Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৩১

শেহেজাদার আদর পর্ব ৩১

শেহেজাদার আদর পর্ব ৩১
সুমাইয়া ইসলাম নূর

গভীর রাত দুটো বাজে…
চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও রাতজাগা ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। জানালার বাইরে কালো আকাশে আধো মেঘের ফাঁকে চাঁদের আলো হালকা করে চৌধুরী বাড়ির বারান্দায় পড়ে আছে। পুরো বাড়িটা ঘুমে ডুবে গেলেও একটা ঘরের আলো এখনও জ্বলছে ক্ষীণভাবে।
ইনায়া ইউভির কোলের উপর গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমের মাঝেও মাঝে মাঝে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠছে মেয়েটা। আর ইউভি এক হাতে গরম পানির ব্যাগটা আলতো করে ইনায়ার পেটের উপর ধরে রেখেছে।
মাঝে মাঝে আবার অন্য হাত দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে। কিন্তু তার পুরো মনোযোগ যেন কাজের চেয়ে বেশি ইনায়ার দিকেই।
কখনো আলতো করে চুল সরিয়ে দিচ্ছে, কখনো কপালে হাত রেখে দেখছে জ্বর এসেছে কিনা। মাঝে মাঝে নিচু হয়ে ফিসফিস করে বলছে—

— “একটু সহ্য কর, আদর এখুনি কমে যাবে।
অনেকক্ষণ পর ইউভির কাজ শেষ হলো।
ল্যাপটপটা পাশে রেখে সে ধীরে ধীরে ইনায়াকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিল। তারপর মাথাটা ইনায়ার চুলের মাঝে ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করল।
ক্লান্ত রাত ধীরে ধীরে ভোরের দিকে এগোতে লাগল।
হঠাৎ ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে উঠতেই পুরো চৌধুরী বাড়ি যেন আবার জেগে উঠল।
বাড়ির সব পুরুষেরা একে একে উঠে পড়ল। আজ গ্রামের সবার জন্য বড় আয়োজন করা হয়েছে বাড়ির পেছনের খোলা জায়গায় গরু জবাই হবে। বিশাল বড় ডেগে রান্না হবে সবার জন্য।
আশেপাশের প্রতিবেশীরাও সকাল সকাল চলে এসেছে।
কেউ সবজি কাটছে, কেউ চাল ধুচ্ছে, কেউ বড় বড় হাঁড়ি নামাচ্ছে। পুরো বাড়িটা কর্মব্যস্ত হয়ে উঠেছে।
সকাল আটটা বাজে।

বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চারাও ঘুম থেকে উঠে পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছে। কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ চিৎকার করছে, কেউ নতুন জামা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু ইনায়া এখনও ঘুমিয়ে আছে।
ইউভি কাউকে তাকে ডাকতে দিচ্ছে না।
নুসরাত চৌধুরী রুমের সামনে আসতেই ইউভি নিচু গলায় বলল মেজো মা, সারারাত আদর ঘুমায়নি। পেটব্যথা করছিল… ওকে ডাকবেন না।
নুসরাত চৌধুরী সাথে সাথে চিন্তিত গলায় বললেন—
আমাকে ডাকলি না কেন? এখন কেমন আছে?
ইউভি শান্ত গলায় বলল।
এখন ভালো আছে। চিন্তা কোরো না।

বাড়িতে মানুষজনের কোলাহলে ইনায়ার ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলেই পাশটা হাতড়ে দেখল… ইউভি নেই।ঠোঁট ফুলিয়ে বিছানায় উঠে বসতেই ফোনটা হাতে নিল।স্ক্রিনে সময় দেখে চোখ বড় বড় হয়ে গেল ইনায়ার ।
সকাল ৯টা বাজে!
— “ইয়া আল্লাহ! এত দেরি হয়ে গেল
তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে ফ্রেশ হতে চলে গেল ইনায়া।ফ্রেশ হয়ে বের হয়েই হঠাৎ ইউভির রাতের কথাটা মনে পড়ল।
“ওই ড্রয়ারটাই তোর জন্য উপহার রাখা আছে রেডি হয়ে অপেক্ষা করিস।
ইনায়া ধীরে ধীরে ড্রয়ারটা খুলল।আর খুলতেই থমকে গেল।ভেতরে সুন্দর করে রাখা একটা বক্স।
কাঁপা কাঁপা হাতে বক্সটা খুলতেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।ভেতরে হালকা আকাশি রঙের একটা সিল্কের শাড়ি। তার সাথে matching আকাশি চুড়ি… ছোট্ট মুক্তোর কাজ করা ব্লাউজ
ইনায়া মনে মনে বললো মা শা আল্লাহ এতো কিউট।
সাতে একটা ভাঁজ করা চিরকুট।
ইনায়া অবাক হয়ে ফিসফিস করে পড়লো।
চিরকুটটা খুলতেই সেখানে ইউভির হাতের লেখা—
“আমার আকাশপরীটার জন্য আকাশি রং।
তোর সেহজাদা”

লেখাটা পড়েই ইনায়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। আয়নার সামনে শাড়িটা নিজের গায়ের সাথে ধরে দাঁড়াতেই নিজের কাছে নিজেকে একঅদ্ভুত সুন্দর লাগলো
কিন্তু পরের মুহূর্তেই মুখটা কুঁচকে গেল।
ধুর! আমি তো শাড়ি পরতেই পারি না!
এই বলে তাড়াতাড়ি ফোন হাতে নিয়ে তুবা আর পিয়াসাকে মেসেজ দিল—
“একবার আমার রুমে আয় তোরা। জরুরি!”
মেসেজ পাঠানোর দুই মিনিটের মধ্যেই দরজা ধাক্কা দিয়ে দুজন ঢুকে পড়ল।পিয়াসা ঢুকেই বলল—
— “কি হয়েছে? এমন জরুরি ডাকলি কেন?”
তুবা চোখ সরু করে বলল নাকি আবার জর আসছে।
ইনায়া লজ্জা পেয়ে বক্সটা দেখাতেই দুজন একসাথে চিৎকার করে উঠল—
— “ওমাইগড!!!”
পিয়াসা শাড়িটা হাতে নিয়ে বলল ইউভি ভাইয়ার taste dangerous level-

— “No tension baby… আমরা আছি তো!”
এই বলে দুজন ফোন বের করে ইউটিউবে “easy silk saree tutorial লিখে ভিডিও চালু করল।
ভিডিওতে আপু বলছে এখন কুচি গুলো সুন্দর করে ভাঁজ করুন।আর এইদিকে তিনজন মিলে এমন অবস্থা করছে যেন যুদ্ধ চলছে।
একবার তুবা শাড়ি উল্টো পেঁচিয়ে ফেলছে,
একবার পিয়াসা আঁচল খুঁজে পাচ্ছে না,
আর ইনায়া মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে বলছে—
তোরা পারিস তো বাল?
পিয়াসা সাথে সাথে বলল—
চুপ! tutorial আপু নিজেই তিনবার কুচি দিছে!
তুবা কুচি করতে করতে হঠাৎ বলে উঠল—
— “এই শাড়ি পরে যদি তুই সিঁড়ি থেকে না পড়িস, তাহলে আমার নাম তুবা এহসান না।
ইনায়া বালিশ ছুঁড়ে মারল।
অনেক কষ্টে অবশেষে দুজন মিলে সুন্দর করে ইনায়াকে সাজিয়ে দিল।
খোলা চুল, হালকা কাজল, আকাশি শাড়ি আর messing চুড়িতে ইনায়াকে আজ সত্যিই অন্যরকম লাগছে।
তুবা আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলল—

— “উফফ! ইউভি ভাইয়া আজকে নির্ঘাত ইন্তেকাল করবে!
ঠিক তখনই তুবার চোখ গিয়ে আটকাল ইনায়ার গলার কাছে হালকা লালচে দাগে।
তুবা চোখ বড় বড় করে বলল—
— “আবার!”
পিয়াসা ভ্রু তুলে ইশারা করে বলল আবার কি
তুবা ইশারা দিয়ে বললো ওই যেওই যে… সেহজাদার signature!
ইনায়া সাথে সাথে আঁচল দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করল।
পিয়াসা নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

— “দেখছিস বেবি? আমার ভাইয়া তোকে কতটা ভালোবাসে… ইসস! আমাদের কপালেই নাই রে!”
তুবা সাথে সাথে বলল তোর কপালে নাই মানে? রেদোয়ান ভাইয়া তো তোকে এমনভাবে দেখে, মনে হয় কাঁচাই খেয়ে ফেলবে!
পিয়াসা সাথে সাথে বালিশ ছুঁড়ে মারল চুপ শয়তান!
এরপর ইনায়া ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো।
আকাশি শাড়ির আঁচলটা এক হাতে ধরে খুব সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে নামছে ইনায়া । নিচে উঠানে এখনও মানুষের আনাগোনা, রান্নার গন্ধ, বাচ্চাদের চিৎকার পূরো বাড়িটা আজ উৎসব এ মেতেছে।
ইনায়াকে দেখতেই সবার চোখ এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। নুসরাত চৌধুরী মুগ্ধ হয়ে বললেন—
মাশাআল্লাহ… আমার মেয়েটাকে আজ একদম পরীর মতো লাগছে। রেশমা চৌধুরী সাথে সাথে বললেন নজর লাগবে কিন্তু!
ইনায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে সবার কাছে গিয়ে বলল আমি একটু ইউভি ভাইয়ার সাথে যাচ্ছি মা একটু পরেই চলে আসব। নুসরাত চৌধুরী হেসে বললেন হ্যাঁ যা। দেরি হলেও সমস্যা নাই। আমার জামাইয়ের সাথেই তো যাচ্ছিস।
— “মা!”

ইনায়া লজ্জায় গাল লাল করে ফেলল।
কি বলো এসব সবাই হেসে উঠল।
ইনায়া আর দাঁড়াল না। তাড়াতাড়ি করে বের হয়ে এলো। বাড়ির একটু দূরে কালো মার্সিডিজ গাড়িটার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইউভি। এক হাতে ফোন, অন্য হাত পকেটে। কালো ঘড়িটা রোদের আলোয় চকচক করছে। খুব মন দিয়ে কারও সাথে ফোনে কথা বলছে সে।
ঠিক তখনই রেদোয়ান এসে বললো ভাইয়া, তোমরা রওনা দাও। আমরা আসছি। বাড়ির দিকটা বাবারা সামলে নিবে। ইউভি ফোনের কথাটা শেষ করে শান্ত গলায় বলল ওকে। তোরা সময়মতো চলে আসিস।
তারপর চারপাশে তাকিয়ে বলল কিন্তু আমার আদর কই? রাজ্জো দূরে হাত তুলে দেখিয়ে বলল—
ওই তো… তোমার আদর।

ইউভি তাকাতেই যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো পৃথিবী থেমে গেল।
ইনায়া ধীরে ধীরে তার দিকেই হেঁটে আসছে।
হালকা আকাশি রঙের সিল্ক শাড়িটা বাতাসে একটু একটু উড়ছে। খোলা চুলগুলো কোমর ছুঁয়ে নেমে এসেছে। হাতে আকাশি চুড়ি, কানে ছোট্ট দুল, মুখে লাজুক একটা আভা।
সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে তার মুখে।
মেয়েটাকে আজ যেন বাস্তবের মানুষ না… আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো শান্ত পরী লাগছে।
ইউভির চোখ একদম স্থির হয়ে গেল তার উপর।
ফোনটা কখন যে হাতে থেকে নিচে নেমে গেছে সে নিজেও বুঝল না।শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল।
মনে হচ্ছিল এই রুপটা দেখার জন্যই হয়তো এত বছর অপেক্ষা করেছে ইউভি।
ইনায়া কাছে এসেও দেখল ইউভি কিছু বলছে না।
শুধু তাকিয়ে আছে। ইনায়া লজ্জা পেয়ে নিচু গলায় বলল—

— “এভাবে কী দেখছেন?”
ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়ার কাছে এগিয়ে এলো।
একদম সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে ফিসফিস করে বলল—
— “আদর… মানুষ এত সুন্দরও হয়?
কথাটা শোনার সাথে সাথেই রেদোয়ান আর রাজ্জো একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
তারপর খুব চুপচাপ পাশ থেকে সরে গেল।
যাওয়ার সময় রাজ্জো নিচু গলায় রেদোয়ানকে বলল চল ভাই… এদের এখন disturb করা মানে নিজের কবর নিজে খোঁড়া।”
দুজন ধীরে ধীরে একটু দূরে চলে গেল, যেন ইচ্ছে করেই ইউভি আর ইনায়াকে একা সময় দিচ্ছে।
এদিকে ইউভি এখনও একদৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে। ইনায়া লজ্জায় চোখ তুলতেই পারছে না।
হালকা বাতাসে তার চুলগুলো বারবার মুখের উপর এসে পড়ছে। ইউভি ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে চুলগুলো কানের পাশে সরিয়ে দিল।
তারপর নিচু হয়ে খুব আস্তে বলল—

— “এই শাড়িটা তোকে এত সুন্দর লাগবে ভাবিনি…”
ইনায়া ঠোঁট কামড়ে ছোট্ট করে বলল—
— “তাহলে কেন কিনলেন?”
ইউভি সাথে সাথে বলল—
কারণ তোর উপর আকাশি রং কেমন লাগে দেখার শখ ছিল।
ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
ইউভি আরও একটু ঝুঁকে এসে বলল—
— “আর এখন মনে হচ্ছে… আকাশটা নিজেই আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।”
ইনায়া আর সহ্য করতে না পেরে মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। ইউভি মুচকি হেসে আলতো করে তার হাতটা ধরল।
চুড়িগুলো টুংটাং শব্দ করে উঠতেই ইউভি কয়েক সেকেন্ড হাতটার দিকেই তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব যত্ন করে হাতের পিঠে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল—

— “চল, আদর। আজ তোকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাব… যেখান থেকে ফিরতে মন চাইবে না।”
ইউভি ধীরে ধীরে গাড়ির দরজাটা খুলে দিল ইনায়ার জন্য। ইনায়া শাড়ির আঁচল সামলে গাড়িতে উঠতেই ইউভিও ঘুরে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল।
তারপর কিছু না বলে আবার ইনায়ার দিকে ঝুঁকে এলো। ইনায়া অবাক হয়ে তাকাতেই ইউভি খুব যত্ন করে তার সিটবেল্টটা বেঁধে দিল।
এত কাছে আসতেই ইউভির পারফিউমের ঘ্রাণে ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠল।
ইউভি ইচ্ছে করেই একটু ধীরে ধীরে বেল্টটা লাগাচ্ছে।ইউভির গরম নিঃশ্বাস বারবার ইনায়ার গালে এসে লাগছে।
ইনায়া লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। ইউভি মুচকি হেসে পাশের ছোট্ট ব্যাগটা খুলল।সেখান থেকে সাদা বেলিফুলের একটা ছোট্ট মালা বের করল।তারপর খুব যত্ন করে ইনায়ার হাতে পরিয়ে দিল। বেলিফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ মুহূর্তেই পুরো গাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল।
ইউভি কয়েক সেকেন্ড ইনায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে নিচু গলায় বলল Perfect… এখন ঠিক লাগছে আমার আদরকে।
ইনায়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে আস্তে করে বলল আপনি সবসময় এমন কেন?
ইউভি গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বললো কেমন ?”

— “এত… এত ভালো।”
ইউভি হালকা হেসে এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতটা বাড়িয়ে ইনায়ার আঙুলের সাথে নিজের আঙুল জড়িয়ে নিল।
— “কারণ তুই আমার শান্তি, আদর।”
রাস্তা দিয়ে গাড়িটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল।
জানালার বাইরে গ্রামের রাস্তা সবুজ গাছ, হালকা বাতাসে দুলতে থাকা ধানক্ষেত।
ইনায়া চুপচাপ ইউভির দিকে তাকিয়ে আছে।
কখনো স্টিয়ারিং ধরার সময় ইউভির হাতের শিরাগুলোর দিকে তাকাচ্ছে কখনো তার চোখের দিকে।
হঠাৎ ইউভি না তাকিয়েই বলল—
এভাবে তাকিয়ে থাকলে accident হয়ে যাবে কিন্তু।
ইনায়া তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে ফেলল।
ইউভি মুচকি হেসে বলল—

— “লজ্জা পেলে তোকে আরও সুন্দর লাগে।”
ইনায়া এবার রাগ দেখিয়ে বলল চুপ করবেন না হলে আমি নেমে যাব।
কিছু সময় এর মধ্যে এসে পৌছালো তাদের গন্তব্যে
গেটের উপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা—
“আদরের আশ্রয়”
ইনায়া ধীরে ধীরে লেখাটার দিকে তাকাল।
তার চোখে বিস্ময়।সে ইউভির দিকে ফিরে আস্তে করে বললো এখানেও আছে?
ইউভি গাড়ি থেকে নেমে ইনায়ার জন্য দরজা খুলতে খুলতে বলল শুধু মাগুরাতেই না… ‘আদরের আশ্রয়’ পুরো বাংলাদেশে দশটা আছে।
ইনায়া অবাক হয়ে বলল সবগুলোর নাম একই কেন? ইউভি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল কারণ এই সবগুলোই আমার আদরের নামে। কথাটা শুনে ইনায়া থমকে গেল।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
“আদরের” মানে… “আদর” তো আমি
তাহলে—
ইনায়া কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
ইউভি মুচকি হেসে আলতো করে তার মাথায় হাত রেখে বলল—

— “তোকে এত কষ্ট করে হিসাব মিলাতে হবে না, আদর। একটু পরেই সব জেনে যাবি।”
ঠিক তখনই কয়েকটা গাড়ি এসে থামল।
ইউভির assistant আর কয়েকজন guard দ্রুত নেমে এলো।
ইনায়া আর ইউভি আশ্রমের ভেতরে প্রবেশ করতেই চারপাশের পরিবেশটা যেন মুহূর্তেই আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। সাদা-নীল রঙের ছোট্ট বিল্ডিং, উঠানে দোলনা, একপাশে ফুলের বাগান… আর চারদিকে ছোট ছোট বাচ্চাদের হাসির শব্দ।
এখানে যারা বাচ্চাদের দেখাশোনা করে তারা সবাই দ্রুত এগিয়ে এলো।
তাদের মাঝখান থেকে মাঝবয়সী এক ভদ্রমহিলা এগিয়ে এসে একদম আপন করে ইউভিকে জড়িয়ে ধরলেন।

— “এইবার আইতে এত দেরি করলা ক্যান বাপজান?”
ইউভি হেসে বলল চাচি, কিছু important কাজের জন্য লন্ডন গেয়েছিলাম।ওহ আচ্ছা
তারপর ভদ্রমহিলার চোখ গিয়ে পড়ল ইনায়ার উপর।।তিনি কৌতূহলী হয়ে বললেন—
এই মাইয়াডা কে রে?
তোমার আদর বুঝি।
ইউভির চোখের কোণে তখন অন্যরকম এক শান্তি।
সে মুচকি হেসে বলল জি চাচি… আমার আদর।
কথাটা শুনে ইনায়ার বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে উঠল। ভদ্রমহিলা ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ গলায় বললেন—
— “বাহ… এইডা মাইয়া না পরির লাহান লাগে! কী মিষ্টি গো! আমার বাপজানের পছন্দ… মাশাআল্লাহ!
ইনায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
ঠিক তখনই আশ্রমের ছোট ছোট বাচ্চারা দৌড়ে এসে ইউভির চারপাশে ভিড় করল।
ইউভি ভাইয়া আসছে! ভাইয়া! আমাদের চকোলেট আনছো? ইউভি হেসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
তারপর সবাইকে কাছে ডাকল।

সব মিয়ে এসেছিএই যে… তোমরা যাকে দেখতে চাইছিলা, এইটা সেই আপু।
সব বাচ্চারা একসাথে অবাক হয়ে ইনায়ার দিকে তাকাল।ইউভি মুচকি হেসে বলল—
যে আপু তোমাদের জন্য প্রতি মাসে চকোলেট পাঠায়। ইনায়া সাথে সাথে অবাক হয়ে ইউভির দিকে তাকাল। ইউভি চুপিচুপি চোখ টিপে দিল।
ইনায়ার মনে হলো বুকের ভেতরটা নরম হয়ে যাচ্ছে।
তারপর ইউভি হাতের ইশারা করতেই assistant কয়েকটা বড় box এনে রাখল।
ইউভি ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল—
আদর gift গুলো ওদের দিয়ে দে।
ইনায়া ধীরে ধীরে box খুলতেই ভেতরে খেলনা, জামা, বই, চকোলেট, colour pencil, story bookকত কিছু!
বাচ্চাগুলোর চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল।
একটা ছোট্ট মেয়ে এসে ইনায়ার শাড়ি ধরে বলল—

— “আপু… এইগুলা সব আমাদের?”
ইনায়া হাঁটু গেড়ে মেয়েটার সামনে বসে মুচকি হেসে বলল হ্যাঁ সোনা। সব তোমাদের।
মেয়েটা খুশিতে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরল।
ইনায়া যেন নিজের অজান্তেই গলে যেতে লাগল এই ছোট ছোট মানুষগুলোর মাঝে।
একটা ছেলে এসে বলল—
— “আপু, আমি আঁকতে পারি!”
আরেকজন বলল—
— “আমি বড় হয়ে ডাক্তার হমু!”
একটা গোলগাল ছোট্ট বাচ্চা এসে ইনায়ার হাতে চকোলেট দিয়ে বলল—
— “আপু, তুমি খাও।”
ইনায়া হেসে চকোলেটটা খেয়ে দিল।
তারপর একে একে সবার সাথে পরিচয় হতে লাগল।

— “আমার নাম আয়ান।”
— “আমি মিষ্টি।”
— “আমি রাফি।”
— “আমি কিন্তু ভাইয়ার favourite!
পুরো জায়গাটা বাচ্চাদের হাসিতে ভরে গেল।
ইনায়া দূর থেকে একবার ইউভির দিকে তাকাল।
ইউভি তখন একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।
কালো শার্ট, হাতে ঘড়ি, চোখে সেই শান্ত অথচ গভীর দৃষ্টি তে একভাবে তাকিয়ে আছে ইনায়ার দিকে।
ইনায়া যত ইউভিকে দেখছে, ততই যেন অবাক হয়ে যাচ্ছে।মনে মনে বললো একটা মানুষ এতটা perfect হয় কীভাবে কিছুক্ষণ পর আশ্রমের বাচ্চাগুলো হঠাৎ করেই একে একে ইনায়ার হাত ধরে টানতে শুরু করল।

— “আপু চলেো”
— “চোখ বন্ধ করো”
— “না না, আগে দেখা যাবে না!”
ইনায়া অবাক হয়ে হেসে বলল—
— “আরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?”
কিন্তু কেউ কিছু বলল না।
ছোট ছোট হাতগুলো খুব যত্ন করে ইনায়াকে নিয়ে যেতে লাগল আশ্রমের পেছনের বাগানের দিকে।
ইউভি একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। ঠোঁটের কোণে সেই শান্ত হাসিটা লেগেই আছে।
বাগানের কাছে যেতেই ইনায়া থমকে গেল।
পুরো জায়গাটা ছোট ছোট fairy light দিয়ে সাজানো। গাছের ডালে ডালে সাদা-আকাশি ফিতা বাঁধা। মাঝখানে বড় একটা টেবিল, তার উপর সুন্দর কেক।
কেকের উপর লেখা Happy Birthday Our Ador Apu”
চারপাশে ছোট ছোট হাতে বানানো paper flower, নানান কালার এর কার্ড আর বাচ্চাদের আঁকা ছবিতে পুরো বাগানটা যেন ভালোবাসায় ভরে গেছে। ইনায়ার চোখ মুহূর্তেই ভিজে উঠল।
সে আস্তে করে বলল—

— “এইসব… আমার জন্য?”
ঠিক তখনই সব বাচ্চারা একসাথে চিৎকার করে উঠল Surpriseeeee!!!”
ছোট্ট ছোট্ট হাততালি, হাসি আর উচ্ছ্বাসে পুরো বাগানটা গমগম করতে লাগল।
একটা ছোট্ট মেয়ে এসে ইনায়ার হাতে ফুল দিয়ে বলল আপু, ভাইয়া নিজে সব সাজাইছে…”
ইনায়া ধীরে ধীরে ইউভির দিকে তাকাল।
ইউভি তখন একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে তার চোখে এক অদ্ভুত শান্তি।
মনে হচ্ছে এই হাসিটা দেখার জন্যই সে এত আয়োজন করেছে। বাচ্চারা সবাই মিলে ইনায়াকে কেকের সামনে নিয়ে গেল। একটা ছেলে গম্ভীর গলায় বলল আপু, wish করেো”
ইনায়া চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু wish করার আগেই ইনায়ার চোখের সামনে শুধু একটা মানুষই ভেসে উঠল ইউভি।
কেক কাটতেই সবাই হাততালি দিয়ে উঠল।

তারপর ইনায়া এক এক করে সব বাচ্চাদের কেক খাওয়াতে লাগল। কারও গালে কেক লেগে যাচ্ছে, কেউ হাসতে হাসতে পালাচ্ছে, কেউ আবার ইচ্ছে করেই দ্বিতীয়বার লাইনে দাঁড়াচ্ছে।
একটা ছোট্ট ছেলে বলল আপু, আমারে আরেকটু দেন না… আমি বড় হইতেছি!
সবাই হেসে উঠল বাচ্চাটার কথা শুনে
একটা মেয়ে কেক খেতে খেতে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরে বলল আপু, তুমি আবার আসবা তো?
ইনায়া সাথে সাথে মেয়েটাকে বুকের সাথে জড়িয়ে নিল।
ইনায়ার চোখে তখন পানি চিকচিক করছে।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ কয়েকটা বাচ্চা মিলে গজল গাওয়া শুরু করল। তাদের ছোট ছোট কণ্ঠে ভাঙা সুর কিন্তু সেই সুরের মাঝে এত মায়া ছিল যে পুরো পরিবেশটাই নরম হয়ে গেল।

কেউ কবিতা আবৃত্তি করছে,
কেউ নাচ দেখাচ্ছে,
কেউ আবার কাগজে আঁকা ছবি এনে বলছে—
এইটা আপুর জন্য বানাইছি!
একটা ছোট্ট ছেলে প্লাস্টিকের ফুল হাতে নিয়ে একদম সিনেমার হিরোর মতো হাঁটু গেড়ে বসে বললআপু, এই ফুলটা তোমার লাইগা!
পুরো বাগানের সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল।
আর এইসবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইনায়া প্রাণ খুলে হাসছে। ইনায়াী সেই হাসিটা যেন চারপাশের সব কষ্ট মুছে দিচ্ছে।
ইউভি একটু দূরে দাঁড়িয়ে শুধু তার আদরের হাসিটা দেখছে। কখনো বাচ্চাদের সাথে মিশে যাওয়া ইনায়াকে দেখছে।কখনো তার চোখভরা আনন্দটা দেখছে।
ইউভির বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে শান্তিতে ভরে উঠছে।।মনে মনে বললো
এই একটা হাসির জন্য আমি হাজারবার পৃথিবীর সাথে লড়তে পারবো।
হঠাৎ ইনায়া দূর থেকে ইউভির দিকে তাকাল।
দুজনের চোখ এক মুহূর্তে আটকে গেল।
বাচ্চাদের হৈচৈয়ের মাঝেও সেই চোখে চোখ রাখার মুহূর্তটা যেন আলাদা একটা পৃথিবী তৈরি করল।
ইউভি খুব আস্তে করে ঠোঁট নেড়ে বলল—

— “Happy Birthday, আমার আদর…”ঠিক তখনই বাগানের গেটের দিক থেকে রেদোয়ান আর রাজ্জো হেঁটে ভেতরে ঢুকল।
রেদোয়ানের সে এসে বলল—
— “বোনু… পেছনে তাকা তো।
ইনায়া অবাক হয়ে পেছনে তাকাতেই ইউভি ধীরে ধীরে তার পাশ থেকে সরে গেল।
পরক্ষণেই পুরো বাগানটা আলোয় ভরে উঠল।
পেছনের বড় monitor-টা হঠাৎ অন হয়ে গেল।
আর স্ক্রিনে যা দেখা গেল, সেটা দেখে ইনায়া একদম স্থির হয়ে গেল। বাংলাদেশের বাকি নয়টা “আদরের আশ্রয়”-এর live video একসাথে চলছে সেখানে।
প্রতিটা আশ্রমেই আজ উৎসব। কোথাও বাচ্চারা কেক কাটছে,কোথাও সবাই বেলুন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,কোথাও আবার ছোট ছোট বাচ্চারা নতুন জামা পরে হাত নেড়ে হাসছে।
সবগুলোর মাঝখানে একটা জিনিস কমোন
সবাই ইনায়ার জন্য দোয়া করছে।
একটা ছোট্ট ছেলে ক্যামেরার সামনে এসে বলল—

— “Thank you, Apu! Happy Birthday!”
আরেকটা মেয়ে চকোলেট দেখিয়ে খুশিতে লাফাতে লাফাতে বলল আপু দেখো! নতুন doll পাইছি!
কেউ নতুন bag পেয়েছে,কেউ colour pencil,
কেউ toy car।
প্রতিটা আশ্রমের প্রতিটা বাচ্চার মুখে আজ অদ্ভুত একটা আনন্দ। মনে হচ্ছে পুরো দেশজুড়ে ছোট্ট ছোট্ট সুখ ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ।
ইনায়ার চোখ ধীরে ধীরে ভিজে উঠল।
ইনায়ার ঠোঁট কাঁপছে। বিশ্বাসই করতে পারছে না—
একটা মানুষ শুধু তাকে খুশি করার জন্য এত কিছু করতে পারে।
চারপাশের সব শব্দ যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে গেল। তার চোখে শুধু স্ক্রিনে হাসতে থাকা বাচ্চাগুলো আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইউভি।
হঠাৎ ইনায়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে দৌড়ে গিয়ে রেদোয়ানকে জড়িয়ে ধরল।
কাঁপা গলায় বলল—

— “ভাইয়া…”
রেদোয়ানও চোখের পানি লুকাতে পারল না।
সে ইনায়ার মাথায় হাত রেখে নিচু গলায় বলল—
— “একটা মানুষ কীভাবে এতটা ভালোবাসতে পারে… সেটা ভাইয়া কে না দেখলে বুঝতাম না, বোনু
তারপর একটু হেসে বলল—
ভাইয়া… আমার বোনটা যে অনেক ভাগ্যবতী।”
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আবার মনে মনে বললো করে বলল—
— “আমি কি পারব আমার পিহুকে তোমার মতো করে আগলে রাখতে?
ইনায়া এবার ধীরে ধীরে রেদোয়ানকে ছেড়ে দিল।
তারপর কোনো দ্বিধা না করে সোজা গিয়ে ইউভিকে জড়িয়ে ধরল।একদম শক্ত করে।
মনে হচ্ছিল—

শেহেজাদার আদর পর্ব ৩০

এই বুকটাই তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
কাঁদতে কাঁদতেই বলল—
অনেক… অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
আমার জীবনের best birthday এটা সত্যি বলছি, আমার যেতে মন চাচ্ছে না, ইউভি ভাইয়া…”
আমি অনেক… অনেক happy…।
ইউভি আলতো করে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।
তারপর ইনায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল This is just the beginning, Ador…”
একটু থেমে আরও নিচু গলায় বলল—
— “There’s still so much more waiting for you.

শেহেজাদার আদর পর্ব ৩২