রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৭
সিমরান মিমি
রাত প্রায় আড়াইটা। স্পর্শীদের গাড়ি গিয়ে সরাসরি গেটের সামনে থামলো। অপরিচিত গাড়ি দেখে দারোয়ান ভড়কে গেলেন। খুলবেন কি খুলবেন না এ নিয়ে দ্বিধায় পড়লেন। শামসুল ক্লান্ত, তাই ঘুমিয়ে আছে এখনো। অগত্যা স্পর্শী বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। তাকে দেখতে বাহাদুর দ্রুত গেট খুলে দিলেন। জিভ কেটে বললেন,
— এই যাহ! আমি তো বুঝতেই পারি নাই আপনারা আসছেন।
স্পর্শী প্রত্যুত্তর করলো না। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। এদিকে লং জার্নি করায় শরীর টাও ক্লান্ত। ড্রাইভারকে ভাড়া চুকিয়ে ধীর কন্ঠে বাবাকে ডাকলো।
– আব্বু, বাড়ি এসে পড়েছি। ওঠো।
শামসুলের ঘুম গভীর হয়নি। তাই মেয়ের এক ডাকেই নড়েচড়ে বসলেন। বাইরে তাকিয়ে পরিচিত গেট দেখে ধীর পায়ে নেমে এলেন। স্পর্শী দুহাতে আগলে ধরলো বাবাকে। মৃদু কন্ঠে দারোয়ানের উদ্দেশ্যে বললো,
— ডিকিতে আব্বুর বাইক আছে। গেটের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখুন। আর কালো ব্যাগটা, সাথে পাশের টেস্টের রিপোর্ট গুলো নিয়ে ঘরে আসুন। গেট আটকে আসবেন।
স্পর্শীর মুখভঙ্গি গম্ভীর। এর মানে তার মেজাজ ঠিক নেই। অন্যসময় হলে বাহাদুর কাকা ইতোমধ্যেই পান খাওয়া দাঁত গুলো বের করে হেঁসে বলতেন, আমারে কি আপনার বোকা দারোয়ান মনে হয়? এই রাইতের বেলা আমি কি গেট খুইলা রাখমু?
তবে আজ তেমন কিছুই বললেন না। চুপ করে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন। স্পর্শীয়া বাবাকে আগলে ধরে এগিয়ে গেলো বাড়ির দিকে। রাত আড়াইটা বাজলেও ড্রয়িংরুমে চড়া আলো জ্বলছে। সদর দরজাও খোলা। হয়তো সবাই জেগে আছে। শামসুল রওনা দেওয়ার পূর্বেই জানিয়েছে, স্পর্শীকে নিয়ে আসছে। তাই হয়তো সবাই না ঘুমিয়ে অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। স্পর্শীর অসস্তি বাড়লো। এ কদিনে কম নাটক করে নি সে। নিশ্চয়ই বাড়ির সবাই চিন্তিত ছিলো। এখন তাকে দেখে কি তারা ঝাড়বে, বকবে? অবশ্য এটাই স্বাভাবিক।
ধীর পায়ে শামসুল কে নিয়ে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই চমকে উঠলো সোনালী। এ যে স্পর্শী তার একপাশ ধরে একপ্রকার খুটি হয়ে দাঁড় করিয়েছে এটাই আশ্চর্যের লাগছে। তার ভাসুরের মতো লম্বা, চওড়া, শক্ত-সামর্থ্য মানুষটার হঠাৎ কি এমন হলো যে হাঁটতে গেলেও মেয়ের সহযোগিতা নিতে হচ্ছে। সোনালী চেঁচিয়ে উঠলো। বললো,
– একি! আপনার কি হয়েছে ভাইজান? শরীর কি খারাপ লাগছে? শুনছেন, ভাইজান এসেছেন।
খলিলুর সরদার অবশ্য নির্ঘুমই ছিলেন। তবে ঘন্টাখানেক পূর্বেই রুমে গেছেন বিশ্রাম নিতে। সোনালীকে বলে গিয়েছেন, ভাইজান আসলে যেনো তাকে ডাকা হয়। তেমনটাই করলেন সোনালী। এবং তার ডাকার পরপরই উপর থেকে নেমে এলেন খলিলুর। সঙ্গে তার বড় ছেলে রোহান। কেউই স্পর্শীর দিকে তাকালো না পর্যন্ত। ছুটে এসে বসলেন শামসুলের পাশে। ইতোমধ্যে বাবাকে সোফায় বসিয়েছে স্পর্শীয়া। নিজেও সিদ্ধান্ত হীনতায় এক পাশে চুপটি করে তাকিয়ে রইলো। বাড়ির কেউ তাকে দেখে টু শব্দটাও করছে না। এমনকি তাকাচ্ছেও না। বিষয়টা ভীষণ ভাবে পীড়া দিচ্ছে তাকে।
– ভাইজান, আপনার কি শরীর খারাপ?
খলিলের প্রশ্নে শামসুল চোখ টেনে তাকালেন। ধাতস্থ হয়ে বললেন,
— হ্যাঁ, একটু খারাপ লাগছে।
এরইমধ্যে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলো বাহাদুর। হাতে টেস্টের রিপোর্ট এবং একটা কাপড়চোপড়ের ব্যাগ। বললো,
— কোথায় রাখমু?
স্পর্শী এগিয়ে গিয়ে হাতে নিলো। তার হাতে টেস্টের রিপোর্ট দেখে খলিলুর সরদার বললেন,
— এগুলো কার?
—আব্বুর।
— মানে? ভাইজান জার্নি করে অসুস্থ হয় নাই? ঢাকায় থাকাকালীন ই অসুস্থ হইছে।
— জি! আব্বু আবারো মিনি স্ট্রক করেছেন।
বাড়ির সকলে এবার দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। লক্ষণ তো ভালো নয়। শামসুল সরদার একদম দূর্বল হয়ে পড়েছেন। সকলের চিন্তিত মুখ দেখে শামসুল নিজেই বলে উঠলেন,
— আরে চিন্তা করো না। আমি একটু রেস্ট নিলেই সুস্থ হয়ে যাবো।
এরপর স্পর্শীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আম্মু, ঘুমাতে যাও।
— তুমি যাবে না? চলো, তোমায় রুমে দিয়ে আসি।
বাধ সাধলেন শামসুল। বললেন,
— আমি যেতে পারবো আম্মু। তুমি যাও। রাত অনেক হয়েছে সবাই’ই ঘুমাতে যাও। খলিল, রিহানকে নিয়ে আমার রুমে চল। কথা আছে।
স্পর্শীয়া আর দাঁড়ালো না। ভোরের আলো ফুটলেই নির্বাচন। হয়তো কোনো আলোচনার জন্য তারা জেগে আছে। কাপড়চোপড়ের ব্যাগ এবং টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে সে চলে গেলো সোজা নিজের রুমে।
শরীর টা ম্যাজম্যাজ করছে। এক্ষুণি গোসল করা প্রয়োজন। রুমের এক কোনায় ব্যাগ ফেলে ফোন হাতে নিলো। এরপর সোভামের হোয়াটসঅ্যাপ একাউন্টে ভয়েস মেসেজ দিলো। বললো,
— মাত্র বাড়ি এসে পৌঁছেছি। আম্মুকে বলিস আমি ঠিক আছি। শুধু আব্বু একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আম্মুর শরীর ভালো আছে কি-না আমাকে জানাস। কাল দশটার আগে ফোন দিবি না, আমি ঘুমাবো। বায়!
ফোন টাকে চার্জে দিয়ে জামাকাপড় নিয়ে ঢুকে পড়লো ওয়াশরুমে।
স্পর্শীয়া আজ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা দায়িত্ব পালন করছে।
পিরোজপুর সদর ৫ নং কেন্দ্রের সম্মুখে বেশ খানিকটা দুরত্ব নিয়ে দাঁড়িয়েছে। সাথে রয়েছে রিহান সহ দলের আরো পাঁচ- ছয় জন ছেলে। সরু এই গলিটা দিয়েই মাধ্যমিক স্কুল অর্থাৎ কেন্দ্রে ঢুকতে হয়। বয়স্ক – বৃদ্ধা, যুবক- যুবতী যারাই আসে প্রত্যেকের সাথে বেশ সুমিষ্ট ভাষায় কথা বলছে স্পর্শীয়া। তার বাবাকে যেনো ভোট টা দেয়, সে ব্যাপারেও ক্ষানিকটা আলোচনা করে নেয়। তারাও দাঁড়ায়, শোনে। কেউ উৎফুল্ল হয়ে জানায় ভোট দেবে, কেউবা শুনে মৃদু হাসি দিয়ে চুপচাপ চলে যায়। এখানকার সকলে স্পর্শীয়াকে চেনে না। তবে রিহান বা দলের অন্যদের বেশ ভালো করে জানে। বিগত তিন তিন বার সাংসদ ছিলেন শামসুল সরদার। তার বিরুদ্ধে প্রথম বারের মতো লড়ছেন পরশ শিকদার। রাজনৈতিক দলিল অনুযায়ী শামসুল সরদারের নিকট বড়ই চুনোপুঁটি পরশ শিকদার। অনেকে তো ধরেই নিয়েছেন সরদারদের জিত। কেউবা শ্রদ্ধা নিয়ে দাঁড়িয়ে সেধে স্পর্শীয়ার সাথে কথা বলে। আবার কেউবা পিঠ বাঁচাতে, ভয়ে, চুপচাপ দাঁড়িয়ে কথা শোনে।
স্পর্শীও বেশ মেতে উঠেছে। কি দারুণ লাগে যখন সাধারণ জনগণ তার বাবার প্রশংসা করে। গর্বে বুকটা ফুলে ওঠে। মন আফসোস করে বলে — ইশশ! এ কদিন এমন পাগলামি না করে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরে পাবলিকের কাছে ভোট চেয়ে নিলেও পারতো। কতটা আনন্দ লাগে।
ভোট চলছে সুষ্ঠুভাবে। প্রশাসন থেকে অত্যন্ত কড়াভাবে নজর রাখা হচ্ছে যেনো দূর্নীতি না হয়। এতে অবশ্য দু পক্ষই সন্তুষ্ট। শামসুল সরদার নিশ্চিত জানেন, তিনিই জিতবেন। পনেরো বছরের রাজত্ব তার। দু দিনের এক ছোকরা কি করে তাকে হারাবে?
সূর্য প্রায় মাথার উপরে খাড়াভাবে অবস্থান নিয়েছে। ঘড়ির কাঁটায় দেড়টা। এই তপ্ত ভর দুপুরে চারজন যুবককে সাথে নিয়ে কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে এলেন পরশ শিকদার। পড়নে তার শুভ্র পাঞ্জাবি। কেন্দ্রে কেন্দ্রে দৌঁড়ঝাপ করায় ঘেমে গেছে অনেকটা। পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে কপালের ঘাম মুছে এগিয়ে এলো। এখনো ভোট দেওয়া হয়নি। তাছাড়া কাছের কেন্দ্র বলে এখানটাতে তেমন একটা নজর দেওয়াও হয়নি। একসঙ্গে দুটো কাজই বিশ মিনিটের মধ্যে সারতে এসেছেন।
পরশ যখন আরেকটু সামনে এলো তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়ালো। সামনেই স্পর্শীয়া দাঁড়িয়ে। কয়েকজন বৃদ্ধা মহিলার সাথে হেসে কথা বলছে। পরশ কিঞ্চিৎ হাসলো। নিশ্চয়ই স্পর্শীয়া ভোট চাইছে। সে ঠোঁট কামড়ে হেসে কয়েক সেকেন্ড পরোখ করলো তা। মেয়েটা আজ একটু বেশিই হাঁসছে। না জানি চোয়াল ব্যথা হয়ে যায়। সে এগিয়ে এলো। স্পর্শীয়ার দিকে তাকিয়ে ক্রুর হাসলো। বললো,
— তা মিস স্পর্শীয়া, আমার কাছে ভোট চাইবে না। আমিও তো ভোটার।
পরশকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে রিহান সামনে এসে দাঁড়ালো। ঠিক যেনো বিশাল প্রাচীর। স্পর্শীয়াকে ছুতে গেলে এই প্রাচীর প্রথমে ভাঙতে হবে। পরশ ভ্রুঁ কুঁচকে তা খেয়াল করলো। রিহানের বয়স খুব একটা বেশি নয়। স্পর্শীয়ার কাছাকাছি। সর্বোচ্চ এক বছর বড় হতে পারে রিহান। সে অনুযায়ী পরশের চেয়ে বেজায় ছোটো।
— তোর বোনের সাথে কথা বলছি আমি। পাশে দাঁড়া।
স্পর্শী নিজেও ইশারা দিলো সরে যাওয়ার জন্য। রিহান শুনলো। দুহাত বুকে বেঁধে বেশ গুরুগম্ভীর হয়ে বললো,
— তো মিস্টার শিকদার, কি যেনো বলছিলেন….
— ভোট! চাইতেও পারো। দেখা গেলো আমায় কনভেন্স করে ফেললে।
স্পর্শীয়া হাসলো। বললো,
— আপনার মতো অজগরের ভোট আমার বাবার প্রয়োজন নেই। প্লিজ আগে বাড়ুন।
— সে তো যাবোই। তোমার কি মনে হয়, আমি সব কাজকর্ম ফেলে এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখবো? আহাম্মক মহিলা!
পরশ আর এক সেকেন্ড ও দাঁড়ালো না। শেষ পেরেক টা সেই মেরে এসেছে। মন চাইছে পিছু ফিরে স্পর্শীয়ার মুখ খানি দেখতে। কিন্তু তা অতিব বিপদজনক। যদি ভয়ংকরী মহিলা চোখ দিয়েই ভস্ম করে দেয়, তখন?
স্পর্শীয়া রাগে কাঁপতে লাগলো। কত্তবড় অভদ্র লোক হলে সেধে এসে কথা বলে, আবার যাওয়ার সময় অপমান করে যায়। এর শোধ তো স্পর্শী তুলবেই। এতোগুলো ছেলের সামনে তাকে আহাম্মক মহিলা বলে চলে গেছে। এমনি এমনি তো আর ছেড়ে দেবে না। সে এই ঘটনার ঘোর শোধ তুলবে, সেটাও জনসম্মুখে। কিন্তু কি করা যায়? ভাবতে ভাবতেই স্মরণ হলো সন্ধ্যার কথা। হ্যাঁ, ফলাফল ঘোষণা তো সন্ধ্যায়’ই করবে। এতো এতো জনগণ তার বাবার পক্ষে ভোট দিচ্ছে। স্পর্শীয়া নিশ্চিত জয় তার বাবার ই হবে। এবং এই নিউজ প্রকাশ হওয়ার পর সে দশ কেজি মিষ্টি নিয়ে শিকদার দের ক্লাবে আসবে। এর পর যা করার, তাতে এক চুল ও ছাড় দেবে না।
পরশ ভোট দিয়ে মাত্রই বেরিয়েছে। দোতলা থেকে স্পষ্ট স্পর্শীয়াকে দেখা যাচ্ছে। হয়তো একটু দুরেই, তবে সে জানে ওটা কে। তার পোশাক, দাঁড়ানোর স্টাইল, কথা বলার ভঙ্গিমা সবটাই পরশের ঠোটস্থ। কিন্তু কেনোই বা স্মৃতি বেইমানি করছে? পরশের হুট করে আফসোস হতে লাগলো। হীনমন্যতায় ভুগতে লাগলো পুরোটা সময়। ভাবতে লাগলো কিছুক্ষণ পুর্বের হওয়া ঘটনা সম্পর্কে। সে কেনোই বা এমন পাগলামি করলো? একজন এমপি প্রার্থী হয়ে ভোটের দিন সকল নিয়ম – নীতি, গম্ভীরতা ছাড়িয়ে কেনোই বা স্পর্শীর দ্বারস্থ হলো? আর কেনোই বা তার সাথে এ ধরণের ফালতু মশকরা করলো? তাকে কি এসবে মানায়? আশেপাশের সকলে কিইনা ভেবেছে। ওহহ শিট! পরশ নিজের উপর বিরক্ত হলো। কেনো সে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলো না। মনে হলো মেয়েটাকে দেখার পর চোখদুটো ওই দিকেই স্থির হয়ে গেলো। পা দুটো অন্য কারোর ইশারা অনুযায়ী চলতে লাগলো স্পর্শীয়া সরদারের গন্তব্যে।
সাম্প্রতিক ঘটনাটা নিয়ে পুরোটা সময় অস্থির হয়ে ভাবতে লাগলো। সাথে নিজেকে কড়া ভাবে শাসালোও। এমনটা আর করা যাবে না। হারজিত যাইই হোক, এই মেয়ের ফাঁদে কোনোভাবেই পড়া যাবে না।
এই কেন্দ্রে আর বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না পরশ। ভীষণ অসস্তি হচ্ছে। সে দ্রুত সঙ্গী ছেলে চার জনকে নিয়ে বের হয়ে গেলো। একবার তাকালোও না পর্যন্ত। গুরুগম্ভীর, রাগী অবয়ব নিয়ে বেরিয়ে গেলো তথাকথিত নেতাদের মতো।
এতে অবশ্য স্পর্শীয়া অবাকই হলো। লোকটার হাবভাব বোঝা দায়। একটু আগেই গায়ে পড়ে কথা বলছিলো। অথচ এখন দেখে মনে হচ্ছে কাউকে চেনেই না। সে যাই হোক, স্পর্শীয়ার সিদ্ধান্ত আবারো বদলালো। ভেবেছিলো, বের হওয়ার সময় কোনো রকম জ্বালাতে আসলে অপমান করে দেবে। কিন্তু তা তো হলোই না বরং উলটো মন খারাপ হলো স্পর্শীয়ার।
সন্ধ্যা প্রায় সাতটা। ড্রয়িংরুমে পিনপতন নীরবতা। শামসুল সরদার দমবন্ধ হয়ে বসে রইলেন। শরীরের অসুস্থতা ভোট শুরু হওয়ার আগেই পালিয়েছে। এখন তিনি শারীরিক এবং মানসিক শক্তিতে পঁচিশ বছরের যুবকের চেয়ে কোনো অংশেই কম নন। বুকের পাটা ফুলিয়ে বসে আছেন সোফায়। ভেতরে ভেতরে টেনশন হলেও বাইরে সবাইকে ধমকের উপর রাখলেন।বললেন,
— এতো টেনশন করার দরকার নেই। জনগণ আমায় ভোট দিলে চতুর্থ বারের মতো এমপি হতে কেউই আটকাতে পারবে না। ধৈর্য রাখো।
স্পর্শীয়া তার পাশেই বাবার একহাত জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে পড়ে রইলো। হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফলাফল জানা হয়ে যাবে। মনে নিদারুণ দুশ্চিন্তা। আর্শিয়া সারা বিকাল ঘরেই ঘাপটি মেরে বসে ছিলো। তবে এখন আর সম্ভব নয়। দুশ্চিন্তা তারও কিছু কম হচ্ছে না। সে নেমে এসেছে কিছুক্ষণ পূর্বেই। বসেছে বাবার থেকে অনেকটা দূরে, সোনালীর পাশে। ক্ষণে ক্ষণে অসস্তি, অভিমান, তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাবার দিকে তাকালো। স্পর্শীয়া দুদিনেই কেমন নিঃসঙ্কোচে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। অথচ সে এতোগুলো বছর কাছে থেকেও পারলো না। ধীরে ধীরে কান্নাটা গলায় দলা পাকাচ্ছে। চোখ দুটো প্রায় ভরে এসেছে অভিমানে। এরই মধ্যে শামসুল ডাকলেন,
— আর্শিয়া, এদিকে আসো ।
আর্শি এক মুহুর্তের জন্য থমকালো। ত্রস্ত পায়ে বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— বলো।
শামসুল এক হাত বাড়িয়ে মেয়েকে এপাশে বসালেন। এরপর জড়িয়ে ধরলেন আলগোছে। জানতে চাইলেন,
— আম্মু, বলোতো কে জিতবে? বাবা, নাকি তোমার মামাতো ভাই।
আর্শি চমকালো, থমকালো। এ কেমন প্রশ্ন করছে তার বাবা। সে আর কান্না আটকাতে পারলো না। মিশে গেলো বাবার বুকের সাথে। কান্না লুকাতে গিয়ে ফুপিয়ে উঠলো। ভাঙা গলায় শুধালো,
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৬
— অবশ্যই আমার আব্বু জিতবে।
ব্যাস! এর চেয়ে বড় কোনো জয় কি শামসুল সরদারের চাই? দুই মেয়েই দুটো হৃৎপিন্ড দখল করে বসে আছে। যারা সর্বক্ষণ’ই তার সঙ্গী। এবারে শুধু একটা আফসোস! সোভাম। শামসুলের যুবক বয়সের প্রতিচ্ছবি। ইশশ!! সোভাম যেদিন তাকে স্বেচ্ছায় বাবা বলে ডাকবে, সেদিন শামসুল হাসিমুখে মরতেও রাজি।
