Born to be villains part 5
মিথুবুড়ি
‘সরকার বাড়িটা আজ হঠাৎ শোকের আবরণে ঢেকে গেছে। দরজার সামনে দূর্ভেদ্য ভিড়। একঝাঁক অবিশ্বাস্য, হতবিহ্বল দৃষ্টি গিয়ে স্থির হয়েছে বসার ঘরের ঠান্ডা মেঝেতে শুইয়ে রাখা সাদা কাপড়ে ঢাকা মৃতদেহের উপর। কারও মুখে স্তম্ভিত শূন্যতা, কারও চোখে অশ্রু-গঙ্গা। মূর্তির মতো নিশ্চল, নিস্পলক শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা বিমর্ষ মানুষগুলোর ঠোঁট একটু পরপর কেঁপে উঠছে হাহাকারে।
‘এ যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুপুরী। সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো নিস্তেজ দেহখানাকে ঘিরে রয়েছে অজস্র মানুষ, অথচ ঠোঁট কাঁপলেও কারো নিস্তেজ বিমর্ষ মুখ হতে শব্দ বেরোয় না। শুধু মাঝেমধ্যে ভেতর থেকে ভেসে আসছে বুকফাটা কান্নার শব্দ। শোর্কাত মানুষের কোলাহল, বুকফাটা কান্না, হাহাকার, বিলাপ, ক্রন্দন, মাতম, বুক চাপড়ানো, আর্তচিৎকার আর আগরবাতির গা-জ্বালানো বিদঘুটে গন্ধে শোকে গেয়ে উঠেছে সরকার বাড়ি। মনে হচ্ছে পুরো পরিবেশটাই যেন কান্না চেপে ধরে আছে৷
‘প্রচন্ড বেপরোয়া গতিতে দু’টো বাইক আর একটা স্কুটি এসে থামল সরকার বাড়ির প্রধান ফটকে। দামি ব্যান্ডের আকর্ষনীয়, নজরকাড়া মডিফাই করা বাইক টা তুচ্ছ বস্তুর মতো ফেলে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে ভেতরে ছুটে গেল গৌরব আর অর্ক। পিছন, পিছন কান্নাভেজা মুখে ছুটে গেল ইবরাত আর হিয়া। তারা অন্দরে প্রবেশ করতেই আরেকটা দামি গাড়ি এসে থামল ফটকে। ইমান ওয়াসিম বেরিয়ে আসার আগেই ইমামা দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ভেতরে গেল।
‘পাঁচ জোড়া স্তম্ভিত চোখ স্থির হয়ে রইল সেই নিস্তেজ মুখের ওপর। রক্তশূন্য মুখখানি, অথচ ফ্যাকাসে ওষ্ঠে লেগে আছে স্নিগ্ধ এক হাসির আবরণ। মনে হয় অভিমানী কোনো শিশু ঘুমিয়ে আছে। ঘুম ভাঙলেই আবার প্রাণবন্ত হয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করবে। কিন্তু আজ আর সে ওঠে না। পাশে বসে মায়ের বুকভাঙা ক্রন্দন, আকাশবিদারী আর্তনাদ—তাও কি তার কানে পৌঁছায় না? নাকি সে সত্যিই সকলের স্নেহ-ভালোবাসা পেছনে ফেলে চিরদিনের মতো বিদায় নিয়েছে!
‘কারিবের মা হাউমাউ করে কাঁদছেন। তার বড় ভাই মাকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। করিম সরকার স্নেহের ছোট ছেলের এই অকালমৃত্যু মানতে পারেনি। বর্তমানে লাইফ সার্পোটে আছেন চিকিৎসাধীন। কোন এক রক্তপিপাসু যেন একরাতের ব্যবধানে গ্রাস করে নিয়েছে সরকার বাড়ির আঙিনায় ঢেউ খেলানো বিস্তীর্ন হাসির ঢেউ।
‘পাঁচজোড়া পদযুগল যেন জমাট বাঁধা ভারি সীসার মতো আঁটকে গেল সেখানেই। চোখের পাতা নড়ে না। পাঁচজনের মুখেই নিস্তেজ বিমর্ষতা, ঠোঁট কেঁপে উঠল কথা বেরোতে না পেরে। তাঁরা নিস্পলক শূন্য দৃষ্টিতে মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে আছে—যা ছিল তাদের জন্য ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের থেকেও নিষ্ঠুরতম বাস্তবতা। হিয়া ফুঁপিয়ে ওঠে গৌরবের পেশল শক্ত বাহুবেস্টনে মুখ লুকাতে গিয়ে টের পেল পুরুষালী বলিষ্ঠ শরীর টা তীব্র এক ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠেছে। অর্ক তার শরীরের ভার ধরে রাখতে পারল না, পিছিয়ে যেতে নিয়েও আবার সোজা হয়। ইবরাত ধরতে চায় অর্ক, কিন্তু অর্ক দাঁড়ায় না, এগিয়ে যায় কারিবের কাছে। ইবরাত মুখে ওড়না চেপে ঠুকরে উঠল। এ মেয়েটিকে সবাই চিনত তার হাসি আর হাসানোর জন্য। অথচ ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া সেই ছেলে আজ তাকে-ও চোখ ভিজিয়ে কাঁদিয়ে দিয়ে গেল।
‘অর্ক কাছে যেতেই কারিবের লা-শের পাশে বসে থাকা বয়স্ক দু’জন ওঠে সরে গেল। অর্ক পরপর কয়েকবার গরম নিশ্বাস ত্যাগ করে কারিবের পাশে বসল। তারপর ধীরে, ধীরে ঝুঁকল কারিবের মুখের ওপর। আলতো করে হাত রাখল কারিবের গালে, অপর হাতে নিজের হাহাকার করা বুক চেপে ধরল। বরফের মতো ঠান্ডা ছেলেটার গাল, লোহার মতো শক্ত চোয়ালের পেশি। অর্ক ওর গাল চাপড়ে ডাকল,
“কারিব, দোস্ত? এই দোস্ত! তুই এটা কী করলি রে ভাই?”
‘দু’টো কথা বলতে না বলতেই গলা ভিজে আসে অর্কর।
ফিসফিসে কান্নায় হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ল সে,,
“তোর ছোট্ট বুকে এতো কষ্ট জমা ছিল, আমরা টেরও পেলাম না, দোস্ত?”কারিবের চোখ মেলতে চাইল অর্ক,”এই দোস্ত, চোখ খুল বলছি৷ একটু কথা বল দোস্ত। বলনা রে দোস্ত, তোর এতো কীসের কষ্ট ছিল, যা আমরা ভাগাভাগি করে নিতে পারতাম না! এই দোস্ত, এই দোস্ত রে? বল না রে দোস্ত…
‘হঠাৎ করেই অধৈর্য হয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে তেতে উঠল অর্ক,
“আরে এই হারামি, চোখ খুল। পুরো একটা বন্ধুমহলকে কাঁদিয়ে তুই এভাবে চলে যেতে পারিস না। চোখ খুলে দেখ হারামি, সবাই কান্না করছে। আমরা তো একসাথে হাসতাম, তাহলে আজ কেন একা কাঁদতে হচ্ছে? উঠ দোস্ত! প্লিজ দোস্ত—আমরা আজকেও ক্লাস মিস দিয়ে রাইডে যাবো। দোস্ত রে চোখ খুল না। ভাই আমার বোঝার চেষ্টা কর—পোলা মানুষ আমি, তাও সবার সামনে কাঁদছি। মানুষ কী ভাবছে বল তো? আমার খুব লজ্জা লাগছে কারিব। তুই উঠ দোস্ত। সারাজীবন তোরা আমাকে জ্বালিয়ে মেরেছিস, মেনে নিয়েছি। কিন্তু আজ মানব না। আজকে আমার ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে রে দোস্ত। তুই শুধু একটা বার চোখ খুলে দেখ, তোর সব কষ্ট আমি দূর করে দিব। তোর বন্ধুরা তোর জন্য সুখ কিনে আনবে, তুই শুধু একটাবার চোখ খুল, ভাই আমার।”
‘অর্কর চোখের জল থামছেই না, বারবার গাল ভিজে যাচ্ছে। এতোদিনের বন্ধুত্ব—দশটা বছর একসাথে কাটিয়েছে তারা। হেসে খেলে, দুষ্টুমি করে পার করেছে কতগুলো বছর। আজ সেই ছেলেটা এভাবে চলে যাবে! কীভাবে মেনে নেওয়া যায়? অর্ক বারবার চেষ্টা করে কারিবের চোখ খুলতে। কারিবের মা বুক চেপে ধরে আর্তনাদ করে বললেন,
“উঠবে না রে বাবা। আমার বাপ চলে গেছে। চলে গেছে আমার
‘অর্ক অবাক চোখে কারিবের মায়ের দিকে তাকায়। চোখের পাতা কাঁপছে তার। সে আবারও তাকাল কারিবের মুখের দিকে। আরেক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার চোখ থেকে। চারপাশের কান্নার রোল হঠাৎ করেই যেন বেড়ে গেল। কেউ দু’হাত মাথায় রেখে হাহাকার করছে, কেউ চোখ মুছছে বারবার, তবু কান্না থামছে না। আবার কেউ অস্থির ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক হাঁটছে, কেউ হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে নীরবে কাঁদছে, কেউ দু’হাত মাথায় রেখে হাহাকার করছে। শুধু কাঁদছে না ইমামা। সে এখনও স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে আছে কারিবের মুখে। তার দৃষ্টিতে অবিশ্বাস, হতবিহ্বল ভাব। পিপাসার মতো শুকিয়ে যাওয়া চোখে সে শুধু তাকিয়ে থাকে ওই নিষ্প্রাণ মুখের দিকে। অথচ দূর থেকে কেউ একজন মোহাচ্ছন্ন হয়ে, নিগূঢ় দৃষ্টিতে তাকে গিলে খাচ্ছে। প্রফেসর আনাম সকলের চোখ এড়িয়ে, নিস্প্রভ ও দ্বিধাহীন নজর টানছে তার দিকে। চারপাশের সকলে শোকে কাতর হলেও, সে যেন তৃষার্ত। এই শোকাচ্ছন্ন পরিবেশে সকলের ভঙ্গুরতাকে সুযোগ করে নিয়েই সে সিক্ত করছে নিজের খরখরে অন্তঃকরণ
‘গৌরব হিয়ারে ছাড়িয়ে অর্কের পাশে গিয়ে বসল। ও পরপর ঢোক গিলছে অনবরত। এই ছেলেটা বড্ড চঞ্চল। তাকে গম্ভীর হতে খুব কম-ই দেখা যায়। রেলগাড়ীর মতো চলে তার মুখ। অথচ আজ তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। গৌরব নিজের সাথে যুদ্ধ করল। বহু কসরতে শব্দ বের করল। প্রথমেই গমগমে গলায় ডাকল,
“এই নটকির পোলা, অনেক নাটক হয়েছে, উঠ এবার। শ্লা, নাটকের জন্য এবার এওয়ার্ড পাবি তুই।”
‘কিন্তু কারিব উঠে না। সে নিস্তেজ, নিরুত্তাপ। গৌরবের কণ্ঠে রাগ ফুটতে থাকে,
“বাঙ্গির নাতি, নমুনা কর? উঠ বলছি শ্লা, দেখ কতগুলো মানুষ কাঁদছে তোর মতো একটা ‘গুড ফর নাথিং’-এর জন্য। এটা টু মাচ কষ্ট হয়ে যাচ্ছে, শ্লা। আমি এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনবো, এর ভেতর যদি না উঠিস, তোদের খোদার কসম কাটছি, নতুন জুতো করে তোর চাপায় লাগামু আমি।”
‘গৌরব এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনলো। কিন্তু কারিব উঠল না। গৌরব আবারও গুনলো। এবারও কারিব উঠল না। গৌরব যেন কোনো কঠিব বাস্তবতা থেকে পালাতে চাইছে। সে আবারও গুনলো। বারংবারের মতো তাকে নিরাশ করে দিয়ে কারিব এবারও উঠল না। তারপর যা ঘটল, তাতে উপস্থিতি সকলে অতিমাত্রায় বিস্মিত হল। তারা দেখল প্রাপ্তবয়স্ক, দাম্ভিক একজন কীভাবে বন্ধুর বুকের ওপর মুষড়ে পড়ে আহাজারি করে উঠল,
“দোস্ত রে! আমার বন্ধু, আমার ভাই তুই—শেষপর্যন্ত তুই-ও চলে গেলি আমাদের ছেড়ে? আমরা জানতেও পারলাম না তো কষ্টের কথা! এতো বড়ো গ্লানি দিয়ে কেম্নে চলে গেলি রে বন্ধু? তোরে তো কখনও বন্ধুর চোখে দেখিনি, আমার ভাই ছিলি তুই। তুই আর অর্ক ছিলি আমার দু’টো হাত, আমার শক্তি। আমি জানতাম, এই দুনিয়ায় সবাই আমাকে ছেড়ে গেলেও আমার দুইটা ভাই আর দু’টো বোন আছে; যাদের সাথে আমার সম্পর্ক শত্রুর মতো, তবুও তারা বিপদে জান দিয়ে দিবে আমার জন্য। এই অপদার্থ আমি টাকে কখনোই ছেড়ে যাবে না তারা—আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। তুই আমার বিশ্বাসে ক্যান আঘাত করলি ভাই? আজ যে আমার একহাত ভেঙে গেল, দোস্ত। আজ আমি আমার বন্ধু হারায়নি, আমার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। আমি দূর্বল হয়ে গেলাম—আমার খুব কষ্ট হচ্ছে দোস্ত।”
‘থেমে, গৌরব চুমু খেল কারিবের কপালে। বুক ফাঁটা আর্তনাদে গৌরব আরও বলল,
“তুই নেই খবরটার শোনার পর বিশ্বার করতে পারিনি দোস্ত। ছুটে গিয়েছিলাম মন্দিরে। ঈশ্বরের কাছে হাতজোড় করে প্রার্থনা করে এসেছি—এটা যেন স্বপ্ন হয়৷ আমার বন্ধু যে আমার-ই থাকে। কিন্তু এটা তো ভয়ংকর স্বপ্ন। এমন স্বপ্নের মুখোমুখি হতে চাইনি আমি কারিব। এতো ভয়ংকর স্বপ্নের মুখোমুখি ঈশ্বর আমাকে কেন করল,দোস্ত? হে ঈশ্বর ফিরিয়ে দাও আমার বন্ধুকে। এই জীবনে কিচ্ছু চাইনি তোমার কাছে, আজ চাইছি—ফিরিয়ে দাও আমার বন্ধুকে। হয় আমার এতোদিনের প্রার্থনা ফিরিয়ে দাও, নয় আমার বন্ধকে৷”
‘হিয়া ছুটে গিয়ে জাপটে ধরল শোকে উন্মাদ, উন্মত্ত গৌরবকে। হিংসা আর বিষাদে ভরা এই পৃথিবীতে যদি সবচেয়ে স্বচ্ছ আর খাঁটি কিছু থেকে থাকে, তবে তা হলো ছেলেদের বন্ধুত্ব। আজকের এই মুহূর্তে তা আবারও সবার সামনে প্রমাণিত হলো।
‘গৌরবকে থামানো অসম্ভব। তার মস্তিষ্কে ঝড়, সারা দেহে শিহরণ। অর্ক একপাশ থেকে শক্ত করে ধরে রেখেছে তাকে; নিজেও একটু পরপর ফুপিয়ে উঠছে। হঠাৎ গৌরব হঠাৎ ইমামার দিকে আঙুল তুলে তীব্র চিৎকারে ফেটে পড়ল,
“সবকিছুর জন্য তুই দায়ী! তুই ভেঙেছিস আমাদের বন্ধুত্বের আশ্রয়।”
‘ইমামা কেঁপে উঠল। নিশ্বাস আঁটকে যায় তার। অযাচিত ভয়ে কাঁপতে থাকে মাংসপেশি। তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ইবরাত ছুটে গেল। উচ্ছল কিশোরীর মতো চঞ্চল মেয়েটা কারিবের বুকে মাথা রেখে শব্দ করে কেঁদে উঠল,
“কারিব রে, ভাই আমার! এটা তুই কী করলি ভাই? তোর ইমু রে লাগত, আমারে বলতি ভাই। আমি ওর পায়ে পড়তাম, একটু কটু কথা শুনাইতাম। সকলে মিলে ওকে বোঝাতাম। সবার জোড়াজুড়িতে ও নিশ্চয়ই একদিন না একদিন ঠিকই রাজি হতো। কিন্তু তুই এটা কী করলি ভাই? সঙ্গী হারানোর এই নির্মম যন্ত্রণা আমরা কীভাবে বইয়ে বেড়াবো রে, ভাই? তুই তো মরে গিয়েও আমাদের গ্লাণিতে রেখে গেলি। আমাদের সারাজীবন এই গ্লানি বয়ে বেড়াতে হবে—আমরা পারিনি, আমাদের বন্ধুর অনুভূতিকে সম্মান জানাতে, আমরা পারিনি তার অনুভূতির মর্যাদা রাখতে।”
‘থেমে, ঘন নিশ্বাসের সাথে ফুঁপিয়ে ওঠে বলল,
“ভাই-রে উঠে যা। আমাদের আরেকটা বার সুযোগ দে। কথা দিচ্ছি, এবার আর তোকে নিরাশ করব না। দরকার হলে আমরা সকলে ইমামার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিবো। তুই তো জানিসই, ও আমাদের সাথে কথা না বলে থাকতে পারে না; তখন নিশ্চয়ই ও রাজি হতো। তাই না? উঠে যা ভাই। তোকে ছাড়া আমরা খুব অসহায় রে ভাই। একসাথে কত স্বপ্ন বুনেছি আমরা, এবার সব বাস্তবায়নের পালা। ফাইনাল ইয়ারের এক্সাম দিয়েই আমরা মালদ্বীপ ট্যুরে যাবো প্ল্যান করেছিলাম মনে আছে না? তারপর তো সবাই, সবার প্রফেশন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ব, তখন আর তেমন সময় হবে না কারোরই। কিন্তু আমরা তো একে-অপরকে কথা দিয়েছিলাম, যতই ব্যস্ত থাকি, নিজেদের জন্য সময় বের করব। কখনোই এই ফেন্ডশিপ নষ্ট হতে দিব না। তুই তো কথা রাখলি না দোস্ত। তোর কথার তো অনেক দাম, আর সবার মতো তুই না। সবথেকে আলাদা তুই। ম্যাচিউরিটি তো তোর মধ্যে সবার আগে এসেছিল, সেই তুই এতো বোকার মতো কাজ কীভাবে করলি দোস্ত?
ভাই আমার উঠে পড়৷ তুই না থাকলে এই গরুর বাচ্চার হাত থেকে আমাকে কে বাঁচাবে? ওই ফাজিল তো সারাক্ষণ আমার পিছে লাগে। তুই না থাকলে কে আমার সকল ছেলেমানুষী গুলোকে প্রশয় দিবে, বল? কে আমার সকল বাচ্চা, বাচ্চা আবদার পূরণ করবে? বলে দে কে আমাদের মান-অভিমান ভাঙিয়ে, বুঝিয়ে-শুনিয়ে একসাথে আগলে রাখবে সারাজীবন? তুই তো আমাদের ফেন্ডশিপের মূল ছিলি। তোকে ছাড়া আমরা সত্যিই অসম্পূর্ণ। প্লিজ আমাদের ছেড়ে যাস না, দোস্ত।”
‘ইবরাত পাগলের মতো কাঁদছে আর বিলাপ করছে। এদিকে ইমামা স্তব্ধ। গৌরবের বলা কথাটা এখনও বুকে কাঁটার মতো বিঁধে রয়েছে। রাগান্বিত কণ্ঠের সূক্ষ্ণ খোঁচা টা যেন হাওয়ায় ধারালো ছুরির মতো কেটে গেল ভেতরটা। যন্ত্রণা বিবশ হয়ে যাচ্ছে অন্তস্থল। ইমামা ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। সে কাছে যেতেই অর্ক, গৌরব আর ইবরাত সরে যায়। ওরা সরে যেতেই হঠাৎ করে বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল শূন্যতার গর্জনে। ইমামা ভেঙে পড়ল কারিবের পাশে। ফাঁপা দৃষ্টিতে তাকাল কারিবের দিকে। গলার ভেতর দলা পাকানো কান্না গুলো শক্তের ঢোকের মাধ্যমে গিয়ে নিল। অতঃপর, হঠাৎ করেই ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল…
“হাহহাহাহা! চারপাশে কষ্ট, কান্না, আহাজারি। শুধু কাঁদতে পারছি না আমিই। কারণ… কারণ আমি অপরাধী। এই সমাজে আহতের চিকিৎসায় সবাই তৎপর হয়, কিন্তু নিহতের শরীরটাকে অবহেলায়, অবিন্যস্তভাবে এক কোণে ফেলে রাখে। আজ তুই মরে গিয়েও আহত, আর আমি? বেঁচে থেকেও নিহত।”
‘গলা শুকিয়ে আসে তার। ভারী নিঃশ্বাসে ফাঁকে, ফাঁকে বেরোয় আরও কিছু শব্দ,
“তুই আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট করেছিস, আমাকে সকলের চোখে অপরাধী বানিয়েছিস, আমাকে আবারও বন্ধু-হারা করেছিস। যে মানুষগুলো আমাকে কষ্ট দেয়, আমি তাদের চিরকাল ঘৃণা করে এসেছি। কেউ আমাকে আঘাত করবে, এটা আমি কখনও মেনে নিতে পারি না। কিন্তু তুই একসাথে কষ্ট, ঘৃণা, অপমান, অপবাদ—সবই দিয়েছিস। তাও দেখ, তোকে ঘৃণা করতে পারছি না আমি। তোর জন্যই আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে রে কারিব। আমি জানি, আজ আমি শুধু একজনকে না, আমার সবগুলো বন্ধুকে হারিয়ে ফেললাম। তুই কাজটা ঠিক করিসনি, কারিব।”
‘ইমামা ঘন নিশ্বাস ফেলতে শুরু করল। চোখের সামনে ক্রমশ সব ঘোলাটে হয়ে আসছে৷ বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যাথা। ইমামা যথাসম্ভব ঠোঁট কামড়ে কান্না ধরে রাখার বৃথা প্রয়াস চালাল। কিন্তু, যখন আর আঁটকে রাখা সম্ভব হলো, তখন কাঁদতে না পারা মেয়েটাও চিৎকার করে কেঁদে উঠল,
“তুই তো আমায় কষ্ট দিতেই চেয়েছিলি, তাই না? তাই তো এতো আয়োজন, এতো নাটক—সবই সেই জন্য নাহ? হ্যাঁ, তুই সফল। তোর প্ল্যান নিখুঁত ছিল৷ একদম মাস্টারপিস। দেখ, আমি কষ্ট পাচ্ছি। আমি ইমামা ওয়াসিম—যাকে তোরা সবসময় ‘ডেড কোল্ড ফিস’ বলে ডাকতি, সেই শীতল, শক্ত ধাতুর আমি আজ কাঁদছি। দেখ কারিব, আমি কাঁদছি। কান্নায় আমার গলা ভেঙে যাচ্ছে। তুই তাকিয়ে দেখ, ইমামার চোখে জল। তুই তো আমার ভেতর পড়তে পারতিস কারিব, ওরা না বুঝলেও তুই জানতিস আমি ভেতরে ভেতরে কতটা ভাঙা। তাও কেন এমনটা করলি দোস্ত? তুই জানিস মা আমি কষ্ট প্রকাশ করতে পারি না।? অথচ দেখ, আজ লুকাতেও পারছি না। আমার ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে রে কারিব। তুই চোখ খুলে দেখ! আমি জানি, তোকে আমি আবারও ফিরিয়ে আনতে পারতাম আমাদের বন্ধুত্বের জায়গায়, এই বিশ্বাসেই আমি নিজেকে গোছাচ্ছিলাম। কিন্তু তুই আমায় সেই সময়টুকুও দিলে না…
‘থেমে, কারিবের মুখের উপরে আঁচড়ে পড়ে; সারা মুখে হাত বুলিয়ে ফোঁপাতে, ফোঁপাতে বলতে থাকে,
‘এই কারিব, প্লিজ আমার সাথে এমনটা করিস না ভাই। এই-যে দেখ, এরা আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আমি মরে যাবো রে দোস্ত। সত্যি বলছি দোস্ত, আমি মরে যাবো এদের ছাড়া। তোরা আমার অংশ। আমি কীভাবে বাঁচব নিজের অংশ ছাড়া? তোকে, গৌরব’কে, অর্ক’কে, ইবরাত’কে হিয়া’কে—তোদের সবাইকে আমার খুব প্রয়োজন। আমি তোদের ছাড়া থাকতে পারিনা জানিস তো। আমার বিষন্ন দিনের আলোকরশ্মি তোরা। পারিবারিক সব ঝামেলা, সব কলহ তোদের পেয়ে ভুলে যেতাম আমি।
এই কারিব, উঠ। তুই তো জানিস, আমার মা আমাকে কখনো খাইয়ে দেয়নি। তুই-ই না সেই ছেলে—যে নিজে না খেয়ে সবসময় আগে আমাকে খাইয়ে দিতি। এখন কীভাবে দায়িত্ব ফেলে চলে গেলি হুহ? উঠ যা দোস্ত…আমার খুব..খুব কষ্ট হচ্ছে রে।”
‘প্রাণশূন্য বুকে মাথা ঠুকতে থাকে ইমামা। চারপাশে কান্নার স্রোত। গৌরব অর্কের কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চুপে অশ্রু ঝরাচ্ছে, হিয়া ইবরাতকে আঁকড়ে ধরে কাঁদছে। তবু, ওদিকে ছেলেটা কী নিস্তব্ধ শান্তিতে শুয়ে আছে! কোনো কথা নেই, কোনো হাসি নেই। শুধু নীরব এক অদ্ভুত সৌন্দর্যে ভেসে আছে। তবে কি সে এমনই হাসতে, হাসতে, সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেল?
‘তবে কি আর কোনোদিন হবে না তাদের একসাথে হওয়া? টিএসসির সেই উচ্ছ্বসিত আড্ডা, ঢাকা শহরের গলি-ঘুপচি চষে বেড়ানো, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া, পরীক্ষার খাতা খালি জমা দেওয়া, কিংবা লাস্ট বেঞ্চে চোখাচোখি করে ফিসফিস হাসি এসব কি এখানেই শেষ?
‘হঠাৎ ইমামার হাতের আঘাতে সাদা কাফনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কারিবের এক নিস্তেজ হাত। মুহূর্তে স্থির হয়ে যায় সময়। হাতের দিকে চোখ পড়তেই কেঁপে ওঠে ইমামা।কারিবের আঙুলের ফাঁকে রক্ত দিয়ে লেখা স্পষ্ট,
“রেড ওয়াইন।”
‘আতঙ্কে ইমামার শুকনো ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে অস্পষ্ট স্বরে ফিসফিস করে ওঠে,
“খুন, এটা খুন।”
‘তখনই ইমামার ফোনে আবার আসে সেই সুরাকারের প্রাইভেট নাম্বার থেকে পাঠানো মেসেজ—
“যদি খুঁজো, অনেক পেয়ে যাবে। কিন্তু আমার মতো করে কে তোমাকে চাইবে, বলো? যতটা কষ্ট তুমি আমাকে দিয়েছ,তার দ্বিগুণ তোমাকে ফিরিয়ে দিব আমি। আই প্রমিজ! তোমার কাছ থেকে সব ছিনিয়ে নিবো আমি এক এক কোরে।”
Born to be villains part 4
‘মেসেজটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইমামের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে চোখের কোণা থেকে অশ্রু মুছে নিল। চোখে জ্বলে উঠছে একরাশ অশ্রদ্ধার আগুন। কাবিনের হাতটাকে শক্ত করে চেপে ধরে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল ইমামা,
“তোর লাশ ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম দোস্ত,
খোদার কসম—তোর খুনিকে নিজের হাতে শাস্তি দেব আমি। ইমামা ওয়াসিম, তাকে কষ্ট দেওয়া মানুষগুলোকে ছেড়ে দেয়না, সেও ছাড় পাবে না।”
