দ্বিতীয় সূচনা শেষ পর্ব
আফসানা শোভা
Lux South Ari Atoll, Maldive.
মালদ্বীপের একটা প্রাইভেট রিসোর্ট লাক্স সাউথ আরি অ্যাটোল রিসোর্ট। সেখানকার একটা ভিলায় উঠেছে ঐক্যরা। মালদ্বীপে লাক্সারি রিসোর্ট গুলোর মধ্যে অন্যতম একটা নিরিবিলি রিসোর্ট এই লাক্স আরি
অ্যাটোল রিসোর্টটি। অনেকগুলো ভিলা নিয়ে গভীর সমুদ্রের এটোলের মাঝের একটা দ্বীপে অবস্থিত এই রিসোর্টটি।
দশ দিনের নির্দিষ্ট একটা সময় ঐক্য নিরিবিলি পরিবারের সাথে একান্তে সময় কাটাতে মালদ্বীপ নিয়ে এসেছে। সাথে এসেছে আহান ঐশী। মূলত ঐক্যের পক্ষের থেকে বোন আর সম্বন্ধীর জন্য বিয়ের গিফট ছিল এই ট্রিপটা। বলতে গেলে দুই জুটিই হানিমুন মানাতে এই মালদ্বীপ ভ্রমণ।
দীর্ঘ চার ঘন্টা পনেরো মিনিটের বিমান যাত্রার পর আজ ভোর রাতে সবাই মালদ্বীপের ভেলেনা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছেছে। সেখান থেকে সি প্লেনে রিসোর্টে পৌঁছাতে প্রায় পঁচিশ মিনিটের মতো লেগেছে ওদের। আরশান, ওয়াফা প্রথমবারের মতো প্লেনে চড়ে বেশ উৎফুল্ল ছিল। কিন্তু এয়ারপোর্টে পৌঁছাবার আগেই দু’জন ক্লান্তিতে নুয়ে মাম্মাম-পাপার বুকে ঘুমিয়ে পড়ে। আবৃতি আর দু’জনকে জাগাতে দেয়নি। কারণ সি প্লেনে চড়লে নাকি মাথা ঘোরায়, বমি বমি পায়। তাই ঘুমন্ত অবস্থায় দু’জনকে কোলে নিয়েই রিসোর্ট পর্যন্ত এসেছে। রিসোর্টের প্রয়োজনীয় চেকিং শেষে নিজেদের জন্য বুক করা রুমে এনে ওদের বেডে শুইয়ে দেয়। তারপর হালকা ফ্রেশ হয়ে নিজেরাও গা এলিয়ে দেয় ওদের পাশে। মখমলি বিছানায় মাথাটা এলিয়ে দিতেই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমায় পরিশ্রান্ত শরীরগুলো। সেই ঘুম ভাঙ্গে মালদ্বীপ সময় সকাল দশটায়। আবৃতি সবার আগে ঘুম থেকে জেগে উঠে। তারপর ঐক্যকে জাগিয়ে শাওয়ার নিতে চলে যায়। ঐক্য এই ফাঁকে ওয়াফা, আরশানকে ঘুম থেকে জাগাতে চেষ্টা করে। আবৃতি শাওয়ার নিয়ে এসে ঐক্য হতাশ চিত্তে বিছানায় বসে আছে। পাশে ওয়াফা আলুথালু বেশে থম মেরে বসে আছে। আবৃতিকে বের হতে দেখে ঐক্য হতাশ গলায় শুধায়,
— এত চেষ্টা করলাম, আরশানকে কিছুতেই তুলতে সক্ষম হয়নি। তুমি প্রতিদিন জাগাও কিভাবে ওকে?
আবৃতি চুল থেকে তোয়ালেটা খুলে মৃদু হেসে বলে,
— আপনি ট্রিক জানেন না তাই জাগাতে পারেন নি।
— আচ্ছা কি ট্রিক শুনি? চোখে পানি ছিটাবে?
— দূর সরুন তো। এটা কোন ট্রিক হলো? এই অকাজ করলে ছেলে ঘুম থেকে উঠে চিল্লিয়ে কেঁদে পুরো মালদ্বীপ মাথায় তুলবে।
— না বাবা দরকার নেই। তুমিই জাগাও।
ঐক্য বিছানা থেকে উঠে কোমরে দুহাত আঁকড়ে দাঁড়ায়। আবৃতি বিছানায় এলোমেলো হয়ে ঘুমিয়ে থাকা আরশানের পাশে বসে। মাথা হাত বুলিয়ে মৃদুস্বরে ডাকে,
— আরশান,বাবা আমার। ওয়াটার ড্রাইভিং করবেনা?
লোভনীয় প্রস্তাবটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই আরশান নড়েচড়ে উঠে। আবৃতি আবার বলে উঠে,
— বাবা, তোমার পাপা ওয়াফাকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন কিন্তু।
এবার কাজ হলো। আরশান ধড়ফড়িয়ে চোখ কচলে উঠে বসে। হাই তুলে ঘুমকাতুরে কন্ঠে শুধায়,
— আমরা মালবীপ পৌঁছে গিয়েছি মাম্মাম?
— মালদ্বীপ বাবা। হ্যাঁ আমরা অনেক আগেই পৌঁছে গিয়েছি। এখন উঠো শাওয়ার নিয়ে ব্রেকফাস্ট করে আমরা ঘুরু ঘুরু করতে বের হবো।
— মাম্মাম, আমরা ওয়াটার ড্রাইভিং করবনা?
— করবো তো বাবা। আগে শাওয়ার নিয়ে রেডিশেডি হতে হবে না।
ঐক্য গলায় তোয়ালে ঝুলিয়ে দুজনকে দু’কাঁধে চড়িয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলে,
— আসুন বাবারা, আমরা পুলে গোসল করব। দেখবেন ঘুম মামা দৌঁড়ে পালিয়েছে।
এই বলে ঐক্য দুজনকে নিয়ে পুলে নেমে পড়ে। পুলে নামতেই দুজনের ঘুম ঘুম ভাব গায়েব। পানি দেখলে খুশির অন্ত থাকেনা দুটোর। সহসা দুজন ঐক্যের গলা জড়িয়ে অপটু হাত,পা ঝাপটিয়ে সাঁতরাতে থাকে।
আবৃতি পুল সাইডে সান লাউঞ্জারে বসে বিমুগ্ধ চোখে বসে স্বামী-সন্তানদের পানিতে দাপাদাপি করা দেখছে। ঐক্যের সাথে বাচ্চাদের এই ছোট ছোট মুহুর্ত গুলো ও খুব উপভোগ করে। বাচ্চাদের খিলখিলে হাসির শব্দে আবৃতির ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে।
— ঐক্য ওদের নিয়ে উঠে আসুন। খিদে পায়নি আপনাদের।
ওয়াফা পুলের নীলাভ স্বচ্ছ পানিতে হাত ঝাপটাতে ঝাপটাতে বলে,
— মাম্মাম আরেকটু থাকি না। খুব মজা হচ্ছে।
— মাম্মাম, পরে আবার নামবে। এখন আসো। খাবার খেয়ে আমরা ঘুরু ঘুরু করতে যাব তো।
আরশান ঐক্যের হাত থেকে আগেভাগে ঝাপ দেয়। আবৃতি আঁতকে উঠে পানিতে নামতে নিল। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে আরশান খুবই দক্ষভাবে সাঁতরে কিনারায় আসল। ঘটনার আকস্মিকতায় আবৃতি হতবাক বনে যায়। ঐক্য ফিচেল হেসে বলে,
— কি অবাক হয়েছেন ছানাদের মাম্মাম?
— আরশান এত তাড়াতাড়ি সাঁতার শিখে নিল!
আবৃতি অবাক স্বরে আওড়ায়।
— দেখতে হবেনা ছেলেটা কার।
আবৃতি মুচকি হাসে। শুধায়,
— ওয়াফা এখনো শিখতে পারে নি?
ওয়াফা হড়বড়িয়ে বলে,
— মাম্মাম, আমি একটু একটু পারি। দেখবে?
বলে ঐক্যের গলা জড়িয়ে পানিতে পা ঝাপটাতে থাকে। মেয়ের কান্ডে ঐক্য হু হা করে হেসে দেয়। আবৃতি ঠোঁট টিপে হাসে। মেয়ে তার একটু একটু পারে। তাও বাপের গলা জড়িয়ে ধরে। শাওয়ার নেওয়া শেষ হলে আবৃতি ওয়াফাকে তৈরী করিয়ে দেয়। আরশানকে ঐক্য রেডি করিয়ে দিয়েছে। ওর আর ওয়াফার পরনে ওশেন ব্লু আর হোয়াইটের কম্বিনেশনে লং গাউন।
ট্যুরে আসার আগে ঐক্য ওদের জন্য একগাদা শপিং করেছিল। মা-মেয়ের জন্য ম্যাচিং করে কয়কটা বিচ ড্রেস কিনেছে ঐক্য। আবৃতির কখনো এইরকম ড্রেসগুলো পড়া হয়নি। ড্রেসটা পড়ার পর নিজেকেই নিজের কাছে অন্যরকম লাগছিল। ড্রেসগুলোর সাথে সাধারণত ওরনা হয়না। ঐক্য নিজ উদ্যোগে আবৃতির প্রতিটি ড্রেসের সাথে আলাদা করে ম্যাচিং ওরনা পারচেস করেছে। আবৃতির প্রতি ঐক্যের এই খুটিনাটি খেয়াল-যত্ন গুলোই আবৃতিকে ততোধিক মুগ্ধ করে।
ঐক্য আর আরশান পরেছে ব্লু আর হোয়াইট হাওয়াই ছাপার ক্যাম্প কলার শার্ট। সাথে ক্যাজুয়াল হোয়াইট থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। ঐক্যের চোখে বিশাল একটা রোদচশমা। আবৃতি আঁড়চোখে বার কয়েক নিজের সুদর্শন বরটাকে দেখে নিল। ঐক্যের বেরিয়ে থাকা শ্যামলা লোমযুক্ত লম্বা লম্বা পা গুলো বড্ড চোখে বিঁধছে। একবার ভাবলো বলবে চেইঞ্জ করে ফুল প্যান্ট পরে নিতে। পরে ভাবল না থাক। এখানে সবাই অর্ধনগ্নই থাকে। তার স্বামীর পায়ের দিকে কেউ তাকাবেনা।
ঐক্য রুম লক করে ঐশীর নাম্বারে কল করে।
— এই আহান, উঠুন না।
আহান কপাল কুঁচকে হালকা একটু নড়েচড়ে ঐশীকে আরেকটু নিজের সাথে জড়িয়ে নেয়। আহানের হাতের বাঁধনে ঐশী হাঁসফাঁস করে বলে উঠে,
— ভাইয়া আমাদের জন্য ওয়েট করছে। প্লিজ জলদি উঠুন।
আহান বিরক্তির শ্বাস ছেড়ে চোখ কচলে উঠে বসে,
— হানিমুন ট্রিট দিয়ে হানিমুনটাই তো করতে দিচ্ছে না তোমার ভাই।
ঐশী সলজ্জে হেসে বলে,
— দশদিনের জন্য এসেছেন। ভুলে গিয়েছেন?
আহান ঐশীকে হেঁচকা টানে নিজের বুকের উপর আছড়ে ফেলে। হাত দিয়ে ঐশীর মুখের উপর ঢেকে পড়া কয়েকটা চুল আলতো হাতে সরিয়ে জড়ানো গলায় বললো,
— না একদম ভুলিনি। হানিমুনে মানুষ যা করতে আসে
আমি তো আমার কাজই করছি। কিন্তু তোমার ভাইয়া বোধহয় ভুলে বসেছে সে হানিমুনে এসেছে।
ঐশী লাজে মরি মরি হয়ে ক্ষীণ গলায় বলে,
— আপনার মতিভ্রষ্ট হয়েছে আহান। হানিমুনে মানুষ খেতে এবং ঘুরতেও আসে।
আহান এক ভ্রু উঁচিয়ে শুধাল,
— ইউ মিন অল ডে খাওয়া এন্ড ঘোরাঘুরি?
— ইয়েস।
আহান ঠোঁট বাঁকিয়ে রহস্যময় হেসে বলে,
— ওহ আই সি। তাহলে রাতে তৈরী থেকো মাই লাভ। রাতের কাজ রাতেই করব তাহলে।
লজ্জার তোড়ে ঐশীর গালদুটো গরম হয়ে উঠল। সহসা আহানকে নিজের থেকে ধাক্কা মারে।
— সরুন তো নির্লজ্জ লোক।
আহান হো হো করে রুম কাঁপিয়ে হেসে দেয়।
রেস্টুরেন্টটা দেখে আরশান, ওয়াফা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। কারণ পুরো রেস্টুরেন্টটা বানানো হয়েছে বড় একটা ব্যানিয়ন গাছের উপর। ভিলা থেকে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে বিচের পাশে জঙ্গলের ভেতর এই রেস্টুরেন্টটা। চারদিকে লম্বা লম্বা ট্রপিকাল গাছ। আরশান ওয়াফা লাফিয়ে উঠে অভূতপূর্ব এই ট্রি-হাউস রেস্টুরেন্টটা দেখে।
— পাপা দেখ দেখ, ট্রি-হাউস। ওয়াও!
আবৃতি চারদিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আওড়ায়,
— আরশান, ওয়াফার পাপা, দেখেছেন কি সুন্দর!
ঐক্য মুচকি হেসে বলে,
— আসল সৌন্দর্য এখনও দেখেছেন কই ম্যাডাম। লাঞ্চে আন্ডার ওয়াটার রেস্তোরাঁয় নিয়ে যাব।
সবাই কাঠের সিঁড়ি চড়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকলো। রেস্টুরেন্টটার ইন্টেরিয়র দেখে সবাই আরো বেশি অভিভূত হলো। ছাদ বিহীন সম্পূর্ণ খোলা রেস্টুরেন্টেটা। ফলস্বরূপ মৃদুমন্দ হাওয়ার পশলা এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে ওদের ক্লান্ত শরীরগুলো। কাঠের পাতাতনের উপর সারিবদ্ধভাবে বিছিয়ে রাখা বেতের চেয়ার। টেবিলগুলো গাছের গুঁড়ি কেটে স্ল্যাব বানানো। প্রতিটি টেবিলের উপর ফুলদানিতে তাজা ফ্রাংগিপানি ফ্লাওয়ারস রাখা। সেই ফুলগুলো থেকে আসা সতেজ সুগন্ধ পরিবেশটাকে আরো মোহনিয়া করে তুলেছে। গাছের ডালে অনেকগুলো রেটেন ল্যাম্প ঝুলছে। এককোণে ছোট একটা বার কাউন্টার। সাজিয়ে রাখা ওয়াইন বটল গুলো দেখে ঐক্যের চোখ চকচক করে উঠে। পরক্ষণেই আবৃতির কথা স্মরণে আসতেই জিভে কামড় দিল। ভুলক্রমে যদি এক প্যাকও গিলে নেয় তাহলে বৌ তার হানিমুনকে আর হানিমুন রাখবে না। না না সবার আগে বৌ। বৌ থাকলে এসব না হলেও চলবে। ঐক্য রেলিংয়ের পাশে একটা টেবিলে ওদের নিয়ে বসলো। এই পাশ দিয়ে সমুদ্রের ভিউ পাওয়া যায়।
সব মিলিয়ে একটা নৈসর্গিক সৌন্দর্যের দেখা পেল সবাই!
একটু পর আহান, ঐশী ওদের সাথে জয়েন হয়। ওরা আসতেই ঐক্য সবার জন্য খাবার অর্ডার করে।
ব্রেকফাস্টে সবাই মালদ্বীপের স্পেইশাল মাসহুনি অর্ডার করে। সাথে ওদের বেস্ট মেন্যু নারকেল পান্না কোটা আর কিছু সি ফুড অর্ডার করে। আবৃতি বেছে বেছে বাচ্চাদের জন্য চিকেন নাগেট, মিনি বার্গার, পাস্তা আর ফ্রুটস স্কিউয়ার অর্ডার করে। সচরাচর একসাথে এত জাংকফুড ও কখনোই বাচ্চাদের এলাউ করতো না। কিন্তু ট্রিপের এই দিনগুলো আবৃতি মনঃস্থির করেছে সবকিছু ওদের পছন্দ মতো করবে। এই সময়গুলো তো সবসময় লাইফে আসবেনা।
ট্রি-হাউসে ব্রেকফাস্ট শেষ করে সবাই বিচে হাঁটতে বের হলো। আহান ঐশী নিজেদের মতো হাঁটতে হাঁটতে অন্যপাশে চলে গেল। ঐশীর পরনে একটা হোয়াইট টপ আর হোয়াইট স্কার্ট। আহানের পরনে একটা কালো থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর প্যাস্টেল রঙের কটনের পাতলা বাটিক শার্ট। গলায় ঝুলানো একটা ক্যামেরা। ক্যামেরা নিয়ে ফটোজেনিক জায়গা গুলোতে বৌকে দাঁড় করিয়ে ফটো নিতে ভুল করছেনা।
ওয়াফা,আরশানকে নিজেদের মতো ছেড়ে দিয়ে ঐক্য আবৃতি বিচ আমব্রেলায় হেলান দিয়ে বসে। ঐক্যের কাঁধে মাথা রেখে আবৃতি বাচ্চাদের দিকে নজর রাখছিল। স্থানীয় একটা মেয়ে বিচে হেঁটে হেঁটে ঝিনুকের বিভিন্ন অর্নামেন্টস আর তাজা ফুলের তৈরী ক্রাউন সেল করছে। ঐক্য মেয়েটাকে ডেকে তার থেকে থেকে দুটো ফ্লাওয়ার ক্রাউন কিনে বৌয়ের মাথায় অতি যত্নসহকারে পরিয়ে দিল। তারপর গলা চড়িয়ে ওয়াফাকে ডাকল। ওয়াফা দৌঁড়ে আসলে ঐক্য ওর মাথায়ও পরিয়ে দিল।
ফ্লাওয়ার ক্রাইন দুটো পরানোর পর মনে হলো ঐক্যের সামনে দুটো জলজ্যান্ত পরী দাঁড়িয়ে আছে। ঐক্য ফোন বের করে আরশানকেও ডাকে। তারপর ফোন বের করে একটা সুন্দর ফ্যামিলি সেলফি তুলে নেয়। বাচ্চারা আবৃতির হাত টেনে ধরে ভীষন আগ্রহী গলায় বলে,
— মাম্মাম আসো আমরা প্যালেস বানাব। আসো।
আবৃতি মুচকি হেসে ওদের সঙ্গে বালিতে বসে পড়ল। ওরা অপটু হাতে আবৃতির সাথে মিলে একটা প্যালেসের গড়ন দিতে শুরু করে। ওদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ঐক্য ফোন বের করে ভিডিও করছে স্ত্রী-সন্তানদের এই চমৎকার মুহুর্তটি। সমুদ্রের নীল জলরাশীর অপার সৌন্দর্য যেন ফিকে পড়ে গিয়েছে তার সামনের এই আদরগুলোর কাছে। ঐক্য মুগ্ধ চিত্তে নিবেশন মনোযোগে ক্যামেরায় তাকিয়ে দেখছে ওদের। হঠাৎ পাশে একটা লোক এসে দাঁড়ায়। নিজের পাশে কারো উপস্থিতি অনুভব করে ঐক্য ভ্রু কুঁচকে তাকায়। নিজের সমবয়সী বা তারও ছোট একটা অপরিচিত সুদর্শন যুবককে দেখে ললাটে মৃদু ভাঁজ পড়ে। ফোনটা অফ করে ভদ্রতাসূচক হালকা হেসে শুধায়,
— এক্সকিউজ মি।
যুবা প্রত্যিত্তরে নিজেও মুচকি হাসি ফিরিয়ে বললো,
— আ’ম মুহিত। ফ্রম বাংলাদেশ।
ত্রস্ত ঐক্যের ললাটে ভাজগুলো মিলিয়ে যায়। ডান হাতটা বাড়িয়ে চমৎকার হেসে বলে,
— বাংলাদেশী! ওহ আই সি। আ’ম ঐক্য চৌধুরী। অলসো ফ্রম বাংলাদেশ।
মুহিত নামের যুবক ঐক্যের সাথে হ্যান্ডশেইক করে বললো,
— নাইস টু মিট ইউ৷ আমার আপনাদের চেহারা দেখেই মনে হচ্ছিল বাংলাদেশী। তাই পরিচিত হতে চলে আসলাম।
ঐক্য স্মিত হাসে। মুহিত আবৃতি আর বাচ্চাদের লক্ষ্য করে আবার প্রশ্ন করে,
— হানিমুনে এসেছেন?
ঐক্য মৃদু হেসে প্রত্যিত্তর করে,
— জি।
— এই বাচ্চাদুটো কার?
যুবক বালি দিয়ে প্যালেস বানাতে নিমগ্ন আরশান, ওয়াফা আর আবৃতিকে লক্ষ্য করে শুধায়। ঐক্য ওদের দিকে একচিত্তে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলে,
— আমার।
লোকটা চোখ কপালে তুলে শুধায়,
— আপনাদের মানে? আপনারা বাচ্চা নিয়ে হানিমুনে এসেছেন?
ঐক্য এবারেও মৃদু হেসে বলে,
— জি!
লোকটা আরেক পলক আবৃতি আর ছানাদের পানে ভড়কে যাওয়া দৃষ্টি ফেলে বোকা বোকা হেসে বলে,
— ওহ, আই সি। আসলে এমন হানিমুন এই প্রথম দেখলাম তো। তাই একটু অবাক হয়েছি। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড। ইনজয় ইওর বেবিমুন।
বলে লোকটা চপল পায়ে প্রস্থান নিল। লোকটার গমন পানে ঐক্য অবাক বিস্ময় নিয়ে অস্ফুটস্বরে বিরবিরিয়ে আওড়ায়,
— বেবিমুন?
— ইয়েহ, আমরা প্যালেস বানিয়েছি। পাপা, পাপা দেখো আমরা প্যালেস বানিয়েছি।
দুজন ছুটতে ছুটতে ঐক্যকে টেনে আনে। ওদের হাসি ঝরা নিষ্পাপ মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আবৃতির মানসপটে ভেসে উঠে আরেকটা নিষ্পাপ কোমল শিশু মুখ। কি মনে করে আবৃতি তুরন্ত নিজের ফোনটা পার্স থেকে বের করে একটা নাম্বারে ডায়াল করে। ওপাশে রিসিভ হতেই চপল কন্ঠে শুধায় আবৃতি,
— ভাল আছো সোনিয়া?
আবৃতির ফোন পেয়ে মোটেও অবাক হলোনা সোনিয়া। কারণ আবৃতি প্রায়ই ফোন করে ওদের খোঁজ-খবর নেয়। বিশেষ করে ধারার জন্য প্রায়শই কল আসে আবৃতির পক্ষ থেকে।
— আলহামদুলিল্লাহ আপু। আপনারা কেমন আছেন? আপনার বাচ্চারা কেমন আছে?
আবৃতি মৃদু হেসে বলে,
— এইতো সবাই ভালো আছে। ধারা বাবু কেমন আছে?
— ভালো আছে আপু। এইতো দোলনায় ঘুমাচ্ছে।
— বাচ্চাটার জন্য খুব খারাপ লাগে সোনিয়া। পৃথিবীর কিছু বুঝে উঠার আগেই বাবা-মা হারিয়ে এতিম হয়ে গেল।
সোনিয়া তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
— সব পাপের প্রতিফল বুঝেছ আপু। কারো সাথে অন্যায় করে কেউ কোনদিন সুখী হতে পারেনা। বদদোয়া বলেও একটা জিনিস আছে। তোমার অভিসম্পাত লেগেছে।
আবৃতি একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
— আমি না তাদের কোনদিন বদদোয়া দিইনি বিশ্বাস করো সোনিয়া। তবুও কেমন হলো এমনটা বলোতো? এই নিষ্পাপ বাচ্চাটা তো কোন দোষ করেনি। তাহলে সবচেয়ে বেশি শাস্তি সে কেন পাচ্ছে?
এক মুহুর্তের নীরবতা। ফোনের অপর পাশে সোনিয়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
— কথায় আছে বাবা-মায়ের কর্মের ফল সন্তানকে ভোগ করতে হয়।
আবৃতি ম্লান কন্ঠে বললো,
— তুমি ধারার খেয়াল রেখ সোনিয়া। এই বাচ্চটা একটা সুস্থ জীবনের অধিকার রাখে। বাবা-মায়ের কৃতকর্মের ফল কোন নিষ্পাপ বাচ্চা ভোগ না করুক। তুমি ওর মা হয়ো।
— দোয়া করো আপু যেন এই বাচ্চাটার মা হয়ে থাকতে পারি।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের স্বীকার ছোট্ট ধারাকে সোনিয়া পরম মমতায় নিজের বুকে আগলে নিয়েছে। ইরার বাবা-মা চেয়েছিল ধারাকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে কিন্তু সোনিয়া কঠোরভাবে তার বিরোধিতা করে। ছোট্ট ধারাকে ও কখনোই নিজের কাছ ছাড়া করতে চায়না। অন্তত ওর বুঝ হওয়া পর্যন্ত নিজের কাছে রাখার দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ সোনিয়া। বড় হওয়ার পর ধারা নিজে যার কাছে থাকতে চাইবে থাকবে, সোনিয়া আটকাবে না।
সোনিয়ার ভাবনার মাঝেই দোলনায় থাকা ধারা ঘুম ভেঙে হাত পা মুচড়িয়ে ট্যা ট্যা করে কেঁদে উঠে।
সোনিয়া লাইনে থাকা আবৃতিকে ব্যতিব্যস্ত গলায় বলে,
— আপু তোমাকে পরে কল করব। ধারার ঘুম ভেঙে গিয়েছে। কাঁদছে বাচ্চাটা।
কল কেটে দোলনা থেকে তারস্বরে কাঁদতে থাকা ধারাকে ব্যস্ত হাতে কোলে নিয়ে সোনিয়া দোলাতে দোলাতে আদুরে স্বরে বলে,
— কি হয়েছে, কাঁদছে কেন ধারা বেবি? খিদে পেয়েছে আমার মা টার? এইতো আম্মু দুধ গরম করে আনছি।
রাত বারোটা:
পুরো ভিলায় ঝিম ধরা নীরবতা বিরাজমান। বাইরে কোন এক বুনো ঝোপ হতে ভেসে আসছে ঝিঁঝি পোকার শব্দ। সারাদিনের নিরন্তর ঘোরাঘুরিতে পর্যটকরা শ্রান্ত দেহে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে। শুধু ঘুম নেই আবৃতির দুই বিচ্চুর চোখে। প্রায় ঘন্টাখানেক হতে চললো আবৃতি ওদের ঘুম পাড়াচ্ছে। অথচ দুজনের চারটে চোখ এখনো গোল গোল করে তার দিকে চেয়ে আছে।
— এখনো ঘুম আসেনি ওদের?
ঐক্য রুমের দরজায় এসে শুধায়। এ নিয়ে প্রায় দশবার চক্কর কেটে গিয়েছে লোকটা। আবৃতির নিজেকে জোকার মনে হচ্ছে। বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে বললো,
— আপনি বারবার এসে ডিস্টার্ব করলে ওদের ঘুম কি করে আসবে ঐক্য?
ঐক্য মুখ গোমড়া করে বললো,
— বারোটা বেজে গিয়েছে।
আবৃতি অতিষ্ঠ হয়ে একটা ধমক দিল ঐক্যকে,
— তো আমি কি এখন নাচব?
আবৃতির ধমক খেয়ে বেচারার মনঃক্ষুণ্ন হলো। চোখে বালকসুলভ টলটলে অভিমান নিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেল। স্বামীকে বাচ্চাদের মতো রাগ করতে দেখে আবৃতি একটা হতাশ শ্বাস ছাড়ল। বিছানায় তাকিয়ে দেখল বাচ্চাদের চোখ দুটোর আকার আগের মতোই আছে। একটুও সংকুচিত হয়নি চোখগুলোর আকার। আবৃতি হতাশ শ্বাস ছেড়ে ফের ক্ষীণ স্বরে গান শুরু করে,
‘আয় আয় চাঁদ মামা
টিপ দিয়ে যা
চাঁদের কপালে চাঁদ
টিপ দিয়ে যা
মাছ কাটলে মুড়ো দেব
ধান কুটলে কুঁড়ো দেব
কাল গরুর দুধ দেব
দুধ খাবার বাটি দেব ।
আয় আয় চাঁদ মামা
টিপ দিয়ে যা
চাঁদের কপালে চাঁদ
টিপ দিয়ে যা!’
অবশেষে দুজনের চোখে ঘুম নামতে নামতে ঘড়ির কাঁটা রাত একটার ঘরে পৌঁছুলো। আবৃতি দু’জনের গায়ে ভালো করে কম্পোর্টার জড়িয়ে বিড়াল পায়ে বের হয়ে আসল। রুমে এসে দেখে ঐক্য রুমের কোথাও নেই। পা টিপে টিপে বারান্দায় উঁকি মেরে দেখে মুখটা আষাঢ়িয়া আঁধার বানিয়ে পুল সাইডে সান লাউঞ্জারে বসে বিয়ার খাচ্ছে ঐক্য। ঐক্যকে মনের সুখে মদ গিলতে দেখে আবৃতির মাথাটা দপ করে জ্বলে উঠে। তবুও স্বামীর গোবেচারা মুখটা দেখে মায়া অনুভব করে ফের রুমে ঢুকে লাগেজ থেকে একটা প্যাকেট হাতে নেয়। হানিমুনের জন্য কেনা ড্রেসগুলোর সাথে ঐক্য কয়েকটা দুষ্ট দুষ্ট শাড়ি, ড্রেস,নাইটি কিনেছেও স্ত্রীকে একান্তে দেখার নিমিত্তে। আবৃতি লজ্জালু হেসে প্যাকেটটা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। তৈরী হয়ে নিজেকে আপাদমস্তক আরেকবার দেখে নিয়ে পিলপিল পায়ে বারান্দার দরজার অভিমুখে এসে দাঁড়ালো।
ঐক্য বিয়ারে চুমুক দিতে গিয়ে থমকে গেল। পুলের স্বচ্ছ নীল পানিতে কারো অবয়বের ছায়া স্পষ্ট ভেসে। ঐক্য ভ্রু কুঁচকে পেছনে ফিরল। পেছনে তাকাতেই মনে হয় কয়েক ভোল্টেজের ঝটকা দিয়ে উঠল শরীর। অবাক নয়নে আবৃতির আপাদমস্তক দেখে ঐক্যের চোখ ধাঁধিয়ে উঠল! বোধগম্য হলোনা হোটেলের সোডিয়াম লাইটের আলো আঁধারিয়া মাঝে কি ওটা কোন অপ্সরা দাঁড়িয়ে আছে? অত্যন্ত পাগলা নেটের ট্রান্সপারেন্ট রেড শাড়িটায় পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে ওর সমস্ত নারী বাঁক। আলো যেন পিছলে পড়ছে ওর সোনারঙা গায়ে। চেয়ে থাকতে থাকতেই ঐক্যের চোখ ঘোলাটে হয়ে আসে। মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠে সর্বনাশা নেশা। আবৃতি আনত মুখে বিড়াল পায়ে ঐক্যের সামনে এগিয়ে আসে। আবৃতির নিজেকে এমন লোভনীয় উপস্থাপনে মনের মধ্যে তা তা থৈ থৈ করলেও বাইরে মুখটা যথাসম্ভব গম্ভীর বানিয়ে রাখল। ঐক্যকে এখনো শান্ত হয়ে বসে থাকতে দেখতে আবৃতি ভীষণ অবাক হলো। এতক্ষণে তো জনাবের ওর উপর হামলে পড়ার কথা। তাহলে কি সাজ পছন্দ হয়নি? আবৃতি টুপ করে ঐক্যের কোলে বসে পড়ে। ঐক্য হঠাৎ প্রতিক্রিয়ায় সামান্য টললেও অতি দ্রুত সামলে নেয়। আবৃতি ঐক্যের হাত থেকে বিয়ারের ক্যানটা নিয়ে দূরে ছুঁড়ে মারে। তারপর ঐক্যের গলা জড়িয়ে আহ্লাদী কন্ঠে বলে,
— কি হয়েছে জনাব? আমাকে কি খুব পঁচা দেখতে লাগছে?
ঐক্য উত্তর দিল না। এত কাছে আবৃতির সুগঠিত কোমল শরীরটা অনুভব করে ঐক্যের পায়ের পাতা শিরশির করছে। একটা শুকনো ঢোক গিলে অন্যদিকে ফিরে শক্ত হয়ে বসে রইল। ঐক্যের কোন প্রতিক্রিয়া না পেয়ে আবৃতি নাক ফুলিয়ে ওর কোল থেকে উঠে মিছে অভিমানের ভান ধরে বলে,
— থাক আমি বরং রুমে গিয়ে চেইঞ্জ করে নিচ্ছি।
ঐক্য ধড়ফড় করে আবৃতির উন্মুক্ত সরু কোমরটা আঁকড়ে ধরে হেঁচকা টানে ফের নিজের কোলে বসিয়ে দেয়। ঐক্যের ছোঁয়ায় অভ্যস্ত আবৃতি ফের একবার কেঁপে উঠল পুরনো অনুভূতিতে। ঐক্য কোনপ্রকার বাক্য বিনিময় না করেই অকস্মাৎ আবৃতির অধর জোড়ায় হামলে পড়ল। ঘটনার আকস্মিকতায়
আবৃতি আঁতকে উঠে ঐক্যের সাদা শার্টটা খামচে ধরে। সময়ের ব্যবধানে আবৃতির লাল টকটকে পুরু ঠোঁটযুগল পৃষ্ট হতে থাকল ঐক্যের সিগারেট পোড়া কালচে ওষ্ঠের দংশনে। একটু পর নিঃশ্বাস নেওয়ার তাগিদে ঐক্য আবৃতির ঠোঁট জোড়া ছেড়ে দিল। কিন্তু ওকে সামান্য শ্বাস ছাড়ার ফুসরত টুকু না দিয়ে পাজকোলা করে উঠে দাঁড়িয়ে রুমে হাঁটা দেয়। নরম বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজের গা থেকে শার্টটা খুলে দূরে ছুঁড়ে মারে। তারপর নিজের সকল ভার আবৃতির শরীরের উপর ছেড়ে ওর গোটা দেহে ঘোলাটে নেশাক্ত দৃষ্টি বুলিয়ে হাস্কি স্বরে ফিসফিসিয়ে বলে,
— তুমি ওয়াইনের লাল তরলের চেয়েও বেশি নেশাক্ত আবৃতি।
আজ বোধহয় পূর্ণিমা! গোটা পৃথিবী জ্যোৎস্নায় স্নান করছে। বিশাল খোলা জানালা ভেদ করে ঝিরঝিরে পবনে শিরশির করে উঠছে আবৃতির নিরাবরণ কায়া। আবৃতি শরীরটা আরেকটু সিঁটিয়ে নেয় ঐক্যের বুকে। নীরবতা ভাঙে আবৃতি,
— ঐক্য?
ঐক্য বদ্ধনেত্রে জড়ানো গলায় উত্তর দেয়,
— হুম।
— আপনি কি জানেন আমি আপনাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি।
ঐক্য চট করে চোখ খুলে তাকায়। আবৃতি মাথা তুলে ঐক্যের লাল চোখযুগলে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিরেট স্বরে বলে,
— এবং আপনি আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ ভালবাসা।
ঐক্য ঢোক গিলে। আবৃতি ওর প্রথম ভালোবাসা নয় এটা সত্য, কিন্তু এই নারীই হবে এক্যের শেষ ভালোবাসা। এই নারীর পরে অন্য কোন নারীর কথা ঐক্য স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবে না। মাহিরাকে একদিন ঐক্য পাগলের মতো ভালোবেসেছিল সত্যি। কিন্তু সেই নারীর কুৎসিত ছলনা আর তিক্ততা হৃদয় থেকে সেই ভালোবাসাকে মুছেও দিয়েছে।
কতক্ষণ দুজনেই নীরবতা পালন করলো। দিনশেষে দুজনের মনেই ক্ষীণ আফসোসের ব্যথা জাগে কেন তারা দুজনের প্রথম ভালেবাসা হয়ে এলো না! কেন?
ভোর পাঁচটা। আবৃতি, ঐক্য, ওয়াফা,আরশান বসে আছে বিচের বালুচরে। চারদিকে ভোরের পাখিদের মৃদু গুঞ্জন। পুরো বিচটা অনেক নিরিবিলি শান্ত। তেমন মানুষজনের আনাগোনা দেখা যাচ্ছেনা। স্বাভাবিক প্রাতঃকালে মানুষ ভিলার মখমলে বিছানায় প্রিয়তমের বুকে নির্বিঘ্নে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে। বাচ্চাদুটো মাম্মাম -পাপার কোলে বসে ঘুমে এখনো ঝিমুচ্ছে। কাক ডাকা ভোরে দু’জনকে কাঁচা ঘুম থেকে একপ্রকার জোর করে তুলে নিয়ে এসেছে ঐক্য, আবৃতি। কারণটা ভোরের সূর্যোদয়! আবৃতির খুব ইচ্ছে ছিল একদিন প্রিয় মানুষটাকে সঙ্গে করে ভোরের নিস্তব্ধ সূর্যোদয় দু’চোখ ভরে দেখবে। ভাগ্য আবৃতিকে সেই সুন্দর ইচ্ছেটাকে পূরণ করার সুযোগটা খুবই সুন্দর সময়ে দিয়েছে। এখন আবৃতির একজন একান্ত প্রিয় মানুষের সঙ্গে সঙ্গে আরো দুজন প্রিয় মানুষও আছে। তাদের ব্যতীত এই সৌন্দর্য আস্বাদন অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
ঐক্যের কাঁধে পরম নিশ্চিন্তে মাথা রেখে আবৃতি তাকিয়ে আছে বিশাল সমুদ্রের কোল ঘেঁষে একটু একটু উদীয়মান ওই টকটকে লাল থালার ন্যায় সূর্যটার দিকে। হঠাৎ অস্ফুটস্বরে বলে উঠে আবৃতি,
দ্বিতীয় সূচনা পর্ব ৪৪
— দ্বিতীয় সূচনা কখনো কখনো খুব সুন্দর হয় তাইনা ঐক্য।
ঐক্য আরশানের চুলে হাত বোলাতে বোলাতে মৃদু হেসে বলে,
— যদি সঠিক মানুষটা জীবনে আসে তবে!
আবৃতির চোখজোড়া হঠাৎ টলমল করে উঠে । ধরা গলায় ভীষণ আবেগে বাষ্প রুদ্ধ কন্ঠে ফিসফিস করে বলে,
— ভালোবাসি আমার সন্তানদের পাপাকে।
ঐক্য মুচকি হেসে আবৃতির চোখের কার্ণিশের অশ্রু কণাগুলোকে সযত্নে মুছে মিহি স্বরে বলে,
— ভালোবাসি আমার গোটা পৃথিবীর সুখ এনে দেওয়া মানুষটাকে!
অসমাপ্ত
