Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯৪

দাহশয্যা পর্ব ৯৪

দাহশয্যা পর্ব ৯৪
Raiha Zubair Ripti

লোকে বলে মেয়ে মানুষের স্বামী ভালো হলে সেই মেয়ের জন্য পৃথিবী নাকি জান্নাতের মতো। আর স্বামী খারাপ হলে পৃথিবী টা হয় জাহান্নাম। মেহরিন এত দিন নিজেকে ভাগ্যবতী ভেবেছিল কারন তার কাছে ছিল মোতালেব ভুঁইয়ার মতো একটা অসাধারণ পিতা,আর সোলেমান নামের এক ছলচাতুরী, ঠকবাজ, প্রতারকের আড়ালে নিজেকে ঢেকে এক আদর্শের চাদর গায়ে দেওয়া স্বামী নামের পাপী।
মেহরিন তো কেবল একটা সুন্দর সংসারের স্বপ্নই দেখেছিল। যেখানে সে থাকবে তার স্বামী থাকবে আর তাদের অংশ তাদের সন্তান থাকবে। ব্যাস এটুকুই তো! নাকি মেহরিন সোনাদানা টাকা পয়সা ক্ষমতা সাম্রাজ্য এসব চেয়েছিল? সে সাধারণ একজন মানুষ, তার কখনোই এসব ক্ষমতা,টাকা পয়সার উপর লোভ জন্মায় নি। তার কেবল লোভ ছিলো একটা সুন্দর সংসারের। যার সাথে যাকে নিয়ে সংসার করার লোভ ছিলো সেই লোকটাই মেহরিনের সংসার টাকে গলায় চেপে মে’রে ফেললো!
মেহরিন ওড়নার এক প্রান্ত চেপে ধরে শব্দ করে কেঁদে উঠছে আর বারবার বলছে-

“ আপনি আমাকে ঠকালেন। ঠকালেন আপনি আমাকে! আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে এই আপনাকে আমি এতগুলো দিন অন্ধের মতো ভরসা করেছিলাম! বিশ্বাস করেছিলাম! ভালোবেসে ছিলাম! নিজের মিথ্যা মৃত্যুর খবর টাও নির্দ্বিধায় ছড়িয়ে দিলেন লুকিয়ে এইসব পাপ কাজ করার জন্য! কেনো করলেন এসব বলুন কেনো করলেন? ”
সোলেমান বা হাতে থাকা র’ক্তে মোড়ানো রাম দা টা ফ্লোরে ফেলে দিলো শব্দ করে। ঘাড় ফিরিয়ে একবার চাচার পানে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলল-
“ আমি তোমাকে মে’রে ফেলবো চাচা,জাস্ট মে’রে ফেলবো। ” কথাটা শেষ করেই হাঁটু গেঁড়ে মেহরিনের কাছে বসে সোলেমান। হাত দিয়ে ধরতে গেলে মেহরিন চিল্লিয়ে বলে উঠে-
“ ছুঁবেন না। একদম ছুঁবেন না আমাকে। ”
সোলেমান হাত পিছিয়ে আনে-
“ আচ্ছা বেশ ছুঁবো না। আমি ছুঁবো না তোমাকে। আমার কথাটা শোনো। এসব যা কিছু দেখছো সব মিথ্যা। চোখে দেখা সবটা সত্যি হয় না মেয়ে। শুনছো আমার কথা মেহরিন? কি বলছি বুঝছো?”
মেহরিন সোলেমানের দিকে ঘুরে তাকালো। ফ্লোরে পরে থাকা রাম দা টা দেখিয়ে বলল-
“ সবটা মিথ্যা? এই মেয়ে গুলো মিথ্যা? আমি মিথ্যা? এই মৃত্যুপুরী টা মিথ্যা? নাকি আপনি বেঁচে আছেন সেটা মিথ্যা? বলুন কোনটা মিথ্যা? কি করছিলেন ঐ রাম দিয়ে ঘরের ভেতর? হু? কি করছিলেন? কাকে খু’ন করছিলেন? ”

মেহরিন উঠে দাঁড়ালো। চোখের জল মুছে রুমের ভেতর ঢুকলো। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলো স্ট্রেচারে একটা পুরুষালি দেহ ছটফট করছে। যার শরীর থেকে গলাটা আলাদা। এখনো র’ক্ত গড়িয়ে পরছে। মেহরিনের শরীর টা কেঁপে উঠলো। সে কখনো এসবের সম্মুখীন হয় নি। অথচ আজ হতে হলো। চোখ মুখ বন্ধ করে খিঁচে ধরলো। দেওয়ালে শরীরের ভর ঠেকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিলো। আজ ২০ টা দিন ধরে মেহরিন নরকের মতো জীবন বইছে। শরীর আর কতই বা সায় দিবে?
মেহরিন হাতের আঙুল দিয়ে ঐ মৃ’ত দেহটা দেখি বললো-
“ কি এটাও মিথ্যা? খু’ন টা কি আপনি করেন নি? কেনো করেছেন? বলুন কেনো করেছেন এসব? ”
বাশার সুলতান পেছনে থাকা কাপড় দিয়ে নিজের হাতটা মুছতে শুরু করলো। সোলেমান নিশ্চুপ। আহত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। মেহরিন আসলো কিভাবে এখানে তার মাথায় ঢুকছে না। কোন সাহসে তারা মেহরিন কে ধরে নিয়ে আসলো! সোলেমান রাম দা টা তুলে নিয়ে ছেলে গুলোর দিকে তেড়ে আসতে আসতে বলল-
“ তোদের সবকটাকে আজ আমি মে’রে ফেলবো শু*** বাচ্চারা। ”
একটাকে অলরেডি কোপ দিলো। আরেকটাকে দিতে যাবে এমন সময় বাশার সুলতান এসে সোলেমানের হাতটা ধরে থামিয়ে দিয়ে টেনে সাইডে নিয়ে বলল-

“ মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং সোলেমান। আমি নিজেও জানতাম না এটা। ”
সোলেমান ঝাড়া দিয়ে বাশার সুলতানের হাতটা সরিয়ে দিয়ে দাঁত চেপে বলল-
“ মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং! কিভাবে হয় তোমার এত বড় মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং? তোমার ভুলের মাশুল কি প্রতিবার আমি দিব? বলো? জবাব দাও। কোন সাহসে ওরা আমার স্ত্রী কে তুলে আনলো? ”
“ আমাদের এত দিনের ব্যবসাটা কি তুই….”
সোলেমান ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক হয়ে বলল- “ আমাদের! ”
বাশার সুলতান এক হাত চেপে ধরলো সোলেমানে।
“ শেষ বার? প্লিজ? এত গুলো বছর ধরে আমরা একসাথে। তোর সুখ দুঃখের একমাত্র ছায়া আমি সোলেমান। নিজের হাতে গড়েছি তোকে। পারবি না? ”
“ সেটারই প্রতিদান চাইছো তবে?”
“ যদি তাই ভাবিস,তাহলে তাই?”
সোলেমান চোখ বন্ধ করে বলল-
“ শেষবার চাচা। এটাই শেষবার। ”

বাশার সুলতান ইশারায় বাকি ছেলেদের বললো বাকি মেয়েগুলোকে নিয়ে এই রুম ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। ছেলেগুলো মেয়েগুলোকে টেনে নিয়ে যেতে চাইলে মেহরিন বলে উঠে-
“ কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ওদের? ছেড়ে দিন বলছি। ছেড়ে দিন। ”
সোলেমান বাশার সুলতান দুজনেই এগিয়ে আসলো। বাশার সুলতান মেহরিনের কাছে এসে বলল-
“ শোনো মা মেহরিন..”
মেহরিন অগ্নি দৃষ্টি নিয়ে তাকালো-
“ খবরদার ঐ মুখে মা শব্দ টা উচ্চারণ করবেন না। আমার নামটাও নিবেন না। লজ্জা করে না এই বয়সে এসে এসব করতে! কিভাবে পারেন আপনারা মেয়েদের তুলে নিয়ে বিক্রি করে দিতে! এত টাকার লোভ! এতটা জঘন্য আপনারা! ”
সোলেমান এগিয়ে এসে মেহরিনের হাতটা ধরে বলল-

“ চলো বাড়ি চলো। ”
মেহরিন হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-
“ কিসের বাড়ি? কোন বাড়ি যাওয়ার কথা বলছেন? আমি আপনার স্ত্রী বলে আমাকে নিয়ে যাবেন,আর এই অসহায় মেয়ে গুলো আপনার কেউ নয় বলে তাদের আপনারা বিক্রি করে দিবন! ”
“ মেহরিন চলো এখান থেকে। আচ্ছা তুমি চাও ওদের যেন ছেড়ে দেওয়া হয় তাই তো? আচ্ছা বেশ আমি ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবো। ওদের বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিয়ে আসবো। তবে আমার একটু সময় লাগবে। সেই সময়টা আমাকে দাও। চলো এখন? ”
বাশার সুলতান অবাক চোখে তাকালো। কি বলছে কি এই ছেলে! কত গুলো টাকা নেওয়া হয়েছে এডভান্স ও কি জানে?
“ সোলেমান…”
সোলেমান আঙুল ঠোঁটের কাছে নিয়ে বলল-

“ হিশশশ। আমাকে সামলাতে দাও। পাপ করছি পাপের সাজা তো পেতেই হবে। ”
মেহরিন ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো সোলেমান কে। চিৎকার করে বলে উঠলো-
“ আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আপনি এতটা নিচ এতটা জঘন্য মানুষ। কেনো করলেন এসব? আমি আপনাকে কতটা ভরসা করেছিলাম জানতেন না? কদিন পর বাপ হতে যাচ্ছিলেন। লজ্জা করছিলো না? আপনার যদি একটা মেয়ে হয় সেই মেয়ের সাথেও যদি এসব করা হয় তখন কি করতেন? নিজেকে বাপ তো বাদই দিলাম মানুষ ভাবতেও কি আপনার লজ্জা করে না? কান খুলে শুনে রাখুন আমি আর আপনার সাথে সংসার করবো না। আমি কোনো পাপীর সাথে এক ছাঁদের নিচে থাকতে পারবো না। না না পারবো না। ”
সোলেমান বাহু চেপে ধরলো মেহরিনের-

“ কি বলছো কি এসব? আমার সাথে সংসার করবে না মানে? ”
মেহরিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বলল-
“ ছুঁতে মানা করেছি না আপনাকে? ছুঁবেন না আমাকে। আপনার ছোঁয়ায় আমার নিজেকে অপবিত্র কলুষিত লাগে।”
“ আমি তোমাকে ছাড়বো না মেহরিন। ”
“ মে’রে ফেলবেন? ফেলুন। শান্তি পাবো তাতে। ”
সোলেমান দেওয়ালে নিজের সর্বোচ্চ টা দিয়ে ঘুষি মারে। মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ তুমি এটা করতে পারো না। তুমি এতটাও কঠিন মানুষ নও। মিছে কঠিন হওয়ার চেষ্টাও করো না। তুমি আমার মানে আমারই। আমি যতই পাপ করি না কেনো। তুমি আমার স্ত্রী হয়েই থাকবে। ছাড়াছাড়ির কোনো প্রশ্নই উঠবে না আমাদের মাঝে। আমি ছাড়বো না তোমাকে দুনিয়া উল্টে গেলেও বুঝেছো? ভালোবাসি আমি তোমাকে। ”
মেহরিন হেঁসে ফেললো সে কথা শুনে। তাচ্ছিল্যের সহিত বলল-

“ দয়া করে ভালোবাসি বলে ভালোবাসা শব্দটাকে হাসির খোঁড়াক বানিয়েন না। এটা কেমন সংজ্ঞা আপনার ভালোবাসার? খুন খারাপি,নারী দের তুলে বিক্রি করাটাও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ কোথায় লেখা আছে? আমাকে দেখান। আমি দেখতে চাই। একটা খারাপ মানুষ আপনি। আমাকে জাস্ট ব্যবহার করে গিয়েছেন। ”
“ খারাপ কেউ সাধে হয় না মেহরিন। একটা মানুষের খারাপ হওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কারন থাকে। ”
মেহরিন চোখ তুলে তাকায়, দৃষ্টিতে তীব্র ঘৃণা নিয়ে বলে-
“ কোন কারণ একজন মানুষকে এমন খারাপ বানায়? আমাকেও বলুন,আমিও শুনি। খুন করা, মেয়েদের তুলে এনে বিক্রি করা। না জানি আরো কি কি করেন। এগুলোও কি কোনো কারণের জন্য করে মানুষ? টাকার অভাব ছিলো আপনার? অভাব পূরন করার জন্য এসব করছেন? এসব করেই তাহলে এত টাকা পয়সা কামিয়েছেন? প্রতারক একটা। ”
সোলেমান চমকে উঠলো –

“ মেহরিন! তুমি আমার সম্পূর্ণ কথাটা শোনো। ”
“ কি বলবেন? নিজের হয়ে সাফাই গাইবেন? নিজের মিথ্যা মৃত্যুর মতোই আবার আরেকটা মিথ্যা বলবেন? বলুন শুনছি তবে। ”
“ না। আমি কখনো নিজের হয়ে সাফাই গাই না। আজও গাইবো না। তোমায় আমি বলেছিলাম যে আমার বাবা আর মা তারা স্বাভাবিক ভাবে মারা গেছে। মিথ্যা বলেছিলাম। তারা স্বাভাবিক ভাবে মারা যায় নি। তাদের খু’ন করে মারা হয়েছিল। আমারই চোখের সামনে মারা হয়েছিল। তখন আমার ৮ বছর। সাল ১৯৯৬। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা কুৎসিত বছর ছিলো বলা চলে। বছরের শুরুতেই, ফেব্রুয়ারি মাসে একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি জয়লাভ করে। নির্বাচনটি শুরু থেকেই বিতর্কিত ছিলো কারণ প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করেছিল। ফলে নির্বাচনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কমে যায় আর নির্বাচনটি একতরফা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে দেশে তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়। বিরোধী দলগুলো একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। জনমতের চাপ আর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিএনপি সরকার বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। অবশেষে প্রায় দেড় মাসের মাথায় সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, যার প্রধান কাজ ছিল একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা।

এরপর জুন মাসে আবারও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবার সকল প্রধান রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে, ফলে নির্বাচনটি প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। আমার বাবা আমজাদ সুলতান আওয়ামী লীগ থেকে এই নির্বাচনে দাঁড়ান ঢাকা ৮ আসন থেকে।আর সেই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। আমার বাবা ক্ষমতায় আসে। এই নির্বাচনের জন্যই অনেক শত্রুও হয় বাবার। বলা চলে বিরোধী দল থেকেই। প্রায় বেশির ভাগ সময়ই বাবা বাড়ির বাহিরে থাকতো। মাঝেমধ্যে রাতে আসতো আবার ভোরেই বেরিয়ে যেত। শুনেছিলাম বাবা কোনো ঝামেলায় পড়েছে। ঢাকার কোথাও যুবসমাজ কে ধ্বংস করার জন্য ক্ষতিকর ড্রাগস সাপ্লাই করা হয়। বাবা সেসবই বন্ধ করার জন্য জোর চেষ্টা করছিলেন। বড় বড় মন্ত্রী দের সাথে বাড়ির বাগানে মাঝেমধ্যে আলোচনা করতেন। আমাদের বাহিরে আসা নিষেধ থাকতো ঐ সমটায়। বলেছিলাম তো আমার মা অনেক সুন্দর ছিলেন। পুরুষদের নজর পরলে নিঃসন্দেহে টানা ৫ মিনিট শুধু তাকিয়েই থাকবে। বাবাও নানার মতো মা’কে লুকিয়ে রাখতেন। খুব জরুরী ছাড়া বাহিরের কাউকে আসতে দিতেন না বাড়িতে।

আমাকে আম্মু বাসায় রাখতো না খুব একটা। মানে সব সময় পড়াশোনার ভেতর বিজি রাখতো। এই যেমন সকাল ছয়টায় মসজিদে পাঠাতো। ৯ টায় স্কুলে পাঠাতো। স্কুল শেষে বিকেলে এসে গোসল করে খাইয়ে দাইয়ে আবার নাইট কেয়ারে পাঠাতো। সেই পড়া শেষ হতে হতে বাসায় ফিরতে আমার রাত ১০ টা বেজে যেত। সেদিন ঝড় বৃষ্টি থাকায় ৯ টা বাজতেই ছুটি দিয়ে দেয়। আমি ড্রাইভার আঙ্কেলের সাথে বাসায় ফিরে দেখি বাগানে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে আমার বাবা। আমি দৌড়ে ছুটে গেলাম। উপর হয়ে থাকা বাবাকে সোজা করতেই দেখলাম তার বুক দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। গুলি করা হয়েছিল। আমি গুনে দেখলাম। ৫ টা গুলি করেছিল আমার বাবার সেই বুকটায়। যেই বুক আমাকে নিজ থেকে জড়িয়ে ধরতো সেই বুকে আমি সেদিন ঝাঁপিয়ে পরলাম বাবাকে ডাকলাম। মা’কে ডাকলাম। মা সাড়া দিলো না ডাকে। ড্রাইভার আঙ্কেল ভেতরে গিয়ে শুধু রুমাইসা কে পেলো। মা কে পুরো বাড়ি খুঁজলাম পেলাম না।

আমি তখন এক বাবা আর মা ছাড়া কাউকেই চিনতাম না। দাদা চাচা কাউকেই না। বলেছিলাম না দাদা আম্মুকে কোনো একটা কারনে অপছন্দ করতো। সেজন্যই বাবা যোগাযোগ রাখতেন না তাদের সাথে। যার দরুন তখন তাদের কোনো নম্বর আমার কাছে ছিলো না। ড্রাইভার আঙ্কেল পুলিশ ডেকে আনলেন। খবরের কগজে নিউজ চ্যানেলে তখন ঢাকা ৮ আসনের আমজাদ সুলতানের খুন হওয়ার খবর। আমাকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গেলো। আমি নিজেই তখন একদিকে বাবা হারানোর শোকে কাতর। অন্যদিকে মা কে খুঁজে পাচ্ছি না। সেই সাথে কোলে আমার পাঁচ মাসে বোন রুমাইসা।

পরের দিন বাবার পোস্টমর্টেম শেষে দাফনের কাজ সম্পূর্ণ করা হয় সুলতান নিবাসে। দাদা জান এসেছিলেন তখন। আমার সাথে ঠিকঠাক কথা বললেন না। কেবল রুমাইসা কে আমার কোল থেকে নিয়ে আদর করলেন। দাফন শেষে আবার চলেও গেলেন। একবারও বললেন না আমি আছি তো ভয় পেও না। কেঁদো না। তখন সুলতান নিবাসে আমি আর রুমাইসা আর ড্রাইভার আঙ্কেল। তিনি খাবার বানিয়ে খাওয়াতেন আমাদের। কদিন পর পর পুলিশ আসেন। কিসব বলে যেতেন আমার ছোট্ট মাথায় ঢুকতো না। তার ৫-৬ দিন পর ড্রাইভার আঙ্কেলও কাজ ছেড়ে চলে যায় নিবাস থেকে। তার নিজেরি তো সংসার আছে। কাজ না করলে তার সংসার চলবে কি করে? এইবার সুলতান নিবাসে আমি আর রুমাইসা একেবারে একা হয়ে গেলাম। রান্নাবান্না কিছু পারতাম। ক্ষুধা লাগলে রুমাইসা খুব কাঁদতো। আমি কোনো রকমে চুলা জ্বালিয়ে পানি গরম করে গুঁড়া দুধ মিশিয়ে ফিটারে ভরে খাওয়াতাম। জানতাম না যে সেখানে চিনি দিতে হয়। মিষ্টি না হলে খায় না। রুমাইসা খেতে চাইতো না। আমি আটা সেদ্ধ করে খেতাম গরম পানি দিয়ে। ভাত তো রাঁধতে জানতাম না। কাচা চাল ডাল চিবিয়ে খেতাম। কখনো রান্না ঘরেই আসি নি। সব কাজ আম্মু করতো। ক’দিন পর গ্যাসও ফুরিয়ে যায়। তখন রুমাইসা কে গুড়া দুধ ঠান্ডা পানি দিয়ে গুলিয়ে খাওয়াতাম। আর আমি ক্ষুধার তাড়নায় কাঁচা সবজি কেটে খেয়েছি। ফ্রিজের কাঁচা মাছ মাংস খেয়েছি। কেউ ছিলো না তখন আমার পাশে। আমার যে দুটো চাচা আছে সেটাও জানতাম না। আম্মুর খোঁজ পেতাম না। বাবার একটা রাজনৈতিক লোকও এগিয়ে আসে নি সেদিন। আমাদের খোঁজ খবর নেয় নি। আমার কারো কাছে ছোট থেকেই হাত পাততে অহং-এ লাগে। কারো কাছে যাই নি। চিনিই তো না কাউকে যাব আর কি করে?

প্রতিটা রাত ভয়ে কাটাতে হয়েছে। আস্ত একটা এত বড় বাড়িতে আমরা দুজন। বাহিরে ঝড় হলেই রুমের দরজা আটকে রুমাইসা কে নিয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে থাকতাম।
প্রায় দেড় মাস পর একদিন রাতে আম্মু বিধ্বস্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেন। তার অবস্থা খুবই বাজে ছিলো। যেই আম্মু তার রূপের জন্য সবার চেয়ে আলাদা ছিলো সেই আম্মুকে সেদিন আমার চিনতে কষ্ট হলো। শরীরের ব্লাউজ ছেঁড়া। আঁচল মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। আম্মু দৌড়ে এসে আমাকে আর রুমাইসাকে খুব আদর করলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম-
“ আম্মু তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? আব্বু নেই। ম’রে গেছে। কে যেন মেরে ফেলছে আব্বুকে। অনেক ভয় পেয়েছি আম্মু। দেখো রুমাইসা তোমাকে না পেয়ে শুধু কাঁদে। আমি সামলাতে পারি না। আমাকে অনেক জ্বালিয়েছে। আমি একটুও বকি নি তাকে। মারিও নি আম্মু। ”

আম্মু কোনো জবাব দিলো না। আমাকে আর রুমাইসা কে টেনে আমাদের বাড়ির নিচে থাকা গোপন বেসমেন্টে নিয়ে যায়। এটা একটা হিডেন বেসমেন্ট ছিল, বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। পুরনো ইটের দেয়াল, স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, আর মাথার অনেক ওপরে একটা ছোট্ট এয়ার ভেন্ট যেখান দিয়ে সামান্য আলো ঢুকতো। আম্মু আমাকে আর রুমাইসাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল-
“ বাবারে আমাকে মাফ করে দিস। আমি তোদের সাথে থাকতে পারছি না বলে। বাবা আমার,শোন এই ঘর থেকে ভুলেও বের হবি না। মাকে কথা দে,যাই হোক না কেন, দুনিয়া উল্টে গেলেও না এই বেসমেন্ট থেকে বের হবি না। বোন কে আগলে রাখবি সবসময়। বাহির থেকে কোনো আওয়াজ আসলেও কানে নিবি না। চুপচাপ বোনের সাথে থাকবি। বের হলে কিন্তু তোকে আর রুমাইসাকেও মেরে ফেলবে ওরা। মা কে কথা দে বাবা। ”
আম্মুর কথাটা শুনে আম্মুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-
“ কিছু খাস নি তাই না? আমিও আজ অনেকদিন ধরে কিছু খাই না। ওরা আমাকে খেতে দেয় না। তোদের কাছে আসতেও দেয়। আজ অনেক কষ্ট করে পালিয়ে এসেছি রে। হাতে সময় নেই। ওরা চলে এলো বলে। আমি রান্না করে নিয়ে আসি? তিনজন মিলে খাব হু? ”
আমি চোখের জল মুছে বললাম-

“ গ্যাস ফুরিয়ে গেছে আম্মু। কাঁচা সবজি খেয়ে থাকতে হয় আমাকে। সব ফুরিয়ে গেছে। আলু হয়তো আর দুটো আছে। অনেক দিন হলো ভাত খাই না আম্মু। রুমাইসা কে ঠান্ডা পানি দিয়ে দুধ গুলিয়ে খাওয়াই। খেতে চায় না। ”
আম্মু জড়িয়ে ধরে কাঁদলো কিছুক্ষণ। তারপর বলল-
“ আম্মু এসে গেছি না? একটু অপেক্ষা করো। আমি দেখছি কি রান্না করা যায়। এখানেই থাকবি হ্যাঁ? ”
আমি মাথা নাড়লাম। আম্মু দরজাটা বাইরে থেকে লক করে চলে যায়। বসার ঘরেই ইট বিছিয়ে চুলা বানিয়ে আম্মু রান্না ঘরে থাকা ঐ দুটো আলু দুটো সিদ্ধ করেছিল। হয়তো চালডাল কিছুই পায় নি আর।
বেশ কিছুক্ষণ পরই আমি শব্দ শুনতে পাই। গাড়ির আওয়াজ। ভারী বুটের আওয়াজ। দরজা ভাঙার শব্দ। কারন এই রুমের ভেতরে থেকে বাহিরের সব কিছু শোনা যায়। আমি সেই এয়ার ভেন্টের নিচে দাঁড়িয়ে, ভাঙা পুরোনো টেবিলের উপর উঠে কোনোভাবে বাইরে তাকাই… আর যা দেখি সেটা আমাকে সারা জীবনের জন্য শেষ করে দেয়…
ওরা আম্মুকে টেনে বাগানে নিয়ে জিজ্ঞেস করছিলো আমি আর আমার বোন কোথায়? আম্মু কিছুই বলেনি একবারও না। তারা আম্মুকে চ’ড় মারলো। আম্মু পড়ে গেল মাটিতে।
আমি সেই এয়ার ভেন্ট দিয়ে সব দেখছিলাম। চিৎকার করছিলাম। নেমে দরজায় ধাক্কা মারছিলাম। কিন্তু বের হতে পারি নি। আম্মু বাইরে থেকে লক করে দিয়েছিল যে।

আমি আবার দৌড়ে ভেন্টের নিচে দাড়ালাম। তারা আমার আম্মুর চুলের মুঠি ধরে টেনে উঠিয়ে পরপর গালে চ’ড় মারছে। আমি পাগলের মতো দেওয়াল থাপড়াতে থাকি চিৎকার করে আম্মুকে ছেড়ে দিতে বলি। কিন্তু আওয়াজ তাদের অব্দি যায় না। মারতে মারতে আমার আম্মু যখন নেতিয়ে পড়ে তখন একজন এগিয়ে আসে। তার মুখেও কালো মাস্ক ওভারকোট,চোখে চশমা,হাতে কালো গ্লাভস। সে আসতেই বাকি লোক গুলো পেছনে ফিরে দূরে চলে গেলো। সেই অমানুষ কুত্তার বাচ্চা আমারই চোখের সামনে আমার আম্মুলে শ্লীলতাহানি করলো। আমার সামনেই আমার মায়ের কাপড় টেনে খুললো তারপর কুকুরের মতো ঝাঁপিয়ে পরলো। আমি কাটা মুরগির মতো দেওয়াল দরজা লাত্থাতে লাগলাম। একটু পরপর উঁকি দিতে গিয়েও আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। তখন খেয়াল করেছিলাম ঐ লোকের পায়ের একটা ট্যাটু আছে। অদ্ভুত সেই ট্যাটু। উঁচু করেছিলেন প্যান্ট পায়ের কাছ থেকে। তখন দেখেছি।
আমার জানা মতে আমি কখনো এমন পরিস্থিতিতে কোনো সন্তান পড়েছে শুনি নি। যে কি না তার মায়ের শ্লীলতাহানি,ধর্ষণ হওয়া দেখেছে। এতেও আমার আম্মু রক্ষা পায় নি। তারা পাগলা কুকুর ছেড়ে দেয় তার উপর। সেই কুকুর আমার আম্মুর শরীর থেকে মাংস খুবলে খুবলে খেয়েছে। ক্যান ইউ ইমাজিন মেহরিন? আমার চোখের সামনে সব হচ্ছে। কিন্তু আমি কিচ্ছু করতে পারি নি। আমার আম্মুর আহাজারি শুনতে পারছিলাম। সে কয়েকবার আমার দিকে তাকিয়েছিল। ইশারা বারবার বোঝাচ্ছিল দেখিস না আমাকে আব্বা দেখিস না। লুকিয়ে থাক ওখানে। বের হোস না ভুলেও।

আমার অশ্রু গড়িয়ে পড়ে চোখ দিয়ে আমি বারবার আল্লাহকে ডেকে বলছিলাম… আল্লাহ, আমার আম্মুকে বাঁচাও। ঐ কুকুর কে থেমে যেতে বলো। আমার আম্মুকে ছেড়ে দিতে বলো। আমার আম্মু কে যে খেয়ে ফেলছে খোদা। আমার আম্মুকে বাঁচাও। আমার আম্মু বাঁচে নি সেদিন। সেই কুকুর টা আমার আম্মুর দেহ থেকে মাংস কামড়ে খেয়ে মে’রে ফেলেছিল।
তিন দিন। আমরা ওই বেসমেন্টে বন্দি ছিলাম… না খেয়ে, না ঘুমিয়ে। তিনটা দিন রুমাইসাও না খাওয়া ছিলো। শুধু পানি খাইয়েছিলাম।
এরমধ্যে মাঝখানে একদিন ঐ লোক গুলো আসে। বাড়িটা খুঁজে আবার চলে যায়। আমার মায়ের দেহটা দিনে দুপুরে সন্ধ্যায় যখনই কোনো কুকুর ঢুকে তখনই খেয়ে পেট ভরে চলে যায়। আমি আটকাতে পারি না। শুধু চিৎকার করে মানা করি।
তিনদিন পর আমি একটা পুরনো কোড়াল পাই একটা ট্যাংকের ভেতরে। সেই কোড়াল দিয়ে দরজাটা ভাঙতে ভাঙতে হাত কেটে যায়। অবশেষে দরজা খুলে যায়। বাইরে তখন ঝড়ো বৃষ্টি। আকাশ কালো, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টি এত জোরে পড়ছিল যে মনে হচ্ছিলো পুরো দুনিয়া ডুবে যাচ্ছে। আমি রুমাইসা কে ঐ রুমে রেখে দৌড়ে বাগানে যাওয়ার সময় বসার ঘরে দেখি ইট দিয়ে বানানো চুলোর উপর পাতিলে দুটো আলু। আমার মা আমাদের নিয়ে খেতে চেয়েছিল। কিন্তু খেতে পারে নি। যখন খাওয়ার সময় হলো তখনই তারা এসে পরলো।

আমি দৌড়ে বাগানে গিয়ে দেখি মায়ের দেহটা পড়ে আছে। পচে গন্ধ বের হচ্ছে। আমি পাগলের মতো তাকে জড়িয়ে ধরি। চুমু খাই,ডাকি,কিন্তু মা আর সাড়া দেয় না। বৃষ্টির পানিতে তার শরীর থেকে মাংস খসে খসে মাটিতে মিশে ধুয়ে যাচ্ছিলো।আমি কুড়াল টা এনে বাবার কবরের পাশে মায়ের জন্য কবর খুঁড়তে শুরু করি। তখনই আবার হঠাৎ গাড়ির শব্দ পাই। আমি ভয় পেয়ে আবার দৌড়ে ভেতরে লুকাই। রুমাইসা কে নিয়ে লুকাই টাঙ্কের ভেতরে। কারণ ওরা বারবার আসতো আমাদের খুঁজতে। ওরা চলে গেলে আমি আবার বের হই। একাই, একাই আমি মায়ের জন্য কবর খুঁড়ে তাকে দাফন করি। তারপর আরো একটা মাস আমি লুকিয়ে থাকি বেসমেন্টে। রুমাইসার দুধ ফুরায় নি তখনও,আর এক প্যাকেট ছিলো। ওর জন্য এক কার্টুন ভরে দুধ নিয়ে আসতো বাবা। আমি ভুলেও ওর জন্য আনা দুধ খাই নি। আমি খেলে ও কি খাবে ওর খাবার শেষ হয়ে যাবে এই ভয়ে। সেজন্য আমি ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে বাগানের ঘাস চিবিয়ে খেয়েছি মায়ের কবরের পাশে বসে। সেই দিনই আমি মরে গিয়েছিলাম মেহরিন।

আম্মুকে কবর দেওয়ার এক মাস পর বাশার চাচা আর আমিরুল চাচা দেশে আসেন। চাচা আমাকে আর রুমাইসা কে নিয়ে সুলতান ভিলায় যান। দাদা তখনো ভাবলেশহীন। আম্মুর সাথে এত বড় কিছু হলো তাতেও তার কিছু যায় আসলো না। আমিরুল চাচা কি যেন বললো দাদা কে ডেকে নিয়ে। তার কদিন পর থেকে দাদা আমার সাথে কথা বলতে শুরু করলো। আমিরুল চাচা বিয়ে করলেন চাচি কে। রুমাইসা কে তাদের সন্তানের মতো লালন-পালন করলেন। আমিও নিবাসে চলে আসি বাশার চাচার সাথে। বাশার চাচা পরে আব্বুর বিজনেস আর রাজনীতির হাল ধরেন। আমাকে স্বাভাবিক জীবনে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমি তো শুধু একটা জিনিসের জন্য বেঁচে আছি। যারা এটা করেছে তাদের খুঁজে বের করার জন্য আমি এই পাপের দুনিয়ায় পা রেখেছি। কারন তারা এই পাপের দুনিয়ারই লোক। সেজন্য চাচার থেকে সাহায্য নিয়ে আমি এই দুনিয়ায় ঢুকলাম। সেই খুনির খোঁজ পেয়েই আমি ডেনমার্কে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে বুঝলাম আমি ফাঁদে পরেছি। তারা আমার উপর সর্বদা নজর রাখে। আমার প্রতিটি মুভমেন্ট আগে থেকেই জেনে যায়। সেদিন সত্যি সত্যি আগুন লেগেছিলো গোডাউনে। ঠিক সময়ে ঘোস্ট আর্কাইভিস্ট এসে আমাকে না বাঁচালে সত্যি সেদিন আমার মৃত্যু হতো। আমাকে হসপিটালে এডমিট করে। সর্বপ্রথম ঘোস্ট আর্কাইভিস্ট ইব্রাহিম কে ফোন করে জানায় এটা। সেজন্যই ইব্রাহিম তোমাকে বারবার ডেনমার্কে আসতে বলছিলো। সেদিন রাতে আমিই এসেছিলাম সুলতান নিবাসে তোমার কাছে। ”

মেহরিন কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“ ইব্রাহিম ভাইয়া। এজওয়ান ভাইয়াও এসবের সাথে জড়িত তাই না? ”
সোলেমান সময় নিলো,আশেপাশে তাকিয়ে বলল –
“ না ওরা এসবের কিছুই জানে না। ওরা এসবে জড়িত না। সব কিছুর মূলে কেবল আমি আছি। হ্যাঁ আমিই আছি।”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে আসে। মেহরিন স্থির দাঁড়িয়ে থাকে, তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সেই জলে এখন শুধু ঘৃণা নেই আছে অসহ্য যন্ত্রণা আর এক ভয়ংকর সত্যের ভার। হ্যাঁ সোলেমানের এমন জীবন মোটেও মেনে নেওয়ার মতো না। তাই বলে অন্যায়কারী কে খুঁজতে সে নিজে অন্যায় করবে দিনের পর দিন! তাহলে তার মধ্যে আর সেই খুনির মধ্যে পার্থক্য রইলো কিসে?
মেহরিন কাঁপা গলায় বল উঠলো-
“ আপনার কষ্ট আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু সেই কষ্ট আপনাকে ওদের মতো হওয়ার অধিকারটাও দেয় না। আপনি প্রতিশোধ নিচ্ছেন না। আপনি আরেকটা নরক তৈরি করছেন। দেশে কি আইন নেই? ”
সোলেমান শব্দ করে হাসলো –

“ ২৬ টা বছর কি কম সময় মেহরিন? আইনের উপরই তো আছে এই কেইস টা। তারা কি করতে পারছে? আইন টাকার কাছে কেনা বুঝেছো? আমিই অন্ধকার জগৎে থেকে তাকে ধরতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি সেখানে আইন কিভাবে বাংলাদেশে বসে ধরবে তাদের? আমার বাবা মায়ের খুনি কে আমাকেই খুঁজে বের করতে হবে। নিজ হাতে শাস্তি দিতে হবে। ”
“ সেজন্য মেয়েদের তুলে পাচার করবেন! এই আপনার অপরাধী দের ধরার নমুনা? ছিঃ! অনুতপ্ত হোন না? খারাপ লাগে না? রুমাইসা আপুকেও এভাবেই বিদায় নিতে হলো দুনিয়া থেকে। আপনার কি একবারও এটা ভাবনায় আসে নি? আপনার পাপের সাজা তাকে পেতে হয়েছে। যেই বোন কে ছোট বেলায় রক্ষা করলেন সেই বোনকেই বড় হয়ে মে’রে ফেলছেন। অপরাধী আপনি। আমি আপনাকে জাস্ট ঘৃণা করি। ”
সোলেমান মেহরিনের বাহু চেপে ধরে নিজের কাছে টেনে ধরে বলল-

“ শোনো মেহরিন আমি ভালো হয়ে যাব। তোমার মনের মতো হয়ে যাব। সব ছেড়ে দিব। চাচা কে বলবো সবাই কে ছেড়ে দিতে। তুমি প্লিজ আমাকে ঘৃণা করো না। তোমার চোখে নিজের জন্য এই ঘৃণাটাই আমি দেখতে চাই না। ”
মেহরিন সোলেমানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-
“ আমি বাড়ি যাব। আমার আব্বুর কাছে যাব আমি। আমি থাকবো না আপনার সাথে। আমাকে আমার আব্বুর কাছে দিয়ে আসুন। সে আমাকে পাগলের মতো খুঁজছে। সে তো আর আপনার মতো অমানুষ না। সে তার স্ত্রী সন্তান কে ভালোবাসে। নিজের থেকেও ভালোবাসে। আর আপনি নিজেকে দেখুন। স্ত্রী আর অনাগত সন্তান কে তুলে নিয়ে এসেছেন পাচার করে দেওয়ার জন্য। না আপনি স্বামী হিসেবে ভালো আর না আপনি বাবা হিসেবে ভালো হবেন। ”
“ আচ্ছা আমি খারাপ,মানুষ হিসেবে আমি জঘন্য খারাপ। আমি মেনে নিয়েছি। তবে এটা বলো না যে আমি স্বামী, বাবা হিসেবে খারাপ। আমি সর্বদা চেষ্টা করেছি তোমার বাবার মতো তোমাকে, তোমাদের আগলে রাখতে। ”
“ কতটা পেরেছেন? জবাব দিন। যে তাকিয়েছে তার চোখ তুলে নিয়েছেন। যে হাত বাড়িয়েছে তার হাত কেটে দিয়েছেন,খুন খারাপি করে প্রটেক্ট করা এসব আপনার ভালো রাখার নমুনা? আমাকে দয়া করে আব্বুর কাছে দিয়ে আসুন। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। ম’রে যাচ্ছি আমি। আপনাকে দেখলেই নিজের প্রতি নিজেকে আমি ধিক্কার দিচ্ছি। ”

“ দিয়ে আসবো। তুমি শান্ত হও। ” সোলেমান পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো- “ পানিটা খেয়ে নাও। শান্ত হও আগে। ”
কথা বলার মাঝখানেই মেয়ে গুলোকে নিয়ে যাওয়া হলে। মেহরিন সেটা দেখে বলল- “ কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ওদের? ছেড়ে দিতে বলেছি না আমি? ছেড়ে দিন।”
“ ছেড়ে দেওয়া হবে। ”
মেহরিন ফেলে দিলো পানির গ্লাস। সোলেমান ফ্লোরে ভাঙা কাঁচের টুকরো গুলোর দিকে তাকালো। মেয়েগুলো কে নিয়ে চলে গেলো তারা। তারপর মেহরিন –

“ বলে দিব, পুলিশ কে আমি সবটা বলে দিব। আপনি জনগনের সামনে ভালো মানুষির মুখোশ পরে সেই জগনেরই বুক ঘর খালি কারছেন। আপনার মতো জঘন্য লোকের সংসার আমি করবো না। ”
কথা গুলো বলেই একাই দৌড়াতে লাগলো। তার পেছন পেছন সোলেমান ও ছুটলো। ছুটতে ছুটতে বলল-
“ মেহরিন দাঁড়াও। দাঁড়াও বলছি। আমি দিয়ে আসবো তোমাকে। লক্ষীটি দাঁড়াও। ”
মেহরিন দাঁড়ালো না। সে আর এই নরকে থাকতে পারবে না। তার পেটে কেমন একটা যন্ত্রণা হচ্ছে। রাস্তা খুঁজে খুঁজে ঠিকই বের হলো মৃত্যুপুরী থেকে। তবে রাস্তায় এসে তার এই রাস্তাটা চেনা চেনা লাগলো। সে ঢাকায়! আর এটা তো সুলতান নিবাসের পেছন সাইড টা জঙ্গলের।
সোলেমান বের হয়ে রাস্তায় এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে মেহরিন কে খুঁজলো। দেখা যাচ্ছে না মেয়েটাকে। কোথায় গেলে এত তাড়াতাড়ি? ডানের রাস্তায় নাকি বামের রাস্তায়? সোলেমান ডানে গেলো আগে। তারপর বামে গেলো। কি আশ্চর্য মেয়েটাকে সে খুঁজে পাচ্ছে না যে।

সোলেমান তাড়াতাড়ি করে ইব্রাহিম কে ফোন করে আসতে বললো। ইব্রাহিম আসলো। সবটা খুলে বলল। সবটা শুনে ইব্রাহিম স্পিচলেস। তার রাগ হচ্ছে এই ছেলেটার উপর। ইচ্ছে করছে মেরে ফেলতে। কেউ কিভাবে নিজের সংসার টা নষ্ট হবে জেনেও এমনটা করতে পারে জেনেশুনে! এটা কেবল সোলেমানের দাঁড়াই সম্ভব। ইব্রাহিম ছেলেপেলে দের লাগিয়ে দিলো মেহরিন কে খোঁজার জন্য। অসুস্থ শরীর নিয়ে খুব একটা দূরে মেহরিন যেতে পারবে না।
সোলেমান পুলিশ স্টেশনে গিয়ে খুঁজলো। মেহরিন আসে নি। লোকটার নিজেকে পাগল পাগল লাগছে। একেই বলে নিজের পায়ে নিজেই কোড়াল মারা। সোলেমান রাস্তা দিয়ে ছুটতে শুরু করলো আর মেহরিনের নাম ধরে চিৎকার করতে লাগলো। কি আশ্চর্য তার মেহরিন নেই তো! কোথায় গেল? ওর তো শরীর টাও ভালো না। মেয়েটা কিছু করে বসবে না তো নিজের! চিৎকার করতে করতে এক সময় সোলেমান হাঁটু গেঁড়ে রাস্তায় বসে পড়লো। কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো-

দাহশয্যা পর্ব ৯৩ (৩)

“ ইয়া আল্লাহ প্লিজ.. প্লিজ সেভ মাই ওয়াইফ, প্লিজ সেভ মাই বেবি। আমার পাপের একটা আঁচও যেন আমার স্ত্রী আর আমার সন্তানের উপর না আসে। পাপ আমি করছি তার সাজা আমাকে দাও। আমি মেনে নিব। যা শাস্তি দিবে, হ্যাঁ আমি তোমার দেওয়া সব শাস্তি মেনে নিব। শুধু ওদের তুমি সুস্থ রাখো খোদা। ”
আর ঠিক সেই মুহুর্তে সোলেমানের পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। তড়িঘড়ি করে ফোনটা বের করে রিসিভ করলো এই আশায় কোনো সুখবর পাবে। কিন্তু নাহ্! সোলেমানের সব আশা কে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে তচনচ করে দিয়ে ওপাশ থেকে বলা হলো-
“ কমলাপুর রেলস্টেশনে রাস্তা পাড় হতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পরে এক বোরকা পরিহিত অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে এটাই আপনার স্ত্রী। ”

দাহশয্যা পর্ব ৯৪ (২)