Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৫

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৫

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৫
নূরজাহান আক্তার আলো

_’ আমি সন্তান হারানোর ভার আর সইতে পারব না। আমার ভেতরের সবটুকু শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। তুই ওসব ছেড়ে দে। বাবা আছি তোর পাশে।’
শারাফাত চৌধুরীর উক্ত কথাটি শুনে কেন জানি শুদ্ধর হাসি পেল। তার ঠোঁটের কোণে ব্যাঙ্গাত্নক হাসি ফুটে উঠল। রুবাবকে ইশারায় পানিভর্তি জগ দিতে বলে ধীর কণ্ঠে বলল,
_’রাজনীতি রান্নাবাটি খেলা তা তো জানতাম না! এই ধরলাম, কিছুদিন মন ভরে খেললাম তারপর ভালো লাগল না ছুড়ে ফেললাম, বাহ! দারুণ তো! তা মি. শাহরিয়ার চৌধুরী, আবেদন করেছেন ভালো কথা। উনারা কি মঞ্জুর করেছে? আমি যতটুকু জানি, আপনার আবেদনটি মঞ্জুর হয় নি; হবেও না। তাহলে কিসের আশায় বাবার বিজনেস দেখার দিবাস্বপ্ন দেখছেন?’

আচমকা শুদ্ধর সূক্ষ্ণ খোঁচামার্কা কথায় সবাই চমকে তার দিকে তাকাল। ধাঁরালো কথার ধাঁচে ভ্রুজোড়া আপনাআপনি কুঁচকে গেল। অথচ শুদ্ধর চোখে-মুখে বিকার নেই। কারো দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধও করল না। পূর্বের মতোই ধীরে সুস্থে খাওয়াতে মন দিলো। বুঝল কয়েকজোড়া চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। তবুও কোনো হেলদোল দেখা গেল না। কিছুক্ষণ পর ঘাড় ঘুরিয়ে সাম্য-সৃজনের দিকে তাকাল। দুজনই খাওয়া শেষ করে চুপ করে বসে বড়দের কথা গিলছে। তাদের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই পাজি দুটো তড়িঘড়ি উঠে দৌড়ে পালাল। তখন সাফওয়ান চৌধুরী শুদ্ধর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
_’তুই শিওর আবেদন মঞ্জুর হয় নি?’
_’ শিওর না হলে বলতাম না নিশ্চয়ই।’
_’তারমানে নির্বাচন হবে?’
_’হবে এবং প্রার্থীকেও শেষ অবধি মাঠে থাকতে হবে।’
শুদ্ধর কথা শুনে শারাফাত চৌধুরী কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
শেষে এসে কী না তরী ডুবে গেল? ছেলেকে ঘরমুখো করার এটাই দারুণ সুযোগ ছিল। তারপর কিছু একটা ভেবে পুনরায় মুখ খুললেন,

_’ সায়ন যখন চাইছে না তখন এসবে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজেদের অফিস আছে, ব্যবসা আছে, হালাল পথে পরিশ্রম করে খাবে। দরকার হলে টাকা দিয়ে হলেও এসব আটকাও।’
_’আমার এত টাকার গরম নেই, ঠেকাও পড়ে নি। তোমার ছেলে আমার কথায় রাজনীতিতে ঢুকে নি যে যখন যা হবে তার দায়ভার আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে। তোমার মেলা টাকা তুমি করো গিয়ে। আর তোমার ছেলে ফোন ধরছিল না দেখে আমাকে কল করে খবরটা জানানো হয়েছে।’
একথা শুনে বড়রা চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। এবার কি হবে? তখন শুদ্ধ শেষ লোকমা মুখে পুরে ধীরে সুস্থ খেয়ে আবারও বলল,

_’ শাহরিয়ার চৌধুরী রাজনীতি ছেড়ে দিক, নির্বাচন না করুক, ব্যবসায়ী হোক তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। লাভও নেই। পয়েন্ট হচ্ছে, তার প্রতিদ্বন্দি সুযোগ পেলেই তাকে রাস্তায় শুইয়ে গলায় ছুরি চালাতে দেরি করবে না। রাজনীতি করা মানুষরা ক্ষমতা ছাড়া ঢোঁড়া সাপের মতোই বিষহীন। জায়গামতো কামড়ালেও বিষ লাগে না। এখন যেই দাপটে ঘুরে বেড়াচ্ছে দুদিন পর থাকবে না। তখন তাকে মারতেও খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা না। সবই ক্ষমতার খেলা। আমার কথাগুলো জঘন্য লাগছে তাই না? লাগারই কথা, সত্য কথা বরাবরই তিতা কী না।’
শুদ্ধ হয়তো আরো কিছু বলত কিন্তু তার আগেই সিতারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললেন,
_’তা কেন করবে? কি করেছে আমার সায়ন? ছাতার রাজনীতি করবে না তাতেও দোষ? ওদের জানে কি মায়া দয়া কিছু নেই? একবার মারল আবার কেন মারবে?’
একথা বলে সিতারা চৌধুরী কাঁদতে লাগলেন। কতবার বলেছিল এসবে না ঢুকতে। শুনে নি ছেলেটা। আজ উনাদের কথা শুনলে আজকের দিন দেখতে হতো না। রাজনীতি করতেই হবে? না করলে কী মানুষ বাঁচে না? শুদ্ধর কথা শুনে শারাফাত চৌধুরী শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে রইলেন। শুদ্ধ বুঝেও তাকাল না বাবার দিকে। ধীরে সুস্থে খাবার শেষ করে হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়াল। রুমের যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই তখন সায়ন বলল,

_’ তুই নেই তো এর পেছনে?’
শুদ্ধ এতক্ষণ নিজেকে সামলালেও এবার আর রাগ দমাতে পারল না।আজকাল সবাই তাকে গুটির মতো পেয়েছে। যে যেভাবে পারে বলতে শুরু করেছে। এমনিতেই মাথাটা গরম ছিল সায়নের কথাখানা আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজে দিলো। এতক্ষণ নিজে নিজেকে সংবরণ করলেও এবার ক্ষ্যাপা সিংহের মতো গর্জে উঠল,
_’ খেয়ে কাজ নেই আমার? এত সস্তা ভাবো আমাকে? তোমার যদি এত
সমস্যা হয় রাজনীতিতে ঢুকেছিলে কেন? এখন পিছিয়ে বীরত্ব দেখানো হচ্ছে? এই বীরত্ব আগে কেন দেখাও নি? আচ্ছা, একটা কথা বলো তো?
আমি তোমাকে বলেছিলাম রাজনীতি করতে? বলেছিলাম নির্বাচনের ভূত মাথায় নিতে? যখন যা করেছ নিজের সিদ্ধান্তে করেছ তাহলে আমি
আমার বউ বাচ্চা সাফার করব কেন? বলো কেন? আজকে কথা যখন উঠলই আমার সব প্রশ্নের জবাব চাই! বলো তোমার রাজনীতি, তোমার নির্বাচনে আমরা কেন সাফার করছি? কেন করব! ভালো? কোন ভালো লাভের আশায় পিছিয়ে যাচ্ছ? ভবিষ্যত? ভবিষ্যতে তোমার রাজনীতির রোষানলে পড়ব না এর গ্যারান্টি দিবে? কারো জীবনের গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে? আর বর্তমান? বর্তমানকে পাশ কাটাবে কিভাবে? তোমার প্রচার করাতে গিয়ে আমি কালার খেয়ে বসে আছি। তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে মাঠে নামলাম, পুরো দমে প্রচার করে সকলের নজরে পড়লাম, খুনের হুমকি পেলাম। এখন তুমি এসে বলছো নির্বাচন ই করবে না। বাহ্, কি দারুণ আবদার! করবেই না যখন হসপিটালে বারণ করো নি কেন? কেন কুকুরের মতো খাটিয়ে নিলে? মানুষ মনে হয় না আমাকে? আমি সস্তা? না বলতেই বিপদ আপদে সবার আগে ছুটে বলি এই মূল্য দিলে? এটাই তোমার বোনের ত্যগ্যের প্রাপ্য?’

সায়নসহ উপস্থিত সকলে হতভম্ব হয়ে শুদ্ধর রাগান্বিত মুখপানে তাকিয়ে রইল। রাগে ছেলেটার ফর্সা মুখটা থমথম করছে৷ তার দিকে যখন প্রশ্ন উঠেছে সেও আজ থামবে না। এতদিন নিজের কথা না ভেবে যত বিপদ আপদ একা হাতে সামলেছে অথচ এখন অনায়াসে তারই দিকে আঙুল তোলা হচ্ছে। সে পকেট থেকে ফোন বের করে রেকর্ডিং অন করল। এক মধ্যেবয়সী লোক শুদ্ধকে সরাসরি অফার করছে, শুদ্ধ যেন রাজনীতির মাঠে নামে। দরকার হলে শুদ্ধকে মন্ত্রীর আসনেও বসাবেন। এজন্য যখন যা করা লাগবে উনি নিজে সব করবেন। কথাখানা সে যেন ভেবে দেখে। এরপরের রেকর্ডিং ছিল কেউ থ্রেট দিচ্ছিল শুদ্ধকে। শুদ্ধ দলে না এলে সায়নের পূর্বের একটি ভিডিও ছেড়ে দেবে। ভিডিওটা হচ্ছে এক নির্জন রাস্তায় সায়ন কাউকে জবাই করছে। শীতল খুন করে জেল খেটে বের না হতেই যদি সায়নের এ ভিডিও ফাঁস হলে কেমন হবে? চৌধুরীরা মাথা তুলে পথেঘাটে চলতে পারবে তো? বুক ফুলিয়ে নিজেদের শিক্ষার গর্ব করতে পারবে তো? প্রচার চালাকালীন এভাবে একের পর এক হুমকিও এসেছিল। শুধু তাই নয়, দুইবার বাড়িতে সাদা কাফন পার্সেল পাঠানো হয়েছিল। তার নামে উড়ো চিঠিও এসেছিল যে, সায়ন নির্বাচনে জিতলে শুদ্ধর কাটা মাথা উপহার পাবে। তাও থামে নি সে বরং জানপ্রাণ দিয়ে প্রচার চালিয়ে গেছে। আর এতে তার ফেস হাইলাইট হয়ে গেছে। অন্যরা বুঝে গেছে সায়ন সিংহ হলে তার ছোটভাই ধূর্ত বাজপাখি। সময় সুযোগ বুঝে নিশানা ছুঁড়ে শিকার তুললে ওস্তাদ এ ছেলে। একে একে সব রেকর্ড অফ হতেই শুদ্ধ পুনরায় বলল,

_’এতদিন রাজনীতির দোহায় দিয়ে অনেক দায়িত্ব এড়িয়ে গেছো। সেসব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে এসে পড়েছে। ভাই আমার, দায়িত্বও আমার ভেবে সেসব সামলে এসেছি। যত ঝড় গেছে র্নিভয়ে বুক পেতে দাঁড়িয়ে গেছি, কারণ পরিবার আমার, ভাই আমার, ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্বও আমার। আমি কখনো চাই নি হেরে যাও, পিছিয়ে পড়ো তাই শীতলের
এ অবস্থাতেও প্রচার চালিয়ে গেছি। আমি বাবা হতাম। আমারও একটা সন্তান হতো, জানো? বলেছে কেউ? সেই সন্তান কেও হারিয়েছি। যখন বিপদ চারদিক থেকে ঘনিয়ে এসেছে তখন আমার সন্তানকে হারিয়েছি।
সেই সন্তানকে কবর দিয়ে উঠতেই কল এসেছে রবির লোক আজমকে মেরেছে। তখন ভঙ্গ হৃদয় নিয়ে তোমার পার্টি অফিস সামলাতে গিয়েছি।
পাবলিক যেন তোমার সাপোর্টে থাকে প্রতিনিয়ত সেই চেষ্টা চালিয়েছি। অথচ তুমি আজকে এক চুটকিতে আমার সব কষ্টটুকু পায়ে পিষে দিলে। বাবার আর্দশ সন্তান হতে উঠে পড়ে লাগলে। অথচ ওইসব ছাঁইপাশ না
করে যদি ল্যাবেও সময়টুকু ব্যয় করতাম তাহলে অর্থ, সাফলতা হাতের মুঠোয় থাকত। শুধু তাই নয় তোমার রক্ষার্থে আমি নিজেও ন্যায়-অন্যায়
অনেক কিছু করে ফেলেছি। সেসব সূত্র ধরে কেউ আমাকে শ্যুট করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি প্রস্তুত! তুমি সাধু সেজে বাপের অফিসে বসতেই পারো। যাও বসো! আমাদের ভালো চাওয়ার অজুহাতে পিছিয়ে যেতেই পারো। তাই যাও! আমরা ভাই! ভাই করে এতদিন নাহয় সাফার করেছি, আরো করব! আরেকজন তো ভাইকে বাঁচাতে খুন করে জেল খাটছে। স্বেচ্ছায় খুনী তকমা নিয়ে খুব সুখেই দিন কাটাচ্ছে। জেল থেকে বের হয়ে বিধবা হবে নাহয়, তাতে কি? তাছাড়া খুন করেছে, একা একা
জেল খাটছে, বাবাকে হারিয়েছে, অনাগত সন্তান কে হারিয়েছে, এসব শোক একে একে কাটিয়ে উঠছে, ধীরে ধীরে বিধবার শোকও কাটিয়ে উঠবে, ইন শা আল্লাহ।’
এইটুকু বলতেই সায়ন চিৎকার করে কান্নাভেজা সুরে বলল,

_’থাম ভাই! দোহায় লাগে আর বলিস না। আল্লাহর কসম করে বলছি তোদের ভালোর জন্য এই সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিলাম। আমি বুঝতে পারি নি এর আগে পিছেও এতকিছু! বোনকে ওই অবস্থায় দেখে মাথা কাজ করছিল না। সহ্য করতে পারছিলাম না আমি! ভেবেছিলাম রাজনীতির জন্য এতকিছু রাজনীতি না করলে যদি সব ঠিক হয়। যদি তোরা ভালো থাকিস! এছাড়া আর কিছু না!’
এইটুকু বলে সায়ন বাহুতে মুখ লুকিয়ে শব্দ করে কাঁদতে লাগল। শুদ্ধ
দেখেও থামাল না বরং হনহন করে উপরে চলে গেল। সায়ন কতবার ডাকলেও শুনল না, পেছন ফিরেও তাকাল না। এমতাবস্থায় বাকিরাও
কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলেন না। সকলে ভেবে দেখলেন শুদ্ধর প্রতিটা কথা যুক্তিযুক্ত। সায়ন ভাবছিল ভবিষ্যত নিয়ে আর শুদ্ধ বর্তমান নিয়ে।
কিন্তু ঝোকের বশে বাকিরা ভুলেই বসেছিল বর্তমান সুন্দর হলে তবেই না ভবিষ্যত উজ্জ্বল হয়। আগে গাছ লাগাতে হয় তারপরে না সুমিষ্ট ফলের আশা করতে হয়। আর রাজনীতি জিনিসটা জটিল ধাঁধার মতো। এখানে পা রাখা সহজ হলেও সময়ের ব্যবধানে সেটা অদৃশ্য শক্তপোক্ত শেকলে পরিণত হয়। দিনকে দিন সেই শেকল পাকাপোক্ত হয়। ছড়াতেও থাকে নিজের মতো করে, কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলে সেই শেকল চাইলেই ভাঙা যায় না। নিজে মুক্ত হয়ে ফেরা পথ থাকে না।
দুপুরের পর রুম থেকে বের হয় নি শুদ্ধ। কারো ডাকে সাড়াও দেয় নি।

বিকেলের দিকে হাসানের জরুরি কল পেয়ে দেখা করতে যাচ্ছে। অর্ক, কামরান, স্যান্ডি তিনজন যাবে হাসানের ছেলের জন্য উপহার কিনতে। বেশ কিছুদিন হয়েছে হাসানের একটা ছেলে হয়েছে। নানান ঝামেলায় বাচ্চাটাকে একপলক দেখেই স্বর্ণের চেন দিয়ে এসেছিল সে। কিন্তু অর্ক, কামরান, স্যান্ডি সায়নের জন্য দেশের বাইরে থাকায় দেখতেও পারে নি। তাই তাকে নিয়ে যাবে গিফ্ট কিনতে। আসলে এসব অজুহাত মাত্র তারা আসলে আড্ডা দিতে চাচ্ছে। মন ভালো করানোর জন্য তার থেকে সময় চাচ্ছে। খুব ভাগ্য করে বন্ধু পেয়েছে কী না। রেডি হয়ে বের হয়ে কাউকেই দেখতে পেল না, ড্রয়িংরুমও ফাঁকা। আশেপাশে কারো সাড়াশব্দও নেই।
ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বাইরে আসতে দেখা গেল রুবাব, সায়ন ঘাসের উপর পা মেলে দিয়ে বসে পেয়ারা খাচ্ছে। সাম্য-সৃজন প্রজাপ্রতি ধরার জন্য ছুটাছুটি করছে। একটুদূরে ঐশ্বর্য, স্বর্ণ খালি পায়ে ঘাসের উপর হাঁটছে।
শখ চলে গেছে কিছুক্ষণ হলো। শারাফাত, সাফওয়ান চৌধুরী আসরের নামাজ পড়ে আর বাড়ি ফিরেন নি৷ মাগরিবের নামাজ পড়ে একেবারে ফিরবেন বোধহয়। সিমিন, সিরাত, সিতারা তিনজাকে দেখা গেল সবজি বাগানে। পুঁইশাকের ডগা বেঁধে দিচ্ছেন। বাগানের এককোণে থাকা মস্ত বড় লেবুর গাছটা লেবুর ভরে মাটিতে নুঁইয়ে পড়েছে। বারোমাস লেবু হয় গাছটাতে। এত রস! বেগুনের গাছগুলো মরে গেছে৷ লাল শাকের বীজ ফেলা হয়েছিল সেই কবে, শাকের পাতাগুলো পোকাতে খেয়ে ফেলেছে। টমেটোর গাছগুলো পানি না পেয়ে রোদে পুড়ে মারা গেছে৷ আলু গাছও তাই। কাঁচা মরিচের গাছগুলো যায় যায় অবস্থা, কয়েকটা মরিচ আছে দেখে সিরাত তুলে নিলেন। তিন জা অনেকদিন পর এদিকে এসেছেন।

পূর্বে যেভাবে নিজেরা সবজির গাছ লাগাতেন আজকেও তাই করলেন।
নতুন করে লাউ, বেগুন, টমেটোসহ লালশাকের বীজ ছিঁটালেন। গাছে পানি দিলেন। লেবুর ডাল কেটে লেবু গুলো ছিঁড়ে নিলেন। এত লেবু কি করবেন বুদ্ধি পেলেন না তখন সিমিন বললেন, লেবুর আচার বানাবেন।
লেবুর আচার অর্ক টা খুব পছন্দ করে। বাকি লেবু দু’একটা করে ভাতের সাথে খাবেন আর বাকিসব রস নিংড়ে আইসকিউবে আইস করে ডিপ ফ্রিজে রাখবে। যখন যখন লেবুর শরবত বানাবেন আইস কিউব দিলেই হবে। এসব নিয়েই টুকটাক কথা হচ্ছিল উনাদের মধ্যে। তখন বাইকের শব্দ পেয়ে সকলেই ঘুরে তাকালেন৷ সিমিন বললেন,
_’ এ সময় কোথায় বের যাচ্ছিস? দাঁড়া, একটু নাস্তা করে যা।’
_’না, এখন না।’
উনাদের কথা শুনে রুবাব চেঁচিয়ে উঠল,
_’সাইটেশ সাহেব কোথায় যাচ্ছেন?’
_’ কাজ আছে।’
_’কখন ফিরবি?’
_’দেরি হবে।’
_’মিষ্টি জাতীয় কিছু আনিস তো ভাই।’
_’ মিষ্টি জাতীয় কি আনব, নাম নাই?’
_’ এই ধর রাবড়ি, কাজু বরফি, কেশর পোড়া, রাজভোগ এসব আর কি।’
_’হুম।’
তাদের কথার মাঝে ইতিউতি করে সায়নও ডাকল,
_’ভাই শুনে যা।’

শুদ্ধ টু শব্দ না করে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল। সায়ন করুণ দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে দেখল। ভাইকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছে ভেবে দুপুর থেকে একদন্ড শান্তি পায় নি। অপেক্ষায় ছিল শুদ্ধ কখন বের হবে, কখন কথা বলবে।
কিন্তু সুযোগই তো দিলো না। সে দুই হাতে মাথার চুল খামচে ধরল আর কিছু ভালো লাগছে না। পরে শুদ্ধর কথাগুলোয় অনেক ভেবে দেখেছে,
শুদ্ধ ঠিক তার এগোনোর সুযোগ নেই, পিছানোরও সুযোগ নেই বর্তমানে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। দুপুরের ঘটনার পর রুমে গিয়ে দেখে সত্যি তার ফোনে কয়েকটা কল এসেছে। কলব্যাক করে শুনল তার আবেদন গ্রহন করা হয় নি৷ অর্থাৎ নির্বাচন হবেই। এবং সেটা সামনে সপ্তাহে হাতে আর মাত্র সাতদিন! তারমধ্যে ৪৮ ঘন্টা আগেই প্রচার বন্ধ করতে হবে।
৪৮ ঘন্টা মানে দুইদিন আগে তাহলে হাতে থাকল মোট পাঁচদিন। আর পাঁচদিনে জানপ্রাণ দিয়ে প্রচার চালিয়ে যেতে হবে। সকালের দিকে পার্টি অফিসে গিয়েছিল একবার সন্ধ্যায় আরেকবার যাবে। আসলে ভাঙা পা নিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তবুও কিছু করার নেই। মাগরিবের আজানের পর রুবাবের সাহায্যে পার্টি অফিসে গেল সায়ন। মনের সকল দোটানা ঝেড়ে ফেলে পূর্বের মতো প্রানবন্ত হয়ে সকলের সাথে আড্ডায় বসল। আজমরা আজকের শেষ প্রচার সেরে এসে হইহই করতে লাগল।

এভাবে রাত বারোটা বেজে গেল। রুবাব ঘন্টা দুয়েক আগে শুদ্ধর কিনে পাঠানো হাতভর্তি খাবার নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। বাকিদেরটা বুঝে দিয়ে আরেকটা প্যাকেট নিয়ে গেছে ঐশ্বর্যের কাছে। মেয়েটা রাবড়ি খেতে খুব পছন্দ করে। তবে সেটা নামকরা মিষ্টাণ্ণ ভান্ডারের দোকানেরই হতে হবে৷
ওই দোকানের রসমালাই পছন্দ করে শীতল। শখের পছন্দ কাজু বরফি।
স্বর্ণের মিষ্টি তেমন পছন্দ না তবে যখন যা আনা হয় টেস্ট করে, এই যা।
দোকানটা চৌধুরী বাড়ি থেকে দূরে বিধায় যখন তখন যাওয়াও হয় না।
শুদ্ধ বাইক নিয়ে বের হচ্ছিল চট করে আনতে পারবে বিধায় তাকে বলা।
আরেকটা কথা না বললেই নয় আসলে ঐশ্বর্যের জন্যই এগুলো আনতে বলেছিল। শুদ্ধ বুঝে সেই দোকানেরই এনেছে৷ অর্কের সঙ্গে দেখা হলে শখের জন্য কাজু বরফি পাঠিয়েছে।বাকিদের জন্য অন্য মিষ্টি কিনলেও, কিনে নি রসমালাই! রসমালাই নিয়ে কাড়াকাড়ি করার পাগলিটাই তো নেই। এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রুবাব। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে চিন্তা হলো ঐশ্বর্যের জন্য। আজকাল ঐশ্বর্য অল্পতেই অসুস্থ হয়ে যায়। কারণে অকারণে কিছু বললে খ্যাচখ্যাচ করে। কদিন ধরে দাঁড়াতেও পারছে না, দাঁড়ালে নাকি মাথা ঘুরছে, খালি নাকি ঘুমাতে ইচ্ছে করে। এত অলস হয়েছে সুযোগ পেলেই শুয়ে পড়ে। শুতে শুতেই চোখের পলকে ঘুমিয়ে কাঁদা। মিষ্টি করে ডাকলে খেঁকিয়ে ওঠে বলে,

_’উহুম, অন্যদিন এখন ঘুমাতে দাও।’
অথচ সে কখনো খাওয়ার জন্য ডাকে। কখনো কেউ ডাকলে ডাকে। সে কি শুধু সেসবের জন্যই ডাকে, আশ্চর্য! আজও রুমে এসে দেখে ঐশ্বর্য ঘুমাচ্ছে। নিজেকে সুন্দর করে গুছিয়ে নিয়ে ঘুমাতে পারে মেয়েটা। এটা অবশ্য খু্বই ভালো দিক। তবে কেন জানি তার এত সুখের ঘুম রুবাবের সহ্য হলো না। হাতের ব্যাগটা রেখে একছুটে ঘুমন্ত বউকে চেপে ধরে চুমু দিতে লাগল। ঐশ্বর্য চমকে উঠে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে তাকে ঠেলতে শুরু করল। চেঁচিয়ে ছাড়তে বলল। অসভ্য, ইতর বলে দু একটা গালিও দিলো। ঐশ্বর্যকে একটু বেশি ছটফট করতে দেখে তড়িৎ ছিঁটকে সরে গেল রুবাব। একটু দূরত্বে দাঁড়িয়ে ইনোসেন্ট ফেস করে বলল,
_’একটাই সিগারেট..!’
_’ভালো করেছ। তোমার ইচ্ছে হয়েছে সিগারেট খেয়েছ এবার আমার ইচ্ছে করছে তোমার গায়ে বমি করার, করব। এদিকে এসো।’
_’আর খাব না।’
_’না খেলে আমিও বমি করব না। এখন যখন খেয়েছ আজকের হিসাব আজকেই শেষ করি। সামনে এসে বসো।’
_’ আচ্ছা আগে ফ্রেশ হয়ে আসি।’

একথা বলে তড়িঘড়ি ওয়াশরুমের দিকে ছুঁটতে দেখে ঐশ্বর্য ফিক করে হেসে ফেলল। বিড়বিড় করে বলেই ফেলল, ‘পাগল একটা।’ তখনই দৃষ্টি গেল প্যাকেটের দিকে সেটা খুলে রাবড়ি দেখে খেতে শুরু করল। কিন্তু একটু খেতেই গা গুলাতে লাগল। দৌড়ে ওয়াশরুমের দরজা ধাক্কাতে লাগল। রুবাব দরজা খুলতে খুলতেই তার গায়েই হরহর করে বমি করে দিলো। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
_’ভালোবাসি জামাইজান।’
রুবাব স্থির হয়ে গাভর্তি বমি নিয়ে মুখে হাসি এঁটে জবাব দিল,
_’ভালোবাসি টু বউজান।’
অতঃপর দুজনই ফিক হেসে ফেলল। এভাবে দেখতে দেখতে কেটে গেল আরো একটি দিন। বাড়ির পরিবেশ আগের তুলনায় থমথমে ভাব কেটে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল। আরো একটা জিনিস লক্ষ্য করা গেল, এবারের নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যেও খুশির আমেজ দেখা যাচ্ছে। ভোট দিতে যাওয়া আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। পাড়ার মোড়ে মোড়ে কত গল্প হচ্ছে। সায়ন আর রবির প্রচার হচ্ছে পুরোদমে। যার কারণে খেলা যেন আরো জমে উঠেছে। তবে সেদিনের পর শুদ্ধর সঙ্গে সায়নের দেখা হয় নি। সায়ন কয়েকবার ডাকলেও শুদ্ধ দেখা করে নি। কিছু একটা নিয়ে সেও ব্যস্ত! কাগজপত্র নিয়ে ছুটাছুটি করছে, যদি এই ব্যাপারে কাউকে কিছু বলেও নি।
সায়ন আরো একটা জিনিস লক্ষ্য করল সিদ্দিকের কোনো খোঁজ নাই।
যতবার আজমকে জিজ্ঞাসা করে আজম মিটমিট করে হাসে। এর মধ্যে কোনো ঘাপলা আছে জেনে সরাসরি ফোন করল শুদ্ধকে। কারণ তার অনুপস্থিতিতে এই দুজনই সব সামলেছে, সব জানে। কল বেজে বেজে প্রায় তিনবারের বেলায় রিসিভ হলো। সায়ন তখন খেঁকিয়ে উঠে বলল,

_’অ্যাই পাগলের বাচ্চা গরু, কোথায় তুই? যেখানেই থাকিস এই মুহূর্তে আমার সামনে হাজির হবি। ভালো করে ডাকছিস কথা কানে ঢুকছে না? বেশি বড় হয়ে গেছো, না? এখন আমাকেও উপেক্ষা করা চু*দা/চ্ছো?
_’তোমাকে না বলেছি আমার সঙ্গে এসব ভাষায় কথা বলবে না?’
_’আসছে সাহেব বাবু। তাড়াতাড়ি আয় কথা আছে।’
_’পারব না।’
_’ আবার বলে পারব না। বোন বাড়ি নেই দেখে সাহস বেড়েছে না?’
_’কাজে এসেছি দেরি হবে।’
_’কোন গর্তে তুই যে, দেরি হবে?’
_’ বলব না।’
_’সিদ্দিক কোথায়?’
_’কোন সিদ্দিক?’
_’জাওরা সিদ্দিক?’
_’চিনি না।’
_’ মেরে মুখ ভেঙে দেব তোমার, বল সিদ্দিক কোথায়?’

_’রাজনীতি করো তুমি অথচ রাজনীতির লোকদের চিনে রাখব আমি? এত ঠেকা পড়ে নি আমার। এসব ব্যাপারে জানিও না। ছাপোষা সাধারণ মানুষ আমি এত বড় বড় ব্যাপারে আর থাকতেও চাই না।’
একথা বলে শুদ্ধ কল কেটে নিজের কাজে মন দিলো। কাগজপত্র উল্টে পাল্টে দেখে জমা দিয়ে বেরিয়ে এলো। শীতলের কেস নিয়ে হাইকোর্টে আপিল করেছে। কয়েকদিন পর আপিলের রায়। দেখা যাক, এবার কি হয়। দিনশেষে সবার জন্য করতে গিয়ে নিজের ভালো থাকাটা হচ্ছে না। এবার সবার আগে নিজের ভালো থাকার কথা ভাববে৷ কিন্তু আসলেই কি পারবে? এটা কি আদৌ সম্ভব? সে গাড়িতে বসে হাত বাড়ির একটা বক্স বের করল। হাসানের ছেলের জন্য গিফ্ট কিনতে গিয়ে এটা নজরে পড়েছিল। এত পছন্দ হয়েছিল যে প্রথমে এড়িয়ে চলে এসেছিল এরপর ফিরে ফিরে আবার কিনে এনেছে। কেন জানি ফেলে আসতে মন সায় দেয় নি। সে ধীরে ধীরে বক্সটা খুলে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, বক্সে খুব ছোটো ছোটো পায়ের জন্য একজোড়া রুপোর নুপুর। মোটা চওড়া নুপুরজোড়া এত বেশি সুন্দর! মৃদু নাড়ালেই রিনঝিন করে বাজে। যখন ছোট্ট একটা ফুল এটা পরে রুমেজুড়ে দৌড়ে বেড়াবে, খিলখিল করে হেসে তাকে দেখামাত্রই ‘বাবা’ বলে ছুঁটে আসবে তখন সেই মুহূর্তটুকু কেমন হবে? ভাষায় প্রকাশ করার মতো কি!

ঘড়ির কাঁটা আর সময় দুটোই চলে নিজস্ব ছন্দে, নিজস্ব নিয়মে। তাদের থামিয়ে রাখার ক্ষমতা কারো নেই, নেই গতি বাঁধার কোনো উপায়। ঠিক তেমনি, সময়ের স্রোতে ভেসে জীবন এগিয়ে চলে অবিরাম এক ধারায়।
এগিয়ে চলে সময়, কাটতে থাকে প্রহর। সেই হিসেবে পেরিয়ে গেল বেশ কয়েকটি দিন। নির্বাচনের প্রচার আটচল্লিশ ঘন্টা আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। যেখানে মাইক, স্লোগান, মিছিলে পুরো এলাকায় সরগরম থাকত, প্রচার বন্ধ হতেই চারিদিক কেমন শান্ত হয়ে গেছে। শুধু পোস্টার-ব্যনারগুলো দেওয়ালে, পিলারের বাঁধা দড়িতে ঝুলছে। নতুন করে লাগানোরও নিয়ম নেই। বেঁধে দেওয়া সময়ে প্রচার শেষ। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গাড়ি নিয়ে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। আগামীকাল সকালে নির্বাচন। এজন্য একটু পরপরই পুলিশের গাড়ি দেখা যাচ্ছে। এখন বাজে রাত আড়াইটা। অথচ ঘুম নেই শুদ্ধ, সায়নের। টেনশনে নাকি অন্য কারণে বোঝা জানা গেল না। দুই ভাই বাড়ির ছাদে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। মাথার ওপরে মস্ত আকাশে মস্ত বড় চাঁদ। দুহাত ভরে জোছনা ছড়াচ্ছে। জোছনার আলোয় চারদিক ভরে উঠেছে। বাতাসে ভেসে আসছে বেলি ফুলের ঘ্রাণ। রাস্তায় মোড়ের কুকুরগুলো ধুলোমাখা রাস্তায় ঘুমিয়ে আছে। নেই বালিশ, নেই কাঁথা, নেই শরীরের নিচে নরম গদির বিছানা তাও কতই সুখে ঘুমাচ্ছে তারা। মা কুকুরটা ঘুমিয়ে আছে আর তার তিনটে ছানা চুকচুক করে দুধ খাচ্ছে। কখনো বা মায়ের চারিপাশ চক্কর মেরে দূরে গিয়ে শুয়ে পড়ছে৷ ছানার আনাগোনা না বুঝে মা কুকুরটি ঘাড় উঁচিয়ে দেখে ডেকে নিচ্ছে কি না বোঝা গেল না, তবে ছানাটি সুড়সুড় করে এসে মায়ের গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। পুরো ঘটনা দুই ভাই দেখল। সায়ন হঠাৎ শুদ্ধর কাঁধে মাথা রেখে চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মলিন সুরে বলল,

_’সরি ভাই।’
শুদ্ধ জবাব দিলো না৷ ভাইয়ের থেকে জবাব না পেয়ে সায়ন ভেজাকণ্ঠে পুনরায় বলল,
_’সত্যি বলছি, তোকে কষ্ট দিতে চাই নি ভাই। তুই তো জানিস তুই আমার ভাই, তুইই আমার বন্ধু। ধ্রুব মারা যাওয়ার পর আমি বন্ধু বানাতে পারি নি। প্রয়োজনই হয় নি কারণ বন্ধুর মতোই সবসময় সবার আগে তোকে পাশে পেয়েছি। কিছু বলার আগেই আমার বেয়াড়া মনের কথা তুই বুঝে নিয়েছিস। ভালো-মন্দ সব কথা তোর সাথে শেয়ার করেছি। তোর জন্য বাড়ির বাইরেও যেতে পারি নি। এ কটাদিন তুই আমার সাথে কথা বলিস নি, দেখা করিস নি, ডাকলে কাছে আসিস নি। তাতেই টের করে পেয়েছি তুই ছাড়া আমি অচল। আমার ভাই ছাড়া আমাকে চালানোর মতো কেউ নেই। মানিয়ে নেওয়ারও কেউ নেই। আজ অনেকদিন পর ধ্রুবকে ভীষণ মনে পড়ছে৷ বুকের পাশটা কেমন যেন করছে। অথচ দেখ এক যুগ ধরে আমি ধ্রুবহারা, বন্ধু হারা। আমার ধ্রুব আমার পাশেও নেই। সঙ্গেও নেই। ঠিক এভাবে কতদিন তার কাঁধে মাথা রাখি নি। ধ্রুব মারা যাওয়ার পর যখন লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতাম তুই তো বলতি তুই আমার আরেক ধ্রুব।

ছোট্ট ধ্রুব। আরেকটা ভাইবন্ধু। আমার পথচলার আরেকটা সঙ্গী। শেষ নিঃশ্বাস অবধি ধ্রুবের মতো করে আমাকে নাকি চালিয়ে নিবি, মানিয়ে নিবি, কখনো আমাকে মাঝপথে ছেড়ে যাবি না। দূরে যাবি না। আজকে
কেন দূর সরে থাকছিস? করলাম নাহয় একটা ভুল তাই বলে কথা বলা বন্ধ করে দিবি? ডাকলেও আসবি না? একবারও ভাবলি না ভাইয়া কষ্ট পাবে? একা একা তড়পাবে? এতটা বেয়াদব তো তুই ছিলি না রে শুদ্ধ?
তাহলে কেন হলি? কবে হলি? তুই তো জানিস শাহরিয়ার চৌধুরী উপরে উপরে শক্ত হলেও ভেতরটা পুরোপুরিই ফাঁপা। তার আসলে কেউ নেই, কিচ্ছু নেই, তবুও এত নিষ্ঠুরতা কেন আমার প্রতি?’

সায়নের চোখের পানি কাঁধে অনুভব করল শুদ্ধ। বাম কাঁধ ভিজে গেছে মুহূর্তেই। হাতের মুঠ শক্ত করে স্থির হয়ে বসে রইল। বোকা ভাইটা জানে সে দূরে আছে অথচ আসলেই কি আছে? নাকি ছিল? তবে এই ব্যাপারে কিছু বললও না, ভুলও ভাঙালো না। এটা পানিশমেন্টটুকু হিসেবেই থাক যাতে ভবিষ্যতে না ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দশবার ভাবে।আপাতত টপিক চেঞ্জ করার জরুরি। কারণ ধ্রুব হচ্ছে সায়নের বুকের আরেকটা সফ্ট কর্ণার বলা চলে। এখন যদি না থামায় তাহলে গুমরে গুমরে ধ্রুবর জন্য কাঁদবে তারপর জ্বর বাঁধিয়ে কাল ছুটে যাবে পাহাড়ে, যেখান থেকে ধ্রুব লাফ মেরে চিরতরে হারিয়ে গেছে পৃথিবীর বুক থেকে। এরপর শুরু হবে আরেকদফা পাগলামি। তাই টপিক বদলাতে দূর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল,

_’রাতের শহর অনেক সুন্দর। চলো ঘুরে আসি?’
_’না। মুড নেই।’
_’তাহলে রুমে গিয়ে ঘুমাও, আমি বের হব।’
_’এতরাতে বের হতে হবে না।’
_’তাহলে বসে বসে মশার কামড় খাও, আমি উঠছি।’
_’ আচ্ছা চল, চা খাওয়াতে হবে কিন্তু।’
_’টাকা নাই।’
_’বোন ঠিকই বলে তুই একটা কিপ্টা।’
_’ বলবেই তো! ৫০ হাজার তো তোমার বোনের গেল না, আমার গেল।
অথচ হসপিটালে থ্রেট দিয়ে ওই আমাকে বিয়ে করেছিল। অথচ এতদিন পর কট খেলাম আমি।’
একথা শুনে সায়ন শব্দ করে হেসে ফেলল। শুদ্ধ কথা বাড়ল না ভাইয়ের হাত ধরে ধীরে ধীরে হাফ সিঁড়ে নিচে নামল। বাকি সিঁড়ি সেদিনের মতো পিঠে নিলো। তারপর দূুজনই পার্কিংলট থেকে বাইক নিয়ে বের করল।
সায়নের বাইক সেদিন কনকের ছেলেপুলেরা নষ্ট করে ফেলেছিল। পরে কেনা হয় নি। তাছাড়া সায়ন বর্তমানে বাইক চালানোর অবস্থাতেও নেই। তাই শুদ্ধর বাইক নিয়ে দুভাই বেরিয়ে পড়ল অজানার উদ্দেশ্যে। বাইক চলতে থাকল শাঁ শাঁ করে। কখনো হাইওয়ে, কখনো উঁচু নিচু মাটির পথ পেরিয়ে। গল্পের তালে তালে শহরের অলি গলি ঘুরল। বাইক থামিয়ে চা খেল। দুজন দুজনকে খুব পচালো। মন খুলে হাসলও। এতদিন পর সুন্দর মুহূর্ত কাটিয়ে ভোরের দিকে বাড়ি ফিরল।

অতঃপর নিজ নিয়মে ভোর হলো। ধীরে ধীরে জেগে উঠল শহর। আজ নির্বাচন। সকাল আটটা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু। বেলা বাড়ার সাথে সাথে দলে দলে মানুষ ভোটকেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। এদের মধ্যে কেউ নতুন ভোটার। তাদের উচ্ছ্বাসটা বেশি। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে যাওয়ার এক আলাদা আগ্রহ। চৌধুরী বাড়ির সদস্যরাও ঠিক সময়মতো গিয়ে ভোট দিয়ে এলেন। সায়ন আটটার পর ঘুম থেকে উঠে আজমকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখল। সবকিছুই স্বাভাবিক। কোথাও কোনো গোলযোগ নেই। এখন পর্যন্ত সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে। যদি কেউ বা কারা সমস্যা সৃষ্টি করতে চায় তাদের কঠোরভাবে দমনের নির্দেশ দেওয়াও আছে। উপর মহলের আদেশ অনুযায়ী পুলিশ বাহিনীও প্রস্তুত। এভাবে কেটে গেল সারাদিন। কত মানুষ এলো, ভোট দিলো, সহি সালামতে আবার ফিরে গেল। তবে যত সময় গড়াতে লাগল ভেতরে ভেতরে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা জমে উঠল। চিন্তায় সায়নের মুখ শুকিয়ে কাঠ অথচ শুদ্ধ তাকে অভয় দেওয়া তো দূর, চিজ পিৎজার
একটা স্লাইস মুখে পুরে ধীরে সুস্থে খেতে লাগল। এদিকে সায়ন একবার উঠছে একবার বসছে৷ টেনশনে এখন অবধি কত লিটার পানি গিলেছে কে জানে। তার অস্থিরতা দেখেও শুদ্ধ পিৎজার আরেকটা স্লাইস খেতে খেতে বলল,

_’কোল্ড ড্রিংকসের ক্যান টা খুলে দাও তো।’
_’পারব না। তুই খুলে খা, দেখছিস না টেনশন করছি?’
_’বার বার উঠ-বস করলে টেনশনও তো ঠিকভাবে টেনশন দিতে পারবে না। এভাবে কেউ টেনশন করে?’
_’শুদ্ধ রে আমার খুব অস্থির অস্থির লাগছে। হেরে গেলে মান-সম্মান থাকবে না।’
এবার শুদ্ধ জায়গামতো খোঁচাটা দিলো,
_’কিছু কিছু মানুষ বলেছিল নির্বাচন করবে না অথচ এখন হারার ভয়ে প্রেসার লো করে ফেলছে, আর কত কী দেখাবে আল্লাহ।’
_’সত্যি টেনশন হচ্ছে বাল।’
_’নাও পিৎজা খাও।’
_’খেলে কি হবে?’
_’পিৎজা খেলে পেট ঠান্ডা। পেট ঠান্ডা তো মস্তিস্ক ঠান্ডা। মস্তিষ্ক ঠান্ডা তো শরীর ঠান্ডা। শরীর ঠান্ডা তো বাকিসব ঠান্ডা।’

_’ তোর মতো কুলনেস আমার নাই রে ভাই। আমার তো পারদে পারদে উত্তেজনা। সেই উত্তেজনায় না শান্ত থাকতে পারছি আর না টেনশন ফ্রি হয়ে বসতে পারছি। ভাই রে, যদি হেরে যাই?’
_’গেলে যাবে। তোমার বোন পরীক্ষার ফেল করে এসে যদি দাঁত বের করে বলতে পারে, বুঝলেন শুদ্ধ ভাই ফেল করাও একটা আর্ট, যা সবাই পারে না।’ তুমি তারই ভাই। বোনের রুলস ফলো করবে৷ অন্যরা নির্বাচনে
জিতে জয়ের ধ্বনি দিয়ে মিছিল বের করে তুমি নাহয় হেরে গিয়ে ব্যান্ড বাজিয়ে নিজের হার স্বীকার করবে।’
শুদ্ধর কথা শুনে সায়ন মুখ ভোঁতা করে তাকিয়ে রইল। বেয়াদবটা একটু অভয় দেওয়া দূর টেনশন আরো বাড়িয়ে দিলো। সে শুদ্ধর শক্তপোক্ত বাহুতে একটা ঘুষি বসিয়ে শুদ্ধর হাতের পিৎজাটাই কেড়ে খেতে লাগল।
ওদিকে চৌধুরী বাড়ির সবাই চিন্তায় কাতর। ছেলেটা শেষ মুহূর্তে নিজের
স্বপ্ন ধূলিসাৎ করতে চেয়েছিল। আল্লাহ আবারও তাকে সুযোগ দিয়েছেন এবার জয়ের হাসিটা যেন সেই হাসতে পারে। যদিও ভোটারদের
উপস্থিতি, আনাগোনা, ভোটের সংখ্যা দেখে বোঝা যাচ্ছিল কোনদিকের পাল্লা ভারী হতে চলেছে। অতঃপর বিকাল চারটা বাজতেই ভোটগ্রহণ শেষ হলো। শুরু হলো ভোট গননা নামে অপেক্ষার আরেকটা অধ্যায়।
ভোট গুনতে গুনতে একেকটা কেন্দ্রের কোথাও রবি এগিয়ে, কোথাও বা সায়ন। এভাবে এক একটা আপডেটের সাথে উত্তেজনা বাড়তে লাগল।
অবশেষে সব হিসাব পাল্টে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিলো শাহরিয়ারের পায়রা। মনে হলো পায়রা যেন ডানা ঝাপটে নিজের জয় নিজেই আনল। মুহূর্তে পুরো জেলায় ছড়িয়ে পড়ল সেই খবর। চারদিকে শুরু হলো উল্লাস, আনন্দ আর বিজয়ের মাতামাতি। এভাবে রাত তখন অনেকটা গড়িয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা এগারোটা পেরিয়ে দৌড়াচ্ছে যেন।

চারদিকে তখনো সবার মুখে মুখে একটাই স্লোগান,
জিতছে কে রে, জিতছে কে?
শাহরিয়ার ভাই ছাড়া আবার কে!
এভাবে স্নোগান দিতে দিতে বেশ কয়েকটা মিছিল বের হলো। সায়ন শুধু তাকিয়ে দেখল। কেন জানি এত উল্লাসের ভিড়েও অদ্ভুত শূন্যতা ঘিরে ধরেছে তাকে। বুকের কাছে একটা চাপ ধরে রেখেছে। সারাদিন ভাইয়ের খেয়াল রাখার জন্য শুদ্ধ আজ সঙ্গে ছিল। টেনশনের সময় পাশে থেকে রাগিয়ে দিয়ে কতবার হাসিয়েছে ঠিক নেই।সবাই যখন তাকে অভিনন্দন
জানাতে ব্যস্ত সায়ন তখন সব এড়িয়ে আচমকা শুদ্ধকে জড়িয়ে ধরল।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। ভাইয়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে শক্ত করে কাপটে ধরল। শুদ্ধ থমকে গেল। মুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল তার। তাদের দেখে আজম থেকে শুরু করে এতদিন যারা দলের জন্য খেঁটেছে তারা এক একে জড়িয়ে ধরল। এই দৃশ্য দেখে
অনেকের চোখের কোণে জল জমল। এই মিলনপর্বটুকু হাইলাইট হলো সোশ্যাল মিডিয়ায়। দলের ছেলেপুলেরা অনেক আগেই সায়নের কাছে আবদার নির্বাচনে জিতলে দামি ব্যান্ড টেস্ট করাতে হবে। সেই কথামতো তাদের খুশি করতে ক্যাশ ছুঁড়ে দিলে বেহায়াগুলো দাঁত বের করে হাসল। অতঃপর এসব করতে করতে রাত প্রায় একটা বেজে গেল। বাড়ির কেউ ঘুমায় নি তাদের নতুন করে অভিনন্দন জানাল। অতঃপর বড়দের ধমক শুনে যে যার রুমে শুতে চলে গেল। কিন্তু সায়ন রুমে গিয়েও শান্তি পেল না। অস্থির হয়ে স্বর্ণকে বলল,

_’সবার এত অভিনন্দনেও বুক ঠান্ডা হচ্ছে না। আমার এখন কি করা উচিত? কি করব আমি? বল না জান?’
স্বর্ণ যেন সহজে বুঝে গেল সায়নের রোগের কথা। সায়নের মাথা বুকে চেপে ধরে মাথায় চুমু আঁকল। ফিসফিস করে বলল,
_’যাবে? বোনের কাছে?’
_’হুম।’
_’চলো তাহলে।’
সায়ন স্বর্ণের বুক থেকে মাথা তুলে জিজ্ঞাসা করল,
_’যাবি তুই?’
_’যাব। যার কারণে আমাদের জয় তার কাছে যাব না?’
_’ কিন্তু এখন তো দেখা করতে দিবে না।’
_’না দিক। কেন্দ্রের লোহার গেটটা নাহয় একটু ছুঁয়ে আসব। ওখানকার আকাশে বাতাসে আমার বোনের নিঃশ্বাস মিশে আছে। বাতাসের কানে কানে নাহয় বলে আসব আমার বোনকে যেন চুপিচুপি বলে আসে,’ এই
বনু, আমরা জিতে গেছি, জিতে গেছে আমাদের লড়াই। জিতে গেছে আমাদের বিশ্বাস।’

সায়ন ছলছল চোখে হ্যা বোধক মাথা নাড়ল। তারপর স্বর্ণের হাত ধরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল উন্নয়ন কেন্দ্রের পথ ধরে। স্বর্ণের জন্য সায়ন ধীরে ধীরে গাড়ি চালাচ্ছে। ভালো রাস্তায় স্পিড বাড়িয়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখের কোণে জমে থাকা জলে রাস্তা ঝাঁপসা দেখাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটার দিকে খেয়াল নেই তবে একটা সময় গাড়ি এসে থামল উন্নয়ন কেন্দ্রের সামনে। উঁচু লোহার গেট। গেটের ওপাশের বন্দি কোনো রুমে
আছে তাদের আদরের ছোটো বোন। তাদের তোতাপাখি। তারা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ইচ্ছে করল গেটটা ভেঙেচূরে ভেতর গিয়ে গলা ফাটিয়ে বলতে, ‘ জানবাচ্চা, পাখি আমার, তুই না মেয়রের বোন হতে চেয়েছিলি? জিতে গেছি বোন। আমরা জিতে গেছি। আমাদের পায়রা জিতে গেছে।’
কিন্তু সেটা সম্ভব না। চাইলে কি এখনই ভেতরে যাওয়া যাবে? না, যাবে না। এখানেও কিছু নিয়ম আছে, সময় আছে। যতই মেয়র পদে বিজয়ী হোক, চরম সত্য হলো সে অসহায় এক ভাই। এসব ভাবতেই ঠোঁট কেঁপে উঠল। মনে গাঁথা কিছু কথা গলায় আটকে গেল। দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কয়েকফোঁটা জল। আজকের এ আনন্দের রাতেও, তাদের সঙ্গে প্রিয় প্রাণটি নেই। এসব নিয়ে যার এত আনন্দ, খুশি, প্রফুল্লতা তারই অনুপস্থিতি সব আনন্দ ফিকে করে গেছে। এসব ভেবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাঙ্গা মন আর ছলছল চোখ নিয়ে দুজনই ফিরে এল। এদিকে এতরাতে গাড়ির শব্দ পেয়ে রুবাব তড়িঘড়ি বেরিয়ে ছিল। সায়ন আর স্বর্ণকে বের হতে দেখে ছুটে গিয়েছিল শুদ্ধর কাছে৷ শুদ্ধর বাইকের চাবি নিয়ে গেট পেরিয়ে বের হতেই দেখে আজম দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে আজম বাইকের পেছনে উঠতে উঠতে বলল,

_’শুদ্ধ ভাই আপনেরে একা ছাড়তে না করছে। আপনে গোস্সা করলেও যাইতে কইছে। গাড়ি জোরে টান দেন ভাই, শাহরিয়ার ভাই কুথায় গ্যাছে শুদ্ধ ভাইরে জানাইতে হইব।’
তারপর সায়নের গাড়ির পেছন পেছনেই তারা গিয়েছিল। দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছিল সায়ন আর স্বর্ণের কাজ। মেসেজ করে শুদ্ধকে জানিয়েছিল।
তারপর তাদের সাবধানে ফিরতে বলে শুদ্ধ অযু করে দাঁড়াল শুকরানা নামাজ আদায় করতে। সিজদায় মাথা ঠেকিয়ে আজও নিজের সব কষ্ট, ব্যর্থতা আর চাওয়া-পাওয়া সঁপে দিল সৃষ্টিকর্তার দরবারে। কারণ, এই একটা জায়গাতেই মনের সমস্ত ভার জমা রাখা যায়। নিঃসংকোচে কথা বলা যায়। গোটা দুনিয়ার সামনে নিজেকে যতই শক্ত করে রাখা হোক না কেন, সৃষ্টিকর্তার কাছে কোনো ভানই চলে না। শক্ত আবরণের প্রয়োজন পড়ে না। লাগে না মুখোশের আড়াল। বরং এখানে আসতেই হয় নিঃস্ব, হত দরিদ্রের বেশে। ডাকতে হয়ে অসহায়ের সুরে। আশ্চর্যের ব্যাপার, এই দরবারে যত বেশি নিজেকে শূন্য করা যায়, মহান আল্লাহ তাকে তত
বেশি অফুরন্ত রহমতে ভরিয়ে দেন। সিজদাহে লুটে পড়ে যত বেশি অশ্রু ঝরানোর যায় মহান আল্লাহ তার তত নিকটবর্তী হোন। তাই সেও ভঙ্গুর, অসহায় বান্দা হয়ে ফরিয়াদ জানাল মন থেকে মহান রবের কাছে। আর তার মনের কথাগুলো ছিল এমন,

_’ হে রহমানুর রহিম, তোমার এই অসহায় বান্দা ভাঙা মন নিয়ে তোমার দরবারে হাজির হয়েছি। তুমি ছাড়া আমার কোনো আশ্রয় নেই, ইয়া রব।তোমার অসীম দয়ার ছায়াতে আমি বেঁচে থাকার সাহস খুঁজি। ভাইয়ের স্বপ্নপূরণ করতে দিশেহারা হয়ে শুধুমাত্র তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করেছিলাম। সেই প্রার্থনা বিফলে যেতে দাও নি মাবুদ বরং আমার কষ্ট
সফলতার রহমতে ভরিয়ে দিয়েছ। তোমার সেই রহমতের দয়ায় আজ আপনাআপনিই বুক ভিজে যাচ্ছে, কৃতজ্ঞতার ভারে অশ্রু ঝরে যাচ্ছে। তোমার দরবারে শত লক্ষ-কোটি শুকরিয়া ইয়া আল্লাহ।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৪

কিন্তু তোমার এই অসহায় বান্দার পরীক্ষা যে এখনো শেষ হয় নি মাবুদ। আমি যে এখনো দাঁড়িয়ে আছি আরেকটি কঠিন পরীক্ষার দ্বারপ্রান্তে। বুকের ভেতরের জমা কথাগুলো বললেও জানো, না বললেও জানো। এ শূন্যতা যে আর সহ্য হয় না। আমি যে বড্ড ক্লান্ত ইয়া মাবুদ, ভাঙ্গুর প্রায় আমার সমস্ত সত্তা। আমাকে রহম করো ইয়া রহিম। হারিয়ে যাওয়া প্রিয় সুখুটুকু ফিরিয়ে দাও। যে সুখের জন্য প্রতিনিয়ত মন কাঁদে, প্রাণ কাঁদে,
সেটা আবার আমাকে করে দাও ইয়া কারিম। হে পরম দয়ালু, আমার বুকের গভীর শূন্যতাকে আবার পূর্ণ করে দাও। আমি যেন এবার জয়ের হাসি হাসতে পারি৷ তাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে পারি। আমি অসহায় বান্দা ফিরিয়ে দিও না মাবুদ।’

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৬

46 COMMENTS

  1. Ektu taratari diben pls! Excitement ba golpo porar interest ta ebhabe dhore rakha jacheena!

  2. ধন্যবাদ আপু এত সুন্দর একটা গল্প দেওয়ার জন্য 🥰🥰❤️❤️🥰🥰🥰

  3. কি বাবা পর্ব দেন 😞🫩 তাড়াতাড়ি দিতে পারেন না 🙃

  4. আররে আপু এত লেট কেনো দিন না পরের পার্ট টা

  5. কি আপু উপন্যাস টা শেষ হবে কবে,আর পরের পর্ব দেন তাড়াতাড়ি 🤨😌💖💖🌹🌹👏👌❤️❤️❤️💘

  6. আপু আপনি কি মরে গেছেন???
    পর্ব টা দেন নাহ

  7. Next part din Apu. …….. Ar koto opekhkha koraben! Already 10 din hoyegeche… Please ebar to din. …….. Ki dukhkhe je running golpo porechilam…… Huhhhh

  8. আপু পরের পর্ব দেন তাড়াতাড়ি 🤨😌💖💐💐🍁💗💗

  9. তারাতারি পরের পার্ট দাও আপু

  10. পরের পার্ট দিন ….. এত দেরি করলে হয়না
    এবার শেষ পার্ট পর্যন্ত আপলোড করবেন please apu.

  11. Tak apu lagbena r golpo dewa. Sobai bishon valobashi tho apnar golpo tai apni erokom koren…😥😥

  12. Apu apni ki doya kore next part ta diben.. ajk 11 din dhore 96 part er jnno wait korci.. taw dissen nh

  13. গত কয়েকটা পর্ব আমি যে পড়ার সময় কি পরিমাণে কেঁদেছি এইটা শুধু আমিই জানি মানে আমার কষ্টে ঠিক বুক ফেটে যাচ্ছিল বাট এখন ভালো সময় আসতেছে আমি চাই শীতল বাড়ি ফিরুক আর ভালো লাগেনা শুদ্ধ আর শীতলের এই অসহায় অবস্থা। প্লিজ আর অপেক্ষা করাবেন না তাড়াতাড়ি পর্ব গুলো দিয়ে দেন।।

  14. Apu kobe asbe next part.. Waiting for it desparetly..🥺!! Pls next part din ami khub excited 96 porber jonno 😃jedin 95 diyechen sedin thekei wait korchi next er jonno..! Pls apu ebr diye din 🥲

  15. আপু পরের পর্ব দেন তাড়াতাড়ি 🤨😌💖 আপনাকে আর গল্প দিতে হবে না 🫩

Comments are closed.