Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৫

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৫

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৫
Tahmina Akhter

— তোমার নাম আমি এমনিতেই মিথ্যাবতী রেখেছি? তুমি অত্যাধিক মিথ্যা কথা বলো।
মেঘালয়ের কথা শুনে আলো হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বিছানায় খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসল। আলো’র কাছ থেকে জবাব না পেয়ে মেঘালয় ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য বিছানা থেকে নামল। আলো মেঘালয়ের বিছানা থেকে নেমে যাওয়ার দৃশ্য দেখছে আপাতত৷ মেঘালয় ওয়াশরুমে ঢোকার পর আলো তড়িঘড়ি বিছানা গুছিয়ে ফেলল৷ তারপর, ভদ্র বালিকার মত মেঘালয়ের জন্য অপেক্ষা করে। মেঘালয় ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আলোকে দেখার পর মুচকি হেসে আলো’র সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আলো মেঘালয়কে দেখে উঠে দাঁড়ালো। আলো খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে মেঘালয়কে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি এমন এক কথা বলল যে, আলো প্রশ্ন করা বাদ দিয়ে ভীষণ রেগে যায়। আলো’র রাগ দেখে মেঘালয় দারুন মজা পাচ্ছে। নরম নরম আলো, শীতল চাহনি ছুঁড়ে দেয়া বউটাকে দেখে তৃপ্তি পাচ্ছে না। রণচণ্ডী রুপের আলোকে দেখলে নিজেকে নিয়ে দারুন গর্ব হয়৷ কারণ, একজন রাগী মানুষকে কন্ট্রোল করার ক্ষমতা সবার হাতে থাকে না। সেই হিসেবে মেঘালয়ের বিরাট সৌভাগ্য। রাগী বউটাকে কত চমৎকার ভাবে সে হ্যান্ডেল করতে পারে!

— কি হলো কথা বলছেন না কেন? বিয়ের এতবছর পর আপনার মনে হলো, আমি খাটো? আপনার হাইটের সঙ্গে আমার হাইট আকাশপাতাল পার্থক্য?
আলো চেচামেচি করে ক্ষান্ত হবার পর মেঘালয় আলোর হাতটা উচু করে ধরে টাওয়াল ধরিয়ে দিয়ে বলল,
— আমার ঘরে এসেছো বিনা অনুমতিতে। আঙুল দিয়ে আমার পিঠে কিসব আজব আকিঁবুকিঁ করছিলে! তাও আমি তোমাকে কঠিন কিছু বললাম না। আর তুমি সামান্য তোমার উচ্চতা নিয়ে বলাতে এভাবে রেগে গেলে! এবার তোমার উচ্চতার ক্ষমতা দেখি আমি । আমার খুব কাছে দাঁড়িয়ে আমার ভেজা চুল মুছে দাও। দেখি তোমার উচ্চতা? মাত্র পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি উচ্চতা নিয়ে তুমি আমার পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চির উচ্চতাকে ছোট চোখে দেখছো?
মেঘালয়ের কান্ড দেখে আপাতত আলো’র ইচ্ছে করছে নিজের কপালটা দেয়ালের সঙ্গে ঠুকাতে। কেন যে ওভাবে রেগে গেল? এবার লাফালাফি করে ডাক্তার সাহেব এর ভেজা চুল মুছবে?
আলো টাওয়াল হাতে নিয়ে অসহায়ের মতো তাকায় কিন্তু মেঘালয় ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,

— দেরি হচ্ছে আমার।
— এভাবে আমি পারব না।
কথাটি বলেই আলো মাথা নীচু করে ফেলেছে। মেঘালয় মুচকি হেসে বলল,
— তাহলে তোমার উচিত তোমার হাইট নিয়ে খুশি থাকা৷
আলো’র ভীষণ রাগ হচ্ছে। এতটাই রাগ হচ্ছে যে চোখের পানি ঠেলে বাইরে বের হতে চাচ্ছে। হঠাৎ মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি চাপল। মেঘালয়ের সামনে গিয়ে মেঘালয়ের দুই পায়ের পাতায় ভর দিয়ে দাঁড়ায় আলো। তারপর, টাওয়াল দিয়ে মেঘালয়ের ভেজা চুল মুছতে শুরু করে। মেঘালয় তো যেন আশ্চর্যের সপ্তম আসমানে আছে। এ যেন মেঘ না চাইতে জল। মেঘালয় ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আলোর মুখের দিকে। আর আলো মেঘালয়ের চুল মুছতে মুছতে এতটাই বেখেয়ালি হয়ে গেছে চোখের সামনে একজোড়া ঘোরলাগা দৃষ্টি তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। মেঘালয় দুইহাত বাড়িয়ে আলোর কোমড় জড়িয়ে ধরে একেবারে তার কাছে টেনে ধরল। আলো হকচকিয়ে যায়। চুল মোছা বন্ধ করে মেঘালয়ের চোখের দিকে একপলক তাকিয়ে মাথা নীচু করে ফেলল। মেঘালয় আলোর অবনত মুখটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— তুমি আগের থেকে অনেক ভারী হয়ে গেছ। তোমার ভারে আমার পায়ের পাতা চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে।
এমন একটা রোমান্টিক মূহুর্তে ডাক্তার সাহেব এর কাছ থেকে এহেন কথা শুনে আলো’র ইচ্ছে করল ডাক্তার সাহেবের চুলগুলো মুঠ করে ধরে ইচ্ছামত টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। কিন্তু, হাজার হলেও তার স্বামী হয় এমন অনাচার স্বামীর সঙ্গে করা স্ত্রীদের শোভা পায় না। তাই মেঘালয়কে কিছু না বলেই আলো সরে দাঁড়ায়। হাতের টাওয়াল ছুঁড়ে রাখল বিছানার কোনে। তারপর, ছুটে বেরিয়ে যায়। ছুটে এসে দরজার কাছে পৌঁছানো মাত্রই পেছন থেকে মেঘালয় আলোর হাত টেনে ধরে। আলো পেছনে না ফিরে বলল,
— হাত ছাড়ুন।
— ছাড়ব না। কি করবে তুমি?
মেঘালয়ের কথা শুনে আলো’র চোখের কোনে জল চলে আসে। চোখ দুটোর কি যে হলো! অল্প কিছুতেই কান্না পায় শুধু৷ মেঘালয় জোর করে আলোকে তার দিকে ফেরালো। আলো চোখের জল আড়াল করার জন্য প্রাণেপনে চেষ্টা করছে। আর হাত ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করছে। মেঘালয় আলোকে জোর করে ধরে রাখার চেষ্টা না করে হাতটা ছেড়ে দেয়। জোর করলে তার বউ ব্যাথা পাবে। মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আলো নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
— আমি তো চাই আপনি আমাকে ছেড়ে না যান। কিন্তু, আপনি….

আলো’র কথা শুনে মেঘালয় বিস্মিত হয়ে যায়। বিস্ময় প্রকাশ করার কোনো মাধ্যম না পেয়ে মেঘালয় একহাত দিয়ে চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে বিষন্ন চোখে তাকায় আলো’র কথাগুলো শোনার জন্য। কিন্তু, আলোর কথা বোধগম্য হবার আগেই আলো আরও কিছু কথা বলল।
—আমাকে কখনোই আপনি ধরে রাখার চেষ্টা করেননি। সবসময় আমাকে আমার ইচ্ছে স্বাধীনতা দিয়েছেন৷ আমি ছোট মানুষ আমার ইগো, আমার জেদ, আমার ইচ্ছে স্বাধীনতাকে প্রয়োগ করে আপনার থেকে দূরে চলে গেলাম। অথচ, আমার বাবার পর আপনি ছিলেন যে আমাকে বুঝতেন, আমাকে বোঝানোর ক্ষমতা আপনার ছিল। আপনি কি কোনোদিন আমাকে বোঝাতে চেয়েছেন আপনি আমাকে কতটা চান? কতটা চাইলে আমাকে আপনি নিজের করে রাখতে চান? আমাকে দূরে কোথাও রেখে আপনি থাকতে পারবেন না?
কথাগুলো বলতে বলতে আলো দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে অঝোরে কেঁদে ফেলল। মেঘালয় হাত বাড়িয়ে আলোকে স্পর্শ করার আগে মনে পড়ে গেল আট বছর আগে বলা আলোর কথাগুলো।

“না, আমি আপনাকে ভালোবাসতে পারিনি। আপনাকে বিয়ে করাটা কি কম অপরাধ মনে করেছেন? সেখানে আপনাকে ভালোবাসব আমি! এই মূহুর্তে আমার অপরাধবোধ অনুভব যেন আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে।”
মেঘালয়ের হৃদয়ে আমার ভাঙন শুরু হলো। পুরনো কথাগুলো যেন আবারও হৃদয়কে রক্তাক্ত করছে। মেঘালয়ের গলার কাছে কি যেন আঁটকে আছে। আলো এগিয়ে এসে মেঘালয়ের হাতদুটো ধরে বলল,
— আমি ছোট মানুষ হিসেবে সেদিন ভুল করেছিলাম। কিন্তু, আমার ভুল ধরিয়ে দেয়ার মত কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী আমার পাশে ছিল না। আমি সেদিন কি পরিমাণ ট্রমায়…..
আলো কথা শেষ করার আগে মেঘালয় আলোর হাত থেকে নিজের হাতদুটো ছাড়িয়ে বলল,

–পুরনো কথা বলা মানে পুরনো হিসেব-নিকেষ করা। আমার পক্ষে সম্ভব নয় আলো। আমি পারব না বলতে ওইদিন নিয়ে কিংবা গত আটবছর ধরে আমি কিভাবে দিনযাপন করেছি? আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। তুমি এবার আসতে পার৷
কথাগুলো শেষ করে মেঘালয় সোজা চলে গেল ড্রেসিংটেবিলের সামনে। আলো’র দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে চোখের জলে। ডাক্তার সাহেব শুনতে চাচ্ছে না কেন তার কথা? কৈফিয়ত কেন চাইছে না? প্রশ্ন না করলে কি উত্তর দেয়া যায়?
এত চরম অবজ্ঞা পেয়েও কি আলো কোনোদিন কারো সামনে দাঁড়িয়ে ছিল? এই একটা মানুষের সামনে কেন যেন নরম হয়ে পরে বারবার? মানুষটা তাকে কোন মায়ায় বেঁধে ফেলল যে নিজের আত্মসম্মানকে জলাঞ্জলি দিয়ে মানুষটাকে আঁকড়ে ধরার প্রবল ইচ্ছে জেগে ওঠেছে।
আলো আর একটা টু শব্দ করে না। দরজা খুলে সোজা বের হয়ে যায় মেঘালয়ের ঘর থেকে। দরজা বন্ধের শব্দ শুনে মেঘালয় আড়চোখে তাকায়৷ আলো নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,
—পুরনো হিসেব-নিকেশ করতে বসলে আমার প্রাপ্তির খাতায় তোমার জন্য এক আকাশ পরিমাণ ঘৃণা জমবে৷ যেই আমি তোমায় ভালোবেসে অভ্যস্ত সেই আমি তোমায় স্বপ্নেও ঘৃণা করতে পারি না।

মেঘালয় তৈরি হয়ে নীচে গিয়ে দেখল টেবিলে নাশতা সাজিয়ে রেখেছে। তৌহিদ সাহেব ইতিমধ্যে নাশতার টেবিলে বসে অপেক্ষা করছে। আলোকে দেখতে না পেয়ে মেঘালয়ের অস্থির লাগছে। বউটা যে তার অভিমানী। অভিমানী বউয়ের অভিমানকে ভীষণ ভয় পায় সে। বউয়ের অভিমান নামক ক্ষুদ্র অনূভুতি যে বারবার তাকে আর তার ভালোবাসাকে বুড়ো আঙুল দিয়ে বারবার জিতে যাচ্ছে।
—দেখ না কান্ড! তোর বউটা এসে বাড়িটাকে পুরোদস্তুর বাঙালী বাড়ির পরিবেশ সৃষ্টি করে ফেলেছে। সাত-সকালে এমন নাশতা শেষ কবে বাংলাদেশে খেয়েছিলাম আমার তো মনেই পড়ছে না।
তৌহিদ সাহেবের কথা শুনে মেঘালয় ভাবনার জগত থেকে ছিটকে বাস্তবে ফিরে আসে। মেঘালয়ের মলিন মুখ দেখে তৌহিদ সাহেব কিছু টের পেলো কিনা?

— অভিমানকে জিতিয়ে কি পাবি, বল তো বাপ?
চাচার মুখ থেকে এই প্রশ্ন শুনে মেঘালয় বিস্মিত হয়ে যায়।
— মানুষ বাঁচে ক’দিন? তোর বউটার হয়তো রাগ কিংবা জেদ বেশী! কিংবা আত্মসম্মানই তার জীবনের একমাত্র সম্বল। তোর সঙ্গে বউমার বিয়ে কিভাবে হয়েছে আমরা সবাই জানি। বিয়ের ব্যাপারটাকে বউ’মার চোখে দেখলে, সে তার জায়গা ঠিক ছিল৷ তাছাড়া, সে তোকে সব সত্যি জানিয়েছে। তুই বউমার সব দোষ-ত্রুটি, গুন মেনে নিয়ে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিস। তোর মায়ের কাছ থেকে তুই সব গোপন করেছিল। এখানে বউমার কোনো দোষ আছে বল? একটা এক্সিডেন্ট এর কারণে মেয়েটার একটা ত্রুটি সম্পর্কে জানার পর তোর মায়ের প্রতিক্রিয়া বউমা মেনে নিতে পারেনি। মানতে পারার কথাও না। যে সবসময় ভালোবাসে সে মৃদু স্বরে ধমক দিলে হৃদয় ভেঙে হাজারটা টুকরো হয়৷ তোর মা তো বউমাকে নিজের মেয়ের মত ভালোবেসেছে।
তৌহিদ সাহেব এর কথাগুলো শোনার পর মেঘালয় চুপ হয়ে যায়। মনে হল যেন তার শব্দের ভান্ডার ফুরিয়ে গেছে । তৌহিদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— দু’জন দু’জনকে সময় দে। কথাবার্তা বল। যদি পারিস অতীতের কোন কথা নিয়ে ঘাটাঘাটি করা বাদ দিতে পারিস৷
— বলব না অতীত নিয়ে কথা। কিন্তু, স্মৃতিদের কি করব?
— সুখের স্মৃতি কটা মনে আছে তোর? সুখ হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী। দুঃখরা যদি না থাকত সুখ নামের এত দামী অনুভূতির জন্ম হত কোথায়?
মেঘালয় চোখ বন্ধ করে ফেলল। চোখ বন্ধ করতেই তার মৃত ছেলের ছোট মুখটা মনে পড়ল। তারপর, কাফনে মোড়ান মায়ের মুখটা চোখে ভাসছে। এই স্মৃতিদের চাইলে কি ভুলে থাকা যায়?
চোখ খুলে মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তৌহিদ সাহেব ভাইপো’র মনের অবস্থা টের পেলেন কিনা? নরম সুরে বললেন,
—ভেবে দেখ, স্মৃতি নিয়ে মাথাব্যথা থাকার চেয়ে বর্তমান নিয়ে ভাবা কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়?
–কালের পরিক্রমায় বর্তমান সময় অতীত হয়ে যায়। অতীত ফেলে দেয়ার মত নয়। জীবনের এক পর্যায়ে যখন পাশে কেউ থাকে না তখন অতীত থাকে। অতীতের কিছু স্মৃতিরা বেঁচে থাকার, ভালো থাকার অনুপ্রেরণা জাগায়। আমি আমার জীবনের প্রতিটা সময়কে উপভোগ করছি। কারণ জীবন তো একটাই। এই জীবন হারিয়ে গেলে আর কখনোই উপভোগ করা যাবে না সুখ, দুঃখ, কান্না, হাসি, রাগ, অভিমান, জেদ, সহ্য, ভালোবাসা, মন্দ বাসা আর ঘৃনাদের। তো এই এত দামী জীবনটাকে একবারই উপভোগ করার সুযোগকে আমি কাজে লাগাতে চাই।
মেঘালয়ের কথাগুলো শুনে তৌহিদ সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,

— উপভোগ করতে পারিস। তোর সেই ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে। কিন্তু, কারোর ওপর জুলুম করিস না বাপ৷ মেয়েটা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে বিধায় এতদূরে ছুুটে এসেছে। মেয়েটা খুব ভালো অবস্থায় ছিল বাংলাদেশে। কাব্য’র কাছে শুনেছি আমি। এই দেশে সে আসতে চায়নি। কিন্তু, যখন জানতে পারে তুই আছিস এখানে। তখনই সে নিজের এত ভালো পজিশন, নিজের মাতৃভূমি, নিজের মা’কে ছেড়ে তোকে পাবার আশায় চলে এসেছে। বউমা’র আশা পূরণ করবি না?
মেঘালয় চুপচাপ সব কথা শুনছে৷ শেষের কথাটি শোনামাত্র মেঘালয় বিড়বিড় করে বলল,
— অবশ্যই করব। আলো’র সব আশা আমি পূরণ করব।
— কি বলছিস বিড়বিড় করে মেঘালয়?
চাচার কথায় মেঘালয় নিজের জগত থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর, নরম সুরে বলল,

—আমার জীবনের আটটি বছর যেভাবে কেটেছে সেভাবে নিশ্চয়ই কেটে যাবার কথা ছিল না। তবুও কাটিয়েছি। এর পেছনে হয়ত কোন কারণ আছে।
সৃষ্টিকর্তা হয়তো চেয়েছেন আমি যেন এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাই। যেখানে এক সৃষ্টিকর্তাকে ছাড়া আমি আমার পাশে আর কাউকে পাব না।
মানুষের স্মৃতি ভোলার জন্য নাকি মানুষ নেশা গ্রহণ করে। অথচ আমি আলো’র স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আল্লাহ ভীরু হলাম৷ আলোকে ফিরে পাওয়ার জন্য আমি কত শত মোনাজাতে কেঁদেছি তার কোন ইয়ত্তা নেই। যথেষ্ট চেষ্টা করতাম প্রতিটি ওয়াক্তে সৃষ্টিকর্তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে। কারণ, সুস্থসবল আমিটার ভেতরে ভগ্ন হৃদয়ের খবর আর কেউ না জানুক আমার সৃষ্টিকর্তা জানতেন। আমার চোখের জল ফেলা কতশত মোনাজাতে আমি আলোকে চেয়েছি সেই চাওয়া আমার সৃষ্টিকর্তা পূরণ করেছে। অসাধ্য ব্যাপার কেবল সৃষ্টিকর্তা সাধন করতে পারে আমি আবারও প্রমাণ পেয়েছি। সৃষ্টিকর্তা যাকে আমার কাছে আবারও পাঠিয়েছে তাকে নিশ্চয়ই আমি হারাতে দেব না? তাকে ঘিরে থাকা সকল কিছুই আমার৷ তাকে ভাল রাখার দায়িত্ব আমার, আমি জানি।
মেঘালয়ের বলা কথাগুলো তৌহিদ সাহেব ছাড়া আরও একজন শুনেছে। সেই একজন হলো আলো। আলো সিঁড়ির ওপরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটার তীব্র অভিমানের আড়ালে এক পাহাড় সমান ভালোবাসা লুকিয়ে আছে আজ আবারও প্রমাণ পেল।

— আলোর কি জানার অধিকার নেই তুই এখনও আলো’র অপেক্ষায় আছিস?
তৌহিদ সাহেব এর কথায় মেঘালয় হেসে বলল,
— অবশ্যই আছে। আর ভালোবাসার এই খেলায় আমি চাই আলো বিজয়ী হোক। কারণ, আমার জিতে যাবার আনন্দ অনুভব নেই। আলোর কাছে আমি শতবার হারতে রাজি৷ আমাকে ভালোবেসে আমার জীবনকে আনন্দময় করার জন্য আলো নিজ হাতে দায়িত্ব পালন করুক। আলো এই ভালোবাসার খেলায় জিতে যাবার পর যেন কোন এক গোধুলীর শেষ লগ্নে দাঁড়িয়ে আমাকে গলা উঁচু করে বলতে পারে,
—আমি আপনাকে সবসময় চেয়েছি। আপনি আমাকে একবারও চাইলেন না কেন?
“তোমাকে আমি আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে চাই। আর কিভাবে তোমাকে চাইতাম, বল?”
আমি সেদিন আলোর এই প্রশ্নের জবাব এভাবেই দেব মনে মনে। কারণ, ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ পেয়ে গেলে ভালোবাসার ওপর আকর্ষণ হারিয়ে যায়। যেই ভালোবাসা পেতে আমরা দু’জন এতবছর অভিমান জিইয়ে রাখলাম, ধৈর্যের পরীক্ষা দিলাম আমি চাই না আমাদের এই ভালোবাসার আর্কষণ কমে যাক।
তৌহিদ সাহেব খেয়াল করলেন মেঘালয় অন্যমনষ্ক হয়ে কথাগুলো বলছে। কথাগুলো বলার সময় মেঘালয়ের চোখ জোড়া ভিজে গিয়েছিল। তৌহিদ সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মেঘালয়ের কাছে গিয়ে মেঘালয়ের কাঁধে হাত রেখে বললেন,

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৪ (২)

— আমাদের হাসিখুশি, বেখেয়ালি মেঘালয় এমন যত্ন করে বউকে ভালোবাসবে আমরা তো কেউই জানতাম না।
মেঘালয় হেসে ফেলল তৌহিদ সাহেব এর কথায়। আর অদূরে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা আলো আজ চোখভর্তি জল নিয়ে হেসে ফেলল। কারণ, আজ যে মেঘ কেটে গিয়ে আলো’র দেখা মিলেছে।
— ভালোবাসা’র এই খেলায় আমি জিতব, ডাক্তার সাহেব। আপনার যত স্বপ্ন আমাকে ঘিরে আছে আমি সেই সব স্বপ্ন পূরণ করব। কারণ, আপনি আমার এমনই একজন যাকে ভালোবাসার ঋণ ভারে আমি দিনকে দিন কুজো হয়ে যাচ্ছি। ভালোবাসার ঋণ পরিশোধ করে আমি আপনার চোখের সামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ভালোবাসা পাবার জন্য দুই হাত পেতে থাকব। তখন নিশ্চয়ই আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে পারবেন না ?

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৬