সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৩
তানিয়া হুসাইন
সকাল থেকে রহমান বাড়িতে যেন রান্নার এক ছোটখাটো উৎসব লেগেছে।
রান্নাঘরের টুকটাক শব্দে ভরে উঠেছে ঘর। চুলার পাশে ঘামে ভেজা রাহির মুখে ক্লান্তি নেই, বরং এক অদ্ভুত আনন্দ।
আজ আদ্রিয়ানের জন্য রান্না করছে সে।
আদ্রিয়ানের পছন্দের প্রতিটা পদ সে যেন মুখস্থ রেখেছে মনেই,
আর তার প্রিয় গরুর মাংস ভুনা সেই পদটা অনেক যত্ন সহকারে রান্না করেছে।
বাড়ির অন্যরাও অবাক, এত যত্ন করে কে আবার রান্না করে আজকাল?
কিন্তু রাহি করছে। চুপিচুপি। কষ্ট করে, কিন্তু ভালোবেসে।
সব রান্না শেষ করে,
রাহি নিজেকে গুছিয়ে নেয়।
সাদা রঙের একটা সালোয়ার কামিজ একেবারে পরীর মতো লাগে ওকে।
ঘন, কোমর ছুঁই ছুঁই লম্বা চুলগুলো ছেড়ে দেয়,
ঠোঁটে হালকা নিউড শেডের লিপগ্লস একটুও বাড়াবাড়ি নেই,
তবুও যেন কোনো নির্মল দৃশ্য চোখে ধরা দেয়।
টিফিন ক্যারিয়ার হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাহি।
হাতের প্রতিটি ভাঁজে, মুখের প্রতিটি চাহনিতে যেন একটাই উদ্দেশ্য ও যেন পেটভরে খায় আজ।
দিন দিন কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছে, চেহারাটাও ভেঙে যাচ্ছে এগুলো দেখতে মোটেও ভালো লাগেনা রাহির।
তাইতো সে সবসময় নিজের মতো চেষ্টা করে তাকে ভালো রাখার জন্য।
আদ্রিয়ানের কেবিনের দরজায় হালকা টোকা দেয় রাহি।
ভিতর থেকে আদ্রিয়ানের ঠান্ডা গলা আসে,
__কাম ইন।
রাহি ধীরে পা ফেলে ঢুকে পড়ে ভেতরে।
আদ্রিয়ান মাথা তোলে না।
ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ আটকে আছে তার।
___তুই এই সময় এখানে?
তার কণ্ঠে প্রশ্ন নেই, আগ্রহ নেই শুধু একটা নির্লিপ্ততা।
রাহি একটু ইতস্তত করে বলে,
__তোমার জন্য টিফিন এনেছি, আদ্রিয়ান ভাইয়া, মামনি বলেছে।
আমতা আমতা করে বলে রাহি।
এইবার আদ্রিয়ান চোখ তোলে।
দৃষ্টি পড়ে রাহির ওপর।
এক মুহূর্তের জন্য হয়তো তার চোখ আটকে যায় শুভ্র সাদা সেই রঙের মতো মেয়েটার গায়ে যেন আলো মেখে আছে।
সাদা রংটা বরাবরই তার খুব পছন্দের
তবে মুগ্ধতা প্রকাশ পায় না।
আদ্রিয়ান চোখ নামিয়ে নেয়।
___রেখে যা। পরে খেয়ে নেবো।
এই ছোট্ট বাক্যে রাহির মন থমকে যায়।
তবুও কিছু না বলে চুপচাপ টিফিনটা টেবিলের পাশে রাখে।
চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই
রাহি,
আদ্রিয়ান হঠাৎ ডেকে ওঠে,
রাহি থামে। চোখে এক অজানা উত্তাপ।
আদ্রিয়ান বুঝতে পারে মেয়েটা এত কষ্ট করে, এত ভালোবেসে এটা এনেছে।
হয়তো ফিরিয়ে দিলে অন্যায় হবে।
___ঠিক আছে,একটু বেড়ে দে।
এইটুকু কথাই যেন রাহির মুখে বসন্ত এনে দেয়।
তার হাসিটা, সেই নিঃশব্দ চওড়া হাসি যেটা শুধু আপন কাউকে দেখানোর জন্য জমিয়ে রাখা।
ধীরে ধীরে আদ্রিয়ানের সামনে খাবার পরিবেশন করে সে।
সাবধানে, যত্নে, এমনভাবে যেন এক এক প্লেট নয় নিজের হৃদয়টাই সাজিয়ে দিচ্ছে সামনে।
আদ্রিয়ান তাকিয়ে দেখে,
তবে তার চোখে সেই গাঢ় শূন্যতা।
না কোনো উষ্ণতা, না বিরক্তি।
এই মেয়েটা হয়তো তার পৃথিবীর বাইরের কেউ,
অথচ সে তার জন্য যত্ন করে রান্না করে, হাসে, অপেক্ষা করে,
কিন্তু আদ্রিয়ানের গায়ে লাগে না কিছু।
তার ভেতরে যেন সব জমে আছে এক শীতল বরফে।
এ সম্পর্ক একতরফা।
রাহির মন আলোয় ঝলমল করলেও, আদ্রিয়ানের মন
একটি নীরব, অন্ধকার কারাগার।
নরম তুলোর মতো বিছানায় শুয়ে আছে ইশায়া শান্ত, নিস্তব্ধ, অথচ ভেতরে এক অসম্ভব ঝড়।
ফিরে এসেছে সে তার পুরনো খাঁচায়, ফিরে এসেছে বন্দী জীবনের নির্মম বাস্তবতায়।
যে মুহূর্তের জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিল, একটুখানি আশার আলো মনে হয়েছিল, তা এখন নিঃসন্দেহে অতীত।
আবারো সে একই চার দেয়ালের মাঝে, যেখানে সময় থেমে থাকে, আর শ্বাস নেয়ার মানেই যেন হয় বেঁচে থাকার শাস্তি।
ইশায়া ধীরে ধীরে চোখ মেলে।
চোখে ক্লান্তি, বিভ্রান্তি আর যেন কোনো আশা নেই।
চারপাশটা দেখে, নিজের অবস্থান বুঝে মনে পড়ে যায় সবকিছু।
স্মৃতিগুলো একে একে এসে বুক চেপে ধরে।
ইশায়া হাটুর মধ্যে মুখ গুঁজে ফেলে।
প্রথমে নিঃশব্দ ফুপিয়ে ওঠে, তারপর কান্না রূপ নেয় তীব্র আহাজারিতে।
বুক ফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে তার ভেতর থেকে,এমনভাবে যেন নিজের ভেতরটা চিড়ে ফেলছে সে নিজেই।
তার কান্নার শব্দ ঘরটায় গুঞ্জন তোলে ঘরের দেয়ালগুলো ও সেই কষ্ট বুঝে, কিন্তু বুঝে না অন্য কেউ।
কিভাবেই বা বুঝবে কেউ এখানের সব কিছুই যে ভীরের নিয়ন্ত্রণে।
ইশায়া বারবার নিজেকেই দোষারোপ করছে সবকিছুর জন্য।
এই মৃ*ত্যুগুলো, এই র*ক্ত, এই ধ্বংস সব কিছুই আমার কারণে।
আমার জন্যই সাফাপু নেই,
আমার জন্যই এত মানুষ,
ভেঙে পড়ে ইশায়া।
কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছে না নিজেকে।
তো এবার তুমি কি করবে?
গম্ভীর গলায় বলে নিকো।
___ভীর বসে আছে সোফায় সিগারেটের ধোঁয়া ধীরে ধীরে তার মুখ ঘিরে থাকলেও, চোখে কোনো অনুভূতি নেই।
একটা নির্লিপ্ততা, এক অদ্ভুত খালি চাহনি যেন সে পৃথিবীর সব ব্যথা অনুভব করেও কিছু বলবে না।
নিকো সামনে এগিয়ে আসে, ভীরের এই নিরবতা তার সহ্য হচ্ছে না।
চোখ তুলে চিৎকার করে ওঠে
আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি,
____কিন্তু ভীর এখনো চুপ।
সে ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে হিসেব কষছে, তার মতো করে।
হঠাৎ ঘরের ভারী নিস্তব্ধতা ভেঙে দেয় রানিয়ার কণ্ঠ।
সাধারণ গার্ড নয়, ভীরের নির্দেশে নিয়োজিত নারী নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে ঠাণ্ডা মাথার, সবচেয়ে দক্ষ,
এরা সব নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত।
সে এগিয়ে আসে ধীর পায়ে, মাথা নিচু।
তার কণ্ঠ স্বল্পস্বরে হলেও কাঁপছে এক ধরনের চাপে।
— বস, ম্যাম এর জ্ঞান ফিরেছে।
___এই কয়েকটা শব্দ যেন বিদ্যুতের ঝটকা হয়ে আঘাত হানে ভীরের স্নায়ুতে।
সে উঠে দাঁড়ায়,
তার শরীরের প্রতিটি পেশী উত্তেজনায় তীক্ষ্ণ হয়ে আছে।
সেকেন্ডও দেরি না করে ভীর উপরের দিকের করিডোরের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।
কিন্তু ঠিক তখনই পেছন থেকে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
__দাঁড়াও ভীর।
তুমি ওর সাথে খুবই নরম ব্যবহার করছো না ভীর?
____ভীর থেমে যায়।
ঘাড়টা সামান্য বাঁকায়, কিন্তু মুখ ফেরায় না।
নিকোর কণ্ঠ আরেকটু শক্ত হয়ে ওঠে,
—এটা কি তোমার সাথে যায়?
তুমি কি ভুলে যাচ্ছো তুমি কে?
— তুমি রাজভীর আলভারেয। সিনালোয়ার শাসক, মেক্সিকোর ভয়ঙ্করতম ডন।
নিকোর কণ্ঠে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
তার দাঁত দুটো একে অপরের উপর চেপে বসে গেছে, যেন নিজের রাগ সে নিজেই গিলে ফেলতে চাইছে।
নিকো আবারো বলে,
তুমি সেই মানুষ, যে একটা পয়সার ক্ষতি হলে চোখের সামনে রক্তের বন্যা বইয়ে দিতে,
আর এখন সেই তুমি একজন মেয়ের জন্য নিজের নিয়ম ভেঙে যাচ্ছো, আমাদের নিয়ম ভাঙছো।
তুমি কি জানো না, ওর কারণে এই দুইদিনে আমাদের কতোটা ক্ষতি হয়েছে?
কয়েক কোটি টাকার প্রজেক্ট বাতিল হয়ে গেছে, লোক মরেছে, গোপন তথ্য ফাঁসের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নিকো একটু থামে, গলা কাঁপে।
কিন্তু তার কথা বন্ধ হয় না,আজ যেন সে ভীরকে জেরা করছে,
তুমি কী ভুলে যাচ্ছো? এই রাজ্যে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি একটাই মৃ*ত্যু।
কিন্তু তুমি, তুমি তাকে কিছু বলতেও পারো না। তুমি বরং তার সামনে গলে যাচ্ছো।
এই দুর্বলতা আমাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে ভীর।
নিকোর কণ্ঠ তখন নিঃশব্দ তাণ্ডবের মতোই।
___তুমি রাজভীর আলভারেয। তুমি দয়া করার জন্য জন্মাওনি। তুমি জন্মেছো রাজত্ব করার জন্য, আগুন ছড়ানোর জন্য।
___ভীরের কাছে একটা প্রশ্নের ও কোন উত্তর নেই।
সে তখনো কিছু বলে না।
তার কাঁধ ওঠা নামা করে গভীর নিঃশ্বাসে।
সে বোঝে নিকো ঠিক বলছে কিন্তু সে জানে,
এই মেয়েটা এই বিশ্বাসঘাতক তাকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যেখানে আইন শাসন-শাস্তি সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়ে।
তার মাথার ভেতরে তখন বেজে চলেছে একটাই শব্দ,
সে আমার।
ওর জন্যই আমি পুড়েছি,
আর এখন ওকে আমি নিজ হাতে জ্বালিয়ে ছাড়ব।
____ভীর দৃঢ় পদচারণা দূরে সরে যায়।
সে একবারও পেছন ফিরে তাকায় নি।
এই দৃশ্যটাই আগুন ঢেলে দেয় নিকোর ভেতরে।
নিকোর চোখ রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে, নিঃশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে ভারি হয়ে যায়।
হঠাৎ রাগে পাশে রাখা কাঁচের গ্লাসটা তুলে ছুড়ে মারে।
গ্লাসটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মার্বেলের মেঝেতে।
চূর্ণ কাঁচের মতোই ভেঙে যাচ্ছে নিকোর ভেতরের শান্তিটুকু।
তার কপালে শিরা ফুলে উঠছে।
মাথার ভেতরে বিস্ফোরণ,
তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে ছুঁয়ে ফেলছে সহ্যের সীমা।
— এই আচরণ! এই ভীর না!
আমি যাকে চিনতাম, সে এইভাবে হোঁচট খায় না!
নিকো দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রয় চোখে আগুন।
প্রয়োজনে আমি নিজ হাতে সরিয়ে ফেলবো ওকে, যদি সেটা ভীরকে তার জায়গায় ফেরায়।
তাহকে সেটাই করবো।
আমরা যে পথে হাঁটছি, সেখানে দুর্বলতার জায়গা নেই।
ভীরের লক্ষ্য ছিটকে যাচ্ছে, আর সেটা আমি কিছুতেই হতে দেবো না।
অন্যদিকে,
জ্ঞান ফিরে এলেও বাস্তবতা তাকে যেন আরও গভীর অচেতনতার মধ্যে ডুবিয়ে দিতে চাইছে।
তার নিঃশ্বাস ছিন্নভিন্ন।
শরীরটা ঘামে ভেজা, আর মন সেই তো জর্জরিত, বিধ্বস্ত।
হঠাৎ,
দরজার খোলার শব্দ ঘরভর্তি নীরবতার বুক চিরে ধেয়ে আসে।
ইশায়া চমকে ওঠে।শরীরে এক মৃদ কম্পন বয়ে যায়,
এই শব্দ তার কাছে গোলা বারুদের মতন,
যার ভেতরে সে আবার ঢুকে যাচ্ছে।
ভেতরে ধীরে ধীরে এক ছায়া ভেসে ওঠে।
একটা ভয়ংকর ছায়া ভীর আলভারেয।
তার চোখ রক্তিম, চোয়াল শক্ত।
তার মুখে কোনো মায়া নেই,
শুধু প্রতিশোধ, অভিমান, আর জ্বলন্ত একভালোবাসার ছায়া।
ভীর সামনে এগিয়ে আসে
ধীরে ধীরে, তার মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু চোখ বলছে সব।
ইশায়ার নিঃশ্বাস আটকে আসে।
তার বুকটা ধকধক করে ওঠে।
মনে পড়ে টিয়াগোর মৃত্যু।
কীভাবে এক মুহূর্তে সে শেষ করে দিয়েছিলো একজন মানুষকে,
ঠান্ডা মাথায়, রক্তমাখা হাতে।
ইশায়ার গা গুলিয়ে ওঠে।
এক অসম্ভব আতঙ্ক তাকে আঁকড়ে ধরে।
তার চোখে ঘৃণা, ভয়, ক্ষোভ।
ভীর তখনও এগিয়ে আসছে,
আর ইশায়া জানে,
আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই পুরুষ
একসাথে তার শাস্তি, তার যন্ত্রনা এবং তার অলঙ্ঘনীয় ভাগ্য।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আছে নিস্তব্ধতায় যেন সময় থেমে গেছে।
আচমকা সেই নিস্তব্ধতা চিড়ে এগিয়ে আসে রাজভীর।
তার মুখে জ্বলন্ত রাগের ছাপ।
তার চোখে জ্বলছে প্রতিশোধ আর বিষাক্ত অভিমান।
তাঁর পায়ের শব্দ কারাগারের শিকল ঠোকাঠুকির মতন,
ভীর ইশায়ার সামনে এসে দাঁড়ায়।
এক সেকেন্ড দুই সেকেন্ড. তারপরেই, আকস্মিক ইশায়ার চুলের মুঠি চেপে ধরে,
এতটা শক্ত করে ধরে, যেন চুলের গোড়া উপড়ে ফেলবে।
___আহহহহ,
অস্ফুটে আর্তনাদ বেরিয়ে আসে ইশায়ার মুখ থেকে।
ভীরের কণ্ঠ আগুনের মতো গরম, থরথর করছে রাগে।
___কেন গিয়েছিস?
বল!
ভীরের চোখ লাল রক্ত চুইয়ে পড়ার মত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
কিসের অভাব ছিল তোর? কী দেইনি আমি তোকে?
তাহলে কেনো পালালি ইশায়া?
একেকটা শব্দ যেন পাথরের আঘাত,
আর ইশায়া সেই পাথরের নিচে চাপা পড়া এক ক্ষতবিক্ষত আত্মা।
ইশায়া যন্ত্রণায় চোখ মুখ চেপে ধরে।
ভীরের মুঠো থেকে নিজের চুল ছাড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পারছে না।
তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
তবুও সে চুপ।
কোনো উত্তর নেই তার ঠোঁটে।
___তার এই নীরবতাই ভীরের রাগকে দ্বিগুণ করে তোলে।
কি হলো! বল!
ভীরের কণ্ঠে বজ্রপাত,
তার হাতের মুঠি আরও শক্ত হয়, ইশায়ার মাথাটা কেঁপে উঠে যন্ত্রণায়।
ইশায়া আর সহ্য করতে পারে না।
ফেটে পড়ে কান্নায় হু হু করে কেঁদে ওঠে।
একটা চাপা, অসহায়, বিধ্বস্ত চিৎকার।
কিন্তু সেই কান্না ভীরের কাছে অনুতাপ নয়, বরং এক প্রতিহত প্রতিধ্বনি।
চুপ,একদম চুপ।
একটা বজ্রাঘাত,
ভীরের শক্ত হাতের থাবা পড়ে ইশায়ার নরম গালে।
সেই থা*প্পড় এতটাই জোরে বসে, ইশায়া ছিটকে গিয়ে পড়ে বিছানায়।
তার গাল মুহূর্তে লাল হয়ে ওঠে, ঠোঁট কেঁপে ওঠে যন্ত্রণায়।
___ভীর নিজের চুল খামচে ধরে,
সে কিছুতেই নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রনে আনতে পারছে না,কিন্তু ঝোকের বসে কিছু করতেও চাইছে না এজন্যই বারবার বলছে তাকে,
ভীর গর্জে ওঠে,
বল, কি জন্য করেছিস এটা?নইলে আজ তোকে মেরে ফেলব আমি।।
তার কণ্ঠে স্পষ্ট এক নিষ্ঠুরতা।
সেই ভয় ইশায়ার শরীরের প্রতিটা রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে।
সে কাঁদছে, অঝোরে
হেচকি উঠে গেছে তার।
চোখ ফুলে উঠেছে কান্নায়।
ভীর সামনে এসে ইশায়ার উপর ঝুঁকে পড়ে।
ইশায়ার দু’গাল এমনভাবে চেপে ধরে, যেন আঙুল ঢুকে যাবে ভেতরে।
ইশায়া ছটফট করে ওঠে, গাল ফেটে যাবে এমন যন্ত্রণায়।
বলতে বলেছি আমি।
না বললে এখন জি*ব্বা টেনে ছিড়ে ফেলবো যাতে আর কোনদিনও কথা না বলতে পারিস।
বল, কেন করেছিস? কী ছিল তোর মনে?
কি ভেবেছিলি, পালিয়ে বাঁচবি? আমার হাত থেকে বাঁচবি তুই?
ভীরের কণ্ঠ এখন বরফ শীতল, কিন্তু ছুরির মতো ধারালো।
তুই আমাকে চিনিস না এখনো, তাই তো?
এত দিন আমার সাথে থেকেও বুঝলি না আমি কে?তুই পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে লুকিয়ে থাকলেও, আমি তোকে ঠিকই খুঁজে বের করতাম।
সব ধ্বংস করাও যদি লাগত, তাও তোকে আমি টেনে আনতাম।
এতদিন আমার সাথে ঘর করে ও তুই এটুকু বুঝলি না। সো স্যাড।
___ইশায়া কাঁদছে অনবরত।
ভীরের চোখে এক পাগলামি খেলে যায়।
তুই মরতেও হলে এখানে মরবি।
আর বাঁচলেও এখানেই বাঁচতে হবে।
এটাই তোর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।
তুই আমার থেকে কখনোই পালাতে পারবি না,
কারণ তোর ঠিকানা ঠিক এইখানে।
আমার কাছে আমার পাশে।
তার কণ্ঠ স্তব্ধ।
কিন্তু তাতে ভয় আরও গভীর।
ঘরের ভেতর নিঃশ্বাস নেওয়ার শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।
___ভীরের আঙুলের আঁচড় এখনো ইশায়ার মুখে টাটকা ব্যথার মতো জ্বলছে। চোখ জ্বলে উঠেছে, কিন্তু এবার আর শুধুই ভয়ের ছাপ নেই,
ভেতরে জমে ওঠা এক গর্জনের শব্দ,
___তার কাঁপা ঠোঁট হঠাৎ কেঁপে ওঠে।
চোখের জল মুছে, কণ্ঠকে শক্ত করে বলে,
দেখবেন একদিন ঠিকই চলে যাব আমি।
ভীরের আঙুল থেমে যায়। চোখ স্থির।
আজ হয়তো পারিনি, কিন্তু একদিন ঠিকই পারব।”
আমি ইশায়া,একদিন ঠিক-ই আপনার এই জেলখানা থেকে বের হয়ে যাব।
মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে চলবো।
তার চোখে তীব্র ঘৃণা, সাহস আর প্রতিজ্ঞা একসঙ্গে লড়াই করছে।
আপনি কিচ্ছু করতে পারবেন না। আপনি ভীর কিছুই না! আপনি কিছুই করতে পারবেন না।
____এক, দুই,
তিন সেকেন্ড,
ঘরের বাতাস জমে উঠল।
ভীর নড়ে না, চুপ করে তাকিয়ে আছে।
তাঁর চোখে হতবুদ্ধি এক ছায়া।
ইশায়া কী বলল এই শব্দগুলো যেন তার বোধে ধরা পড়ছে না।
তারপর,
একটা অমানুষিক হাসি ছড়িয়ে পড়ে ঘরের কোণায় কোণায়।
ভীর হঠাৎ হেসে ওঠে উঁচু গলায়, পাগলের মতো, ঠান্ডা তামাশার ছোঁয়ায়।
ইশায়া একটূ পেছনে সরে যায়।
এই হাসির ভয় এই হাসি মৃত্যু ডেকে আনে, সে জানে।
হাসতে হাসতে হঠাৎ চুপ হয়ে যায় ভীর।
তার চোখ রক্তের মতো লাল ঠান্ডা আগ্নেয়গিরি।
ভীর নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলে,
তাই… চলে যাবি।
এই গলা,দুদিন আগেও কাঁপছিল, আজ দেখছি রাগে জ্বলছে।
আমার সামনে গলা উচিয়ে কথা বলছিস, এত সাহস তোর।
তুই তো আমায় মারতেও উঠেছিলি আগে,মনে আছে?
হুম, এবার তো গলা চিড়ে চিৎকার করছিস। বেশ তোর কলিজা কত বড় হয়েছে তা দেখি মেপে নিতে হয় এখন।
তার ঠোঁটে ক্রুর হাসি ফুটে ওঠে।
এক ভয়ংকর খেলা শুরু হয়েছে।
ইশায়া এবারও থেমে যায় না।
কাঁপা কণ্ঠে তবুও বলেই ফেলে,
হ্যাঁ একদিন আমারো দিন আসবে।
তখন আপনি দেখবেন আপনার এই লক্ষ লক্ষ গার্ড, এই সিকিউরিটি, এই ক্ষমতা, প্রতিপত্তি,
এ সব কিছু আমাকে থামাতে পারবে না।
আমি চলে যাবোই। এই বন্দিদশা থেকে আমি মুক্ত হবোই। কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না।
তার কণ্ঠে ভয় নেই, আছে প্রতিজ্ঞা।
একটা অসম যুদ্ধের ঘোষণা যেন উচ্চারিত হলো।
ভীর এবার ঠোঁট চেপে হেসে ওঠে ঠান্ডা বিষে ভরা সেই হাসি।
ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে,
ইশায়ার দিকে ঝুকে তার মুখে ফু দেয়,মুখের সামনের চুলগুলো সরে যায়।
ইশায়া মুখ ফিরিয়ে নেয়।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫২
ভীর ঠান্ডা গলায় বলে,
হুমমম, যাবি চলে?
কী দিয়ে যাবি বল তো? এই পা দিয়ে?
তার কণ্ঠে হিংস্র ইঙ্গিত।
তাইতো,ওয়েট।
