Born to be villains part 14
মিথুবুড়ি
‘ধানমণ্ডির চার নাম্বার রোড, পিবিআইয়ের সদর দপ্তরের সামনে বেপরোয়া গতিতে ধেয়ে আসা বেগে লাল রঙের একটা আরওয়ান-ফাইভ ভি-ফ্রোর জোরসে ব্রেক কষলো। পিজ ঢালা রাস্তার সাথে চাকার উগ্র ঘর্ষণে তৈরি কর্কশ শব্দে রাস্তার অপরপ্রান্তে মারবেল খেয়াল নিমজ্জিত পথশিশুরা হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল। কম্পিত চোখে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তারা তাকিয়ে থাকল পিবিআই অফিসের রাস্তা লাগোয়া গেইটের দিকে৷ বর্তমান বাংলার বুকে লেডি বাইকার এবং শরীরের সাথে আঁটসাঁট হয়ে দৈহিক গঠন ফুটিয়ে তোলা ইসলাম বিরোধী পোশাক এখন এতোটাই মামুলী আর নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে যে তাদের কারো তটস্থ চোখে চকিতভাব লক্ষ করা গেল না৷
‘তবে যখনই মেয়েটি হেলমেট খুলে কাঁধ ছুঁই-ছুঁই চুলগুলো ঠিক করতে ডানে-বামে মাথা নাড়তে শুরু করে, তখন তার ভিন্ন দেশীয় আদল আর নিখুঁত দেহগঠন মুহূর্তেই সবাইকে স্তব্ধ করে দেয়। একজন আরেকজনকে কনুই দিয়ে ইঙ্গিত করে ফিসফিসিয়ে বলতে থাকে,
“দেখ…দেখ বিদেশি মাল।”
‘মেয়েটির শ্রবণশক্তি ছিল হাঙরের মতো তীক্ষ্ণ। এত দূর থেকেও ছেলেগুলোর ফিসফাস স্পষ্টই পৌঁছে গেল তার কানে। হেলমেটটা ট্যাংকির ওপর রেখে, সেটার ওপর ভর দিয়ে নির্লিপ্ত ভাবনায় বসে পড়ল সে। অতঃপর গাঢ় খয়েরি ঠোঁটের কোণে একঝুলে হাসি তুলে বলে উঠল,
“ইট’স নট মাল।
ইটস কল্ড হট অ্যান্ড সে-ক্সি।
রাস্তা-ঘাটে চুরিচামারি করার বদলে স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করলে উল্টাপাল্টা কমপ্লিমেন্ট দিতে হতো না, বাচ্চা।”
‘একজন মেয়ের কথায় এতো ধার থাকতে পারে ওরা সম্ভবত ধারণাই করতে পারেনি। মুহূর্তের মধ্যে ছেলেগুলো সরে পড়ল সেখান থেকে। আজ রাতে দু-মুঠো ডাল-ভাত জুটানোর জন্য অন্য রাস্তা বেচে নিতে হবে। এই রোডে আজ আর আসবে না তাঁরা। এই সমাজে চোরের জন্য শাস্তি বরাদ্দ আছে,কিন্তু ক্ষুধার্তদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা নেই।
‘মেয়েটি বাঁকা হাসি হেসে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে ভেতরের দিকে হাঁটা ধরল। ব্রিফিং রুমে ঢোকার আগে তার চোখ আটকে গেল বাইরে দেয়ালের দিকে—গত চার বছরে পাওয়া বিকৃতমুখ যৌনকর্মীদের মরদেহের ছবি সারি করে টাঙানো। নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি হিসেবে সেগুলো ঝুলছে। তবে এখানে বিস্ময়কর সত্য হলো এই চার বছরে তাদের কারো পরিচয় মেলেনি, আর না কারো নামে কোনো মিসিং ডায়েরি করা হয়েছে, না কেউ তাদের খোঁজ করেছে। এটা কি কেবলই এক আশ্চর্যজনক ঘটনা? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও ভয়ংকর কোনো রহস্য? সে বিকৃতমুখ গুলোর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে চলে যায়। তার হাসিত ছিল কিছু একটা!
‘রামপুরা, খিলগাঁও, রমনা, তেজগাঁও, সবুজবাগ, মতিঝিল—সব থানা ইনচার্জরা, সঙ্গে একজন পিবিআই প্রধান এবং সিআইডি প্রধান মিলে সকলে ব্রিফিং রুমে অপেক্ষা করছেন নিউইয়র্কে এফবিআই-এর জন্য। কেবল অনুপস্থিত একজন। ডিজিপির একমাত্র ছেলে রোহিত হত্যার তদন্তকারী সিআইডি অফিসার মাহেশ আহসান। জানা গেছে বাইক এক্সিডেন্টের কারণে সে এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
‘ব্রিফিং রুমে উপস্থিত সকল আইন রক্ষকের দার ঘুরে গেলেও এখনও রোহিত হত্যার কোনো সূত্র ধরা পড়ে নি। রোহিত ছিলেন ডিজিপির একমাত্র ছেলে। অত্যন্ত আদরের। নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করার পরও যখন কোনো আশাজনক ফলাফল আসে না, তখন ডিজিপি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের আইন বিভাগের উপর থেকে ভরসা হারাতে শুরু করেন। তখন তার মন ভর করে ছোটবেলার বন্ধু মার্কিনের দিকে। যিনি ছিলেন SAC-এর একজন ভেরিফাইড এবং অভিজ্ঞ এজেন্ট।
‘মার্কিন তখন পরিবারসহ ভ্যাকেশনে সুইজারল্যান্ডে ছিল।তবুও বন্ধুর অসহায় অবস্থা দেখে তিনি হতাশ করেননি। জানালেন, তাদের ফার্মের একজন সক্রিয় ও প্রভুত্বশালী এফবিআই এজেন্ট ভ্যাকেশনে এইমুহূর্তে বাংলাদেশে আছে। পরবর্তীতে অনুরোধ করা হলো রোহিতের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করার জন্য। যদিও ব্যক্তিগত সে কারণে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত বসের কথা মেনে নেয়। আজ সেই এজেন্টই এসেছে সকল অফিসারের কাছ থেকে রোহিতের কেসের তথ্য বুঝে নিতে দ্রুত তদন্ত শুরু করতে।
‘এফবিআই এজেন্ট ব্রিফিং রুমে প্রবেশ করতেই উপস্থিত সবাই রাস্তার ছেলেগুলোর মতো মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে যায়। কারণ তার পরিধান করা জামা এতটাই ফিট যে শরীরের স্পর্শকাতর রেখাগুলো খোলাখুলিভাবে দেখা দিচ্ছিল। অর্ধেক স্ত-ন ছিল উন্মুক্ত। টাইট জিন্সে ভেসে উঠেছিল নারীকায়ার নরম আকৃতি। তার আকর্ষণীয় ফিগার দেখে উপস্থিত সবাই চোখ মেলতে ভুলে যায়। সেই সাথে তার উজ্জ্বল ফর্সা ত্বক, ধারালো চিবুক, নির্ভীক ভঙ্গি—সব কিছু মিলিয়ে সে রুমের মধ্যে একটি চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলে দেয় মুহুর্তেই।
‘এদিকে এফবিআই এজেন্ট কারো দিকে তাকিয়ে না দেখে টেবিল থেকে ফাইলগুলো তুলে নিল পাথরের মতো শক্ত মুখে সরাসরি কেসের ভেতর প্রবেশ করল।
“এই কেসের প্রাইম সাসপেক্টের সঙ্গে আমি দেখা করতে চাই।”
‘নারীর কণ্ঠের ওমন গভীর, মার্জিত আর শীতল বাক্যে হুঁশ ফিরে পেল সকলে। কেউ গ্রীবা বাঁকিয়ে গরম নিশ্বাস ছাড়ে, কেউ অস্থির হয়ে নড়েচড়ে বসে। মেয়েরা যদি জানতো তাদের পোশাকের এই খোলামেলা স্বভাবের কারণে পুরুষদের নজর ঠিক কোথায় যায়, এবং তাদের অন্তরে কী ইচ্ছা জাগে, তবে হয়তো কখনোই তারা এতটা স্বচ্ছন্দভাবে এমন বেহায়াপনা পরিধান করত না।
‘কারোর তরফ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সে পাতা উল্টাতে উল্টাতে আবারও জানতে চাইল,
“কেসের লাস্ট আপডেট কী ছিল?”
‘এতোটাস্পষ্ট বাংলা বোধহয় কেউ আশা করেনি। মুগ্ধতা আর লালসা ক্ষণিকের জন্য কেটে গিয়ে সবার চোখে শুধু বিস্ময় দেখা গেল।
‘গলা পরিষ্কার করে পিবিআই প্রধান বললেন,”দেয়ার ইজ নো আপডেট।”
‘এতোক্ষণে মুখের সামনে থেকে ফাইল সরিয়ে সে শীতল চোখে তাকাল। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পেয়ে পিবিআই প্রধান থতমত খেয়ে গেলেন।
‘সে সন্দিহান গলায় বলে,”কোনো আপডেট নেই মানে?”
‘সিআইডি প্রধান ল্যাপটপ ঘুরিয়ে দেখালেন,”এটা ছাড়া আর কোনো প্রমাণই পাওয়া যায়নি।”
‘ল্যাপটপের স্ক্রিনে ফুটেজ দেখা যাচ্ছে রোহিতের খুনের ঠিক আগের রাতের দৃশ্য। রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে রোহিত চায়ের দোকান থেকে চা খাচ্ছিল। পাশে বসে ছিল কালো হুডি পরিহিত এক ব্যক্তি। যার উচ্চতা ছিল চোখে পড়ার মতো। স্বাভাবিকভাবেই চা খেয়ে সে চলে যায়। আর তার কিছুক্ষণ পরই রোহিতও চলে যায়। কিন্তু সে গাড়ির কাছে যায়নি৷ হুডি পরিহিত ব্যক্তির পিছু পিছু জঙ্গলের রাস্তার দিকে চলে গেছে। সেদিন কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না, তাই দেখা যায়নি রোহিত আসলে কোনদিকে গেছেন। আর ঠিক দুই দিন পর তার নৃশংস লাশ পাওয়া যায়।
‘সম্পূর্ণ ফুটেজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একবার দেখে নিতেই সে কাঁধ ছুঁই-ছুঁই চুলগুলো অকারণে ঠিক করতে করতে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“কেস তো এখানেই ডিসক্লোজড।”
‘এক মুহূর্তে বিফ্রিং রুমে নেমে এলো অস্বস্তিকর স্তব্ধতা। কেউই বুঝতে পারল না। তেজগাঁও ইনচার্জ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
“ঠিক বুঝলাম না… কী বলতে চাইছেন?”
“খুনি হুডি পরা লোকটা।” অতি সহজ গলায় উত্তর দিল সে।
‘পিবিআই প্রধান তৎক্ষণাৎ আপত্তি তুললেন,”কিন্তু এর কোনো স্ট্রং প্রমাণ নেই। প্রথমত, তারা একে অপরকে চিনত না। ফুটেজে আলো কম ছিল, তবুও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তারা কেউ কারও সাথে কথা বলেনি। দ্বিতীয়ত, জঙ্গলের মধ্যে দুইটা রাস্তা। তারা দু’জনই যে একই পথে গেছে এটা অনিশ্চিত এখনও। এটুকু দিয়ে কাউকে খুনি বলা যায় না।”
‘সে ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করল। কথাগুলো হেলায় উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে শান্ত গলায় বলল,”রোহিতের লাস্ট লোকেশন?”
‘সিআইডি প্রধান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,”ও ফোনটা বাসায় রেখেই বের হয়েছিল…” কণ্ঠে চাপা ব্যর্থতার তিক্ততা।
‘সে আবারও ভেবে নিল সব হিসেব। ফুটেজ, পথ, আচরণ সব মিলিয়ে নিশ্চিত স্বরে বলল,
“খুনি হুডি পরা লোকটাই। আর তাকে খুঁজে বের করাই এখন আমাদের একমাত্র কাজ।”
‘সবার মধ্য থেকে সর্বাধিক আগ্রহ দেখা গেল পিবিআই প্রধানের। সম্ভবত রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরী, দৃঢ়চোখের, তীক্ষ্ণবুদ্ধি এফবিআই এজেন্টকে প্রভাবিত করতেই সুযোগ খুঁজছেন তিনি। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে আগ বাড়িয়ে বললেন,
“আমরা চায়ের দোকানদারের সাথে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, লোকটাকে তার একবারও সন্দেহজনক মনে হয়নি। এছাড়াও রোহিত প্রায়ই ওখানে চা খেতে যেত।
কিন্তু হুডি পরা লোকটা সেদিনই প্রথম আর শেষবার যায়।”
“খুনি নিশ্চয়ই খুন করার পর আবার সেখানে হাজিরা দিতে যাবে না, রাইট?”
‘এতোটা সোজা, সপাটে ছোঁড়া প্রশ্ন শূন্যে বজ্রপাতের মতো নেমে এলো। পিবিআই প্রধান স্পষ্টতই ভরকে গেলেন। কণ্ঠ আটকে গেল গলায়। থমথমে গলায় বলতে চাইলেন কিছু..
“না… মানে… আমি বলতে চাচ্ছিলাম…
‘হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল কর্কশভাষী এফবিআই এজেন্ট। তার চোখে বিরক্তির ধার। ঠোঁটেও ঠাণ্ডা অপমানের রেখা। চাহনি সরিয়ে এবার সে তাকাল সিআইডি প্রধানের দিকে। গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
“হুডি পরা লোকটার কোনো খোঁজ পেয়েছেন?”
‘সিআইডি প্রধান নিঃশ্বাস চেপে বললেন,”না। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমরা তাকে অনেক খুঁজেছি। কিন্তু পাইনি। তাকে ট্রেস করার মতো কোনো ক্লু ছিল না আমাদের হাতে।”
‘শব্দগুলো শুনে কিছুক্ষণ নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে রইল এফবিআই-এর জাঁদরেল, একরোখা, কর্কশভাষী এজেন্ট। দৃষ্টি পায়ের পাতার উপর, কপালের ভ্রু-জোড়া গুছানো। শান্তমূর্তির মতো স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ পকেটে হাত রেখে, গভীরভাবে কিছু ভাবল এই ভয়ংকর সুন্দরী। তারপর সেই নীরবতার ভেতরেই বজ্রের মতো রাশভারী স্বরে নির্দেশ দিল,
“সেদিন ওই এলাকায়—ওই সময়—কতগুলো সিম সচল ছিল, সব তথ্য বের করুন। তারপর একে একে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করুন। যার ওপরই সামান্যতম সন্দেহ হয়, তাকেই কাস্টডিতে নিন। স্পেশাল থেরাপি দেওয়া হলে ভেতর থেকে সব বের হয়ে আসবে। এদিক-সেদিক সন্দেহের তীর ছোঁড়ার প্রয়োজন নেই। খুনিকে আমরা পেয়ে গেছি। এবার গলা টিপে ধরার পালা। আই ওয়ান্ট দ্যাট ফাকিং বাস্টার্ড এট এনি কস্ট। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?” বলে নির্লিপ্ত ভাবে দুই স্ত-নের মাঝে গুঁজে রাখা সানগ্লাস বের করে চোখে ঠেলে দিল। চিবুকে পাহাড়সময় গম্ভীরতা।
‘উপস্থিত সকলে স্তব্ধ। সত্যিই এতোটা গভীর, এতোটা সুক্ষ্মভাবে তারা কেউ ভেবে দেখেনি। বয়সে তাদের হাঁটুর সমান এই তরুণী এফবিআই এজেন্টকে মুহূর্তেই অন্য চোখে দেখতে শুরু করল সবাই। তাদের কথোপকথন এখানেই শেষ হলো। তাকে দেখে মনে হলো এই কেসে তার উৎসাহ সামান্যই। যেমন অনেক তথাকথিত মুসলিম নামাজ ফরজ বলে কেবল আদায় করে ফরজ পালন করে,তেমনি সেও যেন যান্ত্রিকভাবে কেসটি ‘সলভড’ করে দিতে হবে বলে সলভড করতে চাইছে। তার চোখে নেই উত্তেজনা, নেই আগুন, নেই কোনো আবেগ।
‘সকলেই যখন চেয়ার সরিয়ে উঠতে শুরু করেছে,
তখনই সে হঠাৎ বলে উঠল,
“আচ্ছা… ওই যৌ-নকর্মীদের কেসগুলো এখনও পেন্ডিং কেন?”
‘যে পিবিআই প্রধান এতক্ষণ নরম গলায় তার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করছিলেন, এই প্রশ্ন শুনে তার মুখটাই বদলে গেল। রাগ, ঘৃণা আর উগ্রতার মিশেলে তেতে উঠলেন তিনি।
“ওদের সাথে এমনটায় হওয়াই উচিত! যেমন কর্ম—তেমন ফল! যে এদের খুন করেছে, তাকে কুর্নিশ দিতে হয়!
জানোয়ারগুলো… জাহান্নামেও এদের জায়গা হবে না!”
‘রুমের চারপাশে হঠাৎ নেমে আসে অস্বস্তিকর নীরবতা। সেক্স-ওয়ার্কারদের প্রতি ঘৃণার স্রোত হঠাৎই পুরো পরিবেশটাই অন্ধকার করে দিল। এফবিআই এজেন্টের চোখ তখন অন্যরকম সংকুচিত।
“পতিতাদের সাথে শুতে খুব মজা, তাই না?” ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ হাসি টেনে সরাসরি ছুঁড়ে দিল সে। কণ্ঠে ঠান্ডা তাচ্ছিল্য।
‘লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিলেও থেমে থাকলেন না পিবিআই প্রধান।
“এরাঁ মানুষ? টাকার বিনিময়ে শরীর বিক্রি করে—হ্যাঁ, অনেকেই করে। কিন্তু এরা লোভী। নিজস্ব গ্যাং আছে এদের। এঁরা যাদের কাছে শরীর বিক্রি করে, তাদেরই খুন করে সব লুটে নেয়। অনলাইনে এদের একটা সাইট আছে সেখান থেকেই কাস্টমার ধরে। এদের বেশিরভাগ কাস্টমারই হয় মধ্যবয়স্ক লোক, বড় ব্যবসায়ী আর ডির্ভোসী। একান্ত সময় কাটানোর নামে এদের ভাড়া করে বাগানবাড়ি বা নির্জন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। অথচ এরা আগে থেকেই প্ল্যান সাজিয়ে রাখে। দেহ বিলানোর আড়ালে টাকা-পয়সা, গয়না সবই তো নেয়ই,সাথে জীবনটাও। তাই তো ধরা পড়ার ভয়ে এদের দলের কেউ কোনো মিসিং ডাইরি পর্যন্ত করে না। লাশও নিতে আসে না।”
‘মেয়েটি মনোযোগ দিয়ে পুরোটা শুনল। এ সমাজে বে-শ্যাদের ধর্ষণ করা জায়েজ, অথচ সেই ধর্ষকরাই আবার গলা উঁচিয়ে তাদের বে-শ্যা” বলে গালি দেয়। কিন্তু এখানে ঘটনাটা অন্যরকম। খুবই অস্বাভাবিক। কার এমন ক্ষোভ এদের প্রতি? কেন এমন নৃশংসতা?
‘ধানমন্ডি চার নম্বরে তারা যখন শিকারীকে নিয়ে আলোচনা করছিল, তখন সে-ই শিকারীই তার শিকার নিয়ে নৃশংস উল্লাসে মেতে উঠেছে।
‘পরিত্যক্ত ল্যাবরেটরির ভেতর চারদিক চাপা অন্ধকারে ডুবে আছে। দেয়ালের পুরনো লোহার পাইপে টপটপ করে জল পড়ার আওয়াজ নিস্তব্ধতাকে আরও আতঙ্কময় করে তুলছে। ল্যাবের মাঝখানে রাখা ঠাণ্ডা ধাতব টেবিলের উপর নিথর হয়ে শুয়ে আছে মেয়েটি। তার হাত-পা শক্ত করে বেঁধে রাখা। এতোটাই শক্ত করে যে নড়ার শক্তিটুকুও নেই।
‘হঠাৎ টক করে উপর থেকে একটি সাদা আলো জ্বলে ওঠে। ঠিক দন্তচিকিৎসকদের সেই তীক্ষ্ণ, ধাতব আলো। আলোটা সোজা গিয়ে পড়ে কাঁপতে থাকা মেয়েটির মুখে। চোখ সঙ্কুচিত করে মেয়েটি শ্বাস নিতে চেষ্টা করে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোয় না।
‘ধীরে ধীরে অন্ধকারের গভীরতা থেকে একটি অবয়ব এগিয়ে আসে। ক্ষীণ আলোর নিচে এসে থামতেই বোঝা যায় তার হাত দুটো সাদা গ্লাভসে ঢাকা, আর মুখে একধরনের তিক্ত কঠোরতা। তার কালো, নিঃসাড় চোখের দিকে তাকাতেই মেয়েটির চোখ ভিজে ওঠে। মেয়েটি নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙে পড়ে৷ ভয়, অসহায়তা, আর অব্যক্ত যন্ত্রণায় কাঁপতে থাকে তার দৃষ্টি। তবুও মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না। কারণ আগেই তার জিহ্বা কেটে ফেলা হয়েছে।
‘অবয়বটি কোনো কথা বলে না। শুধু ধীরে আর স্বাভাবিক শান্ত ভঙ্গিতে পকেট থেকে একটি চিকচিকে ধাতব ব্লে-ড বের করে। আলোয় ব্লে-ডের ধারটা ঠাণ্ডাভাবে জ্বলজ্বল করে ওঠে। তারপর নীরব ল্যাবের ভেতর শুরু হয় সেই মানুষটার অন্ধকার উ-ল্লা-স। শুরু হয় তার নিষ্ঠু-র-তা আর পৈ-শা-চিক আনন্দ।
‘সে প্রথমেই সূক্ষ্ম, হিসেবি আর এমন নিখুঁতভাবে
মেয়েটির ঠোঁটের চারপাশে ব্লে-ড চালাল, যাতে মনে হয় সৌন্দর্যচর্চার ছদ্মবেশে মৃ-ত্যু-র নৃত্য শুরু করছে। ধীরে ধীরে সে ঠোঁটের চারপাশে ব্লে–ড চালাতে শুরু করল। ঠিক যেভাবে মেয়েরা লিপলাইনার দিয়ে ঠোঁট আর্ট করে থাকে। কাটা জায়গা থেকে র-ক্তের ক্ষুদ্র রেখা বেয়ে নামতেই তার ঠোঁটে সর্বসুখ আনন্দ ফুটে ওঠে। শান্ত শীতল চোখে ফুটে পরম তৃপ্তি।
‘অতঃপর ধীরে ধীরে তার ব্লে-ডের ধার বিকট নির্ভুলতায় নামল মেয়েটির ঠোঁটের গায়ে। প্রতিটি স্পর্শেই মেয়েটির শরীর নিঃশব্দ কাঁপনে টান খায় কিন্তু বাঁধা দড়ি তাকে কোনো নড়ার সুযোগ দেয় না। মেয়েটির চোখ থেকে শুধু নিঃশব্দে অশ্রু ঝরে। সে ধীরে ধীরে ঠোঁটের চা-ম-ড়া তুলতে শুরু করে। কোরবানির ঈদে যেভাবে কসাই-রা গরুর শরীর থেকে চামড়া আলাদা করে, ঠিক সেভাবে। ঠোঁটের এক কোণে একটু চাপ প্রয়োগ করার পর, তীব্র শীতে শুষ্ক ঠোঁটের চামড়া যেভাবে উঠে আসে, সেভাবে মেয়েটির ঠোঁট থেকে চামড়া উঠে আসে। ছলকে ওঠা চামড়ায় একটান দিয়ে উপরের ঠোঁটের সম্পূর্ণ চাম-ড়া তুলে ফেলল সে। পাহাড়ি কলকলে নদীর মতো র-ক্ত ঝরতে থাকে ঠোঁট থেকে।
‘অবয়বটি প্রতিটি ধাপ অদ্ভুত নি-ষ্ঠায় আর অদ্ভুত আনন্দে সম্পন্ন করে। যেন সে কোনো ভয়ং-কর শিল্প সৃষ্টি করছে, যার ক্যানভাস হচ্ছে মেয়েটির নীরব যন্ত্রণা। অবয়বটি এবার টেবিলের একপাশে রাখা ধারালো কাঁ-চি তুলে নেয়। চুল কাটার মতোই স্থির, ধীর, নিষ্ঠুর ছন্দে সে তার ‘কাজ চালিয়ে যেতে থাকে প্রথমে। তবে তৃপ্তি না মেলায় পরবর্তীতে কাঁ-চি দিয়ে সে সবজির মতো চিকন, পাতলা পাতলা করে মেয়েটির উপরের ঠোঁট কা-ট-তে থাকে। তবে ঠোঁট থেকে আলাদা করে না। সমুদ্রের তীরে যেভাবে শুটকি রোদে শুকাতে দেওয়া হয়, দড়ির সাথে ঝুলিয়ে—ঠিক সেভাবে ঠোঁ-টের কা-টা অংশগুলো ঝুলে থাকে।
‘তারপর সে কিছু অচেনা গুঁড়ো, ঝাঁঝালো, দাহ্য, মেয়েটির ঠোঁটের প্রতিটি ছিটিয়ে দিল। মেয়েটি শব্দহীন চিৎকা-রে চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকে। অসহায় মেয়েটির নিঃশ্বাস কেঁপে ওঠে, চোখ থেকে অঝোরে পানি পড়ে। এখানেই তার বর্ব-রতা থেমে থাকে না। তারপর সে প্রতিটি কা-টা অংশ যান্ত্রিক নির্লিপ্ততায় ফেলে দেয় পাশের রাসায়নিক দ্রবণে। এসি-ডে ঠোঁটের কাটা কাটা অংশগুলো ফেলতেই গলে মুহূর্তেই তা লীন হয়ে যায়। সবকিছু করতে করতে তার মুখে সেই একই নিষ্ঠু-র শান্তি সেই বিকট সন্তুষ্টি লক্ষ করা যায়।
“এবার নিচের ঠোঁটের পালা।”
‘শব্দটা উচ্চারণ করার সময় অবয়বের কণ্ঠ আরও গভীর, অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা হয়ে যায়। মেয়েটির চোখ ভয়ে স্তব্ধ হয়ে থাকে। মেয়েটি পালাতে নয়, মরতে চাইছে। কিন্তু তাকে মরতে দেওয়া হচ্ছে না। অবয়বটি নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আলোটা এবার ঠিক নিচের ঠোঁটের ওপর এসে পড়ে। সে ব্লে-ডের ধার আঙুলে ঘোরায়। সেই ক্ষুদ্র ধাতব শব্দ ল্যাবের ভেতর অস্বস্তিকর প্রতিধ্বনি তোলে। অবয়বটির হাতের শীতল স্পর্শ মেয়েটির শরীরকে কাঁপিয়ে তোলে। হাউমাউ করে কাঁদতে চাই, পালাতে চাই…….
‘নিচের ঠোঁটের কাজটা সে করে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে।
এখানে তার নি-ষ্ঠুরতা শুধু শারীরিক নয় মনস্তাত্ত্বিকভাবে মাটির নিচে নামিয়ে দেয় মেয়েটিকে। সে ব্লে-ডটা মুখের ঠিক কিনারায় থামিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলে। যা শুনে নরকযন্ত্রণার চেয়েও ভয়ংকরভাবে শিউরে ওঠে।
‘মেয়েটি কেঁপে ওঠে, শ্বাস আটকে আসে, চোখ দিয়ে নিরব অশ্রু পড়তে থাকে। আর সে শুধু তৃপ্ত চোখে দেখে।দেখে মেয়েটির ভেঙে যাওয়া,নিঃশব্দ চিৎকার, ত্রাস এসবই তার প্রকৃত আনন্দ। সে একে একে নিচের ঠোটের সব র-গ টেনে-টুনে ছিঁ-ড়ে বের করে মাংসের ভেতর থেকে। তবে হঠাৎই ব্লে-ড অসাবধানতার জন্য তার হাতে লেগে অনেকটা কেটে যায়। মৃদু আর্তনাদ করে উঠল সে,
“আহহহহ…
‘বাঁ হাত দিয়ে ডান হাতের তালু শক্ত করে চেপে ধরে র-ক্তপাত ঠেকালো সে। অনেকটাই কে-টে গেছে। এই হাতে আর কাটাকাটি সম্ভব না। সে মেয়েটার বিকৃত মুখের দিকে বিতৃষ্ণা ভরা চোখে চেয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল। অন্ধকারাচ্ছন্ন ল্যাবে মেয়েটি ওভাবেই র-ক্তা-ক্ত মুখে পড়ে রইল। শরীরে একটা ফুলের আঘাতও নেই। যা নৃশংসতা, সবই মুখে, ঠোঁটে……
‘ঘন জঙ্গলের গভীরে দাঁড়িয়ে আছে এক ভাঙাচোরা কাঠের ঘর। সময়ের ভারে কুঁজো হয়ে পড়া এক নির্বাক স্মৃতি হয়ে। ভেতরে প্রবেশ করলেই বুঝা যায় এখানে নেই কোনো জীবনের ছাপ। একটা আধভাঙা কাঠের চৌকি ছাড়া কিছুই নেই। নেই আলো, নেই বাতাস, নেই মানুষের গন্ধ।শুধুই সেঁতসেঁতে অন্ধকার আর পচা কাঠের গন্ধ। কিন্তু এই নির্জন, ময়লা, অচেনা ঘরটাতেই রয়েছে এক অসম্ভব বিস্ময়।যা এখানে থাকার কথা নয়, ভাবারও নয়। ঘরের এক কোণে রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সেই দামি হাই-সিসি সুপারবাইক। বিশ্বের সবচেয়ে দামের মধ্যে একটি। যা কয়েকদিন আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছিল। ঘরটি যতই পরিত্যক্ত, অযত্নে ডুবে থাকুক না কেন, বাইকটির ওপর নেই ধুলোর দাগ পর্যন্ত। মনে হয় প্রতিদিন কেউ এসে আঙুলের ছোঁয়ায় তাকে নতুন করে তোলার চেষ্টা করে। অন্ধকারের মাঝে উজ্জ্বল হয়ে আছে বাইকটির ধাতব দেহ।
‘চৌকিটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে এক ব্যক্তি। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পোড়া সিগারেটের ঠোটলা, ব্যবহৃত ইনজেকশন, ফাঁকা ওয়াইনের বোতল৷ সমস্ত ঘরটি নেশার জঞ্জালে ডুবে আছে। বদ্ধ দেয়ালের ভেতর মদের গন্ধ এতটাই ঘনীভূত যে নিশ্বাস নিতেও ভারী লাগে। কালো হুডি পরা লোকটির চোখ বন্ধ, কিন্তু তখনও মস্তিক সজাগ ছিল৷ অচেতন এক ঘোর তাকে ধীরে ধীরে টেনে নিচ্ছে। পাশে ছড়িয়ে থাকা ড্রাগস বলছে সে মাত্রই এই বি-ষ নিয়েছে। তবে এখনও সেই শক্তিশালী ড্রাগস তাকে পুরোপুরি গ্রাস করতে পারেনি; শুধু চোখের পাতা ভার হয়ে এসেছে। দেহ ঢলে পড়ছে। মাথা ঝাপসা কুয়াশায় ডুবে যাচ্ছে।
‘তার চোখের কোণ তখনও ভেজা দাগ৷ হয়তো এই নেশাও তার বুকের গভীরে গুঁজে রাখা যন্ত্রণা মুছতে পারছে না। ঘুম তাকে ধীরে ধীরে তলিয়ে নিচ্ছিল। ঠিক তখনই কানে গোঁজা ব্লুটুথে ক্ষীণ এক সংকেত কেঁপে উঠল। মুহূর্তেই তার শরীর শক্ত হয়ে গেল। চোখ দুটো হঠাৎ খুলে উঠল। এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে সে উঠে বসল। বুঝতে পারল জঙ্গলের নিস্তব্ধতা ভেদ করে কেউ প্রবেশ করেছে। দেরি করলে চলবে না। দ্রুত ডেরার বাইরে বেরিয়ে গিয়ে কয়েক গাছ দূরে এক বিশাল গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। তার দৃষ্টি সোজা স্থির হয়ে আছে আধভাঙা সেই কাঠের ঘরের দিকে। ওখানেই লুকানো আছে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি। তার শেষ স্মৃতি। তার শেষ নিঃশ্বাসের মতো প্রিয় সম্পদ।
‘কিছুক্ষণ পরেই ঘরে ঢুকে পড়ে কয়েকজন। তাদের পোশাক, আচরণ বলে দেয় এরা সাধারণ কেউ নয়। তারা ঘরটাতে তন্নতন্ন করে কিছু খুঁজতে থাকে। কিন্তু তারা আশানুরূপ জিনিসটি না পেয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় ঘরে। মুহূর্তেই লেলিহান শিখায় জ্বলে ওঠে ভাঙাচোরা কাঠের দেয়ালগুলো। আগুনের প্রথম শব্দটুকুতেই সে অনুভব করে তার বুকের মধ্যে কোথাও যেন ধপ্ করে কিছু ভেঙে গেল। ওই আধভাঙা ঘরে যা পুড়ছে, সেটা শুধু দামি সুপারবাইক নয়। পুড়ছে তার আশ্রয়, তার শেষ স্মৃতি, তার হৃদয়ের একমাত্র অমূল্য অংশ।
‘দূর থেকে দেখা যায় বাদামি চোখের সেই লোকটা—ন্যাসো। গার্ডদের সাথে কর্কশ,ধারালো ভাষায় কী যেন বলছে। গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটার চোখ ধীরে ধীরে ভরে আসে। লোকেরা বলে রাজনীতি আর বাইক, দুটোই ছেলেদের আবেগ আর শখের জায়গা। আর সেই আবেগ আর শখ যখন চোখের সামনে আগুনে পুড়তে থাকে, তখন সবচেয়ে শক্ত মানুষটাও কাঁদে। তার চোখ দিয়ে যখন পানি পড়ছিল, তখন ইমামা তার রুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাচছিল।
❝dilnashin naajni mahru mehjabi
yeh sab hai naam tumhare❞
‘ফোনের স্পিকারে ভেসে আসছে গান। ইমামা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লিপস্টিক ছুঁইয়ে দিচ্ছে ঠোঁটে। কথায় আছে মেয়েরা যখন প্রেমে পড়ে, তখন তারা নতুন করে বাঁচতে শেখে। হৃদয়ের ভেতর সুখ জমা হয়, আর সেই সুখের হাত ধরেই শখ জন্ম নেয়। কখনো না সাজা সেই মেয়েটিও আজ অদ্ভুত এক আলোয় জ্বলে উঠেছে। ভেতরে জমে থাকা ভালোবাসা তাকে শেখাচ্ছে নতুন করে সাজতে, নতুন করে নিজেকে দেখতে। ইমামাও আজ ঠিক তেমনই নিজের আনন্দে, নিজের প্রেমে, নিজের সাজে উজ্জ্বল।
‘ও গুনগুন করে গানের সাথে ঠোঁট মেলাচ্ছিল আর নিজের মনের আনন্দে সাজছিল। উল্লেখিত লাইনটা গাওয়ার মুহূর্তেই হঠাৎ মনে হলো লাইনগুলোর সাথে সেই লোকটা যে ধরা দিয়েও ধরা দেয় না, অথচ স্পর্শ থাকে, কিন্তু নাগাল থাকে না তার অদ্ভুত মিল। কুয়াশার ভেতর জোনাকির মতো লুকিয়ে থাকা মানুষটাও তো তাকে এভাবে নানান নামে ডাকে। একেক সময় একেক নামে ডাকতে ডাকতে তাকে শিহরিত করে দেয়। তার প্রতিটি ডাকে, প্রতি বারই নারীহৃদয় তরঙ্গে কেঁপে ওঠে।
‘হঠাৎ করেই রমণীর দুলে ওঠা বুকের ভেতর উষ্ণ সুখ জমল। সাঁঝের শান্ত হাওয়ার দোলায় দুলতে দুলতে জাফরনের লালচে আভা এসে ছুঁয়ে দিয়ে গেল তার আদুরে নাকের টিপ। সব সময় গম্ভীর থাকা মেয়েটা অকারণেই মিটিমিটি হাসছে। এগুলোই তো প্রেমের লক্ষণ। মেয়েটা সব বুঝেও কেন যেন সত্যটার সঙ্গে পুরোপুরি মুখোমুখি হতে চাইছে না। আবার এই সত্য থেকে পালাতেও চাইছে না। অদ্ভুত এক খেলা চলছে এখানে।
‘এরপরের দুই লাইন ইমামা প্রায় নেচে নেচেই গাইল।
দুহাত পিছনে কোমরে রেখে কাঁধে তাল দিয়ে গানের ছন্দে শরীর দুলিয়ে নিখুঁতভাবে আয়নার সামনে নাচতে লাগল আর মনের আনন্দে গলা ছেড়ে মিহি কণ্ঠে গাইল,
❝mere itne sare
nam hai jab tum yeh kehte ho
achche lagte ho❞
‘মিহি কণ্ঠের সুরেলা সুর তখনও অস্তরাঙা সন্ধ্যার হিমেল হাওয়ায় লেগে ছিল। এই মধুরঙ্গ সুর মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আচানক পিনপতন নীরবতায় ঘেরা কক্ষে ধ্বনিত হলো একটি পুরুষালী বিমুগ্ধ কণ্ঠস্বর,
❝tum mujhe Aschi lagti ho❞
‘ঘটনার আকষ্মিকতায় চমকে উঠে কেঁপে উঠল ইমামা। তড়িৎ প্রবাহের মতো পিছন ঘুরল। বিস্ফোরিত দৃষ্টি জোড়া ছুটল ঘরের আনাচে-কানাচে। না কোথাও কেউ নেই। ইমামা শুষ্ক ঢোক গিলে। নির্ভীকতার আড়ালে দণ্ডভোগী স্পন্দনে সে কাঁপা কণ্ঠে শুধায়
“ক-কে?”
‘আবারও সেই ঠাণ্ডা যন্ত্রস্বরূপ কণ্ঠ,”Someone you should fall, red” তবে পরিচিত ডাক৷’
‘ইমামা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। পরমুহূর্তেই আগুনের মতো জ্বলে উঠল,”আপনি আবার আমার রুমে ক্যামেরা লাগিয়েছেন? আর এই স্পিকার! কোথায় লাগিয়েছেন? লিসেন, আই নিড প্রাইভেসি,ওকে?”
‘যান্ত্রিক স্পন্দনযুক্ত কণ্ঠ এবার সামান্য খাদে নামল। প্রায় ফিসফিস করে আওড়ানো শব্দে জবাব এল,
“প্রাইভেসি তো দূরের মানুষের জন্য। আপনার জীবনে আমি আছি ঘাড়ের রগের মতোই খুব কাছে, এলিজান আমার।”
‘তাৎক্ষণিকভাবে ঝিমঝিম বিদ্যুতের ঝাপট নারীর শরীরের প্রতিটি কোণ স্পর্শ করে ছড়িয়ে পড়ল। ইমামা তার দৃঢ়তাপূর্ণ কণ্ঠে যারপরনাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। লোকটার কথা আর ডাকগুলো জাদুর মতো। মুহূর্তের মধ্যে তার সচল মনকে স্থির করতে পারে, রাগের সব কারণ ভুলিয়ে দিতে পারে তার কণ্ঠের স্পর্শে। কণ্ঠ গভীর আর আবেগশূন্য, তবে জাদুময়। মাদকের মতো তীব্র সেই কণ্ঠের রেশ।
‘এক অনিন্দ্য ঘোরে ইমামা নিজেই প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল,”আপনি কি সবাইকে এতো সুন্দর নামে ডাকেন?”
“নো। আই ডোন্ট কল এভরি উমেন সুইটহার্ট, বেবি, ডার্লিং, এলিজান, রেড, হানি…আই ওনলি গিভ নিকনেমস টু মাই উম্যান।”
‘ইমামা নিভে গেল। অজান্তেই ঠোঁটের এক কোণ নেচে উঠল। কিন্তু জমে থাকল না। গোয়েন্দাসুলভ চোখে ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে হাঁটতে শুরু করল। হঠাৎ তার নজর গিয়ে ঠেকল কেবিনেটের ওপর রাখা পুতুলটায়। ইমামা একটু নড়ল৷ ঠিক সেই সঙ্গে পুতুলটার মাথাও নড়ল। বুঝতে পারল পুতুলটার ভেতর ক্যামেরা আছে। এর আগেও সে ঘরের নানা কোণ থেকে এমন ক্যামেরা উদ্ধার করেছে। হঠাৎ ইমামার ঠোঁটের কোণে বাঁকা একটি হাসি ফুটল। ডোলা ডালা টাউজার আর হুডি পরে সে জিমে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। অনেকদিন হয়ে গেছে জিমে যাওয়া হয়নি। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে তার চিন্তায় হঠাৎ খানিকটা পরিবর্তন আসে।
‘ইমামা কেবিনেট থেকে কিছু জামা বের করে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর বের হয়ে এলো। কিন্তু এবার পোশাকে বিরাট পার্থক্য। ঢিলে ঢালা টাইজারের পরিবর্তে এবার নিচে পড়েছে চামড়ার সঙ্গে সিটকে থাকা টাইট ও স্ট্রেচি লেগিংস, উপরে ট্যাং টপ। শরীরের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি একদম স্পষ্ট। কোমড় ছাপানো লাল চুলগুলো চুড়ো করে বাঁধা।ফলে উন্মুক্ত হয়ে গেছে কাঁধ, গলা, ঘাড়। ইমামা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্যামেরার সামনে দিয়ে হেঁটে শর্টস পরতে থাকে। ওকে এভাবে অশালীন পোশাকে দেখে ওপাশের মানুষটার হিংস্র গর্জন দেয়ালের প্রতিটি কোণে বারি খেতে থাকে।
“রেড, নো। আই সেইড নো…
Born to be villains part 13
‘ইমামা উঠে দাঁড়াল। ক্যামেরার সামনে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,”মাই লাইফ, মাই রুলস।”
‘বলে হাতে একটা জ্যাকেট নিয়ে বেরিয়ে গেল। তারপর কিছুক্ষণ নিরবতা। শুধু শোনা যায় গরম নিঃশ্বাসের শব্দ। অতঃপর পুরুষালি হাস্কি স্বর:
“ইয়্যু আর হটার দেন আই ইমাজিনড… আও্যার মিটিং উইল বি অ্যামেজিং, মাই ফাকিং ডার্ক রেড।”
