দ্বিতীয় সূচনা পর্ব ৪৪
আফসানা শোভা
আরশীতে নিজের প্রতিবিম্বের পানে স্থির পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঐশী। ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসির রেখা ফুটে আছে মেয়েটার। হালকা পলক ঝাপটে ঝাপটে নিজেকে দেখছে অনেকক্ষণ ধরে। আপাদমস্তক নীলে আচ্ছাদিত হালকা সাজে সজ্জিত বধূরূপ থেকে যেন নিজেরই চোখ সরছেনা। ঐশী মাথা নামিয়ে মুচকি হাসে। বুক জুড়ে চাপা উত্তেজনায় হাত পা থরথর করে কাঁপছে মেয়েটার। দীর্ঘ চারটা বছর আহানকে ও নিরলস ভালোবেসে গিয়েছে, কোনদিন ভাবেও নি যে তাকে নিজের করে আদোও পাবে কিনা। কিন্তু অবশেষে ওর ভালবাসাকে ও নিজের করে পাচ্ছে। এই অনুভূতি ব্যাখ্যাতীত!
— কই ঐশী হলো তোমার? আমার ভাই এসে তো বসে রয়েছে বৌয়ের অপেক্ষায়।
রুমে চেঁচিয়ে বলতে বলতে ঢুকলো আবৃতি। কিন্তু বধূ সাজে ঐশীকে দেখে থমকাতে বাধ্য হলো আবৃতির ব্যস্ত পদযুগল। মুগ্ধ চোখে ঐশীর আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে বলে উঠে,
— ওয়াও কও সুন্দর দেখাচ্ছে গো তোমায়।
ঐশী মাথা নামিয়ে মৃদু হাসে। আবৃতি উত্তেজিত কন্ঠে বলে
— জানো আহান ও না..
পুরো বাক্যটা সম্পন্ন না করেই মাঝপথে থেমে যায় আবৃতি। মনে মনে ভাবে,
— না থাক, বলার দরকার নেই। দু’জন দু’জনকে দেখে সারপ্রাইজ হবে খুব।
আবৃতির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ঐশী। ভাবি কি বলবে বলে আর পুরো কথাটা বললোনা। আবৃতি মুচকি হেসে ঐশীর কাঁধ আঁকড়ে বললো,
— চলো তোমার দুলেরাজা অপেক্ষা করে আছে।
আবৃতি আর ঐশীর ফ্রেন্ডরা মিলে ঐশীকে নিয়ে বাড়ির লনে আসলো। ওদের বিয়ের স্টেইজটা লনেই করেছে ঐক্য। খোলা মেঘলা আকাশের নিচে অধীর অপেক্ষারত আহান। শীতল সমীরণেও ও মৃদু ঘামছে চাপা উত্তেজনায়। প্রতিটা কপোত-কপোতী বোধহয় এই দিনে এক বুক উত্তেজনা পুষে রাখে নিজেদের সঙ্গীনিকে বিয়ের সাজে দেখতে।৷ হঠাৎ বিয়ের অতিথিদের গুঞ্জন কানে এসে বাড়ি খায় আহানের,
— ওইতো বৌ আসছে।
চটক কাঁটার ন্যায় সামনে তাকায় আহান। তাকাতেই সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে যায় ওর গোটা স্বত্তা। ঐ সময়টায় ঐশীও মাথা তুলে তাকাল। সাদা শেরওয়ানী উপরে নীল শেরোয়ানি কটিতে আবৃত আহানকে দেখেই থমকে দাঁড়িয়ে রইল দুপল। আহানের দু’নয়নে অপার মুগ্ধতা উপচে পড়ছে। একে অপরের সাথে নীরব দৃষ্টি বিনিময় হতেই দু’জনেই চমকে যায়। কারণ দু’জনই আজ তাদের বিশেষ দিনে দু’জনকে সারপ্রাইজ দিতে নীল রঙ গায়ে জড়িয়েছিল। কয়েক সেকেন্ড নিষ্পলক দৃষ্টি বিনিময় হলো দু’জনের। দুজন দৃষ্টিতেই যেন ব্যক্ত করছে না বলা হাজারো কথা। ঘোরের মাঝেই ঐশী স্টেইজের কাছাকাছি আসল। ওর ঘোর কাটে সামনে একটা হাতের উপস্থিতিতে। ঐশী ঘোলাটে চোখ উঁচিতে দেখে ভীষণরকম সুদর্শন ডক্টর আহান খন্দকার ওর দিকে মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে রেখেছে। ঐশী দুরুদুরু চিত্তে আহানের হাতে নিজের হাত বাড়িয়ে দেয়। আহান ওর হাতটা আঁকড়ে স্টেইজে উঠতে সাহায্য করে। ফটোগ্রাফার ওদের নানা যুগল ছবি ক্যামেরাবন্দী করলো। যদিও দুজনের ক্যারিয়ার এস্টাবলিশ হলে মহা ধুমধামে আয়োজন করে আবার বিয়ে হবে। কিন্তু প্রথম অনুভূতি সর্বদা আমাদের হৃদয়ে গেঁথে রয়। ফটোগ্রাফার ছবি তুলতে বারবার আহানকে ক্যামেরার দিকে ফোকাস করতে নির্দেশনা দিচ্ছে। কিন্তু আহান চেয়েও নিজের চোখদুটো ঐশীর উপর থেকে হটাতে পারছেনা। মেয়েটা যেন ওর চোখদুটো চুম্বকের মতো টেনে নিজের সজ্জিত পেলব আননে স্থির করে রাখছে। ফটোসেশন শেষে কাজি বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন। যথারীতি বিয়ের সকল রীতি নিয়ম পালন করে সারাজীবন একটা পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হলো আহান ঐশী।
নিজের বাসর নিয়ে অনেক ফ্যান্টাসি থাকলেও বাস্তবে যখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ সত্যিই হলো তখন এসির ভেতরেও টেনশনে রীতিমতো হাত পা ঘামছে ঐশীর। ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে শরীরটা। চোখ ঘুরিয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখল আহানের রুমটা। যেটাতে আজ থেকে ওর নিজেরও অংশীদারত্ব রয়েছে। বেশ ছিমছাম আর পরিপাটি রুমটা। কোথাও একটু বিশৃঙ্খলা বা অগোছালো ভাব নেই। চারদিকে রুচিশীলতার মৃদু প্রলেপ। অথচ ঐশীর রুমটা এত এলোমেলো থাকে যে আহানের রুমটা দেখে লজ্জিত অনুভব হচ্ছে। যদিও ভাবি আসার পর এত এলোমেলো ভাল লক্ষ্য করা যায়না। সে নিয়ম করে গুছিয়ে দিয়ে যায় অগোছালো কক্ষটা। হঠাৎ খট করে দরজা খোলার আওয়াজ হলো। ঐশী খানিক চমকে গেলেও গাঁট হয়ে বসে রইল। ঠোঁট নাড়িয়ে আপনমনেই
বিড়বিড়ায়,
— কুল ডাউন ঐশী। কুল ডাউন। তোর প্রিন্স চার্মিং তোর জামাই হয়ে গিয়েছে। এভরিথিং ইজ ওকে।
আহান দরজা আটকে রুমে ঢুকে বিছানায় জড়োসড়ো ভাবে বসে থাকা ঐশীকে দেখল। গলার স্বর স্বাভাবিক রেখেই বললো,
— তুমি এখনো চেইঞ্জ করোনি।
যেন দুজন এর আগেও একসাথে থেকেছে, এমন স্বাভাবিক গলা আহানের। ঐশী কি বলবে ভেবে পেল না। চোখের কোণা তুলে দেখল আহান আলমারি খুলে কিছু একটা বের করছে।
— নাও চেইঞ্জ করে শাড়িটা পরে নাও৷
ঐশী তাকিয়ে দেখে আহান বিছানায় একটা জাম রঙা সুতির শাড়ি রেখেছে। সাথে ঐশীর প্রয়োজনীয় ব্লাউজ, পেটিকোট আর প্রয়োজনীয় ছোট পোশাকটিও আছে। ঐশী সলজ্জে কাপড়গুলো হাতে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। আহান এই ফাঁকে নিজেও শেরোয়ানি পাল্টে নিল।
খট করে দরজা খোলার আওয়াজে আহান সপ্রতিভ হয়ে সেদিকে তাকাল। ঐশী একেবারে গোসল সেরেই বের হয়েছে। হালকা জাম রঙা শাড়িটায় কি দারুণ মানিয়েছে শ্যামলা মিষ্টি চেহারার মেয়েটাকে। প্রসাধনী বিহীন ভেজা মুখটা আরো স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে।
আহান সম্মোহনের মতো তাকিয়ে রইল। ঘোর কাটল ঐশীর প্রশ্নে,
— এসিটা কখন লাগিয়েছেন?
আহানের ধ্যান কাটে। ঐশী লজ্জায় আর কোন প্রশ্ন খুঁজে পায়নি। তাই যাই মাথায় এসেছে করে ফেলেছে। আহান ধাতস্থ হয়ে মৃদু স্বরে বলে,
— এইতো মাত্র কিছুদিন হলো।
— আপনার এত টাকা খরচা করে এসি ফিট করার কোন দরকারই ছিল না। আমি মানিয়ে নিতাম।
— একটা এসি ফিট করতে আহামরি খরচ হয়না ঐশী। আমার বৌ আমার ঘরে এসে কষ্টে থাকবে, এটা আমার কাছে খুবই হতাশার বিষয়৷
ঐশী মুগ্ধ চোখে নিজের জীবনসঙ্গিনীকে দেখে। যে কিনা তার ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র বিষয়গুলোতেও নজরে রেখেছে নিজের। আহান বিছানা থেকে ফুলের পাপড়িগুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বললো,
— এসো ঘুমিয়ে পড়ি।
ঐশী সচকিত হয়। আহান শেরওয়ানি পাল্টে টিশার্ট -টাউজার পরে নিয়েছে। ঐশী তোয়ালেটা বারান্দায় মেলে দিয়ে ইতস্ততভাবে বিছানায় বসলো। মনটা ধুকপুক ধুকপুক করছে। আজ কি ওদের বাসর হবেনা? পরক্ষণেই এই চূড়ান্ত অশ্লীল চিন্তাটায় নিজেই লজ্জায় লাল হলো মনে মনে। ছিঃ ছিঃ ও এসব কি ভাবছে? ওর ভাবনার মাঝেই আহান আলমারি খুলে একটা খামবের করলো। তারপর সেটা ঐশীর দিকে বাড়িয়ে ধরে। ঐশী অবুঝ চোখে তাকালে আহান গলা ঝেড়ে বলে,
— তোমার দেনমোহর পরিশোধ করে দিলাম। এন্ড থ্যাংক ইউ ঐশী। আমার সাধ্য অনুযায়ী দেনমোহর ধার্য করার জন্য।
ঐশী সলজ্জে মুচকি হাসল। ওর দেনমোহর মাত্র আড়াই লাখ টাকা রাখতে বলেছিল ঐক্যকে। যেন ওর স্বামীর ওর হক মেটাতে বিড়ম্বনায় না পড়তে হয়। ঐশী খামটা হাতে নিয়ে ফের আলমারিতে রেখে দিল। আহান হঠাৎ বলে উঠল,
— ঐশী, পরীক্ষার আগের সপ্তাহে ভাইয়া তোমায় ও বাড়ি নিয়ে যাবেন বলেছেন।
— হুম৷
আহান আবার ইতস্ততভাবে বলে,
— আমার মনে হয়৷ তোমার এই বাড়িতে থাকলেই ভাল হবে। না মানে আমি তোমার পড়াশোনায় হেল্প করতে পারতাম।
ঐশী মিনমিন স্বরে বললো,
— কিন্তু ভাইয়া তো সেটা এলাউ করবে না। এমনিতেই এখনি এই বাড়িতে পাঠাতে চায়নি ভাইয়া। ভাবি জোর করায়….
— তারমানে তুমিও তোমার স্বামীর বাড়িতে আসতে চাওনি?
আহান মুখটা করে বললো। ঐশী ব্যস্ত গলায় বললো,
— না না। আপনি আমায় ভুল বুঝছেন আহান। আমি আপনার সাথেই থাকতে চাই বিশ্বাস করুন৷
— কিভাবে বিশ্বাস করব, তুমি সে চলেই যাবে আর পাঁচ,ছয়দিন পর।
— আমি কি করব বলুন? আ’ম হেল্পলেস।
অসহায় শোনায় ঐশীর কন্ঠ। আহানের হাসি পেলেও মুখটা গম্ভীর বানিয়ে রাখে। ঐশী এবার আহানের কাছে এগিয়ে এলো। ভয়ে ভয়ে ওর বুকে মাথা রেখে নিচু কন্ঠে বললো,
— আপনি কি জানেন, এই আপনার হতে আমাকে কতটা সাধনা করতে হয়েছে?
ঐশীর হঠাৎ কান্ডে এবং কথায় আহানের বুকের ভেতরটা চনমনে করে উঠে। উতলে উঠা ভীষণ আবেগে হাত দুটো তুলে মেয়েটাকে জড়িয়ে নেয় নিজের সাথে। ফিসফিস করে বলে,
— জানি তো।
ঐশী নাক টেনে শুধায়,
— তাহলে এসব বলছেন কেন?
— আমি তো মজা করছিলাম পাগলি।
ঐশী ওর বুক থেকে মাথা তুলে সরু চোখে তাকয়,
— আপনি এতো পাজি হলেন কবে আহান?
আহান ওর ফুলে উড়া নাকটা টেনে বললো,
— তোমার থেকে শিখেছি।
আহানের কথা শুনে ঐশী কিশোরীদের মতো খিলখিল করে হেসে উঠে। রাতের নিস্তব্ধতায় সেই হাসি নুপুরের মতো ঝংকার তুললো আহানের রুমের দেয়ালে দেয়ালে। আহানের চশমায় ঢাকা চোখ দুটোয় ভাসছে মুগ্ধতা। হঠাৎ করেই ঐশীকে বিহ্বলিত করে আঁকড়ে ধরে ওর হাসতে থাকা ফিনফিনে অধর জোড়া। ঐশী চমকায়, থমকায়। কিছুক্ষণ লেগে যায় এই বিহ্বলতার তোড় সামলাতে। যখন বুঝতে পারে কি হচ্ছে তখন নিজেও হাতের মুঠোয় আঁকড়ে নেয় আহানের বুকের টিশার্টের অংশ। পরম আবেশে চোখ বুজে নিজেও তাল মেলায় স্বামী নামক প্রেমিক পুরুষের সাথে। অশান্ত হৃদয়ের স্পন্দনের তালে তালে ওরা হারিয়ে যায় ভালবাসা বহিঃপ্রকাশের অতলান্তে। ওদের অনুভূতিকে আরো উষ্কে দিতে বাইরে হঠাৎ করে শুরু হলো বর্ষণ। প্রেমময় বর্ষণের সেই রাতে ঐশীর নাজুক নারী কায়ায় ছাপ বসে যায় আহানের করা বিধ্বংসী আদরের লালিমা। আহানের প্রগাঢ় স্পর্শ আর আদরে আদরে মেয়েটা নুয়ে যায় বর্ষার সিক্ত কদম ফুলের মতো।
রাত প্রায় তিনটা। নিস্তব্ধ রুমটিতে বাচ্চার তীব্র কান্নার আওয়াজে কানে তালা লাগার জোগাড়। ক্ষুধার জ্বালায় অতিষ্ট মাত্র দু’মাসের নবজাতকটি গলা ফাটিয়ে কাঁদছে। পাশে শায়িত তার মা জননী নির্লিপ্ত স্থির দৃষ্টিতে সিলিংয়ের পানে চেয়ে আছে। নিজের সন্তানটির এমন করুণ কান্নায়ও তার ভাবাবেগ হচ্ছেনা। যেন শিশুটির এমন হৃদয়বিদারক কান্না তার কর্ণধার স্পর্শই করছেনা। সে হারিয়ে কোন ভাবনার অতলান্তে।
বাচ্চাটা একসময় কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে মুখে আঙুল চুসতে চুসতে ঘুমিয়ে গেল। এই হতভাগা বাচ্চাটি প্রয়াত ধ্রুব ওয়াহিদের। এক ঘৃণ্য পিতার-মাতার সন্তান হওয়ার দুর্ভোগই বোধকরি নিষ্পাপ বাচ্চাটিকে পোহাতে হচ্ছে। পুরো বাসায় কেবল ইরা আর ওর শাশুড়ী। দীপ্ত আর সোনিয়া বিকেলেই সোনিয়াদের বাসায় গিয়েছে অসুস্থ মাকে দেখে আসতে।
ধ্রুবর অকস্মাৎ মৃত্যুর পর অস্থিতিশীল ইরাকে ওর মা বাবা নিজের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। পুরো এক মাস ইরা বদ্ধউন্মাদের মতো আচরণ করেছিল। ডাক্তার জানিয়েছেন ইরা ভীষণ মেন্টালি ট্রমা পেয়েছে। ওর স্বাভাবিক হওয়ার চান্স খুবই ক্ষীণ। এটা সম্পূর্ণ রোগীর শরীরের উপর ডিপেন্ডেড। রোগী যদি নিজের মনোবলে না সুস্থ হয়, তাহলে কোন মেডিসিন দ্বারা সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নিরূপায় ইরার বাবা-মা নবজাতক বাচ্চাটাকে নিজেদের আর আয়ার তত্ত্বাবধানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছিলেন। কারণ ইরা মানসিকভাবে এতটাই অপ্রকৃতস্থ ছিল যে বাচ্চাটাকেও দু চোখে দেখতে পারতোনা। কাছে নিলেই আঘাতের চেষ্টা করতো।
ইরার মা বাবা পুরো আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ওনাদের পুরোপুরি অবাক করে দিয়ে একদিন ইরা নিজে দেখে একদম স্বাভাবিক মানুষের মতো কথা বলতে শুরু করে। নিজের দুমাসের মেয়েকে নিজ উদ্যোগে কোলে নিয়ে আদর করে, স্তন্যপান করায়। পাগলপ্রায় ইরার বাবামা সাথে সাথে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। ডাক্তার জানায় ইরার মানসিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, উদ্বেগের কোন কারণ নেই। হয়তো ধীরে ধীরে ইরা একদম স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। একমাত্র আদরের কন্যার সুস্থতার আশ্বাসবাণী শুনে তাদের বুক থেকে বিশাল ওজনের পাথর সরে যায়। কিন্তু স্থিতিশীল হলেও ইরা সম্পূর্ণ নিশ্চুপ বনে যায়। সারাদিন মুখ ফুটে একটা বাক্য ও ওর মুখ থেকে নিঃসৃত হয়না। সারদিন কেমন ফ্যালফ্যাল করে ছাদের দিকে চেয়ে গভীর ভাবনায় বিভোর থাকবে। নয়তো বাচ্চাটার মুখে চেয়ে থাকতো এক দৃষ্টিতে। ওর মেয়ের একটা সুন্দর নাম রেখেছে ওর চাচা। ইরার নামের সাথে মিলিয়ে ইনায়া ওয়াহিদ। কিন্তু নামটা কেন যেন ইরার পছন্দ হলোনা।
ও নিজে আরেকটা নাম ঠিক করলো মেয়ের জন্য। ধারা! সব মোটামুটি ভালো চলছিল। এর একদিন ইরা হঠাৎ করেই জানায় সে তার স্বামীর বাড়ি ফিরতে চায় ধারাকে নিয়ে। ইরার মা শুনে সাথে সাথে নাকচ করে দেন। কারণটা ইরার শাশুড়ী। মহিলা ছেলের মৃত্যু শোকে পাগল বনে গিয়েছেন। ছেলের অকাল মৃত্যুর জন্য সারাক্ষণ ইরাকে দোষারোপ করে সাপ শাপান্ত করতে থাকেন। ওমন অসুস্থ পরিবেশে ইরার আরো অসুস্থ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় ইরার মা মেয়েকে কিছুতেই পাঠাবেন না। কিন্তু ইরাও নাছোড়বান্দা। সে যাবেই যাবে। না যেতে দিলে পালিয়ে হলেও যাবে। শেষমেশ ইরার বাবার পরামর্শে উনি রাজি হোন। এই তো ধ্রুবর মৃত্যপুরির মতো ফ্ল্যাটটায় ইরার আজ চৌদ্দদিন। ইরার শাশুড়ী আচরণ একদম ঠান্ডা। আগের মতো রুষ্ট আচরণ না করলেও ইরার সাথে তার বিশেষ কথাবার্তা হয়না। সোনিয়া খুব খুশিমনে ধারাকে আগলে রাখতে শুরু করে। একটা অজ্ঞাত কারণে ও কনসিভ করতে পারছেনা। সন্তান কাম্য সোনিয়া তাই ধারাকে নিজ সন্তানের মতোই মাতৃস্নেহে আগলে রাখে। কিন্তু আজ তার অনুপস্থিতিতে বাচ্চাটা না খেয়েই ঘুমিয়ে গেল। সোনিয়া থাকলে বাচ্চাটাকে অন্তত না খেয়ে অসহায় হয়ে ঘুমাতে হতোনা৷ ধারার কান্নার শব্দে ঠিকই উঠে এসে ফর্মুলা মিল্ক খাওয়াতো।
ইরা হঠাৎ বেড থেকে উঠে বসে। রুমের দেয়ালে ধ্রুবর টাঙ্গানো ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তারপর পা টেনে আলমারী খুলে ধ্রুবর পছন্দের রঙের একটা শাড়ি বের করে পড়ে নেয়। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মন ভরে সাজে। সাজগোজ শেষ হতেই আয়নায় নিজের কংকালসার অবয়বের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ অট্টহাসি দিয়ে উঠে। ওর অট্টহাসির শব্দে সদ্য নিদ্রায় আচ্ছন্ন হওয়া ধারা চমকে উঠে ভয়ে চেঁচিয়ে কান্না শুরু করে। কিন্তু ইরা সম্পূর্ণ ভ্রুক্ষেপহীন। বাচ্চাদের চেঁচিয়ে কান্নায়ও কেউ আসলোনা। কিভাবে আসবে ইরার শাশুড়ী ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমাচ্ছেন। ইরা কতক্ষণ অপ্রকৃতস্থের মতো নিরন্তর হেসে হঠাৎ থেমে গেল। তারপর রোবটের মতো রিডিং টেবিলটার সামনের চেয়ারটা নিয়ে বিছানায় রেখে সেই চেয়ারের উপর উঠে দাঁড়ালো। হাতের ওরনাটা ফ্যানের সাথে শক্ত করে বেঁধে গলায় বেঁড়ি বাঁধলো। একবার দেয়ালে টাঙ্গানো ধ্রুবর হাসোজ্জল ছবিটায় তাকিয়ে মৃদু হেসে ভীষণ ঠান্ডা গলায় ফিসফিসিয়ে বললো,
দ্বিতীয় সূচনা পর্ব ৪৩
— আমি আসছি ধ্রুব। আমি আসছি। তোমাকে আর একা থাকতে হবেনা। আসছি আমি।
আর তারপর চোখের পলকে চেয়ারটা পায়ের নিচ থেকে সরে গেল। শূণ্যে কতক্ষণ ইরার শরীরটা ঝুলে পা দাপাদাপি করলো। অতঃপর ইরার পা দুটো সম্পূর্ণ স্থির। জিভ বেরিয়ে চোখদুটো প্রকট ভাবে খুলে আছে। ধারা তখনো কেঁদে চলেছে গলা ফাঁটিয়ে। ওর কান্নার শব্দে ওর মা জননী এবারও ভ্রুক্ষেপ করলোনা!
