প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩
insia isha chowdhury
সূচনার চুল থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ছে। কোনোমতে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো সে।
অন্যদিকে দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল প্রণয়। দরজা খোলার শব্দে অবচেতনভাবেই পেছন ফিরে তাকালো সে। আর তাকিয়েই যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য সময়ের হিসাব ভুলে গেল।ভেজা চুলে সূচনাকে এতটাই স্নিগ্ধ লাগছিল যেন ভোরের শিশির মাখা সদ্য ফোটা সাদা পদ্মফুল। মুখের পাশে লেগে থাকা ভেজা চুলগুলো ওর সৌন্দর্যকে আরও কোমল করে তুলেছে। প্রণয়ের চোখ দুটো অদ্ভুত এক মোহে আটকে গেল সূচনার মুখে। সে শুধু তাকিয়েই রইল।
আর সূচনাও চুপচাপ তাকিয়ে আছে প্রণয়ের দিকে। দুজনের মাঝখানে এখন নীরবতা।
কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে গেল। তারপর সূচনা ধীরে ধীরে প্রণয়ের দিকে এগিয়ে এলো। কিন্তু পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির মেয়েটার পক্ষে পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চির প্রণয়ের চোখের সমান হওয়া সহজ নয়। তাই ও পায়ের পাতার উপর ভর দিয়ে একটু উঁচু হয়ে দাঁড়ালো। তারপর ডান হাতটা প্রণয়ের চোখের সামনে নেড়ে দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল,
“স্যার, আপনার কী হয়েছে? এভাবে কী দেখছেন? আপনি কি ভেতরে আসবেন না। নাকি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবেন? আমার কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে। আমি কিন্তু সব খাবার একাই খেয়ে ফেলতে পারব। আপনি যদি খেতে চান তাহলে ভেতরে চলুন।”
সূচনার কণ্ঠস্বরেই যেন হুঁশ ফিরল প্রণয়ের। সে হালকা কেশে নিয়ে চোখ সরিয়ে বলল,
“হ্যাঁ… হ্যাঁ, ভেতরে চলো।”
ঘরের ছোট্ট টেবিলটার উপর সুন্দর করে বিরিয়ানি সাজানো। দুজন মুখোমুখি বসে খেতে শুরু করল। চারপাশে নিস্তব্ধতা থাকলেও সূচনার স্বভাবসিদ্ধ চঞ্চলতা বেশিক্ষণ চুপ থাকতে দিল না।
খেতে খেতেই সূচনা বলল,
“স্যার, বিয়ের আগে তো আপনার সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তখন তো একবারও বলেননি যে আপনার সাথেই আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
প্রণয় পানির গ্লাসটা নিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“কারণ আমি নিজেও জানতাম না। যে তোমার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। মা শুধু বলেছিল, “প্রণয়, আমি তোর জন্য সেরা মেয়ে পছন্দ করেছি।” তখন বুঝিনি সেই “সেরা মেয়ে”টা তুমি।”
সূচনার ঠোঁটে সাথে সাথে গর্বিত একটা হাসি ফুটে উঠল।
“আপনার মা ঠিকই বলেছে। আমি আসলেই একটা সেরা মেয়ে। তবে আপনি কি আমাকে প্রশংসা করছেন নাকি অপমান করছেন সেটা বুঝতে পারছি না।”
প্রণয় হালকা হেসে বলল,
“তোমাকে অপমান কেন করব? বরং তুমি আগে বলো, তুমি সত্যিই জানতে না যে আমার সাথে তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে? যেভাবে সবার সামনে জ্ঞান হারালে, মনে হচ্ছিল যেন কোনো জল্লাদের সাথে বিয়ে হচ্ছে তোমার।”
সূচনার ঠোঁট নড়ে উঠল। খুব আস্তে বিড়বিড় করে বলল,
“আপনি জল্লাদের থেকে কোন অংশে কম নাকি?”
তারপর গলাটা একটু উঁচু করে আবার বলল, “আসলে স্যার, আমি তো বিয়ের আগে আপনার ছবি দেখিনি। এমনকি এটাও জানতাম না যে কার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আপনার বর্ণনা আমাকে ভাবি বলেছিল। আমি ভেবেছিলাম বিয়ে তো ফরজ কাজ, করে নেওয়াই ভালো। এত খুশি ছিলাম যে খুশির চোটে বরের ছবিটাই আর দেখা হয়নি। এমনকি আমি তো জানতাম আমার হবু বরের নাম আবরার।”
কথাটা বলেই সূচনা নিজের দুহাত বাড়িয়ে দিল প্রণয়ের সামনে। আর বলল,
“দেখুন, আমার মেহেদিতেও বরের নাম হিসেবে “আবরার” লেখা।”
প্রণয় তাকিয়ে দেখল, সত্যিই সূচনার নরম দুহাতে গাঢ় মেহেদির নকশার মাঝে সুন্দর করে “আবরার” নামটা লেখা।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রণয় বলল,
“প্রথমত, তুমি আমাকে “স্যার স্যার” বলা বন্ধ করো। এটা কলেজ না।”
সূচনার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“তাহলে আপনাকে কী বলে ডাকব?”
প্রণয় স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“যেভাবে একজন স্ত্রী তার স্বামীকে ডাকে।”
কথাটা শুনে সূচনার চোখ গোল হয়ে গেল। তারপর একটু নাটক করে বলল,
তাহলে কি আমি এভাবে ডাকব… “ওগো শুনছেন?”
বলেই সে নিজেই খিলখিল করে হেসে উঠল। ওর হাসির শব্দে পুরো ঘরটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
প্রণয় গম্ভীর মুখে তাকিয়ে বলল,
“তুমি চাইলে আমার নাম ধরেও ডাকতে পারো।”
সূচনার হাসিটা এবার একটু থামল। হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর কৌতূহলী চোখে জিজ্ঞেস করল,
“আপনার বয়স কত?”
“সাতাশ প্লাস।”
কথাটা শুনে সূচনার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“কী! আর আমার বয়স মাত্র আঠারো। মানে গুনে গুনে আপনি আমার থেকে নয় বছরের বড়! আপনি তো আমার থেকে অনেক বড়। তাহলে আমি আপনাকে নাম ধরে কীভাবে ডাকব?”
প্রণয় চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল,
“তুমি কি আমাকে বুড়ো বলছো?”
সূচনার মুখের হাসি মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল। তাড়াহুড়ো করে বলল,
“হ্যাঁ…না মানে…আসলে…
প্রণয় গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“থাক। আর আসলে-নকলে করতে হবে না।”
কথাটা বলেই সে আবার খাওয়ায় মন দিল। আর সূচনা ঠোঁট কামড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আবার চেয়ারে বসে খাবার খেতে শুরু করলো।
খাওয়া শেষ হতেই ঘরের ভেতর এক ধরনের নীরবতা নেমে এলো। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ ভেসে আসছে। প্রণয় খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে বিছানার একপাশে ফুলগুলো সরিয়ে বসে পড়ল।
আর ঠিক তখনই সূচনার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
অবিশ্বাস কন্ঠে বলল,
“একি! আপনি বিছানায় কেন বসছেন?”
প্রণয় ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখেই শান্ত স্বরে বলল,
“বিছানায় বসব না তো কী তোমার মাথায় বসব?”
সূচনার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে গেল। একটু ইতস্তত করে বলল,
“না মানে… আপনি বিছানায় ঘুমাবেন?”
প্রণয় এবার ফোনটা পাশে রেখে ভ্রু তুলে তাকাল।
“আমার জানামতে এটা আমার বাড়ি, এটা আমার ঘর আর এটা আমার বেড। প্রতিটা রাত আমি এই বিছানাতেই ঘুমাই তাই আমি আমার বিছানাতেই ঘুমাব।”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে দুহাত কোমরে রেখে দাঁড়িয়ে গেল। মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। প্রতিবাদ করে বলে উঠলো,
“আপনি জানেন না, একটা মেয়ের জন্য একটা অচেনা ছেলের সাথে বিছানা শেয়ার করা কতটা বিরক্তিকর?”
প্রণয়ের চোখেমুখে এবার হালকা বিরক্তি ফুটে উঠল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“এই মেয়ে, বিয়ে করার আগে এসব তোমার মনে ছিল না? এটা আমার ঘর। তাই আমি এখানেই ঘুমাব।”
সূচনা এবার কিছুটা অসহায় মুখে বলল,
“তাহলে আমি কোথায় ঘুমাব?”
“যেখানে মন চায় সেখানে।”
“আমি বিছানা ছাড়া ঘুমাতে পারি না।”
প্রণয় নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল,
“সেটা আমি জানি না। তোমার এত সমস্যা হলে বারান্দায় গিয়ে ঘুমাও। না হলে সোফায় শুয়ে পড়ো।”
প্রণয়ের কণ্ঠে এমন রাগ মিশে ছিল যে সূচনা মুহূর্তেই চুপসে গেল। কিছুক্ষণ ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে থেকে পরে ধীরে ধীরে বলল,
“আরে, আপনি এত রেগে যাচ্ছেন কেন? ঠিক আছে। আমিও বিছানায় ঘুমাব। তবে মাঝখানে বালিশ দেব। আপনি কিন্তু সেই বর্ডার ক্রস করবেন না। কারণ এই বিয়ে এই সম্পর্ক এসব মেনে নিতে আমার সময় লাগবে।”
কথাটা শুনে প্রণয় ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমার এত সাধ নেই।”
কথাটা বলেই সে বিছানার একপাশে গিয়ে বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ল।
সূচনা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বিছানার অন্য পাশে এসে বসলো। বড় একটা কোলবালিশ টেনে এনে মাঝখানে রেখে দিল।
এরপর সাবধানে শুয়ে পড়ল। দুজনই বিপরীত দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছে। ঘরের হালকা নীল আলোয় সূচনার ভেজা চুল ছড়িয়ে আছে বালিশ জুড়ে। আর প্রণয় চোখ বন্ধ করলেও বারবার অনুভব করতে লাগল সেই মিষ্টি শ্যাম্পুর গন্ধ।
অন্যদিকে সূচনা মনে মনে বলল,
“এই জল্লাদের সাথে এখন থেকে প্রতিদিন একই রুমে থাকতে হবে!”
এদিকে সূচনার চোখের পাতায় ধীরে ধীরে ঘুম নেমে এলো। সারাদিনের ক্লান্তি, এছাড়া অচেনা পরিবেশ আর হাজারো অস্বস্তির ভিড়ে একসময় সূচনা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
কিন্তু প্রণয়ের চোখে ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই।
নিজের বিছানায়, একদম পাশে একটা মেয়ের অস্তিত্ব— ব্যাপারটা তার কাছে ভীষণ অস্বস্তিকর লাগছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অচেনা অনুভূতি কাজ করছে। বারবার পাশ ফিরে শুয়েও শান্তি পাচ্ছে না সে। ঘরের নীরবতা, মৃদু নিশ্বাসের শব্দ আর ফুলের মিষ্টি গন্ধ মিলিয়ে পরিবেশটা আরও বেশি অস্থির করে তুলছে তাকে।
অনেকক্ষণ পর ক্লান্ত শরীরের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানলো প্রণয়ও। চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এলো তার। কিন্তু কিছুক্ষণ যেতেই ঘুমের ঘোরে সূচনা নিজের পাশের কোলবালিশটা ঠেলে ফেলে দিল। ওর ঘুম সবসময়ই ভীষণ অস্থির কখনো এপাশ ওপাশ, কখনো হাত-পা ছুঁড়ে ঘুমানো। অবচেতন মনেই সূচনা একটু একটু করে প্রণয়ের দিকে সরে এলো।
গভীর রাত হঠাৎ বুকের উপর ভারী কিছু অনুভব করতেই প্রণয়ের ঘুম ভেঙে গেল। বিরক্ত মুখে চোখ খুলতেই মুহূর্তেই থমকে গেল সে। সূচনা তার বুকের উপর মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। এক পা প্রণয়ের শরীরের উপর তুলে দিয়েছে, ঠিক যেন কোনো কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে আছে। ছোট্ট মুখটা ঘুমের শান্তিতে ভরা, এলোমেলো চুলগুলো ছড়িয়ে আছে প্রণয়ের বুক জুড়ে।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য প্রণয় পুরোপুরি স্থির হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠলো। এই মেয়েটা কয়েক ঘণ্টা আগেও তার জীবনের কেউ ছিল না, অথচ এখন এমন নির্ভরতা নিয়ে তাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় এটাই।
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২
প্রণয় ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ফেলল। ইচ্ছে করল সূচনাকে সরিয়ে দিতে! কারণ সূচনা ঘুম থেকে উঠে এমন দৃশ্য দেখলে অবশ্যই ঝামেলা করবে। কিন্তু হাত বাড়িয়েও থেমে গেল সে। কারণ ঘুমন্ত এই শান্ত মুখটাকে দেখে অদ্ভুত এক মায়া কাজ করছে তার ভিতরে। একটা অচেনা অনুভূতি। হয়তো এই অনুভূতির নাম ধীরে ধীরে ভালোবাসা হয়ে উঠবে।
