obsession vs love part 1
নিরুর কল্পনারাজ্য
–আইয়ুশ আমি প্র্যাগনেন্ট। এবার আমাদের গোপনে বিয়ের কথাটা পরিবারে জানানো উচিত!
ভীষণ প্রফুল্লতায় ঝিলিক কথাখানা বললেও ততটাই অবহেলায় আইয়ুশ উত্তর দেয়,
–তো? এবরশন করে ফেলো।
এতক্ষণ আনন্দে আটখানা হয়ে যাওয়া বিষ বর্ষীয়া রমণী ঝিলিক নিজের বরের এমন অপ্রত্যাশিত কথায় অবাকের শেষ সীমানায় পৌঁছে যায়। অবাকতার সাথে অশ্রুসজল চোখে চেয়ে থেকে শুধায়,
—কীসব বলছো আইয়ুশ? আমাদের বাচ্চা এটা! আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন, তুমি কীভাবে এটা বলতে পারো?
—এখন আমার এতো ঝামেলা ভালো লাগছেনা। তাছাড়া এতো ওভাররিয়্যাক্ট করছো কেনো? ভ্রূণই তো একটা, নাথিং সিরায়াস….
ঝিলিকের পা থেকে যেনো মাটি সরে যাচ্ছে। চোখ হতে অঝোরে ঝরে পড়ছে নোনাজল। এসব তিক্ত কথা সহ্য করতে না পেরে থাপ্পড় মেরে বসে আইয়ুশের গালে। আইয়ুশ খানিকটা অবাক হয়। তেঁড়ে গিয়ে ঝিলিকের গালদুটো নিজের শক্ত হাতে চেপে ধরে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
—খুব সাহস বেড়েছে তোর তাইনা? আমাকে থাপ্পড় মারার সাহস তোর কীভাবে হয়? যা বলেছি সেটাই করবি।
বলেই হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে আইয়ুশ। ঝিলিক অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে রইলো সে দৃশ্য। ধপ করে বসে পড়লো বিছানায়। সে যেনো চিনতে পারছেনা এই আইয়ুশ মির্জাকে। যে-কিনা তাকে ছোটোবেলা থেকে চোখে হারাতো, সর্বদা যত্নে মুড়িয়ে রাখতো। যে-কিনা নিজ থেকেই ঝিলিককে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করেছে। বিয়ে করেছে। কাঁদতে কাঁদতে ঝিলিক বিড়বিড় করলো,
—কী এমন হলো আইয়ুশ যাতে তুমি এই এক মাসে এতো বদলে গেলে? তোমার ভালোবাসা বুঝি এতোটাই ঠুনকো ছিলো? কীভাবে তুমি আমাদের বাচ্চাকে মারার কথা বলতে পারো?
কাঁদতে কাঁদতে বিছানাতেই জ্ঞান হারায় ঝিলিক।
আইয়ুশ মির্জা!
মির্জা পরিবারের বড় ছেলে ওসমান মির্জার প্রথম পুত্র। বয়স ৩১ এর কোঠায়। মির্জা পরিবারের মেঝো ছেলে শাহদাদ মির্জার ছোট মেয়ে ঝিলিক মির্জা। বয়স উনিশ। যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠার দরুণ খুব কম বয়স থেকেই আইয়ুশ-ঝিলিক একে অপরের প্রতি টান অনুভব করে। এরপর প্রায় এক বছর সম্পর্কে থাকার পর আইয়ুশ নিজে ঝিলিককে বিয়ে করে পরিবারের থেকে গোপনে। কেননা তার ঝিলিককে হারিয়ে ফেলার ভয় হচ্ছিলো। কথা ছিলো ঝিলিকের পড়াশোনা শেষ হলেই বলে দিবে। অতঃপর সেখান থেকেই এতোকিছু।
জ্ঞান হারানো ঝিলিককে সযত্নে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে আইয়ুশ। চোখে যেনো তার অজস্র ব্যাথা। সে আহত চোখে চেয়ে থেকে বসে পড়লো ঝিলিকের শিয়রে। চোখদুটো অসম্ভব লাল। ঝিলিকের ডান হাতটা আঁকড়ে ধরে জড়বস্তুর ন্যায় চেয়ে রইলো নিষ্প্রভ; মলিন চেহারাটির দিকে। দুগালে আঙুলের ছাপ বসে আছে। এবার তার চোখ ঝিলিকের উদরে গিয়ে আটকালো। ওখানে এখন ছোট্ট একটি প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে। আইয়ুশ কাঁপা হাতে ঝিলিকের উদর ছুঁলো। ঠোঁট এগিয়ে সূক্ষ্ম একটি চুমু খেলো। বিড়বিড়িয়ে ভগ্ন স্বরে বললো,
—স্যরি সোনা। পাপা খুব হ্যাপি তোমাকে নিয়ে, কিন্তু বোধহয় এখন পাপা তোমাকে আর তোমার মাম্মামকে প্রোটেক্ট করতে পারবেনা। তোমার পাপা ভীষণ উইক, আই এম স্যরি সোনা।
আইয়ুশ ফের আশাহত দৃষ্টিতে ঝিলিকের দিকে চাইলো। হাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বেরিয়ে গেলো কোথাও।
দীর্ঘ দু’ঘন্টা পর জ্ঞান ফিরেছে ঝিলিকের। মাথাটা কেমন ভারি হয়ে আছে তার। ধীরে সুস্থে চোখ খুলে বোঝার চেষ্টা করলো আপাতত সে কোথায় আছে। নিজেরই রুম। আস্তে আস্তে উঠে বসলো সে। মাথায় অল্প জোর দিতেই সবকিছু মনে পড়ে গেলো৷ নিজের পেটে হাত ছুঁতেই আবারও কান্না পেলো তার। মেয়েদের কাছে মা হওয়ার অনুভূতির চেয়ে সুন্দর অনুভূতি আর নেই। অথচ এখন এই অনুভূতিই কেমন যেনো ঝিলিকের কাছে তিক্ত লাগছে। নিজের সকল ভাবনার মাঝেই নিচ থেকে শোরগোলের আওয়াজ এলো। বুঝতে না পেরে নিচের দিকে যেতে উদ্যত হয় ঝিলিক। তবে উঠতে গিয়েই মাথা ঘুরিয়ে ওঠে তার। সারাদিন না খাওয়ার হয়তো। ঝিলিক বহু কষ্টে এক পা, দু পা করে এগিয়ে যায়। উপর থেকেই দেখে পরিবারের সকলে মিলে কাওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। ঝিলিকের মা একটি সরতেই ঝিলিল দেখতে পায় তার বড় বোন সাঁঝকে। বধূবেশে। ঝিলিক অবাক হলো। তার আপু বিয়ে করেছে? কিন্তু কাকে? সে নিচে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ওসমান মির্জার কর্কশ বাক্য ভেসে আসে তার কানে,
—আইয়ুশ, তুমি যে সাঁঝকে পছন্দ করো তা তো একবার আমাদের জানালেও পারতে। এমন হুট করে বিয়ে করার কী ছিলো?
ঝিলিকের মনে হলো সে ভুল কিছু শুনেছে। সে এবার ভালো করে দেখলো। সত্যিই তো, আইয়ুশই তো বরবেশে দাঁড়িয়ে আছে। ঝিলিক দু’পা পিছিয়ে গেলো। সে যেনো শ্বাস নিতেই ভুলে গেলো। অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে রইলো আইয়ুশের পানে। চোখ হতে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছে। আইয়ুশের নজরও এবার ঝিলিকের পানে যায়। অথচ এমনভাবে সে নজর ফেরায় যেনো ঝিলিক কোনো ঘৃণিত বস্তু। পুরুষটি হাসছে। এতে যেনো ঝিলিকের বুকের জ্বালা হচ্ছে। তাকে এভাবে ঠকানোর কী খুব দরকার ছিলো?
