Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৩১

এই অবেলায় পর্ব ৩১

এই অবেলায় পর্ব ৩১
সুমনা সাথী

কলরবের পিছু পিছু রান্নাঘরে পা রাখল নিযানা। কলরব ততক্ষণে চুলায় পাতিল বসিয়ে দিয়েছে। আপনমনে গুনগুন করে গান গাইছে। নিযানা কিছুটা অবাকই হলো; ছেলেটার গুমোট মেজাম তবে কেটে গেছে! ভেবে সে মনে মনে স্বস্তি পেল। নিযানা ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই কলরব পেঁয়াজ কাটতে কাটতে একবার আড়চোখে তাকাল। তাচ্ছিল্য স্বরে বলে উঠল,
‘দেখ! এই সামান্য কাজটুকুও তুই পারিস না!’
নিযানা কোনো পাল্টা জবাব দিল না। বরং খুব মন দিয়ে ওর কাজ দেখতে লাগল। তবে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে তার বিরক্তি ধরল। কলরব যেখানে কাটিং বোর্ড রেখে কাটাকাটি করছে তার পাশের স্লাবটা বসার জন্য বেশ জুতসই। নিযানা কয়েকবার লাফ দিয়ে সেখানে ওঠার চেষ্টা করল কিন্তু উচ্চতার কারনে পারলো না। কলরব এবার বিরক্ত হয়ে ওর দিকে তাকাল। কোনো কথা না বলে এসে নিযানার কোমরে দুহাত রেখে এক ঝটকায় উঁচু করে তাকে তাকের ওপর বসিয়ে দিল। নিস্পৃহ গলায় বিড়বিড় করল,

‘জীবনটা তো আমার তেজপাতা! হাতে একটা জ্যান্ত ননির পুতুল ধরিয়ে দিয়েছে সবাই মিলে।’
নিযানা হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল। অথচ কলরবের মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই; সে যেন অতি স্বাভাবিক কোনো কাজ সেরে আবার নিজের কাজে ডুবে গেল। নিযানা ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি চেপে এক হাতে গালে ভর দিয়ে ওকে দেখতে লাগল। তবে নিযানার নজর এখন আর পেঁয়াজ কাটার দিকে নেই। তা স্থির হয়েছে কলরবের ওপর। তার টু-ব্লক স্টাইলে কাটা এলোমেলো অবাধ্য চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে। ঢেকে দিয়েছে চোখের অর্ধাংশ। পরনের কালো টি-শার্টের বিপরীতে ওর শরীরের দৃশ্যমান ফর্সা অংশগুলো যেন চকচক করছে। নিযানা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটা তুলনা করার চেষ্টা করল। ধুর! কলরবই যেন বেশি ফর্সা। মনে মনে বেশ বিরক্ত হলো সে। একটা ছেলের গায়ের রঙ এত ফর্সা হওয়ার কী দরকার ছিল? শুধু কি রঙ? ছেলেটা দেখতেও সুর্দশন। হঠাৎ কলরব মাথা তুলে তাকাতেই নিযানা চট করে চোখ সরিয়ে নিল। কলরব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওকে পরখ করে জিজ্ঞেস করল,
‘তখন কাঁদছিলি কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে? কলেজে কেউ কিছু বলেছে? কেউ কিছু বললে আমাকে বলবি।’
‘কেনো? তাকে ধরে মারবে?’

নিযানার এমন তীক্ষ্ণ প্রশ্নে কলরব ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। হাতের ছুরিটা থেমে গেল তার। নিযানা ওর চোখের মণি দুটোর অস্থিরতা লক্ষ করল। এই প্রশ্নটার উত্তর সে হাজারবার নিজের মনে সাজিয়েছে কিন্তু কোনো জুতসই সমাধান পায়নি। নিছক ফুফাতো বোন হওয়ার খাতিরে কি কেউ ধরে ধরে প্রোপজ করা সব ছেলেকে মারতে পারে? নিযানার অতলভেদী দৃষ্টির মুখে কলরব গলাটা ঝেড়ে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
‘তোর কি আমাকে গুন্ডা-মাস্তান মনে হয়?’
‘নিখিলকে তো তুমিই মেরেছিলে! মারোনি?’
কলরব এবার সত্যি অবাক হলো। মেয়েটা জানল কী করে? তার মনে সংশয় জাগল। আর কী কী খবর জানে? কিছুটা আমতা আমতা করে বলল,

‘হ্যাঁ, মেরেছি তো। কেন? ওই নগেনকে তোর খুব পছন্দ ছিল নাকি? প্রেম নিবেদন করায় খুশি হয়েছিলিস?’
নিযানা হুট করেই খিলখিল করে হেসে উঠল। কলরব হাতের কাজ ফেলে সবিস্ময়ে সামনের রমনীর পানে চেয়ে রইল। নিযানা ওর চশমাটা মাথার ওপর তুলে রেখেছে। চশমা পরা আর চশমা ছাড়া নিযানার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। কলরবের মনে পড়ল না শেষ কবে ও মেয়েটাকে এভাবে প্রাণ খুলে হাসতে দেখেছে। কখনো খুব করে দেখার প্রয়োজনও বোধ করেনি। কিন্তু আজ দেখল। নিযানার হাসির অদ্ভুত রকম সুন্দর। ওর সৌন্দর্য্য যেন ফ্রেমের চশমাটা আড়াল করে রাখে। কলরবকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিযানা হাসি থামিয়ে প্রশ্ন করল,
‘তুমি আমার ওপর নজর কেন রাখতে?’
কলরব তড়িৎগতিতে এক হাত বাড়িয়ে নিযানার মাথার ওপর থেকে চশমাটা নামিয়ে ওর চোখের ওপর বসিয়ে দিল। দৃষ্টি সরিয়ে আবার কাজে মন দিয়ে ভাবলেশহীন কণ্ঠে বলল,
‘এসব ফালতু গালগল্প তোকে কে বলেছে? আমার কি মনেহয়? আর কোনো কাজ নেই? এসব ফাউল কাজ করে বেড়াবো?’

নিযানা ঠিক বুঝল না কলরব হঠাৎ করে চশমাটা ওর চোখে নামিয়ে দিল কেন। তবুও নাকের ডগায় ঝুলে থাকা চশমাটা ঠিক করে চোখে বসিয়ে নিয়ে বলল,
‘তা তোমার কাজটা কী? তুমি তো কিছু করো বলে জানিনা।’
কলরব নিরেট গলায় বলল, ‘আমার সিগারেট খাওয়ার টাকা জোগাড় করি। ওটা কি তোর বাপ দেয়?’
‘তুমি শুধু সিগারেট খাও। নাকি আরও অন্যকিছুও খাও…?’
‘আরও অনেককিছু খাই। তোর কোনো সমস্যা?’
‘আমি কিন্তু মামুকে বলে দেব!’
কলরব পাত্তাই দিল না। উলটো তেঁতে উঠে বলল, ‘তোর গায়ে কেন লাগছে শুনি? তোর বাপের টাকায় তো আর খাচ্ছি না। আর খবরদার আব্বুকে এসব বলবি না। আমার এত টাকা নেই যে বাড়ি থেকে বের করে দিলে বাইরে গিয়ে আয়েশ করতে পারব। নির্ঘাত রাস্তায় থাকতে হবে।’
নিযানা বেশ বিরক্ত হলো। ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘তোমার সমস্যাটা কী? সব সময় আমার আব্বুকে মাঝখানে টেনে আনো কেন?’

‘তোর বাপকে আমি আনি না। সে নিজেই ঢোকে। ঠিক যেমনটা ফুপি আর তার বয়ফ্রেন্ডের মাঝখানে ঢুকেছিল। আস্ত একটা খাটাশ তোর ওই টাক মাথা বাপটা। অথচ দুনিয়ার সব দোষ হয় কলরবের!’
নিযানা ধমক দিয়ে বলল, ‘কী সব বাজে কথা বলছ? ভালো হচ্ছে না কিন্তু।’
‘খারাপ আর কী করবি? মিথ্যা বলেছি নাকি? শোন, ফুপি বাড়িতে তাকে পড়াতে আসা এক মাস্টারের প্রেমে পড়েছিল। কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ ছিল বলে আমার বেশি বোঝা বাপের সেটা পছন্দ হয়নি। তারপর তোর ওই টাকাওয়ালা বাপের গলায় আমার সুন্দরী ফুপুকে একপ্রকার জোর করে ঝুলিয়ে দিল। আমার বাপের তো কাজই এসব। আর তোর ওই খাটাশ বাপ কী করেছে বল তো? বিয়ের এক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তোকে পৃথিবীতে এন্ট্রি করিয়ে দিয়েছে! এখন দেখ, সবাই সাধু। দোষ কেবল কলরবের।’
নিযানা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লো। ওর মাথাটা ভনভন করছে। এই ছেলেটা এতটা অকপটে এমন স্পর্শকাতর কথাগুলো বলে দিল! নিযানার নিজেরই কান লাল হয়ে যাচ্ছে লজ্জায়। অথচ কলরবের মাঝে কোনো ভাবান্তর নেই। নিযানা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘আমার আব্বু আর যাই হোক। তোমার মতো অন্তত নির্লজ্জ আর অসভ্য নন। তোমার কি লজ্জা-শরম বলতে কিছু অবশিষ্ট আছে?’

‘তো তুই পৃথিবীতে আসলি কী করে? বড় চিন্তার ব্যাপার তো!’
কলরব এমনভাবে কপালে ভাঁজ ফেলে কথাটি বলল। যেন সে আসলেই কোনো গূঢ় রহস্য সমাধানে মহাচিন্তায় মগ্ন। নিযানার পিত্তি জ্বলে গেল; ওর ইচ্ছে করছিল হাতের কাছে যা পায়; সব কলরবের মুখে ছুঁড়ে মারে। নিযানাকে রাগে ফুঁসতে দেখে কলরব বেশ মজা পেল। তার ঠোঁটের কোণে ঝুলে রইল এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি। নিযানা তর্জনী উঁচিয়ে শাসিয়ে বলল,
‘আর একটা বাজে কথা বললে খুব খারাপ হবে বলে দিচ্ছি!’
কলরব কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু মৃদু মাথা নেড়ে হাসল। ওর নুডলস রান্না শেষ। ধোঁয়া ওঠা নুডলস বাটিতে বেড়ে সে ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখল। নিযানা পিছু পিছু গিয়ে চেয়ার টেনে বসল। চামচ হাতে নিয়ে খাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে নিযানা জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি খাবে না?’
কলরব মাথা নাড়ল। বোঝালো খাবেনা। নিযানা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
‘খাও না একটু। আমি একা এতগুলো কীভাবে খাব? এতটা কেনো রান্না করেছো? অন্তত অল্প একটু নাও।’
কলরব আর অমত করল না। পাশের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসল ওর পাশাপাশি। বলল,
‘ঠিক আছে। দে।’
নিযানা উৎসাহের সাথে অন্য একটি বাটিতে অল্প কিছু নুডলস বেড়ে ওর দিকে বাড়িয়ে দিল। ঠিক তখনই পানির বোতল হাতে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল কায়েফ। ওদের দুজনকে এমন নিভৃতে হাসিখুশি দেখে সে কিছুটা থমকে গেল। নিযানা মুখ তুলে ওকে দেখেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল,
‘আরে কায়েফ! নুডলস খাবে? এসো এসো। বসো।’
কায়েফ বেশ বিব্রত বোধ করল। সেই সাথে নিজের ওপর বিরক্তও হলো। আজকেই কি পানি শেষ হতে হলো! সে আমতা আমতা করে বলল,

‘আরে না, তুই খা। আমি আসছি।’
নিযানা ছাড়ার পাত্রী নয়। সে জোর দিয়ে বলল, ‘একসাথে খেলে মজা হবে। জানো, কলরব নিজে রান্না করেছে! এসো না। একটু টেস্ট করে দেখো। প্লিজ?’
কায়েফ মহাবিপাকে পড়ল। সে খেয়াল করল কলরব একদৃষ্টে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। দুজনের চোখাচোখি হতেই কায়েফ দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। কিছু একটা বলে পাশ কাটানোর চেষ্টা করতেই কলরব হেঁসে বলল,
‘আয় না ভাই। একসাথে খেলে সত্যি অনেক মজা হবে।’

কায়েফ আর না করতে পারল না। সে মৃদু মাথা নেড়ে চেয়ার টেনে ওদের সামনে বসল। নিযানা বসা থেকে চট করে উঠে পড়ল। ঝটপট আরেকটি বাটিতে নুডলস তুলে কায়েফের সামনে রাখল। ওকে দেখে নিযানাকে বেশ প্রফুল্ল মনে হচ্ছে। এরপর শুরু হলো খাওয়া। নিযানা খুব স্বাভাবিকভাবে কায়েফের সাথে খুনসুটি আর গল্পে মেতে উঠল। কায়েফও ওর কথার উত্তর দিচ্ছিল। কিন্তু হাস্যোজ্জ্বল আবহের মাঝে কলরব হঠাৎ একদম চুপ হয়ে গেল। সে স্থির দৃষ্টিতে ওদের দেখছিল। ওর মনে হলো। এই টেবিলে তার অস্তিত্ব যেন হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে গেছে। সে যেন শুধুই একজন দর্শক।

সারাটা সকাল গড়িয়ে দুপুর নামল কিন্তু দিব্য তালুকদারের কোনো হদিস পাওয়া গেল না। নবনী মনে মনে বেশ অবাকই হচ্ছে। মানুষটা যেমন অহংকারী তেমনি জেদি; আবার ইগোতে চোট লাগল কি না কে জানে! নবনী নিজেকে বারবার বোঝাচ্ছিল। ইগোতে লাগলে তার কিছু করার নেই। যা খুশি করুক ওই লোক। অথচ মনের এক কোণে দিব্যর জন্য উদ্বেগ দানা বাঁধছে। অফিসে যাওয়ার পথে কোনো বিপদ হলো না তো? সারাটা সময় এক তীব্র অস্থিরতা নবনীকে তাড়িয়ে বেড়াল। দিয়া গোসল সেরে একচোট ঘুমিয়ে নিয়েছিল। ঘুম থেকে উঠে এখন সে উঠোনে অনিতা আর অনিকের সাথে খেলায় মত্ত। নবনী বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওকে ডাকল,
‘দিয়া সোনা। খাবে এসো।’
দিয়া ধীরপায়ে এগিয়ে এসে নবনীর সামনে দাঁড়াল। ছোট্ট দুহাত কোমরে রেখে গাল ফুলিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘মাম্মা, পাপ্পা এখনো আসছে না কেন?’
নবনী সহসা কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। একটু সামলে নিয়ে বলল,
‘আমরা না পাপ্পার সাথে আড়ি করে এসেছি? তাহলে তুমি পাপ্পার কথা কেন বলছ? মাম্মা কিন্তু স্যাড হয়ে যাবে।’
দিয়া দুপাশে মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল। মুখ ছোট করে বলল,
‘আমার মামার সাথে খেলতে ভালো লাগছে না। মাম্মা, আমরা ইহান আর ইভানের সাথে তো কাট্টি করিনি। ওদের ডেকে নিই না! আমরা একসাথে খেললে অনেক মজা হবে।’
‘ঠিক আছে। আমরা আগে খেয়ে নিই। তারপর ওদের ডাকব।’

দিয়া মাথা নাড়ল ঠিকই কিন্তু তার নতুন আবদার সে ঘরে বসে খাবে না। বাইরে খেলতে খেলতে খাবে। নবনী অগত্যা থালা হাতে ওর পিছু পিছু ঘুরে ঘুরে খাওয়াতে লাগল। আজ শুক্রবার হওয়ায় অনিক আর অনিতার স্কুল ছুটি। তাই দিয়া ওদের সাথে কানামাছি খেলায় মেতে উঠেছে। এমন সময় পাশের বাড়ির কুলসুম এলেন। দুই ছেলেই বিদেশে থাকে তার। আর স্বামী গত হয়েছেন বছর ছয়েক আগে। সেই থেকে বিশাল বাড়িতে তিনি একা। যদিও বাড়িটা সবটায় প্রায় ভাড়া দেওয়া। পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে মেলামেশায় তার সময়টা কেটে যায়। এ বাড়িতে তার অবারিত যাতায়াত। বারান্দায় বসে বাচ্চাদের খেলা দেখতে দেখতে তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন,
‘তা নবনী, জামাই আসেনি?’
নবনী অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে বলল, ‘উনি কাজে একটু ব্যস্ত তো। তাই পরে আসবেন।’
কুলসুম মাথা নেড়ে সায় দিলেন। দিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘দিয়া কিন্তু দেখতে অবিকল অবনীর মতো হয়েছে। মাশাআল্লাহ। একদম পুতুল একটা!’
দিয়া তখন নবনীর হাত থেকে শেষ লোকমাটা মুখে তুলেছে। কুলসুমের এমব কথা শুনে সে থমকে গেল। চিবানো বন্ধ করে কৌতূহলী চোখে নবনীর দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল,

‘মাম্মা, অবনী কে?’
নবনীর বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য যেন থমকে গেল। চেনা এক চিনচিনে বিষাদ নতুন করে নীলচে ব্যথা হয়ে ছড়িয়ে পড়ল শিরায় শিরায়। অবনীর চলে যাওয়াটা আজও নবনীর কাছে এক অপূরণীয় শূন্যতা। নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁটে এক চিলতে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে বলল,
‘অবনী হলো একটা মা পরী।’
দিয়াকে বেশ ভাবুক দেখাল। তার কপালে সূক্ষ্ম চিন্তার ভাঁজ। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে সে পুনরায় প্রশ্ন করল,
‘তাহলে আমি কেন তার মতো হলাম?’
‘কারণ সেই পরীটাই তো আমাকে তোমায় পেতে সাহায্য করেছে। তাই।’
দিয়া দুপাশে মাথা নাড়ল। বলল, ‘কিন্তু আমি তার মতো হতে চাই না। আমি ঠিক তোমার মতো বিউটিফুল হতে চাই। আই অ্যাম নট আ ডল মাম্মা। আই অ্যাম আ প্রিন্সেস। পাপ্পা’স প্রিন্সেস!’
মেয়ের এমন আত্মবিশ্বাসী কথা শুনে নবনী না হেসে পারল না। আদুরে গলায় সায় দিল,
‘আচ্ছা। তাই হবে।’

দিয়া এবার হাতের ইশারায় নবনীকে একটু নিচু হতে বলল। নবনী কৌতূহল নিয়ে ঝুঁকতেই দিয়া ঝটপট ওর গালে একটা ছোট্ট চুমু এঁকে দিল। এরপর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
‘দিয়া খুব লাভ ইউ, মাম্মা!’
নবনীর মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেল। দিয়াকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বলল,
‘মাম্মাও তোমাকে খুব খুব ভালোবাসে সোনা। এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো চটপট হা করো তো!’
বারান্দায় বসে থাকা কুলসুম বললেন, ‘জানিস নবনী, আমাদের পাড়ার অসীম আছে না? তুই তো ওকে ভালো করেই চিনিস। ওই যে এখন ঢাকায় বড় চাকরি করে। শুনলাম, ওর নাকি খুব বড়লোক এক বাপের মেয়ের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল। ওর মা তো ছেলে আর হবু বউয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ! আমি তো মুখের ওপর বলে দিলাম। এত অহংকার কোরো না বাপু। তবে আশ্চর্যের বিষয় কী জানিস? অসীম নাকি নিজে থেকে বিয়েটা ভেঙে দিয়েছে!’
নবনী আর অসীমের অতীত কুলসুমের অজানা ছিল না। শুরুতে কথাগুলো নবনী গা না দিলেও। বিয়ে ভাঙার খবরটা শুনেই সে চকিত হয়ে তাকাল। অসীম কেন এমনটা করল? সে তো এই সম্বন্ধ নিয়ে বেশ খুশিই ছিল। মনে একরাশ খটকা জাগলেও নবনী মুখে কিছুই প্রকাশ করল না। খাওয়া শেষ হতেই দিয়া তাকে জোর করে কানামাছি খেলায় নামিয়ে দিল। কুলসুম ও কিছুক্ষণ পর বিদায় নিলেন। বেলা গড়িয়ে আকাশ যখন পড়ন্ত বিকেলের রঙ নিল তখন হাতে দুটো বড় ব্যাগ নিয়ে সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল দিব্য তালুকদার। দিয়া কিছু একটা বলতে উদ্যত হতেই দিব্য ঠোঁটে আঙুল দিয়ে তাকে চুপ থাকার ইশারা করল। দিয়া আনন্দ চেপে ছুটে গেল তার কাছে। দিব্য ওকে কোলে তুলে নিলো। অনিতাকে ইশারায় ডেকে হাতের ব্যাগ দুটো তার হাতে ধরিয়ে দিল। এরপর দিয়াকে নামিয়ে দিয়ে অতি সাবধানে পা টিপে টিপে নবনীর ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। এদিকে চোখের ওপর রুমাল বাঁধা নবনী হাতড়ে হাতড়ে কাউকে ধরার চেষ্টা করছে। অনিক আর দিয়া আড়াল থেকে মুখ চেপে হাসছে। নবনী ভ্রু কুঁচকে বলল,

‘খুব হাসি পাচ্ছে, তাই না? একবার ধরি তোদের। তারপর দেখাব মজা!’
নবনী হাত বাড়িয়ে এদিক-ওদিক খুঁজতে খুঁজতে আচমকা এক শক্ত কিছুর সাথে ধাক্কা খেল। অজানা আশঙ্কায় সে পিছিয়ে যেতে গিয়ে ভারসাম্য হারাতে লাগল। ঠিক তখনই এক জোড়া শক্ত হাত অতি দ্রুত তাকে সামলে নিল। নবনীর সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠল। নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিল অতি পরিচিত সেই পারফিউমের ঘ্রাণ। হাতের স্পর্শ আর গায়ের গন্ধ চিনতে নবনীর এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। ওর হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচায় রীতিমতো লাফাতে শুরু করলো। এক টানে চোখের বাঁধনটা খুলতেই দিব্যর সেই গভীর চোখের সাথে চোখ মিলে গেল ওর। দিব্যর চোখ দুটো হাসছে কিন্তু মুখে অদ্ভুত গাম্ভীর্য। সে নিচু স্বরে শান্ত গলায় বলল,
‘বড্ড দুঃসাহস করে আপনার শহরে এসেছি।ওয়েলকাম করবেন না মিসেস তালুকদার?’
নবনী ছিটকে সরে গেল। দিয়া হাততালি দিয়ে খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল,
‘ইয়ে… মাম্মা ভয় পেয়েছে! মাম্মা ভয় পেয়েছে!’
দিব্যর ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। দিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে তার নরম গালে নিজের নাক ঘষে আদুরে গলায় বলল,

‘তোমার মাম্মা না এক নাম্বারের ভীতু। শুধু পালাতে জানে। কিন্তু সামনাসামনি মোকাবেলা করার সাহস ওর নেই।’
বাবাকে কাছে পেয়ে দিয়া যেন মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টি পেল। এতক্ষণ সবার সাথে খেলাধুলায় মেতে থাকলেও মনের গহীনে যে একটা বিষাদের ছায়া ছিল। তা নিমিষেই উধাও হয়ে গেল। সে দিব্যর গলা জড়িয়ে ধরে আধো-আধো স্বরে বলল,
‘তোমাকে খুব মিস করেছি পাপ্পা। তুমি জানো, আমি আজ কী কী করেছি?’
দিব্য মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বলল, ‘আমি তো চলে এসেছি মা। এখন তোমার সব গল্প শুনব। পাপ্পাও তোমাকে অনেক মিস করেছে।’
পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছিল নবনী। হঠাৎ তার চোখের কোণ ভিজে উঠল। এক তীব্র অভিমান আর অবহেলার বোধ তার হৃদয়ে বিঁধতে লাগল। মনে হলো এই বাবা আর মেয়ের নিবিড় সম্পর্কের মাঝে সে নিতান্তই এক বহিরাগত। দিব্য তালুকদার তার আদরের মেয়েকে ছাড়া দিশেহারা। আর দিয়াও তার বাবাকে ছাড়া অন্ধ। এই দুর্ভেদ্য দেয়ালের ওপাশে নবনী নিজেকে বড় বেশি তুচ্ছ আর একা মনে করল। সে হুট করে এগিয়ে গিয়ে দিব্যর কোল থেকে দিয়াকে এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে নিজের কোলে তুলে নিল। দিব্য কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও বাধা দিল না। নবনী দিয়ার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধরা গলায় প্রশ্ন করল,

‘দিয়া, তুমি আমাকে ভালোবাসো?’
দিয়া মাথা নেড়ে সায় দিল। নবনী কঠোর কণ্ঠে বলল,
‘আমরা এখানে এসেছি মোটে কয়েক ঘণ্টা অথচ এর মধ্যেই তুমি বারবার পাপ্পার কথা জিজ্ঞেস করেছ। আচ্ছা, আমি যদি কোথাও হারিয়ে যাই। তুমি কি আমাকে এভাবেই খুঁজবে? আমাকেও কি তোমার মনে পড়বে?’
অনিতার মুখে দিব্যর আগমনের খবর শুনে আনিকাও ততক্ষণে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছেন। মেয়ের এমন অস্বাভাবিক আচরণ আর কথা শুনে তিনি যেমন থমকে গেলেন। তেমনি বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। এগিয়ে এসে শাসনের সুরে বললেন,
‘নবনী, এসব কী বলছিস তুই? আবল তাবল!’
নবনীর ভেতরের দীর্ঘদিনের জমানো অভিমান বাঁধ ভাঙলো। সে চিৎকার করে উঠল,
‘অনেক হয়েছে। আর পারছি না! ও উনাকে ছাড়া থাকতে পারে না আর উনি ওকে ছাড়া বাঁচে না। তাহলে আমার ত্যাগের আমার ভালোবাসার মূল্য কোথায়? এই পুরো সমীকরণে আমি কি কেবলই একটা প্রয়োজন মেটানোর বস্তু? যার কাজ ফুরিয়ে গেলে অনায়াসেই সরিয়ে রাখা যায়?’
দিব্য ভীষণ বিব্রত বোধ করল। আনিকা ঘটনার গভীরতা না বুঝলেও এটুকু আঁচ করলেন যে। নবনীর মনের গহীনে কোনো এক আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হয়েছে। তিনি নবনীর হাত ধরার চেষ্টা করে বললেন,
‘নবনী, এভাবে কথা বলতে হয় না।’

নবনী বলল, ‘তুমি দয়া করে চুপ করো আম্মু। যেটা জানো না, সেটা নিয়ে কথা বোলো না। তোমাদের সবার জেদ আর চাপের মুখে পড়ে উনি আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কেবল কর্তব্যের খাতিরেই এই সংসার টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। আর দিয়া? ও মোটেও আমাকে ভালোবাসে না। ও শুধু ওর শূন্যস্থানে আমাকে পেয়েছে বলে আঁকড়ে ধরেছে। ওর কাছে আমি কেবল একটা যান্ত্রিক প্রয়োজন। তার বেশি কিছু নই। কাল উনি আরেকটা বিয়ে করলে! দিয়া হইতো তাকে আঁকড়ে ধরবে।’
দিব্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কোনোমতে বলল,
‘নবনী, ও একটা ছোট্ট বাচ্চা! ওর সাথে কেন এসব জটিলতা নিয়ে কথা বলছ? তুমি এতটা অবুঝ কেনো হচ্ছো?’
নবনী দিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে দিল। তীব্র অভিমানে সে তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। দিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ওকে কিছু বুঝাতে হবে না। দিয়া, তুমি তো পাপ্পার জন্য কাঁদছিলে? এই যে তোমার প্রিয় পাপ্পা চলে এসেছে। এখন ওনার সাথেই তুমি বাড়িতে ফিরে যাও। মাম্মা আর তোমার কাছে ফিরবে না। তুমি মাম্মাকে আজ ভীষণ কষ্ট দিয়েছ দিয়া, ভীষণ!’

আনিকা নিজের মেয়ের এমন রূপ দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। দিয়া ফ্যালফ্যাল করে নবনীর দিকে তাকিয়ে ছিল। মায়ের এমন ব্যবহার সে আগে কখনো দেখেনি। পরক্ষণেই তার ছোট্ট বুকটা কান্নায় ফুলে উঠল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে বলল,
‘মাম্মা, তুমি কি দিয়ার ওপর রাগ করেছ? দিয়াকে আদর করবে না? দিয়া তো কোনো দুষ্টুমি করেনি মাম্মা!’
নবনী সেই করুণ আকুতির কোনো প্রত্যুত্তর না করেই হনহন করে সদর দরজা পেরিয়ে রাস্তার দিকে চলে গেল। দিব্য মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল সেই নিস্তব্ধ উঠোনে। নবনীকে ওভাবে বেরিয়ে যেতে দেখে দিয়া আতঙ্কে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। আনিকা পিছু ডাকলেন,
‘নবনী! নবনী, ফিরে আয়! এটা কোন ধরনের ব্যবহার?’
কিন্তু নবনী ততক্ষণে মিলিয়ে গেছে। কারো কথা কানে নিলো না। বা শুনলো কিনা কে জানে!

সোফায় বসে ইহান আর ইভানের সাথে কার্টুন দেখছে কলরব। কুহু পাশে বসে মন দিয়ে খাতায় কিছু লিখছে। ড্রয়িংরুমে আপাতত আর কেউ নেই। মৌনিতার পাঠানো নাস্তাগুলো ওদের সামনে এনে রাখল মিলু। মনে মনে সে কলরবের ওপর বেশ বিরক্ত। এত বড় ধামড়া একটা ছেলে হয়ে ছোট বাচ্চাদের মতো কার্টুন দেখবে কেন। এটা তার মাথায় ঢোকে না। আজ শুক্রবার বলে ইহান-ইভানের পড়া নেই। তাই ওরা টিভি দেখছে। ওদের পছন্দের দিন এটা। কিন্তু মিলুর কাছে দিনটা একদম অপছন্দের। কারণ এই কার্টুনের চক্করে তার নিজের সিরিয়াল দেখা মিস হয়ে যায়। বিরক্তি চেপে রাখতে না পেরে মিলু বলেই ফেলল,
‘ছোট ভাইজান, আপনার না বিয়ে হয়েছে? এখনো কার্টুন দেখেন। এটা কেমন কথা!’
কলরব কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই সেখানে নিযানা আর মৌনিতা ঢুকল। সোফায় এসে শরীরটা এলিয়ে দিল নিযানা। কলরব টিভির দিক থেকে চোখ না সরিয়েই পাল্টা প্রশ্ন করল,
‘কার্টুনের সাথে বিয়ের কী সম্পর্ক?’

মিলু নিযানার পাশে বসে বলল, ‘সম্পর্ক নেই বলেন কী? এই যে আপনার বউ পাশে এসে বসেছে। নতুন বউকে পাশে বসিয়ে কি এখন আপনার কার্টুন দেখা উচিত?’
‘তাহলে কী দেখা উচিত? সিরিয়াল? ওই যে ধুমতানা নানা না!’
নিজের মনের ভেতরের কথাটা এভাবে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় মিলুর মুখটা সাথে সাথে ভার হয়ে গেল। কলরব মিটিমিটি হাসছে। প্লেট থেকে একটা পকোড়া তুলে নিয়ে আয়েশ করে কামড় দিল সে। মৌনিতাও মিলুর দশা দেখে হাসছে। কিন্তু হঠাৎ নিযানার গলার দিকে তাকাতেই মিলু আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠল।
‘হায় হায় ছোট ভাবি! আপনার গলায় এটা কী হয়েছে?’
নিযানা চমকে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে ঘরে উপস্থিত সবার কৌতূহলী নজর স্থির হলো নিযানার গলার ওপর। একমাত্র ব্যতিক্রম কলরব; সে আগের মতোই নির্বিকার মুখে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। নিযানার মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। তাকে নিয়ে ছেলেটার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই দেখে সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘একটা বিষাক্ত পোকায় কামড় দিয়েছিল রাতে।’
কথাটা কানে পৌঁছানো মাত্রই কলরব যেন খানিকটা থতমত খেয়ে গেল। তার চোখের কোণে বিস্ময়। বড় বড় চোখে সে নিযানার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত অপ্রস্তুত ভাব। পাশ থেকে মৌনিতা ঠোঁট টিপে হাসছে। তার হাসিতে লুকিয়ে দুষ্টুমি। আলতো করে ফোড়ন কাটল,

‘পোকাটা বেশ বড়সড়, তাই না?’
নিযানা মুহূর্তেই লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। আড়ষ্টতায় নুয়িয়ে পড়লো। চিবুক ছুঁল বুকের কাছের ওড়নায়। কিন্তু কুহুর সেদিকে খেয়াল নেই; সে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বেশ চিন্তিত গলায় বলল,
‘বিষাক্ত পোকা? ঔষধ লাগিয়েছিলিস? পরে যদি খারাপ কিছু হয়ে যায়!’
কলরব নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘ও নিজেই তো একটা আস্ত গিরগিটি! তার চেয়ে বেশি বিষাক্ত আর কী হতে পারে? ভাবিস না। বিষে বিষে বিষক্ষয় হয়েগেছে?’
নিযানার প্রচন্ড রাগ হলো। প্রত্যুত্তরে বলল, ‘আমাকে গিরগিটি বলছো? আমি গিরগিটি?’
কলরবও ছাড়ার পাত্র নয়। পালটা বলল, ‘তুই আমাকে পোকা বললি কেন? আমি পোকা?’
মুহূর্তের উত্তেজনায় বলে ফেলা কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে যেতেই দুজনেই হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজেদের বর্তমান অবস্থান আর চারপাশের উৎসুক মুখগুলো দেখে দুজনেই যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। নিযানার মনে হচ্ছে পায়ের তলার মাটিটা যদি এখন দু-ভাগ হতো। তবে সে মাথা নিচু করে ঢুকে যেত সেই গহ্বরে। মৌনিতা খিলখিল করে হেসে উঠল। কুহু আকাশ যেন থেকে পড়ে বলল,
‘ও তোমাকে কখন পোকা বলল? সব কথা নিজের গায়ে টেনে নিয়ে মানুষকে অকারণে কথা শোনানো তোমার পুরোনো অভ্যাস!’

কলরব ধমক দিয়ে বলল, ‘তোকে এত মাতব্বরী করতে কে বলেছে? এসেছে উকালতি করতে! জ্ঞান না দিয়ে নিজের কাজ কর।’
মৌনিতা হাসতে হাসতেই বলল, ‘আহা ভাইয়া, ওকে বকছ কেন? ও তো অবুঝ। তাই বুঝতে পারেনি। এসব বড়সড় পোকার কামড় না খাওয়া পর্যন্ত কি আর এর মর্ম বোঝা যায়?’
মৌনিতার কথা শুনে কলরব বিব্রতবোধ করল। নিযানা ততক্ষণে ওড়না টেনে নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। মিলু কৌতূহল সামলাতে না পেরে আবার এগিয়ে এল। নিযানার গলায় সেই দাগটা আর দেখতে না পেয়ে কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করল,

‘আচ্ছা আপা, ওটা কি আসলেই পোকার কামড়?’
নিযানার মনে হলো এবার তার কান্না চলে আসবে। কী এক বিড়ম্বনাময় পরিস্থিতি! কলরব আর দেরি করল না। বসা থেকে ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
‘তুমি কি কোনো দাগ গবেষক? এত বিচলিত হওয়ার কী আছে? ওটা আসলে কলরব স্পেশাল ট্যাটু! নাও সিক্রেট বলে দিলাম। এবার শান্তিতে গিয়ে ঘুমাও যাও।’
বলেই কলরব হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিযানা অসহায় চোখে ওর চলে যাওয়া দেখল। অদ্ভুত এক মানুষ! ভুলভাল কথা বলে তাকে আগুনের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজে কেমন সুন্দর রাজার মতো প্রস্থান করল!

আকাশ ভেঙে পড়া বৃষ্টির তোড়ে চরাচর আজ যেন বিষাদে ডুবেছে। ধরণী জুড়ে নিকশ কালো আঁধারের রাজত্ব; মাঝে মাঝে মেঘের বুক চিরে বিদ্যুতের তীব্র হিরন্ময় দ্যুতি চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে মর্ত্যে। সেই ক্ষণিকের আলোয় চারপাশটা শ্বেতশুভ্র হয়ে জেগে উঠেই আবার অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে।বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর টিনের চালে বৃষ্টির উন্মত্ততা। সব মিলিয়ে প্রকৃতি আজ উত্তল।নবনী যখন বাড়ির উঠোনে পা রাখলো তখন সে আগাগোড়া ভিজে একাকার। তার পরনের শাড়িটা শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। চুল থেকে গড়িয়ে পড়া জলের ধারা চোখের জলের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। অনিতা আর অনিক তাকে কুলসুমের বাড়িতে পেয়েছিলো তখন। নবনীর জেদ ছিলো। দিব্য না যাওয়া অবধি সে ফিরবে না। কিন্তু অনিক যখন জানালো যে দিব্য চলে গেছে তখন বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়লো সে।

এই অবেলায় পর্ব ৩০

ভেতরের অপরাধবোধ তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল আগে থেকেই। দিয়ার সাথে করা সেই রূঢ় ব্যবহার। সেই তিক্ত কথাগুলো এখন তীরের মতো নিজের বুকেই বিঁধছে। অভিমানে, যন্ত্রণায় আর একরাশ শূন্যতায় নবনী এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। কাঁদতে কাঁদতে মাথা ধরেছে তার। আশা করেছিলো দিব্য বোধহয় তাকে ফেরাতে যাবে। কিন্তু তার বাজে ভাবে মনটা ভেঙেছে। দিব্য তাকে কিভাবে ছেড়ে দিলো। পাথরভারী পা দুটো টেনে টেনে নবনী বারান্দার দিকে এগোচ্ছিল। মাথা নিচু, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা। পৃথিবীর সবটুকু আলো যেন নিভে গেছে তার জীবন থেকে। কিন্তু বারান্দার বাঁকটা ঘুরতেই সে থমকে দাঁড়ালো। হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল তার। ঠিক ঘরের ঢোকার মুখটিতে কেউ একজন বসে আছে। ঝাপসা চোখেও নবনীর চিনতে ভুল হলো না সেই অবয়ব। দিব্য!

এই অবেলায় পর্ব ৩২

1 COMMENT

Comments are closed.