অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১০
ফাহিমা ইসলাম
ভোর আজ যেন কোনো মমতাহীন দেবতার নীরব অভিশাপ হয়ে নেমে এসেছে ধরণীর বুকে। আকাশের রং ফিকে, তবু তার গভীরতায় লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য বিষণ্ণতা৷ আলো ফুটলেও আলো নেই কোথাও। সূর্যের কিরণ কুণ্ঠিত, ক্লান্ত, অনিচ্ছুক, দিগন্ত ছুঁয়ে আসার আগেই যেন তার উষ্ণতা নিঃশেষ হয়ে গেছে। তূর্ণার মতোই তারও মনটা হয়তো আজকে বিষণ্ণতায় ভড়া তাই হয়তো, রোজকর নিয়মে খিলখিলিয়ে হেসে উঠতে পারছে না। এখনও তূর্ণার আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরা রৌদ্রিকের হাতের উপর। রাতের আতঙ্ক যেন ঘুমের মাঝেও তাকে ছেড়ে যায়নি,কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, ভ্রূ কুঁচকে আছে, ঠোঁট কাঁপছে অচেতন এক আতঙ্কে!
রৌদ্রিক সারারাত জেগে ছিল। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, তবুও দৃষ্টিজোড়া কোমল, একটা অদ্ভুত অপরাধবোধ আর দায়িত্ববোধের মিশ্রণ। হালকা নড়াচড়ায় তূর্ণার ঘুম ভাঙলো। চোখ খুলতেই সে প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলো না। তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি স্থির হলো রৌদ্রিকের মুখপানে। মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখে আতঙ্ক ফিরে এলো। সে ঝটকা দিয়ে সরে যেতে চাইল, কিন্তু শরীর যেন সাড়া দিচ্ছে না।
“না… না… কাছে আসবেন না…!” ‘কাঁপা গলায় বললো সে, নিজের শরীরটা গুটিয়ে নিতে নিতে।
রৌদ্রিক সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিল, তার স্পর্শও এখন বিষের মতো তূর্ণার নিকট।
“তূর্ণা লুক এট মি, আ’ম ইউর হাসবেন্ড। তোমার বর লুক এট মি।” ‘ধীর শান্ত গলায় কথাটুকু বলে উঠলো রৌদ্রিক। তূর্ণা মাথা নাড়লো, যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।
“আপনারা সবাই মিথ্যে বলেন। সবাই,সবাই কষ্ট দেয়!”
বলতে বলতো তূর্ণার চোখ দিয়ে আবারও জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। তূর্ণার এই মুহূর্তে রৌদ্রিক বুঝলো। রৌদ্রিক আস্তে করে রোদেলাকে ঠিক মত শুইয়ে দিয়ে, সো ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। যাতে তূর্ণা নিজেকে নিরাপদ মনে করে।
“আমি এখানে থাকবো, কিন্তু তোমার কাছে আসবো না, যতক্ষণ না তুমি নিজে চাও। ঠিক আছে?”
তূর্ণা কিছু বললো না, শুধু হাঁপাতে হাঁপাতে চারপাশে তাকালো। তারপর ধীরে ধীরে রোদেলার দিকে চোখ গেল,শান্ত ঘুমন্ত মুখ। সেই দৃশ্যটা যেন তাকে খানিকটা স্থির করলো।
“ও… ও ঠিক আছে?”
খুব আস্তে জিজ্ঞেস করলো তূর্ণা। রৌদ্রিক মাথা নাড়লো-
“হ্যাঁ,ও একদম ঠিক আছে।”
রৌদ্রিক তূর্ণার মুখপানে চাইলো, মেয়েটার সমগ্র মুখশ্রী জুড়ে শুধুই আতঙ্ক। বার বার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, কালকের দাগগুলো আজকে যেনো আরও গাঢ় রং ধারণ করেছে। কালচে হয়ে আছে, যেটা খুব করে রৌদ্রিকের চোখে লাগছে। কেমন জানি নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে, মেয়েটা তার দায়িত্ব অথচ সে এই সামান্য দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। ভালোটা নাহয় না বাসুক তাহলে বলে এইটা নয় যে যে-সে তার স্ত্রীর গায়ে হাত দিবে আর সে সেটা মেনে নিবে। তারউপর তার রুমেই তারই স্ত্রীকে রে*প করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেখানে নিজের সঙ্গে দৃষ্টি মেলাতে কেমন জানি নিজেরই গিল্টি ফিল হচ্ছে। রৌদ্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তূর্ণার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে-
“গতকাল রাতে যা হয়েছে,এটাই শেষ। রিয়ান আর কখনো তোমার কাছে আসবে না। আমি আছি তো!”
“থাকবেন?”
শিশুসুলভ প্রশ্ন, অশ্রুসিক্ত নয়নজোড়া রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন মুক্তাদানার মত চকচক করছে অশ্রুবারি গুলো, তবে এই অশ্রুবারি গুলো শুধুই বিষাদময় এক বাজে স্মৃতির অংশ। তূর্ণা দেহাবশেষে বয়ে চলা মৃদু কম্পন খুব করে টের পাচ্ছে রৌদ্রিক। মেয়েটা সারারাত এইভাবে কেঁপে, ঘুমের মাঝেও আতঙ্কে চমকে উঠছিলো। রৌদ্রিকের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। রৌদ্রিক আবারও তূর্ণা নিকট অতি শান্তময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে নরম স্বরে বলে-
“হ্যাঁ, থাকবো। কিন্তু,তোমাকে সুস্থ হতে হবে, তূর্ণা। আমি একা পারবো না সেটা, তুমি কি আমার ওপর একটু ভরসা করার চেষ্টা করবে?”
তূর্ণা সরাসরি উত্তর দিল না। তবে এবার সে পুরোপুরি সরে গেল না। বরং হাঁটু জড়িয়ে বসে থাকলো, এর উত্তর তার নিকট জানা নেই, সে কি ঠিক হবে? কই কেউ বলে না সে সুস্থ হবে। রূপা আপু, সাহেলা বেগম, লুকমান হোসেন কেউ তো বলে না সে সুস্থ হবে। সবসময় সবাই তার মৃত্যু কামনা করো আসচ্ছে, সে সকলের নিকটই শুধুই বোঁঝা এছাড়া আর কিছুই নয়।
রৌদ্রিক টেবিলের উপর রাখা, জগ থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে দূরত্ব বজায় রেখে তূর্ণার দিকে সেটা বাড়িয়ে দিলো। তূর্ণার ক্রন্দনরত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে বলে-
“পানি খাও, আজকে ডাক্তার দেখাবো,ঠিক আছে?”
ডাক্তারের কথা শুনে তূর্ণার ভয়ার্ত চোখে রৌদ্রিকে দিকে তাকালো। ডাক্তার মানেই তো ওইসব বড় বড় সুঁই মাংসের মধ্যে ঢু*কিয়ে দেয়, কত কত তেঁতো ঔষধ খেতে দেয়। এইসব মনে পরতেই তূর্ণা আতঙ্কিত ভাবে মাথা নাড়িয়ে বলে-
“ডাক্তার? না আমি ডাক্তার দেখাবো না, দেখাবো না।”
“না দেখালে সুস্থ হবে কিভাবে তুমি? ভয় পেও না, তোমাকে কেউ কষ্ট দেবে না। শুধু, তোমার মাথার ভেতরের ভয়গুলো একটু কমাতে সাহায্য করবে।”
তূর্ণার আগের থেকে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে এতোক্ষণে। তূর্ণা রৌদ্রিকের কথা শুনে গোল গোল চোখে সেদিকে তাকালো, ভয়ে ভয়ে আবারও জিজ্ঞেস করে-
“ আমার মাথায় কি ভয় লুকিয়ে আছে? তাই কি সবাই তূর্ণাকে পাগল বলে? ডাক্তারের কাছে গেলে বাবা কি আমাকেও রূপা আপুর মত খাইয়ে দিবে? চুল বেঁধে দিবে আমার বর?”
রৌদ্রিক কি উত্তর দিবে ভেবে পেলো না, ওই বাড়িতে এই অসুস্থ মেয়েটাকে কি একটুও ভালোবাসা যেতো না? তূর্ণার পরিবারের সম্পর্কে কোনো ধারণা রৌদ্রিকের নেই, তাই তেমন কাউকে চেনেও না। বিয়ের দিন শুধু দেখেছিল। তারপর তো সে তূর্ণাকে ফেলেই সেখান থেকে নিজের গন্তব্যে চলে গিয়েছিল। রৌদ্রিক তূর্ণার কাতর ভড়া দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে ধীর কণ্ঠে বলে-
“ তোমার বাবার ভালোবাসা আমি এনে দিতে পারবো কিনা জানি না। তবে তোমাকে সুস্থ একটা জীবন উপহার দেওয়ার চেষ্টা করবো। নিজের জন্য বাঁচতে শিখবে তুমি। মানুষ যার কাছে ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি চায়,তার নিকটই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয়। তাই কোনোদিন ভালোবাসার জন্য কারো নিকট হাত পাতবে না, এটা শুধুই তোমাকে আঘাত করবে।”
আধার-আবিষ্ট বিকেলের নিস্তব্ধতা ভেঙে, ক্লিনিকের কাঁচঘেরা প্রাঙ্গণে জমাট বেঁধেছে এক অদৃশ্য চাপা অস্বস্তি। নির্বিকার সাদা দেয়ালগুলো যেন নিঃশব্দে সাক্ষী হয়ে আছে মানুষের অন্তর্লৌকিক ভাঙাচোরা অস্তিত্বের। জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধে ভারী হয়ে ওঠেছে বাতাসে, বিষণ্নতার এক অনুচ্চারিত অভিঘাত ক্রমাগত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
রৌদ্রিক স্থির, অন্তর্গত অস্থিরতায় ক্ষতবিক্ষত। তার দৃঢ় আঙুলে বন্দী তূর্ণার শীতল, কাঁপা হাতটা আরও কেঁপে উঠছে। তূর্ণা, এক অদ্ভুত বিপর্যস্ত সত্তা। তার দৃষ্টি কখনো শূন্যে স্থির, কখনো বা অকারণ আতঙ্কে বিচলিত। হঠাৎ হঠাৎ অসংলগ্ন বচনে ফেটে পরছে সে-
“ও আসবে, ও আমাকে নিয়ে যাবে। আপনি দরজা বন্ধ করুন বর প্লিজ!”
তার কণ্ঠে কাঁপা আতঙ্ক, অথচ সেই আতঙ্কের কোনো দৃশ্যমান উৎস নেই। তবুও এমন ভাবে আঁকড়ে ধরেছে রৌদ্রিককে। যেন তার অস্তিত্বটুকুই রৌদ্রিকের শ্বাস-প্রশ্বাসে নির্ভরশীল। এখন উত্তরায় অবস্থান করছে, বিকেলের দিকে তাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। তূর্ণাকে নিয়ে এখানে এসেছে, আসার পর থেকে মেয়েটা আতঙ্কে তার বাহু সেই যে শক্ত করে চেপে ধরেছে ছাড়ার নাম নেই। রৌদ্রিকও কিছু বলেনি, অধ্যাপক ডাঃ আব্দুল্লাহ মাহমুদের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। বেশ অনেকটা সময় হয় ওনার চেম্বারের এসে বসে আছে আসার নাম নেই ওনার। রৌদ্রিক নিজের হাত ঘড়িতে কয়েকবার সময় দেখে নিলো, হুট করেই কেবিনে কেউ প্রবেশ করতে করতে বলে ওঠে-
“ আ’ম ইক্সট্রিমলি সরি মিস্টার সিকদার। স্যারের ছেলের এক্সিডেন্ট হয়েছে তিনি সেখানেই গিয়েছেন তারজন্য এখানে উপস্থিত থাকতে পারছেন না।”
মামুষটার কথা শুনে রৌদ্রিক বিষয়টা বুঝতে পেরে গম্ভীর ভাবেই উত্তর দেয়-
“ আচ্ছা তাহলে আমরা উঠি, আমি তাহলে অন্য জায়গায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিবো।”
রৌদ্রিকে কথা শুনে লোকটা তাড়াহুড়ো করে বলে-
“ স্যার কিছু না মনে করলে, স্যার বলেছেম আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্টটা তার জায়গায় ডঃ কায়সারকে নিতে বলেছেন। আপনাদের সমস্যা না হলে, উনিও খুব ভালো একজন সাইকিয়াট্রিস্ট। ”
রৌদ্রিক কিছুখন ভাবলো, কালকে সকাল সকাল বেরিয়ে যেতে হবে। কালকে পর পর পর তিনটা সার্জারী আছে, তাই চাইলেও আসতে পারবে না। তাই আর দ্বিমত করলো না। লোকটার সঙ্গে তূর্ণাকে নিয়ে ডাঃ কায়সারের কেবিনের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলো। কায়সার পদবীটা তার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে, সঙ্গে পেশাটাও। সে যা ভাবছে সেটা নাও হতে পারে, কেবিনে ঢোকা মাত্রই অতি পরিচিত একখান মুখশ্রীর সামনে এলো। প্রীয়তী! পরিপাটি সাদা কোটে আবৃত, চোখে এক তীক্ষ্ণ নিরীক্ষণী দৃষ্টি, ওষ্ঠপুটে হাসি ঝুলিয়ে পেসেন্টকে ওয়েলকাম জানানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো সে। কিন্তু সে থমকে দাঁড়িয়ে রৌদ্রিকের দিকে তাকাল, এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়, পরক্ষণেই তা রূপ নিল শীতল হয়ে এলো। বহুদিন পর সামনাসামনি দোখা হলো তাদের, প্রীয়তি বেশ অবাক হয়েছে। না চাইতেও তার ওষ্ঠপুট থেকে শব্দ বেরিয়ে এলো-
“রৌদ্র? তুমি এখানে?”
তার কণ্ঠে বিস্ময়ের ভরা। প্রীয়তির এবার নজর গেলো রৌদ্রিকের হাত চেপে ধরা তূর্ণার দিকে, তূর্ণা প্রীয়তির দিকেই তাকিয়ে আছে নিষ্পাপ ভাবে। তূর্ণাকে চিনতে পারলো না প্রীয়তি। সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে রৌদ্রিকের এত নিকটে একটা মেয়েকে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে। রৌদ্রিক রিনি ছাড়া অন্যকোনো মেয়েকে এইভাবে হাত ধরে রাখে না। পাঁচ বছর সংসারের রৌদ্রিকে পুরোপুরি না জানলেও স্ত্রী হিসেবে অনেককিছুই জানা তার। হয়তো এখন তারা প্রাক্তন, তবুও একসময় একই ছাদের তলায় ছিল তারা।রৌদ্রিকের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। চোখে ভেসে উঠেছে এক দহনশীল অনীহা।
“ কল মি মিস্টার রৌদ্রিক, নট রৌদ্র।
শক্ত গলায় কথাটুকু বলে উঠলো রৌদ্রিক। প্রীয়তি নিজের বেরিয়ে আসা আবেগটুকু নিজের মধ্যে দমন করে স্টাফকে বের হয়ে যেতে বলে। রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে-
“ কেমন আছো মিস্টার রৌদ্রিক? হঠাৎ এখানে কেনো? আর এই মেয়েটা কে?”
নিজের মধ্যে থাকা সকল কৌতুহল একসঙ্গে ঢেলে দিলো প্রীয়তি। রৌদ্রিকের কোনো হেলদোল হলো না, সো শান্ত ভাবে জবাব দিলো-
“ সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে মানুষ যা করতে আসে আমিও সেটাই করতে এসেছি। সি ইজ মাই ওয়াইফ মিসেস রৌদ্রিক তূর্ণা সিকদার। ”
রৌদ্রিকের কথায় যেনো প্রীয়তি ভীষণ রকমের চমকালো! সে কি সত্যি ই শুনলো নাকি তার মনের ভুল? রৌদ্রিক বিয়ে করেছে! প্রীয়তি বিস্মিত নয়নে রৌদ্রিকের পাশে আঁটোসাটো হয়ে থাকা তূর্ণাকে দেখলো। আবার রৌদ্রিকের দিকে তাকালো। রৌদ্রিক যে মজা করার মত মানুষ নয় সেটাও খুব ভালো করে জানে প্রীয়তি। তবু বিশ্বাস করতে বড্ড কষ্ট হলো তার।
“ সত্যি ই বিয়ে করেছো তুমি?”
“ তো তোমার কি মনে হয় তোমার সঙ্গে আমি ফাইজলামি করছি?”
গম্ভীর স্বরে কথাটুকু বললো রৌদ্রিক। প্রীয়তি তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ ওর জন্যই কি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছো?”
রৌদ্রিক কোনো উত্তর দিলো না, এইখানে সে এক মুহুর্তও থাকবে না। তূর্ণাকে নিয়ে বাহিরের দিকে পা বাড়াতে নিলে, প্রীয়তির হঠাৎ বলে ওঠে-
“ এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নিলে? তাও আবার একটা পাগলকে! রৌদ্রিক সিকদারের রুচি এতটা খারাপ হলো কবে?”
প্রীয়তির কথা রৌদ্রিকের কর্ণকুহরে প্রবেশ মাত্রই অসম্ভব রকমে রাগে ফেঁপে উঠলো সে। রাগে আগের থেকেও বেশি চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, পিছন ফিরে রক্তিম চোখ প্রীয়তির উপর রেখে বলে-
“ বিয়ে না করার কারণ তো দেখছি না। তাহলে বিয়ে
করবো না কেনো? এন্ড মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ, সি ইজ
মাই ওয়াইফ। পাগল হলেও তোমার থেকে থেকে
শতগুণ ভালো সে। তাই সেকেন্ড টাইম আমার
ওয়াইফকে কিছু বলার আগে শতবার ভাববে কার
ওয়াইফকে নিয়ে কথা বলছো মাইন্ড ইট!”
প্রীয়তি একনজর রৌদ্রিকের সঙ্গে মিশে থাকা তূর্ণাকে দেখে নিলো। মুহুর্তেই হৃদয় মাঝো ঈষার ঝর বয়ে গেলো, কেনো গেলো জানা নেই তার। প্রীয়তি আনারও বলে-
“ তাই বলে একটা পাগলকে বিয়ে করবে? মেয়ের কি অভাব পরেছিলো সে একটা পাগলকে বিয়ে করতে হলো তোমার। আমার মেয়েটার কি হবে? যদি এই মেয়ে ওকে আঘাত কর তখন?”
রৌদ্রিকের দৃষ্টি রূপ নিল ভয়ংকর কঠোরতায়। রক্ত লাল চোখে প্রীয়তির দিকে তাকিয়ে শিলাস্তম্ভের মতো ভারী স্বরে বলে-
“ কথা একটু সংযত করো, প্রীয়তী। তুমি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট মানসিক অসুস্থতাকে ‘পাগলামি’ বলে তুচ্ছ করার মতো অশিক্ষিত নও তুমি, অন্তত হওয়ার কথা না। আর রইলো মেয়ের কথা, ওইটা তোমার মেয়ে হয় কি করে? মা হওয়ার কোনো দায়িত্ব কিংবা কর্তব্য তুমি কি পালন করেছো? আজকে হঠাৎ মেয়ের জন্য এত দরদ আসলো কোথা থেকে? নেক্সট টাইম তোমার মুখ দিয়ে আমার মেয়ে শব্দটা যেনো উচ্চারণ না হয়। রোদেলা শুধুই আমার মেয়ে।”
প্রীয়তী হালকা হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে-
“ওহ প্লিজ, রৌদ্রিক! তুমি বদলাওনি একটুও। এখনও ভাঙা মানুষদের জোড়া লাগানোর ব্যর্থ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছো দেখি। শিক্ষিত ভাষায় এটাকে মানসিক অসুস্থতা হলেও সমাজে এটাকে পাগলামিই বলে।”
রৌদ্রিক এক পা এগিয়ে এলো। তার চোখে এবার নিখাদ হিংস্র দৃঢ়তায় পরিপূর্ণ। দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলে-
“হ্যাঁ, আমি জানি। কারণ একসময় তোমাকেও জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছিলাম। ভুলটা সেখানেই হয়েছিল তুমি ভাঙা ছিলে না, তুমি ছিলে শূন্য। আর শূন্য মানুষকে কোনোদিন জোড়া লাগানো যায় না। আর রইলো সমাজ, সেটাকে কোনোদিন আমি দাম দেইনি, আর না দেওয়ার প্রশ্ন আসে।”
প্রীয়তীর মুখে এক ঝলক কঠিনতা নেমে এলো। রৌদ্রিক কি এমনটা আগেও ছিল? নাকি তার নিকট নতুন লাগছে। রৌদ্রিক কেমন মানুষ সেটা সে খুব ভালো করে জানে। কিন্তু আজকে তার রৌদ্রিকের এই ভালোমানুষিটা তূর্ণার জন্য হওয়ায় ভালো লাগছে না। একদমই ভালো লাগছে না তার কাছে। তূর্ণা নিঃশব্দে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে আছে। তার
কালোমণি যুক্ত চোখে জমে থাকা অশ্রু চিকচিক করছে। প্রীয়তিকে সে চেনে না, তবে সামনে থাকা মামুষটা যে সবার মত তার পাগল হওয়ায় বিষয়টা নিয়ে তার দিকে ঘৃণিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেটা বুঝতে পারছে। তার জন্য রৌদ্রিকে কত কথা শুনতে হলো, সেলিমা খাতুন বলতো সে নাকি তার মাকে গিলে খেয়েছে। সে নাকি অভাগী, রাক্ষস সত্যি কি সে তার মাকে গিলে খেয়েছে? ভাবতে ভাবতে বৃষ্টি ফোঁটা যেমন হঠাৎ আকাশ বেঁধে ঝড়ে পারে তেমনি তার অশ্রুবিন্দু গুলো গাল বেয়ে ঝড়ে পরলো।
রৌদ্রিক তূর্ণার হাতটা শক্ত করে নিজের সঙ্গে চেপে ধরে কেবিন থেকে বের হয়ে যায়। তূর্ণা ফুঁপিয়ে কান্না করে ওঠে, পুরোন ব্যথাগুলো আবারও নাড়া দিয়ে উঠছে। সে কোনোদিন ঠিক হবে না, ডাক্তারই তো বললো সে পাগল। বর তাহলে কেনো বললো সে সুস্থ হবে? সে তো অসুস্থ, আর এই অসুস্থতার কোনো ঔষধ নেই। তূর্ণা মাথা নিচু করে কান্না করতে করতে বলে-
“ আমি একটা রাক্ষস বর, তাই তো মাকেও গিলে নিয়েছি। আমি কোনোদিন সুস্থ হবো না, আমিও হারিয়ে যাবো মায়ের মত। যেখানে কেউ আমাকে কষ্ট দিবে না, সবাই খুব পঁচা। তূর্ণাকে শুধুই কষ্ট দেয়!”
রৌদ্রিক হাঁটা বন্ধ করে দিয়ে ক্রন্দনরত তূর্ণার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো। রক্তিম নেত্রজোড়া কেমম শীতল হয়ে এসেছে। তূর্ণা দিকে পূর্ণ দৃষ্টি রেখে ভরসা দিয়ে বলে-
“আমি আছি, যতবার তুমি নিজেকে হারিয়ে ফেলবে, ততবার আমি তোমাকে খুঁজে এনে আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে দেব।”
“ তোর কি হয়েছে মিথিলা এমন করছিস কেনো?”
পিছন থেকে ইমা প্রশ্ন করে। ইমা শ্রাবণের মামাতো বোন হলেও সে আর মিথিলা সমবয়সী হওয়ায় তাদের মধ্যে বেশ ভালো বন্ধুত্ব রয়েছে। মিথিলা বারান্দায় উদাসী হয়ে দাঁড়িয়ে খোলা নীলিমায় দিকে তাকিয়ে ছিল। হুট করে ইমার আগমনে সেখান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ইমার দিকে তাকায়। মিথিলাকে দেখে ঠিক মনে হচ্ছে না, নেত্রজোড়া কেমন লাল হয়ে আছে। চোখের পাতা ফুলেও আছে কিছুটা, ইমা কিছুটা আন্দাজ করে বলে-
“ মিথিলা তুই ঠিক আছিস তো? কান্না করেছিস কেনো?”
“ কান্না কেনো করবো পাগল। আর আমি ঠিক আছি, বেশি ভাবিস না।”
ইমা মানলো না মিথিলার কথা। মেয়েটা অন্যসময়ের মত হাসি-খুশি না। বিষণ্ণতা মেয়েটাকে গ্যাস করে নিচ্ছে, ইমা হুট করে বলে ওঠে-
“ রৌদ্রিক ভাই আর তূর্ণা ভাবির বিয়ে নিয়ে মন খারাপ? এবার অত্যন্ত না বলিস না, আমি বুঝতে পারছি তোর অবস্থাটা।”
ইমার কথা শুনে মিথিলা নিজের দমানো অনুভূতিগুলোকে আর আটকিয়ে রাখতে পারলো না। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়িয়ে দলা পাকানো কান্নাগুলোকে আটকিয়ে কোনো রকমে বলে ওঠে-
“ না তুই একদমই আমার অবস্থা বুঝতে পারবি না। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ইমা! ভীষণ কষ্ট! রৌদ্রিক কেনো আমায় নিজের করলো না, কেনো করলো না? ”
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৯ (২)
ইমা কি বলবে বুঝতে পারলো না, মেয়েটা অনেক আগ থেকেই রৌদ্রিককে ভালোবাসে। তবে সেটা কোনোদিন বলতে পারেনি, সবচেয়ে বড় কথা রৌদ্রিক তখন বিবাহিত ছিল। তাই তখন নিজের মনকে এটা বলে সান্ত্বনা দিতো যে রৌদ্রিক অন্যকারো। কিন্তু প্রীয়তি আর রৌদ্রিকে যখন ডিভোর্স হলো, তখন মিথিলা রৌদ্রিককে নিজের করে পাওয়ার আসা আবারও দেখতে শুরু করে। কিন্তু রৌদ্রিক তখনও তাকো ফিরিয়ে দেয়, তবে মিথিলা নিজের জায়গা থেকে সরে যায়নি। ভেবেছিল এবার বাবাকে বলে তার আর রৌদ্রিকের বিয়ে ঠিক করাবে। কিন্তু হুট করেই রৌদ্রিকে অন্যত্রে বিয়ে ঠিক হয়ে যায়, সে কিছু করার আগেই রৌদ্রিক আবারও তার হাত ছাড়া হয়ে যায়।
