Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 23

Naar e Ishq part 23

Naar e Ishq part 23
তুরঙ্গনা

নিজের ঘরের বারান্দায় সামনে স্তব্ধ ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছে সুহিন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। চারপাশে শীতল হাওয়া বইয়ে। কিন্তু সুহিনের মন মস্তিষ্ক অন্য কোথাও পড়ে আছে। তার ঘরের বারান্দা হতে বাড়ির পেছনের সুইমিংপুলটা দৃশ্যমান৷ সে নিবিষ্টমনে সুইমিংপুলের দিকে তাকিয়ে। হাতের মুষ্টিতে সেই সাদা কাজের খাম। চোখেমুখে অদ্ভুত এক চিন্তার ছাপ।

সুহিন চোখবুঁজে কিছু অতীতের দৃশ্য একমনে ভাবতে থাকল। ছোটবেলায় সেই অপ্রত্যাশিত রাতে, যখন বাড়ি ভর্তি লোকজন জড়ো হলো; তার মাকে সবার মাঝে নিয়ে গিয়ে,সবাই নানান ক্ষোভ প্রকাশ করতে লাগল, তখন ভীতু সুহিন কেবল করিডোরে আড়াল থেকে সেই দৃশ্যটুকু অবুঝমনে দেখেছিল। তখনও বুঝে উঠতে পারেনি সেসব কি হচ্ছে। কিন্তু সে এইটুকু জানত,এই সমাজ তার মা আর কেকে’র সম্পর্কে যা ইঙ্গিত করে তা সম্পূর্ণ বানোয়াট।
কিন্তু ঘটনা যদি তাই হয়, তবে এই ঘামের ভেতর থাকা কাগজগুলো কি বলছে? আর এগুলো কেকে কেনোই বা নিজের ক্লোজেটেট ভেতর এতো গোপনে রেখে দিয়েছিল। সবই কি স্বাভাবিক? নাকি সবাই মিলে তাকে এক বিশাল নাট্যমঞ্চের পুতুল বানিয়ে রেখেছে?

সুহিনের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল। সে ভারী ভারী শ্বাস ফেলল। এমন বোকা-নিরীহ মানুষ হয়ে সে পৃথিবীতে কেনো এসেছিল,তা তার বুঝে আসে না।
এসব ভাবতে ভাবতেই, মায়ের মৃত্যুর সেই অন্ধকার রাতের ঘটনা মনে পড়ে গেল। কেকের মতো গভীর রাতে সে-ও দেখেছিল তার মা’কে। রাতের বেলায় একা একা থাকত বিধায়,বেশিরভাগ সময়ই সে ভয়ে ঘুমাতে পারত না। একইসাথে কাউকে কিছু বলার সাহসও পেতো না। অবশ্য বলবে কাকে? নিজের বলতে আছেই কেবল তার মা, আর তো কেউ নেই।

সুহিন একা একা ওয়াশরুম সেড়ে,শুয়ে পড়েছে। ঠিক সেইসময় সে কিছু আওয়াজ শুনতে পায়। কৌতুহল বশত সে বারান্দার দিকে এগিয়ে যেতে যেতেই, দেখে একজন লালা শাড়ি পড়া নারী সুইমিংপুলের নিকটে এগিয়ে যাচ্ছে। চেহেরা স্পষ্ট না হলেও,তার কেনো যেন মনে হলো ওটা তার মা। অস্পষ্ট গলায় সে একবার তার মা’কে ডেকেওছিল। কিন্তু তার মা কোনো উত্তর দিল না। বরং সুহিনের ডাক শুনতে পেয়ে,অদ্ভুত ভঙ্গিতে তার দিকে ফিরে দেখল। সুহিনের মনে হলো,তার মা তাকে দেখে মুচকি হাসছে। অথচ সে তখনও বুঝতে পারেনি,তা মা কি করতে চলেছে!
এরিমধ্যে সে নিজের চোখে দেখতে পায়, তার মা মুখ ফিরিয়ে হাতের মুষ্টিতে থাকা একটি শিসি থেকে কিছু একটা খাচ্ছে। এবং সে কোনো কালবিলম্ব না করেই, সরাসরি সুইমিংপুলের মাঝে গিয়ে নিজের মুখ ডুবিয়ে কিছুক্ষণ সময় বসে রইল। বোকা সুহিন তখন মনে মনে আওড়ায়,

“আম্মু এতো রাতে গোসল করছে? ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করলে জ্বর আসবে না?”
তার এমন বোকা ভাবনার মাঝেই দেখল, পানির নিচে মাথা ডুবিয়ে স্থির হয়ে জ্যান্ত মূর্তির ন্যায় বসে থাকা আরশিয়া—অচিরেই স্বাভাবিক হয়ে খানিকটা ভেসে উঠেছে। তবে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নয়, কিছুটা অদ্ভুত! সুহিন নিজের চশমাটা ঠেলে খানিক সংশয়ের সাথে ডাকল,
“আম্মু! চলে আসো। এতো রাতে গোসল করলে ঠান্ডা লাগবে।”
সুহিনের নমনীয় কন্ঠস্বর থমকে গেল। মুহূর্তের মাঝেই দেখল কিছু মানুষ সুইমিংপুলের কাছে এসে হাজির হয়েছে।যাদের মধ্যে কেকে-ও আছে। সবাই বিস্ময়ের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। সুহিন তখনও বোঝার চেষ্টায়, এখানে আসলে কি হচ্ছে? তার আম্মু আদতে ওখানে কি করছে?

কিন্তু সেসব বুঝতে ততক্ষণে বহু দেরি হয়ে গেল। হতবিহ্বল সুহিন স্তব্ধ হয়ে রেলিং এর পাশে দাড়িয়ে রইল। একবারের জন্য কেকের তীক্ষ্ণ নজর গিয়ে পড়ল সুহিনের দিকে। সে তার দিকে তাকিয়ে সেদিন কি দেখল তা সুহিনের জানা নেই। কেননা তার কিছু মুহূর্তের পরপরই, সে নিজের দুঃস্বপ্ন সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত হলো। তার মা সেজেগুজে গোসল করতে নয় বরং নিজেকে শেষ করতেই এখানে এসেছিল। এবং নিজের খায়েশ অনুযায়ী মা তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে।
তার মা চলে গিয়েছে এটা সুহিন কোনোভাবেই মানতে পারছিল না। সবকিছু তো তার চোখের সামনেই হলো, তবে কিভাবে? যখন শুনল, তার মায়ের কঠিনসব মানসিক রোগ ছিল এবং সেই শিসিতে ছিল ভয়ানক এক বিষ,ততক্ষণে তার মাথায় জিনিসগুলো কিছুটা বোধগম্য হতে লাগল। কিন্তু তবুও যেন মৃত্যুর এই আকস্মিক নাটকীয়তা সে মেনে নিতে পারছে না।

চারপাশের সকলেই বলতে লাগল, আরশিয়া মেহের তো একটা পাগল ছিল। কেউ বলল, মাঝেমধ্যে তাকে ছাদে একা একা দেখা যেতো। নিশ্চয় কোনো অশরীর আত্না ভর করেছিল। এসব সহ কতসব গুঞ্জন রটলো। মা ছাড়া বদ্ধ ঘরে সুহিন নিজেকে আরো গুটিয়ে নিল।
কাশিফকে বড় ভাই হিসেবে চিনলেও, লোকজন তাকে বাবা হিসেবে চিহ্নিত করতো। সুহিন তখনও বুঝতো না এর কারণ কি! কেকে কেন তার বাবা হতে যাবে, তার বাবা তো আগেই মারা গিয়েছে। সমাজের কুৎসিত চিন্তাভাবনা তখনও তার অপরিপক্ক মস্তিষ্কে বোধগম্য হতো না। মায়ের মৃত্যুর পর নিজেকে আর মানুষ বলেও মনে হতো না। কেউ তার খবর নিতে আসতো না—সে ঘরের কোণে বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে।
সুহিনের কাছেও ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবীটাই ঘোলাটে হতে লাগল। বাড়িতে আগে অনেক মানুষজন থাকলেও, তখন দুএকজন কাজের লোক ছাড়া কাউকেই দেখা যেতো না। জাভিয়ানও কাজের জন্য বাহিরে বাহিরে থাকতো। পুরো বাগান,পুরো বাড়ি সবকিছু কেমন স্তব্ধ হয়ে গেল। থাকার মাঝে রইলো কেকে, তাকে তো সে ভীষণ ভয় পায়। তার কাছে যেয়েই বা কি করবে?

এভাবেই বিভীষিকাময় দিন কাটাতে কাটাতে, আরেক অন্ধকার রাতের আগমন হলো। সুহিনের ঘুম আসছে না। দুপুরেও কিছু খায়নি, রাতেও খেতে নিচে আসা হয়নি। যে কারণে কেউ তার খোঁজও নেয়নি। কিন্তু খিদের চোটে ঘুম উড়ে গিয়েছে তার।
সে ধীর পায়ে বুকে টেডি জড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ঝকঝকে আলোয় পূর্ণ বাড়ির বেশিরভাগ লাইটই তখন বন্ধ করে রাখা। বাড়িতে আদোতে কেউ আছে কিনা সেটাও তো সে জানেনা। সারাদিন কান্না করেছে ঘরের কোণে, বাহিরে কি হয়েছে কে জানে।
সে উপায় না পেয়ে, কিছু রুম পরেই কেকের রুমের দিকে এগিয়ে গেল। দরজাটা খোলাই আছে। কিন্তু পুরো ঘর অন্ধকার। সুহিন দরজার কোণে মুখ এগিয়ে ডাকে,
“কাশিফ ভাইয়া! তুমি আছো? আমার ভয় করছে,বাড়িতে কেউ নেই।”
অত্যন্ত ক্ষীণ কন্ঠস্বর। অথচ কোনো সাড়াশব্দ এলো না। সুহিন ভীত হয়েই ঘরের ভেতর এগিয়ে গেলো।কয়েকবার ডাকল,

“কাশিফ ভাইয়া! ঘুমিয়ে পড়েছো?”
সুহিন খেয়াল করল বিছানায় কেউ নেই। চাঁদের আলো বারান্দা হতে ঘরে এসে কিছুটা আলোকিত করে রেখেছে। সুহিন আর দুটো পা এগিয়ে বারান্দায় উকি দেয়, কিন্তু সেখানেও কেকে নেই। সে মন খারাপ করে চলে আসতে নিবে ঠিক তখনই তার নজর পড়ে জানালার ফাঁক দিয়ে, সুইমিংপুলের দিকে।
সেখানে কেউ একজন কালো পোশাকে বসে আছে। ওটা যে কেকে তা বুঝতে তার বেশি একটা সময় লাগল না। অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে পানিতে পা ডুবিয়ে সে বসে আছে। হাত দুটো উরুর মাঝে আলগোছে ফেলে রাখা। সে স্থির দৃষ্টিতে পানির দিকে চেয়ে চেয়ে কিছু একটা দেখছে।

সুহিন তবুও কিছুটা আশ্বস্ত হলো যে, অন্তত এই বাড়িতে কেউ একজন আছে।এরপর সে আর বেশি না ভেবে, সাহস নিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। দরজা খোলা থাকায় বিশেষ কোনো বাধার সম্মূখীন হলো না।কিন্তু হঠাৎ ছোট্ট একটি মেয়েকে বাড়ির পেছনের দিকে যেতে দেখে, মেইন গেইটের কাছে দায়িত্বরত একজন গার্ডের ভ্রু কুঁচকে গেল।এমনিতেও এই বাড়িতে এখন গার্ডরাও হাতেগোনা দু’একজন মাত্র।
যথারীতি গার্ডটি আরেকজন গার্ডের উদ্দেশ্যে বলল,
“ঐটা ছোট সাহেবের সৎ মেয়েটা না? মা’টা তো দুদিন আগে মরল, মেয়ে আবার ঐখানে যায় কেন?”
তার কথা শুনে অন্য গার্ডটা ব্যাঙ্গাত্নক ভঙ্গিতে বলল,
“কি জানি, মরতে যাচ্ছে মনে হয়।”

—“আহা! মজা করছি না আমি, একা একা মেয়েটার বাড়ির পেছনে যাওয়া ঠিক না। ওকে… ”
—“তো কি করবেন? এমনিতেও সেই অনেকক্ষণ আগেই ছোট সাহেব ওদিকে গেসে। হয়তো মেয়েও বাপের কাছে যাচ্ছে।”
এ কথা বলে অকারণেই ব্যক্তিটি হেসে উঠল। এখন তারা এই পরিবার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করবে গার্ড দেওয়ার নামে গল্পের আসর জমাতে।
—“কি যে আর বলবো, বড়লোক বাড়ির বড়লোকি সব কারবার। শুনছিলাম, এই ছোট সাহেবের আম্মাও নাকি এই বাড়িতেই ফাঁস টানিয়ে মরছিল”
—“বলেন কি এসব? শাহমীর কাহসানের স্ত্রী?” “,বিস্ময়ের সাথে দ্বিতীয়জন বলল।
—“হ্যা, ঠিকই শুনছেন। অদ্ভুত এক বাড়ি এইটা। বাইরে থেকে ঝকঝকে আভিজাত্যে মোড়া মনে হলেও, ভেতরের গল্প তো সবই অজানা। বাড়ির মানুষগুলোও আজব। সাথে দুদিন বাদে বাদেই কেউ না কেউ মরে, আর কয়দিন এখানে কাজ করতে পারবো জানিনা। এমনিতেও দিনে দিনে ভুতের বাড়ি হয়ে যাচ্ছে।”
দুজনের কথোপকথন চলতে থাকে। সুহিন কেকের কাছে গিয়ে, তার পেছনে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ায়। ভীত ও ইতস্তত স্বরে বলে,

“ভাইয়া শুনছো!”
কাশিফ কোনো জবাব দেয়না। সে নিজের ধ্যানে নিবিষ্ট। সুহিন আবারও ডাকে।এইবার কেকে মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকায়।তার বিধস্ত শান্ত রূপে সুহিন শুরুতে কিঞ্চিৎ ভীত হয়। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে কেকের দিকে দু পা এগিয়ে যায়।
কেকে গুরুগম্ভীর স্বরে আওড়ায়,
“কেনো এসেছিস এখানে?”
সুহিন বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না।ভয়ে যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে একবার নজর বুলিয়ে দেখল, এদিকের বন-ঝার গাছপালা গুলো প্রায় জঙ্গলে রূপ নিয়েছে। ঝিঁঝি পোকারা ডাকছে। সুহিন অচিরেই ভীত হয়ে কেকের গা ঘেঁসে দাঁড়ায়। আমতাআমতা করে বলে,
“আমার ভয় করছে!”

—” কাকে?”
—“ভুত!”
সুহিনের কন্ঠস্বর ভয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে গিয়েছে। সে কেকে ছাড়া আর কাউকে খুঁজেও পাচ্ছে না সাহায্যের জন্য। কেকে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।তার এহেন উত্তরে তাচ্ছিল্যের সহিত কিঞ্চিৎ হাসে। শান্ত স্বরে আওড়ায়,
“বস এখানে!”
সুহিন অনুমতি পেতেই চুপচাপ তার পাশে গিয়ে বসে পড়ে। কেকে পুনরায় নির্বাক হয়েছে। সুহিন নিজেও বলার মতো কিছু খুজে পাচ্ছে না। তার ক্ষিদে পেয়েছে, কিন্তু কেকে’কে কি এখন তা বলবে? সে কি তাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খেতে দিবে? যদি তা না করে উল্টো বকা দেয়,রেগে যায়! এই ভাবনায় সে ভাবল, তাহলে বরং কালকে সকালেই খাবে।
এরিমধ্যে কেকে সুহিনের উদ্দেশ্যে অদ্ভুত স্বরে আওড়ায়,
“হানি!”
সুহিন তার ডাকে সারা দেয়,
“হ্যা!”

—“আমার তোকে বিরক্ত লাগছে!তুই কি এখন তোর মায়ের মতোই মরতে চাস? তুইও মরে গেলে এই বাড়িতে আর কোনো ঝামেলা অবশিষ্ট থাকবে না। আমিও তখন শান্তিতে বাঁচতে পারব। নো এলিমেন্ট,নো পেইন।”
কেকে তার দিকে মুখ ফেরায়। সুহিন আতংকিত ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই কেকে’কে তার সাধারণ দিনের চেয়ে আরো বেশি অদ্ভুত ও অচেনা ঠেকছে। কেকে তাকে বিরক্ত করে,কষ্ট দিয়ে মজা পায় কিন্তু এমন কথা তো বলে না।
কেকে তীর্যক হেসে আবারও বলে,
“ম’রতে চাস?”
সুহিন বর্তমানে ফিরে এসে চোখ মেলে তাকায়। জোরে জোরে শ্বাস ফেলে। সে-রাতে কেকে তার কথা মতোই কাজ করেছিল। তার অনুমতি নেওয়ার সময়টুকুও যেন তার হাতে ছিল না। কোনো ভাবনাচিন্তা ছাড়াই তাকে সুইমিংপুলের মধ্যে ডুবিয়ে চেপে ধরে। তবে সেদিন বারান্দা হতে সেই দৃশ্য জাভিয়ানের নজরে না পড়লে,সে হয়তো আজ আর বেঁচে থাকত না।

জাভিয়ান সে কয়দিন নিজের কাজে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকত। আর সেদিন রাতে কাজের ব্যস্ততায় অস্থির হয়ে বারান্দার পায়চারি করতে গিয়েই সে এই দৃশ্য দেখে ফেলে। নির্বিকার ভঙ্গিতে একটা ছোট্ট অস্তিত্বকে শেষ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে কেকে।
অতঃপর জাভিয়ান এক মূহুর্তও দেরি না করে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। তার চিৎকার চেঁচামেচিতে গার্ডদুটোও এগিয়ে যায়।আর তারা সবাই গিয়ে কেকে’কে আঁটকায়। সুহিন সেদিন বোঝেনি কেকে কেনো ওমন করেছিল। কিন্তু সে ঘটনার পর কেকে’কে বেশ কয়েকদিন ট্রিটমেন্টের জন্য বাড়ির বাহিরে রাখা হয়। সে-ও নাকি তার মায়ের মতোই হয়ে যাচ্ছিল—একজন মানসিকভাবে বিকৃত সাইকো।
অতঃপর কেকে কিছুটা সুস্থ হতে হতেই জাভিয়ান তাকে দেশ ছাড়ার ব্যবস্তা করে দিল। কেকেও খুব সহজে রাজি হয়ে গেল। তারপর সে-ও এই বাড়ি ছেড়ে হারিয়ে গেল;যেন অভিশপ্ত প্রাসাদ থেকে মুক্তি পেলো সে। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথেই সমাজের দেওয়া নোংরা অপবাদগুলো সুহিনের বোধগম্য হতে লাগল। তখন গিয়ে বুঝতে পারল, সবাই সেইসময় কেনো কেকে’কে তার বাবা হিসেবে গন্য করতো। সুহিন নানান আফসোস-অভিযোগ নিয়ে জাভিয়ানের কাছে এসব নিয়ে জানতে চাইলে, সে তাকে বারবার বোঝাতো—এমন কোনো বিষয়ই নেই, সমাজ শুধু শুধু এমনটা করছে কিন্তু অতীতে যা হয়েছে তা তো আর ঠিক করা সম্ভব না।তাই এভাবেই চুপচাপ এসব মুখ বুঁজে সহ্য করতে হবে।

সুহিন এতসব কিছু ভাবতে ভাবতেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। সেদিন তার জানপ্রাণ যায় যায় উপক্রম।ভেবেছিল হয়তো বাচবেই না এই সাইকো’টার হাত থেকে। যার কাছে সাহায্যের জন্য গিয়েছে,সেই তাকে দুনিয়া ছাড়ার জন্য সাহায্য করতে চেয়ছে।
কি আশ্চর্য! সেই মানুষটাই নাকি আবার তাকে বিয়ে করল। কিন্তু কেনো? কোন উদ্দেশ্যে? সবাই যা বলে কেকে কি সেরকমই নাকি আরো রহস্যময় কিছু? এসবের উত্তর তো এবার তার মুখোমুখি হলেই জানা যাবে। তার চিরবিশ্বাস, পেপার্সে যা লেখা আছে কেকে তা শুরুতেই অস্বীকার করে দিবে। নিশ্চিত এর পেছনে ভিন্ন কোনো কারণ আছে৷ তাই এখন শান্ত থাকাটাই বুদ্ধিমানে কাজ। কিন্তু লোকটা গিয়েছে কোথায়? সেই যে রাতে পাগলামি করে গেল,এরপর তো তার কোনো দেখাই নেই।

বিকেল গড়িয়ে রাতের নি’কষ অ’ন্ধকার পুনরায় ধরণীকে গ্রাস করল। পরি’ত্যক্ত ফ্যাক্টরির সেই জরাজীর্ণ ক’ক্ষটি এখন এক বীভৎস ক’সাইখা’না। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে পাঁচ বন্ধু মিলে এক পৈ’শা’চিক উৎসবে মেতে ছিল। আব্বাস মির্জা, আরিজ আর আরশাদের নিথর দেহগুলোকে তারা অত্যন্ত নিপুণভাবে খণ্ড-বিখ’ণ্ড করেছে।
প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা করে সেগুলোকে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে শহরের বিভিন্ন নর্দ’মার গহ্বরে এমনভাবে গু’ম করা হয়েছে যে, কোনো ফরে’নসিক রিপোর্টও তাদের অস্তিত্বের হদিস পাবে না।
​অন্যদিকে জাভিয়ানের দ’ণ্ড ছিল আরও ম’র্মা’ন্তিক। কেকে তাকে একবারে মরতে দেয়নি। তার শরীরের প্রতিটি হাড় আগেই রড দিয়ে চূ’র্ণ করা হয়েছিল, এরপর কনুই পর্যন্ত দুই হাত এবং একটি পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। য’ন্ত্র’ণায় মুমূর্ষু সেই দেহটিকে আপাতত কেকে-র কথামতো এক গোপন আ’স্তানায় কড়া পাহাড়ায় রাখা হয়েছে।

কিন্তু র’ক্তপিপাসা এখনো মেটেনি; হিসেব বাকি ছিল আরও একজনের—পুলিশ ইন্সপেক্টর রাদিফ হান্নান। প্রশাসনের প্রভাবশালী লোক হওয়ায় সরাসরি আঘাত করা ঝুঁকিপূর্ণ, তাই কেকে বেছে নিল প্রবঞ্চনার এক মোক্ষম পথ।
​রাতের নিস্তব্ধতায় হাইওয়ের এক নির্জন প্রান্তে নিজের নিকষ কালো ফেরারির পাশে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেকে। আকাশে বিস্তৃত চাঁদের রুপালি আভা চারপাশকে আলোকিত করলেও কেকে-র দুচোখে কেবল অন্ধকারের হাতছানি। সে চেয়ে আছে দূরের নিস্তব্ধ ব্রিজের দিকে; বোকা নিরীহ এক শিকারের অপেক্ষায়। চারপাশ দিয়ে দিয়ে বয়ে আসা হিমশীতল বাতাস তার এলোমেলো কাঁধ অব্দি ছুঁয়ে যাওয়া চুলগুলোকে বারংবারযা স্পর্শ করে যাচ্ছে।তার শান্ত ভাবমূর্তিকে হিং*স্র রূপে প্রকাশ করছে।

রাদিফ হান্নানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুচর বেলাল আজগরকে কেকে আগেই বাগে এনেছে। বেলালের স্কুলপড়ুয়া মেয়েটিকে সাদ মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে ক্যাফেতে ঘণ্টা দুয়েকের জন্য জিম্মি রাখতেই বেলাল নতি স্বীকার করে। মেয়ের প্রাণের মায়ায় বেলাল বাধ্য হয়ে রাদিফকে একটি প্ররোচনামূলক ফোন কল দেয়।
​বেলাল রাদিফকে জানায় যে, আব্বাস মির্জা,জাভিয়ান ও আরিজ খন্দকার বড় কোনো এক রাজনৈতিক ফাঁদে পড়েছেন এবং তাদের জীবন এখন বিপন্ন। যেহেতু আব্বাস ও জাভিয়ানের ফোন অনেকক্ষণ ধরে বন্ধ ছিল, তাই রাদিফের মনে সন্দেহের বীজ বোনা সহজ হলো। বেলাল তাকে প্ররোচিত করে, যেন সে এখনই তাদের গোপন আস্তানা থেকে নিজের অপকর্মের সব প্রমাণ সরিয়ে ফেলে, অন্যথায় পুলিশি অভিযানে সে ফেঁসে যাবে। নিজের ক্যারিয়ার আর জীবন বাঁচাতে হন্যে হয়ে রাদিফ সিভিল ড্রেসে নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে সেই গোপন আস্তানার উদ্দেশ্যে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়ে।

​আর এই মুহূর্তটির জন্যই কেকে চতুর শিকারী নেকড়ের ন্যায় অপেক্ষা করছিল। রাদিফের গাড়ি যখন বিশাল ব্রিজের ঠিক মাঝবরাবর পৌঁছাল, তখন কেকে ধীরলয়ে একটি ব্ল্যাক ট্রেজারার সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরল। বারংবার লাইটার জ্বালিয়ে নিভিয়ে, আঙুলের ডগায় অদ্ভুত এক নিস্পৃহ খেলায় মেতে উঠল। প্রতিবার লাইটের সুইচ অন-অফ এর শব্দই যেন কারো জীবনের শেষ সেকেন্ডগুলোকে কাউন্ট করছে।
ঠিক সেই সময় বিপরীত দিক থেকে একটি বিশালাকার মালবাহী ট্রাক ঝড়ের বেগে ধেয়ে এল। চালক যেন নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করেই ট্রাকটি সজোরে রাদিফের গাড়ির ওপর তুলে দিল। প্রচণ্ড সংঘর্ষে গাড়িটি রেলিং ভেঙে ছিটকে পড়ল, অতল জলরাশির মাঝে। ট্রাকটি মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকার চিরে দিগন্তে মিলিয়ে গেল।

এদিকে পুরো দৃশ্যটা নির্বিকার দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখল কেকে। ক্ষীন হেসে লাইটারটা হাতের কব্জির কৌশলে এদিক-ওদিক করে নিজের নির্লিপ্ততা প্রকাশ করল। অতঃপর ভারী শ্বাস ফেলে তির্যক হেসে, সিগারেট টেনে ধোঁয়া ছাড়তে লাগল। লাইটারটা জ্যাকেটের পকেটে রেখে,নিজের ফোনটা বের করল। কাউকে ফোন করার আগেই, হুট করে এক আননোন নাম্বার থেকে কল এলো। কলটা রিসিভ করে, কেকে অকপটে আওড়াল,
“গুড জব! এখন দেশ ছেড়ে কয়েক বছরের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যাও।… আশা রাখছি, মরে যাবে আর বেঁচে ফিরলে,এমনিতেও বেশিদিন বাঁচতে পারবে না।”

কেকে এই বলেই ফোনটা রেখে দিল। অতঃপর দুদণ্ড চাঁদের দিকে চেয়ে রইল। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতেই, সে চাঁদের মাঝে ডুবে গেল। কেকে যখনই চাদের দিকে নিবিষ্ট মনে তাকায়,তখনই সেই চাঁদে যেন নিজের মায়ের প্রতিচ্ছবিকে খুঁজে পায়। এক চকচকে মুখচ্ছবি। যথারীতি সে আরো কিছুক্ষণ সে চাঁদের দিকে চেয়ে থেকে আওড়ায়
“সরি মম! ইউ নো না? ইউর সন ইজ’ন্ট জাস্ট এ্যা ব্যাড বয়… হি ইজ এ্যা ব্যাড ওল্ফ।”
এই বলেই কেকে ক্ষীণ হাসল। সিগারেটটা শেষ করতে করতেই যেন মাথাটা ধরে এলো। সে পুনরায় মলিন হেসে চাঁদের উদ্দেশ্যে আওড়ায়,

“ওয়ান মোর সরি ফর… আমি তোমাকে আমি বাঁচাতে পারিনি৷ সমাজ,সমাজ,সমাজ, দেখেছো তো মম! এ সমাজ আমার কাছ থেকে তোমাকেই কেঁড়ে নিয়েছে। অথচ এই সমাজের জন্য তুমি কিনা নিজেকে শেষ করেছো,হাস্যকর।”
কেকের মাথাটা আবারও ধরে এলো। তার বাবা যা ছিল সে তা কখনোই হতে চায়না। সবদিক হতে বাবা তার জন্য আদর্শ হলেও, সম্পর্কে দিকে সে কখনোই তার বাবার প্রতিচ্ছবি হতে চায় না।
কেকে সিগারেটটা শেষ করে,নিচে ফেলে দিয়ে পায়ে পিষল। অতঃপর নিজের ঝকঝকে নিকষ কালো ফেরারিতে বসে পড়ল। স্টিয়ারিং-এ মাথা ঠেকিয়ে,চোখ বুজল;মাথার যন্ত্রণা কমাতে চাইল। গত দুদিন হতে চোখে ঘুম নেই। আর এখন পৃথিবীর সব ক্লান্তি যেন তার উপর জেঁকে বসেছে।

Naar e Ishq part 22

কেকে চোখবুঁজে কিছুক্ষণ স্থির রইল। রাত খুব বেশি হয়নি। কিন্তু এই মূহুর্তে তার আমারদায়ক কিছু একটার খুবই প্রয়োজন। কিন্তু, কিন্তু,কিন্তু…!
কেকে এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ স্টিয়ারিং হতে মাথা তুলল। তার চোখে এক বিচিত্র আকাঙ্ক্ষার ঝিলিক। স্টিয়ারিং এ দুহাত শক্ত করে চেপে, ঠোঁটের কোণে তির্যক হাসি ফুটিয়ে, অস্ফুটে আওড়াল,
“ওহ! আমার তো বউ আছে।”

Naar e Ishq part 24