ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৬
সাবিলা সাবি
বিগত চব্বিশ ঘণ্টা মেক্সিকো সিটির এই বিশাল অট্টালিকাটি এক গভীর সমাধিতে পরিণত হয়েছে। তান্বী বারবার জাভিয়ানের নাম্বারে কল করছে কিন্তু ওপাশ থেকে কেবল একটি যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। তার হাতের ফোনটি এখন বিষাক্ত কোনো পাথরের মতো ভারী ঠেকছে। প্রতিটি মুহূর্ত তার মনের ভেতর আশঙ্কার বিষবৃক্ষ রোপণ করে চলেছে। সে ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে উন্মাদের মতো পায়চারি করছে। জাভিয়ান কোনোদিন তাকে এভাবে একা রেখে নিস্পৃহভাবে উধাও হয়ে যায় না। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা যন্ত্রণায় দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। হারানো সন্তানের স্মৃতি আর বর্তমানের এই অনিশ্চয়তা তাকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে।
শহরের এক কোণে পরিত্যক্ত এক গুদামঘরে তখন বিষণ্ণ বাতাস বইছে। চারদিকে লোহার মরিচা আর জমাটবদ্ধ রক্তের ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে। জাভিয়ান যখন সেই ধ্বংসস্তূপের সামনে এসে দাঁড়াল তখন তার চোখে কেবল বিনাশেরই নেশা। সে খবর পেয়েছে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত কাছের অ্যাসিস্ট্যান্ট রায়হানকে অপহরণ করা হয়েছে। মেইলস্ট্রোমের লোকগুলো জাভিয়ানকে তার নিরাপদ আশ্রয় থেকে বের করে আনার জন্য এই জঘন্য চালটি চেলেছে জাভিয়ানের ধারনা। গুদামের প্রবেশপথে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক ডজন সশস্ত্র গার্ড। তাদের হাতের ভারী মারণাস্ত্রগুলো কৃত্রিম আলোয় চকচক করছে। জাভিয়ান কোনো ভ্রুক্ষেপ না করেই ভেতরে পা রাখল। ভেতরে ঢুকতেই জাভিয়ানের হৃৎস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সামনের একটি মরচে ধরা লোহার খুঁটির সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় বেঁধে রাখা হয়েছে রায়হানকে। তার সাদা শার্টটি এখন রক্তের প্রলেপে বিভীষিকাময় রূপ ধারণ করেছে। তার মাথাটা নিস্তেজ হয়ে বুকের ওপর ঝুলে পড়েছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে পৈশাচিক নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়েছে তার শরীরের ওপর। রায়হানের এই মুমূর্ষু অবস্থা দেখে জাভিয়ানের শান্ত চোখের মণি দুটোতে প্রলয়ংকরী এক আগুন জ্বলে উঠল। সে তার দামি কোটটি অবহেলায় মেঝের ধুলোয় ছুড়ে ফেলল। শার্টের হাতা গুটিয়ে সে যখন গার্ডদের দিকে এগিয়ে গেল তখন তার মধ্যে আর কোনো দয়া অবশিষ্ট নেই। সে এখন কেবল এক জীবন্ত প্রতিহিংসার প্রতিমূর্তি।
জাভিয়ান একাই সেই মরণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। তার প্রতিটি আঘাত থেকে ঝরে পড়ছিল জমাটবদ্ধ আক্রোশ। গার্ডদের ভিড়ের মাঝে সে এক জীবন্ত ধ্বংসলীলায় পরিণত হলো। কিন্তু আচমকা মাথার পেছনে ভারী লোহার এক প্রচণ্ড আঘাত এসে লাগল। মুহূর্তেই চারদিকের সব আওয়াজ নিভে গিয়ে চোখের সামনে জমাটবদ্ধ ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এল। জাভিয়ান লুটিয়ে পড়ল সেই স্যাঁতসেঁতে মেঝেটার ওপর।
এরপর কতক্ষন সময় পার হয়েছে তার কোনো হিসেব জাভিয়ানের কাছে নেই। জ্ঞান ফেরার পর সে টের পেল তার সারা শরীর অবশ হয়ে আছে। হাত পা দুটো শক্ত করে একটি লোহার চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। সামনের টেবিলে রাখা একটি কম্পিউটার থেকে বিচ্ছুরিত নীলচে আলো তার ঝাপসা চোখে বিঁধছে। আর তখনই অন্ধকার আর ধোঁয়শার সেই অস্পষ্ট দেয়াল ভেদ করে একটি অবয়ব ধীরপায়ে বেরিয়ে এল। জাভিয়ান পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল। চোখের সামনের কুয়াশা পরিষ্কার হতেই তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে মার্কো। তার ভাই মার্কো রেয়েস চৌধুরী তার গায়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট আর কোমরে ঝুলছে একটি পিস্তল। মেক্সিকোর এই অন্ধকার জগতের প্রেক্ষাপটে এমন একটি বিশ্বাসঘাতকতা জাভিয়ানের কল্পনাতেও ছিল না। জাভিয়ান অস্ফুট স্বরে অবিশ্বাসের সুরে বলল, মার্কো তুই? মার্কো এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বললো “অবাক হচ্ছো ব্রো, অবশ্য অবাক হওয়ারই কথা মিস্টার জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী। ওপস সরি, এভরিওয়ান মিট দ্য নাইট রেভেন ওরফে জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী।”
জাভিয়ানের রক্ত এক নিমেষে শীতল হয়ে এল। সে দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো “তুই আগে থেকেই জানতিস এটা?”
মার্কো টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বললো “জানতাম না, তবে জেনেছি। আর জানার পর অবাক হয়েছি ঠিকই তবে আমার ছকটা বেশ ভালোই মিলে গেছে। অন্য কেউ হলে এই কাজ হাসিল করতে অনেক সমস্যা হতো। এখন ঘরের লোক যেহেতু, তাই কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল।”
জাভিয়ানের সারা শরীরে তখন অপমানের জ্বালা। সে আর্তনাদ করে উঠে বলল, “রায়হানকে কেন আক্রমণ করলি? ওর সাথে কিসের শত্রুতা ছিল তোর?” মার্কো খুব ঠান্ডা গলায় জবাব দিল, “কান টানলে মাথা আসে জাভি ব্রো জানো তো। রায়হানকে আঘাত না করলে তোমাকে এই ডেরায় টেনে আনা সম্ভব হতো না। তোমাকে দরকার ছিল বলেই রায়হানকে বলির পাঁঠা বানাতে হলো।”
ঘরের ভেতরের সেই গুমোট নীরবতা তখন জাভিয়ানের ভেতরের নাইট রেভেনকে আরও হিংস্র করে তুলছে। তান্বী বাড়িতে তার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে অথচ জাভিয়ান এখন তার কাছের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার জালে বন্দী।
হঠাৎ করেই এক বালতি বরফশীতল পানি ছিটিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই রায়হানের জ্ঞান ফিরে এলো। প্রচণ্ড ঠান্ডার ঝটকায় সে যখন চোখ মেলল, তার সামনে নরক নেমে এসেছে। নিজের রক্তমাখা শার্ট আর অবশ শরীরের চেয়েও বড় আঘাত সে পেল সামনে তাকিয়ে। তার প্রিয় স্যার জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী একটি লোহার চেয়ারে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। নাইট রেভেনের মতো অপরাজেয় এক মানুষকে এমন অবস্থায় দেখে রায়হানের কণ্ঠ চিরে এক আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। “আমি আপনাকে ফোনে কতবার বারণ করেছিলাম স্যার! কেন এলেন এইখানে? আমার যা হওয়ার হতো, ওরা আমাকে মেরেই ফেলত আপনি কেনো কথা শুনলেন না?” রায়হান গলার সবটুকু জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠল।
জাভিয়ান মাথা তুলে তাকাল। তার কপালে জমাট বাঁধা রক্ত, কিন্তু চোখের মণি দুটো এখনো সেই আগের মতোই হিমশীতল। সে গম্ভীর স্বরে ধমক দিয়ে বলল, “সাট আপ রায়হান।” রায়হান ফুঁপিয়ে উঠে বলল, “স্যার, আপনি জানেন না মার্কোর পরিকল্পনা কতটা গভীর। এখানে আসা আপনার একদম উচিত হয়নি।”
অন্ধকারের ধোঁয়াশা থেকে বেরিয়ে ধীরপায়ে মার্কো সামনে এসে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে তখনও নিষ্ঠুর হাসি। জাভিয়ান সরাসরি মার্কোর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “এসব কেন করছিস মার্কো? কী চাস তুই?”
মার্কো একটা টেবিলের ওপর হেলান দিয়ে বসল। সে উপহাসের সুরে বলল, “আমি যদি জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর কাছে কিছু চাইতাম, তবে হয়তো দামি কোনো বাংলো বা গাড়ির আবদার করতাম। কিন্তু আমি তো কথা বলছি নাইট রেভেনের সাথে। আর নাইট রেভেনের কাছে আমার কী চাওয়ার থাকতে পারে, সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি নিশ্চয়ই তোমার মাথায় আছে ব্রো?” জাভিয়ান কেবল দুটি শব্দ উচ্চারণ করল, “সরাসরি বল।”
মার্কো এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “বেশি কিছু না, কেবল Cicada 3301 পাজেলের পাসকোডটা চাই।” জাভিয়ানের শুকনো ঠোঁটে এক অবজ্ঞার হাসি ফুটে উঠল। সে ব্যঙ্গ করে বলল, “মগের মুল্লুক পেয়েছিস? তুই কি আদৌ জানিস তুই কী চাইছিস?” মার্কোর চেহারায় এতক্ষণের সেই শান্ত ভাবটা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। তার দীর্ঘদিনের পুষে রাখা আক্রোশ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সে চিৎকার করে বলল, “মগের মুল্লুক ভাবার কোনো কারণ নেই জাভিয়ান। সেদিন যদি তুমি না থাকতে, তবে ওই পাজেল আমিই সমাধান করতাম। cicada প্রজেক্টে তোমার সাথে আমিও ছিলাম অপর প্রান্তে সেটা তুমি হয়ত জানতে কিন্তু আমি জানতাম না নাইট রেভেন আসলে তুমি ছিলে, আমার আগে তুমি সমাধান করে ফেললে। ওই একটা পাসকোডের জন্য আমি বছরের পর বছর তিলে তিলে নিজেকে তৈরি করেছি।
হ্যাকিংয়ের পেছনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছি কেবল সবাই জানতো আমি বই আর লাইব্রেরী নিয়ে ব্যাস্ত কিন্তু আমি নিজেকে তৈরি করেছিলাম এই পৃথিবীটাকে নিজের হাতের মুঠোয় আনতে। আর তুমি সেটা এক নিমিষেই ছিনিয়ে নিলে?” জাভিয়ান বুঝল, মার্কো কোনো সাধারণ লোভী শত্রু নয়। সে এক ব্যর্থ প্রতিভার প্রতিহিংসায় জ্বলছে। ওদিকে বাড়ির সেই নিস্তব্ধ কামরায় তান্বী তখনো জাভিয়ানের ফোনের অপেক্ষায় উন্মাদের মতো ছটফট করছে। সে জানে না, তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি এখন মেক্সিকোর এক অন্ধকার গুদামঘরে নিজের সবচেয়ে কাছের পরিবারের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। জাভিয়ানের মনের ভেতর তখন এক নিঃশব্দ যুদ্ধ চলছে। Cicada 3301 পাজেলটা কেবল একটি কোড নয়, এটি হলো এক ধ্বংসাত্মক চাবি যা মার্কো বা অন্যকারো মতো মানুষের হাতে পড়লে পুরো বিশ্বের মানচিত্র বদলে যাবে। জাভিয়ান কোনোভাবেই এই পরাজয় মেনে নেবে না। তার চোখের সেই ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুন জানান দিচ্ছিল যে লড়াই এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
জাভিয়ান তার রক্তমাখা মুখটা সামান্য তুলে মার্কোর চোখে চোখ রাখল। ব্যথায় তার কপাল কুঁচকে থাকলেও কণ্ঠে ছিল অবিচল কাঠিন্য। সে অত্যন্ত ধীর এবং ভারী গলায় বলল, “দেখ মার্কো, তুই যা চাইছিস তা কোনোদিন সম্ভব নয়। আমি মরে গেলেও তুই এই পাসকোড পাবি না। কারণ এই একটি কোডের সাথে গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা জড়িয়ে আছে। আমি নাইট রেভেন হতে পারি, মাফিয়াদের গডফাদার হিসেবে অন্ধকার জগতের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মানুষ হতে পারি, কিন্তু আমি কোনোদিন দেশদ্রোহী বা সন্ত্রাসবাদী হতে পারব না। ওই কোড ভুল হাতে যাওয়ার অর্থ হলো পুরো পৃথিবীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া। আমি বেঁচে থাকতে সেটা হতে দেব না।”
মার্কোর ঠোঁটের কোণে তখন নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল। সে জানত জাভিয়ান এত সহজে নতি স্বীকার করার পাত্র নয়। সে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে পকেট থেকে রিভলবারটি বের করে রায়হানের দিকে তাক করল। মার্কো অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি জানতাম তুমি এত সহজে পাসকোড দেবে না ব্রো। সেই জন্যই তো রায়হানকে তুলে এনেছি।” কথাটি শেষ হতে না হতেই গুদামঘরের নিস্তব্ধতা চিরে একটি গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। রায়হানের বাম পায়ে বুলেটটি বিঁধে যেতেই সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল। মেঝেতে তাজা রক্তের স্রোত বইতে শুরু করল। মার্কো এবার আরও হিংস্র হয়ে উঠল। সে বন্দুকের নলটি রায়হানের কপালের দিকে তাক করে জাভিয়ানের দিকে ফিরে বলল, “কম্পিউটার তোমার সামনেই আছে। এখনই পাসকোড টাইপ করো। নাহলে এবারের গুলিটা সরাসরি রায়হানের মাথায় গিয়ে লাগবে।”
যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা রায়হান তখন সবটুকু শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল। তার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এলেও কণ্ঠে ছিল অকৃত্রিম আনুগত্য। সে আর্তনাদ করে বলল, “আমি মরে গেলেও আপনি কোড দেবেন না স্যার! এই বেইমানের কাছে কোনোভাবেই মাথা নত করবেন না।”
মার্কো এক কুৎসিত বিদ্রূপের হাসি হাসল। রায়হানের রক্তাক্ত পায়ের দিকে ইশারা করে সে অত্যন্ত নির্লিপ্ত গলায় বলল, “ইশ ব্রো! রায়হান তোমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ ছিল। নিজের পরিবারের চেয়েও বেশি প্রিয় ছিলো ও তোমার।কতবার ও তোমাকে বাঁচিয়েছে আর আজ তুমি ওর মৃত্যুটা এভাবে দাঁড়িয়ে দেখবে?” জাভিয়ানের ভেতরের হাহাকার তখন আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছে। সে পাথরের মতো স্থির থাকার চেষ্টা করলেও তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত আর্তনাদ ফুটে উঠল। সে ধরা গলায় বলল, “দেখ মার্কো, তুই আমাকে শেষ করে দে, যা করার আমার সাথে কর। কিন্তু রায়হানকে ছেড়ে দে। আমি তোকে রিকোয়েস্ট করছি মার্কো, রায়হানকে ছেড়ে দে।” মার্কো এবার জাভিয়ানের খুব কাছে গিয়ে ঝুঁকে দাঁড়াল। তার চোখে তখন পৈশাচিক আনন্দের জোয়ার। সে খুব নিচু স্বরে বলল, “সরি ব্রো! আমি তো জানি তুমি নিজের জান দিলেও কোড দেবে না। তাই শুধু রায়হানকে দিয়ে তোমাকে ভাঙা যাবে না। তুমি কি জানো ভিলা এস্পেরেন্জায় এই মুহূর্তে ঠিক কী হচ্ছে? আমি সেখানেও খেলা সাজিয়ে রেখে এসেছি। আমার বাবা সাইফ চৌধুরী বাড়িতে নেই, শুধু বড় চাচ্চু-চাচি আর তোমার প্রাণের—ওহ সরি, আমার ভাবি তান্বী ওখানে একা। আমি বাড়িতে সিক্রেট বম ফিট করে রেখে এসেছি একটা ফোন কল ঠুস পুরৈ বাড়ি উড়ে যাবে সাছে বড় চাচ্চু- চাচি আর তান্বী।”
‘তান্বী’ নামটা কানে যাওয়া মাত্রই জাভিয়ানের শরীরের রক্ত যেন মাথায় উঠে গেল। হাতের বাঁধন ছিঁড়ে ফেলার এক আপ্রাণ চেষ্টা করে সে হুঙ্কার দিয়ে উঠল, “বাস্টার্ড! শুয়োরের বাচ্চা! তান্বীর যদি বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষতি হয়, তবে তোকে আমি জ্যান্ত কবর দেবো! পৃথিবীর কোনো গর্তে লুকিয়েও তুই নিস্তার পাবি না!” মার্কো একদমই বিচলিত হলো না। সে শান্তভাবে জাভিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল, “রিল্যাক্স ব্রো! এখনো তো কিছু করিনি। একদম কুল থাকো। অপশনটা তোমার কাছে খুব সিম্পল। তুমি কোড দিয়ে দাও, সবাই মুক্ত হয়ে যাবে। এখন তুমিই ঠিক করো—তুমি কার কথা ভাববে? তোমার তান্বী নাকি এই পুরো দুনিয়া? দেখো, আমি কোড নিয়ে তো আর দুনিয়া ধ্বংস করব না, তাই না? শুধু ক্ষমতাটা আমার হাতে থাকবে। আমি দুনিয়ার সামনে আসল ‘নাইট রেভেন’ হিসেবে পরিচিতি পাব, ব্যাস! তুমি তোমার মতো থাকবে, তোমার ওই সাধারণ জীবন আর তান্বীকে নিয়ে।”
জাভিয়ান তখন এক চরম দোটানায়। একদিকে তার নীতি আর গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা, আর অন্যদিকে তার নিঃশ্বাস তার তান্বী। মেক্সিকোর এই বিষণ্ণ রাতে জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী আজ জীবনের সবচেয়ে কঠিন জুয়াড় মুখোমুখি।
জাভিয়ান এবার মুখ খুললো সামান্য বিদ্রুপ হেসে বললো ” আমিও ভাবতাম মার্কো রেয়েস চৌধুরী, চৌধুরী বংশের ছেলে হয়েও এতোটা ইনোসেন্ট কিভাবে, কিভাবে সারাদিন নীতি আর বই পুস্তক নিয়ে পড়ে থাকে। তবে আজ তুই প্রমান করেছিস তোর শরীরে আসলেই মেইলস্ট্রোমের রক্ত বইছে।” মার্কো কিঞ্চিত হেসে জবাব দিলো ” জী সাথে তোমার রক্তও আছে আমার শরীরে।”
মার্কো এবার তার তুরুপের শেষ তাসটি চালল। টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপের স্ক্রিনে সে সিসিটিভি ফুটেজ চালু করে জাভিয়ানের চোখের সামনে ধরল। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে ভিলা এস্পেরেন্জার ড্রয়িংরুম, যেখানে তান্বী উন্মাদের মতো পায়চারি করছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ফুটে উঠছে গভীর অস্থিরতা। ফুটেজ বদলে মার্কো এবার বাড়ির নিচে লুকিয়ে রাখা সেই বিধ্বংসী টাইম-বোমাটি দেখাল, যার লাল ডিজিটাল সংখ্যাগুলো মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
জাভিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে ধরা গলায় বলল, “মার্কো, তুই জীবনে সবচেয়ে বড় ভুলটা করছিস।” মার্কো বিদ্রূপের হাসি হেসে জবাব দিল, “এত হেজিটেট ফিল হচ্ছে কেনো তোমার? ওই কোড কি তোমার কাছে তান্বী জীবনের চেয়েও বেশি ইম্পর্ট্যান্ট? এখন তো মনে হচ্ছে তুমি নিজেও তোমার ওই ক্ষমতার মোহকে সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসো।”
জাভিয়ান আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। তার কাছে গোটা পৃথিবী একদিকে, আর তার জান, জীবন—তার জিন্নীয়া একদিকে। পৃথিবীর সব নীতি আর সুরক্ষার চেয়ে তান্বীর জীবনের মূল্য তার কাছে অনেক অনেক বেশি। এক মুহূর্তের সেই কঠিন দ্বৈরথ কাটিয়ে সে কোনো প্রকার সংকোচ ছাড়াই cicada 3301 পাজেলের এর সেই অতি গোপনীয় পাসকোডটি মার্কোর হাতে তুলে দিল। মার্কো পৈশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়ল। সে দ্রুত কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে পুরোনো পাসকোডটি বদলে ফেলে নিজের তৈরি নতুন একটি কোড সেখানে বসিয়ে দিল। পুরো সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ নিজের দখলে নিয়ে সে জাভিয়ানের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাল।
মার্কো তার বন্দুকটি খাপে ভরতে ভরতে বলল, “রাখলাম তোমাদের দুজনকে জীবিত। আপাতত ছেড়ে দিচ্ছি, তবে খবরদার! উল্টোপাল্টা কিছু করার চেষ্টা করবে না। হিতে বিপরীত হতে সময় লাগবে না। আমার সাথে পরে কোনো রকম চালাকি করার চেষ্টা করলে এই দুনিয়ার এমন অনেক গোপন তথ্য আমি ফাঁস করে দেব, যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।”
গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তান্বী যখন তন্দ্রার ঘোরে ছিল, তখন হঠাৎ এক পরিচিত অস্তিত্বের স্পর্শে তার ঘুম ভেঙে গেল। সারা দিনের দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তিতে শরীরটা ভেঙে আসছিল, কিন্তু সেই চিরচেনা ঘ্রাণ নাকে আসতেই তার সবটুকু ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। কেউ একজন তাকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। তান্বী মুহূর্তেই বুঝতে পারল এই বলিষ্ঠ হাত দুটো কার। সে নিজেকে কিছুটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ভাঙা গলায় বলে উঠল, “কোথায় ছিলেন আপনি কাল থেকে? একটা ফোন পর্যন্ত করেননি! আপনি জানেন আমি কতটা চিন্তায় ছিলাম? পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম আমি!” জাভিয়ান কোনো উত্তর না দিয়ে তান্বীর ঘাড়ের কাছে মুখ গুজল। তার শরীরের তপ্ত নিঃশ্বাস তান্বীর ত্বকে অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলল। দীর্ঘ চব্বিশ ঘণ্টার সেই বিভীষিকা আর ত্যাগের ক্লান্তি জাভিয়ানের কণ্ঠে এক গভীর কোমলতা এনে দিয়েছে।
সে অত্যন্ত শান্ত আর ধরা গলায় বলল, “রিল্যাক্স জিন্নীয়া। ফিরে এসেছি তো তোমার কাছে, তাই না? এখন একদম চুপটি করে থাকো তো। অনেক কাজ শেষ করে ফিরেছি, একটু মন ভরে তোমাকে জড়িয়ে ধরতে দাও।” তান্বীর সব অভিমান জাভিয়ানের ওই একটা অনুরোধে ধুলোয় মিশে গেল। সে আর কোনো প্রশ্ন করল না, কেবল নিজেকে সঁপে দিল জাভিয়ানের সেই সুরক্ষিত আলিঙ্গনে। জাভিয়ান তান্বীকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। মেক্সিকোর সেই রক্তঝরা রাতের পর এই মুহূর্তটুকু যেন তার কাছে এক টুকরো স্বর্গ। সে তান্বীর কপালে পরম মমতায় ঠোঁট ছোঁয়াল, তান্বী জানল না, তাকে ফিরে পেতে তার জাভিয়ান আজ নিজের অস্তিত্বের এক বিশাল অংশ বিসর্জন দিয়ে এসেছে।
সকালের প্রথম আলো যখন জানালার পর্দা চিরে ঘরে প্রবেশ করল, তান্বীর চোখ পড়ল জাভিয়ানের দিকে। জাভিয়ানের মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ দেখে তান্বী আৎকে উঠল। গত রাতের সেই দীর্ঘ উৎকণ্ঠা মুহূর্তেই এক নতুন আতঙ্কে রূপ নিল।
সে কম্পিত স্বরে জিজ্ঞেস করতেই জাভিয়ান ঘুমঘোরে থাকা চোখ দুটো আধবোজা রেখেই খুব শান্তভাবে বলল,
“আরে, তেমন কিছু হয়নি। ছোটখাটো একটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছিলাম, তাই এই সামান্য চোট।” তান্বীর দুশ্চিন্তা কমলো না, বরং তার চোখ ভিজে এলো। সে অভিমানের সুরে বলল, “এই জন্যই আমার মনটা কালকে থেকে বারবার কু ডাকছিল। রাতে যখন ফিরলেন, তখন কেন বললেন না আমাকে?” জাভিয়ান আলতো করে তান্বীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, “এত চিন্তা করতে হবে না জিন্নীয়া, খুব সামান্য ব্যথা। দুপুরে একবার হসপিটালে যাব।” তান্বী অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “হসপিটালে কেন?” জাভিয়ান একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানাল, “আসলে রায়হানও ওই একই অ্যাক্সিডেন্টের শিকার হয়েছে। ও এখন হসপিটালে ভর্তি আছে।” তান্বীর বুকটা ধক করে উঠল। গত চব্বিশ ঘণ্টার সেই ভয়াবহতা যেন তাসের ঘরের মতো তার সামনে খুলে যাচ্ছে। সে বিচলিত হয়ে জানতে চাইল, “এত কিছু হয়ে গেল! রায়হান ভাইয়া এখন কেমন আছে?” জাভিয়ান তখন নিজের ভেতরের সেই বিষাক্ত স্মৃতিগুলো আড়াল করে নিয়ে খুব নিরাসক্ত গলায় বলল, “হুম, ওই ভালোই আছে এখন।” জাভিয়ান জানে, রায়হানের গুলি খাওয়া আর মার্কোর সেই বিশ্বাসঘাতকতার গল্প তান্বীকে বলা সম্ভব নয়।
দুপুরের দিকে হসপিটালে পৌঁছানোর পর জাভিয়ান আর তান্বী সরাসরি রায়হানের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। কেবিনে রায়হানের পাশে একটি মেয়েকে বসে থাকতে দেখে জাভিয়ান কিছুটা অবাক হলো। রায়হান জাভিয়ানকে দেখেই সপ্রতিভ হয়ে উঠল এবং মেয়েটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, “স্যার আসুন, ও হচ্ছে মিলা। ওর সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।” জাভিয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে কিছুটা কৌতুহলী স্বরে প্রশ্ন করল, “রায়হান, তোমার আবার কবে বিয়ে ঠিক হলো? আমাকে তো একবারও বললে না?”
রায়হান মৃদু হেসে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “স্যার, এই বিয়ের আয়োজন নিয়েই তো গত কয়েকদিন প্রচণ্ড ব্যস্ত ছিলাম। আর আপনি তো সবসময়ই বলতেন যে আপনি বেঁচে থাকতে আমাকে কোনদিন বিয়ে করতে দেবেন না। অথচ দেখুন স্যার, কালকে তো প্রায় কবরেই চলে যাচ্ছিলাম, বিয়ের স্বাদ আর পাওয়া হতো না।” রায়হানের এই রসিকতা শুনে জাভিয়ান আর গম্ভীর থাকতে পারল না, সে মৃদু হেসে উঠল। কেবিনের সেই থমথমে পরিবেশটা মুহূর্তেই হালকা হয়ে গেল। এদিকে তান্বী খুব সহজভাবে মিলার সাথে আলাপ শুরু করল এবং কিছুক্ষণ তাদের মধ্যে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ কথাবার্তা চলল। আলাপের এক পর্যায়ে যখন তান্বী আর মিলা কিছুটা দূরে সরে গেল, তখন রায়হান নিচু স্বরে জাভিয়ানের কাছে বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চাইল। জাভিয়ানের চোখের দৃষ্টি আবার সেই আগের মতো তীক্ষ্ণ আর শীতল হয়ে এলো। সে রায়হানের কানের কাছে মুখ নিয়ে অত্যন্ত সংক্ষেপে শুধু এটুকুই বলল, “মার্কো এখনো বাড়ি ফেরেনি।” জাভিয়ানের এই একটি বাক্যেই রায়হান বুঝতে পারল যে মেক্সিকোর এই শান্ত দুপুরের আড়ালে কোনো এক প্রলয়ংকরী ঝড় দানা বাঁধছে, যার শেষ এখনো অনেক দূরে।
দূদিন সময় পেরিয়ে গেছে আরো। মেক্সিকোর আজকের শান্ত সকালটি কোনো এক অজানা বিপদ বয়ে এনেছে। ভিলা এস্পেরেন্জার চারপাশ গত দুদিন ধরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকলেও আজ ভোরের আলো ফুটতেই সেই নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে ভেঙে গেল। হঠাৎ সাইরেনের বিকট শব্দে কেঁপে উঠল পুরো এলাকা। ছাদে ড্রোন উড়তে লাগলো। পুলিশ, সিআইডি এবং বিশেষ কমান্ডো বাহিনীর এক বিশাল বহর মুহূর্তের মধ্যে বাড়িটিকে এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করল। মেক্সিকোর আকাশের নীল রঙ ঢাকা পড়ে গেল ধুলো আর যান্ত্রিক গর্জনে। সশস্ত্র জওয়ানরা পজিশন নিতেই মাইকিং শুরু হলো— “জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী, আপনাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে! নিজেকে আইনের হাতে সঁপে দিন!” এই রণংদেহী ডাক শুনে সায়েম চৌধুরী আর সাইফ চৌধুরী হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। তাদের চোখেমুখে তখন রাজ্যের বিস্ময় আর আতঙ্ক। “কী হয়েছে অফিসার? আমার ছেলে কী করেছে?” সায়েম চৌধুরীর এই আর্তনাদ মিডিয়ার ক্যামেরার ক্লিক আর সাংবাদিকদের শোরগোলে হারিয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির সদর দরজা ঠেলে বেরিয়ে এল জাভিয়ান। তার পরনে ছিল সাধারণ একটি ধূসর শার্ট, কিন্তু চলনে ছিল সেই চিরচেনা আভিজাত্য। যেন কোনো কয়েদি নয়, বরং এক সম্রাট তার সাম্রাজ্য ছেড়ে বিদায় নিচ্ছে। তার ওই শান্ত ভঙ্গি দেখে খোদ অফিসাররাও থমকে দাঁড়াল। ইন্টারন্যাশনাল পুলিশের একটি চৌকস দল কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে জাভিয়ানের সামনে এসে দাঁড়াল। মুহূর্তের মধ্যে জাভিয়ানের দুই হাত রুপালি হাতকড়ায় বন্দী হলো। পরিবারের সবাই যেন এক নিমেষে জীবন্ত পাথরে পরিণত হলেন। তান্বী তখন ভিড় ঠেলে পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে জাভিয়ানের দিকে এগোতে চাইল। “জাভিয়ান” কিন্তু সশস্ত্র রক্ষীদের মানবপ্রাচীর তাকে ছুঁতেও দিল না জাভিয়ানকে। জাভিয়ান যখন পুলিশের গাড়িতে গিয়ে বসল, তার দৃষ্টি একবারের জন্য স্থির হলো তান্বীর ওপর। সেই গভীর চাহনিতে কোনো ভয় ছিল না, ছিল কেবল এক নিগুঢ় রহস্য। কোনো আইনি ওয়ারেন্ট পড়ার আগেই সাইরেন বাজিয়ে কনভয়টি ছুটতে শুরু করল। সায়েম চৌধুরী আর সাইফ চৌধুরী কালক্ষেপণ না করে নিজেদের গাড়িতে উঠে পুলিশের পিছু নিলেন।
তান্বী তখন দিশেহারা। মেক্সিকোর রাজপথে দাঁড়িয়ে সে কেবল ধুলো ওড়া দেখল। এক সেকেন্ডের জন্য সে ভেঙে পড়লেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত একটি ট্যাক্সি থামাল। কাঁপানো গলায় সে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল, “ওই গাড়িবহরকে ফলো করুন! যেকোনো মূল্যে!” মেক্সিকোর সেই উজ্জ্বল সকালটি নিমিষেই এক অন্ধকার অনিশ্চয়তায় ঢাকা পড়ে গেল। তান্বী জানত না এই যাত্রা তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, কিন্তু সে জানত— জাভিয়ানকে ফিরিয়ে আনার লড়াইটা মাত্র শুরু হলো।
মেক্সিকোর আকাশ-বাতাস আজ যেন এক বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। টেলিভিশন পর্দার উজ্জ্বল আলোয় বারবার ভেসে উঠছে সেই দুর্ধর্ষ শিরোনাম—**”ধরা পড়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাট ‘নাইট রেভেন’!”**সাধারণ মানুষ আর বড় বড় মাফিয়াদের কাছে যে ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, আজ তার পরিচয় কেবলই একজন ‘ইন্টারন্যাশনাল টেরোরিস্ট’। সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত কঠোর ভাষায় প্রচার করছে যে, জাভিয়ান কেবল একজন মাফিয়ার গডফাদার ছিলো না; সে ছিলো অপরাধ জগতের সেই অদৃশ্য গডফাদার, যার ইশারায় পুরো ডার্ক ওয়েবের নেটওয়ার্ক চলত। বিশ্বজুড়ে কেউ কোনোদিন যে **’Cicada 3301’** পাজেলটি সমাধান করতে পারেনি, জাভিয়ান তা করে ফেলেছিলো। আর সেই কোড এক্সপোজ হওয়ার সাথে সাথে ডার্ক ওয়েবের হাজারো গোপন তথ্য এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং খাতের তথ্য ফাঁস হয়ে গেছে। জাভিয়ানকে বহনকারী পুলিশের কনভয়টি যখন সাইরেন বাজিয়ে ছুটছিল, তখন সেটি কোনো সাধারণ আদালতের দিকে গেল না। শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে কনভয়টি ঢুকে পড়ল ইন্টারপোলের একটি অতি-সুরক্ষিত ‘ব্ল্যাক সাইট’ বা গোপন ডিটেইনমেন্ট সেন্টারে। আদালতে তোলার আগে জাভিয়ানকে একটি সাউন্ডপ্রুফ জেরা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে বিশেষ অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা তাকে ঘিরে ধরল। তাদের মূল লক্ষ্য Cicada 3301 এর মাধ্যমে সে আর কী কী তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে তা বের করা। জাভিয়ান সেখানেও সেই একই গাছাড়া ভাব নিয়ে বসে রইল, যেন এই হাতকড়া তার আভিজাত্যে কোনো আঁচড় কাটতে পারেনী।ওদিকে সেই গাড়িবহরের পিছু নিয়েছে সায়েম চৌধুরীর গাড়ি, আর তারও পেছনে এক বুক হাহাকার নিয়ে ধুলো উড়িয়ে ছুটছে তান্বীর ট্যাক্সি। ট্যাক্সির ভেতর বসে তান্বী অবিশ্বাসের সাথে নিজের ফোনের স্ক্রিনে দেখছে।ফোনের পর্দায় দ্রুত ধাবমান সংবাদ শিরোনামগুলো দেখে তান্বীর চোখের সামনে পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে এল। যে মানুষটাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছে, সে আসলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র
অধিপতি ‘নাইট রেভেন’! এই রূঢ় সত্যটা অনুধাবন করার আগেই বিশ্বজুড়ে তাকে এক ভয়ানক সন্ত্রাসবাদী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হলো। তান্বী অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল, “জাভিয়ান কেন এসব করতে যাবে? তার ছি কলঙ্ক মিথ্যে…”। তার বুক চিরে এক দীর্ঘ হাহাকার বেরিয়ে এল; সে জানেষা,এই বিষাক্ত অপবাদের অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক নিঃস্বার্থ ত্যাগের মহাকাব্য।
এদিকে শহরের এক নিভৃত আস্তানায় বসে মার্কো তখন উন্মাদের মতো চিৎকার করছিল। তার সুনিপুণ পরিকল্পনাগুলো মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। সেদিন যখন সে জাভিয়ানের কাছ থেকে জোরপূর্বক পাসকোডটি ছিনিয়ে নিয়ে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, তখন সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি যে তার সিস্টেমটি অন্য কেউ হ্যাক করে রেখেছে। সেই রহস্যময় হ্যাকার চোখের পলকে কোড জেনে যায় আর সমস্ত সংবেদনশীল তথ্য ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে দেয়, যার পুরো দায়ভার গিয়ে বর্তায় জাভিয়ানের কাঁধে। মার্কো প্রথমে ক্রোধে ফেটে পড়লেও হঠাৎ তার অধরে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবল, “ভাগ্যিস কোডটা আগেভাগেই ফাঁস হয়ে গেছে! আজ যদি আমি নিজেকে নতুন ‘নাইট রেভেন’ হিসেবে পৃথিবীর সামনে ঘোষণা করতাম, তবে জাভিয়ানের জায়গায় এই হাতকড়া আমার কবজিতে থাকত”। জাভিয়ান গ্রেফতার হওয়ায় মার্কো কার্যত এক ঢিলে দুই পাখি মারল—চিরতরে তার পথের কাঁটা অপসারিত হলো, আবার সে নিজেও এক ভয়ানক আইনি বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেল।
মার্কো জানালার ওপাশে থাকা মেক্সিকোর ব্যস্ত রাজপথের দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক শান্তিতে হাসল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দিনের কথা। বিষণ্ণ গলায় সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “মনে পড়ে জাভিয়ান? তোর বাবা-মায়ের অ্যানিভার্সারির সেই রাতটা? সেদিন তুচ্ছ কারণে তুই আমাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলি সবার সামনে। আমি কতদিন যাবত হাঁটতে পারিনি সেটা আমি আজও ভুলিনি।”
মার্কোর দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির মতো তার কণ্ঠ দিয়ে ঝরতে লাগল। সে বলতে থাকল, “সম্পদ, আভিজাত্য আর ক্ষমতা—সবই তো তোর একার ছিল। একই বংশের রক্ত আমার গায়েও বইছে, অথচ তুই সব পাবি আর আমি ধুলোর মতো তোর পেছনে পড়ে থাকব? এটা আমি মেনে নিতে পারিনি জাভিয়ান। আমি জানতাম তোকে শারীরিকভাবে হারানো সম্ভব নয়, তাই তোর সবচেয়ে বড় শক্তিটাকেই তোর বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলাম।”
সে ল্যাপটপের স্ক্রিনে জাভিয়ানের গ্রেফতার হওয়ার দৃশ্যটা বারবার দেখতে দেখতে পৈশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়ল। “এখন দেখ, অতি ক্ষমতা আর ওই নাইট রেভেনের অহংকার কীভাবে তোর ধ্বংস ডেকে আনে। দুনিয়ার চোখে তুই এখন শুধু অপরাধীই নোস, তুই একজন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী। তোর ওই তান্বী, তোর পরিবার—সবাই এখন তোর নামের কালিমায় জ্বলবে। তুই আমাকে শূন্য হাতে রেখেছিলি, আজ আমি তোকে তার চেয়েও বড় শূন্যতার মাঝে ঠেলে দিলাম।”
ইন্টারপোলের সেই সুরক্ষিত ব্ল্যাক সাইটের সদর দরজায় পা রাখতেই সায়েম চৌধুরীকে কয়েকশ ক্যামেরা আর লেন্সের তীক্ষ্ণ নজর ঘিরে ধরল। গণমাধ্যমের কর্মীরা যেন ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা হাজারো প্রশ্নের বাণে তিনি তখন দিশেহারা। একজন সাংবাদিক চিৎকার করে উঠলেন, “মিস্টার সায়েম চৌধুরী, আপনি মেক্সিকোর একজন আদর্শ বিজনেস টাইকুন হিসেবে পরিচিত, অথচ আপনার ঘরেই বড় হয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত সম্রাট ‘নাইট রেভেন’! সে শুধু একজন মাফিয়া নয়, বরং একজন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী। বাবা হয়েও কি আপনি এসব জানতেন না?” এতক্ষণ তিনি কেবল গ্রেফতারের কথা জানতেন, কিন্তু জাভিয়ানের বিরুদ্ধে ওঠা এই বিধ্বংসী অভিযোগগুলো শুনে তাঁর পায়ের তলার মাটি সরে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর আদর্শবাদী সত্তা চরম অপমানে দগ্ধ হতে লাগল। স্থির গলায় ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, “আমি জানতাম না আমার বাড়িতে এমন একজন অপরাধী বড় হচ্ছে। আমার ছেলে এমন হীন আর দেশদ্রোহী কাজ করতে পারে, তা কল্পনাও করিনি।” তাঁর কণ্ঠে তখন মমতার শেষ বিন্দুটিও উবে গেছে। তিনি আরও যোগ করলেন, “আজ তাকে নিজের সন্তান বলতেও আমার লজ্জা লাগছে। যে দেশের ক্ষতি করতে পারে, সে আমার কেউ নয়।”
দূরে ট্যাক্সির ভেতর বসে তান্বী যখন এই কঠোর বাণীগুলো শুনছিল, তখন সে যন্ত্রণায় পাথর হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল জাভিয়ান আজ আক্ষরিক অর্থেই একা হয়ে গেছে। তাঁর নিজের রক্তও আজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সায়েম চৌধুরীর এই প্রকাশ্য ত্যাজ্য করার ঘোষণা যখন জাভিয়ানের কানে পৌঁছাল, তার ঠোঁটের কোণে এক বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। সে জানত, এটাই হওয়ার ছিল। ব্ল্যাক সাইটের সেই রণক্ষেত্রে তান্বী পাগলের মতো জাভিয়ানের দিকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সশস্ত্র প্রহরীদের মানবপ্রাচীর তাকে নিষ্ঠুরভাবে আটকে দিল। তান্বী আর্তনাদ করে জাভিয়ানের নাম ধরে ডাকতে লাগল, ঠিক সেই মুহূর্তে জাভিয়ানের চাচা সাইফ চৌধুরী তান্বীর হাত শক্ত করে ধরে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে আনলেন। গম্ভীর ও ক্রুদ্ধ স্বরে তিনি বললেন, “এখানে চিৎকার করে কোনো লাভ নেই তান্বী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বাসায় চলো, নয়তো আমাদেরও জাভিয়ানের সাথে জালে জড়াতে হবে।” তান্বী বুঝতে পারল এখন আবেগে ভেঙে পড়লে চলবে না, মস্তিষ্ক ঠান্ডা রাখা জরুরি। সে প্রবল কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে সাইফ চৌধুরীর সাথে গাড়িতে উঠল। কিন্তু ভিলা এস্পেরেন্জায় পৌঁছানোর পর তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরও ভয়াবহ দৃশ্য। উত্তেজিত জনতা আর প্রতিবাদকারীরা জাভিয়ানের টেরোরিস্ট হওয়ার খবর পেয়ে বাড়িতে হামলা চালাচ্ছে। দেয়ালের গায়ে লেপটে দেওয়া হচ্ছে ঘৃণার কালিমা। সায়েম চৌধুরী জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে আবারও ঘোষণা করলেন যে, জাভিয়ানের এই অন্ধকার জগতের সাথে পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই। জাভিয়ান যে এত বড় দেশদ্রোহী, তা তাঁরা আগে জানতেন না এবং এখন তারা কোনোভাবেই তার পাশে নেই।
বাড়ির ভেতরে তখন এক থমথমে পরিবেশ। জাভিয়ানের মা অস্থির হয়ে বেরিয়ে আসলে সায়েম চৌধুরী তাকে রূঢ় সত্যটা জানালেন। জাভিয়ান যে ‘নাইট রেভেন’ এবং তাকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা শুনে একজন মা হিসেবে তার বুকটা হাহাকার করে উঠল। নিজের সন্তানের জন্য তার প্রাণ কাঁদলেও, পুরো দুনিয়ার ঘৃণা আর স্বামীর কাঠিন্যের সামনে তিনি কেবল নিরবে চোখের জল ফেলতে লাগলেন। তান্বী সিঁড়িতে বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
জেরা শেষে জাভিয়ানকে একটি উচ্চ-নিরাপত্তাসম্পন্ন বুলেটপ্রুফ কনভয়ে তোলা হলো। সাইরেন বাজিয়ে গাড়িগুলো যখন মেক্সিকো সিটির ব্যস্ত রাস্তা চিরে ছুটছিল, জাভিয়ান জানালার ওপাশে তাঁর তিলে তিলে গড়া সাম্রাজ্যের পতন দেখছিল। তাকে নিয়ে যাওয়া হলো মেক্সিকোর সবচেয়ে দুর্ভেদ্য জেলখানা—’আলতিপ্লানো’-তে। সেখানে প্রবেশের পর জাভিয়ানের দামী শার্ট কেড়ে নিয়ে তাকে পরিয়ে দেওয়া হলো কয়েদিদের কর্কশ ধূসর পোশাক। তাকে রাখা হলো একটি ‘হাই-সিকিউরিটি আইসোলেশন’ সেলে, যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা তাকে প্রতি সেকেন্ডে পর্যবেক্ষণ করছিল।
পরেরদিন…
মেক্সিকোর বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ আজ এক রণক্ষেত্র। শত শত ক্যামেরা আর ঘৃণাভরা স্লোগানের মাঝ দিয়ে যখন জাভিয়ানকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তার চারপাশে সশস্ত্র গার্ডদের এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই ভিড়ের মাঝে ধুলোবালি মেখে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে জাভিয়ান একবারের জন্যও দেখল না।কাঠগড়ায় যখন জাভিয়ান এসে দাঁড়াল, তান্বী তাকিয়ে দেখলো জাভিয়ানের পরনে আভিজাত্যের সেই শার্ট নেই; বরং কয়েদিদের জন্য নির্ধারিত কর্কশ ধূসর পোশাকটি তার চওড়া কাঁধকে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ঢেকে রেখেছে। বিচারক গম্ভীর স্বরে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট পাঠ করছিলেন। অভিযোগের পাহাড়—’নাইট রেভেন’ কোডনেইমে অপরাধ জগৎ শাসন এবং ‘cicada 3301 ‘ নামক পাজেলের জটিল কোডটি এক্সপোজ হয়ে পুরো পৃথিবীর ডার্ক ওয়েবের গোপন তথ্য এবং ব্যাংকিং তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া। জাভিয়ানের দৃষ্টি তখন সামনের দেয়ালের কোনো এক বিন্দুতে স্থির। সে যেন এই জগতের উর্ধ্বে এক অন্য গ্রহের বাসিন্দা, যেখানে কারো ঘৃণা বা ভালোবাসা তাকে স্পর্শ করতে পারছে না।
আদালত কক্ষের এক কোণে ভিড়ের চাপে পিষ্ট হতে হতে তান্বী ডুকরে কেঁদে উঠল। তার চোখের তপ্ত লোনা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, যা গার্ডদের নিষ্ঠুর ব্যারিকেড মানছে না। সে বারবার জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছিল, একটা ইশারা বা অন্তত এক পলক অবজ্ঞার জন্য হলেও ব্যাকুল ছিল সে। আদালত কক্ষের সেই রুদ্ধশ্বাস পরিবেশে জাভিয়ান যখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল, তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল এক জোড়া সজল চোখ, যে চোখ দুটির মালিক ভিড়ের মাঝে পিষ্ট হতে হতে বারবার তাঁর নাম ধরে ডাকছিল। জাভিয়ান জানত, তান্বী সেখানে আছে। সে জানত, তাঁর সামান্যতম করুণ দৃষ্টির জন্য মেয়েটি চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত হয়ে তাকিয়ে আছে। কিন্তু জাভিয়ান একবারের জন্যও ঘাড় ফেরাল না। ওদিকে সায়েম চৌধুরী যখন বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করছিলেন যে, জাভিয়ান তাঁর কেউ নয় এবং এমন দেশদ্রোহী অপরাধীর ঠাঁই কেবল অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, তখন জাভিয়ানের মায়ের দুচোখ বেয়ে কেবল হালকা অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। যা সায়েম চৌধুরীর কঠোর পৌরুষের কাছে অত্যন্ত নগণ্য। সাইফ চৌধুরী তখন তান্বীর ওপর কড়া নজর রাখছিলেন, পাছে মেয়েটি কোনো পাগলামি করে পরিবারের বিপদ আরও বাড়িয়ে না দেয়। বিচারক যখন জাভিয়ানের জন্য ‘যাপিত জীবন’ বা আমৃত্যু কারাদণ্ডের প্রস্তাব করলেন, তখন পুরো আদালত কক্ষ উল্লাসে ফেটে পড়ল। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝে তান্বী কেবল অনুভব করল তার পায়ের তলার মাটিটা দ্রুত সরে যাচ্ছে। জাভিয়ান একইভাবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, হাতকড়া পরা হাত দুটি তার স্থির সংকল্পের পরিচয় দিচ্ছিল। জাভিয়ান খুব ভালো করেই জানত, সে যদি এখন একবার তান্বীর চোখের দিকে তাকায়, তবে সেই মায়া আর হাহাকারের সমুদ্রে সে নিজেও তলিয়ে যাবে। তান্বীর চোখে চোখ রাখা মানেই নিজের এই মুহূর্তে গড়ে তোলা সব কঠিন প্রতিরোধ নিমিষেই ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া। নিজের চরম দুর্বলতা সে কারও সামনে, এমনকি তান্বীর সামনেও প্রকাশ করতে চায় না।
জাভিয়ানের এই নিষ্ঠুর অবহেলা ছিল আসলে এক গভীর ভালোবাসা। সে জানত, সে যদি এখন তান্বীর দিকে ফিরে তাকায়, তবে তান্বী আরও বেশি ভেঙে পড়বে। তাঁর সামান্যতম আবেগ তান্বীকে এক নিরাময়হীন যন্ত্রণার মুখে ঠেলে দেবে। মেয়েটিকে এই কলঙ্কিত ছায়া থেকে নিরাপদ রাখতে আর নিজেকে শক্ত রাখতে সে এক চরম অভিনয়ের আশ্রয় নিল। সে যখন আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, গার্ডরা তাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময়ও সে একবার তান্বীর দিকে ফিরে তাকাল না। তখনো সে নিজের চোখের কোণে জমে থাকা জলকে এক অমানবিক জেদে আটকে রেখেছিল। সে জানত না, এই না তাকানোটা তান্বীর বুকেও এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে, যা হয়তো কোনোদিন মুছে যাবে না। রাত নামল মেক্সিকোর আকাশে। আলতিপ্লানো কারাগারের লোহার ফটক যখন জাভিয়ানের পেছনে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল, তান্বী তখন সেই বিচারকক্ষের মেঝের ধুলোয় বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
অবশেষে মার্কো যখন ভিলা এস্পেরেন্জায় পা রাখল, তার চোখেমুখে এক কৃত্রিম শোকের প্রলেপ। অত্যন্ত সুনিপুণ গাম্ভীর্য ধরে রেখে সে এমন এক আবহে নিজেকে উপস্থাপন করল, যেন জাভিয়ানের এই পতনে সে নিজেও ভেতরে ভেতরে চূর্ণ-বিচূর্ণ। বাড়ির থমথমে ও অস্থির পরিবেশের বুক চিরে সে ধীরপায়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তান্বী তখন দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল নির্জীব পাথরের মতো। মার্কোকে দেখতেই সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মতো ছুটে এল। কান্নাভেজা কণ্ঠে তান্বী আর্তনাদ করে উঠল, “মার্কো ভাইয়া, আপনি এসেছেন আপনি কোথায় ছিলেন?? জাভিয়ান কি আর কোনোদিন ফিরে আসবে না? বাড়ির কেউ তো আমাকে কিচ্ছু বলছে না! কাল থেকে যাকে জিজ্ঞেস করছি, সে-ই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আপনি বলুন না, কিভাবে ওকে ফিরিয়ে আনবো?” মার্কো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল। অত্যন্ত নিচু স্বরে সে বলল, “দেখো তান্বী, এটা সাধারণ কোনো কেস নয়। জাভিয়ান যে অপরাধে ফেঁসেছে, তাতে আমরা কিছু করতে গেলে পুলিশ আমাদেরও জালে জড়াবে। পুরো পরিবার এখন কড়া নজরদারিতে আছে।” তান্বী এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে মার্কোর পা জড়িয়ে ধরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। তার বুকফাটা চিৎকারে ঘরের দেয়ালগুলো যেন কেঁপে উঠছিল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি কিছু বুঝতে পারছি না ভাইয়া! আমি কী করব? আপনি প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন। কী করলে জাভিয়ানকে ছাড়ানো যাবে? যা করতে বলবেন আমি তাই করব, শুধু ওকে ফিরিয়ে আনুন!” মার্কো নিচু হয়ে তান্বীর দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক পৈশাচিক শীতলতা। সে ফিসফিস করে বলল, “শোনো তান্বী, কোর্ট অলরেডি রায় দিয়ে দিয়েছে—ওর আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়ে গেছে। আর আমি যতটুকু জানি, সরকার ওকে বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখবে না। খুব শীঘ্রই ওকে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে।”
‘ক্রসফায়ার’ শব্দটা শোনামাত্র তান্বী শিউরে উঠল। এক অজানা আতঙ্কে তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে আরও শক্ত করে মার্কোর পা আঁকড়ে ধরল। মার্কো এবার নির্লিপ্তভাবে তান্বীর হাত ছাড়িয়ে দিয়ে তাকে উঠে দাঁড়াতে ইশারা করল। সে অত্যন্ত রহস্যময় গলায় বলল, “শান্ত হও তান্বী। এখনো এক শতাংশ আশা বাকি আছে। এই পৃথিবীতে কেবল একজনই পারে জাভিয়ানকে এই নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে আনতে।” তান্বী তার চোখের জল মুছে রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইল, “কে? কার কাছে যেতে হবে আমাকে?” মার্কো জানালার ওপাশে জমাট বাঁধা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে উচ্চারণ করল,মেইলস্ট্রৌম (Maelstrom)!
নামটা শোনামাত্রই ঘরের ভেতরের বাতাস যেন এক নিমিষে ভারী হয়ে এল। তান্বী জানত এই নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর জগত, সেখানে পা রাখা মানেই নিজের আত্মাকে বাজি রাখা। জাভিয়ানকে ফিরে পাওয়ার নেশায় তান্বী এখন সেই নরকের পথে পা বাড়াতেও প্রস্তুত।
তান্বী তখন অশ্রুসজল চোখে মার্কোর দিকে তাকিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বলল, “আমি কোনোকিছুর ভয় আর করি না। আমাকে দয়া করে ওই ঝড়তুফান ভাইয়ার কাছে নিয়ে চলুন। জাভিয়ানকে বাঁচাতে আমাকে যা করতে হবে, আমি তাই করব।”
মার্কো তান্বীর এই মরিয়া ভাব দেখে মনে মনে তার পরবর্তী চালটি ঠিক করে নিল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল, যা তান্বীর অশ্রুসিক্ত চোখ খেয়াল করতে পারল না। সে গলার স্বর কিছুটা নিচু করে অত্যন্ত গম্ভীরভাবে বলল, “ঠিক আছে, তবে জানোইতো—মেইলস্ট্রৌম সাধারণ কোনো মানুষ নয়। সেখানে একবার পা রাখলে ফেরার পথ খুব কঠিন হয়ে যাবে। তুমি যখন ঠিক করেই ফেলেছ, তবে কাল সকালে তৈরি থেকো। আমি তোমাকে নিয়ে যাব।” তান্বী নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সায় দিল। সারা রাত তার চোখের পাতা এক হলো না। একদিকে জাভিয়ানের সেই নির্লিপ্ত মুখ, আর অন্যদিকে মেইলস্ট্রৌম নামক এক অজানা বিভীষিকা। সে জানত না যে মার্কো তাকে সাহায্যের অযুহাতে এক গভীর খাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
জাভিয়ানের পতনের খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তেই লুসিয়া আর ফারহান আর স্থির থাকতে পারল না। জাভিয়ানের মতো আভিজাত্যের প্রতীক এমন একজন মানুষের এই আকস্মিক এই অবস্থা আর ‘নাইট রেভেন’ হিসেবে তার পরিচয় প্রকাশ পাওয়াটা তাদের কাছে ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। তারা দুজনেই অবশেষে হন্তদন্ত হয়ে ভিলা এস্পেরেন্জার সদর দরজায় এসে পৌঁছাল, কিন্তু সেখানে পাহাড়ের মতো অটল হয়ে তাদের পথ আটকে দাঁড়াল মার্কো। মার্কো খুব সুকৌশলে লুসিয়া আর ফারহানকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দিল। তার চোখেমুখে তখন এক ধূর্ত শিকারির তৃপ্তি। সে জানত, ফারহান অর্থাৎ তান্বীর নিজের ভাই যদি এখন বোনের পাশে এসে দাঁড়ায়, তবে তান্বীর ভেঙে পড়া মনটা আবার যুক্তির আলোয় শক্ত হতে পারে। তারা থাকলে তান্বী হয়তো ‘মেইলস্ট্রৌম’-এর কাছে যাওয়ার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে। মার্কো চায় না এই মুহূর্তে তান্বীকে কেউ সান্ত্বনা দিক; সে চায় তান্বী যেন কেবল তার ওপর নির্ভর করে ওই অন্ধকারের গহ্বরে পা বাড়ায়।
ফারহান চিৎকার করে ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও মার্কো অত্যন্ত শীতল ও যান্ত্রিক গলায় তাদের ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “এখন বাড়িতে কেউ নিরাপদ নয়। পুলিশি ঝামেলার মাঝে তোমরা এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। তোমরা বরং ফিরে যাও”। অবশেষে গাড়িতে বসে ফারহান বারবার তান্বীকে ফোন করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু মার্কোর নির্দেশে হয়তো আগেই সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল।
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৫ (২)
এদিকে শহরের অন্য প্রান্তের হাসপাতালের বেডে শুয়ে রায়হান তখন টেলিভিশনের পর্দায় জাভিয়ানের গ্রেফতারের নিউজ দেখছিল। তার চেনা সেই ‘নাইট রেভেন’ আজ খাঁচায় বন্দী—এই দৃশ্য সইতে না পেরে সে যন্ত্রণায় চিৎকার করে বিছানা ছেড়ে উঠে আসতে চাইল। কিন্তু সে জানত না, এই হাসপাতালের প্রতিটি দেয়ালও এখন মার্কোর ইশারায় চলছে বা অন্য কারো। রায়হান পুরোপুরি উঠে দাঁড়ানোর আগেই নার্স আর ডাক্তাররা এসে তাকে জাপটে ধরল। মার্কোর আগে থেকেই দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী, তারা রায়হানকে একটি কড়া ডোজের ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে রায়হানের বিদ্রোহী চোখ দুটো বুজে এল, সে ঢলে পড়ল এক গভীর ও বিজাতীয় ঘুমে। ভিলা এস্পেরেন্জার ভেতরে তান্বী তখন নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছে তার একমাত্র গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। সে জানে না, তার নিজের আপনজনরা দরজার ঠিক ওপাশেই দাঁড়িয়ে আছে, আর মার্কো তাকে খুব সন্তর্পণে এক নিশ্চিত মরণফাঁদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
