Mad for you 2 part 8
তানিয়া খাতুন
রুমের দরজাটা ভেতর থেকে শক্ত করে বন্ধ।
আর দরজার ওপাশে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
একবার রুহির আব্বুর গর্জে ওঠা কণ্ঠ—
“দরজা খোলো!”
আবার তার আম্মুর কান্নাভেজা কণ্ঠ—
“রুহি মা… দরজা খোল… মা ভয় পাস না…”
একটার পর একটা ধাক্কায় দরজাটা কেঁপে উঠছে। মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যাবে।
কিন্তু এই ঘরের ভেতরে যেন সম্পূর্ণ আলাদা এক পরিবেশ।
দরজার সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুহি।
আর তাকে দুই হাতের মাঝে বন্দি করে রেখেছে ক্ৰিশ।
তার দু’হাত দরজার দুপাশে রাখা, ফলে রুহির পালানোর কোনো পথ নেই।
সে পুরোপুরি ক্ৰিশের শরীরের মাঝে আটকে গেছে।
দুজন এতটাই কাছে দাঁড়িয়ে যে রুহি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে ক্ৰিশের গরম নিঃশ্বাস তার মুখে এসে লাগছে।
তার বুকের ওঠানামাও যেন শোনা যাচ্ছে।
রুহির পুরো শরীর কাঁপছে।
সে চোখ বন্ধ করে রেখেছে শক্ত করে। মুখটা ভয়ে কুঁচকে গেছে।
হাত দুটো মুঠো করে চেপে ধরেছে নিজের ওড়নার কিনারা।
তার মনে হচ্ছে—যদি চোখ খোলে, তাহলে আরও ভয়ঙ্কর কিছু দেখতে হবে।
কিন্তু ক্ৰিশ?
সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রুহির দিকে।
এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ, সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটা এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখে সেই ভয়ঙ্কর কোমলতা।
যে কোমলতা মানুষকে শান্ত না করে বরং আরও অস্থির করে তোলে।
বাইরে থেকে ক্রমাগত চিৎকার ভেসে আসছে, দরজায় ধাক্কার শব্দ হচ্ছে… কিন্তু ক্ৰিশ যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।
তার পুরো মনোযোগ শুধু রুহির দিকে।
আর রুহির এই ভয়… এই কাঁপতে থাকা অসহায় অবস্থা… অদ্ভুতভাবে উপভোগ করছে সে।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে আরও ঝুঁকে আসে। এতটাই কাছে যে তার চুল এসে ছুঁয়ে যায় রুহির গাল।
রুহির নিঃশ্বাস আটকে যায়।
তারপর ক্ৰিশ খুব নিচু গলায়, প্রায় ফিসফিস করে বলে—
“Butterfly… give me a kiss…”
কথাটা শুনে রুহি সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে ফেলে।
তার চোখ দুটো আতঙ্কে বড়ো হয়ে যায়।
যেন সে বিশ্বাসই করতে পারছে না—এই পরিস্থিতিতেও ক্ৰিশ এমন কথা বলতে পারে।
তার ঠোঁট কেঁপে ওঠে।
“কি…?”
সে আরও সিটিয়ে যায় দরজার সাথে।
যেন কাঠের ভেতর ঢুকে যেতে পারলে বেঁচে যেত।
তারপর কাঁপা গলায় বলে ওঠে—
“আস্তাগফিরুল্লাহ… দূরে যান…”
এই কথাটা শোনামাত্র ক্ৰিশের চোখের দৃষ্টি বদলে যায়।
কয়েক সেকেন্ড আগেও যেখানে অদ্ভুত কোমলতা ছিল, সেখানে এখন বিরক্তি আর চাপা আগ্রাসন নেমে আসে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে।
তারপর খুব নিচু, ভারী গলায় বলে—
“নিজে থেকে করবে…নাকি?”
রুহি কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ে।
ক্ৰিশের চোখ এবার ধীরে ধীরে নেমে আসে তার ঠোঁটের দিকে… তারপর আরও নিচে।
সে আরও একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলে—
“নাকি আমি এমন জায়গায় kiss করবো… যেটাতে তোমার অঙ্গে অঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালিত হবে?”
কথাটা শুনে রুহির পুরো শরীর কেঁপে ওঠে।
তার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করতে থাকে এত জোরে যেন বাইরে থেকেও শোনা যাবে।
সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নেয়। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে।
“Please… এমন করবেন না…”
রুমের ভেতরের বাতাসটা যেন ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল।
বাইরে দরজায় একের পর এক ধাক্কার শব্দ, চিৎকার, কান্না—সব মিলিয়ে অস্থির একটা পরিস্থিতি।
ক্ৰিশ নিচু হয়ে তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে—
“Baby… kiss me first. আমার ধৈর্য খুব কম…”
কথাগুলো শুনে রুহির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
তার গলা শুকিয়ে গেছে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।
এই মানুষটার চোখের দিকে তাকাতেই তার ভয় লাগছে।
সে অসহায়ের মতো একবার দরজার দিকে তাকায়।
বাইরে তার আব্বু-আম্মু আছে, তবুও যেন কেউ তাকে বাঁচাতে পারছে না।
রুহি ধীরে ধীরে ঠোঁট কামড়ে ধরে।
তার মাথা কাজ করছে না।
শুধু একটা কথাই বুঝতে পারছে—এই মুহূর্তে ক্ৰিশকে আরও রাগানো ঠিক হবে না।
কাঁপতে কাঁপতে সে পা উঁচু করে।
তার চোখ আধবোজা।
লজ্জা আর ভয়ে পুরো মুখ লাল হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে।
সে খুব ধীরে ক্ৰিশের দিকে এগিয়ে আসে… kiss করার জন্য।
কিন্তু তাদের উচ্চতার পার্থক্যের কারণে সে ক্ৰিশের ঠোঁট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
রুহি বিব্রত হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তারপর আরও একটু পা উঁচু করে।
তবুও নাগাল পায় না।
ক্ৰিশ সেটা দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসে।
সেই হাসিতে দুষ্টুমি ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল অধিকারবোধ।
ধীরে ধীরে সে হাত বাড়িয়ে রুহির সরু কোমর জড়িয়ে ধরে।
হঠাৎ করেই রুহি মাটি থেকে খানিকটা উপরে উঠে যায়।
ভয় পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে দু’হাত দিয়ে ক্ৰিশের কাঁধ আঁকড়ে ধরে।
তাদের মুখ এখন খুব কাছাকাছি।
রুহি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে ক্ৰিশের গরম নিঃশ্বাস তার মুখে লাগছে।
ক্ৰিশ গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলে—
“Lip to lip kiss চাই, baby… first করো…”
রুহির বুকের ভেতরটা আরও জোরে কাঁপতে থাকে।
সে কি করবে বুঝতে পারছিল না।
ধীরে ধীরে সে নিজের শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নেয়।
তারপর চোখ বন্ধ করেই একটু একটু করে ক্ৰিশের দিকে এগিয়ে আসে।
কিন্তু তার আগেই ক্ৰিশ আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না।
এক ঝটকায় সে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে রুহির ঠোঁটে।
রুহির পুরো শরীর কেঁপে ওঠে।
তার আঙুলগুলো শক্ত হয়ে চেপে ধরে ক্ৰিশের শার্ট।
চোখ বন্ধ হয়ে যায় আপনা থেকেই।
ক্ৰিশ হামলে পড়ে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো, দাঁত চালায় রুহির ঠোঁটে।
ব্যথায় কেঁদে উঠে মেয়েটা, হালকা রক্ত বের হয় ঠোঁট কেটে।
ক্ৰিশ সময় নিয়ে শুষে নেয় সবটুকু, তৃষ্ণার্ত প্রাণীর মতো।
ক্ৰিশের আচরণে তীব্রতা ছিল। যেন বহুদিনের জমে থাকা আবেগ হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।
রুহি প্রথমে স্থির হয়ে গেলেও কিছুক্ষণ পর অস্থির হয়ে ওঠে।
তার নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে যায়। সে সরে আসার চেষ্টা করে।
কিন্তু ক্ৰিশ তাকে আরও কাছে টেনে নেয়।
তার এক হাত শক্ত করে জড়িয়ে থাকে রুহির কোমরে, আর অন্য হাত গিয়ে থামে তার চুলে।
রুহির চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
তার মনে হচ্ছিল সে যেন কোনো অদ্ভুত ঝড়ে আটকে গেছে—যেখান থেকে বের হওয়ার শক্তি নেই।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে রুহির আব্বুর কণ্ঠ ভেসে আসে—
“আমি তোমার সাথেই আমার মেয়ের বিয়ে দেবো!
দয়া করে দরজাটা খোলো!”
কথাটা শুনেই ক্ৰিশ থেমে যায়।
কয়েক সেকেন্ড সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রুহির দিকে।
রুহি হাঁপাচ্ছে। তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখ ভেজা।
মুখটা লজ্জা আর অস্বস্তিতে লাল হয়ে গেছে।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে তাকে নিচে নামিয়ে দেয়।
রুহি সঙ্গে সঙ্গে দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, যেন নিজের ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে।
ক্ৰিশ নিজের ঠোঁটের কোণে আঙুল ছুঁইয়ে হালকা হাসে।
তারপর দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
Lock খুলে ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে দেয়।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন রুহির আব্বু। মুখে ক্লান্তি, চোখে রাগ আর অসহায়তা।
ক্ৰিশ ঠোঁট মুছতে মুছতে তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে—
“কি যেন বলছিলেন…?”
রুহির আব্বু কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন।
ক্ৰিশের আচরণ, তার কথাবার্তা—সবকিছু মিলিয়ে মানুষটার মাথা যেন ঝিমঝিম করছে।
তিনি ধীরে ধীরে মাথা নিচু করলেন। তারপর নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে বড় একটা নিঃশ্বাস নিলেন।
এদিকে রুহির আম্মু দ্রুত ভেতরে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।
রুহি এখনো কাঁপছে। তার চোখ ভেজা, ঠোঁট লাল হয়ে আছে।
মেয়েটাকে এমন অবস্থায় দেখে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল তার মায়ের।
“মা… ভয় পাস না…”
তিনি কাঁপা হাতে রুহির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
রুহি কোনো কথা বলল না। শুধু মায়ের বুকের সাথে মুখ লুকিয়ে রইল।
ওদিকে রুহির আব্বু ধীরে ধীরে ক্ৰিশের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
তার কণ্ঠে এবার রাগের বদলে ক্লান্তি।
“দেখো বাবা… তোমাদের বিয়েটা যেভাবে হয়েছে, সেটা ঠিক না…”
তিনি একটু থামলেন।
“তাই আমি আবার তোমাদের বিয়ে দেবো। নিয়ম মেনে, সবার সামনে।
তারপর তুমি ওকে নিয়ে যেও… কেমন?”
ক্ৰিশ পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
“Game খেলছেন, শ্বশুর মশাই?”
কথাটা শুনে রুহির আব্বু হকচকিয়ে গেলেন।
“আ… মানে? ছি ছি… game কেন খেলবো?”
তিনি তোতলাতে তোতলাতে বললেন,
“আমি তোমাকে সত্যি বলছি বাবা…”
ক্ৰিশ কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। যেন মানুষটার মনের ভেতরটা পড়ে ফেলতে চাইছে।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
“বেশ…”
“তাহলে কালকেই বিয়ে হবে। এই বাড়িতেই।”
তার চোখ হালকা সরু হয়ে এলো।
“আপনারা যদি রাজি থাকেন… বলুন। না হলে…”
কথাটা শেষ করল না সে।
কিন্তু অসমাপ্ত বাক্যের মাঝেই চাপা হুমকি স্পষ্ট ছিল।
রুহির আব্বু দ্রুত বলে উঠলেন—
“রাজি! আমি রাজি!”
তার কণ্ঠে তাড়াহুড়ো ছিল। যেন তিনি কোনোভাবে পরিস্থিতিটা শান্ত করতে চাইছেন।
রুহির আম্মু অবাক হয়ে স্বামীর দিকে তাকালেন।
তার চোখে প্রশ্ন—
আপনি সত্যিই মেয়েকে এই ছেলের হাতে তুলে দেবেন?
কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। শুধু মেয়েকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
ক্ৰিশ এবার ধীরে ধীরে রুহির দিকে তাকাল।
রুহি মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে একবারও ক্ৰিশের দিকে তাকাচ্ছে না।
ক্ৰিশ ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসল। তারপর আঙুল ঠোঁটে ছুঁইয়ে বাতাসে একটা flying kiss ছুঁড়ে দিল তার দিকে।
Mad for you 2 part 7
“Bye, butterfly…”
তার গলা নিচু, অদ্ভুত কোমল।
“আজকের বাকি কাজটা কাল করবো…”
রুহি সঙ্গে সঙ্গে মুখ আরও ঘুরিয়ে নেয়।
তার বুকের ভেতর আবার অজানা ভয় জমতে থাকে।
