লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৩ (২)
লিজা মনি
নিক তাকিয়ে থাকে এনির দিকে। এনির কাঁপা শরীরটা নিজের সাথে মিশাতে চাইলো। কিন্তু এনির বাড়ন্ত পেটের জন্য নিকের সমস্যা হচ্ছে প্রচুর। এনিকে একদম বুকের সাথে মিশিয়ে নিতে পারছে না। নিক এতক্ষণ খেয়াল করে নি বিষয়টা। মস্তিষ্ক সজাগ হতেই অধৈর্য হয়ে পেটের দিকে চোখ যায় তার।
” পেট এমন ফুলেছে কিভাবে? এসিডিটির সমস্যা! কষ্ট হচ্ছে নিশ্চই খুব। দশ মিনিট অপেক্ষা করো ডাক্তার চলে আসবে। একবার রুম থেকে বের হয় সব কয়টাকে মেরে নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে আসব। আমি না হয় ছিলাম না। তাই বলে তোমার একটু খেয়াল রাখতে পারলো না? বেইমান!
এনির কপাল খানিকটা কুচকে আসে। তার পেটের বাচ্চাকে এসিডিটির রোগী বলে চালিয়ে দিচ্ছে! এনি চোয়াল চেপে নিকের থেকে সরে আসে। সামান্য রাগ দেখিয়ে বলে,
” দুরে সরুন আপনি আমার থেকে।
নিক ঘাড় ঘুরিয়ে এনির দিকে তাকায়। একস্মিক এমন ব্যবহারে নিক কিছুটা বিচলিত হয়ে বলে,
” দুরে সরব মানে? আমার থেকে দুরে সরে বসার সাহস হলো কিভাবে তোমার? কাছে এসো ব্লাড রোজ।
এনি চোখ ছোট ছোট করে তাকায়,
” আমি আপনার থেকে দুরে এই থাকব। আপনার সংসার করব না আমি।
নিক চোখ গরম করে তাকায়। ক্রোধে ফেটে পরে মুহূর্তের মধ্যে। দুরে চলে যাবে এই কথাটা বললে তার সুস্থ মস্তিষ্ক বিকৃত রুপ ধারন করে। কিন্তু নিক আজ খুব শান্ত ভাবে রাগটাকে কন্ট্রোল করতে চাচ্ছে। দাঁত পিষে বলে,
” কিছক্ষন আগেই তো বললে আমার সমস্ত পাপ, খারাপ স্বভাব, ছন্নছাড়া আমিটাকে ভালোবাসো। সব কিছু দিয়ে নিজের মত সামলে নিবে। এখন সংসার করবে না বলার স্পর্ধা কিভাবে দেখালে?
এনি ও একইভাবে দাঁত পিষে উত্তর দেয়,
” আমি ছন্নছাড়া এক পুরুষের সংসার করব বলেছি। কোনো বলদের সংসার নয়।
নিক আকস্মিক চেঁচিয়ে উঠে,
” কিহহহ! বলদ বলছো কাকে?
এনি মুখ ভেংচি মেরে উত্তর দেয়,
” আপনাকে।
নিক কিছুক্ষণ এনির দিকে তাকিয়ে থাকে। এরপর নিশ্বাস ছেড়ে এনির কোমরটা চেপে ধরে আবার ও নিজের কাছে নিয়ে আসে। কপালে পড়া চুলগুলো কানের কাছে গুঁজে দিয়ে বলে,
” কি হয়েছে তর বেইবি। হুট করে এমন অদ্ভুত আচরন করছিস কেনো? ভুল করেছি আমি? কষ্ট পেয়েছিস!
নিকের অধৈর্য চোখ-মুখ দেখে এনি মুচকি হেসে তাকায়। তাহলে আপা সত্যিই ঠিক কথাই বলেছিল। উনার সাথে যদি মিষ্টি করে কথা বলা যায়, তবে সে আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই হয়ে ওঠে। এই যে এই মুহূর্তে কত শান্তভাবে কথা বলছে তার সঙ্গে। গ্যাংস্টার বসের এই নরম রূপটা এনির কাছে একেবারেই নতুন, অচেনা।
মনে হঠাৎ প্রশ্ন জাগে, নিক যদি জানতে পারে সে বাবা হতে চলেছে তবে তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? যে মানুষটা “বাচ্চা চাই” বলতে বলতে সবাইকে পাগল করে তুলেছিল।সে যদি হুট করে শুনে নেয় সে বাবা হতে যাচ্ছে তাহলে কী অনুভব করবে? এই কথাটা বলার অপেক্ষাতেই তো এতদিন সে নিজেকে ধরে রেখেছিল।
এনি ধীরে নিকের হাতটা ধরে। তারপর নিজের বাম হাতটা পেটের ওপর রাখে। নিক প্রথমে বিভ্রান্ত হয়ে এনির পেটের দিকে তাকায়।তারপর তার চোখে চোখ রাখে।
এনি গভীর শ্বাস নিয়ে নিকের চোখে চোখ রেখে মুচকি হেসে বলে,
” কখনো দেখেছেন এসিডিটির জন্য কারোর পেট এইভাবে ফুলে যায়? কোথায় দেখেছেন এমন?
নিক নিজের কপাল ঘেষে এনির গালে হাত রাখে। এদিকে – সেদিকে তাকাচ্ছে বার বার। গ্যাংস্টারের বসের ছন্নছাড়া রুপ দেখে এনি নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকে। নিক কিছু ভেবে আচমকা এনির দুই কাধে হাত রেখে এলোমেলো শ্বাস নিয়ে বলে,
” এ. এসিডিটি না হলে কি হয়েছে? অন্য কিছু হয় নি তো? কষ্ট হচ্ছে, ব্যাথা অনুভব করছো!
নিক এনিকে কোলে তুলতে এগোতেই এনি সঙ্গে সঙ্গে তাকে থামিয়ে দেয়। চোখ রাঙিয়ে, স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে নিকের দিকে তাকায়,
” এমন বেপোরোয়া হচ্ছেন কেনো? চুপচাপ বসুন আমার পাশে। একদম সুস্থ আমি।
নিকের জবাব আসে একইরকম বেপরোয়া ভঙ্গিতে। কিন্তু কণ্ঠে চাপা উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,
” তোমাকে নিয়ে কোনো রিস্ক নিতে চাই না। যদি কিছু সমস্যা হয় কাকে নিয়ে বাঁচব আমি?
এনি চট করে উত্তর দেয়,
” আপনার ছেলে অথবা মেয়েকে নিয়ে বাঁচবেন।
নিক কিছুক্ষণের জন্য নিঃশব্দ হয়ে যায়। চোখে-মুখে জমে ওঠে দ্বন্দ্ব আর অস্বীকার। পরক্ষণেই রাগ চেপে রাখতে না পেরে কঠিন গলায় বলে,
” ছেলে অথবা মেয়ে নিয়ে বাঁচব মানে? আমার ছেলে -মেয়ে নেই। প্রয়োজন নেই এইসবের।
” কিন্তু আমার প্রয়োজন আছে। একটা বাবু চাই আমার। একদম আপনার মত চোখ- মুখ যাতে হয়। ঠিক আপনার বাম ভ্রুঁতে যেমন কাটা দাগ, ঠোঁটের পাশে আর নিচে তিল।
এনির হঠাৎ এমন ইচ্ছের মানে নিক বুঝলো না। তবে এইসব কথায় বিরক্তবোধ করে। রাগ দেখিয়ে শাষিয়ে বলে,
” বাচ্চার প্রয়োজন নেই আমার। এইসব অহেতুক কথা বলবে না আর আমার কাছে। চলো আমার সাথে।
নিক এনিকে পাজা কোলে তুলতে যায়। কিন্তু এনি মুখ ঘোমরা করে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। নিক হেরে গিয়ে নিশ্বাস ছেড়ে এনির সামনে হাটু ভেঙ্গে বসে পড়ে,
” কি ক্ষমতা তর ব্লাডরোজ, গ্যাংস্টার বসকে হার মানিয়ে দিচ্ছিস সামান্য অভিমান করে। অথচ সামনে কেউ চিৎকার করে কাঁদলে ও মায়া অনুভব হয় না। বাচ্চার জেদ কেনো ধরলে হুট করে? তোমাকে নিয়ে কোনো রিস্ক নিতে চাই না আমি। বাচ্চা জন্ম দিতে প্রচুর কষ্ট! আমি তোমার সাথে কাউকে ভাগ করে নিতে পারব না।
এনি অবাক হয়ে বলে,
” সে আমাদের সন্তান হবে। ভাগাভাগির প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে? নিজের সন্তানকে হিংসে করছেন?
নিক ভ্রুঁ ভাঁজ করে বলে,
” হোয়াট ডাজ ইট ম্যাটার? হেদার দ্য চাইল্ড ইজ মাইন অর সামওয়ান এল্স’স। আই ওউন্ট শেয়ার ইউ উইথ এনিওয়ান। বাচ্চা পছন্দ করি না আমি। তোমার আর আমার মাঝে থার্ড কেউ আসলে সহ্য করতে পারব না। তোমাকে হারানোর ভয়ে বাচ্চা চেয়েছিলাম। এখন সেই হারানোর ভয়টা নেই। আর একজন গ্যাংস্টার কখনো পিতৃত্বের স্বাদ গ্রহন করতে পারে না। আর জেদ ধরবে না।
এনির চোখে পানি টলমল করে উঠে। কেমন ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে বাহিরে। নিক কাউকে ফোন দিয়ে এনির কাছে। বলা হয়েছে ইমার্জেন্সি বুলেট প্রুফ গাড়ি রেডি রাখতে। এনিকে নিয়ে হসপিটালে যাবে সিট – সব বুকিং রাখতে। এনি সব শুনেও একদম চুপ হয়ে থাকে। নিক কাছে আসলেই বলে,
” আমি একদম ঠিক আছে। এতদিন চব্বিশ ঘন্টা মেয়ে ডাক্তার ছিলো। এখনও আছে। আপনার ভয়ে এখন আসছে না।
নিক গম্ভীরতা নিয়ে বিরোধীতা করে বলে,
” একদম ঠিক নেই তুমি। শরীরের অবস্থা একদম বেহাল দশা। এমন অসুস্থ হলে সামলাতে পারবে না আমাকে।
এনি মুখ তুলে তাকিয়ে ,
” আপনি আমাকে অসুস্থ বলছেন? অসুন্দর লাগছে তাই না? এই কারনে এমন কথা বলতে পেরেছেন!
নিক এনির দুই গালে হাত রেখে কপালে চুমু খায়। অধৈর্য হয়ে বলে,
” যে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বছরের পর বছর, আজীবন কাটিয়ে দিতে পারব তাকে অসুন্দর বলার আগে আমার জবান বন্ধ হয়ে যাক। যদি এমন সুযোগ থাকত তুমি আমার সামনে প্রতিক্ষণ বসে থাকতে তবে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তোমাকে দেখে চোখের তৃষ্ণা মিটাতাম। তুমি নিজেও জানো না তোমাকে নিয়ে কতটা তৃষ্ণার্ত আমি।
এনির নিকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। নিকের হাতটা আবার ও তার পেটের উপর রেখে বলে,
” পেট ফুলার কারন ও বলছি। একটা কথাও বলবেন না এখন। শুধু কিছু অনুভুতি অনুভব করুন। অনুভব করতে পারছেন কিছু?
নিক এনির কথার মানে বুঝলো না। কি আশ্চর্য গ্যাংস্টার বস একজন নারীর কথায় একদম চুপ হয়ে যায়। এনির কথা অনুযায়ী তার পাশে বসে। কিন্ত চোখ মুখে ছিলো দুশ্চিন্তার ছাপ। এনি আলতো ভাবে নিকের হাতটা ধরে নিজের তলে পেটের উপর রাখে। নিক কপাল কুচকে তাকায়। এনি কথা বলতে পারছে না। তার কথা সব গলায় আটকে আসছে। কোনো রকম উচ্চারন করে বলে,
” অনুভব করুন গ্যাংস্টার বস। অনুভব করুন আপনার অস্তিত্বকে। আরেকটা নিক জেভরান আসলে কিন্তু ব্যাপারটা মন্দ হয় না।
এনির কথার অর্থ বুঝতে পারে নি প্রথমে। হুট করে বিষয়টা ভাবতেই নিক ঠোঁট চেপে ধরে নিজের।
তার মতো একজন রক্তশীতল মস্তিষ্কের গ্যাংস্টার যার কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই তার জন্য এই খবরটা ছিল একটা প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কার মতো। খবরটা শোনামাত্রই তার শরীরের রক্ত এক মুহূর্তের জন্য জমে বরফ হয়ে যায়। যে মানুষটা সারা জীবন শুধু ধ্বংস করতেই শিখেছে আজ সে জানতে পারল তার অংশ সৃষ্টি হতে চলেছে। নিকের পাথুরে হৃদয়ে শুরুতে কোনো আনন্দ হলো না। কেমন এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর রাগ দানা বাঁধল। কোনো অনুভুতি এই ভেতরে কাজ করছে না। অদ্ভুত ভয় তাকে ঘিরে ধরেছে। নিক চট করে এনির হাত সরিয়ে ফেলে। নিজের হাতের দিকে এক পলক তাকিয়ে এনির দিকে তাকায়। যেখানে তার হাত ছুঁয়ে ছিলো এতক্ষণ।
চোখে -মুখে ক্রোধ আর দুশ্চিন্তা। এনি ভেবেছিলো নিক অনেক খুশি হবে। কিন্তু এমন রিয়্যাকশনের অর্থ বুঝলো না সে।
নিক মাথায় হাত চেপে ধরে কয়েক মুহূর্ত ঘন ঘন শ্বাস নেয়। বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা যেন আর ধরে রাখতে পারছে না সে। নিকের এই উন্মুখ, অধৈর্য রূপ দেখে এনি শুকনো ঢোক গিলে ফেলে। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে আসে।
এনি সাহস করে নিকের কাঁধে হাত রাখতেই পরের মুহূর্তে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। নিক হঠাৎ হেঁচকা টানে তাকে নিজের বুকে চেপে ধরে। তার শক্ত বাহুর চাপে এনি যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়। চোখ লাল হয়ে ওঠে নিকের, চোয়াল শক্ত হয়ে কাঁপতে থাকে। কণ্ঠে আগুন ও রাগে গর্জে ওঠে সে,
” আমার জায়গা থেকে সব রকম নিরাপত্তা দিয়ে রেখেছিলাম। তাহলে বাচ্চা আসার মত ভুল কিভাবে হলো? তুমি আমার অনুমতি না নিয়ে এত বড় কাজ কিভাবে করলে?
শেষ কথাটা নিক বলে ওঠে তীব্র রাগ আর ধমকের সঙ্গে।এনি আর নিজেকে সামলাতে পারে না। চোখের কোণে জমে ওঠা জল টলমল করতে থাকে। গলা বেঁধে আসে।বুকের ভেতর চাপা হাহাকার জমে ওঠে। কোনো রকমে কান্নাটা আটকে রাখার চেষ্টা করে সে।কিন্তু ঠোঁট কাঁপা থামাতে পারে না। নিকের এমন ভয়ানক রাগের শিকার হবে এটা সে কল্পনাও করেনি।কাঁপা গলায় এনি বলে,
” আমি কিছু করি নি।
নিক শুনলো না সেই কথা। দাঁত পিষে ধমকে উঠে,
” কিছু না করলে হলো কিভাবে? সত্যি করে বলবে লাস্ট বার মেডিসিন খাও নি? আমি নিজ হাতে খাওয়ানোর পরও কিভাবে মিস করলে? ফেলে দিয়েছো?
এনি চোখ-মুখ খিঁচে ফেলে। কেঁদে দিবে ভাব,
” আমি মেডিসিন ফেলে দেয় নি। আমি প্র্যাগনেন্সি নিয়ে নিজেও জানতাম না। বরং আপনার এক্সিডেন্টের দিন জানতে পারি আমি প্র্যাগনেন্ট। এইটা নিয়েও এতটা সিউর ছিলাম না। সিউর হতে গেলে ডাক্তারের কাছে যেতে হত। প্র্যাগনেন্সি নিয়ে তখন চিন্তায় ছিলাম না। আমি ছটফট করেছিলাম আপনাকে নিয়ে। আরিশ ভাইয়া বলে গিয়েছিলো কোথাকার যুদ্ধ আছে। এতে আপনার বিপদ হতে পারে। সময় পায় নি এইটা জানার। কিন্তু পরবর্তীতে জানতে পারি। যখন আপনার এক্সিডেন্টের খবর শুনে আমি জ্ঞান হারিয়ে পড়েছিলাম। তখন ডাক্তার বলেছিলেন আমি দেড় মাসের অন্তসত্তা। এতদিন অপেক্ষা করেছিলাম আপনাকে এই সংবাদটা কবে দিব? ছটফট করেছি আপনার কানে পৌছে দিতে যে আপনি ও বাবা হচ্ছেন।
নিক নিজের বাঁধন হালকা করে। ঘন ঘন নিশ্বাস ছেড়ে বলে,
” আমি সন্তান চাই না। আমার কিছুর প্রয়োজন নেই।
এনি কান্নার জন্য কথা বলতে পারছে না। আহত গলায় বলে,
” আপনি এখনও আমার সেই অতীতের কথাগুলো মনে করছেন? আপনাকে বাচ্চা নিয়ে অনেক খারাপ কথা শুনিয়েছি। তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিলো। আমি নিজের মধ্যে ছিলাম না তখন। আমার চোখে ওই সময় আপনি একজন পিশাচ ছাড়া কিছুই ছিলেন না।।তীব্র ভাবে ঘৃনা করতাম আপনাকে। সন্তানের কথা বললে সন্তান হারানোর ভয় পেতাম। আপনার জীবন নরকের ন্যায়। যেখানে মৃত্যুর লড়াই হয় প্রতিনিয়ত। প্রতি রাতে ঘুমার সময় ও ভয়ে ভয়ে ঘুমাতে হয়। ঘুমন্ত অবস্থায় যদি কেউ আক্রমন করে তবে সকালের সূর্যদয়টা দেখতে পারব কি না। ক্ষমতার জন্য ষড়যন্ত্রের একের পর এক চাল বিছিয়ে দেওয়া হয়। যদি সেই চাল ভেঙ্গে ফেলতে পারো তবেই টিকা সম্ভব নয়ত প্রান হারাতে হবে। এমন এক বিভৎস্য দুনিয়ায় আমি সন্তান জন্ম দিতে চায় নি। রাখতে চাই নি কোনো দুর্বলতা। আপনি বলুন না কোনো শত্রুপক্ষ যদি আঘাত করতে আসে। তবে চোখের সামনে মা হয়ে নিয়ে নিজের মাছুম বাচ্চার ছটফটানি কিভাবে সহ্য করতাম। তাই বাচ্চার কথা বললে এতটা রেগে যেতাম। এখন তো ও আমাদের সংসারের স্তম্ভ হয়ে এসে পড়েছে। ওর থেকে এইভাবে মুখ ফিরিয়ে নিবেন না। ও আপনার অংশ নিক।
নিক বিছানা থেকে উঠে দেয়ালে ঘুষি বসায়। সাথে সাথে কেঁপে উঠে ঘরের প্রতিটা জিনিস পত্র।
” আমি বাচ্চা চাইলে এতদিনে বাচ্চার বাবা হয়ে যেতাম। আমাকে আটকানোর ক্ষমতা তোমার ও ছিলো না। নিক জেভরান যা চাই সেটা নেওয়ার জন্য কারোর কাছে হাত পাতে না বরং ছিনিয়ে নেয়। তাই ওইদিনের কথাগুলো আমার উপর কোনো প্রভাব এই ফেলে নি। আমি কারোর বাবা হব এর থেকে হাস্যকর কিছু হতেই পারে না। আমার স্পর্শ, আমার ছায়া তার জন্য শুভ হবে না। এই হাত দিয়ে নিজের জন্মদাত্রীকে খুন করেছি। এই কালো হাত দিয়ে হাজার বাচ্চাকে বলি দিয়েছি। আমার মত নরপশু নিবে পিতৃত্বের স্বাদ? ছ্যাহহহ! আমার ছায়া তার জন্য মঙ্গলকজন নয়। আমার কালো হাতের থাবায় সে ঝলসে যাবে। তোমার উচিত হয় নি আমার হাত তার উপরে রাখার।
এনি বিছানা থেকে উঠে আসে। নিকের গালে হাত দিয়ে হালকা হেসে বলে,
” বাবারা সন্তানের জন্য দেয়াল হয়। তাদের ধ্বংসকারী নয়। আপনার অংশ সে নিক। আপনার স্পর্শ পেলে সে ঝলসে যাবে না। বরং আপনার স্পর্শ না পেলে ঝলসে যাবে।
নিক তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
” আমার এই হাত রক্তে ভেজা। যে হাত দিয়ে আমি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিই সেই হাত দিয়ে একটা নিষ্পাপ প্রাণকে ছোঁয়া কি পাপ নয়? আমার ছায়া তাকে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেবে না।”
নিকের সেই তাচ্ছিল্যকে উপেক্ষা করে এনি এক পা এগিয়ে আসে। তার চোখে পানি থাকলেও কণ্ঠস্বর ছিল দৃঢ় ও অবিচল। সে নিকের রক্তমাখা হাতের ওপর নিজের হাত রেখে খুব নরম গলায় বলল,
“রক্ত ধুয়ে যায় সাফ হয়ে যায়।কিন্তু রক্তের টান কখনো মুছে যায় না। আপনার হাত কারোর জন্য যমদূত হতে পারে কিন্তু আপনার সন্তানের জন্য এটাই হবে তার প্রথম আশ্রয়। সে আপনার অন্ধকার দেখবে না সে দেখবে তার বাবাকে।
নিক এক ঝটকায় নিজের হাত সরিয়ে নেয়। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার। ধূসর বাদামী চোখের মনিতে এক ধরনের উগ্র অস্থিরতা। সে ঘরের জানলার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
”বাবা ডাকবে না।তীব্রভাবে ঘৃনা করবে। আমি এক নরপশু যার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আমার মত মানুষের অংশ হয়ে জন্মানো মানেই অভিশপ্ত জীবন পাওয়া।পৃথিবী আমাকে ভয় পায়। আমি চাই না আমার সন্তান আমাকে দেখে আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকুক। আমার স্পর্শ পেলে সে ঝলসে যাবে।
“ভুল ভাবছেন। যে বাঘ পুরো বনের কাছে আতঙ্কের সে-ও তার ছানাকে পরম মমতায় আগলে রাখে। আপনার কঠোরতা পৃথিবীর জন্য তুলে রাখুন। কিন্তু আপনার সন্তানের জন্য আপনি কেবলই এক জন ‘বাবা’। আপনার স্পর্শ তাকে ঝলসে দেবে না। তাকে এই নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে আড়াল করে রাখবে।
“আমার ভেতরে কোনো মায়া নেই, কোনো দয়া নেই। আমি তাকে কী দেব?”
নিকের একটা শক্ত হাত টেনে নিয়ে নিজের পেটের ওপর রাখে। নিক হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল।কিন্তু এনি তা ছাড়ল না। এনি দৃঢ় গলায় বলে,
“আপনি তাকে আপনার নাম দেবেন।আপনার সাহস দেবেন। একজন মাফিয়া রাজত্ব জয় করতে পারে কিন্তু একজন বাবা তার সন্তানের হৃদয়ে রাজত্ব করে। তার ছোট্ট আঙুল যখন আপনার এই শক্ত হাতটা ধরবে তখন বুঝতে পারবেন আপনি নরপশু নন আপনি একজন রক্ষাকর্তা।
নিকের চোখদুটো এনির স্ফীত উদরের দিকে নিবদ্ধ আসে। কিন্তু সেখানে কোনো পিতৃসুলভ কোমলতা বা পরম মমতার লেশমাত্র নেই। সনিক এক পা এগিয়ে এসে এনির খুব কাছে দাঁড়ায়। এতটাই কাছে যে এনি নিকের গায়ের সেই চিরচেনা উগ্র তামাক আর দামী পারফিউমের তীব্র গন্ধ পাচ্ছিল।
নিক তার শক্ত আঙুল দিয়ে এনির চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে। অত্যন্ত নিস্পৃহ এবং শান্ত গলায় বলে,
” এই বাচ্চার জন্য যদি তোমার তিল পরিমান কষ্ট হয় তবে তিল পরিমান ছাড় দিব না। তোমাকে কষ্ট দেয় এমন কাউকে সহ্য হয় না আমার। এমনকি নিজেকেও না!
সামান্য থেমে নিশ্বাস টেনে বলে,
” তুমি হয়তো একে তোমার সন্তান হিসেবে দেখছো কিন্তু আমি একে দেখছি তোমার শরীরের ওপর আসা এক বাড়তি চাপের মতো। তোমাকে কষ্ট দেয় এমন কাউকে আমি সহ্য করব না তা সে কোনো শত্রু হোক। কোনো নিয়তি হোক, কিংবা আমার নিজের রক্ত। তোমাকে সুস্থ দেখতে পাওয়ার জন্য আমি যদি এই অনাগত প্রাণকে…….
নিক থেমে যায়। কথাটা অসম্পর্ণ রেখে এনির শুকনো কাঁপা ঠোঁটের উপরে চুমু খেতে যায়। কিন্তু এনি খেতে দিলো না তাকে। নিকের এমন পাষাণ হৃদয় দেখে এনির কান্না আসে। লোকটা পাথর সে জানে। কিন্তু পৃথিবীর এমন কোনো পুরুষ নেই যে বাবা হওয়ার খবর শুনে এমন পাথর হৃদয় নিয়ে বসে থাকে। এনি রাগটাকে সামলাতে না পেরে নিকের কলার চেপে ধরে আচমকা। নিককে কিছু বলতে না দিয়ে চোখে চোখ রেখে দাঁত পিষে বলে,
” যদি এইভাবে মুখ ফিরিয়ে রাখেন তবে প্রচুর খারাপ হবে। আমি বাচ্চা চেয়েছিলাম? বাচ্চা আমি কখনো চাই নি। জোর করে এই বাচ্চা নেয় নি আপনার থেকে। বরং নিজে দিয়েছেন এই বাচ্চা। সজ্ঞানে হোক বা অন্যভাবে। সে আপনার অংশ। আমার সন্তানের প্রতি কোনোরকম অবহেলা দেখালে আমি সহ্য করব না। হৃদয়হীন, পাষন্ড লোক। সন্তানের অস্তিত্ব অনুভব করে একটুও মায়া কাজ করলো না। হৃদয়ে পাষন্ড প্রলেপ পড়ে গিয়েছে। এই সাড়ে ছয় মাস নিজে নিজে সব সামলে নিয়েছি। আর বাকি দিন গুলো নিজেই সামলাতে পারব। লাগবে না আপনার কোনো ভালোবাসা।
এনি কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে ওয়াশরুমে গিয়ে দরজা আটকে দেয়। এই মুহূর্তে নিকের সামনে দাড়াতে ইচ্ছে করছে না। কান্না আসছে বুক ভেঙ্গে। ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে। ওয়াশরুমের পিচ্ছিল মেঝেতে বসে এনি নিজের মুখাবয়ব দুহাতে আবৃত করে রুদ্ধশ্বাসে ক্রন্দন করতে থাকে। নিকের সেই পাষাণোচিত বাক্যবাণগুলো ওর অন্তঃকরণকে এক নিদারুণ দহনজ্বালায় দগ্ধ করছিল। যে মাতৃত্ব নারীর শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার নিকের দৃষ্টিতে তা যেন এক অসহনীয় আপদ।
বাইরে নিকের পায়চারির শব্দ শোনা যাচ্ছে। প্রতিটি পদবিক্ষেপ এনির হৃদকম্পন বাড়িয়ে দিচ্ছে। নিকের এই নির্লিপ্ত কাঠিন্য আর অনমনীয় জেদ এনিকে এক দুর্ভেদ্য অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি করে ফেলেছে। তার অনাগত সন্তানটি এমন পিতার ছত্রছায়ায় আসতে চলেছে যার কাছে মমতা এক প্রকার মানসিক দুর্বলতা।
টেপ ছেড়ে শীতল জলের ধারায় মুখ ধুয়ে এনি যখন আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে কিছুক্ষণ। আয়নায় নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে হাত রেখে। দুই,হাত দিয়ে স্পর্শ করে সামান্য হেসে বলে,
” আচ্ছা তোমার কি কান তৈরি হয়ে গিয়েছে? তুমি কি আমাদের কথা শুনতে পেয়েছো? শুনলেও কষ্ট পাবে না একদম। তোমার বাবা একটু আলাদা রকম। অদ্ভুত রহস্যময় সে! আজ রাগ দেখিয়েছে। উনার ভয় হচ্ছে যদি আমার কিছু হয়ে যায়! তোমার কিছু একটা হয়ে গেলে কাল দেখবে তোমার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছে। দেখবে তুমি তার জীবন হয়ে উঠেছো।
বিশাল সমুদ্রের নীল জলরাশি তখন উন্মত্ত তান্ডবে মেতেছে। লোনা বাতাসের ঝাপটা আর উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন চারপাশের পরিবেশকে এক অদ্ভুত মায়াবী গাম্ভীর্যে ভরিয়ে দিয়েছে। পিচঢালা রাস্তার একপাশে অধিরাজের দামী গাড়িটা নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তার মালিকের একাকীত্বের পাহারাদার। সমুদ্রের একদম কিনারায় বালুকাবেলার শেষ প্রান্তে স্থবির পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিল অধিরাজ। তার শার্টের হাতা গুটানো।এলোমেলো চুলগুলো বাতাসের ঝাপটায় কপালে আছড়ে পড়ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে সে পিঠে এক জোড়া ছোট হাতের কোমল স্পর্শ অনুভব করলো। ছোট ছোট দুইটা হাত তার চওড়া পিঠটাকে জড়িয়ে ধরেছে। এই উত্তাল সমুদ্রের গর্জনের মাঝেও অধিরাজ যেন সেই হৃৎস্পন্দনের শব্দ শুনতে পায়। সে ঘুরে নি একটুও। দৃষ্টি সাগরের দিগন্তেই নিবদ্ধ রইল। কিন্তু অধিরাজের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে এক চিলতে রহস্যময় আর তৃপ্তির মুচকি হাসি।
সে খুব ভালো করেই জানে এই দুইটা হাত কার। এই বিশাল দেহের অধিকারী যার এক ইশারায় শত্রুর হৃদিয় থমকে যায় তাকে পেছন থেকে জাপ্টে ধরার সাহস কেবল ওই একজন রমণীরই আছে। সমুদ্রের নোনা গন্ধে মিশে থাকা সেই পরিচিত সুবাসটা অধিরাজের নাসারন্ধ্রে পৌঁছে দিতেই তার ভেতরের সব কাঠিন্য যেন বালির বাঁধের মতো ধসে পড়ে।
বাতাস তখন সেই রমণীর অবাধ্য চুলগুলোকে উড়িয়ে এনে অধিরাজের কাঁধে ফেলছে। অধিরাজ তানভীর দিকে ঘুরে তার কপালে চুমু খেলো। বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে নিচু স্বরে সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়ে তানভীর উদ্দেশ্যে বলে,
” এইভাবে যদি সারাক্ষন বুকের সাথে মিশিয়ে রাখতে পারতাম তাহলেও বোধ হয় তৃষ্ণা মিটতো না।
তানভী মুচকি হেসে বিড়াল ছানার মত হালকা উকি দেয়। অধিরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
” তোমার বস বেঁচে আছে শুনে খুশি হলাম। উনার কিছু হয়ে গেলে দেখা যেত একটা সময় তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি। বসের শোকে শোকে মরে যেত।
অধিরাজ সামান্য হেসে বলে,
” মিথ্যা বলো নি। কিভাবে জানলা বস বেঁচে আছে? আমি তো এখনও বলিনি
” নিউজে দেখাচ্ছে। আজ পুরো নিউজফিড জুড়ে ভুমিকম্প বইছে। উনি বেঁচে আছে শুনে অনেক বড় শক খেয়েছি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম নিউজের দিকে।ভেবেছি মিথ্যা নিউজ ছড়াচ্ছে। পড়ে দেখলাম সত্যি কাহিনী এইটা। গ্যাংস্টার বস বেঁচে আছে। বলো নি কেনো?
অধিরাজ তানভীর চুল ঠিক করে দিয়ে বলে,
” আমি আর আরিশ স্যার ছাড়া এইট কেউ জানত না। এমনকি বসের ওয়াইফ ম্যাম ও জানত না।
” উনি জানলেই বা কি? উনি তো তোমার বসকে প্রচন্ড ভাবে ঘৃনা করে। মৃত্যুতে খুশি হয়েছে নিশ্চই? খুশি হবে স্বাভাবিক। উনার জায়গায় থাকলে আমি ডিজে গান লাগিয়ে নাচতাম।
অধিরাজ হালকা হেসে তানভীর চিবুক ধরে তার মুখটা উপরে তুলে ধরে। এরপর চোখে চোখ রেখে বলে,
” তুমি বাদে উনার মত সুন্দরী নারী কোথাও দেখিনি। আবার উনার মত রুপ বদলকারী নারীও কোথাও দেখিনি। বাহিরের মানুষ উনাকে যতটা শান্ত ও ভিতু ভাবে উনি তেমনটা নয়। হ্যা, উনি কিছুটা শান্ত আর ভালো। বাট উনার হিংস্র আর অত্যাচারী রুপ দেখো নি। জেডকে উনি মেরেছে তাও খুব নৃশ্যংস ভাবে।
তানভী আচমকা চেঁচিয়ে উঠে,
” হুয়াট? এই নরখাদককে উনি মেরেছে মানে? এমন হিংস্র ব্যাক্তিকে কিভাবে মারলো?
অধিরাজ কাধ নাড়িয়ে বলে,
” কিভাবে মেরেছে জানি না। তবে তার মৃত্যু খুব নৃশ্যংস ভাবে হয়েছে। পুরো শরীর ছিলো খন্ড -বিখন্ড আর বিকৃত। কোনো সাধারন মানুষের ক্ষেত্রে এতটা জঘন্যভাবে কাউকে খুন করা সম্ভব নয় তানভী। উনাকে একটা লোক স্পর্শ করতে এসেছিলো। উনি তাকেই মেরে দিয়েছে। ওইদিন থেকেই বুঝতে পারি এই গল্পে উনি যতটা সহজ উনি ঠিক ততটা সহজ নয়। উনি একজন সাইকোপ্যাথ রুপী নরখাদককে মারার ক্ষমতা রাখে।
তানভী ঠোঁট ভেজায় নিজের। পর মুহূর্তে বলে,
” একদম ঠিক কাজ করেছে। ওই জানোয়ারটাকে মেরে ফেলা উচিত ছিলো। যাক, কেউ অন্তত মেরেছে। খুব খুশি হয়েছি, বলে বুঝতে পারব না। দেখে নিও তোমার বসকে আবার কবে আক্রমন করে বসে।
অধিরাজ ফিঁচেল হেসে বলে,
” বসের কান আর চোখ বাজপখির মত। দুরে কেউ তাকিয়ে থাকলেও বস অনুভব করতে পারে। খুব সহজেই শত্রুদের ঘায়েল করতে পারে। উনাকে আক্রমন করা এতটা সহজ নয়। আর তুমি যার কথা বলছো সে কোনোদিন আক্রমন করবে না। বসের মৃত্যুতে উনি হাসে নি বরং মানসিক রোগীতে পরিনত হয়েছে।
তানভী বুঝতে না পেরে বলে,
” মানে?
” মানে উনি বসের মৃত্যু মেনে নিতে পারে নি। দিন দিন পাগল হয়ে যাচ্ছিলো। সারাক্ষণ বসকে কল্পনা করত। ডাক্তার বলেছিলো এইসব রোগীরা হুট করে মারা যায়।।চিন্তায় ছিলাম খুব। উনার কিছু হয়ে গেলে বস বেঁচে গিয়েও আবার মরে যাবে।
তানভী অবাক হয় প্রচুর। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলে,
” অদ্ভুত ভালোবাসা এদের। একজন আরেকজনের প্রেম স্বীকার করে না। অথচ কেউ চোখের আড়াল হয়ে গেলে আরেকজন বেপোরোয়া হয়ে যায়।
অধিরাজ তানভীর কোমর পিছন থেকে চেপে ধরে সামনে হেটে যায়। একটা পাথরের উপরে বসে বলে,
” এই যে বললাম দুইজন এই রহস্যময়। তাছাড়া পাগলে- পাগলে মিলেছে ভালো।
তানভী খুঁচা মেরে বলে,
” বাহহ, নিজের প্রান প্রিয় বসকে পাগল বলছো যে আজ? বিশ্বাস হচ্ছে না।
অধিরাজ থমথমে খেয়ে বলে,
” আমি অন্য পাগলের কথা বুঝায় নি। বস ম্যামের জন্য পাগল সেটা এই বুঝিয়েছে। ওদের কথা বাদ দাও। কষ্ট পেয়েছো তুমি?
তানভী অধিরাজের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলে,
” কষ্ট পাব কেনো আমি? তুমি তো আমার কাছেই আছো।
অধিরাজ অপরাধী গলায় বলে,
” তোমাকে বলেছিলাম বউ সেজে বসে থাকতে। তুমি আমার জন্য বসে ছিলে অথচ আমি আসি নি।
তানভী মলিন হেসে বলে,
” কষ্ট তো অনেক পেয়েছিলাম রাজ, অস্বীকার করব না। ভেবেছিলাম তুমি বিয়ের নাম করে আমাকে ধোঁকা দিয়েছো। দুই দিন পর্যন্ত তোমার কোনো খোঁজ মেলে নি। এতটা কেঁদেছি যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। পরে যখন শুনলাম নিক জেভরান বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। তখন বুঝেছি তোমার না আসার কারন। কিন্ত এরপর ও ভয় হচ্ছিলো তোমার যদি কিছু হয়ে যায়। ছুঁটে গেলাম মিনারের দিকে। গার্ডরা জানালো তুমি ঠিক আছো, চিন্তামুক্ত থাকতে।
অধিরাজ গম্ভীর নিশ্বাস ছেড়ে তানভীর গালে চুমু খায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
” এইবার আর কোনো বাঁধা নেই। বস ফিরে এসেছে। শত্রুগুলোকে মেরে তুমি-আমি বিয়ের সাজ সাজব।
তানভী মুচকি হেসে অধিরাজের বুকে ল্যাপ্টে যায়। অধিরাজ বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় নিজের প্রেয়সীকে।
ঘড়ির কাঁটা রাত এগারোটার ঘর স্পর্শ করার উপক্রম। পুরো ভূগর্ভস্থ আস্তানাটি আজ এক অশুভ রোশনাইয়ে উদ্ভাসিত। শহরের সবচেয়ে অন্ধকার গলির শেষ প্রান্তে যেখানে আইনের হাত পৌঁছাতে ভয় পায় সেখানেই আজ জমেছে পাপাচারী আর অপরাধ জগতের রাঘববোয়ালরা। দীর্ঘ নিস্তব্ধতার অবসান ঘটিয়ে যখন সেখানে নিকের পদচারণা ঘটল মুহূর্তেই পুরো হলঘর এক হিমশীতল স্তব্ধতায় জমে যায়।
নিক বেঁচে আছে। এই একটি সংবাদ পুরো মাফিয়া সাম্রাজ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। তার ফিরে আসাকে উদযাপন করতে মদ্যপান, জুয়া আর নর্তকীদের উন্মাদনায় এক বীভৎস উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এই আয়োজনের প্রতিটি অংশই ছিল নিকের মনোরঞ্জনের জন্য সাজানো। কিন্তু বিশাল সেই সদর দরজা ঠেলে নিক যখন ভেতরে প্রবেশ করে তার চেহারায় কোনো আনন্দের লেশমাত্র ছিল না।
নিক অত্যন্ত ধীরস্থির পায়ে এগিয়ে গিয়ে তার নির্দিষ্ট সেই রাজকীয় আসনে বসলো। তার পরনে কালো কোট। চোখেমুখে এক কঠিন নির্লিপ্ততা। চারপাশে যখন উল্লাস হওয়ার কথা তখন নিকের গম্ভীর মূর্তির সামনে কারো শ্বাস ফেলার সাহসটুকুও হচ্ছিল না। নিক তার আসনের হাতলে হাত রেখে হেলান দিয়ে বসে।
গ্যাংস্টার বসের দুচোখ যেন একজোড়া তৃষ্ণার্ত বাজপাখির মত তীক্ষ্ণ, নির্দয় এবং অনুসন্ধিৎসু। সেই চোখের দৃষ্টি হলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে থাকে। কারোর চোখে বিশ্বাসঘাতকতার ছাপ আছে কি না কিংবা এই অকাল উৎসবের আড়ালে কেউ কোনো ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে কি না নিকের বাজপাখির মতো চাহনি যেন প্রতিটি মানুষের আত্মা ভেদ করে সেই সত্য খুঁজে বের করতে চাইছে। উৎসবের বাজনা তখনো বাজছে কিন্তু নিকের ওই স্থির আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির নিচে উপস্থিত সবার হাড়ের ভেতর এক অজানা আতঙ্ক বয়ে যাচ্ছিল। একজন নিকের উদ্দেশ্যে বলে,
” আপনি বেঁচে আছেন শুনে প্রচুর খুশি হয়েছি।
নিক অদ্ভুতভাবে হাসলো,
” যখন মরিনি সেখানে নতুন করে বেঁচে ফিরব কিভাবে?
পর পর কায়াতের হিংসাত্নক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলে,
” আপনারা সবাই এখানে থেকে আসতে পারেন।।বাহিরে নর্তকীদের সাথে ফুর্তি করেন। বর্তমানে কায়াত আর আমার কিছু পার্সোনাল কথা আছে।
নিকের গম্ভীর গলায় এক আদেশে সব এক এক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। কায়াত সামান্য বিচলিত না হয়ে নিজেকে শক্ত করে ধরে রাখে। তবুও খুব অস্থির হয়ে উঠেছে নিকের এমন শিকারীর ন্যায় চাহনিতে। নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। টেবিলের উপর আঙ্গুল দিয়ে শব্দ করতে করতে বলে,
” তর কপাল ঘামছে কায়াত। কপালটা মুছে নে। এত ভয় পাচ্ছিস কেনো বুঝলাম না।
” ভয় পেতে যাব কেনো তকে? শত্রুকে কেউ ভয় পায়?
নিক বাঁকা হেসে বলে,
” শুনলাম তুই আমার বউকে তুলে আনার জন্য চার পাঁচবার মিনারে আ্যটাক করিয়েছিস? কত কষ্ট করলি তুই ভাবতেই খারাপ লাগছে
কায়াত শুকনো ঢোক গিলে। কিন্তু নিজের ভয়টা প্রকাশ করতে চাইলো না।
” এইসব খাওয়া মাল তুলে এনে আমার কি লাভ?
নিক হালকা হেসে নিজের কপাল ঘেষে। হাতে একটা ছুঁড়ে তুলে নিয়ে সেটা সামান্য নাড়াচড়া করে। ছুঁড়ির দিকে তাকিয়েই বলে,
” ভয় পাচ্ছিস?
কায়াত তেলে -বেগুনে জ্বলে উঠে,
” বাস্ট্রাড ভয় পেত যাব কেনো?
কায়াতের মুখের গালি নিকের সহ্য হলো না। চেয়ার থেক উঠে কায়াতের বুঝে উঠার আগেই তার গলাটা চেপে ধরে। কায়াত চেয়ার থেকে মেঝেতে পড়ে যায়। নিক পেটের উপর পা রেখে দাঁত পিষে বলে,
” শালা মাদার্ফাক! বোমা তুই হামলা করিয়েছিস তাই না?
কায়াত ছটফট করে কঠিন গলায় বলে,
” মিথ্যে কথা বলবি না। আমি হামলা করাতে যাব কেনো?
নিক রহস্যময়ভাবে হাসলো,
” মাত্র দুই দিন সময় দিলাম তকে। এই দুই দিন যত ফুর্তি করার করে নে। কারন এই দুই – একদিনের ভেতরে সিউর হয়ে যাব মেইন কালপ্রিট কে? যে গার্ডকে তুই হাত করেছিস তাকে একবার খুঁজে পায়। নরকের যন্ত্রনা ঠিক কেমন ভয়ানক হয় তুই সেটা অনুমান করবি মাদার্চু*দের বাচ্চা।
নিক কথাটা বলে কায়াতের শরীরের উপর দিয়েই হেটে যায়। কায়াত ব্যাথায় চিৎকার দিয়ে উঠে। গ্যাংস্টার বসের চোখ -মুখ ক্রোধে লাল হয়ে উঠেছে। সোজা গিয়ে গাড়ির মধ্যে বসে যায়। উদ্দেশ্য মিনারে যাওয়া।
আরিশ আর অধিরাজ ডিভানে বসে নিকের জন্য অপেক্ষা করছিলো। নিক মিনারে প্রবেশ করে। আরিশ আর অধিরাজের উদ্দেশ্যে বলে,
” কাল পুরো শহরে মিষ্টি বিতরন করে দে। পুরো মাফিয়া সম্রাজ্যকে জানিয়ে দে গ্যাংস্টার বস বাবা হতে যাচ্ছে।
নিক কথাটা বলে এক মুহূর্ত দাড়ানোর প্রয়োজন মনে করলো না।।আরিশ আর অধিরাজ একে -অপরের দিকে তাকিয়ে আহাম্মকের মত মুচকি হাসলো। আরিশ অধিরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
” বুঝলি আরিশ নিক আর আমি একসাথে বিয়ে করেছি। আমি কিছু মাস পরে করেছি। তবে সেসব হিসেবে রাখি না। এনি প্রায় ছয় -থেকে সাত মাসের অন্তসত্তা। আর এদিকে আমার বাসরটা হলো না। আর অপেক্ষা করা যাবে না। আমার ও বাবা হওয়ার অনুভুতি খুঁচাখুঁচি করছে। ভার্জিন থাকতে আজকাল শীত লাগছে প্রচুর। বরফে জমে যাচ্ছি আমি। গরম প্রয়োজন আমার।।বউ লাগবে এখন ইমার্জেন্সি। আমি যায়, তুই বসে থাক।
আরিশ আর দাড়ালো না। উঠে উপরে চলে গেলো। অধিরাজ আহাম্মকের মত দাঁড়িয়ে আরিশের যাওয়া দেখলো। সবাই বাচ্চার বাবা হয়ে যাচ্ছে আর এদিকে সে বিয়েই করতে পারলো না!
আরিশ রুমে প্রবেশ করে শব্দহীনভাবে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। পুরো রুম বিদঘুটে অন্ধকার। আরিশ শুধু অনুভব করলো কেউ বিছানার মধ্যে শুয়ে আছে। এক হাতে লাইট জ্বালিয়ে বেডের দিকে তাকায়। নাজলী গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। ঘুমায় নি এখনও। চোখের পাতা নড়ছে।আরিশ শিউরে বসে নরম সুরে ডাক দেয়,
” উঠো।
নাজলী শুনলো না। আরিশ কপাল কুচকায়,
” তুমি ঘুমাও নি আমি জানি।।ঘুমন্ত ব্যাক্তির চোখের পাতা এমন ছটফট করে না।
আরিশ কথাটা বলে নাজলীর কপালে হাত রাখে। সামান্য ঝুঁকেছিলো চুমু খাওয়ার উদ্দেশ্যে। নাজলী চট করে সরে যায় সেখান থেকে। চোখ-মুখ একদম ফুলে গিয়েছে কান্নার ফলে। আরিশ হতভাগ হয়ে তাকিয়ে আছে। এইভাবে কেঁদে বুক ভাসাবে সে কল্পনাও করে নি। তাই তো এতক্ষন আসে নি। যদি জানত এইভাবে কাঁদবে তাহলে তো সাথে সাথে এসে পড়ত। নাজলী রাগ দেখিয়ে বলে,
” দশ হাত দুরে থাকুন আমার থেকে। বেইমান!
আরিশ বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়,
” কি বেইমানি করেছি আমি?
নাজলী ক্ষেপে যায়,
” একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিয়েছেন। আপনাকে বিয়ে করে আমার জীবন -যৌবন শেষ।
আরিশ কপাল কুচকে বলে,
“” যৌবনে তো হাত এই দিলাম না।।যৌবন কিভাবে শেষ করলাম?
আরিশের এমন নির্লজ্জ কথায় নাজলী দাঁত পিষে বলে,
” বের হয়ে যান রুম থেকে। কি দেখতে এসেছেন এখানে? আমি বেঁচে আছি নাকি মরে গিয়েছি সেটা?
আরিশ এইবার কিছুটা গম্ভীর হয়,
” তোমার রাগ আর অভিমানের কারন আমি জানি। খোঁজ বা দেখা করার মত পরিস্থিতি বা সময় ছিলো না আমার কাছে। চারদিকে শত্রুরা খাঁপ পেতে ছিলো। গার্ডদের মধ্যেই সব থেকে বড় বিশ্বাসঘাতক লুকিয়ে ছিলো। আমি যদি মিনারে আসতাম তবে শত্রুরা আমার উপরে আ্যটাক করত। এমনও হতে পারে আমাকে অনুসরন করে নিক পর্যন্ত চলে গিয়েছে। তোমার কি মনে হয় তোমাকে দেখার জন্য হৃদয় ছটফট করে নি? অবশ্যই করেছে। কিন্তু অনেক সময় ষড়যন্ত্রের কাছে আবেগ হেরে যায়। দুরত্ব বাড়িয়ে দেয় দুজনের মধ্যে। আর এই সাময়িক দুরত্ব ভবিষ্যত সুন্দর করে।
নাজলী ঠোঁট কামড়ে ধরে এদিক-সেদিক তাকায়। কান্নার ফলে কথা বলতে পারছে না। আরিশ পায়ের সুজ খুলে এক লাফে বিছানায় উঠে। নাজলীর কম্পিত শরীরটা নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে শান্তনা দিয়ে বলে,
” আমি এতটা খারাপ নয়। তোমার সাথে রাগ দেখালেও আগলে নিতে জানি।
নাজলীর কান্নার বেগ আরও বেড়ে যায়। আরিশ পড়ে মহা জ্বালায়। মেয়ে মানুষকে আদর করলে আরও মাথায় চেপে বসে।
” এইভাবেই কাঁদবে সারারাত? কষ্ট হচ্ছে কিন্তু।
নাজলী বুকে মাথা রেখে বলে,
” এইভাবেই কেঁদেছি এই পাঁচ মাস। তখন কষ্ট লাগে নি?
” লেগেছিলো কিন্তু আসতে পারি নি। একটা জিনিস খুব উপকার হয়েছে। যা আমার কাছে অমুল্য রত্নের মত।
নাজলী নাক টেনে বলে,
” কি?
আরিশ মুচকি হেসে বলে,
” দুরত্ব না থাকলে ভালোবাসা অনুভব করা যায় না। এই একটা দুরত্ব থেকে এনি নিককে অনুভব করলো। আর তুমি অনুভব করলে আমাকে। নাহলে কিভাবে বুঝতাম তোমার মত জঙ্গলীও যে ভালোবাসতে জানে।
নাজলী চোখ ছোট ছোট করে তাকায় আরিশের দিকে,
” ভালোবাসি কখন বললাম?
আরিশ অবাক হয়ে বলে,
” আমার জন্য কেঁদেছো এইটাই তো ভালোবাসা।
নাজলী একদম নাঁখোজ করে বলে,
” আপনার জন্য কেঁদেছি কে বললো? আমি কেঁদেছি তার কারন ছিলো। আপনার সাথে কত ঝগড়া করেছি। এখন আপনার যদি কিছু হয়ে যায় তবে আমার মাফ চাওয়া আর হবে না। কারোর কাছে মাফ না চেয়ে কবরে গেলে শাস্তি পেতে হবে। সেই ভয়ে কেঁদেছি আমি। আপনার জন্য কাঁদতে যাব কোন দুঃখে? আশ্চর্য! দেখি সরুন।
নাজলী বিছানা থেকে নেমে যায়। আরিশের মাথা ঘুরাচ্ছে যুক্তি শুনে। শাস্তির ভয়ে কেঁদেছে, লাইক সিরিয়াসলি! এখনও কেঁদেছে। চোখ দুইটা ফুলে লাল হয়ে আছে। পুরো অভিমান দেখেছে, ছলছল দৃষ্টি দেখেছে সে। আর এই মেয়ে বলছে শাস্তি পাওয়ার ভয়ে কেঁদেছে! হায় আল্লাহ এমন ঘাড় ত্যারা মেয়েই কেনো আমার কপালে রাখলে?
নাজলী দরজা খুলে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। আরিশ পথ আটকে বলে,
” বাহিরে কেনো যাচ্ছো?
নাজলী পিছনে তাকিয়ে বলে,
” আশ্চর্য! পথ আটকাচ্ছেন কেনো? রুম থেকে বের না হলে আমি ঘুমাব কোথায়?
আরিশ নিজের রাগের নিয়ন্ত্রন হারাচ্ছে। কপাট রাগ দেখিয়ে বলে,
” এত বড় বেড চোখে পড়ে না তোমার?
” অহহ, তাহলে আপনি বাহিরে ঘুমাবেন?
” আমি বাহিরে ঘুমাব কেনো?
নাজলী ভ্রুঁ কুচকে বলে,
” আমি আর আপনি এক বেডে ঘুমাব এমন কিছু ভাবছেন?
আরিশ নাজলীর বাহু ধরে বলে,
” স্বামী -স্ত্রী এক বেডে ঘুমায় এইটাই দুনিয়ার নিয়ম।
নাজলী মুচকি হেসে বলে,
” সব স্বামী -স্ত্রী ঘুমায় কারন তাদের সম্পর্ক ওইরকম। তাদের মধ্যে ভালোবাসা -অনুভুতি আছে। আপনার মত নয়। যে সম্পর্কে ভালোবাসা নেই সেখানে এক বেডে ঘুমানোর প্রশ্ন এই আসে না।
আরিশ দাঁতে দাঁত পিষে দরজার সাথে চেপে ধরে বলে,
” তুমি ভালোবাসলেই তো হয়ে যায়।
নাজলী পিঠে সামান্য ব্যাথা পায়। কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলে,
” আমি কেনো ভালোবাসব আপনাকে? আপনি ভালো বাসেন এইটা কোনোদিন স্বীকার করেছেন? যেদিন আপনি বলবেন সেদিন উত্তর কি দিব সেটা ভেবে দেখব। আপাযত আমাকে ছাড়ুন। আপনার জন্য অর্ধেক জীবন শেষ আমার।।আমার হতভাগা জামাইটা অপেক্ষা করে বসে আছে আমাকে বিয়ে করবে বলে। অথচ এদিকে আমাকে আটকে রেখেছেন। তাকে বাসর করা থেকে বঞ্চিত করছি আমি। আপ………
নাজলী আর কিছু বলতে পারে নি। আরিশ হিংস্রতা নিয়ে চেপে ধরে নাজলীর ঠোঁট। আকস্মিক এমন হিংস্র থাবায় নাজলী ছটফটিয়ে উঠে। আরিশ মাথার উপর দিয়ে চেপে ধরে নাজকীর দুই হাত। অন্য হাত দিয়ে কোমর চেপে ধরে ঠোঁট চুম্বনে মিলিত হয়। নাজলী যতবার ছটফট করে ততবার হিংস্রভাবে কামড় পড়ে তার নরম ঠোঁটে। আরিশের চোখ বন্ধ। তার অবাধ্য হাতের বিচরন জামা ভেদ করে উন্মুক্ত মাংসে খামছে ধরে। আরিশ নাজলীকে পাজা কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দেয়। নাজলী সরে যেতে চাইলে হ্যান্ডকাফ দিয়ে হাত বেঁধে ফেলে। আরিশ ঘন ঘন নিশ্বাস টানছে। ঠোঁট ব্যাথার কারনে নাজলী কথা বলতে পারছে না। কোনোরকম উচ্চারন করে বলে,
” কুত্তার বাচ্চা, আমার ঠোঁট কি তর বাপের সম্পত্তি।
আরিশ নেশালো চোখে তাকায়। গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে বলে
” আমার, একান্তই আমার সম্পত্তি। আমার ভালোবাসা! আমার প্রেম! আমার নিশ্বাস।
নাজলী থমকে যায়। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। কাঁপা গলায় বলে,
” ক… কি বললেন?
আরিশ কানের দিকে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলে,
” ভালোবাসি তোমাকে। এই কন্ঠে পর পুরুষের নাম সহ্য হয় না। আগুন লাগিয়ে দিতে ইচ্ছে করে।
নাজলী ঠোঁট চেপে ধরে নিজের। চোখ দিয়ে বিরতহীনভাবে পানি গড়িয়ে পড়ছে। এই শব্দটা শুনার জন্য কত ছটফট করেছে সে। অবশেষে, একটু ত্যারামি করার ফলে শুনার ভাগ্য হলো। নাজলী আরিশকে উঠাতে চাইলো। আরিশের নিশ্বাস এলোমেলো। কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আরিশের এমন ছন্নছাড়া, উন্মাদ রুপ দেখে নাজলী ভড়কে যায়,
” ক… কি করছেন ছাড়ুন।আমার কথা শুনোন আগে।
আরিশ ছাড়লো না। হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দিয়ে জামার ফিতার মধ্যে হাত রেখে গলায় মুখ গুজে দেয়। মিনতি সুরে বলে,,
” প্লিজ, ন… নাজলী। অন্তত এই মুহূর্তে সরে যেত বলো না। প.. প্লিজ! ভালোবাসি তো অনেক। অনুমতি দাও… প্লিজ!
নাজলীর শরীর শিরশির করে উঠে। আরিশের পিঠে হাত রেখে নাজলী চোখ বন্ধ করে ফেলে নিজের। অনেক তো দুরত্ব হলো। আর এত দুরত্ব রেখে কি হবে? ভালোবাসার সময় তো দিন দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। নাজলী লজ্জায় লাল হয়ে যায়। কাঁপা গলায় বলে,
” আমিও ভালোবাসি আপনাকে। অনেক ভালোবাসি!
সাথে সাথে খুলে যায় জামার ফিতা। নাজলীর শরীর শিরশির করে উঠে। আবার ও।শক্ত করে আরিশের পিঠ খামছে ধরে। অনুভব করতে পারছে একজন উন্মাদ পুরুষের বেসামাল স্পর্শ। কি আশ্চর্য! ভালোবাসা শব্দে এত শক্তি কেনো? সামান্য একটা স্বীকার উক্তিতে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছে। সরে আসার মত শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। আরিশ নাজলীর কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৩
” প্রস্তুত!
নাজলী লজ্জা আর আতঙ্কে আরিশের বুকে মুখ লুকায়। আরিশ মুচকি হেসে নাজলীর মাথায় চুমু খায়,
” ভয় নেই। নিজের সবটা দিয়ে আগলে নিব।
নাজলী চোখ বন্ধ করে ফেলে। শক্ত করে খামছে ধরে আরিশের চুল। সময় যাচ্ছে বিরতহীনভাবে। ভালোবাসার এক অতল গহ্বরে হারিয়ে যায় দুইজন।
সঠিক মানুষের সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত যেন এক একটা নতুন জন্ম। আরিশ আর নাজলী সেই জন্মের স্বাদ নিতে নিতে ডুবে গেল একে অপরের মাঝে।
