Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯২

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯২

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯২
তানিয়া হুসাইন

ডাক্তার যাওয়ার পর ভীর ডাক্তারের দেওয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী দ্রুত সব ঔষধ আনতে বলে গার্ডকে।
আর মারিয়াকে খাবার আনতে বলে।
ভীর ইশায়ার কাছে গিয়ে নিচু গলায় বলে,
__আগে একটু কিছু খাও।
ঔষধ খেলে কমে যাবে ব্যাথা বলে ইশায়ার কপালে আলতো চুমু খায়।
খাবার আসলে ভীর নিজের হাতে তাকে অল্প স্যুপ খাইয়ে দেয়, তারপর ঔষধগুলো একে একে খাওয়ায়।
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে ইশায়ার পেটের ব্যথাটা কমতে শুরু করে।কিছুক্ষণ পর ঠিক হয় সে।ভীর পুরোটা সময় এক মুহূর্তের জন্যও তাকে একা ছাড়েনি।
ভীর বেপরোয়া অধৈর্য হলেও ইশায়ার বেলা সে সব সময়-ই ধৈর্যের সাথে করে সব কাজ।কোন কিছুতেই বিরক্ত হয় না সে।
ইশায়া একটু স্টেবল হতেই ভীর উঠে দাঁড়ায়।
তাকে বাইরে যেতে হবে কাজ আছে।
সে রেডি হয় কালো প্যান্টের সাথে সাদা শার্ট,কালো কোট ।চুলে জেল দিয়ে সেট করে।
ভীর অভ্যাসমতো পুরো শরীরে পারফিউম স্প্রে করতেই।

___ ইশায়া কেশে উঠে,।
মুখ চেপে ধরে দ্রুত পাশ ফিরে সে।
তার চোখ মুখ কুঁচকে আছে যেন সাথে সাথেই বমি চলে আসবে।
ভীর সাথে সাথে ঘুরে তাকায়।
___আবার কী হয়েছে?
সে দ্রুত ইশায়ার দিকে এগিয়ে আসে।
শরীর আবার খারাপ করছে? ডাক্তার ডাকবো?
কিন্তু ভীর কাছে আসতেই ইশায়া তাড়াতাড়ি হাত তুলে থামায়।
___সরুন! সরুন প্লিজ!
ভীর থেমে যায়, তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়।
ইশায়া বিরক্ত গলায়, মুখ চেপে ধরে বলে,
___আপনার পারফিউমের গন্ধে আমার বমি আসছে। দূরে যান,
কয়েক সেকেন্ড ভীর শুধু তাকিয়ে-ই থাকে।যেন কথাটা বিশ্বাসই করতে পারছে না।
তারপর শক্ত, অবিশ্বাসভরা গলায় বলল,
__What the **** ! এই পারফিউমের দাম জানো তুমি।এটা বাংলাদেশি টাকায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা,
Clive Christian এর “নাম্বার ওয়ান ইম্পেরিয়াল ম্যাজেস্টি”।আর তুমি বলছ এটার গন্ধে,
কথা শেষ করার আগেই ইশায়া আবার চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে।এক হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে অন্য হাতে মুখ ঢেকে রাখে।
ভীর থেমে যায়।তার বিরক্তি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কারণ সে বুঝতে পারে ইশায়া ইচ্ছা করে করছে না। সত্যিই তার সমস্যা হচ্ছে।ভীর গভীর শ্বাস ফেলে
তারপর আর একটাও কথা না বলে চুপচাপ পারফিউমের বোতলটা টেবিলে রেখে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।কারণ এই মুহূর্তে সে যতক্ষণ রুমে থাকবে, ইশায়ার ততই কষ্ট হবে।

_____আজ পুরো য*মুনা ফিউচার পার্ক আলোয় ঝলমল করছে।উইকেন্ড হওয়ায় মানুষের ভিড়ও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। চারদিকে রঙিন আলো, বড় বড় ব্র্যান্ডের শোরুম, মানুষের কোলাহল, শিশুদের হাসির শব্দ সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
এই ভিড়ের মাঝেই একসাথে প্রবেশ করলো রহমান পরিবার।পরিবারের সব মেয়েরাই আজ এসেছে বিয়ের শপিং করতে। তাদের সাথে এসেছে রাহির বাবা-মা আর বোনেরাও।
আজ সবচেয়ে বেশি খুশি রাহি। তার মুখের হাসিটা কিছুতেই থামছে না। চোখেমুখে এমন এক উজ্জ্বলতা, যা বহু বছর পর ফিরে এসেছে তার জীবনে।
কারণ আজ তার বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে।
অবশেষে সে আদ্রিয়ানকে নিজের করে পাবে।
যে মানুষটাকে সে একসময় হারিয়ে ফেলেছিলো,
যাকে পাওয়ার সব আশা ধীরে ধীরে ছেড়ে দিয়েছিলো,
আর এখন সেই মানুষটাই তার হতে যাচ্ছে।একসময় যখন সাফাপু আর আদ্রিয়ানের প্রেমের সম্পর্ক এর কথা সে জেনেছিল, বিয়ের কথা ঠিক হয়েছিলো, তখন রাহি নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেয় তাদের থেকে। হাসিখুশি মেয়েটা একদম চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলো। নিজের অনুভূতিগুলো বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখে দূরে সরে গিয়েছিলো সবার কাছ থেকে।

কিন্তু ভাগ্য মানুষকে কোথা থেকে কোথায় এনে দাঁড় করায়, সেটা কেউ জানে না।যাকে পাওয়ার আশা সে অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছিলো, আজ তাকেই সে নিজের জীবনের সঙ্গী হিসেবে পেতে যাচ্ছে।
ভাবতেই রাহির বুকের ভেতর আনন্দে কেঁপে উঠছে।
সে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
একদিন আদ্রিয়ানও তাকে ভালোবাসবে।এই বিশ্বাসটুকু নিয়েই সে নতুন স্বপ্ন বুনছে।শুরু হয় বিয়ের শপিং।
একটার পর একটা শোরুম ঘুরতে লাগলো সবাই।
রাহির জন্য কেনা হয় সোনার গয়না। নেকলেস, কানের দুল, চুড়ি, টিকলি সবকিছু পছন্দ করছে বড়রা।
তারপর বেছে নেওয়া হয় বিয়ের শাড়ি। লাল রঙের ভারী কাজ করা শাড়িটা রাহির গায়ের সাথে ধরতেই সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।
রেহেনা বেগম মেয়ের সুখ দেখে শুকরিয়া আদায় করেন।রাহির লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠছে সবার কথায়।আদ্রিয়ানের জন্য নেওয়া হয় শেরওয়ানি। গাঢ় রঙের রাজকীয় ডিজাইন।
রাহির বোনেরা সেটা নিয়ে মজা করতে শুরু করে,

___দুলাভাইকে এটা পরলে সিনেমার হিরোর মতো লাগবে!তাদের কথায় সবাই হেসে উঠে।শুধু বিয়ের জিনিসেই থামেনি কেনাকাটা।
পরিবারের সবার জন্যই জামাকাপড় কেনা হয়। কেউ শাড়ি দেখছে, কেউ থ্রি-পিস, কেউ আবার বাচ্চাদের পোশাক নিয়ে ব্যস্ত।
সব মিলিয়ে আনন্দে ভরে ছিলো পুরো সময়টা।
সবাই যখন নিজেদের কেনাকাটায় ব্যস্ত, তখন হঠাৎ করেই সায়মা রহমানের চোখ পরে একটা বেবি পিংক রঙের গাউনের উপর।তিনি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন সে দিকে।তারপর এগিয়ে গেলেন গাউনটার কাছে।নরম কাপড়ের উপর আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলেন তিনি।
তার ঠোঁটে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠলো ঠিকই,
কিন্তু বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠলো তীব্র শূন্যতায়।এই রংটা তার মেয়ের সবচেয়ে পছন্দের ছিলো।যদি মেয়েটা আজ এখানে থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই এই গাউনটা নেওয়ার জন্য জেদ ধরে বসে থাকতো।হাত জড়িয়ে ধরে বলতো,

___আম্মু প্লিজ! এটা আমাকে কিনে দাও না।
সে যদি না দিতো তাহলে মেয়ে গাল ফুলিয়ে তার বাবাকে ফোন দিবে।আর বাবা সে ফোন দিয়ে আমাকে কথা শুনিয়ে বলতো,মেয়ে যেটা বলেছে সেটা কিনে দাও।টাকার চিন্তা তোমার করতে হবে না।আমার মেয়ে যা চায় তাই দাও।
হঠাৎ করেই সায়মা রহমানের বুকের ভেতর কেমন করতে থাকে।কতদিন হয়ে গেলো মেয়ের জন্য কিছু কেনা হয় না।তার মেয়ে টাও আর বায়না ধরে না
কথাগুলো মনে হতেই তার চোখ ভিজে উঠে।
তিনি দ্রুত চোখের কোণের পানি মুছে ফেলেন যাতে কেউ দেখে না ফেলে।
তারপর আবার গাউনটার দিকে তাকালেন।
কী মনে করে ধীর গলায় দোকানদারকে বলেন,
___এটাও প্যাক করে দিন।

_____রাত প্রায় দুটো।
ভীরের প্রাইভেট অফিসের কাঁচঘেরা রুমটা অন্ধকারে ডুবে। শুধু ডেস্কের উপর রাখা ল্যাম্পটার আলো তার মুখের অর্ধেকটা আলোকিত করে রেখেছে।হাতে ও*য়াইনের গ্লাস, চোখ ল্যাপটপের স্ক্রিনে।কাজে ব্যস্ত সে, তার অনেক পেন্ডিং কাজ রয়েছে অনেক গুলো ডিল।
হঠাৎ দরজা ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ে নিক।
তার মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর।
___ভীর… সমস্যা হয়েছে।
ভীর ধীরে চোখ তোলে।তার দৃষ্টি ঠান্ডা।
___পোর্টে আমাদের শিপমেন্ট আটকে গেছে।
এক মুহূর্তে ভীরের চোখের রং বদলে যায়।
ভীরের আঙুলের ফাঁকে থাকা গ্লাসটা শক্ত করে ধরে।
___কত টাকার?
এনরিকো এবার সামনে এগিয়ে আসে।
___কয়েকশো কোটি। পুরো চালানটাই।
পরের সেকেন্ডেই চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায় ভীর।
তার চোখে সেই ভয়ংকর শান্ত রাগ।
___কে আটকে দিয়েছে?
স্পেশাল টাস্ক ফোর্স। নতুন অফিসার এসেছে। কারো কথা শুনছে না।ভীর হালকা হাসে।কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই, নতুন এজন্যই এই দুঃসাহস করার সাহস পেয়েছে।সমস্যা নেই তার জায়গা আমি তাকে দেখিয়ে দিব। হয় মানবে না হয় মরবে।

___গাড়ি বের করো।
শক্ত গলায় বলে ভীর
কালো রঙের কয়েকটা এসইউভি রাত চিরে বন্দরের দিকে ছুটে যায়।চারদিকে ক*নটেইনার, বিশাল ক্রে*ন আর পু*লিশের ফ্ল্যাশিং লাইট।ভীর গাড়ি থেকে নামতেই আশেপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
কালো কোটের ভিতর হাত ঢুকিয়ে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে সে সামনে যায়।একজন সিনিয়র অফিসার এগিয়ে আসে মিস্টার রদ্রিগেজ।
___এখানে আপনার আসার অনুমতি নেই।
ভীর থামে না।
___আমার জিনিস আটকে রাখার অনুমতি তোদের কে দিয়েছে?
অফিসার এবার কড়া গলায় বলে,
___আ*ইনের অনুমতি।
ভীর রি*ভলবার বের করতে নিলে ডিয়েগো সামলায় তাকে।নিক আর এনরিকো বুঝে যায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।কারণ ভীরের চোখের দৃষ্টি ইতিমধ্যে বদলে গেছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, সর*কারি লোক আছে, স্পেশাল ইউনিট আছে।ভীর চাইলে এখন র*ক্ত ঝরাতে পারে… কিন্তু সেটা করলে পুরো সাম্রাজ্য ঝুঁকিতে পড়ে যাবে।
তাই ডিয়েগো তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।
নিক ফোন বের করে একটা নাম্বারে কল দেয়।
ওপাশে কল ধরতেই নিক ঠান্ডা গলায় বলে,

___মন্ত্রী সাহেব… আপনার লোকেরা আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে।
ওপাশে কিছু বলতেই নিক নিচু হেসে বলে,
__ভীর যদি রেগে যায় তাহলে কালকে আপনার লা*শ এই সমুদ্রে ভাসবে। না হয় কাল সকাল পর্যন্ত এই শহরের বন্দর বন্ধ হয়ে যাবে। আর তখন দায়টা কিন্তু আপনার ঘাড়েই পড়বে।
তার কণ্ঠ একেবারে শান্ত। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অফিসারদের মুখ শক্ত হয়ে যায়,দুই মিনিট।
মাত্র দুই মিনিটের মধ্যেই এক সিনিয়র কর্মকর্তা দৌড়ে আসে।
তার আচরণ আগের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
___স্যার… একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। শিপমেন্ট রিলিজ করা হচ্ছে।
নিক ঠোঁট চেপে হাসে।ভীর কোনো উত্তর দেয় না।
সে শুধু অফিসারটার দিকে তাকায়।সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল যে লোকটা চোখ নামিয়ে নেয়।
ভীর গম্ভীয় গলায় বলে,

___পরের বার আমার জিনিসে হাত দেওয়ার আগে, নিজের পরিবারের কথা মনে রাখবে।
কথাটা বলেই সে ঘুরে গাড়ির দিকে হাঁটে।
কাজের চাপে ভীর দূরেই আছে প্যালেস থেকে। কোটি কোটি টাকার একের পর এক গোপন ডিল সামলাতেই তার সময় কেটে যাচ্ছে। চেয়েও সে যেতে পারছেনা এই ডিলগুলো যেগুলোর নাম প্রকাশ পেলেই পুরো শহর কেঁপে উঠবে আ*ন্তর্জাতিক পর্যায়ের অ*বৈধ বাণিজ্য, নি*ষিদ্ধ প্রযুক্তির লেনদেন, গোপন অ*স্ত্র পাচা*র, প্রভাবশালী শক্তিগুলোর সাথে গোপন অর্থনৈতিক সমঝোতা। কোটি কোটি নয় হাজার কোটি টাকার হিসাবও মিলাতে ব্যস্ত সে।এটা সবচেয়ে বড় ডিল ভীর চাইছে না এটায় কোন হেরফের হোক তাই সে নিজেই সামলাচ্ছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়। বাইরে থেকে যতটা স্থির মনে হয়, ভেতরে ততটাই ঝড় চলছে।
প্যালেসে ফিরতে না পারলেও ইশায়ার প্রতিক্ষনের হিসাব সে রাখে।

____সমুদ্র আজ অদ্ভুতভাবে শান্ত যেন গভীর নীল পানির নিচে কোনো গোপন সত্য লুকিয়ে আছে। সেই নীরবতার মাঝেই ভেসে আছে একটি বিশাল জাহাজ দ্যা ব্ল্যাক ভাসেল। দূর থেকে এটাকে সাধারণ কার্গো শিপ মনে হলেও কাছে এলে বোঝা যায় এটি কোনো সাধারণ জাহাজ নয়। এটি এক ভাসমান সাম্রাজ্য যেখানে আ*ইন নেই, আছে শুধু শক্তি আর গোপন চুক্তির হিসাব।
জাহাজের ভেতরে আলো খুব কম। হলুদ ম্লান বাতিগুলো ধাতব দেয়ালে পড়ে ছায়া তৈরি করছে, আর সেই ছায়ার মাঝেই চলছে অদৃশ্য এক ব্যস্ততা।
ভীর দাঁড়িয়ে আছে জাহাজের উপরের ডেকে। তার চোখ সামনে বিস্তৃত সমুদ্রের দিকে, কিন্তু মন পুরোপুরি অন্য কোথাও। তার হাতে থাকা ট্যাবলেটে ভেসে উঠছে ইশায়ার ঘুমন্ত মুখশ্রী, বুকের ভেতর জ্বলছে ভীরের একবার ছুয়ে দেওয়ার তৃষ্ণায়। বিরক্ত সে কোন দিন এগুলো শেষ করবে আর কোন দিন সে ফিরে যাবে তার প্রানের কাছে।
এদিকে ডিয়েগো এ*নক্রিপ্টেড ডাটা রুট ম্যাপ, সময়সূচি আর কয়েকটি কোডেড নাম দেখছে। আজ তার দায়িত্ব হলো একটি শিপমেন্ট পৌছে দেওয়া জায়গা মতো।
তার পাশে নিক দাঁড়িয়ে আছে, সবসময়ের মতো শান্ত কিন্তু সতর্ক।

এনরিকো নিচের কন্ট্রোল রুম থেকে যোগাযোগ সামলাচ্ছে রেডিওতে মাঝে মাঝে ভাঙা ভাঙা কোড শোনা যায়।
ভাসেলের ভেতরে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলছে চা*লান নিয়ে। বাইরের দুনিয়ার কাছে এটি সাধারণ মালামাল মনে হলেও, ভীর জানে প্রতিটি কন্টেইনারের ভেতর কি আছে।ভীর নিচে নামে। ধাতব সিঁড়িতে তার পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনি হয়ে পুরো করিডোরে ছড়িয়ে পড়ে। নিচে একটি ছোট কক্ষে বসে আছে দলের টেকনিক্যাল ইউনিট। সেখানে বড় স্ক্রিনে জাহাজের লাইভ অবস্থান দেখাচ্ছে নীল রেখা সমুদ্রের উপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে লাল বিন্দু ঝিলিক দিচ্ছে সম্ভাব্য নজরদারির সংকেত হিসেবে।
ভীর নির্দেশ দেয়, এই রুটে ২০ মিনিট ডিলে দাও। সামনে প্যাট্রোল শিপ আছে।
তারপর সবাই দ্রুত কাজ শুরু করে। কেউ সিগন্যাল ব্লক করছে, কেউ বিকল্প পথ ক্যালকুলেট করছে।
এই জাহাজে সময়ের ধারণা আলাদা। দিন-রাত মিশে যায়। সমুদ্রের মাঝে আটকে থাকা এই ভাসমান ঘাঁটিতে।
ভীরকে আরো থাকতে হবে কয়েকদিন তার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
ঘুম আসছে না ভীরের সিগারেট ধরায় সে।
ভীর আবার ডেকে এসে দাঁড়ায়। সমুদ্রের বাতাস তার শরীরে লাগছে।
ভীরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিক এসে পাশে দাঁড়ায়,

___সব ঠিক আছে, ব্রো?
ভীর শুধু বলে,
__এখন পর্যন্ত তো সব ঠিকই আছে।
আলো-আঁধারির মধ্যে দাঁড়িয়ে ভীর আর নিক দুজনের চোখেই একই অস্থির আগুন।নিক নিচু গলায় বলে,
___তুমি চলে যাও ব্রো।
আমি সামলে নিবো ডোন্ট ওয়ারি আমি জানি এই ডিল টা তোমার জন্য কতটা ম্যাটার করে।
___এখন যে কোন কিছু হয়ে যাতে পারে নিক।এটা আমার অনেক বছরের সাধনা।তার কণ্ঠ চাপা, কিন্তু চোখে দৃঢ়তা।
নিক কিছু বলে না আর সে জানে হাজারবার বললেও ভীর যাবেনা। হঠাৎই নিজ বলে,
___ব্রো আমাদের চালান এর ইনফরমেশন কিভাবে পেলো ওরা।
আমার মনে হচ্ছে আমাদের খুব কাছের কেউ আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে।
ভীরের মুখ শক্ত সে ঠান্ডা গলায় বলে,
___কিন্তু কার এতো বড় সাহস আমার গ্যাং এ থেকে আমার সাথে বিশ্বাস ঘাতকা করবে,যে জায়গায় জানে ধরা পড়লে মৃ*ত্যু নিশ্চিত।

____কিন্তু এই যে আমাদের একটার পর একটা জায়গা,বিজনেস রুট টার্গেট করা হচ্ছে, এগুলোর ইনফরমেশন ওরা কিভাবে পাচ্ছে।ভেতরের কেউ ছাড়া এটা সম্ভব না ব্রো।
বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া মিশে যায়। ভীর একদম স্থির, যেন আবেগহীন বরফের টুকরো।
তার ঠান্ডা কণ্ঠ আবার শোনা যায়,
___আমি শুধু এই ডিলটার জন্য চুপ ছিলাম।
এটা শেষ হোক,তারপর দেখ।
নিক তখন একটু ইতস্তত করে, তারপর চোখ তুলে জিজ্ঞেস করে,
___ব্রো এই একটা রা*ইফেল এর দাম কত।
ভীর নিকের বিস্মিত মুখ দেখে। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সে বলে,
__১৫ লক্ষ।

নিক দ্রুত হিসাব করতে থাকে, ভীর রাতের অন্ধকারে তাকিয়ে আছে।নিক বলে,
১ টা কনটেইনারে যদি ২০০ পিস থাকে।
তাহলে ১ টা কনটেইনারের দাম ৩০ কোটি টাকা।
সে থেমে যায়, তারপর চোখ বড় করে হিসাব শেষ করে,
তাহলে ৫০০ টা কনটেইনার এর দাম
হিসাবটা করলে দাঁড়ায়
২০০ × ১৫,০০,০০০ = ৩০,০০,০০,০০০ টাকা (৩০ কোটি)
৫০০ × ৩০ কোটি = ১৫,০০০ কোটি টাকা
অর্থাৎ মোট দাম = ১৫ হাজার কোটি টাকা।
নিকের চোখে এবার সত্যিকারের শক।
ভীর শুধু তাকিয়ে থাকে, এই অঙ্ক তার কাছে শুধু একটা সংখ্যা।
নিক বড় বড় চোখ করে ভীরের দিকে তাকায়।
ভীর তার রিঅ্যাকশন দেখে হালকা হাসে। তারপর সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে ছেড়ে দিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলে ওঠে,
তুই এটার হিসাব করছিস।হো*য়াইট গোল্ড আছে।
কো*কে ন আছে।এসবের হিসাব তোর মাথায় ঢুকবে না।তুই প্যালেসের সিকিউরিটির দিকে নজর দে।স্পেশাল ফোর্স আনা,সবার ফোন ট্রেস কর,সবার।
অনেক হয়ে গেছে এই লুকোচুরি।

_____দূরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে ওদের সব কথা শুনছিল ম্যাটিয়াস।
চারপাশে শুধু উত্তাল সমুদ্রের গর্জন, পানির উপর ভেসে থাকা বিশাল কার্গো জাহাজ আর রাতের ঠান্ডা বাতাস। কিন্তু তার চোখে-মুখে কোনো অনুভূতি নেই।
নিক কিছুই জানে না।সে এখনো ভাবে এই ডিলের প্রতিটা তথ্য শুধু ভীরের হাতেই সীমাবদ্ধ।
কিন্তু সত্যিটা ভিন্ন।
এই পুরো ডিলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু জানে ম্যাটিয়াস।লুকা মাতেও অনেক চেষ্টা করেছে এই চালানটা আটকাতে।পুরো কার্গো লুট করার পরিকল্পনাও তৈরি ছিল তাদের।
সমুদ্রের মাঝেই র*ক্ত ঝরানোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল তারা।
কিন্তু ভীরের উপস্থিতি সব প্ল্যান নষ্ট করে দেয়।
ভীর থাকলে কোনো ফাঁক থাকে না,তার চোখ এড়িয়ে এখানে কিছু করা সম্ভব না সমুদ্রের অন্ধকারেও তার দৃষ্টি ছু*রির মতো ধারালো।তবুও ম্যাটিয়াস জানে
এই খেলায় শেষ চালটাই আসল। ভীর তাকে বিশ্বাস করেছে।আর এটাই তার ধ্বংসের কারণ হবে,
ভীরকে সরিয়ে দিতে পারলেই সব শেষ।এই সাম্রাজ্য এই হাজার হাজার কোটি কোটি টাকা,
এই অ*স্ত্র, সো*না, গোপন রুট, ক্ষমতা সবকিছুর মালিক হবে সে,ম্যাটিয়াস একটু দূরে সরে আসে।
তারপর কোটের ভেতর থেকে ছোট্ট একটা চিপ বের করে।আরেক হাতে কালো রঙের স্যাটে*লাইট ফোন।
স্ক্রিনে মাত্র একটা নাম মাতেও। ম্যাটিয়াস শেষ মেসেজটা পাঠিয়ে দেয়।
মেসেজ সেন্ড হতেই সে ফোনটা কিছুক্ষণ হাতে ঘুরিয়ে দেখে।তারপর চিপ আর ফোন দুটোই ছুঁড়ে ফেলে দেয় মাঝ সমুদ্রে।
অন্ধকার পানির নিচে মুহূর্তেই হারিয়ে যায় সব প্রমাণ।ম্যাটিয়াস ধীরে ধীরে মাথা তুলে সামনে তাকায়।
দূরে দাঁড়িয়ে আছে ভীর।সমুদ্রের কালো বাতাসে উড়ছে তার কোট।
আর ম্যাটিয়াসের ঠোঁটে ফুটে ওঠে শীতল, ভয়ংকর এক হাসি।এখন শুধু শেষ গুটি চালার পালা।

_____ ভারী ধোঁয়ায় ঢেকে আছে পুরো রুম।দামী সি*গারের গন্ধ, অ্যা*লকোহলের তীব্রতা আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অ*স্ত্র সব মিলিয়ে জায়গাটা অন্ধকার।আ*ন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই ভয়ঙ্কর লোক বসে আছে সেখানে। লুকা আর মাতেও,আশে-পাশে আরো অনেকে টেবিলের উপর রাখা ক্রি*স্টালের গ্লাসে ধীরে ধীরে বরফ গলছে।
মাতেও নিঃশব্দে গ্লাসটা হাতে ঘুরাচ্ছে, আর লুকা বিরক্ত চোখে সামনে তাকিয়ে আছে
হঠাৎ লুকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
___এই ম্যাটিয়াস বেশি-ই উড়ছে।
তার কণ্ঠে বিরক্তি স্পষ্ট।
অনেকদিন ধরে জমে থাকা রাগটাকে আটকে রেখেছে সে।নিজেকে এমনভাবে চালাচ্ছে যেন পুরো খেলাটা ও-ই চালায়।
মাতেও ধীরে ধীরে গ্লাসে চুমুক দেয়,তার চোখে বরফের মতো ঠান্ডা স্থিরতা।

___উড়তে দাও।এখন আমাদের ওকে প্রয়োজন।
কথাটা বলেই ঠান্ডা চোখে সামনে তাকায় মাতেও।
প্রয়োজন শেষ হলে,সবার আগে ওকেই শেষ করবো।
মাতেও এর কথা শুনে লুকার ঠোঁটে নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠে।
তারপর দুজন একসাথে গ্লাস উঁচু করে চিয়ারস করে।
এক চুমুকে ড্রিংক শেষ করে লুকা সোফায় হেলান দেয়।
তার চোখে স্পষ্ট র*ক্তপিপাসা।
গম্ভীর গলায় সে বলে,
___এবার মুখোমুখি হওয়ার পালা।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯১

বাইরে বজ্রপাতের আলো এক মুহূর্তে রুম আলোকিত করে গেল।সেই আলোয় দুজনের মুখ আরও ভয়ংকর দেখায়।লুকা টেবিলের উপর রাখা ব*ন্দুকটার দিকে তাকায়।হয়তো ভীর থাকবে,
নাহলে ওর নাম মুছে আমাদের জায়গা তৈরি হবে আ*ন্ডারওয়ার্ল্ডে।মাতেও কোনো উত্তর দেয় না, সি*গার জ্বালায়।তারা দুজনই জানে আ*ন্ডারওয়ার্ল্ডে সিংহাসন একটাই।আর সেখানে জায়গা করে নিতে হলে কাউকে না কাউকে মরতেই হবে।আর তাদের জন্য ভীরকে মরতে হবে।
এমন সময় রুমে ঢুকে একটা সুন্দরী লাস্যময়ী মেয়ে।
লুকা মাতেও দুজনের-ই চোখ চিক চিক করে ওঠে।
তাদের এখন শান্তি প্রয়োজন।
লুকা উঠে দাঁড়ায়।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৩