Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১০

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১০

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১০
সিমরান মিমি

হস্পিটালের দোতলায় ছোটোখাটো একটা শোরগোল। বেশকিছু সাধারণ লোক এবং সাংবাদিক কেবিনে ঢোকার জন্য মুখিয়ে আছে। কিন্তু ডাক্তার এবং রোগীর কড়া নির্দেশে তা পারছে না। রোগী বলতে বর্তমানে এখানে ভর্তি আছে তিন জন। রাতেই মারামারি করে এডমিট হয়েছে। তবে দেখে বোঝা যাচ্ছে দল আলাদা। ষোলো – সতেরো বছরের একজন কিশোর ছেলে কাত হয়ে শুয়ে আছে। তার এক পা উঁচু করে ঝোলানো৷ পুরু ব্যান্ডেজ তাতে। দেখে বোঝাই যাচ্ছে পা টা ভেঙে ফেলেছে দুষ্কৃতিকারীরা। তার পাশে লাল রঙের শাড়ি পড়ে বসে আছেন এক ভদ্রমহিলা। সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর। খানিকক্ষণ বিরতি দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ছেলের। সেদিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো সোভাম। মা কে মনে পড়ছে ভীষণ। এই মুহুর্তে সে পাশে থাকলে এতোটা একা মনে হতো না। এই যন্ত্রণা গুলোও অনুভব হতো না।

সোভামের ডান হাতে পুরু ব্যান্ডেজ করে গলার সাথে ঝুলিয়ে দিয়েছে ডক্টর। ভাঙে নি, তবে হাড় ফেটেছে। স্টিকের আঘাতে কনুই এর নিচের অংশের মোটা হাড় তিন জায়গা দিয়ে ফেটে গেছে। এছাড়া কপালের ডানপাশে এবং পায়েও ভীষণ ভাবে আঘাত পেয়েছে। বিশেষ করে প্রবীণ কে বাঁচাতে গিয়ে এমন হাল হয়েছে। এতো গুলো সন্ত্রাসীর সাথে পেরে ওঠেনি সোভাম। তবে একা মার খাওয়ার পাত্রও সে নয়। যখন বুঝলো এরা থামার নয়, তখন নিজেও হয়ে উঠেছিলো বেপরোয়া। সবাই কে না পারলেও সুজনের মাথা ফাটিয়েছে। ভাগ্য অতি সু প্রসন্ন থাকায় তৎক্ষণাৎ পুলিশ হাজির হয়েছিল সেখানে। নাহয় তারা আট জন মিলে কেটে ভাগ করে রাস্তায় ফেলে রাখলেও বাঁধা দেওয়ার মতো কেউ ছিলো না।

মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই অতি প্রিয় জায়গাটার প্রতি টান হারিয়ে ফেলছে সোভাম। এখানকার নিশ্চুপ সাধারণ মানুষ, ভয়ংকর রাজনৈতিক কৌশল, পথভ্রষ্ট যুবক সমাজ, নেশার অবাধ প্রচলণ সবকিছু তিক্ততার সৃষ্টি করছে। এখন মনে হচ্ছে মা এই জায়গা থেকে তাদের দূরে সরিয়ে মন্দ করেনি। এখানকার আইনব্যবস্থা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ জন ও পঙ্গু। গোটা পিরোজপুর শাসন করছে সরদার এবং শিকদার পরিবার। দু দলের দু রকমের শাসন, মতের অমিল। যার পরিনাম এক দল কর্তৃক অন্যদলের রক্তক্ষরণ।
স্পর্শী ফোন দিচ্ছে বারংবার। কয়েকবার কেটে দেওয়ার পরেও ক্ষান্ত হচ্ছে না। বরং সে যেনো ফোন কাটাতে আরো ক্ষেপে গেছে। সোভাম নিজের অসুস্থতা প্রকাশ করতে চায় না মা – বোন কে। এমন হলে আজই তারা এসে নিয়ে যাবে। সদ্য শুরু হওয়া চাকরিটার দিকেও চাইবে না। এদিকে স্পর্শীয়া এখন ভিডিও কল দেওয়া শুরু করেছে। কি মুছিবত! বাধ্য হয়ে মুখের সামনে এনে রিসিভড করলো সোভাম। হাতের ব্যান্ডেজ না দেখানোর প্রয়াস করলেও, তার কপালে যে আঘাত রয়েছে সেটা বেমালুম ভুলেই বসলো। আঁতকে উঠলো স্পর্শী। চিৎকার করে বললো,

– একি! তোর কপালে কি হয়েছে?
স্পর্শীর চিৎকারে বুক টা কেপে উঠলো সোভামের। ঘাবড়ে গিয়ে ফেলে দিলো ফোন। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো তার
ব্যান্ডেজ যুক্ত হাত। ভাইয়ের এমন করুন দশা দেখে স্পর্শী পাগল প্রায়। কেঁদে দিলো সাথে সাথে।
– তোর হাত ভেঙেছে? কপালেও ব্যান্ডেজ। এসব কিভাবে হলো? আমাকে বলিস নি কেনো?
কপালে হাত দিয়ে নিজের বোকামোতে বিরক্ত হলো সোভাম। আসল ঘটনা চেপে অনুরোধের সুরে বলে উঠলো,
– আস্তে চেঁচা। মাকে প্লিজ বলিস না। আমি একটু এক্সিডেন্ট করেছি। আঘাত খুব গভীর না। এই ডাক্তার টা শুধু শুধু কতখানি ব্যান্ডেজ পেঁচিয়েছে। সেরে যাবে, শান্ত হ।
স্পর্শী কাঁদলো। বুকের ভেতরটাতে ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে। একা একা সেই কতদুরে থাকে। অপরিচিত জায়গায় এভাবে হাত ভেঙে হস্পিটালে থাকলে কেইবা সেবাযত্ন করবে? না জানি কবে এক্সিডেন্ট হয়েছে! কি খেয়েছে, কিভাবে থেকেছে সে বিষয়ে কিচ্ছু জানে না তারা।
– ঠিক আছে। মাকে কিচ্ছু বলবো না। তুই তোর ঠিকানা বল, আমি আসবো ওখানে।
নাক টেনে চোখের পানি মুছতে মুছতে কথাটি বললো স্পর্শী। তার কথাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে সোভাম উচ্চস্বরে বলে উঠলো,

– না! এখানে কোথায় আসবি? কেনোই বা আসবি। আমি ঠিক আছি। পাগলামি করবি না চড়ুই।
শক্ত চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো স্পর্শী। সোভাম অসুস্থ শুনে এই যে তার এতোটা কষ্ট হচ্ছে, সেটা কি সে বোঝে না? তাও কতটা বিরক্তির ধমক দিলো। কিন্তু এটা কি স্পর্শীয়া মানবে? মোটেও না। সে তার সিদ্ধান্তে অটল। ভাই যেহেতু অসুস্থ, সেহেতু সে পিরোজপুরে যাবে, সেবা করবে, সুস্থ করবে। এরপর ঢাকায় ফিরবে। ব্যাস!
কিন্তু এসবের জন্য প্রয়োজন ঠিকানা। সে তো কিছুই জানে না। বললো,
– ঠিক আছে। তোর ঠিকানা বলতে হবে না। আমি বরং মাকে জানাই। তারপর দুজনে মিলে আসি।
কটমট করে তাকালো সোভাম। বললো,
– তুই একটা অসহ্যকর, চড়ুই। এভাবে বিনা কারনে লাফাতে লাফাতে কেনো আসবি এখানে? কি দরকার তোর? বললাম তো আমি সামলে নেবো।
– মায়ের সাথে কথা বলবি? দাঁড়া দিচ্ছি।
সোভাম হতাশ হলো।
-মেসেজে দিচ্ছি। তবে সাবধান, মা যেনো জানে না।
স্পর্শী আর কিঞ্চিৎ সময় ও ব্যয় করলো না। বান্ধবির বিয়ে, সেখানে যেতে হবে, থাকতে হবে বলে টানা আধ ঘন্টা বোঝালো। এরপরেও যখন পিপাসা মানলো না তখন অনন্দা কে দিয়ে মিথ্যে পর্যন্ত বলালো। মেয়ের বান্ধবীদের কথা ফেলতে পারলেন না পিপাসা। শেষমেশ অনুমতি দিলো দু দিনের জন্য।

রাত তখন আটটা একচল্লিশ। স্পর্শী দাঁড়িয়ে আছে পিরোজপুর সরকারি হাসপাতালের সামনে। সারাদিনের জার্নিতে বড্ড ক্লান্ত সে। সাভার থেকে রওনা দিয়েছিলো ঠিক দুপুর দুইটায়। প্রায় সাত ঘন্টা লেগেছে আসতে আসতে। অবশ্য ঢাকা থেকে পিরোজপুরে আসতে পাঁচ ঘন্টার বেশি লাগে না। কিন্তু সাভার থেকে বেরোনোই যে মুশকিল। পৃথিবীর কোথাও হয়তো এতোটা জ্যাম নেই।
পথিমধ্যে দু বার ফোন করেছিলো সোভাম। কত দূর এসেছে, ঠিক আছে কি-না, এসব ভেবে চিন্তিত সে। তখনই কেবিন নম্বর টা জেনে নিয়েছিলো স্পর্শীয়া। তাই আর ফোন না দিয়েই উঠে গেলো দোতলায়। একদম বারান্দার পাশের কেবিন টা সোভামের। নাম্বার অনুযায়ী সেদিকে এগোতেই পা থেমে গেলো। হৃৎপিন্ড টা খামছে ধরলে আকস্মিকভাবে। কেবিনের ভেতর থেকে বাইরে লোকজন উপচে পড়ছে। কিন্তু কেনো এই ভিড়? স্পর্শী বুঝে উঠতে পারলো না। তার ভাই দিব্যি ঠিক আছে। মনে মনে একথা ভেবে শক্ত হয়ে পা বাড়ালো।
অসহ্য যন্ত্রণা! এতো মানুষ কেনো ভিড় করবে হস্পিটালে? তাও কোনো রোগীর কেবিনে। ভেতরে ঢোকার সামান্যও জায়গা নেই। স্পর্শী বিরক্ত হয়ে দুজনকে বললো,

– একটু সরুন তো ভাই, ভেতরে যাবো।
যুবক দুটো পিছু তাকিয়ে স্পর্শীকে দেখলো। কোনো প্রকার পাত্তা না দিয়ে বললো,
– এখন না, পরে আসেন। এমপি সাহেব ভেতরে আছে।
এমপি সাহেব! তার মানে আন্দাজ টা ঠিকই ছিলো স্পর্শীর। এদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনো রাজনৈতিক দলের লোকজন। কমপক্ষে বিশ- পঁচিশ জন লোক আছে কেবিনের ভেতরে এবং বাইরে। বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হস্পিটালের আনাচে কানাচে। কিন্তু এমপি সাহেব এখানে কেনো আসতে যাবে? তার আত্মীয়- স্বজন ভর্তি আছে হয়তো। কিন্তু তাই বলে এতো লোক আনবে? তাও না হয় আনুক। পঞ্চাশ জন না এনে সে পাঁচশো জন আনুক। কিন্তু তার জন্য স্পর্শীয়া এখানে বসে অপেক্ষা করবে? এতো দূর থেকে এসে অসুস্থ ভাইকে না দেখে বসে বসে এই জ্ঞানহীন লোকেদের যাওয়ার অপেক্ষা করবে? মোটেও না।
স্পর্শী আরো একবার ভদ্রভাবে ছেলে দুটোকে ডাকলো। বললো,
– দেখুন ভাইয়া, আমাকে যেতে দিন। ভেতরে আমার অসুস্থ ভাই আছে।
এবারে রেগে গেলেন তারা। ধমক মেরে বললেন,
– কথা কানে যায় না? বললাম তো ভেতরে এমপি সাহেব আছে। আর কই যাবেন আপনি? জায়গা আছে ভেতরে ঢোকার?

লোকটার চিৎকারে হতবাক হয়ে গেলো স্পর্শী। আশেপাশের কয়েক জন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাচ্ছে। ভীষণ অপমান বোধ করলো সে। অভদ্রতা না করে কারোর রোষের স্বীকার হওয়ার চেয়ে আচ্ছা মতন অভদ্রতা করে তার পর ধমক শোনা উপকারী। এতে রাতের ঘুম ভালো হয়। হাতের কনুই দিয়ে স্বজোরে আঘাত করলো একজনকে। অন্যজনের পায়ের উপর জুতোর হিল চেপে ধরলো। আকস্মিক এই আঘাতে হতবিহ্বল হয়ে সরে গেলো দুপাশে। পরপরই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললো,
– এটা কি রাজনীতি করার জায়গা? এতো এতো লোক কেনো হস্পিটালে থাকবে? ডাক্তার কোথায়, হস্পিটাল প্রশাসন কোথায়? আমি জানতে চাই এটা কোনো রোগীর থাকার জন্য সুস্থ পরিবেশ কি-না!

ঠান্ডা একটা পরিবেশে হুট করেই এমন মেয়েলি আওয়াজ শুনে সকলে চমকে উঠলো। তাদের দৃষ্টি সোভাম এবং প্রবীণের দিক হতে সরে গিয়ে পড়লো স্পর্শীয়ার উপর। অতিরিক্ত ভিড়ে, গরমে তার ফর্সা মুখটা ঘেমে লাল হয়ে গেছে। শামসুল সরদার মেয়েটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। কেনো তাকালো তা সে নিজেও জানে না। সোভাম জিভ কেটে চোখ বন্ধ করে বসে রইলো। উফফফফ! ওর এখনই কেনো আসতে হলো? আর দশ টা মিনিট পরে এলে খুব কি ক্ষতি হয়ে যেতো।এখন কিভাবে সামলাবে সব? কোনো না কোনো ভাবে জেনেই যাবে মূল ঘটনা।
সোভামের সামনে চেয়ার দিয়ে বসে আছেন এক মধ্যবয়স্ক লোক। বয়স পঞ্চাশের অধিক। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে আরো পনেরো জন । তাদের মধ্যে দুজনের হাতে ক্যামেরা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এরা প্রেসের লোক। স্পর্শী বুঝে উঠতে পারলো না এর কারন। শুধু বুঝলো মাঝখানে যিনি বসে আছেন তিনিই এমপি। তবে সেটাও নিশ্চিত নয়। মাথায় দপ দপ করে আগুন জ্বলছে। এতো এতো ভিড়ে নিশ্চয়ই তার ভাইয়ের কষ্ট হচ্ছে, অসস্তি হচ্ছে। কিন্তু এদের কোনো আক্কেল জ্ঞানই নেই।

– আপনিই কি এমপি?
শামসুল সরদার নিজের দিকে ছুড়ে দেওয়া এমন প্রশ্নে চমকালেন। কিছুটা আশ্চর্যের সাথে দেখলেন স্পর্শীকে। সাথে সাথেই ধমকে উঠলো রিহান। তার সামনে বড় চাচাকে এভাবে কেউ প্রশ্ন করছে। নেহাত প্রেসের লোক পাশে, নাহয় ঠাস করে একটা লাগিয়ে দিতো গালে। তবে সেটা এই মুহুর্তে করতে না পারলেও চুপ করে রইলো না। ধমক দিয়ে বললো,
– এইই মেয়ে, সম্মান দিয়ে কথা বলো।
– অসম্মান টা করলাম কোথায়? তবে হ্যাঁ, দু মিনিটের মধ্যে কেবিন ফাঁকা না করলে সেটাও করবো। মাত্র পাঁচ জন থাকবেন। এটা একটা হস্পিটাল। একজন জন প্রতিনিধি হয়ে জনগণের সুবিধা – অসুবিধার দিকে চিন্তা করছেন না একবার ও। এতো এতো ভিড়ে রোগী যে উলটো অসুস্থ হয়ে পড়বে, সে ব্যাপারেও আক্কেল – জ্ঞান নেই। বের হোন এক্ষুনি।
স্পর্শীর কন্ঠ ঝাঁঝালো। সোভাম কিছু বলতে গিয়েও চুপ রইলো। যা হচ্ছে ভালোই হচ্ছে। এতো এতো ভিড় তার নিজের ও পছন্দ নয়। রিহান পাশে থাকা বাহারের দিকে তাকালো। এতোটুকু একটা মেয়ের কন্ঠ এতো ধারালো, তা মোটেও সহ্য হবার নয়। কিছু বলতে গিয়েও শামসুল সরদারের ইশারায় থেমে গেলো। তিনি হাত তুলে থামতে ইশারা করলেন। শান্ত কন্ঠে বললেন,

– ভিড় কমাও। ওদের কে নিয়ে গাড়ির কাছে অপেক্ষা করো।
দাঁতে দাঁত পিষে বেরিয়ে গেলো রিহান। রইলো প্রেসের লোক দুজন, সাথে খলিলুর সরদার ও আরো দুটো ছেলে। এতোক্ষণে সোভামের দিকে এগিয়ে গেলো স্পর্শী। সকলের সামনে ছুটে গিয়ে বসলো পাশে। হাতে, কপালে হাত দিয়ে বুলিয়ে ভাঙা গলায় বললো,
– কতটা ব্যথা পেয়েছিস! এক্সিডেন্ট করলি কিভাবে? দেখে শুনে রাস্তা পার হবি না।
এক্সিডেন্টের কথা শুনে কপাল কুঁচকালো শামসুল। পরক্ষণেই তা ঝেড়ে ফেলে প্রবীণের দিকে তাকালো। প্রেসের লোকেদের উদ্দেশ্য করে বললো,
– এই নিউজ টা পেপারের হেডলাইনে যেনো থাকে। আর হ্যাঁ, প্রবীণ তো কেস করবেই। এবারে তুমি তোমার মত জানাও মাস্টার। পরশ শিকদারের বিরুদ্ধে কেস করবা তো?
চুপসে গেলো সোভাম। স্পর্শীর সামনেই বলতে হলো এসব। উফফফ! স্পর্শীয়া অবাক হলো। বললো,

– কেস করবে? এই পরশ শিকদার কি এক্সিডেন্টের জন্য দায়ী? ইচ্ছাকৃত ভাবে চাপা দিতে চেয়েছিলো নাকি। কি গাড়ি ছিলো ওটা, বাইক না বাস? এইই ভাইয়া বল না।
– গাড়ি চাপা দিতে যাবে কেনো? ওর লোক দিয়ে পিটিয়েছে।
স্পর্শী কি ঠিক শুনলো। পিটিয়েছে – শব্দটা কানে প্রতিধ্বনিত হতেই মাথা শূন্য হয়ে গেলো। গা ঘামতে লাগলো দরদর করে। অস্ফুট আর্তনাদ করে বললো,
– কিহহহহহ! পিটিয়েছে মানে? কেনো পেটাবে? কি করেছে আমার ভাই? ওকে কেনো পেটাতে যাবে পরশ শিকদার? আর সে কে?
স্পর্শীর চিৎকারে কেবিনের সকলে সজাগ দৃষ্টিতে তাকালো। শামসুল সরদারের পাশে দাঁড়ানো যুবক টি বললো,
– পরশ শিকদারও একজন রাজনীতিবিদ। আমাদের বিপক্ষ দল। আপনার ভাইয়ের সাথে তার কোনো শত্রুতা নেই। প্রবীণ কে মারছিলো দেখে আপনার ভাই বাঁধা দিয়েছিলো। তাই তাকেও পিটিয়েছে।
স্পর্শী অস্থির হয়ে উঠলো। সোভাম মাথা নিচু করে বসে আছে। স্পর্শীর এমন অস্থিরতা শামসুল সরদারকে আনন্দ দিলো। এই তেজ, এই অস্থিরতাকে কাজে লাগাবেন তিনি। ইশারা দিলেন পাশে দাঁড়ানো ছেলেটাকে। সাথে সাথেই যুবক টি ফোন বের করে ভিডিও অন করলো। স্পর্শীর হাতে দিয়ে বললো,

– দেখুন।
ভিডিও টা ভয়ংকর। সোভাম পড়ে আছে মাটিতে।পাশে প্রবীণ নামক কিশোর ছেলেটাও কাতরাচ্ছে। দুজনকে হক স্টিক হাতে ছয় সাত জন মিলে পেটাচ্ছে। উফফফ! শ্বাস রোধ হয়ে আসছে স্পর্শী। অস্থির হয়ে উঠলো ক্রমশ। একবার ভাইয়ের ব্যান্ডেজকৃত শরীর, তো অন্যবার ভিডিওতে মারের দৃশ্য। দুটো দেখে গলাকাটা পায়রার মতো ছটফট করতে লাগলো। দুচোখ দিয়ে অনর্গল অশ্রু ঝরছে। এলোমেলো ভঙ্গিতে মাথার চুল খামচে বলতে লাগলো,
– এতোটা জঘন্য ভাবে আমার ভাইকে মেরেছে। জানোয়ার, অমানুষ! আমি…. আমি খুন করে ফেলবো। এতোজন মিলে নির্দয়ের মতো পিটিয়েছে। আ আমার ভাই ছটফট করছিলো। আল্লাহ!
কান্না গিলে পুণরায় বললো,
– পুলিশ কেনো এখনো কিছু করেনি? ওই জানোয়ার গুলোকে এরেস্ট করেছে?
– না করেনি। আর ওদের এরেস্ট করে কি লাভ? ওরা তো পরশ শিকদারের নির্দেশে এটা করেছে। এরেস্ট করলেও কিছুক্ষণ পর ছাড়িয়ে আনবে। ক্ষমতাশীল জানোয়ার! আমরা থানায় যাচ্ছি। আপনি কি যাবেন?
– হ্যাঁ, হ্যাঁ যাবো তো। আমি কেস করবো।

মুহুর্তেই শামসুল সরদারের ইশারায় বেরিয়ে গেলো ছেলে দুটো। স্পর্শী তাদের সাথে ছুটলো। কয়েকবার উচ্চস্বরে ডেকেও ফেরাতে পারেনি সোভাম। চিন্তা হচ্ছে ভীষণ! স্পর্শীর মাথা গরম। একটুতেই হাইপার হয়ে যায়। এসব ঝামেলায় ওকে জড়ানো উচিত হবে না। উফফফ! এতোক্ষণে হুশ ফিরলো তার। মাকে জানালেও বিষয় টা নিয়ে এতো বাড়াবাড়ি করতো না বরং বুঝিয়ে বলা যেতো। কিন্তু স্পর্শী! সে তো কথা শোনার মতো নয়।
হস্পিটালের বাইরে টা থমথমে। কয়েক হাত পর পর ছেলে-পেলের ভিড়। যেনো কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে গুরুতর। গেটের সামনে যেতেই কিছুটা দূরে চোখ পড়লো। একটা দলের পাশে হস্পিটালের প্রাচীরের সাথে অস্ত্র হেলিয়ে রাখা। সেখানে হক স্টিক, চাপাতি, ছুরি ইত্যাদি দেখা যাচ্ছে। যেনো বড় কোনো ঝামেলার সৃষ্টির পূর্বক্ষণ।
শামসুল সরদার হাসপাতালে আসার পূর্বেই পরশ শিকদার এসেছিলো। সে সুজনকে দেখে, তার সাথে আলোচনা করে তবেই বেরিয়েছে। ঠিক দশ মিনিট পর শামসুল সরদারের আগমন। ভাগ্য অতি সুপ্রসন্ন থাকায় মুখোমুখি হয় নি তারা। নাহলে এতোক্ষণে বেঁধে যেতো কুরুক্ষেত্র। অন্তত নেতাদের মধ্যে না হলেও পাতি নেতারা শান্ত থাকতে পারতো না।

সদরের পূর্ব প্রান্তে বড় একটা চায়ের দোকানের সামনে অবস্থান করছে পরশ শিকদার। পাশেই গাড়ি। সেখানকার জনসাধারণের সাথে আলাপ করতে করতে আশেপাশে চিল চাহনি দিয়ে নজর রাখছে। বিকেল থেকেই সরদারের ছেলেরা অস্ত্র নিয়ে বসে আছে। তাদের উদ্দেশ্য যে খুব একটা সুবিধার নয় তা বুঝতে বাকি রয় নি। শামসুল সরদার এবার দারুন একটা পরিকল্পনা করেছে। সরাসরি লেগে সুবিধা করে উঠতে পারবে না বলে চুনোপুঁটিকে গুটি বানিয়েছে। নির্বাচন পূর্বে কাউন্সিলের সামনে তার দলকে বিশৃঙ্খলাকারী, সন্ত্রাসী দল হিসেবে আখ্যায়িত করে তাকে অযোগ্য বলে প্রমাণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। মন্দ নয়! তবে এবার বিশৃঙ্খলা করেই ছাড়বে পরশ। সন্ধ্যার পর পরই ছেলেদের নির্দেশ দিয়েছে অস্ত্র নিয়ে সদরে অবস্থান করার। কোনো ভাবে সরদারের লোক তাদের লোম ছুঁলেই যেনো রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। হোক কয়েক টা মার্ডার। যা হবার তা পরে দেখা যাবে।

থানার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে স্পর্শী। গাড়িতে উঠে বসে চোখ বন্ধ করে নিলো। ভিডিও টা ভাসছে এখনো। কতটা নৃশংস ভাবে মেরেছে তার ভাইকে। কতটাই ব্যথা পেয়েছে সে। আচ্ছা, ওই সময় কি মা মা বলে চিৎকার করছিলো সোভাম? চেয়েছিলো কি কেউ এসে তাকে বাঁচাক। জানোয়ার গুলোকে বাঁধা দিক। কিন্তু বাঁধা দেয় নি। কেউ দেয় নি। বরং দর্শকের ন্যায় শত শত লোক মজা লুটেছে। ভাবতেই হু হু করে কেঁদে দিলো স্পর্শী। দুহাতে চেপে ধরলো মুখ। সেদিকে তাকিয়ে দেখলো ছেলেটা। থামিয়ে দিলো গাড়ি। স্টার্ট হওয়ার ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে গাড়ি থেমে যাওয়ায় স্পর্শী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। যুবকটি জানালার কাচ নামিয়ে আঙুল দিয়ে চায়ের দোকানে ইশারা করে বললো,
– ওই যে লম্বা – সাদা পাঞ্জাবি পড়া লোক, ওটাই পরশ শিকদার। ওর নির্দেশেই সাত- আট জন মিলে পিটিয়েছে তোমার ভাইকে। হয়তো তার বিরুদ্ধে কেস করলে আবারো শোধ তুলবে। এবারে মেরেও ফেলতে পারে। সন্ত্রাসী তো, খুন- খারাবি সেকেন্ডের মধ্যে করে ফেলতে পারে।
মাথায় দপ দপ করে জ্বলে উঠলো আগুন। মুহুর্তেই চিৎকার করে উঠলো স্পর্শী। বললো,

– আমি বের হবো। এক্ষুনি।
ব্যতিব্যস্ত হয়ে বের হলো স্পর্শী। ছুটে গেলো চায়ের দোকানের দিকে। রহিম থামাতে গেলেও পাশে থাকা ছেলেটা বাঁধা দিলো। ক্রুর হেঁসে বললো,
– আরে ভাই , যেতে দে না। তেজী ঘোঁড়া, বাজার ভর্তি মানুষের সামনে পরশ শিকদার একটু অপমানিত হোক। ভালো লাগবে। ওদিকে চল গাড়ি নিয়ে।
প্রশস্ত রাস্তা। রিকশা থেকে শুরু করে বাস পর্যন্ত চলছে। তার মধ্যে দৌড় দিলো স্পর্শী। এভাবে রাস্তা পার হতে দেখে অবাক হলো অনেকে। পরশ ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো। মেয়েটা তার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছুটে আসছে। সে অবাক হলো। কিন্তু ভাবার সময় পেলো না। এর মধ্যেই স্পর্শী দুহাত দিয়ে স্বজোরে ধাক্কা মারলো বুকে। এক পা পিছিয়ে গেলো পরশ। অদ্ভুত আশ্চর্য নিয়ে তাকানোর পূর্বেই কলার চেপে ধরলো পুণরায়। ঘৃণামিশ্রিত চোখে কলার ধরে ঝাকিয়ে চেঁচিয়ে বললো,

– জানোয়ারের বা’চ্চা। এভাবে অমানুষের মতো আমার ভাইকে কেনো মারলি। তোর কুত্তাগুলো একটা বাচ্চা ছেলেকে মারছিলো, আর সেটাতে বাঁধা দিয়েছে বলে ওকে এভাবে পেটাবি? কাপুরুষের মতো সাত/আটজন মিলে একজনকে ধরেছিস। একা গেলি না কেনো? এতোক্ষণে আমার ভাই তোকে কবরে শুইয়ে দিতো।
আশেপাশে লোকজনের ভিড় জমে গেছে। সরদার পক্ষের সকলে আনন্দে দিশেহারা প্রায়। প্রশান্তিময় এ দৃশ্য অবলীলায় দেখছে। পরশ হতবাক হয়ে গেলো। এতোটা অসম্মান, অপমান – ভাবতেই রাগে শরীর কাঁপতে লাগলো। স্বজোরে চেপে ধরলো স্পর্শীর হাত। ব্যাথায় অবশ হয়ে গেলো কবজি। কলার থেকে ছাড়িয়ে ঠাস করে থাপ্পড় মারলো গালে। ছিটকে দোকানের কোনায় পড়লো স্পর্শী। মাথা টা ভন ভন করে উঠলো। চোখের সামনের সব টা ঝাপসা দেখাচ্ছে। কান টা গরম হয়ে ধোয়া বেরোনোর উপক্রম। এক্ষুণি যেনো অজ্ঞান হয়ে যায়। ঝিম মেরে বসে রইলো মাটিতে। আশেপাশের সকলে অদ্ভুত ভঙ্গিতে স্পর্শীকে দেখছে। লজ্জায়, অপমানে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লো সে। তার সাথে আসা সেই ছেলে দুটো কোথায়? তারা কি আসবে না তাকে সাপোর্ট করতে? কিন্তু এলো না। তাদের অস্তিত্ব ই নেই এখানে।

প্রথমে একটা বাচ্চা ছেলেকে মেরেছে। সেখানে বাঁধা দিয়েছে বলে তার ভাইকে সাত আটজন মিলে নৃশংস ভাবে পিটিয়েছে। এখন যখন জবাব চাইতে এলো, তখন তাকে এতো লোকের সামনে এভাবে মেরেছে। এতোটা নিচ, জানোয়ার মানুষ হয়? ক্ষোভে মাথা তুললো স্পর্শী। সে যে দোকানের কোনায় ছিটকে পড়েছে সেটা ফলের। পাশেই মাঝারি আকৃতির ছুরি। শক্ত করে ছুরিটস মুঠোয় নিলো। আশেপাশের পরিস্থিতি বুঝতে না দিয়েই ঢুকিয়ে দিলো পরশ শিকদারের বুকে। কিন্তু নিশানা ব্যর্থ হলো। স্পর্শীকে কাছে আসতে দেখে পাশে সরে যাওয়ায় ছুরিটা ঢুকলো তার বাহুতে। ধারালো ছুরির আঘাতে সাদা পাঞ্জাবি টা দরদর করে রক্তে ভিঁজে গেলো। আকস্মিক এ ঘটনায় উপস্থিত সবাই হতভম্ব। বাহার চমকে গেলো। আঘাত টা সরাসরি পরশ শিকদারের উপর করা হয়েছে ভেবেই ঢোক গিললো। গা বাঁচাতে নিজের দলের ছেলেদের উদ্দেশ্যে বললো,
– অস্ত্র গুলো নিয়ে যা গোডাউনে। এগুলোর দরকার হবে না আজ। অবস্থা সুবিধার না । ধীরে ধীরে সবাই কেটে পড়।
সকলে পরশকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ রেগে স্পর্শীর দিকে এগিয়ে আসলেও পরশের ইশারায় থেমে যায়। মিনিট খানেকের মধ্যে সেখানে পুলিশ হাজির হলো। স্পর্শীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পরমুহূর্তেই হস্পিটালে ঢোকে পরশ।

সোভামের ডান পায়েও চোট পেয়েছে ভীষণ। নাড়াতে কষ্ট হয় অনেক। তবে এই মুহুর্তে আর বসে থাকা সম্ভব নয়। ‘ একটা মেয়ে ছুরি নিয়ে পরশ শিকদারের উপর হামলা করেছে ’ – একথা শুনে সোভাম অস্থির হয়ে উঠলো। মেয়েটা যে স্পর্শী, সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। বরং সে নিশ্চিত, ওটাই স্পর্শী। খোঁড়াতে খোঁড়াতে ব্যান্ডেজ হাতে নিচে নামলো। লোকজনে ভর্তি পুরো হস্পিটাল, বাজার। তবে স্পর্শী কোথাও নেই। এক জন চা ওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলো তাকে এরেস্ট করা হয়েছে। দুশ্চিন্তায় পাগল প্রায় সোভাম। একটা ট্যাক্সিতে উঠে রওনা দিলো থানার উদ্দেশ্যে।
‘ সে একটা বাচ্চা ছেলেকে মেরেছে। আমার ভাইকে মেরেছে, আমাকে মেরেছে। তাই আমি তাকে ছুরি দিয়ে মেরেছি। এখানে আমার কোনো দোষ নেই। ’
ধমক মারলো অফিসার। বললো,

– চুপ করুন, বেয়াদপ মহিলা। কোন আক্কেলে আপনি পরশ শিকদারের উপর হামলা করেছেন? তার লোকেরা যে এখনো আপনাকে আস্ত রেখেছে এটাই তো ভাগ্য। বাইরে না থেকে জেলে থাকুন, সুরক্ষিত থাকবেন।
– আমার ফোন দিন।
বলে ব্যাগ টেনে ফোন বের করলো স্পর্শী। খানিকক্ষণ ভেবে ফোন লাগালো পাভেলের নাম্বারে। সে স্থানীয় না। একপ্রকার উড়ে এসে জুড়ে বসা পাব্লিক। এখানে সবকিছু রাজনৈতিক দাপটের উপর চলে। সে হিসেবে পাভেলের সাহায্য প্রয়োজন। সোভাম অসুস্থ। এই মুহুর্তে সে জেলে থাকলে ভাইকে কে সামলাবে?
– হ্যাঁ বল। কি ব্যাপার? ফোন ধরিস নি কেনো বিকেলে?
স্পর্শী সময় নিলো না। দ্রুত কন্ঠে বলে উঠলো,
– আমি তোদের পিরোজপুরে আছি। বিপদে পড়েছি, তোর সাহায্য প্রয়োজন।
পাভেল হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
– কি হয়েছে? তোর গলা এমন লাগছে কেনো?

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৯

– তুই না বলেছিলি তোর ভাই রাজনীতি করে? আমাকে একটু হেল্প করতে বল না। অকারণে পুলিশ এরেস্ট করেছে আমায়। আমি সবটা বলবো তোকে। তুই আগে এখানে আয়।
বাকিটা বলতে পারলো না স্পর্শী। এর পূর্বেই ইনস্পেকটর টেনে নিলো ফোন, ব্যাগ। বললো,
– পরশ শিকদারের সাথে ক্ষমতার লড়াই করবেন? মূর্খামি না করে চুপচাপ জেলে বসে থাকুন। ফ্যামিলির কাউকে জানিয়ে তার কাছে গিয়ে অনুরোধ করতে বলুন। ভাগ্য ভালো হলে ছেড়ে দেবে।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১১