Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 33

Naar e Ishq part 33

Naar e Ishq part 33
তুরঙ্গনা

রোমের এক ব্যস্ততম শহরতলী; রাতের খাবার-দাবারের পর্ব চুকিয়ে সুহিন চুপচাপ এসে বসেছে তাদের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দাটাতে। চারিদিকের কোলাহল ছাপিয়ে উন্মুক্ত আকাশের বুকে এক বিশাল চাঁদ আজ যেন রুপোলি আলো উগরে দিচ্ছে। তন্বী রমণী বেতের একাকী সোফায় বসে আনমনে সেই চাঁদের দিকে চেয়ে আছে। তার বিষণ্ণ চোখের মনিতে চাঁদের আলো প্রতিফলিত হলেও মনের গহীনে তখন অমাবস্যার অন্ধকার।
রাতের এক পশলা দমকা হাওয়া এসে তার বাদামী চুলের আলগা খোঁপাটাকে এলোমেলো করে দিল। কিছু অবিন্যস্ত ছোট চুল তার কপাল আর গালের ওপর অবাধ্য হয়ে উড়তে লাগল।

ভেতরের ঘরে নিমরা তখন গভীর মনোযোগে পড়াশোনা করছে। দানিয়েলও হয়তো নিজের কোনো জরুরি কাজ নিয়ে ব্যস্ত। আর এখানে, এই নিস্তব্ধতায় সুহিন একাকী লড়ছে তার নিজের ভেতরের এক চরম অপমানের সাথে। মনটা বারবার ছুটে যাচ্ছে সেই অমানুষটার দিকে। ভোরবেলায় চলন্ত ঘোড়া থেকে পৈশাচিক কায়দায় ফেলে দেওয়ায় হাড়মজ্জায় যে তীব্র ব্যথা পেয়েছিল, তা সে কাউকে বলেনি। কিন্তু প্রতিবার নড়াচড়া করতে গিয়ে সেই লুকোনো ব্যথাটা বিষের মতো চাড়া দিয়ে উঠছে। তার ওপর ঘাড়ের একপাশে সেই রাক্ষসের মতো বন্য কামড়ের দাগ আর অবশ করা যন্ত্রণা তো এখনো অক্ষত।
​তবে আজ সে কেকের চেয়েও বেশি নিজেকে নিয়ে ভাবছে। এটা তার কেমন নিয়তি? কেন সে এতটা সস্তা? যে কেউ চাইলেই তাকে নিজের প্রয়োজনে খেলনার মতো ব্যবহার করছে, আবার ইচ্ছে ফুরোলেই ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে আস্তাকুঁড়ে। জন্মের পর বাবা-মায়ের স্নেহের আশ্রয়ে বড় হতে না হতেই তারা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। তাকে একা করে দিয়ে চলে গেল এক অনিশ্চিত গন্তব্যে।
এরপর কাহসান কুঞ্জের আশ্রয়ে সে নিজেকে নতুন করে গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু আজ নিজেকে প্রশ্ন করে দেখল—আসলেই কি সে কিছু গড়তে পেরেছে? আগেও সে পরগাছাই ছিল, আজও সে এক পরগাছা; নিমরা আর দানিয়েলের মতো মানুষের আশ্রয়ে পরজীবী হয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাকে। আচ্ছা, তার কি নিজস্ব যোগ্যতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো কিচ্ছুটি নেই? সে কি এতটাই অপদার্থ, এতটাই সস্তা?

​—“বউপাখি! একা একা কী করছো?”
​সুহিনের একান্তই বিদ্রূপাত্মক আর আত্মগ্লানিতে ভরা ভাবনার সুতোটা ছিঁড়ে দিয়ে বারান্দায় আগমন হলো দানিয়েলের। পরনে কালো ট্রাউজার আর সাদা টি-শার্ট। সে এসে সুহিনের সোফার ঠিক একপাশে দাঁড়াল। সুহিন নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে তটস্থ গলায় বলল,
“আরহাম ভাই, আপনি…”
​দানিয়েল মৃদু এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি হাসল। এরপর সুহিনের পাশের সোফাটায় অত্যন্ত আয়েশি ভঙ্গিতে গা এলিয়ে বসতে বসতে বলল,
“হ্যাঁ, ভাবলাম দেখে আসি আমার বউপাখিটা একা একা কী করছে!”
​আজ হঠাৎ করেই দানিয়েলের এই ‘বউপাখি’ সম্বোধনটা সুহিনের বুকে তীরের মতো বিঁধল। মনের ভেতর এক অদ্ভুত সংকোচ আর জড়তা এসে ভর করল। কেন এমন হলো, সে জানে না। দানিয়েল তো শুরু থেকেই তাকে এই নামে ডেকে আসছে। শুরুতে সুহিন বাধা দিতে চেয়েও দানিয়েলের ইচ্ছের জোরের কাছে হেরে গিয়েছিল; পরে আর এটা নিয়ে সে বিশেষ মাথা ঘামায়নি। দানিয়েল চাইছে যখন, বলুক। কিন্তু আজ এই তিক্ত পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এই স্বাভাবিক সম্বোধনটাও তার আত্মসম্মানকে যেন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল।

​—“কী হলো, বোকাহরিণী আমার? সেই কখন থেকে এত কী গভীর ভাবনা ভাবছেন?”
​দানিয়েলের সিল্কি চুলগুলো রাতের দমকা হাওয়ায় মৃদু দুলছে। তার ফর্সা মুখাবয়বে এক উজ্জ্বল, আশ্বস্তকারী হাসি লেপ্টে আছে। সুহিন নিজেকে আরেকটু গুটিয়ে নিয়ে ইতস্তত করে বলল,
“আরহাম ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
​দানিয়েল সুহিনের মুখের দিকে চেয়ে প্রশ্রয়ের সুরে বলল,
“একটা কেনো, দশটা প্রশ্ন করো। প্রয়োজনে সারারাত জেগে বসে তোমার সব প্রশ্নের জবাব দেবো আমি।”
​সুহিন আনমনা হয়ে খানিকটা মলিন হাসল। পরক্ষণেই আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল আকাশের সেই ঝকঝকে চাঁদের দিকে। অত্যন্ত ভারী গলায় সে বলতে শুরু করল,

“আমার না… নিজেকে একজন মানুষ হিসেবে বড্ড সস্তা মনে হয় আরহাম ভাই। কেমন যেন পুরো বিষয়টা। আমার নিজের থেকে করার মতো কোনো যোগ্যতা নেই। আমি কখনো তেমন কিছু করতেও পারিনি। আজ পর্যন্ত আমার জীবনের সাথে যা কিছু ঘটেছে, সবই অন্যের ইচ্ছে কিংবা অন্যের চাওয়া-পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে হয়েছে। জীবনটা আমার, অথচ এতে আমার নিজস্ব কোনো ভূমিকাই নেই? সম্পূর্ণ একটা পরগাছার মতো জীবন আমার।”
​সুহিনের মুখে এমন গভীর আত্মঘাতী অভিব্যক্তি শুনে পাশে বসে থাকা দানিয়েল অকস্মাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মুখের সেই চঞ্চল হাসি নিমেষেই মিলিয়ে গেল। সুহিন এবার চাঁদ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সরাসরি দানিয়েলের চোখের দিকে তাকাল। তার বুক ফেটে কান্না আসছিল; গলার কাছে এক দলা কান্না এসে আটকে গেছে, কিন্তু সে নিজেকে শক্ত রাখল। একটুও কাঁদল না সে। বরং নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে কিছুটা কাঁপা স্বরে বলল,
“আমি দেশে ফিরে যেতে চাই।”

​রমণীর মুখ থেকে এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের কথা শোনা মাত্রই দানিয়েলের হাসোজ্জল মুখটায় অন্ধকারের ছায়া নেমে এলো। তার কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল, বক্ষপিঞ্জরের ভেতরটা ধক করে উঠল এক অজানা আশঙ্কায়। সে দ্রুত নিজেকে তটস্ত করে, অত্যন্ত করুণ ব্যথিত স্বরে বলে উঠল,
“বউপাখি! তুমি কি আমাদের সাথে থাকাটাকেই নিজের জন্য পরগাছা হওয়া মনে করছো? আমরা তোমার এতটাই পর যে, আমাদের সাথে থেকে তুমি নিজেকে সস্তা ভাবছো?”
​দানিয়েল তাকে সম্পূর্ণ ভুল বুঝছে দেখে সুহিন ছটফট করে উঠল। সে দ্রুত নিজের হাত নেড়ে ব্যাকুল গলায় বলল,
“আরহাম ভাই, অন্তত আপনি আমায় ভুল বুঝবেন না প্লিজ। আমি মোটেও সেটা বলতে চাইনি। আমি দেশে ফিরে যেতে চাই কারণ, এবার আমি আমার নিজের যোগ্যতায় কিছু একটা করতে চাই। নিজের পরিশ্রমে, নিজের যোগ্যতায় নিজে কিছু করে যতদিন বাঁচতে পারব, ততদিনই বাঁচব। অন্তত আর পাঁচটা মানুষের মতো মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।”
​সুহিনের কথা শেষ হওয়া মাত্রই দানিয়েল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তীব্র অধিকারবোধ আর জোর গলায় বলে উঠল,

“হ্যাঁ, করো না! তোমাকে না করেছে কে? তুমি যেভাবে চাও, যা করতে চাও—সব করতে পারো। তোমাকে কেউ কোনোদিন বাঁধা দেবে না—অন্তত এই আরহাম বেঁচে থাকতে। কিন্তু তার জন্য দেশে যাওয়ার কী প্রয়োজন সুহিন? ওখানে গিয়ে একা একা কী করবে তুমি? ওখানে তোমার নিজের কেই-বা আছে?”
দানিয়েলের শেষ প্রশ্নটা যেন তীরের মতো গিয়ে বিঁধল সুহিনের বুকে। সে কিছু বলার জন্য ওষ্ঠাধর উন্মুক্ত করতেই দানিয়েল কিছুটা কটাক্ষের সুরে, তীক্ষ্ণ গলায় আবার বলে উঠল,
“তুমি আবারও ওই কাহসান কুঞ্জে ফিরে গিয়ে প্রমাণ করতে চাও যে তুমি নিজে থেকে কিছু করতে পারো? যদি সেই অন্যের আশ্রয়েই থাকতে হয়, তবে এটা তোমার কেমন প্রমাণ করা হবে সুহিন?”
​দানিয়েলের এই সরাসরি আঘাতে সুহিন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। পুরো শরীরটা তার শক্ত হয়ে উঠল। যে ক্ষত থেকে সে দূরে পালাতে চায়, দানিয়েল যেন অজান্তেই সেই ক্ষতটায় আবার নখ বসিয়ে দিল। সুহিন কোনোমতে ভেতরের কান্না আর ক্ষোভের ঝড়টাকে সামলে নিল। চশমাটা নাক বরাবর ঠিক করে নিয়ে সে কিছুটা জেদি গলায় ভাঙা কন্ঠে বলল,
​”আমি কাহসান কুঞ্জে যাব না আরহাম ভাই। আমি রোমে থাকার মতো দেশেও কোনো মেসে কিংবা হোস্টেলে থাকব। ওখানে গিয়ে টিউশনি করাব, বাচ্চাদের পড়াব। কত মেয়েই তো একা মেসে থাকে, হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা আর জব একসাথেই চালায়। তাহলে ওরা পারলে আমি কেন পারব না? নাকি সবার মতো আপনিও মনে মনে ভাবেন আমি একটা অপদার্থ, দুর্বল?”

​সুহিনের শেষ কথাক’টি বলার সময় তার কণ্ঠস্বর দৃঢ়ভাবে কাঁপছিল। চশমার কাঁচের আড়ালে নীল চোখ দুটো নোনা জলে ছলছল করে উঠল। সুহিনের এই আকস্মিক রূপ, কন্ঠস্বরের তীব্র হাহাকার আর চোখের জল দেখে দানিয়েল একদম হকচকিয়ে গেল। সে বুঝতে পারল না ঠিক কী কারণে এই শান্ত মেয়েটা আজ নিজের ভেতর এভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
​দানিয়েল আর এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। সে সোফা থেকে সটান উঠে দাঁড়িয়ে সরাসরি সুহিনের সামনে এসে একদম মুখোমুখি হয়ে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল। সুহিন তার এই আকস্মিকতায় থমকে গিয়ে কিছুটা পেছাতে চাইল, কিন্তু তার আগেই দানিয়েল অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় সুহিনের দুটো নরম হাত নিজের শক্ত দুই হাতের মুঠোয় পুরে নিল। সুহিনের ছলছল চোখ থেকে অশ্রুর প্রথম ফোঁটাটি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ার আগেই দানিয়েল অত্যন্ত ব্যথিত আর ব্যাকুল স্বরে বলে উঠল,

​”বউপাখি আমার, প্লিজ… একটা বার আমার কথা বোঝার চেষ্টা করো। নিজেকে এভাবে দুর্বল ভেবে কষ্ট দেওয়ার কোনো কারণ নেই। আর যদি তুমি দুর্বল হও-ই, তবে তাতে ক্ষতিটা কী? এই বিশাল পৃথিবীতে কি সবাই খুব শক্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়? সবাই কি লড়াকু হয়? প্রকৃতি কি সবাইকে এক ছাঁচে গড়েছে?”
​দানিয়েল সুহিনের হাতের ওপর নিজের হাতের চাপ বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত নরম, মনস্তাত্ত্বিক ও আশ্বস্তকারী স্বরে বলতে লাগল,
“শোনো সুহিন, সমাজ আমাদের শেখায় যে সবসময় শক্ত হতে হবে, একাই সব ঝড় সামলাতে হবে। কিন্তু সাইকোলজি বলে, নিজের ভেতরের কোমলতা আর আবেগ প্রকাশ করতে পারাটাই সবচেয়ে বড় সততা। তুমি বোকা নও, তুমি আসলে সরল। তুমি দুর্বল নও, তোমার মনটা বড্ড নরম। আর এই কঠোর, নিষ্ঠুর পৃথিবীতে একটা নরম মন নিয়ে বেঁচে থাকাটা কোনো অপরাধ নয়, বরং ওটাই তোমার সবচেয়ে সুন্দর দিক;ব্যক্তি হিসেবে তোমার আসল সৌন্দর্য।
পৃথিবীতে ক্যাকটাসও বাঁচে, আবার লতাগুল্মও বাঁচে। লতাগুল্মকে বেঁচে থাকার জন্য কোনো বৃক্ষের সাহায্য নিতে হলে সেটা তার দুর্বলতা নয়, ওটাই তার প্রকৃতি। তুমি আমার ওপর পরগাছা নও সুহিন, তুমি আমার জীবনের সেই অংশ—যাকে আগলে রাখতে পারলে আমি নিজের ধন্য মনে করি।”

​দানিয়েলের এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক উক্তিগুলো সুহিনের অবশ হৃদয়ে বোধহয় কিছুটা ব্যাথানাশকের মতো কাজ করল। সে একদৃষ্টিতে দানিয়েলের ফর্সা, আকুল মুখাবয়বের দিকে চেয়ে রইল। তার কান্নার বেগ কিছুটা থিতিয়ে এলেও মনের ভেতরের সংশয়গুলো পুরোপুরি দূর হলো না। সুহিন আলতো করে নিজের হাত দুটো দানিয়েলের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে মৃদু স্বরে বলল,
​”কিন্তু আরহাম ভাই, অন্যের দেওয়া আশ্রয়ে আর কতদিন? নিজের কোনো পরিচয় না থাকলে দিনশেষে আয়নার সামনে দাঁড়াতে বড্ড লজ্জা হয়। আমার যে একটা নিজস্ব অস্তিত্ব আছে, সেটাই তো আমি ভুলে যাচ্ছি।”
​দানিয়েল মেঝে থেকে উঠে আবারও সুহিনের পাশের সোফাটা টেনে নিয়ে বসল। রমণীর ললাটে আছড়ে পড়া সিল্কি চুলগুলো আনমনে হাত দিয়ে একপাশে সরিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“পরিচয় কি শুধু টাকা উপার্জনেই হয়, বউপাখি? নিমরা তোমাকে কতটা ভালোবাসে, আমি তোমাকে কতটা শ্রদ্ধা করি—এগুলো কি তোমার পরিচয় নয়? আর তোমার যদি সত্যিই কিছু করার ইচ্ছে থাকে, তবে এই শহরে বসেই করো। আমি তোমাকে লাইব্রেরিতে কোনো পার্ট-টাইম কাজ খুঁজে দেব, কিংবা তুমি চাইলে আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করতে পারো। অবশ্য সে চেষ্টা তো আমি শুরু থেকেই করে আসছি। কিন্তু মেস বা হোস্টেলের ওই একাকী, কঠিন জীবনে তোমাকে আমি কিছুতেই ঠেলে দিতে পারব না। ওসব জায়গায় চারপাশের মানুষের কটু কথা আর জটিলতা তুমি সহ্য করতে পারবে না, বউপাখি। হুট করে জেদের বসে এমন উল্টোপাল্টা কাজ করলে তো হবে না।”
​সুহিন কান্না থামাতে না পরে, ঠোঁট চেপে চাঁদের আলোর দিকে মুখ ফিরিয়ে মাথা নাড়ল,
“আমি নিজেকে পরিবর্তন করতে চাই আরহাম ভাই। সারাজীবন তো আর ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকা যাবে না; সারাটা জীবন তো এভাবেই কাটিয়ে দিয়েছি আমি।”

​—“পরিবর্তন ঘরের ভেতরে থেকেও আনা যায়,” দানিয়েল দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “তার জন্য জেনে-বুঝে নিজেকে বিপদের মুখে ফেলার কোনো প্রয়োজন নেই। অন্তত যত দিন আমি আছি, তত দিন তোমাকে কোনো ঝামেলার মুখোমুখি হতে দেব না। তুমি শুধু আমার পাশে থাকবে, ব্যস।”
অতঃপর বেশ খানিকটা সময় দুজনের মধ্যে পিনপতন নীরাবতা চলল। দানিয়েল ইচ্ছেকৃতই সুহিনকে সময় দিল ভাববার, বোঝার।
এরিমধ্যে চাঁদের এক ফালি রুপোলি আলো সুহিনের ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল। এলোমেলো বাদামী চুলের অবিন্যস্ত গোছার ফাঁক দিয়ে দানিয়েলের নজর আটকে গেল সুহিনের ফর্সা ত্বকের ওপর। সেখানে গাঢ় লালচে-নীল রঙের এক বিচিত্র ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট হয়ে আছে। রাতের আবছা অন্ধকারেও সেই দাগটির ভয়াবহতা এড়ালো না।
​দানিয়েল কৌতূহলে আর আশঙ্কায় ভ্রু কুঁচকে সেদিকে হাত বাড়াল। চাপা, সন্দিহান স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“এটা কী বউপাখি?”

​দানিয়েলের আঙুলগুলো ক্ষতটা ছুঁয়ে দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে সুহিন টের পেল; সে চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের ক্ষতটা আড়াল করার চেষ্টায় তীব্রভাবে আঁতকে উঠল। দানিয়েল স্পর্শ করার আগেই সে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় নিজের আলগা খোঁপাটা টেনে সম্পূর্ণ চুলগুলো ঘাড়ের পাশ দিয়ে এনে বুকের সামনে ফেলে দিল। নিজের চশমাটা কব্জি দিয়ে নাক বরাবর ঠেলে, মাথা নুইয়ে অত্যন্ত ইতস্তত করে বলল,
“পো… পোকা কামড় দিয়েছে।”
​দানিয়েল ভ্রু কুঁচকে শুষ্ক, অবিশ্বাস্য এক হাসি হাসল,
“পোকা? এটা আবার কেমন পোকা কামড় দিয়েছে; জায়গাটা তো দেখছি বেশ লাল হয়ে গিয়েছে।”
​সুহিন আর কোনো প্রতিউত্তর করল না, অপরাধীর মতো ওষ্ঠাধর চেপে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। দানিয়েল তার এই জড়তা আর লজ্জা দেখে মৃদু মুচকি হাসল। সুহিনের বিষণ্ণতা কাটানোর ছলে সে পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে রমণীর নরম, বাদামী হালকা কোঁকড়ানো চুলগুলো আদুরে ভঙ্গিতে আরও কিছুটা এলোমেলো করে দিল। গভীর মুগ্ধতা নিয়ে অস্ফুটে আওড়াল,

“এলোকেশী!”
​এই বলেই সে আবার নিজের সোফায় সোজা হয়ে বসল। সুহিনের মন ভালো করার উদ্দেশ্যে সে খুব স্বাভাবিক ঢঙেই পরের প্রসঙ্গটা তুলল,
“তা, তোমাদের মিলান ট্রিপ কেমন কাটল? ফিরতে ফিরতে তো আজ দুপুর গড়িয়ে গেল, ওসব নিয়ে তো ভালো করে কিছুই জিজ্ঞেস করা হলো না।”
দানিয়েল ভেবেছিল মিলানের প্রসঙ্গ টানলে হয়তো মেয়েটার বিষণ্ণ মন কিছুটা হালকা হবে। কিন্তু সে তো আর জানত না, মিলান শব্দটা সুহিনের বুকে একটা তপ্ত শেলের মতো গিয়ে বিঁধেছে। এই একটা নাম সুহিনকে আবারও সেই ভোরবেলার প্রান্তর আর সেই অমানুষটার পৈশাচিক উন্মাদনার অতল গহীনে টেনে নিয়ে গিয়েছে এক নিমিষেই।
​দানিয়েল সুহিনের নীরবতা খেয়াল না করেই বলতে লাগল,

“নিমরার কাছে তোমার ভার্সিটির ইন্টারভিউয়ের ব্যাপারে শুনেছি। তবে ওসব নিয়ে তুমি একদম চিন্তা কোরো না। আমি যখন বলেছি, তখন শুধু আমার ওপর ভরসা রাখো। আমি খুব জলদি একটা না একটা ব্যবস্থা করে ফেলব।”
​সুহিন তার আশ্বাসে বিশেষ কোনো স্বস্তি পেল না, বরং তার বুকের ভেতর অন্য একটা ঝড় তখন উসখুস করছিল। সে কিছু একটা বলার জন্য ছটফট করছে দেখে দানিয়েল নিজেই ধরে ফেলল। সে হেসে বলল,
“সুহিন, তুমি কি আমায় কিছু বলতে চাচ্ছো? নির্দ্বিধায় বলতে পারো। তবে প্রসঙ্গটা যদি সেই আগের মতো দেশে ফিরে যাওয়ার হয়, তবে স্পষ্ট বলে দিচ্ছি—এই মুহূর্তে তোমাকে আমি দেশে পাঠাতে পারব না। ওই রিস্ক আমি কোনোভাবেই নেব না।”

​সুহিন কিছুক্ষণ সময় নিল। বুকের ভেতরের ভারী বাতাসটা ফুসফুস চিরে বের করে দিয়ে ধীর গলায় বলল,
“না আরহাম ভাই, বিষয়টা তা নয়। নিমরা আপনাকে কিছু বলেছে কি না জানি না… মানে, আমিই ওকে বলতে মানা করেছিলাম। কিন্তু এখন বলা দরকার…”
​দানিয়েলের চোখের কোণে এবার গাঢ় গাম্ভীর্য নেমে এল। সে তটস্থ হয়ে বসে বলল,
“কোন বিষয়ে?”
সুহিন আঙুল দিয়ে কামিজের কোণাটা শক্ত করে চেপে ধরে ইতস্তত করে বলল:
“কেকে… ওনার বিষয়ে।”
​কেকে-র নামটা উচ্চারণ হওয়ামাত্রই দানিয়েলের চঞ্চল ভ্রুজোড়া এক তীব্র আকর্ষণে কুঁকড়ে গেল। তার মেরুদণ্ড টানটান হয়ে উঠল। সে চাপা অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“কেকে? কী করেছে সে? আর হুট করে কেকে কোথা থেকে এল…?”
​তার কথা শেষ হওয়ার সুযোগ না দিয়েই সুহিন এক টানে বলে ফেলল,
“মিলান… উনি মিলানে থাকেন।”
​সুহিনের মুখ থেকে এই কথাটা শোনামাত্রই দানিয়েল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মুখের সমস্ত অভিব্যক্তি এক নিমেষে উবে গিয়ে সেখানে তীব্র বিস্ময় আর এক অজানা সংশয় ছেয়ে গেল। সে আগপাছ না ভেবে কেবল একটি প্রশ্নই অত্যন্ত রূঢ় গলায় ছুঁড়ে দিল,
​”তোমার সাথে ওনার দেখা হয়েছিল?”
​সুহিন এবার মুখ তুলে দানিয়েলের দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় দানিয়েলের সেই ফর্সা, শুকনো মুখখানার দিকে চেয়ে সে ধীরলয়ে মাথা নাড়ল,
“হুম!”

রাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে। ফ্লোরেন্সের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, সমুদ্রঘেঁষা এক নির্জন দ্বীপের প্রান্তে অবস্থানরত কাচ আর কাঠের তৈরি এক অত্যধুনিক গ্লাস হাউস। সাগরের অন্ধকার নীলচে জলরাশি গর্জন তুলে তীরে আছড়ে পড়ছে; চারপাশে দমকা শীতল হাওয়া বইছে। ঠিক তখনই সেই নিঝুম প্রহরে হেডলাইটের তীব্র আলো ফেলে একটি কালো রঙের চকচকে ফেরারি এসে থামল বাড়ির প্রবেশদ্বারের সামনে।
​মিলান থেকে ফ্লোরেন্সের এই দ্বীপের দূরত্ব প্রায় তিনশো কিলোমিটার। ফেরারির মতো সুপারকারের গতিতে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সময় লেগেছে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। কেকে সুযোগ পেলেই শহরের কোলাহল ছেড়ে এই নির্জন আশ্রয়ে চলে আসে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাড়িতে সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, কেকে তখন কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের পরিহিত অবিন্যস্ত ঘরোয়া পোশাকেই বেরিয়ে পড়েছে।

পরনে তার ক্যাজুয়াল কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার, চুলগুলো চোখের ওপর এসে পড়েছে এক চরম অবিন্যস্ত রূপে। তার ঠিক পরপরই গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামল এক সুবিশাল সাইবেরিয়ান হাস্কি—টমি। রাতের এই শীতল প্রহরে দুজনেই কিছুটা আনমনে, নিজস্ব গা-ছাড়া ছন্দঢঙে এগিয়ে গেল সেই গ্লাস-হাউসের দিকে। কেকের ওষ্ঠধরে শিসের ছন্দে সুর তুলেছে ইতালির বিখ্যাত ‘Bella Ciao’ এর কিছু অংশবিশেষ। মধ্যরাতে সমুদ্র উপকূল হতে ভেসে আসা শীতল দমকা হওয়ায়, সেই মৃদু সুরখানা আরো বেশি রহস্যময় হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।
অথচ কেকে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে, শিসের ছন্দে সদর দরজার ডিজিটাল প্যানেলে অভ্যস্ত হাতে একটা সিক্রেট সিকিউরিটি পাসওয়ার্ড টাইপ করে ভেতরে প্রবেশ করল। যদিও কাঁচের দেয়ালের ওপারে, বাড়ির ভেতরের ড্রয়িংরুমে আগে থেকেই এক অস্পষ্ট নারী অস্তিত্বের আভাস মিলছিল।

​এই গ্লাস হাউসের ভেতরটায় কেবল সাধারণ ড্রইংরুম নয়,বরং সুসজ্জিত এক আর্ট গ্যালারির ন্যায় সুবিশাল। ঘরের চারপাশের দেয়াল থেকে শুরু করে মেঝে পর্যন্ত সর্বত্র অত্যন্ত রুচিশীলভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা আছে নানারকম পেইন্টিং-ক্যানভাস।বিশাল গ্লাসের দেয়াল গলিয়ে আকাশের পূর্ণ চাঁদের আলো সরাসরি ড্রয়িংরুমের মাঝবরাবর এসে আছড়ে পড়েছে। সেই মায়াবী রুপোলি আলোর তীব্রতা এতটাই বেশি যে, ঘরের ভেতর আলাদা কোনো কৃত্রিম লাইটের প্রয়োজনই পড়েনি। চারপাশ সমুদ্রের দমকা হাওয়া আর চমৎকার প্রাকৃতিক আলোতেই সম্পূর্ণ পূর্ণ হয়ে আছে।
​সেই আলো-আঁধারির মাঝে, মাইলের পর মাইল বিস্তৃত উত্তাল সমুদ্রের দিকে মুখ করে সোফায় বসে আছেন এক রহস্যময় নারী। তিনি উল্টোদিকে মুখ করে থাকায় তাঁর চেহারা দেখা যাচ্ছে না ঠিকই, তবে তাঁর সামনে রাখা বিশালাকার ক্যানভাস আর হাতের সূক্ষ্ম নড়াচড়া স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছিল—তিনি গভীর মনোযোগে রঙতুলির আঁচড়ে কিছু একটা চিত্রবিশেষ ফুটিয়ে তুলছেন।

​সেই পরিচিত অবয়বের দিকে তাকিয়ে, কেকে শিস বাজানো থামিয়ে দিল; তার গম্ভীর ওষ্ঠকোণে ফুটে উঠল খানিক মুচকি হাসি। তবে ঘরের সেই পিনপতন নীরবতা খানিকটা বিঘ্নিত হলো টমির চঞ্চলতায়। সে হালকা স্বরে একটা ‘ঘেউ’ শব্দ করে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে চাইল।​কেকে তৎক্ষণাৎ টমির দিকে নজর ফিরিয়ে, ভ্রু কুঁচকে শাসনের সুরে ফিসফিস করে আওড়াল,
“বিরক্ত করিস না টমি, ফায়ার কুইন রেগে যাবে।”
​টমি যেন তার মনিবের কণ্ঠের গাম্ভীর্য আর ‘ফায়ার কুইন’ শব্দটার ওজন বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারল। অগত্যা সে একদম শান্ত হয়ে গেল। ততক্ষণে কেকে নিজের সেই চিরচেনা এলোমেলো বেপরোয়া ঢঙেই দু-পা ভেতরে অগ্রসর হলো।ঘরের শান্ত পরিবেশটা বজায় রেখে পেছন হতে সে গাম্ভীর্যের সাথে নমনীয় স্বরে আওড়াল,
“মে আই কাম ইন, মাম্মাম!”
ভেতরে প্রবেশ করার পর এভাবে অনুমতি চাইবার মতো অদ্ভুত বৈপরীত্য কেবল এই বন্য পুরুষের পক্ষেই সম্ভব।
​ভেতরের শান্ত পরিবেশ ভেদ করে আসা সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে নারীটির ঠোঁটেও এক টুকরো প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। হাতের তুলিটি ক্যানভাসের গায়ে আলতো করে ঠেকিয়ে রেখেই, পেছনে না ফিরে তিনি অত্যন্ত স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন,

“কাশিফ! এসেছো তুমি?”
​কেকে পেছনের ভারী গ্লাসডোরটা লাগিয়ে দিয়ে, টমিকে টেনে ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে অনুযোগের সুরে বলতে লাগল,
“ইয়েস, তোমায় বিরক্ত করার জন্য আমার আসতেই হতো। কিন্তু সরি মাম্মাম, ওই গাধাটাকে এবারও সাথে করে নিয়ে আসতে পারিনি।”
​তার এই খামখেয়ালীপূর্ণ কথা শুনে নারীটি আর স্থির থাকতে পারলেন না। নিজের হাতে থাকা তুলিটি থামিয়ে, ক্যানভাস থেকে হাত সরিয়ে তিনি ধীরস্থির ভঙ্গিতে পেছনের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালেন।
​নিমিষেই জানলার স্বচ্ছ কাঁচ গলিয়ে আসা রুপোলি চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হলো এক পরম জ্যোতির্ময় মুখমণ্ডল। কোনো তন্বী নবযৌবনা রমণীর ন্যায় তাঁর রূপ ও লাবণ্য। চোখে-মুখে বা ললাটে কোথাও বয়সের সামান্যতম ছাপ নেই, মাথার একরাশ চুল এখনো জ্বলজ্বলে বাদামী-কালো। সেই অপার্থিব সৌন্দর্যের কপালে খানিকটা কৃত্রিম বিরক্তির ভাঁজ ফেলে তিনি শুধালেন,

“কার কথা বলছো তুমি, কাশিফ?”
​কেকে নিজের ট্রাউজারের পকেটে দু-হাত গুঁজে দিল। চোখের ওপর নেমে আসা অবাধ্য চুলগুলো এক ঝটকায় সরিয়ে, মুখে চুইংগাম চিবানোর মতো এক অত্যন্ত নির্বিকার ভাব নিয়ে বলল,
“ইউ নো ভেরি ওয়েল মাম্মাম, আমি ওর কথাই বলছি। এই পুরো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গাধা ও!”

Naar e Ishq part 32

​কেকের মুখে এমন তাচ্ছিল্যভরা কথা শুনে নারীটি তাঁর ললাটের ভাঁজ আরো সংকুচিত করলেন। ক্যানভাসের পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে, মায়ের চিরাচরিত স্নেহে মাখা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“কাশিফ! বাবা, কতবার তোমায় বারণ করেছি ওকে ওভাবে সম্বোধন করবে না। মেয়েটা সরল,কিছুটা অবুঝ, হয়তো খানিকটা বোকা… কিন্তু দিনশেষে ও তো তোমার বউ!”

Naar e Ishq part 34

2 COMMENTS

Comments are closed.