাদ হয়ে উঠে। শুধু পারে না ধ্বংসে মেতে উঠতে। যে কোনোদিন মসজিদে পা রাখে না সেও মসজিদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে তোমার জন্য প্রান ভিক্ষা চায়। যার চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছে বহু বছর আগেই। সে গ্যাংস্টার বস তোমার ছুঁড়িঘাত বুক দেখে মসজিদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রান ভিক্ষে চেয়ে কেঁদেছে। মায়া আর ভালোবাসা আর কিভাবে প্রকাশ করে?
আরিশের মুখ বের হওয়া প্রতিটা বাক্য এনিকে স্তব্দ করে দিচ্ছে। নিক তার জন্য কেঁদেছে এনি কল্পনা এই করতে পারছে না। একটা মনস্টার কি আদ’ কাঁদতে পারে? এনির সারা শরীর নিথর হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে পায়ের তলার মাটি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। সে তো এতদিন নিককে কেবল এক পাষাণ হৃদয়ের ‘সাইকোপ্যাথ’ হিসেবেই চিনে এসেছে। যে মানুষটি তাকে অবহেলা করেছে, পুড়িয়েছে, এমনকি জীবন্ত কবরের স্বাদ পর্যন্ত দিয়েছে। সেই মানুষটি তার জন্য স্রষ্টার দরবারে চোখের জল ফেলেছে? এই বৈপরীত্য এনি নিতে পারছে না।
এনির চোখের জল গাল বেয়ে টুপ করে ঝরে পড়ে। নিজের চুলের মুঠি ছেড়ে দিয়ে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শূন্যের পানে। তার মস্তিষ্কে তখন কেবল একটাই দৃশ্য ঘুরপাক খাচ্ছিলো সেই রক্তচক্ষু, ভয়ংকর মানুষটি মসজিদের বারান্দায় হাঁটু গেড়ে বসে আছে। এনি বুঝতে পারছিল না এই অনুভূতিটা আসলে কী। এটা কি করুণা? নাকি অবচেতন মনের সেই ‘আসক্তি’, যা আরিশ বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে এই মুহূর্তে! এনি কাঁপা গলায় বলে,
” উনি কেঁ.. কেঁদেছিলো?
আরিশ এনির এই ভেঙে পড়াটা খুব শান্তভাবে দেখছে। তার মুখে সেই রহস্যময় হাসির রেখা খেলে যায়।
” বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার? আশ্চর্য হচ্ছো, যে হাজারজনের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে সে কেনো তোমার জন্য এত আগ্রহ প্রকাশ করলো? অস্বাভাবিক কিছু নয় এইটা। তুমি জায়নামাজে বসে তার জন্য মঙ্গল কামনা করো। আর সে মসজিদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মঙ্গল কামনা করেছে। কি অদ্ভুত প্রেম তাই না?
এনি মাথা চেপে ধরে নিজের। এই প্রসঙ্গ সে এড়িয়ে যেতে চায়। আর নিতে পারছে না এইসব। এতদিন যা দেখে এসেছে এইসব সত্য নাকি বর্তমানে শুনা প্রতিটা কথা! এনি নাক টেনে স্বাভাবিক গলায় বলে,
” এই নিয়ে কোনো কথা বলতে চাচ্ছি না আর। আমি জানতে চাচ্ছি, আমাকে পাচার কেন্দ্রে যখন রাখা হয়েছিলো তখন এত সুবিধা কেনো দেওয়া হয়েছিলো? সবাইকে ময়লা -নোংরা জায়গায় রাখা হয়েছে। আমাকেই কেনো আলাদা এক পরিচ্ছন্ন রুমে রাখা হয়েছিলো? অন্য মেয়েরা যখন বেড টাচের স্বীকার হয়েছে সেখানে আমি কোনো পুরুষের দেখা এই পায় নি। শুধু ঝাপসা দেখেছিলাম কোনো এক হুডি পড়া বলিষ্ঠবান ব্যক্তি আমার শিউরে বসে আছে। কে ছিলো সে? সব এইতো বললেন আমি এইটাও জানতে চাই। কে বাঁচিয়েছিলো সেদিন?
আরিশ কপাল কুচকায়।।ভাবুক গলায় বলে,
” সেটা নিজের স্বামীকেই জিজ্ঞাসা করে নিও। পুরো পাচার কেন্দ্রের মালিক তোমার স্বামী।
এনি বিরক্তি হয়ে বলে,
” বার বার স্বামী উচ্চারন করবেনা না।
” কেনো, দুর্বল হয়ে যাও?
এনি সামান্য রাগ দেখিয়ে বলে,
” দুর্বলতা কাজ করে না আমার। প্রশ্নের উত্তর দিন। উনাকে অনেক বার জিজ্ঞাসা করেছি কিন্তু উত্তর মেলে নি।
আরিশ সাবলীল গলায় বলে,
” অনুভব করো সে কে ছিলো।
এনি কাঁপা গলায় বলে,
” উ.. উনি।
আরিশ হাসি দিয়ে বলে,
” বাহহ নিজের স্বামীর উপস্থিতি একদম মুখস্ত করে রাখা। এইতো আদর্শ স্ত্রীর লক্ষণ!
এনি বিরক্তি হয়ে বলে,
” আপনি আমার কাছে মজা করছেন ভাইয়া?
আরিশ কাঁধ নাড়িয়ে বলে,
” তোমার সাথে মজা করার মত সাহস আমার নেই। আজ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা উৎসব আছে। একসাথে অনেকজনের প্রান নেওয়া উৎসব। দোয়া করো তোমার হাজবেন্ড যাতে বেঁচে ফিরে।
এনি আচমকা তাকায়। বুকের ভেতরে একটা সুক্ষ্ণ ব্যাথা অনুভব করতে থাকে।। গলায় কথা আটকে আসছে। কোনোরকম উচ্চারন করে বলে,
” ক.কি বলতে চাইছেন? কি হবে উনার?
আরিশ রহস্যময় হেসে বলে,
” জন্ম -মৃত্যুর এক লড়াই। আগুন নিয়ে ক্রিকেট ম্যাচ খেলব। এখানে কে মরবে, কে বাঁচবে নিশ্চয়তা নেই।
আরিশ কথাটা বলে ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তবে সম্পূর্ণ ছিলো এনির চোখের আড়ালে। এনির ভয়াতুর মুখ দেখে হাসি ও পাচ্ছিলো খুব। কিন্তু এই মুহূর্তে হাসা যাবে না। নিক যদি জানতে পারে ওর বউকে নিয়ে মজা নিয়েছি তবে জীবন্ত কবর দিয়ে আসবে তাও নর্দমার ভিতরে। আরিশ আলতো করে সরে যায় এনির সামনে থাকে। অথচ এনির কোনোদিকে খেয়াল এই নেই। সে কোন ভাবনায় ডুবে আছে কে জানে?
চারপাশে গুলির আওয়াজে হুট করেই এনি আৎকে উঠে। চারপাশে কেমন অদ্ভুত শূন্যতা। সামনে আরিশের কোনো অস্তিত্বও নেই। আরিশের কথাগুলো এখনও কানে বাজছে। কিশোরি মন ছটফট করছে। কেমন হাহাকার আর শূন্যতা চেপে ধরেছে। এনি নিশ্বাস নিতে পারছে না। এইভাবে ছটফট করতে করতে কত সময় পার হয় এনি জানে না। কাঁপা হাতে নিকের মোবাইলে আবার ও ফোন করে। সামান্য কিছুক্ষণ কল হতেই ওপাশ থেকে রিসিভ করে। এনি এক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করলো না। ছটফট গলায় উচ্চারন করে,
” আ.. আপনি কোথায় আছেন?
নিকের কপাল কুচকে আসে।।কন্ঠ কেমন অস্বাভাবিক লাগছে। নিক গম্ভীরতা নিয়ে বলে,
” কি হয়েছে? অসুস্থ অনুভব করছো?
এনি এদিক -সেদিক তাকায়। কিভাবে মিথ্যা বলবে সে? জড়তা নিয়ে বলে,
” হ.. হ্যা।
নিক বসা থেকে উঠে যায়। মুহূর্তে আবার দাঁড়িয়ে যায়। এনির খারাপ লাগছে আবার এইটা তাকে জানাচ্ছে। অসম্ভব! এই মেয়ে মরে যাবে তবুও তাকে কিছু জানাবে না। নিজের ঘাড়ত্যারা বউকে সে ভালোভাবেই চিনে।নির্ঘাত এখানে কিছু একটা আছে! নিক গলা কেঁশে বলে,
” কি হয়েছে?
এনি ঠোঁট চেপে ধরে বলে,
” বাড়ি ফিরবেন কখন?
নিকের কপাল আবার ও কুঁচকে আসে। হুট করেই চোখ যায় আরিশের দিকে। আরিশ মিটিমিটি হাসছে। নিক ফোনটা মিউট করে আরিশের কলার চেপে ধরে। দাঁত পিষে বলে,
” কি কুকাম করে এসেছিস?
আরিশ মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে বলে,
” কি করেছি আমি?
” হাসছিস কেনো এইভাবে?
” বউয়ের সাথে কাটানো মুহূর্ত গুলোর কথা মনে করে হাসছি। তর কি?
নিক ধমকে উঠে,
” মিথ্যা বললে জবান ছিঁড়ে ফেলব। নির্ঘাত কিছু একটা করে এসেছিস। নয়ত যে মেয়ে আমার ছায়া সহ্য করতে পারে না সে হুট করে আমাকে বাড়ি ডাকবে কেনো?
আরিশ দুষ্টু হেসে বলে,
” বেশি কিছু বলে নি দোস্ত। শুধু তর কিছু কাহিনী বলেছি। তবে একটা মিথ্যে বলেছি। কিন্তু কল্পনাও করি নি তীঁরটা কাজে লাগবে।
নিকের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে,
” কি করেছিস?
আরিশ গলা কেঁশে বলে,
” বলছি ভাই। আগে বল মারবি না?
নিক কলার আরও চেপে ধরে বলে,
” আর একটা ড্রামা করলে এই ছাব্বিশ তালা থেকে ফেলে দিব।
আরিশ কিছুটা ভয় ভয় নিয়ে বলেছি,
” বলেছি আজ তুই একটা খুনের উৎসবে যাবি। আর সেখানে যে কোনো একদল টিকে থাকবে। তর মৃত্যুও হতে পারে এতে। যাতে তর জন্য বেশি বেশি করে দোয়া করে। কিন্তু আমি যা বলেছি যাস্ট প্রমান পাওয়ার জন্য বলেছি। এনি যদি তকে ভালো না বাসত তবে কখনো তকে ফোন করত না নিক। তকে তার কাছে ডাকছে তার একটাই কারন হতে পারে। যাতে তুই সেখানে যেতে না পারিস। বন্ধুর সংসার বাঁচাতে একটু ড্রামা করেছি। মারিস না ভাই!
নিকের চোখ ছোট ছোট হয়ে আসে। ছেড়ে দেয় আরিশের কলার।।ঠোঁটের কোণে দৃশ্যমান হয়ে উঠে অদ্ভুত বাঁকা হাসি।
নিক ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখে এখনও ফোন চলছে। মিউট খুলে গম্ভীর ভাব নিয়ে বলে,
” কাছে ডাকছো?
এনি দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
” বাড়ি ফিরবেন কখন সেটা জিজ্ঞাসা করছি।
” কেনো?
” কেমন যেন অস্থির লাগছে।
” আর?
” মাথা ঘুড়াচ্ছে।
” আর?
” বমি- বমি পাচ্ছে।
” আর?
” পুরো শরীর ব্যাথা করছে।
নিক দীর্ঘ শ্বাস ফেলে।।গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” এসিডিটির সমস্যা। মেডিসিন নাও ঠিক হয়ে যাবে।
নিক কথাটা বলে থামতে পারে নি। পাশের থেকে আরিশ উঁকি মেরে বলে,
” কিরে মামা লক্ষণ তো ভালো নয়। বউ প্রেগন্যান্ট করে ফেললি নাকি? সবই তো প্রেগনেন্সির লক্ষণ!
নিক চোখ রাঙ্গিয়ে তাকায়। আরিশ -অধিরাজ হেসে উঠে। এনি ওপাশ থেকে কথা না বুঝলেও এইটা বুঝেছে এখানে সবাই আছে। নিক টেবিলের উপরে এক হাত রেখে বলে,
” ওয়েট করো বেবিগার্ল, খুব দ্রুতই ফিরছি। যদি তোমাকে অসুস্থ না পায় তবে বাজেভাবে আ্যকশন নিব।
এনি চট করে ফোন কেটে দেয়। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে বসে পড়ে ডিভাবে। সে কি করেছে ভাবতেই হতভম্ভ হয়ে যায়। যদি নিকের কিছু হয়ে ও যায় তাতে ওর কি? সে কোনো কিছু মুহূর্তের জন্য এইভাবে বেপোরোয়া হয়ে উঠেছিলো! নিজের এমন অদ্ভুত কাজে নিজেই বিরক্ত হয়ে উঠে।
মাটির অনেক নিচে এক পরিত্যাক্ত রুম।।সেখানে লুকিয়ে থাকা সেই পরিত্যক্ত রুমটি সময়ের কাছেই পরাজিত এক মৃত অধ্যায়। চারদেয়ালের গায়ে জমে থাকা শ্যাওলা আর কালচে ছত্রাক অন্ধকারের সঙ্গে মিশে এক বিকৃত নীরবতা তৈরি করেছে। ভেজা মাটির গন্ধ বাতাসে এতটাই ঘন যে নিশ্বাস নিলেই বুকের ভেতর অস্বস্তি জমে ওঠে। সেই নোংরার মধ্যে একটা স্টিলের চেয়ারের মধ্যে বসে আছে কায়াত। কারোর ফোনের অপেক্ষায়। চোখ -মুখে এক অদ্ভুত হিংস্রতা। প্রতিহিংসার আগুনে দাউ -দাউ করে জ্বলছে তার শরীর। হুট করেই বেজে উঠে সেই ফোন। কায়াত ফোনটা রিসিভ করে বলে,
” খবর কি?
ওপাশ থেকে বার্তা আসে,
” আপনার খোঁজ চলছে শহরের আনাচে -কানাচে।।নিক জেভরান ক্ষেপেছে বস।।পাগলা কুত্তার মত আপনাকে খুঁজছে।।এখন বের হওয়ার দরকার নেই।
কায়াত চিৎকার করে উঠে,
” খানকির পোলা তুই কি ওই কুত্তার বাচ্চার গুণ গাওয়ার জন্য ফোন দিয়েছিস?
ওপাশ থেকে ভয়াতুর কন্ঠ আসে,
” সরি বস।
কায়াত শান্ত হয়ে বসে।
” খেলা শুরু কর।।এইবার সেও দেখনে কায়াত কি জিনিস!
” কি করব বস?
” ওই গ্লাসমিনারে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দে।
” কিন্ত বস এর চারপাশে বহু দুর পর্যন্ত সিকিউরিটি রাখা। অনেকে বলে মাটির নিচেও নাকি গুপ্ত হিসেবে আছে। পায়ের শব্দ পেলেই সজাগ হয়ে উঠে।
কায়াত ভাবুক গলায় বলে,
” ওদের প্রাইভেট জেট কবে ইতালি যাবে?
” কোনটা বস?
কায়াত আবার ও গর্জে উঠে,
” কুত্তার বাচ্চা তদের আবর্জনা খাইয়ে পেলেছি আমি? বার বার প্রশ্ন করলে মেরে নদীতে ভসিয়ে দিব।
” সরি বস।।
কায়াত আঙ্গুল কামড়ে বলে,
” কাল রাতে একটা ছাড়ার কথা। এই সময়ে কিছু অবৈধ মাল ইতালি সাপ্লাই হয়। সেখানে নিক ও উপস্থিত থাকবে। এক কাজ কর, ওই সময়ে জ্বালিয়ে দে সব কিছু। ওই কুত্তার বাচ্চাকে ও আগুনে জ্বালিয়ে মার। এতদিন অনেক সহ্য করেছি। এইবার আমার খেলা শুরু হবে। ওর শরীরটা যাতে এমন ভাবে পুড়ে যায় যেখানে এক পিন্ড মাংস ও কেউ খুঁজে না পায়। কাল রাতে বোমা ছুঁড়ে মারবি সেদিকে। পুড়ে-ছাই হয়ে যাক সব কিছু।
” ওকে বস। যেভাবে বলেছেন সেভাবেই হবে।
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৫৮
ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া মাত্রই কায়াতের ওষ্ঠাধরে এক বক্র ও ক্রূর হাসির রেখা প্রস্ফুটিত হলো। পরক্ষণেই নিস্তব্ধ প্রকোষ্ঠ বিদীর্ণ করে প্রলয়ংকরী এক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সে। সেই হাসির শব্দে যেন কোনো আদিম ও পাশবিক লালসা মূর্ত হয়ে উঠল। তার কণ্ঠ নিঃসৃত সেই হাস্যধ্বনি ছিল কর্কশ এবং কর্ণবিদারক। মনে হচ্ছিল সহস্র লৌহশৃঙ্খলের ঘর্ষণজনিত কোনো এক বীভৎস আর্তনাদ চারপাশের বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। এতে উল্লাস ছিল না ছিল কেবল এক পৈশাচিক উন্মাদনা। যা শ্রবণমাত্রই হৃদপিণ্ডে হিম। সেই প্রকম্পিত হাসির রেশ অন্ধকার কক্ষের প্রতিটি কোণকে যেন এক বিভীষিকাময় নরকে রূপান্তরিত করল। বাতাসের স্বাভাবিক স্পন্দন স্তব্ধ হয়ে যায়। আর সেই পৈশাচিক নাদ যেন এক অমোঘ অভিশাপের ন্যায় শূন্যে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
