Home দ্বিতীয় সূচনা দ্বিতীয় সূচনা পর্ব ৪৩

দ্বিতীয় সূচনা পর্ব ৪৩

দ্বিতীয় সূচনা পর্ব ৪৩
আফসানা শোভা

— আমাকে আপ্পি ডাকবে আরশান।
আরশান নাক কুঁচকে বলল,
— এ্যাঁ! আমি তোমাকে কেন আপি ডাকব?
ওয়াফা কপালে ছড়িয়ে থাকা বেঙ্গস কাটিং চুলগুলো আঙুলের সাহায্যে সরিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বলল,
— কারণ আমি তোমার চেয়ে এক মান্থ বড় হু।
আরশানকে খানিক ভাবুক দেখা গেল। বাচ্চাটার মাথায় এটা ঢুকছেনা যে একমাসের বড় আবার কিসের বড়।
— কি খেলা হচ্ছে কিডস?
দু’জন পিছনে ফিরে দেখে যথারীতি সাদা টিশার্ট আর একটা ঢোলাঢালা টাউজার পরনে ঐক্য এসে দাঁড়িয়েছে লনে। হাসিমুখে বাচ্চাদের কাছে এগিয়ে এসে ওদের সাথেই লনের সবুজ ঘাসে বসে পড়ল। ঐক্যকে দেখেই আরশান বিভ্রান্ত গলায় প্রশ্ন ছোঁড়ে,

— পাপা, ওয়াফা মনি বলছে ওকে আপ্পি ডাকতে। কারন সে আমার এক মাসের বড়৷
আরশানের কথা শুনে ঐক্য হু হা করে হেসে দেয়। পাপাকে হাসতে দেখে ওয়াফা মুখ ফুলিয়ে শুধায়,
— তুমি হাসছ কেন পাপা? আমি একদম সত্যি বলছি। আমি আরশানের এক মান্থের বড়, এক মান্থ। দেখ মার্চ, এপ্রিল,মে…..
ওয়াফা গুরুতর ভঙ্গিতে আঙুলের খাঁজগুলো গোণা আরম্ভ করে। যেন আজ পাপাকে প্রমাণ দিয়েই ছাড়বে সে আরশানের এক মাসের বড়। ঐক্য কোনরকমে হাসি রুখে মেয়েকে নিজের কাছে টেনে আনল। বললো,
— মা, একমাসের বড় ইজ নট আ বিগ ডিল। তুমি আরশানের বোন এটাই ফ্যাক্ট।
ওয়াফা হঠাৎ প্রশ্ন করে,
— পাপা? কাল কাল ডান্স ক্লাসে রিপ্তি বলেছিল আমরা ভাইবোন কি করে হয়েছি?
ঐক্যের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। থম মারা কণ্ঠে শুধায়,

— তুমি কি বলেছিলে?
ওয়াফা চট করে বললো,
— ম্যাজিক করে৷
ঐক্য অবাক স্বরে শুধায়,
— মানে?
— পাপা আমি আল্লাহকে বলেছিলাম যেন সুইটি আন্টিকে আমার মাম্মাম করে দেয়। দেখ আল্লাহ ম্যাজিক করে সুইটি আন্টিকে আমার মাম্মাম বানিয়ে দিয়েছে।
ঐক্য মেয়ের নিষ্পাপ কপোলে হাত রেখে মৃদু হাসে। বলে,
— একদম ঠিক বলেছ মা।
তারপর বুক ভরে একটা সতেজ নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে দু’জনকে নিজের সন্নিকটে টেনে নিয়ে আসে। বাচ্চাদুটোর ললাটে স্বস্নেহে দুটো চুম্বন এঁকে বলে,
— তোমরা সবসময় দুজন দুজনের বন্ধু হয়ে থাকবে। চলার পথে একজন হোঁচট খেয়ে পড়লে আরেকজন টেনে তুলবে। যদি আমি আর তোমাদের মাম্মাম কখনো তোমাদের সাথে নাও থাকি তোমরা কোনদিন ভুলে যাবেনা তোমরা দুজনের বন্ধু। মনে থাকবে?
ওয়াফা,আরশান ঐক্যের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথা নাড়ায়। ঐক্য দুজনকে বুকে জড়িয়ে নেয়। একটা প্রশান্তিকর নিঃশ্বাস ছেড়ে অনুভব করে আজ ও পরিপূর্ণ!

— আমি ওয়াফার মাম্মাম।
আবৃতি প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও মুহুর্তেই সামলে নেয় নিজেকে। মুখটা থমথমে করে প্রত্যিত্তোর করে,
— এক্সিউজ মি।
— তুমি বোধহয় আমাকে চিনতে পারোনি আমি মডেল মাহিরা আর ওয়াফার মাম….দদধ
— আপনি কে আমি খুব ভাল করেই চিনতে পেরেছি। এত বিশদভাবে বর্ণনা করতে হবে না। এখন আসল কথায় আসুন৷ আমাকে কল করার কি প্রয়োজন পড়ল ক্লিয়ারলি সেটা বলুন।
আবৃতি কথা কেড়ে নিয়ে নিস্পৃহ গলায় বললো। আবৃতির শক্ত কথাগুলো শুনে মাহিরা চমকে উঠল। তাৎক্ষণিকভাবে কোন উত্তর করতে পারলনা আবৃতির প্রশ্নের।
— কি হলো আপনি কিছু বলবেন নাকি আমি কল কাটব।
মাহিরার ভোঁতা মস্তিষ্কে প্রশ্ন করে,

— ওয়াফা কোথায়?
বারবার ওয়াফার নাম মাহিরার মুখে শুনে কেন জানি খুব কষ্ট হচ্ছে আবৃতির। কি চায় এই মহিলা? কেন আবৃতির সংসারে নজর দিচ্ছে। আচ্ছা ওয়াফাকে কি এই মহিলা আবৃতির থেকে কেঁড়ে নিতে চায়?
— কি হলো? বলছেন না কেন আমার মেয়ে কোথায়?
— ওয়াফাকে দিয়ে আপনার কি কাজ সেটা জানতে পারি?
মাহিরা দাঁতে দাঁত চেপে ধরে, বলে,
— আমি ওয়াফার জন্মদাত্রী মা৷ আর সন্তানের কাছে মায়ের কি প্রয়োজন থাকতে পারে মিসেস…
— মিসেস আবৃতি চৌধুরী।
অপমানে ফুঁসতে থাকা মাহিরা গলায় হালকা কৌতুকের সুর তুলে বলল,

— ওহ হ্যাঁ আপনি তো আবার আমার এক্স হাসবেন্ডের দ্বিতীয় স্ত্রী। যদিও ঐক্য দ্বিতীয় বিয়ে করুক তাতে আই হেভ নো প্রভলেম। চাইলে আরো দুটো বিয়ে করতে পারে সেটা ওর ইচ্ছে। কিন্তু ও কোন সাহসে একটা বাইরের মেয়েকে আমার মেয়ের মাম্মাম বানিয়ে দিয়েছে। আমার মেয়ের এত দুর্দিন আসেনি যে সৎ মায়ের কাছে বড় হবে।
মাহিরার কথাগুলো তীরের ফলার মতো বুকে এসে বিঁধলআবৃতির। সৎ মা, দ্বিতীয় স্ত্রী এই বাক্য দুটো বিষবাক্যের ন্যায় কানে শোনাল। কথাগুলো তো সত্যি, তাহলে আবৃতির এত কষ্ট হচ্ছে কেন? আবৃতি দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। ওয়াফার উপর এই মহিলার কোন অধিকার নেই। ভেতরকার সব উদ্বেগ, কষ্টের ধামাচাপা দিয়ে, কন্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে আবৃতি শক্ত কন্ঠে বলল,
— প্রথমত ভদ্র ভাষায় কথা বলুন মিস মাহিরা। আপনার নিচু মন-মানসিকতার পরিচয় সব জায়গায় দিতে যাবেন না। আর দ্বিতীয়ত আমি ঐক্যের একমাত্র স্ত্রী আর ওয়াফার মা। আপনার ভাষ্যমতে সৎ মা৷ তাই সই, হ্যাঁ আমি সৎ মা ওয়াফার। আপন মা যদি আপনার মতো স্বার্থান্বেষী আর লোভী মা হয় তাহলে আমি সৎ মা হিসেবেই গর্বিত বোধ করব। অন্তত ওই নিষ্পাপ বাচ্চাটার শৈশব আমার কাছে নিরাপদ থাকবে। আর আপনার যদি নিজের বাচ্চার প্রতি বিন্দুমাত্র মায়া থাকতো তবে কি করে দুধের শিশুটাকে ছেড়ে যেতে পারলেন?
মাহিরা রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য বনে যায়। আবৃতির কথাগুলো যেন ওর কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতো জ্বলন ধরিয়ে দিয়েছে। ক্ষুদ্ধ গলায় কিড়মিড় করে বলে,

— আমি আমার সন্তানের সাথে যাই ইচ্ছে করব তাতে তোমার কি?
— ওহ প্লিজ মিস মাহিরা। বারবার ‘আমার সন্তান, আমার সন্তান’ ঝপ করা বন্ধ করুন। আচ্ছা আগে আমাকে একটা কথা বলুন, ওয়াফার সামনে আসলে ও আপনাকে ওর মা হিসেবে চিনতে পারবে?
আবৃতির এই প্রশ্নটাই যথেষ্ট ছিল মাহিরার ভোঁতা মুখটা থোঁতা করে দিতে৷ বহুকষ্টে দুটো কথা খুঁজে আবৃতির প্রশ্নের যোগ্য উত্তর দিতে পারলোনা। ওয়াফা যখন দু বছরের তখন ঐক্যকে ডিভোর্স দিয়ে সব ছেড়ে ছুড়ে চলে এসেছিল। চোখে ক্যারিয়ারের নেশা, অন্তরে সফলতার ক্ষুধায় নিজের ছোট্ট মেয়েটার চিন্তা একটুও উঁকি দেয়নি। আসলে নিজের ব্যস্ততার মধ্যে সময় হয়নি ওতটুকু বাচ্চার খোঁজ নেওয়ার। মাহিরার ভাবনার মধ্যেই আবৃতির কাটকাট গলা শোনা গেল,

— আগে একজন প্রকৃত মা হোন মাহিরা। কেবল জন্ম দিলেই মা হওয়া যায়না। একজন মাকে ত্যাগী হতে হয়। একটা পশু ও তো নিজের দুধের শিশুকে আগলে রাখে, অথচ আপনি? আফসোস আপনি এমন একজন মা যে নিজের সন্তানের দুধের তৃষ্ণাটুকু পর্যন্ত মেটাননি। বলতে বাধ্য হচ্ছি আপনি মা নামের কলংক!
মাহিরার মুখের রক্ত সরে যায়। ফোনের ওপাশে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে থমকে বসে রইল। মাহিরাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আবৃতি কাটকাট গলায় ফের বললো,
— রাখছি। আর কোনদিন কল না দিলে খুশি হবো।
কল কেটে আবৃতি ফোনটা হাতে নিয়ে দপ করে বেডে বসে পড়ে। ওর চোখদুটো টলটল করে নোনাজলে। এইতো মাত্র চারদিন হলো ও নতুন করে একটা সংসারের মতো সংসার পেল, এর মধ্যেই ওর সুখে কুনজর লেগে গেল! মাহিরার কথাগুলো এখনো কানে বেজে চলেছে। হঠাৎ করে আবৃতির মনে একটা অযাচিত আতঙ্ক হানা দেয়। শিউরে উঠে ঘোরের মাঝেই বিরবির করে বলে,

— ওয়াফা, ওয়াফা কোথায়?
সন্তান হারানোর শঙ্কায় উন্মত্ত আবৃতি পাগলপ্রায় হয়ে নিচে ছুটে যায়। এইতো কিছুদিন পূর্বে ভাগ্যের উত্থানে কুঁড়িয়ে পাওয়া সুখটুকু আঁচলে ধরে রাখতে উন্মাদের মতো ছুটে যায় নিচে। লনে আসতেই আবৃতির পায়ের তলার মাটি সরে যায়। নেই, কোথাও ওর পুতুল মেয়েটা নেই। সকালে আবৃতির পরিয়ে দেওয়া ফ্রকটা পরে এখানেই তুরতুর করে খেলছিল না? তাহলে এতটুকু সময়ের মধ্যে কোথাও গেল? ওই মাহিরা নিয়ে যায়নি তো? পেয়েও সব হারানোর শঙ্কায় আবৃতির বাহ্যিক জ্ঞান লোপ পেয়েছে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে উষ্ণ জলের ফোয়ারা। আবৃতির মধ্যে সেগুলো মোছার কোন তাগিদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিহ্বল ভীতু আবৃতি হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। ঠোঁট ভেঙে কেঁদে বলে,

— ওয়াফা, সোনা মা আমার। কোথাও তুমি? তুমি মাম্মামকে ছেড়ে কোথায় গিয়েছ?
হঠাৎ সূর্যের সোনালি রোদ্দুরের মতো খিলখিল হাসির শব্দ আবৃতির কানে বাড়ি খায়। চকিতে আবৃতি সেই শব্দের উৎসের খোঁজে চারদিকে তাকায়। ওর খোঁজার মাঝেই ফের কাঙ্ক্ষিত খিলখিলে হাসির ফোয়ারা আবৃতির কর্ণধারে এসে বাড়ি খায়। একটু পর আবৃতি বুঝতে পারে শব্দটা বাড়ির পেছন সাইড থেকে আসছে। আবৃতি রুদ্ধশ্বাসে ছুটে যায় অন্তরের তাড়নায়। বাড়ির পেছনে আসতেই ওর ব্যস্ত পদযুগল থমকে যায়। একটা ঠান্ডা শীতল বাতাসের পরশ নিমিষে ওর পীড়ায় জর্জরিত অন্তরকে শীতল করে দেয়। চৌধুরী ভিলার পেছনে একটা সুইমিং পুল আছে। যেটা এর আগে চক্ষুগোচর হয়নি আবৃতির। পুলে মাঝখানে ঐক্য দু’হাতে ওয়াফা, আরশানকে সাঁতার দেওয়া শেখাচ্ছে। বাচ্চাদুটো পানি ঝাপটে ঝাপটে খিলখিল করে হাসছে। আবৃতির চোখে এতক্ষণের সব বিষাদ উবে যায়, সেথায় ভর করে এক পশলা প্রশান্তি! দৃষ্টিতে থৈ থৈ আবেগের জোয়ার নিয়ে আবৃতি অধর জোড়া প্রসারিত করে হাসে। নিষ্পলক চেয়ে থাকে তার সুখগুলোর দিকে। হঠাৎ আরশানের চোখ যায় আবৃতির দিকে। স্ফূর্ত কন্ঠে চেঁচিয়ে বলে,
— মাম্মাম এদিকে এসো। দেখ পাপা আমাদের সুইমিং টেরেনিং দিচ্ছে।
— ট্রেনিং বাবা৷
— হ্যাঁ টেরেনিং৷
ওয়াফা মুখ চিপে হাসে। আবৃতি মুচকি হেসে ওদের কাছে এগিয়ে আসে। ঐক্য হাত দিয়ে ভেজা চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে বলে,
— মিসেস চৌধুরী সাঁতার জানেন?
আবৃতি ঘাড় নাড়ায়। ঐক্য ইঙ্গিতপূর্ণ চোখে তাকিয়ে বলে,
— আসুন না তাহলে আপনাকেও কোলে নিয়ে সাঁতার শেখাই।
সহসা আবৃতির মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। বিষম খেয়ে উঠে বেচারী। ঐক্যের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলে,
— লাগবেনা সাঁতার শেখানো। তাড়াতাড়ি ওদের নিয়ে পানি থেকে উঠুন। আমি টাওয়াল নিয়ে আসছি।

কয়েকদিন পর…….
আজ চৌধুরী ভিলা সেজে উঠেছে বাহারি আলোকসজ্জায়। কারণ আজ আহান, ঐশীর কাঙ্খিত পরিনয়ের দিন৷ সকাল থেকেই আবৃতির পা দুটো এক মিনিটের জন্য এক জায়গায় স্থির হয়নি। ঘরোয়াভাবে আকদ হলেও ব্যস্ততার কোন কমতি নেই। অতিথিদের আপ্যায়ন, বাচ্চাদের দেখাশোনা, রান্নাবান্নার তদারকি সব একা হাতে আবৃতিকেই সামলাতে হচ্ছে। ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে ঐক্য রান্না ঘরের দরজার সামনে একটা ব্যাগ রাখল। আবৃতি ওকে দেখে ব্যস্ত হয়ে চুলাটা লো ফ্লেমে রেখে এগিয়ে এল। স্বামীর ঘর্মাক্ত মুখটা দেখে ত্রস্ত চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিজের শাড়ির আঁচল টেনে মুখটা মুছিয়ে দিল। ঐক্য বদ্ধ নেত্রে মুচকি হাসে। আবৃতির এই ছোট ছোট যত্নগুলো ও খুব উপভোগ করে। এত মায়া মায়া এই যত্ন গুলো। এগুলোর লোভ ঐক্যে নিজেও ছাড়তে নারাজ। মুখটা মুছে আবৃতি ফ্রিজ থেকে কাঁচা আমের সরবত বের করে দিল।
ঐক্য সরবত খেতে খেতে বললো,
— বাজারে এত গরম? খেঁটে খাওয়া মানুষগুলো কি করে এত গরম সহ্য করে? সামান্য একটু বাজার করে আনতেই আমার জান বেরিয়ে গিয়েছে।
আবৃতি বাজারগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললো,

— ও আপনারা বুঝবেন না? এসির হাওয়ার নিচে কাজ করা মানুষ কি আর সূর্যের তাপের নিচে কাজ করা মানুষের কষ্টের মর্ম বুঝবে?
ঐক্য চারদিকে সাবধানী নজরে তাকায়। আশেপাশে কেউ নেই নিশ্চিত হতেই ঐক্য বিড়াল পায়ে একদম আবৃতির পেছনে দাঁড়ায়। আবৃতি মন দিয়ে বিফ স্টেক করছিল। খোঁপা থেকে কয়েকটা চুল বের হয়ে আবৃতির ঘর্মাক্ত ফর্সা মুখে লেপ্টে আছে। শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে দক্ষ গিন্নির মতো হাতা খুন্তি নাড়ছে। ঐক্য যে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি। ঐক্য বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে আবৃতির বৌয়ের মোমঢালা পেলব কপোলে চেয়ে রয়। ওর কানের কাছে ঠোঁট এগিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে
— মিসেস চৌধুরী কাজ করতে করতে আপনার মেজাজ বোধহয় হট হয়ে আছে। এক মিনিট রুমে আসবেন? আপনার হট মেজাজটা কুল কুল করে দেব৷
আবৃতির আপাদমস্তক শিরশিরিয়ে অনুভূতিতে ছেয়ে যায়। ও টের পেয়েছে লোকটা পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তবুও মানা করেনি। স্বামীর এমন আহ্লাদগুলো কোন মেয়ে ছাড়তে চাইবে? আবৃতি কি বোকা নাকি? ও নিজের জীবনে ভাগ্য করে পাওয়া সকল সুখ, আহ্লাদ, অনুভূতি মন ভরে আস্বাদন করবে। মনের ভাব আড়াল করে আবৃতি মেকি রাগান্বিত হওয়ার ভান ধরে বললো,

— যান তো আমার মেজাজ এমনিতেই ঠান্ডা। আপনাকে আর ঠান্ডা করতে হবেনা। আপনি বাচ্চা দুটোকে পারলে গোসল করিয়ে দিন৷
ঐক্য মুচকি হেসে বললো,
— আচ্ছা৷
— একদম বেশিক্ষণ পানিতে রাখবেন না ওদের। ওয়েদার চেইঞ্জ হচ্ছে। ঠান্ডা লেগে যাবে নাহয়।
ঐক্য টুপ করে আবৃতির গালে একটা চুমু খেয়ে বললো,
— যথা আজ্ঞা মহারাণী।
আবৃতি চোখ বড় বড় করে চারদিকে তাকায়। কুন্ঠায় নুইয়ে ঈষৎ রাগ দেখিয়ে বলে,
— দূর যান তো। কি শুরু করলেন।
ঐক্য মুচকি হাসে আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়।
— কই বৌমা তোমার হয়ে…
ঐক্য ছিটকে আবৃতির থেকে দূরে সরে দাঁড়ায়। কাকলি একটু অপ্রস্তুত হলেন। ইতস্ততভাবে বললেন,
— বলছিলাম তোমার রান্না কতদূর। একা একা পারছো তো মা?
আবৃতি যেন লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাবে। কাজে ব্যস্ততা দেখিয়ে মৃদুস্বরে বললো,
— এই তো মামনি। স্টেকটা হয়ে এসেছে। ফ্রাইড রাইস করব এবার।
— আচ্ছা তুমি ফ্রাইড রাইস বসিয়ে দাও। মামনি স্টেকটা দেখছি। রিমলা আর রেণু কোথায়?
— ওদের গোসলে পাঠিয়েছি। ভোর রাত থেকে দুজন রান্নাঘরে ছিল।
এই ফাঁকে ঐক্য সুড়সুড় করে কিচেন থেকে বের হয়ে গেল। এখানে থাকলে আজ আর রক্ষে নেই। বৌ তাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে।

বাচ্চাদের তৈরী করে আবৃতি নিজে তৈরী হতে শুরু করলো। আলমারী থেকে লাল জর্জেট শাড়িটা বের করে পড়তে শুরু করে। ঐশীর আকদ উপলক্ষে ঐক্য সবাইকে শপিং করে দিয়েছিল। আবৃতির জন্য পছন্দ করে এই রেড শাড়িটা কিনেছে। কিন্তু শাড়িটা এতটাই পিচ্ছিল যে পরতে রীতিমতো ফ্যাসাদে পড়তে হচ্ছে। হঠাৎ রুমের দরজায় কেউ নক করে। আবৃতি শাড়িটা কোনমতে শরীরে জড়িয়ে দরজা খুলে দেয়। ঐক্য আবৃতিকে আপাদমস্তক পরখ করে হেসে বলে,
— কি ব্যাপার বৌ, আপনার তৈরী হতে হতে তো ঐশীর বিয়েই শেষ হয়ে যাবে।
আবৃতি ঐক্যের দিকে একবার চোখ বুলায়। এজ ইউজুয়্যাল আপাদমস্তক ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ড্রেসআপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হোয়াইট শার্ট, তার উপর ব্ল্যাক ভেস্ট,ভেতরে ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট চেক টাই। উপরে ব্ল্যাক কোর্ট। আবৃতি মনে মনে স্বামীর রূপে মুগ্ধ না হয়ে পারলোনা। তথাপি রুমে ঢুকতে ঢুকতে বিরক্তির গলায় বললো,
— আমার রেডি হতে কখনো এত সময় লাগেনা আপনি ভাল করেই জানেন। সব দোষ আপনার কিনে দেওয়া এই শাড়ির। এতটাই পিছলা যে আমি পরতেই পারছিনা।
ঐক্য গলা ঝেড়ে বললো,

— আমি আছি কি করতে। এসো আমি হেল্প করছি।
আবৃতির মনঃপুত হলে প্রস্তাবটা।
— তাহলে কুঁচিটা ধরে দিন।
ঐক্য হাঁটু গেড়ে বসে আবৃতির কুঁচিগুলো বিন্যস্ত করে দেয়।
— দিন আমার হাতে দিন।
— না আমাকে করতে দাও।
বলে আবৃতিকে সম্পূর্ণ জমিয়ে কুঁচিগুলো ওর মসৃণ নির্মেদ কোমরে গুঁজে দেয়। আবৃতি শিহরণে কুঁকড়ে যায়। ঐক্য ইচ্ছে করেই একটু সময় নিয়ে কুঁচিগুলো কোমরে গুঁজে দেয়। এই ফাঁকে আবৃতির মরণ দশা। বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে ঐক্যের হাতটা খামচে ধরে বললো,
— হ..য়েছে আপনি উঠুন। বাকিটা আমিই পারব।
ঐক্য ঠোঁট কামড়ে হেসে উঠে দাঁড়ায়। আবৃতির শাড়ি পরা হলে ঐক্য কাভার্ডের দিকে এগিয়ে যায়। একটা বক্স বের করে ভ্যানিটির সামনে রাখে
আবৃতি কৌতুহলে তাকিয়ে দেখে। ঐক্য বক্সটা খুলতেই গাঢ় রেড কালারের একটা হিরের পেন্ডেট জ্বলজ্বল করছে। আবৃতি মুগ্ধ চোখে পেন্ডেটটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঐক্য মুচকি হেসে পেন্ডেটটা নিজের হাতে আবৃতির গলায় পরিয়ে দেয়। আবৃতি নিজের গলায় হাত ছুঁইয়ে শুধায়,

— এটা কখন নিয়েছেন?
— ঐশীর জন্য গিফট কিনতে গিয়েছিলাম বসুন্ধরার। তখন এরা চোখে পড়ে গেল। ভাবলাম তোমার শাড়ির সাথে ম্যাচিং হবে তাই কিনে ফেলেছি।
— এটার অনেক দাম না? কি দরকার ছিল এটার?
— বৌকে গিফট দিতে দরকার পড়েনা।
আবৃতি আনত মুখে মুচকি হাসে। মুখে বললেও স্বামীর এই উপহারে ও বেশ খুশি হয়েছে। ঐক্য হঠাৎ ওকে নিজের দিকে ফেরায়। হালকা মেকআপে সজ্জিত বৌয়ের আকর্ষণীয় আননে নির্নিমেষ চেয়ে মুগ্ধ স্বরে আওড়ায়,
— ইউ লুক লাইক আ ব্লোমিং রোজ মিসেস চৌধুরী।

দ্বিতীয় সূচনা পর্ব ৪২

আবৃতি লজ্জায় আইঢাই করে উঠে। ঐক্য চেয়ে থাকতে থাকতে চোখে ঘোর লেগে যায়। হঠাৎ করেই দখল করে নেয় আবৃতির কৃত্রিম রঙে রঞ্জিত ওষ্টযুগল! ঘটনার আকস্মিকতায় আবৃতি চমকে উঠে। শরীরে ঝাপটা দিয়ে যায় অল্প পুরনো স্পর্শের রেশ। তড়িৎ নিজেকে সামলে নিজেও আঁকড়ে ধরে ঐক্যের শার্টের কলার। বদ্ধনেত্রে নিজেও হারিয়ে যায় স্বামীর সাথে প্রমত্ত অধর সুধা পানে! ঐক্য হেঁচকা টানে আবৃতিকে আরেকটু কাছে টানে। আবৃতির প্রতিক্রিয়া ওকে আরো মাতাল করে তুলেছে। বুকে অদ্ভুত অনুভূতির ঝড় নিয়ে ঐক্যের হাত পৌঁছে গেল আবৃতির ব্লাউজের ফিতেয়।

দ্বিতীয় সূচনা পর্ব ৪৪