Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৬

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৬

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৬
তানিয়া হুসাইন

ভীর রুমের লাইট অফ করে।মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশ ডুবে যায় আধো অন্ধকারে শুধু ব্যালকনি দিয়ে আসা ম্লান আলো ঘড়ে ঢুকছে।তারপর বিছানার দিকে এগিয়ে এসে বিছানার একপাশে শুয়ে পড়ে।ইশায়া থেকে একটু দূরত্ব রেখেই শোয়।
কারণ ভীর যেমনভাবে ঘুমায়, তাতে অসাবধানেই ইশায়ার পেটে চাপ পড়ে যেতে পারে।তার ঘুম অনিয়ন্ত্রিত কখন কী করবে, তার নিজেরও ঠিক নেই।
তাই মাঝখানে একটা বালিশ রেখে শুয়ে পড়ে ভীর
ভীর এক হাত তুলে কপালের ওপর রাখে।চোখ বন্ধ করে ।
এভাবেই যায় কিছু সময়।
ভীর শোয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই একটা নরম, কাঁপা কাঁপা হাত এসে থামে তার বুকের ওপর।
ভীরের ঘুম খুব হালকা হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই সদ্য বন্ধ হওয়া চোখ খুলে যায়।তার প্রতিক্রিয়া সবসময়ই দ্রুত ও তীক্ষ্ণ।
সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে তাকায় ইশায়ার দিকে।
প্রথমে ভাবে হয়তো ঘুমের ঘোরে হাত এসে পড়েছে।
কিন্তু ভীর দেখে ইশায়া ঘুমিয়ে নেই।একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
তার চোখে অদ্ভুত এক গভীরতা।
ভীর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।ইশায়া এখন তাকায়-ই না তার দিকে,
ভীর উঠে কপাল কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলে,

__কি হয়েছে? কোনো সমস্যা? শরীর ঠিক আছে? ডাক্তার ডাকবো?কণ্ঠে তার উদ্বেগ স্পষ্ট।
ইশায়া কিছু বলে না।চুপচাপ ধীরে আরও একটু এগিয়ে আসে।
ভীর দেখছে ইশায়ার করা প্রত্যেকটা কাজ।
ইশায়া ভীরের একদম কাছাকাছি এসে হঠাৎ করেই ভীরকে জড়িয়ে ধরে।মুহূর্তটা যেন সময়ের গতি থামিয়ে দেয়।ভীরের বুক কেঁপে ওঠে হঠাৎ।এতটা অপ্রত্যাশিত স্পর্শ তার জন্য একেবারেই অবিশ্বাস্য।
ইশায়ার শরীর তার সাথে মিশে যেতেই ভীরের ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে।এটা কি শান্তি,
নাকি আরও গভীর কোনো আসক্তি?
সে বুঝে উঠতে পারে না শুধু অনুভব করে তার শক্ত, নির্লিপ্ত হৃদয়ের কোথাও যেন এক অচেনা কম্পন জন্ম নিচ্ছে।
ইশায়ার সব কিছু মনে পড়ার পর থেকে সে আর ভীরের সাথে ঠিকমতো কথা ও বলেনি। সে ইচ্ছে করেই একটা দেয়াল তুলে রেখেছে দু’জনের মাঝে।তাই হঠাৎ তার এমন আচরণে ভীর সত্যিই অবাক হয়েছে খুব।
কিছু না বুঝেই ভীর একহাতে ইশায়াকে আগলে নেয়।তার শরীরটা নিজের দিকে টেনে এনে নিচু গলায় বলে,

___কি হয়েছে?
ইশায়া কোনো উত্তর দেয় না।বরং আরও কাছে এসে মুখ গুঁজে দেয় ভীরের বুকে।নরমভাবে বারবার নাক ঘষতে থাকে তার বুকের সাথে।
এই আচরণটা এতটাই অপ্রত্যাশিত, এতটাই ঘনিষ্ঠ
যে ভীরের শরীরের ভেতর হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে।তার শ্বাস ভারী হয়ে আসে,
কপালে হালকা ঘাম জমতে শুরু করে।
এতদিন ধরে জমে থাকা সব অনুভূতি দমিয়ে রাখা আকাঙ্ক্ষা, অধিকার, আবেগ সব যেন একসাথে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
ভীর নিজেকে সংযত করে, ইশায়াকে একটু দূরে সরিয়ে দেয়।চোখে কঠিন চাপা টান, কণ্ঠ ভারী,
এরকম করোনা আমি কন্ট্রোল হারালে কি করে বসবো,একটু থেমে, শ্বাস সামলে আবার বলে,

___এখন ঠিক না, বেব… ডাক্তা…
ভীর কথাটা শেষ করার আগেই ইশায়ার উত্তপ্ত ঠোঁট এসে ছুঁয়ে যায় ভীরের বুকে।একটা নিঃশব্দ স্পর্শ…
কিন্তু তাতে ঝড় বয়ে যায় ভীরের ভেতরে।
ভীর নিজের হাত মুঠো করে শক্ত করে ধরে,নিজেকে সামলানোর শেষ চেষ্টা।তার ভেতরে যেন ঝড় উঠছে, তবুও সে চেষ্টা করছে নিয়ন্ত্রণে থাকতে,কিন্তু এদিকে ইশায়া সে যেন আজ ঠিক করেই নিয়েছে, ভীরের সব ধৈর্য ভেঙে দেবে।ধীরে ধীরে ইশায়া মুখ তোলে ভীরের গলা থেকে।তার চোখ সরাসরি গিয়ে থামে ভীরের চোখে।একটা নিঃশব্দ একটা অদ্ভুত টান।
তারপর তার নরম হাত উঠে আসে ভীরের শক্ত চোয়ালের দিকে।আলতো করে ছুঁয়ে যায় তার দাড়ি, স্পর্শটা ধীর, ইচ্ছে করেই দীর্ঘ করা।ভীর স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে ইশায়ার দিকে।চোখে তীব্র আগুন।
ইশায়ার দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে আসে ভীরের ঠোঁটের দিকে।সে অজান্তেই ঢোক গিলে।সেই এক মুহূর্ত ভীরের সব ধৈর্য ভেঙে যায়।

এক ঝটকায় সে উঠে আসে ইশায়ার উপর। দু’জনের মাঝের দূরত্ব এক নিঃশ্বাসে মুছে যায়।ভীর ঝুকে ইশায়ার ঠোঁট জোড়া নিজের দখলে নিয়ে নেয়।
দু’জোড়া অধর মিলেমিশে যায় একে অপরের সাথে
তীব্র, গভীর, নিয়ন্ত্রণহীন এক স্পর্শে।ভীর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না।সে ডুবে যায় ইশায়ার ঠোঁটের স্বাদে দম বন্ধ করা আবেগে ভরা এক আকর্ষণে।
ভীরের বেসামাল ছোঁয়ায় ইশায়া তাল হারায়।তার শ্বাস কেঁপে ওঠে… শরীর ঢেউয়ের মতো দুলে ওঠে সেই অনুভূতিতে।আর ঠিক এটাই তো ইশায়া চেয়েছিল,
ভীর এখন আর আগের মতো নেই,সে উন্মাদ হয়ে উঠছে, তার প্রতিটা স্পর্শে সেই উন্মাদনা স্পষ্ট।এই সুযোগেই ইশায়া ধীরে ধীরে নিজের হাতটা পিছনে নিতে চায়…কিন্তু তার এই সামান্য নড়াচড়াতেই ভীর থেমে যায়।
বিরক্ত হয়ে মুখ সরিয়ে নেয় তার গলা থেকে।
চোখে তীব্র দৃষ্টি, কণ্ঠ ভারী আর কর্তৃত্বপূর্ণ,

__Don’t move now…
একটু ঝুঁকে, আরও নিচু স্বরে বলে
___এখন ছাড়ছি না।
সময় গড়ানোর সাথে সাথে ভীর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এতদিন ধরে নিজেকে যে ধৈর্যের দেয়ালে আটকে রেখেছে সেগুলো যেন একে একে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।তার স্পর্শে এখন আর কোনো সংযম নেই…
বরং সেখানে জমাট বেঁধে আছে আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা, এক ধরনের মরিয়া হয়ে ওঠা অধিকারবোধ।
ভীর ভুলে যাচ্ছে সব শুধু ইশায়াতেই ডুবে যাচ্ছে ক্রমশ, এক অন্ধ নেশার মতো।আর ইশায়া অপেক্ষায় কখন সে ভীর যখন পুরোপুরি তার মধ্যে মগ্ন,ইশায়া খুব সাবধানে নিজের হাত সরায়।শ্বাস যেন তার বুকেই আটকে আছে,
বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখা ছুরিটা আলগোছে তুলে নেয় হাতে।তার বুকের ভেতর ধকধক শব্দ,হাত কাঁপছে তবুও থামে না।
ভীর কিছুই টের পায় না।সে তখনও ইশায়াতে ডুবে আছে নিজের তৈরি এক অন্ধ জগতে।এক সেকেন্ড…
একটা সুযোগ আর ঠিক তখনই,
ইশায়া ছু*রিটা সোজা ভীরের বুকে বসিয়ে দেয়।
আনাড়ি হাতে নিখুঁতভাবে না হলেও, তবুও ধারালো ফলাটা তার বুক বরাবর গভীরভাবে কেটে যায়।
ঘটনাটা এতটাই অপ্রত্যাশিত ভীর প্রথম কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝতে পারে না।তারপর তীব্র ব্যথায় তার শ্বাস আটকে আসে।চোখ কুঁচকে ওঠে,
মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।রক্ত ধীরে ধীরে বের হতে শুরু করে…তার বুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ে লাল উষ্ণতা।মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে ভীরের।
কিন্তু ইশায়া থামে না।সে আবারও ছুরি তুলে আঘাত করতে যায়,এইবার শেষ করে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টায়,কিন্তু ভীর একঝটকায় ইশায়ার হাত চেপে ধরে।তার চোখ জ্বলে ওঠে রাগে, সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না,এই আঘাতটা ইশায়ার হাত থেকেই এসেছে।

রাগে ভীর পরের মুহূর্তেই,
ঠাসসসসস! ঠাসসসসসসসস!করে দুই গালে জোরে থা*প্পড় বসিয়ে দেয় ।শব্দটা পুরো ঘরটাকে কাঁপিয়ে তোলে।
ইশায়া হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় পাশে।তার ঠোঁটের কোণে রক্ত জমে ওঠে,চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।
এদিকে ভীরের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে উঠছে।
তার বুক থেকে অবিরাম র*ক্ত ঝরছে শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।তবুও সে নিজেকে সামলায়।কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নেয়।
ভীর কোন মতে ডিয়েগোকে কল করে।
কল কেটে যেতেই তার দৃষ্টি পড়ে মেঝেতে পড়ে থাকা ছু*ড়িটার দিকে। সেটা তুলে নেয় সেটা ভীর।তার চোখ রক্তলাল। যেন ভেতরে জমে থাকা আগুন এখন বাইরে বেরিয়ে আসার অপেক্ষায়।সে তাকায় ইশায়ার দিকে।
সেই দৃষ্টি এতটাই ভয়ংকর, এতটাই তীব্র ইশায়া ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয় । বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ করছে। তার শরীর কাঁপছে, কিন্তু সে চুপ একদম চুপ।
ভীরের শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।রাগ ক্ষোভ আর অস্থিরতা তাকে ভেতর থেকে ছিঁড়ে ফেলছে। কিন্তু সে কিছু করে না।ভীর জানে এই অবস্থায় সে নিজের উপর কন্ট্রোল হারালে কী হতে পারে।সে চায় না একটা ভুলে সব শেষ হয়ে যাক।তাই সে চুপচাপ বসে থাকে।

মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিজেকে থামানোর চেষ্টা করে।
রুমের ভেতর ভারী নীরবতা।ইশায়া ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নেয়। তার শ্বাস কাঁপছে, চোখে ভয় তবুও চেষ্টা করছে নিজেকে সামলাতে।
ঠিক তখনই ডিয়েগো দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়ে, সাথে একজন ডাক্তার।ডাক্তারের চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়, এতটা ভয় যে তার পা পর্যন্ত কাঁপছে।সে একবার ভীরের দিকে তাকায় তারপর এগিয়ে আসে ।
ভীর কোনো কথা বলে না। হেলান দিয়ে বসে আছে সে।
ডাক্তার ক্ষতটা পরিষ্কার করতে শুরু করে।ব্যাথায় ভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, কিন্তু সে একটাও শব্দ করে না।তার চোখ মাঝে মাঝে উঠে যায় ইশায়ার দিকে।আর সেই দৃষ্টি ইশায়ার বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দেয়।ডাক্তার দ্রুত ব্যান্ডেজ করে দেয় ক্ষতটা।
যা যা প্রয়োজন সব করে ফেলে তাড়াহুড়ো করে।
তার একটাই উদ্দেশ্য যত দ্রুত সম্ভব এই ভয়ংকর পরিবেশ থেকে বের হয়ে যাওয়া।ডিয়েগো নিঃশব্দে সব পর্যবেক্ষণ করছে।

___এরমাঝে নিক হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে ভীরের রুমে।ভেতরে ঢুকেই তার চোখ যায় ভীরের বুক থেকে পেট পর্যন্ত লম্বা করে জড়ানো সদ্য ব্যান্ডেজে।সেই দৃশ্য দেখেই নিকোর কপালের রগ ফুলে ওঠে, চোয়াল শক্ত হয়,ডিয়েগো মাত্র-ই তাকে জানিয়েছে।
রাগে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে , হাসফাস করতে থাকে সে তার বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে।যেন ব্যাথা টা ভীর না সে নিজেই পেয়েছে।হ্যা তার নিজের সাথে যদি এটা হতো তাও তার এমন কষ্ট হতো না।
নিকের দৃষ্টি সরে আসে ইশায়ার দিকে।ইশায়াকে জানে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে তার,নিকো নিজেকে থামাতে পারেনা।
এক পা দুই পা করে ইশায়ার দিকে এগিয়ে যেতেই শোনা যায়,
__এখানেই থেমে যা, নিক।
ভীরের ভারিক্কি, ঠান্ডা গলার শব্দ পুরো রুমে ছড়িয়ে পড়ে।
___ওর পাশে যাওয়ার সাহসও করিস না।
শব্দগুলো আদেশ না, হুমকি। নিক থেমে যায় ঠিকই,
কিন্তু তার ভেতরের আগুনটা একটুও কমে না। হঠাৎই সামনে রাখা ফ্লাওয়ার ভাসটা তুলে নিয়ে পুরো শক্তি দিয়ে দেয়ালে ছুড়ে মারে সে।কাঁচ ভাঙার শব্দে পুরো রুম কেঁপে ওঠে।ইশায়া কেঁপে ওঠে তার শরীরটা আরো সিটিয়ে যায়, চোখ দুটো ভয় আর আতঙ্কে ভরে ওঠে।
নিক দাঁত চেপে, হিসহিস করে বলে ওঠে,

__এভাবে ছেড়ে দিবে ওকে?!
তার গলার স্বর ধীরে ধীরে চিৎকারে পরিণত হয়,
আজ কি হতে পারতো জানো?কি হতো আজ, ব্রো?
সে এক পা এগিয়ে আসে, চোখ লাল হয়ে আছে তার, বন্ধ দরজার আড়ালে ঘুমের মাঝে কি হতে পারতো?
তার গলার আওয়াজ আরও তীব্র হয়ে ওঠে,
তোমার কিছু হলে কি হতো, ব্রো?
প্রতিটা শব্দে ভয়, রাগ আর আতঙ্ক মিশে আছে।এক কোণে বসে ইশায়া নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে।তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে অনবরত। বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন থামছেই না।
ভীর কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে নিকোর দিকে।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলে,

___শান্ত হো। কিছু হয়নি আমার।ঠিক আছি আমি।
নিক এই কথাতেই আরও তেতে ওঠে।তিক্ত হাসি দিয়ে বলে,
___হ্যাঁ… কি ঠিক আছো, তা তো দেখতেই পারছি!
তার চোখ যায় ভীরের ব্যান্ডেজের দিকে।নিকো হতাশ গলায় বলে,
এভাবে কিভাবে চলবে বলো?এরকম তো হতে দেওয়া যায় না!
একটু থেমে, গলা নিচু করে কিন্তু তীব্রতা কমে না,
___নেক্সট টাইম… এর থেকেও খারাপ কিছু হতে পারে।
ভীর এবার চোখ নামায় না,
একদম স্থির, বরফশীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
তার কণ্ঠ ঠান্ডা,
___যা হবে… আমি দেখে নিবো।তুই যা। তোর রুমে গিয়ে ঘুমা।
নিক হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে,

___কিন্তু ব্রো, এটা হ…
আমি তোকে যেতে বলেছি নিকো।ভীর তাকে কথাটা শেষ করতে দেয় না।
নিক কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে তারপর রাগে হনহনিয়ে দরজাটা জোরে খুলে এক ঝটকায় বেরিয়ে যায় সে। আবার ও নিস্তব্ধ হয়ে যায় পুরো রুম আর সেই নীরবতার ভেতরে শুধু শোনা যায় ইশায়ার চাপা কান্নার শব্দ,আর ভীরের দমবন্ধ করা নিঃশ্বাস।
ভীর স্থির হয়ে বসে আছে।তার দৃষ্টি শূন্য। আজ কোন কিছুই তাকে প্রভাবিত করতে পারছে না।ইশায়ার কাছ থেকে এমন কিছু অবিশ্বাস্য। ভীরের তীক্ষ্ণ, গভীর চোখ দুটো সরাসরি গিয়ে থামে ইশায়ার উপর।সেই দৃষ্টিতে কোনো রাগ নেই আছে এমন এক নীরবতা, যেটা শব্দের চেয়েও বেশি ভয়ংকর।এদিকে ইশায়া বিছানার এক কোণায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।নিজের হাঁটু দুটো জড়িয়ে ধরে আছে শক্ত করে।সে নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না কি করেছে সে সবকিছু যেন গুলিয়ে যাচ্ছে তার মাথার ভেতর।ভীরকে এতটা শান্ত দেখে তার ভয়টা আরও বাড়তে থাকে।এই নীরবতা এই ঠান্ডা দৃষ্টি
এগুলোই যেন ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা।ইশায়া বারবার নিজের চোখের পানি মুছছে।কিন্তু তবুও পানি থামছে না।
ভীর অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকে তার দিকে,একদম নড়াচড়া ছাড়া, নিঃশব্দে।
তারপর হঠাৎই ঠান্ডা, নির্লিপ্ত গলায় বলে,

___ঘুমাও।
একটা শব্দ।কিন্তু সেই শব্দের ভেতর লুকিয়ে আছে অদ্ভুত এক ভার।ইশায়া কিছু বলে না।সে চুপচাপ বসে থাকে আগের মতোই।নড়তে পর্যন্ত ভয় পাচ্ছে সে।
ইশায়ার নড়চড় না দেখে ভীরের রাগ উঠে।ভীরের গলার স্বর এবার একটু শক্ত হয়,
___ঘুমোতে বলেছি… চুপচাপ ঘুমাও।
তার চোখের দৃষ্টি আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।
আমাকে উঠিয়ো না,নাহলে এখন সব কিছুর হিসাব তুলবো আমি।এখন আমি উঠলে এর পরিণতি তোমার জন্য খুব খারাপ হবে মিসেস ইশায়া জারিন।
কথাগুলো ধীরে বলা কিন্তু প্রতিটা শব্দে স্পষ্ট হুমকি।
ইশায়া আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না।
না প্রতিবাদ, না প্রশ্ন শুধু নিঃশব্দে বিছানায় শুয়ে পড়ে।চোখ দুটো শক্ত করে খিচিয়ে বন্ধ করে নেয়,
যেন চোখ বন্ধ করলেই সবকিছু থেকে লুকানো যাবে।তার শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে আছে,হাত দুটো কাঁপছে।
ভীর তাকিয়েই থাকে তার প্রতিটা নড়াচড়া, প্রতিটা শ্বাস লক্ষ্য করছে।সে দেখে ইশায়ার বন্ধ চোখের পাতা কাঁপছে।ভয়, আতঙ্ক, আর দমিয়ে রাখা কান্না সবকিছু স্পষ্ট হয়ে উঠছে সেই ছোট্ট কাঁপুনিতে।
ভীর কিছু বলে না আর।সে চুপচাপ বসে থাকে,
ইশায়ার দিকেই তাকিয়ে।সময় গড়িয়ে যায়।সে তাকিয়ে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত ইশায়ার সেই কাঁপতে থাকা চোখের পাতা অবশেষে স্থির হয়ে আসে,যতক্ষণ না সে ঘুমিয়ে পড়ে।

___ম্যাটিয়াস সবকিছু শুনে ভেতরে ভেতরে তৃপ্তির হাসি হাসে।এই মেয়েটাই অজান্তেই তাদের কাজ সহজ করে দিচ্ছে।একটুর জন্য চুকে গেলো, আর একটু হলেই আজ-ই খেল খতম হয়ে যেত।তার চোখে ঝলসে ওঠে আলো। সে আর সময় নষ্ট করে না।ম্যাটিয়াস প্যালেসের বাইরে চলে যায়।লুকা অবদি এই খবরটা পৌঁছানো দরকার… যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
____নিকো রুমে গিয়ে রাগে রুমের সব কিছু তছনছ করে ফেলে।তারপর বিছানায় বসে ফুসফুস করছে,
বেলা অবাক হয়,একটু আগে একটা ফোনে এতো হহন্তদন্ত করে বেরিয়ে গেলো।এতো দ্রুত ফিরেও এলো।আবার এতো রেগে আছে,বেলা বুঝতে পারেনা কি হয়েছে।
তাই সে নিকোর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,

___কি হয়েছে কোন সমস্যা এরকম করছো কেনো।
নিকো কিছু বলেনা একেবারে চুপ সে।তার চোখে বার বার ভীরের ব্যান্ডেজ করা দৃশ্যটা ভেসে উঠছে।
বেলা আবারো জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে।নিকোর এমনিতেই মেজাজ খারাপ তার উপর বেলার বার বার কথা বলায় নিকো রেগে যায়।
নিকো রেগে ঠাসসস করে বেলার গালে থা*প্পড় বসিয়ে দেয়।রাগে তার মাথা কাজ করছেনা।
___ইসাবেলা গালে চাত চেপে সরে দাঁড়ায়।
নিক চিৎকার করে বলে,
একেবারে চুপ।চুপচাপ বসে থাক, একটা কথা ও বলবি না।মুখ থেকে একটা শব্দ বের হলে গ*লা কে*টে ফেলবো।
বেলা গালে হাত দিয়েই রাগে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
___সূর্যের নরম সোনালি আলো বিশাল প্রাসাদের মার্বেল দেয়ালে পড়ে ঝলমল করে ওঠে।দূরে পাহাড়ের গা বেয়ে হালকা কুয়াশা নামছে,বাগানের বিদেশি ফুলগুলোতে শিশির জমে আছে, প্রতিটা ফোঁটা আলোয় ঝিকমিক করছে।মৃদু হাওয়া এসে পাতাগুলো নেড়ে দিচ্ছে, যেন সকালের নিস্তব্ধতায় কোনো অজানা গল্প ফিসফিস করে বলছে।
সবকিছু এত শান্ত এত স্বাভাবিক,যেন এই প্রাসাদের দেয়ালের ভেতরে কোনো অন্ধকার রাত কখনোই নেমে আসেনি।

___ইশায়ার ঘুম ভাঙে।চোখ খোলার পরও সে নড়ে না,চুপচাপ শুয়ে থাকে বিছানায়।তার চোখ ফাঁকা কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে।ভীরের চেহারাটা বারবার ভেসে উঠছে তার সামনে।নিজের কাজের জন্য আফসোস করতে চায় না সে…চায় না একটুও দুর্বল হতে।তবুও… কেন জানি বুকের ভেতরটা হালকা ব্যথা করে ওঠে।আজ রোজকার মতো ভীর নেই রুমে।চারপাশে সবকিছু এত স্বাভাবিক, এত নিখুঁতভাবে সাজানো…যেন এখানে রাতে কিছুই ঘটেনি।কিন্তু সে তো একজন মাফিয়া বসকে আঘাত করেছে।তার তো এখনই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।তাহলে কেন…?
কেন তাকে এত করুণা করা হয়।
ঠিক সময় মতো মারিয়া এলেনা আসে।ইশায়ার ব্রেকফাস্ট নিয়ে।ট্রে রেখে সে আগের মতোই নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।কোনো প্রশ্ন নেই,কোনো প্রতিক্রিয়া নেই,সবকিছু এত স্বাভাবিক যা ইশায়ার সহ্য হচ্ছেনা।তার গলা শুকিয়ে আসে,সে বলতে চায়ভীর কোথায়?কিন্তু শব্দ বের হয় না।তার ভেতরে একটা অদ্ভুত টানাপোড়েন চলছে।সে চাইছে সে পারেনি ভীরকে মারতে,তাহলে ভীরই মেরে ফেলুক তাকে।
এইভাবে বেঁচে থাকা তার পক্ষে সম্ভব না।
একটা জিনিস ইশায়া লক্ষ্য করেছে রুমের সবকিছু লক করা।জানালা, দরজা,এমনকি ছোট ছোট ক্যাবিনেট পর্যন্ত।আর তার ঔষধগুলো যেগুলো সবসময় হাতের কাছেই থাকত সেগুলো আর বাইরে নেই।
সব সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৫

___সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে।সূর্যের আলো মিলিয়ে যায়,কিন্তু ভীরের কোনো দেখা মেলে না।সময় যত যাচ্ছেইশায়া ততই অস্থির হয়ে উঠছে।সে নিজেই বুঝতে পারছে না,কেন সে অপেক্ষা করছে,এই মানুষের জন্য
যাকে সে নিজেই শেষ করতে চেয়েছে।তার মাথায় একটার পর একটা প্রশ্ন ঘুরছে,উনি কেমন আছে এখন?ক্ষতটা কি বেশি গভীর ছিল?আমি ঘুমানোর পর কি তার শরীর আরও খারাপ হয়েছে?উনি কি হাসপাতালে?এই চিন্তাগুলোই তাকে গ্রাস করে ফেলছে।আর ঠিক পরের মুহূর্তেই সে নিজেই নিজেকে শাসাচ্ছে।
এরই মাঝে হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হয়।
___ইশায়ার বুক ধড়াম করে ওঠে।শ্বাস আটকে আসে তার।এই বুঝি ভীর এসেছে।তার চোখ দরজার দিকে যায়…..

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৭