Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৭

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৭

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৭
সিমরান মিমি

তুই কি বাড়িতে যাবি?
স্পর্শীর ইশারা পেয়ে ইতোমধ্যে পরশ এগিয়ে গেলো গেটের দিকে। এখন সোভাম একা দাঁড়িয়ে। খানিকক্ষণ ক্ষোভে ফুসলো। এরপর থমথমে পায়ে গাড়ির ভেতরে এসে বসলো। পুরোটা রাস্তায় টু শব্দটাও করলো না। তাকিয়ে রইলো বাইরের দিকে। কিন্তু যখনই গাড়ি সরদার বাড়ির গেটের সামনে থামলো। ফের পূর্বের মতোই সে স্পর্শীর হাত ধরে একপ্রকার টেনে হিচড়ে নিয়ে ড্রয়িংরুমের সোফার উপর ফেললো। বাড়ির সবাই ততক্ষণে জেনে গেছে স্পর্শী বাড়িতে নেই। শামসুল সরদার সোভামকে এভাবে ক্ষেপে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,

– কি হয়েছে? আর স্পর্শীয়া কোথায় ছিলো?
– জিজ্ঞেস করুন আপনার মেয়েকে — রাতের অন্ধকার নামার সাথে সাথেই সে কোথায় পালিয়ে গিয়েছিলো!
স্পর্শী সূচালো নজরে চাইলো। ভাইয়ের ভুল শুধরে দিয়ে তেজী কন্ঠে বললো,
– পালিয়েছিলাম মানে কি? আমি তোকে ভয় পাই? বাড়ির গাড়ি নিয়ে গিয়েছি, আবার ফিরেও এসেছি। এখানে রাতের অন্ধকার, পালানো এসব কোথা থেকে আনলি!
শামসুল গম্ভীর হয়ে উঠলেন। প্রশ্ন ছুড়লেন স্পর্শীর দিকে।
কার কাছে গিয়েছিলে?
বাবার প্রতি অভিমান এখনো তাজা। আগের মতো কথা বলা হয় না একদমই। শুধুমাত্র যা জিজ্ঞেস করে তারই উত্তর দেওয়া হয়। স্পর্শীয়া শামসুলের দিকে তাকালো না পর্যন্ত। পূর্বের মতোই নিজের জেদে অটল থেকে বললো,

– পরশ শিকদারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। ঢাকায় তো আর যেতে পারি নি, তাই বাড়িতে গিয়ে দেখে এসেছি।
কতটা সহজ সাবলীল উত্তর। যেনো কথাগুলো বলে সে ভীষণ গর্ববোধ করছে। নিজের দুঃসাহস প্রকাশ করছে বাড়ির সকলের সামনে। অথচ সে যে কতটা নির্বোধ তা একবার ভেবেও দেখছে না। সোভাম মেজাজ হারিয়ে ফেললো। আচমকা স্পর্শীর গলা টিপে ধরলো। তুমুল আক্রোশে ফেটে পড়ে বললো,
– গলা টিপে মেরে ফেলবো একদম। তোর মরার এতো সাধ যখন অন্য বাড়ির ছেলের হাতে মরবি কেনো? ছোটোবেলা থেকে পেলেপুষে যখন আমি বড় করেছি — মেরেও আমি ফেলবো। সবটা জেনে শুনেও ইচ্ছে করে ওই ছেলেটাকে সুযোগ দিচ্ছিস! ও তোকে ব্যবহার করছে স্পর্শী!!!!

পিপাসা ইতোমধ্যে সোভামের পিঠে কিল-ঘুষি মেরে স্পর্শীয়াকে ছাড়ালো। পুরো বাড়ির সকলে নিস্তব্ধ, শুধু শামসুল সরদার ছাড়া। তিনি সবকিছু নিরবে পর্যবেক্ষণ করছেন। সোভাম স্পর্শীর গলা টিপে ধরেছে তাতে একটুও খারাপ লাগেনি। ঢাকায় থাকতে দুজনের মধ্যে মারামারি এর দ্বিগুণ হতো। তাই বিষয়টা স্বাভাবিকই লাগলো। কিন্তু খারাপ তখনই লাগলো যখন স্পর্শীয়া শামসুল সরদারকে নিরব দেখলো। এতোকিছু হওয়ার পরেও বাবা সোভামকে কিছু বললো না! চুপচাপ দেখতে থাকলো। নাকি সোভাম স্পর্শীকে মেরেছে বলে তার শান্তিই হয়েছে! বিষয়টা বেশ নেতিবাচক ভাবে মনে গেথে গেছে স্পর্শীয়ার। সে চিৎকার করে উঠলো। বললো,
– ব্যবহার করছে না ও আমায়!!! আমি বাচ্চা নই। ভালো-মন্দ বোঝার যথেষ্ট ক্ষমতা আছে আমার। আমায় কেউ ব্যবহার করতে চাইবে, আর নেচে নেচে গিয়ে তার দ্বারস্থ হবো — এতোটা বোকা আমি নই!
এরপর স্পর্শী মায়ের দিকে তাকালো। বাড়ির সকলকে শুনিয়ে পিপাসার উদ্দেশ্যে বললো,
তুমি বলেছিলে না মা — যে আমায় নিঃস্বার্থভাবে চাইবে, তাকে যেনো অবজ্ঞা না করি। আমি তাই’ই করবো। আমি বিয়ে করবো পরশ শিকদারকে। যে মানুষটা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আমায় বাঁচানোর চেষ্টা করেছে — তার থেকে বেটার অপশন আমার দরকার নেই। এতোটুকু নিঃস্বার্থ সম্পর্ক নিয়েই আমি বাঁচতে পারবো।
থেমে শামসুল সরদারের উদ্দেশ্যে বললো,

– আর আব্বু, চাচ্চু — তোমাদের যদি মনে হয় পরশ আমায় ফাঁদে ফেলে রাজনৈতিক ভাবে তোমাদের ধরাশায়ী করতে চাইছে, তবে আমার শেষ কথাও শুনে রাখো। যেদিন আমার মনে হবে – আমিই তোমাদের দূর্বলতার কারন, সেদিনের পর আমি আমার অস্তিত্বটাও অবশিষ্ট রাখবো না। কিন্তু বিয়ে আমি পরশ শিকদারকেই করবো!
স্পর্শী চলে গেলো। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই সোভামের ক্ষিপ্ত আওয়াজ পাওয়া গেলো।
– তোর পা দুটো ভেঙে আমি ঢাকায় নিয়ে যাবো।
ফের ঘুরে তাকালো স্পর্শী। তেজ নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
– সাহস থাকলে কাছে আয়। তোর মাথা ফাটিয়ে আমি ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করাবো, কথা দিলাম।
এরপর সকলের উদ্দেশ্যে জোরালো আওয়াজে বললো,
-খবরদার! আমার উপর কেউ জোর খাটাতে আসবে না। ফল ভালো হবে না। একবার মেজাজ বিগড়ে গেলে পড়ে সকলে মিলে আফসোস করবে!

ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে সামনে এগোচ্ছে। রাত তখন সাড়ে দশটা। একটু আগেই টানা দু ঘন্টা ধরে বর্ষণ হয়েছে। এখন বৃষ্টি থেমে গেলেও ঠান্ডাটা বেশ ভালো ভাবেই লাগছে। হু হু করে বাতাস ঢুকছে ভেতরে। স্পর্শীয়া গায়ে চাঁদর জড়িয়ে নিলো। তবুও জানালা বন্ধ করলো না। পাতায় আটকে থাকা বৃষ্টির পানি টুপটাপ করে মাটিতে পড়ছে — যা দেখতে, অনুভব করতে ভীষণ ভালো লাগছে।
রাতে খেতে যায় নি স্পর্শী। দরজা বন্ধ করে ঘাপটি মেরে বসে আছে। অথচ সোভাম এবং শামসুল সরদার বাদে একেক করে বাড়ির সকলে এসে তাকে সেধে গেছে। অবশ্য সোভাম এসেছিলো, তবে সাধতে নয়। প্লেট ভর্তি করে খাবার নিয়ে স্পর্শীয়ার দরজার সামনে চেয়ারে বসে শব্দ করে শুনিয়ে শুনিয়ে খেয়েছে। এমনকি স্পর্শীয়ার পছন্দের খাবারগুলোর নাম বলে বলে, তা অতি সুস্বাদু হয়েছে — এসব বলে ইচ্ছে করে লোভ লাগিয়েছে। তবুও দরজা খোলে নি স্পর্শী। কানে ইয়ারফোন গুঁজে বসে ছিলো। কিন্তু নাক? খাবারের সুগন্ধ গুলো তো ঠিকই নাকে এসেছে!
এতোসব করেও টলাতে পারেনি। পণ করে শক্ত হয়ে বসে ছিলো খাটে। সোনামা নিশ্চয়ই তার খাবার আলাদা করে তুলে রেখেছে। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে, সেই ফাঁকে রান্নাঘরে গিয়ে নিয়ে আসবে সে।
পরশ কল করছে বারবার। অথচ স্পর্শী রিসিভড করছে না। তার ভীষণ লজ্জা করছে। কিন্তু তাতে কি হার মানে অসভ্য পুরুষ? সেতো একনাগাড়ে দিয়েই চলেছে। অগত্যা বাধ্য হয়ে কল রিসিভড করলো। মুহুর্তেই ওপাশ থেকে চিন্তিত কন্ঠে পরশ বললো,

– খুব বেশি ঝামেলা হয়েছে? ফোন ধরছিলে না কেনো?
স্পর্শী পুরোটা অস্বীকার করলো। বললো,
– নাহ, কিছুই হয় নি।
– তবে ফোন কেনো ধরছিলে না?
– এমনিই!
এমনিই! খুব একটা বিশ্বাস হলো না পরশের। তাই কিছু বললোও না। নিরবতা পেয়ে স্পর্শীয়া বললো,
– ঘুমাচ্ছেন না কেনো? এমনিতেই তো শরীর খারাপ — রাত জাগবেন না।
– উহু! আমি একদম সুস্থ। সন্ধ্যায়’ই তো একটা থেরাপি নিলাম।
স্পর্শী বুঝে উঠতে পারলো না। সন্ধ্যায় তো তার সাথে ছিলো, তাহলে থেরাপি নিলো কখন? আর যদি থেরাপি নেওয়ারই হতো, তবে এতো তাড়াতাড়ি কেনো ঢাকা থেকে ফিরলো? এখানে কি ভালো সুযোগ -সুবিধা পাওয়া যায়!
– কোন হস্পিটাল থেকে নিয়েছেন?
পরশ মৃদু হাসলো। স্পর্শীয়াকে লজ্জা দিয়ে বললো,

– উহু! আমবাগানে বসে যে নিলাম।
মুহুর্তেই ফোনটা দূরে ছুড়ে মারলো স্পর্শী। দুহাতে কপাল চেপে বালিশে মুখ গুজলো। কি ভয়ংকর কথা! এই লোক এতোটা অসভ্য কবে হলো! সে হঠাৎ আয়নায় ঠোঁট দেখলো। এক মুহুর্তের জন্য কল্পনা করে নিলো তখনকার ঘটনা। ইশশশ! পুরুষালি একটা ঠোঁট তার ঠোঁটে চুমু খেয়েছে, ব্যাপারটা ভাবতেই শরীরটা শিরশির করে উঠলো। ফোনের ওপাশে পরশ ডাকছে স্পর্শীকে — এই শোনো না!
স্পর্শী পুণরায় ফোন কানে নিলো। কিছুটা রুক্ষস্বরে বললো,
-আপনি আমার সাথে জোর করে অসভ্যতা করেছেন। লজ্জা করেনা আবার এগুলো মনে করিয়ে দিতে।
-কসম স্পর্শীয়া, চুমুটা খাওয়ার পর আমার শরীরটা অনেক বেটার লেগেছে। এসে একটানা তিন ঘন্টা ঘুমিয়েছি। ঘুমের ওষুধ খেলেও আমি এতোটা শান্তির ঘুম দেইনা। কাল কি আরেকবার সুযোগ দেবে?
নাহ! আর নেওয়া যাচ্ছে না এসব অসভ্যতা। স্পর্শী ফোন কেটে দিলো। মুখে অন্য কথা বললেও তার ভালো লাগছে। মনটা প্রজাপতির মতো উড়ছে। শরীরটা তুলোর ন্যায় হালকা হয়ে মেঘের সাথে ভাসছে। সে পড়ে রইলো বিছানায়। এরইমধ্যে দরজায় ধড়াম করে আওয়াজ এলো। ওপাশ থেকে সর্বশক্তি নিয়ে সোভাম দরজা ধাক্কাচ্ছে। চিৎকার করে বলছে,

– স্পর্শী, দরজা খোল। আমি শেষবারের মতো বলছি, দরজা খোল। ভেঙে ফেলবো কিন্তু?
পুরো বাড়িটাতে যেনো ডাকাত পড়েছে। ভুমিকম্প হওয়ার ন্যায় থরথর করে কাঁপছে। ইতোমধ্যে বাড়ির সবাই জেগে গেছে। স্পর্শীয়া হতভম্ব হয়ে দরজা খুলে দেয়। তাকে অগ্রাহ্য করে সোভাম সরাসরি খাটের কাছে আসে। হাতে ফোন নিয়ে কললিস্ট চেক করে কিছু না পেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ঢোকে। সেখানে পরশের একাউন্টে একটানা এতোগুলো কল দেখে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তারমানে সে ভুল কিছু শোনেনি। স্পর্শী এতোক্ষণ পরশের সঙ্গেই কথা বলছিলো। সে বারণ করার পরেও শোনেনি। মেজাজ হারিয়ে ফোনটাকে ছুড়ে ফেললো ফ্লোরে। গায়ের ঝাল মেটাতে ফোনের উপর কয়েকবার লাথি মারলো। চিৎকার করে বললো,
– তোর প্রেম আমি ছুটাবো হারামির বাচ্চা! এতোবার বুঝানোর পরেও আবার ওই জানোয়ার টার সাথে কথা বলছিস!
শামসুল হতাশ হয়ে খানিকক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এরপর গম্ভীরতা ছাপিয়ে বললেন,

– তোমায় আমি বুদ্ধিমতী ভেবেছিলাম।
মুহুর্তেই বাধা দিলো সোভাম। বললো,
– ওর মগজ চিবিয়ে খেয়েছে ওই শিকদার। ও পড়ে আছে কেয়ার নিয়ে। অথচ বুঝতে পারছে না কোরবানির আগে গরুর বেশ ভালো করে যত্ন করা হয়। যখন মরবে, তখন বুঝবে।
স্পর্শীয়া চোয়াল শক্ত করে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। এমনভাবে ভেঙে, পিষে ফেলা হয়েছে যে দ্বিতীয়বার আর ওই ফোন ইউজ করা যাবে না। এমনকি সার্ভিসিং করাও সম্ভব হবে না। সে চোখ তুলে ভাইয়ের দিকে তাকালো। কন্ঠে কাঠিন্যতা এনে দৃঢ়তার সাথে বললো,
– কাজ’টা ভালো করলি না।
এই বলে কোনোদিকে না তাকিয়েই সোজা চলে গেলো ভেজা ছাদে। সশব্দে দরজা আটকে দাঁড়িয়ে রইলো এক কোণায়। দরজার ওপাশে চেঁচামেচির আওয়াজ আসছে। সোভাম, শামসুল সহ সকলে ডাকছে! কিন্তু স্পর্শীয়া ফিরেও তাকালো না। দাঁড়িয়ে রইলো ঠায় হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে সোভামকে নিচে দেখা গেলো। ভেজা, কর্দমাক্ত উঠোনে দৌঁড়ে দৌঁড়ে বাগানের এপাশ টাতে আসছে স্পর্শীকে দেখার জন্য। হয়তো ভেবেছে সকলের উপর রাগ করে ছাদ থেকে লাফ দেবে।

পুরোটা রাত জেদ ধরে ছাদেই বসে রইলো স্পর্শী। বিগত ঘটনা গুলো ভেবে ক্রমশ ক্রোধে ফেটে উঠলো। বাড়ি সুদ্ধ প্রত্যেকে তার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে। এমনকি সোভাম ফোন ভেঙে, গায়ে হাত তুলে পরিস্থিতি আরো খারাপ করে তুলেছে। স্পর্শীয়ার কি নিজস্ব পছন্দ থাকতে পারে না? নিজের পছন্দের ছেলেকে সে কি বিয়ে করতে পারবে না? তার মতের মূল্য এতোটাই ঠুনকো! অথচ সে তো কখনোই সোভামকে বাধা দেয় নি। উদ্দেশ্য অযৌক্তিক জেনেও ভাই এবং দিশার মধ্যে কখনোই ঢোকে নি। ছেড়ে দিয়েছে তাদের মতো। অথচ সোভাম কি করে পারলো তার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব হীন করতে?
রাত প্রায় সাড়ে তিনটা। বাড়ির ছোটো রা ঘুমিয়ে পড়েছে। তবে ঘুম নেই শামসুলের চোখে। সে এবং পিপাসা কিছুক্ষণ পর পর আলতো করে ছাদের দরজায় টোকা মারছে। সাথে অনুরোধের সুরে বলছে,
-অনেক হয়েছে স্পর্শীয়া! এবার নিচে এসো।

কিন্তু সেসবে গুরুত্ব না দিয়ে কান চেপে বসে আছে স্পর্শী। পেছনের বাগান থেকে সোভামের আওয়াজ আসছে। ছেলেটা চেয়ার নিয়ে এখনো সেখানে বসে। হা করে তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে। যেনো বোন লাফ দিলে কয়েক সেকেন্ডে ক্যাচ করে নেবে। ছোটো বোনের জেদ সম্পর্কে তার ধারণা কম নয়। যে কোনো সময় যা কিছু করে ফেলতে পারে। একবার ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় স্টাডি টুর নিয়ে এভাবেই ঝামেলা বেঁধেছিলো দু জনের মধ্যে। এমনকি বিপাশা, পিপাসা দুজনেই বাধ সেধেছিলো কক্সবাজারের নাম শুনে। কিন্তু স্পর্শীর জেদের সামনে টিকে থাকতে পারে নি। দরজা বন্ধ করে তৃপ্তি নিয়ে ঘরের জিনিস ভেঙেছে। একসময় ভাঙা আয়নায় গুরুতর ভাবে হাত কেটে গেলেও বের হয়নি। জেদ নিয়ে ভেতরেই বসে ছিলো। তুমুল ধারায় সেবার রক্ত বেরিয়েছিলো। তবুও দরজা খোলেনি এই আহাম্মক মেয়ে। যেনো হাতটা বাধলেও সে পরাজিত হয়ে যেতো মা-ভাই এর সামনে। শেষমেষ অতিরিক্ত ব্লিডিং এর কারনে অজ্ঞান হয়ে যায়। স্পর্শীর নিস্তব্ধতা পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে সবাই এবং এমন দশা দেখে হস্পিটালে ছুটেছিলো দিশা হারিয়ে। পরে অবশ্য স্পর্শীয়া নিজেই যায়নি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শরীর দূর্বল হয়ে পড়েছিলো। স্যালাইন হাতে পড়ে থাকতে হয়েছে হস্পিটালের বেডে।
বাগানে বড্ড মশা। আর এক ঘন্টা এখানে থাকলে ডেঙ্গু নিশ্চিত। সোভাম ছাদের দিকে তাকিয়ে আবারো ডাকলো। বললো,

– চড়ুই, বড্ড ঘুম পাচ্ছে। এবার তো দরজা খোল। কাল সন্ধ্যার মধ্যে নতুন ফোন কিনে দিবো।
ভোররাত! আকাশে সন্ধ্যার ন্যায় আবারো বড় বড় মেঘ জমেছে। নিশ্চয়ই মুষলধারে বৃষ্টি হবে। স্পর্শী শেষমেশ প্রকৃতির কাছে হার মানলো। শব্দ করে দরজা খুলে নেমে এলো দোতলায়। আসলেই কি সে হার মেনেছে? নাকি মাথাতে অন্য কোনো পরিকল্পনা রয়েছে। মা-বাবা দুজনেই নির্ঘুম, ভাই নামক হারামি টা বাগানে বসে মশার কামড় খাচ্ছে — হয়তো সে কারনেই নেমেছে। স্পর্শীয়ার নামার শব্দ পেয়ে সোভাম দ্রুত রুমে ফিরলো। এখন আর ওর কাছে যাওয়া উচিত নয়। যদি তাকে দেখলে রাগ আবারো বাড়ে? তার চেয়ে ঘুমানো উত্তম। সকলেই স্পর্শীকে কোনো প্রশ্ন না করে, তার সামনে না এসে চুপচাপ ঘুমাতে গেলো।
সারা রাত নির্ঘুম থাকায় প্রত্যেকেই খুব তাড়াতাড়ি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো। স্পর্শীয়া রান্নাঘরে গিয়ে বেশ আয়েশ করে খেলো। টানা আধঘন্টা বসে অল্প অল্প খাওয়ার পর সরাসরি ঢুকে পড়লো মায়ের রুমে। পিপাসা নিচতলার গেস্টরুমে থাকে। ফোনটা অবহেলায় টেবিলের উপর রাখা। সেটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বের হয়ে গেলো স্পর্শী। দ্রুত পায়ে চলে গেলো নিজের রুমে। দরজা বন্ধ করে এক এক করে প্রায় নয় বার কল করলো পরশের নাম্বারে।
তখন ভোররাত। এইতো কিছুক্ষণ পরেই ফজরের আজান দিবে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকার মধ্যে হঠাৎ অপরিচিত নাম্বার থেকে এতোগুলো কল দেখে কিছুটা ভড়কে গেলো পরশ। বিরক্তও হলো। ঘুম ঘুম কন্ঠে বললো,

– কে বলছেন?
– স্পর্শীয়া সরদার!
পরশ হতভম্ব হয়ে যায়। আঁতকে ওঠে। ঘুম চলে যায় এক নিমিষেই। কন্ঠে আতংক নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
– স্পর্শীয়া, তুমি! এতো রাতে? এটা কার নাম্বার? তুমি কি ঠিক আছো?
– না ঠিক নেই। আমাকে ঝামেলায় ফেলে নিশ্চিন্তে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন। আপনার কারনে আবারো ঝামেলা হয়েছে। ভাইয়া আমার ফোন ভেঙে ফেলেছে। এখন পর্যন্ত দুচোখের পাতা এক করতে পারি নি।
পরশ চমকে উঠলো। এতো কিছু হয়ে গেছে ও বাড়িতে! সে চিন্তিত কন্ঠে বললো,
– শোনো, একটু শান্ত হও। আমি কি আসবো এখন?
স্পর্শীর ক্রোধ কমে নি। তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,

– এসে কি করবেন?
পরশ বুঝে উঠতে পারলো না। সোজাসাপ্টা বলে ফেললো,
– তোমায় আমার কাছে নিয়ে আসবো।
– আপনার পরিবার বুঝি খুব মেনে নেবে!
আবারো সেই তাচ্ছিল্যের সুর। পরশ একটু শান্ত হয়ে বসলো। হুট করে ঘুম ভেঙেই এমন পরিস্থিতি। ভাবার সময় টুকুও পাচ্ছে না। অবশেষে খানিকক্ষণ ভেবে – চিনতে উত্তর দিলো। বললো,
– তা হয়তো এতো তাড়াতাড়ি নেবে না। সবটা ঠিক হতে সময় লাগবে। কিন্তু তাই বলে তোমায় তো ঝামেলায় ফেলে রাখতে পারি না। তুমি চিন্তা করো না, বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে।
অবশেষে দিশা খুঁজে পেলো স্পর্শীয়া। সারাদিনের অপমান, অসম্মানের পর এই টুকু সমাধান হৃদয়টা নরম করে দিলো। সে হু হু করে কেদে উঠলো। বললো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৬

– সকালে খুব তাড়াতাড়ি আসবেন। আমরা বিয়ে করবো।
– আচ্ছা, আচ্চা বাবা। একটু শান্ত হও। আমি সবটা সামলে নিচ্ছি। কল করলে চলে আসবে। এখন একটু ঘুমাও।
ফের বাঁধা দিলো স্পর্শী। রুক্ষস্বরে বললো,
– আমার ফোন নেই, বলেছি না। নয়টার সময় আসবেন, আমি ওয়েট করবো বড় রাস্তায়।
অতঃপর তাদের পরিকল্পনা শেষ করে স্পর্শী পুণরায় চুপিচুপি মায়ের ফোন রেখে আসলো। এরপর কিছুক্ষণের জন্য শুয়ে পড়লো!

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৮