রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৫
সিমরান মিমি
কল সংযোগ কাটার পূর্বেই ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লো পরশ। মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে উঠলো। “ স্পর্শীয়া সরদারের লাশ পাওয়া গেছে ঝালকাঠি ব্রিজের নিচে।” বাক্যটা তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সে অনুভূতি শূণ্য হয়ে খানিকক্ষণ বসে রইলো। স্মৃতিতে স্পর্শীয়ার সুশ্রী চেহারাটা ভেসে উঠেছে। সেই রাত গুলোর কথা কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে যখন, স্পর্শী বারংবার ভালোবাসার কথা বলে তাকে ফাঁসাতে চেয়েছে জালে। সেগুলো নাটক হলেও কম শ্রুতিমধুর ছিলো না। সেই মেয়েটা আর নেই। মারা গেছে। নাহ, খুন করা হয়েছে। ভাবতেই শরীরের লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেলো। চোখ টা জ্বলছে। মেয়েটা আর নেই। অথচ সেদিন ও কত খারাপ ভাবে তাকে অপমান করেছে পরশ। পরশের মন বিষিয়ে উঠলো ক্রমশ। স্পর্শীয়া খামখেয়ালি আচরণ করলেও অন্যায় তো করেনি। যা দেখেছে, শুনেছে, তা নিয়ে তৎক্ষনাৎ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। কিন্তু এতো বড় শত্রুটা কে, যে নিমিষেই প্রাণ টা কেড়ে নিলো!
পরশ দুহাতে কপাল চেপে ধরলো। অনুতাপে চোখ দুটো ভিজে এলো। দ্রুত তা মুছে ভাবতে লাগলো স্পর্শীর কথা। সবটা তার ভুল। সেদিন হয়তো খুব বাজে কিছু ঘটেছিলো। নিশ্চয়ই শামসুল সরদার বাবার কথা শুনে স্পর্শীয়ার সাথে বাজে ব্যবহার করেছিলো, শাসিয়েছিলো। কিন্তু মেয়েটা এসব মেনে নেয় নি। বাবার থেকে অপমানিত হয়ে কোনো কিছু না ভেবেই বেরিয়ে পড়েছে রাতের আধারে। পরশ শুনেছে, স্পর্শীয়াকে শেষবার সোভামের ফ্লাট থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হতে দেখা গিয়েছে। তবে কি ভাইয়ের কাছে গেছিলো? নাকি ভাইকে না পেয়ে ভেঙেচুরে অন্যকোথাও গিয়েছিলো। সে রাতে একাকী স্পর্শীয়া কি কোনো খারাপ, নেশাখোর সন্ত্রাসীর পাল্লায় পড়েছিলো! যারা নিজেদের কামনা মিটিয়ে প্রমাণ লোপাট করতে খুন করে ভাসিয়ে দিয়েছিলো।
ভাবনাতে নানা ঘটনার আবির্ভাব ঘটছে। পরশ এসব সহ্য করতে পারলো না। তার কষ্ট হচ্ছে, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আফসোস, অনুতাপে জর্জরিত হয়ে অস্পষ্ট কন্ঠে, বিরবির করে বললো,
“ ফিরে এসো স্পর্শীয়া, তোমার মৃত্যুর দায় আমি নিতে পারবো না।”
ড্রয়িংরুম থেকে পাভেলের চিৎকারের আওয়াজ আসছে। সে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে ছুটতে ভাইয়ের রুমে এলো। আজকাল যা ঘটে, তার দ্বিগুণ রটে। পুলিশের ভাষ্যমতে “ঝালকাঠিতে একটা মেয়ের তাজা লাশ পাওয়া গেছে। হাইট, গায়ের রঙ দুটোই স্পর্শীয়া সরদারের সাথে মিলে যাচ্ছে। লাশের গায়ে কোনো পোশাক না থাকায় এবং মুখ বিকৃত হয়ে যাওয়ার চেনা সম্ভব হচ্ছে না। সেজন্যই ডাকা হয়েছে শামসুল সরদারকে। “ ঘটনা মাত্র এতোটুকুতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এলাকার লোকজন এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ নিশ্চিত হয়ে ধরে নিয়েছেন ওটাই স্পর্শীয়া। সারা শহরে রটে গেছে, “ শামসুল সরদারের বড় মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে ঝালকাঠি ব্রিজের নিচে। বাবার রাজনীতির জন্য মেয়েটা বলি হয়েছে।”
পাভেল ছুটে গেলো পরশের সামনে। আতংকে শরীরের হাড় ক্ষয় হয়ে এসেছে তার। উদ্ভ্রান্তের মতো হাটু মুড়িয়ে বসলো ফ্লোরে। পরশকে ঝাকিয়ে বলতে লাগলো,
— কি হয়েছে চড়ুইয়ের? সবাই এসব কি বলছে ভাইয়া? তুই কোথায় ছিলি? তুই না ওর বয়ফ্রেন্ড, তাহলে তোর দোষ দিচ্ছে কেনো সবাই?
পাভেল এ কদিন বাড়িতে ছিলো না। সেদিন কফির ঘটনা ঘটার পর যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে শহরের বাইরে গিয়েছিলো বন্ধুদের সাথে। যতো কাছাকাছি থাকবে, ততই কষ্ট বাড়বে। বিরহে ছটফট করবে। স্পর্শীয়ার গায়েব হওয়ার ব্যাপারে কিছুই জানতো না সে।
পরশ পাভেলের দিকে শান্ত হয়ে তাকালো। আচমকা দুহাতে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিলো। পুণরায় কাছে আসতেই থাপ্পড় বসালো গালে। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
— আমার চোখের সামনে আসবি না হারামির বাচ্চা!
একহাতে পাঞ্জাবি এবং অন্যহাতে ফোন, ওয়ালেট নিয়ে দ্রুতপায়ে বের হয়ে গেলো রুম থেকে। সিঁড়ির গোড়ায় যেতেই নজরে আসে আমজাদ শিকদারকে। তিনি চিন্তিত মুখে পায়েচারি করছেন সারা ঘরে। হাতে ফোন। দেখে মনে হচ্ছে, কাউকে বারবার কল করছেন ; কিন্তু অপর পাশের ব্যক্তি তা ধরছে না। পরশ মুহূর্তের মধ্যে রুমে প্রবেশ করলো। স্বজোরে দরজায় ধাক্কা দিয়ে বাবার দিকে এগিয়ে গেলো। ছেলেকে দেখে ঘাবড়ে গেলেন আমজাদ। তিনি পরশের চোখের দিকে তাকাতে পারছেন না। মনে হচ্ছে, এই বুঝি ধরা পড়ে যাবেন। বার বার অন্যদিকে তাকিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেন। বললেন,
— কি সমস্যা তোমার? এতো জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছো কেনো?
— তুমি কিছু করো নি তো?
পরশের কন্ঠে স্পষ্ট সন্দেহ। আমজাদ রেগে গেলেন। বললেন,
— মুখ সামলে কথা বলো। আমি তোমার বাবা হই।
— সেজন্যই জিজ্ঞেস করছি।
— বাচ্চা একটা মেয়ে। তাকে খুন করে এই বুড়ো বয়সে জেল খাটতে যাবো কোন দুঃখে ? যত্তসব আবোলতাবোল কথা। গিয়ে দেখো, তোমাকে ফাঁসাতে ওদের দল থেকেই নির্বাচনের আগে এমন কাজ করেছে।
পরশ আবারো নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো খানিকক্ষণ। এরপর দ্রুত পা বাড়ালো বাড়ির বাইরে। এক্ষুনি ঝালকাঠি যেতে হবে।
ঝালকাঠি থানা পরিষদ। তার সম্মুখে বিশাল মাঠ। প্রায়’ই ট্রেনিং এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় মাঠটা। আজ সেই মাঠের এক কোণে ভিড়। কৌতুহলী এলাকাবাসী একে একে দেখে যাচ্ছে লাশটাকে। যদিও দেহটা সাদা চাদরে ঢাকা এবং চারপাশে বাউন্ডারি করে এড়িয়া দেওয়া হয়েছে। তবুও লোকজন দূর থেকে উঁকি দিয়ে চাদরটাকে দেখেই যেনো তৃপ্তি পাচ্ছে। ইনস্পেকটর দত্ত আলোচনা করছেন লোকাল থানার ইন্সপেক্টরের সাথে। তিনি লাশ টা পিরোজপুরে নিতে দেন নি। যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রমাণ হবে লাশ স্পর্শীয়া সরদারের ততক্ষণ পর্যন্ত হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। যদি অন্য কারোর দেহ হয়!
পরশ চল্লিশ মিনিটের মধ্যে থানায় পৌছেছে। থানার বাইরে গাড়ি থামিয়ে ত্রস্ত পায়ে নামলো। দুরে পুলিশের ঘিরে রাখা সাদা চাদর এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে। ওটা স্পর্শীয়ার লাশ, ভাবতেই শরীর টা নাজুক হয়ে পড়লো। ভেতরটা তীব্র অনুতাপে ফেটে পড়েছে। তবুও সে বাইরে অনড়, পর্বতের ন্যায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। ধীর পায়ে প্রবেশ করলো ভেতরে। তাকে দেখতেই বাকা চোখে তাকালেন ইন্সপেক্টর দত্ত। টিটকারি মেরে বললেন,
— আপনার তো আজ ঈদের দিন মিস্টার শিকদার। শত্রুর মেয়ে খুন হয়েছে। সে এখন ভেঙে পড়বে, নির্বাচনে হেরে যাবে। আপনি তো এখন পার্টি করবেন। এখানে কেনো এসেছেন? সান্ত্বনা দিতে!
পরশ চোখ তুলে ইনস্পেকটরকে দেখলো। শান্ত, গুরু-গম্ভীর কন্ঠে বললো,
— কারোর মৃত্যুতে খুশি হওয়া জানোয়ারের কাজ। আমি মানুষ ইন্সপেক্টর। তবে আপনার মুখে খারাপ লাগার ছিটেফোঁটাও দেখতে পাচ্ছি না আমি।
মুখটা থমথমে হয়ে গেলো ইনস্পেকটরের। অগ্রাহ্য করে অন্যদিকে চেয়ে রইলো। পরশ একজন পুলিশকে চাদর সরাতে বললো। তিনি চাদর সরিয়ে মুখ দেখালেন। বললেন,
— মুখ দেখালে তো চিনবেন না। থেতলে গেছে চামড়া। মনে হয় লাশ যেনো চেনা না যায়, সেজন্যই খুনী এমন করছে।
পরশের ভেতরটা ধক্ করে উঠলো। সে চোখ দুটো বন্ধ করে নিজেকে সামলে নিলো। শরীরটা কাঁপছে। জীবন তাকে কত লাশ দেখিয়েছে। মারামারি, কোপাকুপি, নৃশংস হামলা — এসব ঘটনা নিজে ঘটানো বা অন্যের ঘটানো ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে অজস্র। তবুও আজ যেনো আঘাত গুলো সহ্য করতে পারছে না।
— কি করে বুঝলেন দেহটা স্পর্শীয়া সরদারের?
ইনস্পেকটর দত্ত অনিচ্ছুক কথা বলতে। তবুও বাধ্য হয়ে বললো,
— স্পর্শীয়া মিসিং। হাইট, গায়ের রঙ মিলে গেছে। বাকিটা নিশ্চিত হবেন এমপি সাহেব। তাকে জানানো হইছে। এসে নিশ্চিত করলেই লাশ নিয়ে যাবো।
মুহুর্তেই চমকে তাকালো পরশ। জিজ্ঞেস করলো,
— নিশ্চিত না হয়ে আপনি কোন আক্কেলে বলেছেন, এটা স্পর্শীয়া?
— আশ্চর্য! আমি কখন বললাম? এখন লোকজন গুজব ছড়ালে কি করবো?
এতোক্ষণে বুকের উপরের পাথরটা সরে গেলো। শরীর হালকা হয়ে উঠলো পরশের। সে শান্ত হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো শামসুল সরদারের জন্য। আচমকাই নজর পড়লো লাশের দিকে। একটা হাতের উপর থেকে চাদর সরে গেছে। পানিতে থাকার কারনে দেহটা ফুলে উঠেছে। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে গায়ের রঙ। পরশ চমকে উঠলো। লাশের হাতের তালুতে মেহেদীর দাগ। কিন্তু সেদিন বিকালে স্পর্শীয়ার হাতে এমন কিছু তো ছিলো না। পরশের স্পষ্ট মনে আছে। সে তৎক্ষনাৎ অসম্মতি জানালো। জোর গলায় বললো,
— এটা স্পর্শীয়া নয়।
ইনস্পেকটর চমকে উঠলেন। বাকিরাও ভ্রু সংকোচন করে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন,
— আপনি কি করে নিশ্চিত হচ্ছেন?
— নিখোঁজ হওয়ার দিন বিকেলে স্পর্শীয়া আমার সাথে ছিলো। ওর হাতে মেহেদী ছিলো না।
— নিখোঁজ রাতে হয়েছে। আপনার সাথে দেখা হওয়ার পর বাড়িতে গিয়েও দিতে পারে।
পরশ ভাবলো। নাহ, এমনটা সম্ভব নয়। স্পর্শীয়া বাড়ি যাওয়ার পরপরই সন্ধ্যার ক্ষণে আমজাদ শিকদার ফোন দিয়েছেন ও বাড়িতে। এরপর নিশ্চয়ই ঝামেলা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মেহেদী লাগানোর প্রশ্নই আসে না। সে আবারো অসম্মতি জানালো। বললো,
— হ্যাঁ, সেটা হতে পারে। কিন্তু তাহলে মেহেদীর রঙ টা আরো গাঢ় থাকতো। এই লাশের হাতের মেহেদী অনেকটা উঠে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটা ৫/৬ দিন আগে লাগানো হয়েছে।
সবাই চিন্তায় পড়লেন। পরশের যুক্তি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। লোকাল থানার ওসি বললেন,
— বেশ! শামসুল সরদার আসুক।
কেটে গেলো আরো ঘন্টাখানেক। পরশ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলো লাশটা। এখন আর তার শরীর কাঁপছে না। অস্বাভাবিকও লাগছে না। হুট করেই সে আবারো যুক্তি দিলো। লাশের দিকে ইঙ্গিত করে বললো,
— স্পর্শীয়ার বাম দিকের ঘাড়ের সামনে, গলার নিচে বড়সড়, গাঢ় একটা তিল ছিলো। এই লাশটার তা নেই। আমি নিশ্চিত, এটা স্পর্শীয়া হতেই পারে না।
উপস্থিত সবাই প্রস্ফুটিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। কেউ কেউ চাপা হাসলেন। সবাইকে নিরব থেকে পরশ আন্দাজ করতে পারলো ঘটনাটা। খানিকটা অসস্তিও হলো। এরইমধ্যে পুণরায় টিটকারি মারলেন ইনস্পেকটর দত্ত। বললেন,
— বাহ! আপনি দেখছি আদ্যোপান্ত সব জেনে বসে আছেন। আগে জানলে শামসুল সরদারকে নয়, আপনাকে কল করতাম লাশ চিহ্নিত করতে।
ইতোমধ্যে কানা-ঘুষা শুরু হয়ে গেছে। লোকাল থানার ওসি নিশ্চিত ধারণা করে বসলেন। স্পর্শীয়া এবং পরশের মধ্যে যে কোনো প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হয়ে বসে রইলেন।
থানার সামনে আরো একটা গাড়ি থামার আওয়াজ এলো। সেখান থেকে উদভ্রান্তের মতো ছুটে এলো আরেক লম্বা- চওড়া যুবক। তার অস্থিরতা দেখে চমকে গেলেন ওসি। ইনস্পেকটর কে জিজ্ঞেস করলেন,
— ইনি আবার কে?
ইনস্পেকটর দ্রুত এগিয়ে এলেন। সোভামকে চিনতে তার এক সেকেন্ড ও লাগলো না। তিনি ইশারা করে লাশ দেখিয়ে দিলেন। ছুটে গিয়ে লাশের সামনে বসে পড়লো সে। এলোমেলো ভঙ্গিতে চাদর সরালো। নুয়ে পড়া কন্ঠে ডাকলো,
— আমার চড়ুই!
পরশ ঘাড়ে হাত রেখে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলো। গুরু-গম্ভীর আওয়াজে বললো,
— এটা স্পর্শীয়া নয়। শান্ত হও!
মুহুর্তেই পেছনের দিকে তাকালো সোভাম। পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে লাশের দিকে চাইলো। সে এক দৃষ্টিতে লাশটাকে নিরীক্ষণ করে বলে উঠলো,
— এটা আমার বোন হতেই পারে না। ওর চুল এতো ছোটো নয়। হাটু অবধি চুল আমার বোনের।
“এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে স্পর্শীয়া। শহর তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে তোর মৃত্যুর খবরে। বাড়ির সবার অবস্থা কি হয়েছে একবারও ভেবে দেখেছিস? ”
অনন্দার কথায় আরো ফুসে উঠলো স্পর্শীয়া। ধমক দিয়ে বললো,
— তুই চুপ থাক।
শুনলো না অনন্দা। তার ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেছে। সে চলে গেলো অন্যরুমে। ফোন বের করে কল বসালো সোভামের নাম্বারে। এই নাম্বার টা তার সংগ্রহে থাকলেও কখনো কল দেওয়া হয় নি। স্পর্শীয়া তার কলেজ ফ্রেন্ড। গলায় গলায় ভাব না থাকলেও বেশ ভালো একটা সম্পর্ক। কলেজ শেষে এক ভার্সিটিতে চান্স পেলো, তাও ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে। এরপর ফার্স্ট ইয়ার শেষ করতেই তার বিয়ে হয়ে গেলো, ভোলায়। তারপর থেকে তেমন একটা ক্লাস করা হয় না। একপ্রকার লেখাপড়াই শেষের পথে। খুব একটা ক্লাস না করায় তেমন আলাপ-আলোচনাও নেই। সেদিন হুট করেই স্পর্শী ফোন দিয়ে ঠিকানা জেনে নেয়। এরপর বেড়ানোর কথা বললেও, পরবর্তীতে তার উদ্দেশ্য সবটা অনন্দার কাছে পরিস্কার হয়ে যায়। সে আর কিছু ভাবলো না। সরাসরি কল করলো সোভামের ফোনে। রিসিভড হতেই বলে উঠলো,
— দাদা, আমি অনন্দা। স্পর্শীয়ার ফ্রেন্ড।
সোভাম এক মুহূর্তে’র জন্য চমকে গেলো। সে স্পর্শীয়ার ফ্রেন্ড সার্কেলকে তেমন একটা চেনে না। তাই অসস্তিতে পড়লো। বললো,
— বলুন।
— দাদা, স্পর্শী আমার কাছে আছে। ও বাড়ি থেকে রাগ করে এখানে এসেছে। আমি অনেকবার বলেছি আপনাদের জানাতে। কিন্তু বোঝাতেই পারছি না।
সোভাম নিস্তব্ধ হয়ে বসে পড়লো। মাথাটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে বসে রইলো। গলায় কাঁটা বিধে গেছে। কথা বের করতে পারছে না। এই মুহুর্তে ভেতরটা হাহাকার করছে। স্পর্শীয়াকে চোখের সামনে দেখতে ইচ্ছে করছে। নয়তো বিশ্বাস হচ্ছে না। অন্যদিকে রাগে, ক্ষোভে বিষিয়ে যাচ্ছে মেজাজ। সামনে থাকলে ক্রোধের বশে হয়তো থাপ্পড় লাগাতো এতোক্ষণে। এটা কোন ধরণের বাচ্চামি। তবু সে নিজেকে সামলালো। অভিমান জড়িত কন্ঠে বললো,
— ওকে বলবেন, তার বাবা স্ট্রক করেছেন। মাও অসুস্থ। সে মৃত্যুর নাটক করলেও বাপ-মা দুজনেই মরার পথে। জ্যান্ত দেখার ইচ্ছা থাকলে যেনো আমার সাথে যোগাযোগ করে। ঢাকায় যাবো এক্ষুনি!
ফোন কেটে দিলো সোভাম। নত মস্তকে উঠে দাঁড়ালো মাঠ থেকে। ইনস্পেকটরের উদ্দেশ্যে বললো,
— সরি! আমার বোনের খোঁজ পেয়ে গেছি। লাশটা অন্য কোনো মেয়ের। আমার যেতে হবে। থ্যাংক ইউ!
পরশ চমকে উঠলো। সোভাম কোনো কথা না বলেই চলে যাচ্ছে। স্পর্শীয়া বেঁচে আছে শোনার পর অস্থিরতা বাড়লো পরশের। সোভামের উদ্দেশ্যে বেহায়ার মতো বলে উঠলো,
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৪
— ও কি সুস্থ আছে? আর আছেই বা কোথায়?
চোখ দুটো ছোট ছোট করে পিছু ঘুরে তাকালো সোভাম। তার সন্দেহ গাঢ় হচ্ছে। তবুও সে নির্জীব। এক্ষুণি ঢাকায় যেতে হবে। দু দুজন রোগী ভর্তি। সেখানে থাকা প্রয়োজন।
