শেহেজাদার আদর পর্ব ৩২
সুমাইয়া ইসলাম নূর
আশ্রমটার পরিবেশটা যেন ধীরে ধীরে আরও আপন হয়ে উঠছে ইনায়ার কাছে।
দূরে ছোট্ট বাচ্চাদের থেকে হালকা কোরআন তেলাওয়াতের শব্দ ভেসে আসছে। বাচ্চাগুলো কেউ দোলনায় খেলছে, কেউ নতুন খেলনা নিয়ে দৌড়াচ্ছে। ফুলের বাগান জুড়ে বেলি আর রজনীগন্ধার মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে আছে।
চারপাশে এত শান্তি… এত মায়া… যেন এই জায়গাটার প্রতিটা ইটের সাথে ভালোবাসা মিশে আছে।
ইনায়া এখনও অবাক চোখে চারপাশ দেখছে।
ঠিক তখনই রেদোয়ান ধীরে ধীরে এসে ইনায়ার হাতে কয়েকটা ফাইল আর পেপার তুলে দিল।
এই নে, বোনু।
ইনায়া অবাক হয়ে বলল কি এইগুলো ভাইয়া?”
রেদোয়ান মুচকি হেসে বলল তোর স্বপ্ন।
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল মানে?
রেদোয়ান মাথা নেড়ে বলল নিজেই দেখে নে।
ইনায়া ধীরে ধীরে পেপার গুলো খুলতে লাগল।
একটা… দুটো… তিনটা…
হঠাৎ বড় বড় করে লেখা একটা নাম দেখে তার হাত থেমে গেল।
“IVA”
ইনায়ার বুক ধক করে উঠল।
ইনায়া অবাক হয়ে ফিসফিস করে বলল “এইটা…? ইনায়ার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। কাগজগুলোতে স্পষ্ট লেখা—IVA Brand Ownership Documents ইনায়া পুরোপুরি হতবাক হয়ে গেল।
আমি… আমি কিছু বুঝতেছি না ভাইয়া
রেদোয়ান কিছু বলার আগেই ইউভি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
তারপর একদম শান্ত গলায় বলল—
আজ থেকে এই দশটা আশ্রমের দায়িত্ব তোর, আদর। ইনায়া শ্বাস আটকে ইউভির দিকে তাকিয়ে রইল। ইউভি আরও বলল—
এদের দেখাশোনা এখন থেকে তুই করবি।আর IVA brand-ও
কয়েক সেকেন্ড থেমে খুব আস্তে বলল এখন থেকে পুরোটা তোর।”
ইনায়া যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। মানে… IVA এতদিন কার ছিল?
ইউভি মুচকি হেসে তার চোখের দিকে তাকাল।
শুরু থেকেই তোর ছিল, আদর। কথাটা শুনে ইনায়ার চোখ ভিজে উঠল। আমার…?
ইউভি আলতো করে ইনায়ার মাথায় হাত রেখে বলল সময় হলে সব বলব।
ইনায়া পেপার গুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
ইনায়ার হাত কাঁপছে।খুব ছোট্ট গলায় বলল—
— “অথচ এই brand টা আমার dream ছিল…”
ইউভির ঠোঁটের কোণে শান্ত হাসি ফুটে উঠল।
জানি তো। তোর কোন জিনিসটা ভালো লাগে, কোনটা স্বপ্ন… সব জানি আমি।”
ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে গেল।
ইউভি নিচু হয়ে খুব আস্তে বলল রাতে সব বুঝিয়ে বলব, আদর। এখন বাচ্চাদের খাওয়ানোর সময় হয়ে গেছে চল
ইউভি রেদোয়ানের দিকে তাকাতেই রেদোয়ান মাথা নেড়ে assistant দের ইশারা করল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় বড় food packet এনে রাখা হলো। তারপর রাজ্জ রেদোয়ান ইউভি ইনায়া চারজন মিলে বাচ্চাদের মাঝে খাবার দিতে শুরু করল। ইনায়া এক এক করে সবার হাতে packet তুলে দিচ্ছে। কেউ বলছে আপু, আমারটায় চিকেন আছে?” কেউ আবার packet নিয়েই খুশিতে লাফাচ্ছে। একটা ছোট্ট মেয়ে খাবার নিয়ে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরে বলল আপু, তুমি রোজ আসবা?
ইনায়া হেসে মেয়েটার গালে চুমু দিয়ে বলল—
ইন শা আল্লহ, আসব। দূরে দাঁড়িয়ে ইউভি সেই দৃশ্যটা দেখছিল। ইউভির চোখে তখন অন্যরকম এক শান্তি। সব বাচ্চাদের খাওয়ানো শেষ হলে ইউভি, ইনায়াদোয়ান আর রাজ্জোও একপাশে বসে খেতে শুরু করল।
ইনায়া চুড়ির জন্য ঠিকমতো খেতে পারছে না।
বারবার হাত আটকে যাচ্ছে। বিষয়টা ইউভি আর রেদোয়ান দুজনেই খেয়াল করল। রেদোয়ান সাথে সাথে বলল এই বোনু, দে। আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
এই বলে সে নিজের হাতে ইনায়াকে খাওয়াতে শুরু করল। ইনায়া মাঝখানে বসে আছে।
এক পাশে ইউভি… অন্য পাশে রেদোয়ান।
আর ইউভির পাশে রাজ্জো বসে সব দেখছে।
একবার রেদোয়ান ভাত তুলে দিচ্ছে, আরেকবার ইউভি পানির বোতল এগিয়ে দিচ্ছে।
খাওয়া শেষ করে বাচ্চাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেল সবাই।ছোট ছোট বাচ্চারা এসে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরছে।কেউ আঁচল ধরে আছে, কেউ হাত ছাড়তে চাইছে না।ইনায়ার মনটাই খারাপ হয়ে গেল।
ইউভি ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলল মন খারাপ করিস না।এই জায়গাটা এখন তোরই।
ইনায়া চুপচাপ ইউভির দিকে তাকাল। তারপর খুব আস্তে করে ইউভির হাতটা ধরে ফেলল।
এদিকে রেদোয়ান আর রাজ্জো গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে বলল ভাইয়া, আমরা বাসায় যাই?তোমরা আসো পরে। ইউভি মাথা নেড়ে বলল—
হুম। আমরা একটু পরে আসছি।
রেদোয়ান মুচকি হেসে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বললো বোনু, ভাইয়াকে বেশি জ্বালাস না।
ইনায়া সাথে সাথে বলল।আমি জ্বালাই?” রাজ্জো নিচু গলায় বলল।হ্যাঁ, আমার ভাইটার অবস্থা দেখলেই বুঝা যায়।
সবাই আবার হেসে উঠল।
তারপর ধীরে ধীরে গাড়িগুলো বের হয়ে গেল আশ্রমের গেট পেরিয়ে। আর আশ্রমের ফুলের গন্ধ মেশানো নরম বাতাসের মাঝে ইউভি আর ইনায়া কিছুক্ষণ চুপচাপ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।ইউভি একদৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ছিল।
আকাশি শাড়িতে মেয়েটাকে আজ এতটাই নরম আর মায়াবী লাগছে যে চোখ সরাতেই পারছে না ইউভি। হঠাৎ ইউভি ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল।
কি দেখো, বউ? তোমার সেহজাদাকে চিনতে পারছো না নাকি?
ইনায়া সাথে সাথে মাথা নিচু করে ফেলল।
চুড়িগুলো কাঁপা কাঁপা শব্দ করে উঠল।
নিচু গলায় বলল ইউভি ভাইয়া… ওইভাবে আমার দিকে তাকাবেন না প্লিজ ইউভি আরও একটু কাছে এগিয়ে এলো।
— “কেন?”
ইনায়া ঠোঁট কামড়ে ফিসফিস করে বলল জানি না… কেমন কেমন লাগে ইউভির বুকের ভেতরটা নরম হয়ে গেল। সে আলতো করে ইনায়ার থুতনিতে হাত দিয়ে মুখটা উপরে তুলল। আদর… তুই সত্যি খুব এলোমেলো। তারপর মুচকি হেসে বলল নিজেকে একটু তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নে… না হলে আমি কিন্তু control হারিয়ে ফেলব।
ইনায়া লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল।
সে কিছু বলার আগেই ইউভি হঠাৎ এক ঝটকায় তাকে কোলে তুলে নিল।
— “ইউভি ভাইয়া!”
ইনায়া ভয় পেয়ে দুহাত দিয়ে শক্ত করে ইউভির কালো শার্ট খামচে ধরল। চারপাশের বাচ্চারা সাথে সাথে হৈহৈ করে উঠল উউউউ ভাইয়া আপুকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে! আপু লজ্জা পাইছে!
ইনায়া আরও লজ্জা পেয়ে ইউভির বুকের সাথে মুখ লুকিয়ে ফেলল। ফিসফিস করে বলল—
সবাই দেখছে… বাচ্চারাও ইউভি নিচু হয়ে তার কানের কাছে মুখ এনে খুব আস্তে বলল—
ওদেরও তো শিখতে হবে… ভালোবাসা কাকে বলে।
ইনায়া সাথে সাথে ইউভির বুকে ছোট্ট একটা ঘুষি মারল।
— “অসভ্য! ইউভি হেসে ফেলল।
তারপর আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে বলল বেশি কথা বলো না, বউ… আমি কিন্তু ভুলে যাব আমার বউ অসুস্থ। ব্যাস! এরপর ইনায়া একদম চুপ গয়ে গেলো ।
শুধু মুখ গোমড়া করে ইউভির শার্টটা মুঠো করে ধরে রইল। আর ইউভি ঠোঁটের কোণে সেই দুষ্টু হাসি নিয়েই হাঁটতে লাগল গাড়ির দিকে।
গাড়ির কাছে পৌঁছে খুব যত্ন করে ইনায়াকে নামাল সে। তারপর দরজা খুলে ভেতরে বসতে সাহায্য করল। ইনায়া বসতেই শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে দিল ইউভি। চুলগুলো একপাশে সরিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে।
গাড়ির ভেতরটা তখন বেলিফুলের মিষ্টি ঘ্রাণে ভরে আছে। বাইরে হালকা বাতাসে গাছের পাতা দুলছে।
ইউভি ধীরে ধীরে ঝুঁকে এসে আবার ইনায়ার সিটবেল্টটা লাগিয়ে দিল।কিন্তু এবার ইচ্ছে করেই একটু বেশি সময় নিল। ইউভির গরম নিঃশ্বাস বারবার ইনায়ার গালে লাগছে। ইনায়ার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে অদ্ভুতভাবে। সিটবেল্ট লাগানো শেষ হলেও ইউভি সরে গেল না। একদম কাছে থেকেই নিচু গলায় বলল আজকে তোকে এত সুন্দর লাগছে যে।
ইনায়া কাঁপা গলায় বলল—
যে…?
ইউভি খুব ধীরে তার কানের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল
তোরে নিয়ে কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে, আদর…”
ইনায়ার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
সে তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।
ইউভি মুচকি হেসে গাড়ি স্টার্ট দিল।
এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ধরল আর অন্য হাতটা আলতো করে ইনায়ার হাতের উপর রাখল।
চুড়িগুলো টুংটাং শব্দ করে উঠতেই ইউভি খুব শান্ত গলায় বলল—
— “এই শব্দটা এইটা আমার শান্তির শব্দ।
গাড়িটা ধীরে ধীরে গ্রামের মেঠোপথ ধরে এগিয়ে চলেছে। দু’পাশে সবুজ ধানের ক্ষেত বাতাসে দুলছে।
আকাশটা আজ অদ্ভুত সুন্দর। সাদা মেঘগুলো নীল আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে আর সেই আলো এসে পড়ছে ইনায়ার মুখে ইনায়া জানালার বাইরে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ ইউভি গাড়িটা একটা সরু পথের পাশে থামিয়ে দিল।
ইনায়া অবাক হয়ে বলল—
— “এখানে?”
ইউভি মুচকি হেসে গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে দিল চল, আদর।”
ইনায়া ধীরে ধীরে নেমে চারপাশে তাকাতেই মুগ্ধ হয়ে গেল। চারদিকে নির্জন শান্ত পরিবেশ।
একটা ছোট্ট পুকুর পুকুরভর্তি লাল শাপলা ফুটে আছে। পানির উপর হালকা বাতাস লাগতেই শাপলাগুলো আস্তে আস্তে দুলছে। পুকুরের পাশ দিয়ে সবুজ ঘাস, কয়েকটা কাশফুল আর দূরে ধানের ক্ষেত। মনে হচ্ছে কোনো ছবির ভেতর এসে দাঁড়িয়েছে দুজনে । ইনায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে পুকুরের দিকে তাকাল।
তার চোখে তখন শিশুর মতো মুগ্ধতা।
— “ইয়া আল্লাহ… এত সুন্দর!
ইউভি একটু দূরে দাঁড়িয়ে শুধু ইনায়াকে দেখছে।
ইনায়ার খুশি দেখলেই ইউভির বুকের ভেতরটা শান্তিতে ভরে যায়। ইনায়া হঠাৎ ঘুরে বলল—
আপনি এই জায়গাটা কিভাবে খুঁজে পেলেন?
ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়ার কাছে এসে দাঁড়াল
যেদিন প্রথম তুই বলছিলি তোর লাল শাপলা দেখতে ভালো লাগে। সেদিন থেকেই খুঁজছিলাম।
ইনায়া একদম চুপ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা নরম হয়ে আসছে। সে নিচু গলায় বলল
আপনি সব মনে রাখেন? ইউভি খুব আস্তে বলল—
— “তোর সাথে জড়িত কিছু ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নাই, আদর।”
বাতাসে ইনায়ার চুলগুলো উড়ছিল।
ইউভি আলতো করে চুলগুলো সরিয়ে দিল।
তারপর পুকুরের ধারে ঘাসের উপর নিজের কালো কোর্ট টা বিছিয়ে বলল এখানে বস। ইনায়া হেসে বসে পড়ল। পুকুরের পানিতে লাল শাপলার প্রতিবিম্ব পড়ছে। ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়ার পাশে বসে একটা ছোট্ট শাপলা তুলে এনে ইনায়ার হাতে দিয়ে বললো।চাচির বেটি এই ফুলটার মতোই তুই।”
ইনায়া মুচকি হেসে বলল—
— “মানে?”
দেখতে নরম… শান্ত… কিন্তু একবার মনে জায়গা করে নিলে আর সরানো যায় না।
ইনায়া লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল।
ঠিক তখনই হালকা বাতাসে ইনায়ার আঁচলটা উড়ে ইউভির মুখে এসে লাগল। ইউভি আঁচলটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল তোর শাড়ি টাও আমার ছোয়া পেতে চাই শুধু তুই ই চাস না ইনায়ার বুক ধক করে উঠল।
সে কিছু বলতে গেলেও পারল না।হঠাৎ ইউভি খুব আস্তে ইনায়ার মাথাটা নিজের কাঁধে এনে রাখল।
এক হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে নিল।
কিছুক্ষণ পর ইনায়া নিচু গলায় বলল—
ইউভি ভাইয়া…”
হুম?”
“আজকে কেন জানি মনে হচ্ছে… আমি পৃথিবীর সবচেয়ে lucky মেয়ে।
ইউভি হালকা হেসে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
— “কারণ তুই আমার আদর।
তারপর হঠাৎ ইউভি ইনায়ার হাত ধরে পুকুরের একদম ধারে নিয়ে গেল।
পানিতে ভেসে থাকা একটা লাল শাপলা তুলে এনে খুব যত্ন করে ইনায়ার খোঁপায় গুঁজে দিল।
কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নিচু গলায় বলল—
— “এখন পুরো জায়গাটার চেয়েও বেশি সুন্দর লাগছে তোকে…”পুকুরের পানিতে হালকা বাতাস লেগে ছোট ছোট ঢেউ উঠছে। লাল শাপলাগুলো দুলছে ধীরে ধীরে। আর সেই শান্ত পরিবেশের মাঝখানে ইউভির কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে ইনায়া। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর হঠাৎ ইনায়া আবার একি ভাবে নিচু গলায় বলল—
—ইউভি ভাইয়া…”
— “হুম?”
ইনায়া আঙুল দিয়ে শাপলার পাপড়ি ছুঁতে ছুঁতে আস্তে করে বলল—
— “Do you love me?”
ইউভি একদম শান্ত গলায় বলল—
— “No.”
ইনায়া থমকে গেল।
তার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।
মনে মনে বলল আপনি যে আমাকে কতটা ভালোবাসেন, সেটা আমি জানি… তবুও একবার মুখে বলুন না ইনায়া ঠোঁট ফুলিয়ে একটু রাগ দেখিয়ে বলল—
— “ভালোবাসেন আপনি আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু মুখে একবারও বলেন না! ইউভি এবার ইনায়ার দিকে তাকাল।
চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত।ধীরে ধীরে বলল—
— “I don’t love you, Inaya Nur Chowdhury.”
কথাটা বললেও মনের ভেতরটা যেন অন্য কথা চিৎকার করে বলছে—
ভালোবাসার থেকেও বেশি ভালোবাসি তোকে…
ইনায়ার চোখে এবার সত্যি সত্যি অভিমান জমল।
সে নিচু গলায় বলল একবার বলেন না… আমার সব ইচ্ছা, সব স্বপ্ন আপনি পূরণ করেন, ইউভি ভাইয়া… শুধু এইটা বাদে। ইউভি গভীর শ্বাস ফেলল।
তারপর খুব ধীরে ইনায়ার দিকে ঘুরে বলল—
ভালোবাসলে মুখে না… কাজে প্রমাণ দিতে হয়, আদর। সে ইনায়ার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলতে লাগল—
— “তোর mood swing…
তোর রাগ-অভিমান…
তোর চুপ করে থাকা…
অল্প কিছুতেই কেঁদে ফেলা…
তোর বাচ্চামি…
সবকিছু নিয়ে অতিরিক্ত ভাবা…
এইসব কিছু মেনে নিয়েছি আমি।
তোর সব স্বপ্ন পূরণ করার চেষ্টা করছি… ইন শা আল্লাহ সামনে আরও করব।
এইটা কি ভালোবাসা না, আদর?
মুখে ‘ভালোবাসি’ বললেই কি শুধু ভালোবাসা হয়?”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল ইউভি এইজন্যই বলি… তুই ভীষণ এলোমেলো। নিজেকে একটু গুছিয়ে নে, আদর।
ইনায়া এবার জেদি চোখে তাকাল।
তারপর আঙুল তুলে বলল আমিও ইনায়া নূর চৌধুরী। আপনার মুখ থেকে ‘ভালোবাসি’ কথাটা শুনেই ছাড়ব। বিনিময়ে যদি আমাকে প্রান
কথা শেষ হওয়ার আগেই ইউভি হঠাৎ ইনায়া কে নিজের দিকে টেনে নিল।পরের মুহূর্তেই ইনায়ার ঠোঁট দুটো ইউভির ঠোঁটের মাঝে হারিয়ে গেল।
ইনায়া আচমকা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল।
তবুও ইউভি ছাড়ল না। ইউভির ভেতরের সব অভিমান, ভয়, ভালোবাসা যেন একসাথে মিশে গেছে সেই মুহূর্তে। বেশ কিছুক্ষণ পর ইউভি ধীরে ধীরে তাকে ছেড়ে দিল।
তারপর কপাল ঠেকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
— “Next time এই কথা বলার আগে একশোবার ভাববি… সালি।
ইনায়া হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
ইউভি কয়েক কদম দূরে সরে গিয়ে বলল—
— “যা… এখন কাছে আসবি না আমার।
এই বলে সে সোজা গাড়ির দিকে চলে গেল।
ইনায়া তখনই বুঝতে পারল ইউভি রাগ করেছে। গাড়ির কাছে গিয়ে ইউভি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইল। নিজে কিছু বলল না, কিন্তু ইশারায় বুঝিয়ে দিল— উঠে বস।
ইনায়া ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে বসল।এখন ইউভি আর তার সিটবেল্ট বেঁধে দিল না। চুপচাপ নিজের সিটে বসে সামনে তাকিয়ে রইল। ইনায়া নিজেই সিটবেল্ট বেঁধে নিল।তারপর বারবার ইউভির দিকে তাকাচ্ছে।কিন্তু ইউভি একবারও তাকাচ্ছে না।
চোয়াল শক্ত করে গাড়ি চালাচ্ছে শুধু।
শেষমেশ ইনায়া আর থাকতে পারল না।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ইউভিকে জড়িয়ে ধরল।
দুই হাত দিয়ে ইউভির হাত শক্ত করে ধরে মাথাটা তার কাঁধে রেখে ফিসফিস করে বলল—
— “Sorry… আমার সেহজাদা। আর বলব না…”
ইউভি কিছু বলল না। শুধু গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু তার হাতের শিরাগুলো টানটান হয়ে আছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সে গাড়িটা রাস্তার পাশে থামাল। তারপর ধীরে ধীরে ইনায়ার দিকে ফিরল।
ইনায়ার চোখ তখন ভেজা।।মুখটা ছোট্ট হয়ে গেছে।
ইউভির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে খুব আস্তে ইনায়ার কপালে একটা চুমু দিল।
তারপর কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল তুই ছাড়া আমি ভীষণ এলোমেলো হয়ে যাব, আদর তোকে আমি অসম্ভব রকমের ভালোবাসি…
কিন্তু মুখে।কিচ্ছু বললো না পুরো টা পথ চুপ করে বাড়ি ফিরলো ইউভি।
রাত অনেক গভীর। চারপাশে এক অন্যরকম শান্তি নেমে এসেছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে মাঝে মাঝে হালকা বাতাসে নারিকেল গাছের পাতার শব্দ শোনা যাচ্ছে আকাশভরা তারা যেন পুরো শীতারামপুর গ্রামটাকে নরম আলোয় মুড়িয়ে রেখেছে।
চৌধুরী বাড়ির ছাদে বড় করে পাটি পেতে সবাই গোল হয়ে বসে আছে। এত মানুষ একসাথে থাকলেও পরিবেশটা অদ্ভুত শান্ত আর আপন লাগছে।
ইনায়া মন মরা হয়ে জামেলা চৌধুরীর কোলের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। তার চোখ আধো বুজে এসেছে। পিয়াসা আবার ইনায়ার পেটের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। আর পিয়াসার বুকের উপর মাথা রেখে দিব্যি আরামে শুয়ে আছে তুবা। তাদের পাশেই তুলিত আর তারিন গুটিসুটি মেরে বসে গল্প শুনছে।
একপাশে বসে রেশমা চৌধুরী, নুসরাত চৌধুরী আর সাবিহা চৌধুরী নিজেদের মধ্যে গল্প করছেন। নিচের উঠানে আবার রাতিব চৌধুরী, রবুল চৌধুরী, লিখন চৌধুরী, মুস্তাক চৌধুরী আর গ্রামের কিছু মানুষ গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। দূর থেকে তাদের হাসির শব্দও ভেসে আসছে।
রিদ, আয়াত আর আতিকা পুরো ছাদজুড়ে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে। আর ইউভি, রেদোয়ান, রাজ্জো, রাশেদ মির্জা আর রিমঝিম কোনো একটা important কাজে বাইরে গেছে।
হালকা বাতাসে ইনায়ার লম্বা চুলগুলো উড়ছে। হঠাৎ ইনায়া চোখ খুলে আস্তে করে বলল আচ্ছা দাদুমনি… তোমাদের গ্রামে হিন্দু আছে?
জামেলা চৌধুরী মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন না তো দাদি। এই গ্রামে তো মুসলিমরাই থাকে। পাশের দিকে হিন্দু ধর্মের মানুষ আছে। কেন বল তো? ইনায়া একটু উঠে বসে বলল আমার এক friend-এর কাছে শুনছিলাম রাম আর শীতা নাকি তাদের দেবতার নাম। তাহলে তারা তো এই গ্রামে থাকত না… এই গ্রামের নাম শীতারামপুর কেন?
জামেলা চৌধুরী হেসে ফেললেন। ওহ, এই কথা! তাহলে শোন…
সবাই একটু নড়েচড়ে বসল। তুলি তো একদম সামনে এগিয়ে এসে বসল আগ্রহ নিয়ে।
জামেলা চৌধুরী ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—অনেক অনেক আগে নাকি শীতারাম রাজা নামে একজন এই এলাকায় তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে আসছিল। তখন এই জায়গায় পানি ছিল না বললেই চলে। পরে নাকি তাদের ঘোড়াগুলারে পানি খাওয়ানোর জন্য এইখানে বিশাল এক পুকুর কাটা হয়।”
তুবা চোখ বড় বড় করে বলল একদিনে?
জামেলা চৌধুরী মাথা নেড়ে বললেন। লোকমুখে শোনা যায়… এক রাতেই নাকি সেই পুকুর কাটা হয়েছিল। কতটুকু সত্যি জানি না দাদি আমরাও বড়দের মুখে এই গল্প শুনছি। পিয়াসা মুগ্ধ গলায় বলল ওয়াও movie vibe!
জামেলা চৌধুরী হেসে আবার বললেন পরে সেই পুকুরের কারণেই এই গ্রামের নাম রাখা হয় শীতারামপুর। ইনায়া মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। চারপাশের বাতাসটাও যেন গল্পের সাথে আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। ঠিক তখনই তুলিত উৎসাহ নিয়ে বলল “দাদি দাদি! ওই প্লেট দেওয়ার গল্পটা বলো না!
জামেলা চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে বললেনকোন গল্প?”
পিয়াসা সাথে সাথে উঠে বসে বলল আমরাও শুনবো!”
জামেলা চৌধুরী একটু হেসে বললেন অনেক আগে যখন এই গ্রামে বিয়ে বা বড় অনুষ্ঠান হতো, তখন মানুষজন ওই পুকুরের পাড়ে গিয়ে যা চাইত… তাই নাকি পেত। তুবা অবাক হয়ে বলল মানে?”
কাসার প্লেট, গ্লাস, বাটি, চামচ… যা দরকার হতো, রাতে গিয়ে চাইলে সকালে পুকুরপাড়ে পাওয়া যেত।
সবাই একসাথে বলে উঠল কীহহহহহ!
পিয়াসা তো ভয় পেয়েই ইনায়ার হাত চেপে ধরল।
জামেলা চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন কিন্তু শর্ত ছিল… অনুষ্ঠান শেষে আবার গভীর রাতে সবকিছু ফেরত দিয়ে আসতে হতো।
তুবা কৌতূহলী হয়ে বলল এখন দেয় না কেন?
জামেলা চৌধুরী এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেনএকদিন এক লোক লোভ সামলাতে না পেরে একটা বাটি নিজের কাছে রেখে দেয়। তারপর থেকেই আর কিছু পাওয়া যায় না।
কয়েক সেকেন্ড পুরো ছাদের সবাই চুপ হয়ে গেল।
শেহেজাদার আদর পর্ব ৩১
তারপর সবাই একসাথে বলে উঠল সো স্যাড! একজন লোভী লোকের জন্য সব শেষ! মানুষ এমন কেন!
পিয়াসা নাটকীয়ভাবে বলল আমি হলে অন্তত matching সেটটা রেখে দিতাম!
সবাই হেসে উঠল। হাসির শব্দে ছাদের পরিবেশটা আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
ইনায়া আবার ধীরে ধীরে জামেলা চৌধুরীর কোলের উপর মাথা রাখলো মনে মনে বললো কী এমন বললাম যে এত রাগ করলো।।।।।।।
