Home Born to be villains Born to be villains part 5 (2)

Born to be villains part 5 (2)

Born to be villains part 5 (2)
মিথুবুড়ি

“তোর লাশে কসম দোস্ত, খোদার কসম—তোর খুনিকে নিজের হাতে শাস্তি দেব আমি। ইমামা ওয়াসিম, তাকে কষ্ট দেওয়া মানুষগুলোকে ছাড় দেয়না, সেও ছাড় পাবে না।”
‘মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে সোজা হল ইমামা। ভেজা চোখের তাঁরাই দাউদাউ করছে প্রতিশোধের আগুন। সে আলতো করে কারিবের হাতটা রেখে দিল। শেষবারের মতো আরেক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল কারিবের রক্তশূন্য হাতের ওপর। ইমামা বুক ভরে নিশ্বাস টেনে উঠে দাঁড়াল। তারপর আর কারোর দিকে না তাকিয়ে দৌঁড়ে বেরিয়ে গেল।

‘আচড়ে পড়া আতঙ্কে ফর্সা মুখ ফ্যাকাসে রূপ ধারণ করেছে ইতিমধ্যে। খুনসুটি করে উঠে আসা ভয় বাদামী রঙের মনিযুগল গ্রাস করে অসীম অন্ধকার টেনে ধরেছে নিস্পৃহ অক্ষিপটে। ভীতসন্ত্রস্ত হৃৎস্পন্দনে কাঁপছে চোয়ালের মাংসপেশি। অস্থিরচিত্তে পায়চারি করছে লোকটা। ফোনের ওপাশ হতে ভেসে আসছে অবিশ্রাম বন্য হুংকার,
“আমি তো শুধু ভয় দেখাতে বলেছিলাম। ছেলেটা মারা গেল কী করে? হাহ! আই ওয়েইল কিল ইউ। আই সোয়ার, আই ওয়েল বোথ অব ইউ।”
‘কপালের কার্নিশ প্রান্তে সরু পথ তৈরি করে শীতল ঘাম গড়িয়ে পড়ল। লোকটা কাঁপা কাঁপা গলায় কিছু বলার চেষ্টা করল,”ব-ব….
‘তাকে থামিয়ে দিয়ে ধৈর্যচ্যূত কণ্ঠে আবারও ভেসে এলো গর্জন,

“আই ডোন্ট নিড এনি ফাকিং এক্সপ্লেনেশন৷ জাস্ট টেল মি, হোয়াট ডিড হি ডিড উইথ হিম? জাস্ট টেল মি! ছেলেটা মারা কেন গেলে? আমি চাইনি, ওদের ফেন্ডশিপ নষ্ট হোক।আমি শুধু বলেছিলাম, ভয় দেখিয়ে ছেলেটার মাথা থেকে এসব ভূত দূর করার জন্য। দ্যান, হোয়াই শি ইজ ক্রায়িং? জাস্ট টেল মি ড্র্যামেট।”
‘লোকটা আবারও নিজেকে নির্দোষসাবস্ত করার চেষ্টা করল। দৃঢ়তাপূর্ণ কণ্ঠে বলতে চাইল,
“বস, সত্যি বলছি—ও শুধু ভয় দেখিয়েছে। আমি সাথে ছিলাম, ট্রাস্ট মি। ছেলেটা খুব সুন্দর করে মেনেও নিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ এমন কাজ করে বসবে, তা অকল্পনীয়। এমনটা করবে জানলে, আমি সর্বক্ষণ চোখে চোখে রাখতাম।”
‘ভাঙচুরের আওয়াজ ভেসে আসছে ওপাশ থেকে। কাঁচ ভাঙার ক্র্যাচ, ক্র্যাচ শব্দে কপাল খিঁচে কান থেকে ফোন সরিয়ে নিল লোকটা। ওপাশে ধ্বংসাত্মক তান্ডব চালাতে থাকা রক্তপিপাসু চিৎকার করে উঠল,
“ইট’স নট সুইসাইড, ইট’স আ মার্ডার ইউ, ফাকিং ইডিয়ট।”
‘রক্তঝরা ক্রোধে ফুঁসতে থাকা ব্যক্তিটির ঝাঁঝালো কণ্ঠের হুংকারে লোকটার পুরু ভ্রুজোড়া কুঁচকে উঠল। ঘোর বিস্ময় কুয়াশার মতো ঘিরে ধরল চারপাশ থেকে। জাফরনের মতো শোভনীয় উষ্ণ লাজের পেলব মুখে ঘোর দুঃশ্চিতার ছাপ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

“দুইদিন সময় দিলাম। দুইদিনের ভেতর বাস্টার্ড-টাকে আমার চাই৷”
‘ভারি কণ্ঠের শব্দগুলো কর্নগূহরে পৌঁছে দানবীয় তীব্রতা ছড়িয়ে দেওয়ার আগেই কটকট শব্দ তুলে লাইন বিচ্ছিন্ন হল। লোকটার কপালের ভাঁজ আরও গভীর হয়ে উঠল। সে গম্ভীর নিশ্বাস ফেলে পিছন ঘুরতে যাবে, তখনই ছুটে আসা ইমামা অসাবধানতার জন্য ধাক্কা খেল কালো লেদারের জ্যাকেট পরিশেষ লোকটার সুবলিত পুরুষ্টু হাতের সমুখের অংশে। গোধূলি-রঙা চুলগুলো মুখের সামনে থেকে সরিয়ে বেখেয়ালি দ্রুত গতিতে লোকটাকে ‘স্যরি’ বলে ছুটে গেইটের দিকে গেল ইমামা।

‘গ্রীবা সামান্য বাঁকিয়ে দিঘল বিস্ময়ের চাহনিতে লোকটা চেয়ে আছে ইমামার দিকে। ঠিক তখনই ভেতর থেকে উৎকণ্ঠিত মুখে ছুটে এলো ইবরাত। কিন্তু লোকটিকে দেখামাত্রই তার পা হঠাৎ থমকে গেল। চোয়াল অবাক হয়ে ঝুলে পড়ল। অপরিচিতের উচ্চতা আর জিমে গড়া শরীর যেন সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি কাড়ল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সে দেশীয় নয়। গায়ের রঙ গমের মতো চাপা উজ্জ্বল, আর সবচেয়ে দৃষ্টি-নন্দন হলো দু’টি বাদামি চোখ। ইবরাত বেহায়ার মতো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এদিকে লোকটা ফোন কানে নিয়ে সরে গিয়ে সাইডে দাঁড়াল।

‘বিশ্রামহীন ফোনটা বারবার ব্রিপ, ব্রিপ শব্দ করে চলেছে। ইমামা দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির জন্য৷ অথচ কোথাও খালি অটো বা সিএনজি চোখে পড়ছে না। নিজের গাড়ি নিয়েই এসেছিল সে কিন্তু এখন সেটি নিতে গেলে ইমান ওয়াসিম টের পেয়ে যাবে৷ যা সে একদমই চায় না। কারিবের দাফনের কাজে তিনি ব্যস্ত থাকায় হয়তো এখনও বুঝে ওঠেননি যে ইমামা বাইরে বেরিয়ে পড়েছে।
‘বুকের ভেতর অস্থিরতার টিপটিপ শব্দ যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। এমন সময় হঠাৎ একটি গাড়ি এসে থামল তার সামনে। চমকে উঠে ইমামা দেখল প্রফেসর আনাম। গ্লাস নামিয়ে তিনি শান্ত স্বরে বললেন,
“কোথায় যাবে? চল, আমি ড্রপ করে দিচ্ছি।”
‘জড়তা কাজ করলেও ইমামা বেশিক্ষণ ভাবল না। তাকে এখনই অফিসার মাহেশের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সেদিন এত কথা হলেও নাম্বার নেয়া হয়নি, নয়তো ফোনেই সব বলা যেত। কারিবের খুনের বিষয়ে জানানোটাই এখন সবচেয়ে জরুরি। সে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিল, তখনই ফোনটা আবার বেজে উঠল। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তেড়েফুঁড়ে ভেসে এলো হুংকার,

“ডোন্ট গো উইথ হিম! আই সেইড, ডোন্ট গো উইথ হিম!”
‘ইমামা জানে এটা সুরাকার নয়। সুরাকার কখনো ফোন করে না। আর তার শীতল কণ্ঠে এমন ঝাঁঝও নেই। এইমুহূর্তে কিছু বলার অবস্থায় ছিল না ইমামা। ফোন কেটে দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল। অনবরত ঘাম ঝরছে, হাঁপিয়ে উঠছে শরীর। একঝলক ইমামার উৎকণ্ঠিত মুখের দিকে তাকিয়ে প্রফেসর আনাম গাড়ি স্টার্ট দিলেন।
‘সেদিন অফিসার মাহেশ একটি আশ্রমের ঠিকানা দিয়েছিলেন, জানিয়েছিলেন সেখানেই তাকে পাওয়া যাবে। কেন একজন এত বড় অফিসার আশ্রমে থাকেন সে প্রশ্নটা আর করা হয়নি ইমামার৷ ইমামার মাথায় একটাই প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে—কী শত্রুতা তার সঙ্গে সুরাকারের? কেন সে এমন হুমকি দিচ্ছে, যে ইমামার কাছের মানুষদের একে একে কেড়ে নেবে? কেবল তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই কি কারিবের মতো নির্দোষ এক ছেলেকে নির্মমভাবে মেরে ফেলল? কী চাইছে আসলে এই সুরাকার?
‘চিন্তার জালে জড়াজড়ি হয়ে ইমামা এতোটাই গভীরে তলিয়ে গিয়েছিল যে খেয়ালই করল না প্রফেসর আনাম তার দিকে কাতর, নিঃশব্দ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে৷

‘গাড়ি গিয়ে থামল এক আশ্রমের সামনে। ইমামা তাড়াহুড়ো করে নেমে ভেতরে ঢুকে গেল। অফিসার মাহেশের নাম বলতেই জানা গেল তিনি আশ্রমের পিছনের লেকের ধারে মাছ ধরছেন। এই নীরব, একাকিত্বময় জীবনেই মাছ ধরাই তাঁর একমাত্র সঙ্গী। অবসরে তিনি সবসময় এ কাজেই ডুবে থাকেন।
‘ইমামাকে দেখে অফিসার মাহেশ খানিকটা অবাক হলেও কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। ইমামা নিশ্বাস ফেলার ফাঁক না রেখে আজকের সব ঘটনা খুলে বলল, ফোনের মেসেজগুলোও দেখাল। মেসেজগুলো পড়েই অফিসার মাহেশের কপাল কুঁচকে গেল। তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ইমামার ভেতরটাকে কাঁপিয়ে তুলল। ইমামার কণ্ঠ কেঁপে উঠল,
“আপনারও কি মনে হচ্ছে, আমার জন্যই কারিব মারা গেছে?”
‘অফিসার মাহেশ ধীরে বর্শা রেখে ঘাটে বসলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে গম্ভীর গলায় বললেন,
“আপনার কোনো পাস্ট আছে, মিস ইমামা?”
‘ইমামা মাথা নাড়ল, “না।”

“পূর্বে কোনো প্রেমঘটিত সম্পর্ক?”
“না। আমার জীবনের ফার্স্ট লাভ এখনও আসেনি।”
“বিষয়টা খুব অদ্ভুত নয়? আপনার কোনো অতীত নেই, নেই কোনো প্রণয়ঘটিত সম্পর্ক; অথচ দু’জন সাইকো আপনার পিছনে লেগে আছে। আর তারা এতটাই ধূর্ত যে স্পেশাল ফোর্সও তাদের নাগাল পাচ্ছে না, ছুঁতে পারছে না!”
‘ইমামা মাথায় হাত চাপা দিয়ে অফিসার মাহেশের পাশে বসে পড়ল। ক্লান্ত, ভেঙে পড়া সুরে বলল,

“আমি জানি না… আমি সত্যিই কিছু জানি না, অফিসার। শুধু জানি কারিব আত্মহত্যা করেনি। ভয় দেখিয়ে কেউ ওকে মরতে বাধ্য করেছে। আত্মহত্যা করার মতো ছেলে কারিব না। আমি জানি না, কার সাথে আমার এতো বড় শত্রুতা! এটাও জানি না কেন সে এমনটা করছে। আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে অফিসার, সবকিছু।”
‘অফিসার মাহেশ ইমামার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলেন।
“প্রাইভেট নাম্বার দুইটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি; তবু কল-রুটের মাধ্যমে তাদের লোকেশন নিরূপণ করা গেছে। যদিও এটা শুধু একটি ক্লু—এককভাবে তাদের ধরতে পর্যাপ্ত নয়। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী যে সুরাকার—তার লোকেশন বাংলাদেশে, আর অপর নম্বরটির লোকেশন ইতালি দেখায়।”
‘ইমামা চমকে উঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে,”ইতালিতে থাকে?”

‘অফিসার মাহেশ ওপর-নিচ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ইমামা গভীর ভাবনায় ডুবে গিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
“সে যে-ই হোক। আমার মনে হয় না সে আমার ক্ষতি করতে চাইছে। বরং সে এমন কিছু জানে, যা আমি জানি না। আর সেটাই প্রতিবার জানাতে চাইছে আমাকে।”
‘অফিসার মাহেশ উত্তর দিল,”সেটা হয়তো ডিএনএ টেস্ট রিপোর্ট এলে বোঝা যাবে।”
‘ইমামা কপাল কুঁচকে আবার বলল,”কিন্তু যদি আমার ধারণা সত্যি হয়ও, তাহলে তার লাভটা কোথায়?”
‘অফিসার ঠাণ্ডা স্বরে বলল,”আপনার পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়াই হয়তো তার লাভ।”
‘চোখ গেঁথে তাকাল ইমামা,”কিন্তু কেন?”
‘মাহেশ মৃদু হেসে মাথা নেড়েই বললেন,
“ওটা কেবল সেই সাইকোটাই বলতে পারবে।”
“আমরা কি কোনোদিন এই সাইকোদের ধরতে পারব না?” ।

“পারব।”
“হাউ?”
‘মাহেশ ঠোঁটে একচিলতে রহস্যময় হাসি টেনে বললেন,
“আই হ্যাভ আ প্ল্যান।”
‘ইমামা চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে ফিসফিস করল,
“অলসো আই হ্যাভ।”
‘ওরা চোখে-চোখে কথা বলল। তারপর হঠাৎ করেই দু’জনে হেসে উঠল। অফিসার মাহেশ ইমামার আরেকটু কাছে এসে বসলেন। ইমামা ভুরু উঁচিয়ে তার দিকে তাকাতেই, তিনি ভুরু নাচালেন। ইমামা স্বাভাবিক হল। জোরপূর্বক খানিকটা হাসি ফোটানোর চেষ্টা করল ওষ্ঠপুটে। অফিসার মাহেশ নিচু গলায় বললেন,
“আশা করি—দুই ডিলে, দুই পাখি মরবে এবার৷”

‘ইমামার হাসি পেল। তবে সে হাসল না। হঠাৎ গম্ভীর হয়ে জানতে চাইল,
“একজনের ইনফরমেশন চেয়েছিলাম যে, ওই বিষয়ে কিছু জানা গিয়েছে?”
‘অফিসার পানিতে আবারও বর্শা ছুঁড়লেন। অত্যন্ত গুরুতর ভঙ্গিতে মাছ ধরতে, ধরতে নিরেট ঠান্ডা গলায় বললেন,
“সেদিনের পার্টি থেকে কার্যকর কিছুই মেলেনি। ইতালি থেকে আসা ভিআইপি অতিথিদের সবাই ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড জগতের ভয়ংকর সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ নিরাপত্তার আড়ালে তাদের আনা হয়েছিল। অথচ প্রাইভেসির অজুহাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অতিথিদের লিস্ট তো দূরের কথা, সিসিটিভি ফুটেজও আমাদের দেননি। শুধু একবার তদন্তের স্বার্থে দেখতে দেওয়া হয়েছিল। তবু গুপ্তচরদের সূত্রে জানা যায় তারা পরদিন ভোরেই প্রাইভেট জেট করে ইতালি ফিরে গেছে। আর সেই অতিথিদের ভেতরে ছিল ইতালির সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম— ড্রাগন গ্রুপের লিডার। আপনার বর্ণনা ও ফিট অনুযায়ী কেবল তারই বৈশিষ্ট্য মিলে যাচ্ছে।
‘ইমামা চমকে উঠল,”তার নাম?”

“ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই তাকে চেনে আর.কে নামে। আন্ডারগ্রাউন্ডে সে পরিচিত মাফিয়া হিসেবে। তার সাম্রাজ্যে সে ড্রাগন লিডার। আর শত্রুরা তাকে ডাকে ব্লাডিবিস্ট।”
“একজন মানুষের এতোগুলো নাম? তার আসল পরিচয় কী?”
‘অফিসার ঠাণ্ডা হাসল,”ওটা কেবল সে-ই বলতে পারবে।”
“মানে, তার প্রকৃত পরিচয় কেউ জানে না?”
“ঠিক তা নয়। যতটুকু জানার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, ততটুকুই আমরা জানি। যেটা আড়ালে রাখা হয়েছে, সেটা জানতে দেওয়া হয়নি। তাই তার আসল পরিচয়টা আজও অন্ধকারেই রয়ে গেছে।”
‘কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইমামা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“গুগলে? কোনো ছবি নেই?”
‘অফিসার এবার কণ্ঠ নামিয়ে বলল,
“অনলাইনে ছবি কেবল তাদেরই থাকে, যারা নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। কিন্তু সে একেবারেই অদৃশ্য মানুষ। সবাই তার নাম জানে, তার ক্ষমতার গল্প জানে, শত্রুরা তার ভয়ে কাঁপে। কিন্তু বাস্তবে কে সে—তা আজও কেউ জানে না।”
“অদ্ভুত!”

“একদমই নয়। অনেকেই আছেন যারা নিজেকে সামনে আনতে বা জাহির করতে পছন্দ করেন না। একটু খোঁজ নিলেই দেখা যাবে—আজও বহু শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি আছে, যাদের সুনাম ও র‌্যাংকিং বিশ্বমানের কিন্তু মালিকদের ব্যক্তিগত কোনো তথ্য প্রকাশ্যে নেই। একইভাবে আন্ডারগ্রাউন্ড দুনিয়ায়ও অসংখ্য মাফিয়া ডন আছে যাদের নামে শহর কাঁপে, অথচ তাদের মুখ দেখাই যায় না।”
‘ইমামা এবার একেবারেই নিশ্চুপ হয়ে গেল। সবকিছুই আরও বেশি রহস্যে আচ্ছন্ন হয়ে ধোঁয়াটে হয়ে উঠছে ক্রমে। তার ভাবনার সুতো হঠাৎই ছিঁড়ে গেল অফিসারের উচ্ছ্বাসে।বড়সড় এক মাছ ধরা পড়েছে বর্শিতে। মাছটাকে রেখে হাত মুছে অফিসার আকস্মিকভাবে এগিয়ে এল ইমামার দিকে। তারপর হঠাৎ এমন ভঙ্গিতে তাকে জড়িয়ে ধরল, যদিও শরীরে স্পর্শ করল না। তবে এতটাই কাছে এল যাতে করে লেকের অপরপ্রান্তে দেয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ব্ল্যাকমাম্মার লোক কিংবা আশ্রমের পেছনের সিসিটিভি হ্যাক করে ইতালি বসে স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা লোকটা—দু’জনের কাছেই মনে হয় অফিসার সত্যিই ইমামাকে আলিঙ্গন করেছে।

‘ব্ল্যাকমাম্মায় বসে থাকা লোকটার হাতের রগগুলো তীব্র ক্রোধে ফেটে উঠতে লাগল এই দৃষ্টি অবলোকন করে। বাঁ-হাতের পিঠে খচিত ভয়ংকর সাপের ট্যাটুটি যেনো রক্তিম রোষে জীবন্ত হয়ে উঠতে চাইছে। অন্যদিকে স্ক্রিনের ওপাশে ইতালিতে বসে থাকা লোকটার সমুদ্র-নীল চোখ থেকে ঝরে পড়তে লাগল অগ্নিশিখার দহন।
‘ইমামা বিদায় নিয়ে পা বাড়াতেই পিছন থেকে ডাক ভেসে এল,
“হেই, বিউটিফুল।”
‘ইমামা ঘুরে দাঁড়াল। দৃঢ়তাপূর্ণ্য কণ্ঠে বলল,
“ইট’স ইমামা।”
‘অফিসার মাহেশ দাঁত চেপে একচিলতে হাসল। হাসতেই গালের ডিম্পল যেনো সৌন্দর্য বিস্তারের খেলায় মেতে উঠল। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মাথার চুল চুলকাতে, হেসেই বলল,
“উপসসস! স্যরি, ইমামা।”

‘ইমামা ঠান্ডা স্বরে আবারও বলল,”মিস ইমামা। আমরা না বন্ধু, না আত্মীয়।”
‘মাহেশ চোখ টিপে জবাব দিল,”মানে, গার্লফ্রেন্ড–বয়ফ্রেন্ড হওয়ার সুযোগ আছে?”
“শাট দ্য ফাক আপ, অফিসার।”
‘অফিসার আবারও হেসে উঠল। তারপর হঠাৎ গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
“জাস্ট কিডিং। আপনার সেই ফেবারিট রাইটারটা কী যেন নাম?”
“ক্যালভিন কৌহিলু।”
“হ্যাঁ, সি.কে. ওকে নিয়ে কাল একটু রিসার্চ করলাম। দেখলাম, গত দু’বছরে তার একটাও নতুন বই বের হয়নি। অথচ নেটে তার বই নিয়ে তুমুল আলোচনা। পাঠকেরা পাগলের মতো অপেক্ষায়। তবুও তার দেখা নেই। বেস্ট সেলার এওয়ার্ড শো-তেও তাকে দেখা যায়নি। হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে গেল এত বড় লেখক কেমন অদ্ভুত না?”
“হ্যাঁ, বিষয়টা আমাকেও ভাবাচ্ছে।”
“আমাকেও। আচ্ছা, কাল দেখা হচ্ছে তবে।”

‘আশ্রম থেকে বেরিয়ে ইমামা দেখতে পেল প্রফেসর আনান তখনও দাঁড়িয়ে আছে। ইমামাকে দেখামাত্র উনি এগিয়ে এলেন। বললেন,
“ইমামা, লেট মি ড্রপ ইউ।”
‘ইমামা কাঠিন্য সদাতেজি মুখে বলল,
“আই ক্যান ম্যানেজ।”
“হোয়াইট র…..
‘ইমামা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“একজন টিচার আর স্টুডেন্টের মধ্যে যোজন, যোজন দূরত্ব থাকে। আশা রাখছি সেটুকু দুরত্ব আপনি বজায় রাখবেন৷”
‘প্রফেসর আনামের চোখেমুখে ব্যাথা ফুটে উঠল। তিনি
আহত কণ্ঠে বললেন,”আমি তোমাকে ভালোবাসি ইমামা।”
‘ইমামার চোয়াল শক্ত, কণ্ঠে কঠোরতা, “আমি আপনাকে ভালোবাসি না স্যার। বিষয়টা আমি আগেও ক্লিয়ার করেছি৷”

‘প্রফেসরের কণ্ঠে ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। দুচোখ সজল হয়ে আসে।
“আমার মন কেন মানে না ইমামা, বলতে পারবে?”
“যে মন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না, তাকে প্রজ্বলিত করা উচিত। কারণ অনিয়ন্ত্রিত মন নিজেকে ধ্বংস করার আগেই আপনাকেও ভগ্নগোল করতে পারে।”
‘শক্ত গলায় কথাগুলো বলে একটা সিএনজিতে উঠে চলে গেল ইমামা। প্রফেসর আনাম ভেজা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ব্যস্ত রাস্তার দিকে। একফোঁটা গড়িয়ে পড়ল তার চোখ থেকে।

‘ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে রুমে ঢুকল ইমামা। আশ্রম থেকে সে গিয়েছিল কারিবের কবরস্থানে। সেখানেও কেউ তার সঙ্গে কথা বলেনি। ফিরে এসে ফোনটা দেখল৷ না, কোনো নাম্বার থেকে আর কল বা মেসেজ আসেনি। জামাকাপড় হাতে নিয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল সে। এই বাস্তবতার অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এখন তার চাই এক লম্বা ঘুম। আর তার আগে দরকার গোসল।

‘সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইমামা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাদের স্মৃতিমাখা দিনগুলো, কারিবের হাসিমাখা মুখ। এই দুনিয়ায় সময়ের সাথে সাথে গুরুত্ব হারিয়ে যায়। কেউ কারও কাছে আর সেই প্রথম দিনের মতো থাকে না। অথচ ইমামা পেয়েছিল। সাতটা বছর ধরে, প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে সেই নির্দোষ ছেলেটা তাকে প্রথম দিনের মতোই গুরুত্ব দিয়েছিল। অথচ আজ তার কারণেই ছেলেটাকে মরতে হলো।
‘ইমামার হাতে ধরা ছিল ছোট্ট সাদা একটা ফুল। হঠাৎ হাত ফসকে তা বাথটবে পড়ে গেল। মুহূর্তেই ফুলটা গলে গেল পানির সাথে। বিস্ময়ে আঁতকে উঠল ইমামা। দ্রুত ছুটে গিয়ে বারান্দা থেকে আরও দুটো ফুল এনে বাথটবে ফেলল। কিন্তু একই ঘটনা ঘটল৷ ফুলগুলো মুহূর্তেই গলে গেল। বুক কেঁপে উঠল ওর। তবে কি কেউ বাথটবের পানিতে এসিড ঢেলে রেখেছে? অস্থির হাতে ট্যাপ চালিয়ে বাথটবটা ফ্লাশ করে দিল ইমামা। নতুন করে পানি ভরে দেখল এবার আর তেমন কিছু ঘটল না। তবুও তার ভেতরটা কেমন অদ্ভুত অশনি-আশঙ্কায় ভারী হয়ে উঠে।

‘ইমামা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে শাওয়ার নিয়ে রুমে ফিরল। বুকের ভেতরটা এখনও হিম হয়ে আছে। মুখে সিরাম মাখতে যাচ্ছিল,কিন্তু হঠাৎ কী মনে করে একফোঁটা সিরাম বেডশিটের ওপর ফেলল। মুহূর্তেই বেডশিটের কাপড়টা পুড়ে গেল। ধোঁয়া উঠতে লাগল। আঁতকে উঠে হাত কাঁপতে লাগল ওর থরথর করে। শিশিটা হাত থেকে ছিটকে সোফার ওপর পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে সোফার কভারও জ্বলসে গেল।
‘ঠিক তখনই ইমামার ফোন বেজে উঠল। কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সেই ভারি কণ্ঠের ফিসফিস,

Born to be villains part 5

“বলেছিলাম—তুমি মুক্ত, স্বাধীন পাখি। কিন্তু তোমার আকাশ —আমার খাঁচা। মালিকের কথার অবাধ্য হয়ো না সুখপাখি। জ্বলসে যাবে একেবারে। আমি মানুষটা একটুও ভালো নই। আই রিপিট—জ্বলসে যাবে। আমি মানুষের জাতের মধ্যে না পড়লেও, এক কথার মানুষ।”

Born to be villains part 6