Born to be villains part 14 (2)
মিথুবুড়ি
‘ভিড় আর কোলাহলের ভিড়ে দমবন্ধ লাগে যে মানুষটির, সেই ইমান ওয়াসিম নিজের স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তুলেছেন শহর থেকে অনেকটা দূরে, এক নির্জন ঢালু অঞ্চলে। এলিট জীবনের চাকচিক্য পিছনে ফেলে চাঁদনী আকাশের নরম আলোয় দাঁড়িয়ে আছে ওয়াসিম ভিলা।
‘সন্ধ্যার শীতল বাতাসে ভর করে নেমে আসছে ডিসেম্বরের কাঁপুনি। চারদিকের হিমেলতা যেন নিঃশব্দে গায়ে জড়িয়ে ধরছে ইমামাকে। পরণের জ্যাকেটের চেইন টেনে গেইট পেরোয় সে। গাড়ি নেয়নি সাথে। ওয়াসিম ভিলা থেকে জিমের পথটা ঢালু হলেও খুব বেশি দূরত্ব নয়। ঢাল বেয়ে নিচে নামলেই সরু রাস্তা। আর তার ঠিক অপর পাশে জিমের উঁচু কাচঘেরা ভবন। ইমন সাথে আসতে চাইছিল। কিন্তু ইমামা রাজি হয়নি। পর অবচেতন মন বলছে আজ কিছু হতে যাচ্ছে।
‘রাস্তার দুইধারে দাঁড়িয়ে থাকা ঘনসবুজ গাছগুলো জঙ্গলের মতো নিস্পন্দ। দু’কদম এগোতেই হঠাৎ পুরো পরিবেশে ঘনকালো আঁধার নেমে এল। একসঙ্গে নিভে গেল রাস্তার পাশের সব আলো। ইমামা চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন তাকিয়ে দেখল ওয়াসিম ভিলাও ডুবে আছে একই অস্বাভাবিক অন্ধকারে। ও ভাবল হয়তো বিদ্যুৎ বিভ্রাট। যদিও এমনটা বছরে একবারও ঘটে না।
‘তবুও সে হাঁটা থামাল না। চাঁদের স্বচ্ছ আলো পথ চিনতে যথেষ্ট ছিল। ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালানোর প্রয়োজনও হয়নি। অথচ তার করুচিপূর্ণ পোশাকের আড়ালে থাকা প্রতিটি অঙ্গরেখাকে শহরের কদর্য চোখ থেকে রক্ষা করতে সমগ্র শহরের বিদ্যুৎ সংযোগ জোরপূর্বক ছিন্ন করে দেওয়া হলো, নির্বোধ সে তা জানতেই পারল না তার নিরাপত্তার বিনিময়ে আলোহীন এক নগরী ঢেকে গেল গভীর অন্ধকারে।
‘ইমামা হাঁটতে হাঁটতে ফিরে গেল সেদিনের সেই বিচিত্র মুহূর্তে। যেদিন তার অবচেতন মনই তাকে জানিয়ে দিয়েছিল লোকটা তার ফোন হ্যাক করেছে। প্রথমে বিক্ষিপ্ত রাগে একের পর এক কল করছিল সে। কিন্তু কেউ ফোন তোলে না, রিভিউও করে না। ধীরে ধীরে ইমামার ভেতরে জমতে থাকা রাগ আগুনের মতো ফেটে উঠছিল। কয়েকবার মনে হয়েছিল ফোনটাই ছুড়ে ভেঙে ফেলবে। কিন্তু পরক্ষণেই মাথায় এসে যায় যে একবার হ্যাক করতে পেরেছে, সে চাইলে বারবারই করবে।
‘ঠিক তখনই হঠাৎ তার খোলা জানালার ফ্রেমে চারটে হাত একসাথে ভেসে উঠল। ভয়ে শরীরের রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল ইমামার। হাত ফসকে ফোন মেঝেতে পড়ল। কিন্তু পরের সেকেন্ডেই আতঙ্কের জায়গায় আসে বিস্ময়। জানালার ওপাশ থেকে উঁকি দিচ্ছে দুই পরিচিত মুখ। ইবরাত আর হিয়া। মই বেয়ে উঠে আসা সেই দু’জন এক লাফে রুমে ঢুকে ইমামাকে জড়িয়ে ধরল। হিয়া ইবরাতের মতোই কেঁদে কেঁদে নিজের ভুল স্বীকার করল, ক্ষমা চাইতে লাগল। ইবরাত মাথা নিচু করে চুপ ছিল। হতবিহ্বল ইমামা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। তবে এটা স্পষ্ট ওদের এই হঠাৎ আচরণের পেছনে অদৃশ্য কারিগর সেই লোকটাই। সেটা তখনও তার অজানা।
‘বিহ্বল ইমামা তখন নিজেও নিজের আবেগ সামলাতে পারেনি। হঠাৎ করেই ওদের জাপ্টে ধরে কেঁদে উঠেছিল। তিনজনের কান্নাকাটির সেই ছোট্ট ঝড় থেমে গেলে ইবরাত আর হিয়া হঠাৎ জানাল আজ রাতে তারা লং ড্রাইভে বের হবে। ইমামা তড়িঘড়ি করে আপত্তি জানাল। যদিও মধ্যে রজনীতে খোলা আকাশের নিচে, বন্ধুদের সাথে লং ড্রাইভে যাওয়ার ইচ্ছে তার বহুদিনের। তবে বাবার কঠোরতা আর মায়ের কর্কশ আচরণের কাছে কখনোই সে কথা মুখ ফুটে বলতে পারেনি। ইচ্ছে ছিল, তবে সাহস ছিল না।
‘তবে তার সেই ইচ্ছে পূরণ হয় সে রাতে। সে রাতে আর কেউ তার নিষেধাজ্ঞা শুনেনি। তার নিষেধ যেন ওদের কানেই পৌঁছায়নি। জোর করে হাত ধরে মই দিয়ে সাবধানে নিচে নামিয়ে আনে ওরা। গার্ডগুলো ইমান ওয়াসিমের নিয়ন্ত্রণে ছিল না বিধায় কেউ ওদের দেখেও কিছু বলেনি। সেদিন যেভাবে ইমামা চুপিসারে বের হয়েছিল, ঠিক একইভাবে বের হল তিনজন। আর আশ্চর্যের বিষয় হুবহু সেই জায়গাতেই, একইভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সেই কালো গাড়িটা।
‘বন্দিত্বের বুক ফুঁড়ে যখন নিজের বহুদিনের অব্যক্ত ইচ্ছে হঠাৎ বাস্তব হয়ে উঠল, তখন আর নিজেকে থামাতে পারেনি ইমামা। গাড়িটাকে দূর থেকে দেখেই চিৎকার করতে করতে ছুটে যায় সে। সেদিন ড্রাইভটা করেছে ইমামা নিজ হাতে। রাত চারটার পর তারা ফিরেছিল। সেই অবিস্মরণীয় রাত ইমামা কখনোই ভুলবে না।
‘সেদিন পৃথিবীর সব শেকল খুলে গিয়েছিল। কোনো গার্ড ছিল না, কোনো বাঁধা ছিল না, কোনো নিয়মের শীতল শাসন ছিল না। তিন বান্ধবী ঠিক যেন রাতের আকাশে মুক্তি পাওয়া হালকা, উচ্ছ্বসিত, স্বাধীন তিনটি পাখি। তারা রাস্তায় নেচেছে, উচ্চস্বরে গেয়েছে, হাসির ঢেউয়ে কাঁপিয়েছে নির্জন রাতকে। মাঝরাস্তায় হুট করে থেমে গেছে গাড়ি। তারপর তিনজনই ছুটে নেমে পড়েছে টলমলে অন্ধকারের ওপর। কেউ মাথা রেখে শুয়ে থেকেছে ঠাণ্ডা রাস্তায়, কেউ হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চেয়েছে তারাভরা আকাশকে। টংয়ের দোকানের হলুদ আলোয় বাষ্প ওঠা রং চায়ের স্বাদে ছিল বুনো স্বাধীনতার গন্ধ। আর তাদের এই উন্মুক্ত উড়াল পাহারা দিচ্ছিল সেই ঈগল। গাড়ির চাকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডানা ঝাপটাচ্ছিল সে তীক্ষ্ণ এক রক্ষক হয়ে।
‘আর ঠিক এভাবেই শেষ রাতের ঘন আঁধারের সঙ্গে গলে মিলিয়ে গিয়েছিল ইমামার জমে থাকা সব রাগ। লোকটাকে তো আর সে শুধু শুধুই ঝোপের আড়ালের ধুরন্ধর বাঘ বলে না। সেদিন বাড়ি ফিরেও ইমামা কিছুতেই ঘুমোতে পারেনি। আনন্দের ঢেউ তখনও তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। বন্ধুদের উচ্ছ্বসিত হাসি কানে বাজছিল, আর চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল তার হাসিমাখা মুখ। যেটা সে গত কয়েক বছরে দেখেনি।
‘চুপচাপ শুয়ে থেকে শুরু থেকে সবটা ভাবছিল ইমামা। অনেক ভাবার পর একটা সময় হঠাৎই বুঝতে পারল এলোমেলো হয়ে যাওয়া জীবনটা যেন নিঃশব্দে গুছিয়ে উঠছে। মনে হচ্ছিল আড়াল থেকে কেউ দৃঢ় হাতে তার ছড়িয়ে থাকা সবকিছু ঠিকঠাক সাজিয়ে দিচ্ছে।
‘কেউ একসময় বলেছিল,
“দুনিয়ার সবাই আপনাকে ভাঙতে চাইবে, আমি একা আপনাকে গড়ে তুলব।”
‘হ্যাঁ, লোকটা এখন ঠিক সেই কথাটাই সত্যি করে দেখাচ্ছে। দূরে থেকেও সে ইমামাকে ভালোবাসার এমন কোমল অনুভবে ঢেকে রাখছে, যা থেকে ইমামা নিজেকে সরাতে পারে না। একসময় যার কথা তাকে শুধু বিভ্রান্ত করত, বদমেজাজী মনে হতো—আজ মনে হচ্ছে লোকটা সত্যি। তার ভালোবাসার ভেতরেও আছে এক অদ্ভুত জাদু। আর সেই জাদুর উৎস একটাই, তাকে গুছিয়ে দেওয়া, তাকে ভালো লাগা। আর কোনো দ্বন্দ্ব নয়। এবার স্পষ্ট তার উদ্দেশ্য ভালো।
‘একসময় যে অচেনা নম্বরের কল আর হুমকি তাকে কুরে কুরে খেতো, এখন সেসব আর আসে না। যে মায়ের কর্কশ শব্দে তার বুক হুহু করে উঠত, কান্না চেপে রাখতে রাখতে গলা শুকিয়ে যেত; তবুও সে বেহায়ার মতো একটু আদরের আশায় মায়ের কাছে ছুটে যেত। কিন্তু এখন আর যেতে হয় না। এখন আর সে আদরের সামান্য টুকরোর জন্য তৃষ্ণার্ত থাকে না। এখন তার মনে হয় সারাক্ষণ কেউ তাকে নরম, অদৃশ্য স্নেহে আচ্ছন্ন করে রাখছে। একটা সময় যে বন্ধুরা ভুল বুঝে দূরে সরে গিয়েছিল, তারা ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। স্বল্পভাষী ইমামার আর একা লাগে না। তার মনে হয়, সারাক্ষণ কেউ তার পাশে হাঁটে। তার নিঃশ্বাসের ফাঁকে ফাঁকে কেউ আছে নীরবে। তার একাকী জীবনের সঙ্গী হয়েছে মায়া, আর……
‘সে এখন আর কাঁদতে পারে না। কাঁদতে দেওয়া হয় না তাকে। তার মনে হয় তার চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু ঝরলেই কারোর বুকের ভেতর তীব্র ঝড় উঠে। কারোর মাথায় আগুন চেপে বসে। এখন সে স্বাধীনভাবে হাঁটতে পারে। রাস্তায় কেউ আর তাকে বাঁকা চোখে মাপে না। গায়ের ওপর অবাঞ্ছিত স্পর্শের ছায়া নামে না। সে প্রথমবারের মতো নিজেকে এতোটা নিরাপদ মনে করছে। কারণ কেউ একজন দূর থেকে পাহারা দেয় তাকে অদৃশ্য ঢাল হয়ে।এখন তার জীবনে এমন একজন মানুষ আছে, যাকে সে যেকোনো সময় কাছে পায়। তাদের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব থাকলেও মানুষটা তাকে প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করায়,
সে আছে। পাশেই আছে।
‘লোকটা জাদুঘর। সত্যিই জাদুঘর। কাকে কীভাবে কাবু করতে হয়, কীভাবে হৃদয়ের গভীরতম জায়গায় নরম করে আঘাত করতে হয়, তা সে নিখুঁতভাবে জানে। রাগ গলে গিয়ে ভোরবেলা ইমামা তাকে কল করেছিল। ধীর কণ্ঠে শুধু একটাই প্রশ্ন করেছিল,
“আমি কি সত্যিই এত ভালোবাসার যোগ্য?”
‘ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর খুব স্থির, গভীর সুরে উত্তর এলো,
“ভালোবাসা অদ্ভুত এক জিনিস। যাকে দেয়, সবটা দেয়। আবার কারো কাছ থেকে কেড়ে নেয় সবটা। আপনাকে আমি সবটা দিতে প্রস্তুত, এলিজান।”
‘সেদিনের সেই অমলিন ক্ষণ,অমৃত স্মৃতি আর গুরুগম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠের বিমুগ্ধ সে বাক্য আজও শ্রুতির কিনারায় গভীর মন্ত্রোচ্চারণের মতো প্রতিধ্বনি তোলে৷ রূপলাবণ্যে মত্তা নারীর পাথর-ঢাকা কোমল মুখশ্রীতে ফুটে ওঠে নরম দীপ্তি। রক্তাভ আদুরে ঠোঁটের এক কোণ ঢলে পড়ল শিরশিরে অনুভূতির তাড়নায়। ইমামা এখন অনুভব করছে, গভীরভাবে অনুভব করছে অন্ধকারের কিনারায় দাঁড়ানো সেই অচেনা পুরুষটিকে। সে নত স্বীকার করছে ভালোবাসার কাছে। সবশেষে সে-ও ভালোবেসে ফেলেছে তাকে। তো যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে নিশ্চয়ই একটু বাজিয়ে দেখাও যায়, তাই না? সুতরাং আজ দেখা যাক তার জেলাসি লেভেল!
‘ইমামা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ খেয়াল করল তার বরাবর একটা মানব ছায়া হাঁটছে তার সাথে। তৎক্ষনাৎ সর্তক হল সে। সচকিত চোখের মনিযুগল ঘুরিয়ে মন্থর গতিতে গ্রীবা বাঁকিয়ে পাশে তাকায় সে। সেই মুহুর্তে ওর নিশ্বাস আঁটকে ছিল বুকের ভেতর। তবে সেখানে কোনো ভয় ছিল না। ছিল হৃদয়ের দোলাচাল। মনমঞ্জিল থেকে আভাস আসছিল হয়তো সে হবে! সেই লোকটা নিশ্চয়ই আজ সামনে আসবে। এসে কঠিন গলায় শাসিয়ে বলবে,”আই ইয়্যু আউট অব ইয়্যুর মাইন্ড?” তারপর তীব্র অধিকারসুলভ নিজের গায়ে চাপানো কালো ওভারকোট দিয়ে তাকে ঢেকে দিবে। অতঃপর দৃঢ়বদ্ধ বেষ্টনে চেপে ধরে সকল অশুভ দৃষ্টি থেকে অদৃশ্য করে ফেলবে৷
‘কিন্তু না,অপ্রকাশ্য রহস্যে ঢেকে থাকা মানুষটি আজও আসেনি রমণীর শুষ্ক হৃদয় প্রেমোবর্ষণের বানভাসি জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সে হলো বাতাসের মতো। শরীর ছুঁয়ে দেয়, অস্তিত্ব টের পাইয়ে দেয়৷ তবু ধরতে গেলে আঙুল ফাঁকি দিয়ে মিলিয়ে যায়। সে থাকে, কিন্তু ছোঁয়া যায় না; শুধু অনুভবের নিঃশব্দ স্পর্শে বেঁচে থাকে।
‘ইমামা আলগোছে ভারি শ্বাস ফেলে সর্দপনে প্রশ্ন ছুঁড়ে,”আপনার নাম যেন কী?”
‘ইমামা ছিল রাস্তার ডান পাশে। আর ছায়া মানব ছিল বামে।তাও রাস্তা ছাড়িয়ে গাছের সরু লাইন ধরে সরু দীর্ঘ পদযুগল ধীর কদমে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিল। ছায়ায় মোড়া সেই নীরব মানব হয়তো ভাবেনি এতো সহজে ধরা পড়ে যাবে। আর ধরা পড়ে গেলেও যে চিৎকার চেঁচামেচির পরিবর্তে সপাটে এমন প্রশ্ন তেড়ে আসবে, তা যে ছিল কল্পনীয় সেটা তার ভেবাচেকা খাওয়া অভিব্যক্তিতে ফুটে ওঠে। মেয়েটা যে খুব চালাক সেটা সে এতোদিনে বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু সবসময় বসের দেওয়া সর্তকবাণী— ‘ওর থেকে সাবধানে থাকবে অলওয়েজ। ’শি ইজ স্লাই, সলিড অ্যান্ড ইম্পসিব্ল টু ফুল’ এর যথাযথ কারণ খুঁজে পেল।
‘সামান্য গলা খাঁকারির শব্দ শোনা গেল। তারপর বাতাসে মিশে এল বেগবান কণ্ঠের নিচু স্বর,
“নিকোলাস। নোন অ্যাজ ন্যাসো।”
“ওই-যে আরেকজন ছিল, মোটা করে…… তার নাম?”
‘গুদামের বস্তার মতো দেখতে সুস্বাস্থ্যবান আর অমাবস্যার অন্ধকারে ঢাকা লোকটাকে সরাসরি ‘কালো’ বলতে পারছিল না ইমামা। ওর ইতস্তত ভাব বুঝতে পেরে ন্যাসো নিজে থেকেই বলল,
“ওর নাম লুকাস।”
“ওটাকে কোন দেশ থেকে আমদানি করেছে আপনার বস?”
“লোকা আফ্রিকান।”
“ওহ, আই সি।”
‘আবার নিস্তব্ধতা। ন্যাসো যান্ত্রিক ভঙ্গিতে উত্তর দিয়ে এমনভাবে চুপ করে গেল যেন তার অস্তিত্বই নেই এখানে। ইমামা শেষমেশ নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করল,
“তা আজ আপনার বস কেন পাঠিয়েছে আপনাকে?”
‘সেই একই ঠান্ডা, রোবটিক স্বর,”আপনাকে নজরে রাখার জন্য।”
“কিন্তু আপনি তো চোখ বন্ধ করে হাঁটছেন।”
‘কথা শেষ হতেই সামনের ছোট্ট গর্তে হুড়মুড় করে পড়ে গেল ন্যাসো। বসের কমান্ড ফলো করতে গিয়ে এভাবে এক মেয়ের সামনে লজ্জায় পড়তে হবে এটা বোধহয় তার ক্যালকুলেশনে ছিল না। মৃদু শব্দ করে উঠে ন্যাসো। কিন্তু ইমামার হাসির শব্দ শুনে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। শরীর ঝেড়ে শুকনো পাতা আর মাটি ফেলতে লাগল তড়িঘড়ি।
‘নিজেকে ঠিক করতে করতে ইতস্তত কণ্ঠে বলল,”স্যরি,, বাট আই লাভ মাই ব্রাউন আইস।”
‘ইমামা হাসি গুটিয়ে নিল। নিজের মতো হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“আমার একটা কাজ করবেন?”
‘আবার সেই রোবটিক কণ্ঠ,”অফর্কোস, ম্যাম।”
“আজ আপনাকে আপনার বসকে মিথ্যা বলতে হবে।”
“স্যরি ম্যাম।”
“আচ্ছা, দু’টো।”
“স্যরি ম্যাম।”
“আচ্ছা একটা?”
“নো ম্যাম।”
“প্লিজ?”
“স্যরি ম্যাম।”
‘ইমামা বিরক্তও হলো, “আচ্ছা, তাহলে বলুন আজ আপনাকে ঠিক কোন কাজে পাঠানো হয়েছে?”
‘ন্যাসো এবার একদম যন্ত্রের মতো বলল,”পুরো শহর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। তাই বস আপনাকে দেখতে পারছে না। আমার ডান কাঁধে ক্যামেরা আছে। আপনি রেকর্ড হচ্ছেন, ম্যাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফুটেজ বসের কাছে পৌঁছে যাবে।”
‘ইমামা মনে মনে মুখ বাঁকাল। দরদী ভালোবাসা এমন উথলে উঠেছে যে এক মুহূর্তও চোখের সামনে না দেখলে চলে না। অথচ কাছে আসতে পারে না। যত্তসব নাটক!
‘কিছুক্ষণ চিন্তা করে ইমামা ধীর গলায় জিগ্যেস করল,”তা আপনার বস কি বলেছে জানা যাবে?”
“বলেছে—শহরের বুকে হেঁটে যাচ্ছে তার ব্যক্তিগত নারী। যাকে দেখার এখতিয়ার রয়েছে শুধুমাত্র তার। তিনি ছাড়া সকল পুরুষের জন্য আপনি হারাম।”
‘ইমামা জিমে পা রাখতেই দু’টি অদ্ভুত ঘটনা একসাথে ঘটল।প্রথমত, তার প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এলো বিদ্যুৎ।টিমটিম করে জ্বলে উঠল সব লাইট, সচল হলো সব ক্যামেরা। দ্বিতীয়ত, গোটা জিম অস্বাভাবিকভাবে ফাঁকা। কাকপক্ষীও নেই।৷ শহরের এমন নামকরা জিম হঠাৎ এত নির্জন বিষয়টা কোনোভাবেই হজম করতে পারল না ইমামা। আর যদি আজ সত্যিই অফ-ডে হতো, তাহলে গেট তার জন্য খোলা থাকত না নিশ্চয়ই!
‘প্রশ্নগুলোর ভিড়ের মাঝেই ইমামা ঠোঁট অদ্ভুতভাবে তুষ্ট হেসে উঠল। ধীর হেসে গা জ্যাকেট খুলে এক পাশে রাখল। তারপর কানে এয়ারপিচ লাগিয়ে ট্রেডমিলের ওপর দাঁড়িয়ে দৌড়াতে শুরু করল।
‘ওদিকে মনিটরিং রুমে চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করে বসল একজন। তার সামনের বিশাল স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে ইমামাকে। তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। তবে এই সিগারেটের থেকেও বেশি পোড়ায় সামনের মেয়েটির। মেয়েটার সৌন্দর্য তার ইস্পাতের মতো ধারালো নিয়ন্ত্রণে কম্পন তোলার জন্য যথেষ্ট। ডিসেম্বরের ঠান্ডায়ও উত্তাপ ছড়ানো রমণীর শরীরের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে গরম নিঃশ্বাস বের হয় তার ভেতর থেকে। গলার টাই টেনে খুলে ফেলল সে।
‘তবে হঠাৎ ফায়ার স্প্রিংকলার থেকে টুপটাপ তরল ঝরতে শুরু করল। শুধুমাত্র ইমামা দাঁড়িয়ে থাকা কর্ণারটি বাদে। কপাল কুঁচকে পায়ের গতি থামিয়ে স্থির হয়ে গেল ইমামা। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ক্যামেরার দিকে তাকাতেই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল রিচার্ডের অধরকোণে। মুহূর্তেই সে হাতে থাকা সিগারেটের শলা ছুঁড়ে ফেলল। ঠিক তখনই বাংলাদেশের নামকরা সেই জিমের কাঁচ ভেদ করে জ্বলন্ত একটি সিগারেটের শলা ভিতরে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আগুন দাউ দাউ করে উঠল। দূর থেকে ছায়ামুখো কাউকে দৌড়ে পালাতে দেখা গেল।
‘আগুন দেখামাত্র শিরদাঁড়া বেয়ে শীত নেমে গেল ইমামার। ঠিক সেই মুহূর্তে আগুনের লালাভ আলোয় থরথর করে ওঠা জিমজুড়ে বজ্রকণ্ঠের মতো গর্জে উঠল কেউ,
“এই আল্লাহ বান্দি এই, শুনে রাখ—ইয়্যুর লাইফ, মাই রুলস, ওকে ডার্লিং? অ্যান্ড ইফ আই সে নো… দ্যান নো মিনস ফাকিং নো, গট ইট মাই ফাকিং ডার্ক রেড?”
‘আগুন দেখে যতটা না ভয় পেয়েছিল, তার চেয়েও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে দিল স্পিকারের মধ্য দিয়ে ভেসে আসা হুংকার। ইমামা পিছাতে গিয়ে ছিটকে পড়ে গেল। আগুন ক্রমশ তার দিকে তেড়ে আসছে। ভয়ে এককোণে গুটিয়ে বসল ও। জবুথবু হয়ে কাপছে পুরো শরীর। ও ভেবেছিল কিছু একটা ঘটবে, কিন্তু এতো ভয়ংকর হবে সেটা কল্পনাও করতে পারেনি। হঠাৎ ধোঁয়া আর অগ্নির মধ্যেই যে তখনকার নিস্তব্ধতার ভেতরে লুকানো বিশাল ঝড়ের আভাস ছিল, তার নিম্ন মস্তিষ্ক সেটা এখন ধরতে সক্ষম হয়।
‘ইমামা কাঁপতে কাঁপাতে বলে,”আপনি কি আমাকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে চাইছেন?”
‘প্রত্যুত্তরের পরিবর্তে আসে বিদঘুটে হাসির ঝংকার। আগুন এখনও ওর থেকে অনেকটা দূরে থাকলেও তাপ ওর নরম চামড়া ছুঁয়ে দিচ্ছে। দিশেহারা সে এদিক-সেদিক তাকায়। কিন্তু না…কেউ নেই।
‘ইমামার চোখে ভয়। ও কাঁপা কাঁপা গলায় আবার বলে,”আপনি না আমাকে ভালোবাসেন?”
‘দাঁতে দাঁত পিষার ফলে যে ঘর্ষণ তৈরি হয়, সে ঘর্ষণের সাথে এলো জবাব,”দ্যাটস ফাকিং ট্রু। ইফ ইট’স কম টু মাই ইগো
দেন দ্য হোল গেম বিকাম ওয়ান সাইডেড। যেটা আমার, সেটা শুধুই আমার। আমার দেখার জিনিস শুধু আমিই দেখবো।”
‘বিশাল এক শব্দ ধ্বনিতে ভেসে উঠল। হয়তো পাশের কর্ণারে কিছু ব্লাস্ট হয়েছে। আগুনের উত্তাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে। শরীরের মাংস যেন এবার গলে পড়বে। ইমামা পিছতে পিছতে কাঁচের পাশে গিয়ে ঠেকল। যত পিছায়, আগুন ততই তাড়াহুড়ো করে এগোয়। ওর কোনো অনুরোধ, আর্তনাদ হৃদযন্ত্রহীন পাষাণ লোকটির কানেও লাগে না। চোখের এক ফোঁটা অশ্রুও তার পাথরের মতো শক্ত বুকে কোনো দাগ কাটতে পারে না।
‘একটা সময় ইমামা রাগে ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,”ভেবেছিলাম আপনার প্রেমে পড়বো। অলমোস্ট পড়েও গিয়েছিলাম। কিন্তু না…আই ওয়াজ আ ফাকিং ফুল। আপনারে মতো শয়তানের সাথে প্রেম হয়না। হার্টলেস কোথাকার।”
“উফফস, এলিজান…প্রেমে আপনি তো পড়বেনই, সাথে আপনার বাবাও পড়বে, মিস বিউটিফুল।”
‘ইমামা চমকে ওঠে। ভুরু কুঁচকে ওঠে,”বাবা পড়বে মানে! আপনি গে?”
“হোয়াট রাবিশ।”
“ছিঃ।”
“শাটআপ।”
“আপনি গে৷”
“জাস্ট ফাক অফ।”
“না আপনি গে।”
“ফালতু কথাবার্তা।” চিড়বিড় করে সে৷
“তাহলে প্রমাণ দিন আপনি গে না!”
“কী প্রমাণ।”
“এক্ষুণি আগুন নেবানোর ব্যবস্থা করুন।”
“এই প্রমাণ তো এভাবে দেয় না, বেইব। এই প্রমাণ দিবে আমার চাঁদ।”
‘কাঁপতে থাকা ইমামা ভড়কে গেল,”চাঁদ?”
‘হিসহিসিয়ে বলল সে,”ইয়ের বেইব। ইয়্যুর প্রাইভেট প্রপার্টি।”
“আমি আগুনে পুড়ে যাচ্ছি আর এদিকে মস্করা হচ্ছে? জানোয়ার…আমি শুধু আজ বেঁচে ফিরি। ওটার আগে তোকে মারবো। শয়তান।” ইমামার কণ্ঠ কেঁপে উঠছে যন্ত্রণায়।
“বেস্ট অব লাক, সুইটহার্ট।!” নিরুদ্বেগ সে। থরাই কাঁপে না তার স্বর।
‘আগুন এবার ইমামার পা ছুঁয়ে ধরে। সেই দহন সহ্য করতে না পেরে ইমামার চোখ ভেঙে অশ্রু গড়ায়। শরীর জ্বলে যাচ্ছে তার। ও কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে, “আমার শরীর জ্বলে যাচ্ছে!”
‘পাষাণ হৃদয়েও তখনও বিন্দুমাত্র মায়া নেই তার মুখে। বরং তীব্র ক্ষোভে বলে,”কেউ যখন আমার কথা শোনে না… তখন আমার শরীরও এভাবেই জ্বলে রে জান। একদম জ্বলে-পুড়ে ঝলসে যায়।”
‘একটা আগুনের উল্কা এসে পড়ে ইমামার হাতে। বিকট আর্তনাদ ফেটে বেরোয়,”আহহহহহ্!”
“আরও জোরে!”
“ইয়্যু ফাকিং বাস্টার্ড!”
“মোন, বেবি… জাস্ট মোন।”
“আপনার ওপর আল্লাহর গজব পড়ুক… নরখাদক, জানোয়ার, শয়তান, কুত্তা।”
‘সে হেসে ওঠে,”শ্যুড আই সে আমিন?”
“আগুন নেভান… প্লিজ… আমার কষ্ট হচ্ছে।”
“আচ্ছা, আচ্ছা আমি স্যরি বলছি। আমি আর কখনো এমন করবো না… স্যরি… খুব করে স্যরি।”
“তখন কে জানি বলছিল, মাই লাইফ….
“ই..ইয়্যুর রুলস। মা..মা-মাই লাইফ, ইয়্যুর রুলস।”যন্ত্রণায় হাঁপাতে হাঁপাতে অবশেষে জ্ঞান হারায় ইমামা।
“সো সুইট অব ইউ মাই রেড।” এতোক্ষণে তার ঠোঁটের কোণে সন্তুষ্টির হাসি ফুটে ওঠে একটা অদ্ভুত বাঁকা রেখায়। তারপর ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যেই তার এক ইশারাতেই উপর থেকে পানি নেমে আসতে শুরু করে। একজন মেয়ে দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়ে। ইমামাকে তুলে উদ্ধার করা হয় তৎক্ষনাৎ।
Born to be villains part 14
‘ইমামাকে উদ্ধার করা হলে সে উঠে দাঁড়ায়। দু-হাত তখন পকেটে গোঁজা। সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হেঁটে মনিটরিং রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ইমামা এতোক্ষণ শুধু, শুধু তাকে গালা-গাল করছিল। তার উদ্দেশ্য তো ভালো ছিল। নয়তো কি আর তার ঠোঁট থেকে ঝড়ে পড়ে…
“ওমন সুইট ফুলের মতো একটা মেয়েকে ধমক দিয়ে আমি কেন বোঝাতে যাবো, এসব আমার পছন্দ না৷ হাউ লেইম।”
