Home Remedy Remedy গল্পের লিংক || মীরা রায়াদ

Remedy গল্পের লিংক || মীরা রায়াদ

Remedy part 1
মীরা রায়াদ

“হ্যালো, হ্যাঁ আমি মাত্র এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করেছি। হুম সব ঠিক আছে।”
“আআআআআআআ”
আকস্মিক চিৎকারে ভড়কে গেলো মেয়েটি।কয়েক হাত দূরে ঠিক তার সামনে একটি মেয়ে এয়ারপোর্টের ফ্লোরে বসে বাচ্চাদের মতো হাতপা ছুঁড়ে সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে।
“ওকে আমি পরে কথা বলবো তোমার সাথে”
বলে সামনের দিকে পা আগাতে আগাতে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিলো একবার। তার মতো প্রায় অনেকেই কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে মেয়েটির দিকে আগালো সে। কাছাকাছি গিয়ে শুনতে পারল নিজস্ব ভাষায় মেয়েটি সমানতালে করো সাথে চেঁচিয়ে যাচ্ছে।

” ম্যাঁ আবহি শাদি নেহি করুঁগি। নেহি নেহি নেহি কাবহি নেহি। হ্যালো হ্যালো।”
ওপাশ থেকে ফোন কেটে দেয়া হয়েছে বোঝা গেলো। তৎক্ষণাৎ মেয়েটি রাগে আবার চেঁচিয়ে উঠলো –
” ইয়া আল্লাহ্য় মালিক ইয়ে কিয়া হো রাহা হে মেরে সাথ। কোয়ি তো বাঁচাও মুঝে উছ বান্দারিয়া ছে।”
” এক্সকিউজ মি”
দারুন রিনরিনে কণ্ঠটি শুনতে পেয়ে মেয়েটি সেদিকে ফিরে তাকালো। তার খুব নিকটে মায়া মায়া মুখের একটি মেয়ে মুচকি হাসি দিয়ে দাড়িয়ে আছে। পরনে তার খুবই হালকা রঙের একটি ছিমছাম শাড়ি। রংটা এমনই হালকা ছিল যে ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না আসলে কী রং। কিন্তু দেখতে ভারী মিষ্টি লাগছে। সাবলীল ভাবে একটি হাত খোপা করা, সামনে কিছু বেবি হেয়ার উড়ছে। অগোছালো চুল মুখে নেই কোনো প্রসাধনী। না কোনো অত্যধিক আধুনিকতা আর না জোর করে এক্সট্রা কোনো সাজ, তাও দেখলে চোখে কেমন শান্তি শান্তি লাগছে। মেয়ে হয়েও কেমন হা করে তাকিয়ে তার সুন্দর্য গিলে চলছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” হ্যালো মিস, আর ইউ অলরাইট”
বাহ্ আবার ক্রাশ খেয়ে গেলো। এত্তো কিউট কিভাবে রে ভাই! উফফ, পুরাই রসগোল্লা।
ওপাশ থেকে কোনো প্রতিউত্তর না পেয়ে শাড়ি পরিহিতা মেয়েটি খুবই বিব্রতবোধ করলো। কি বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে গেলো।
” হাই, আম ঈশাল রেহমান আনসারী”
নিজের নাম বলতে বলতে মেয়েটি ফ্লোর থেকে উঠে দাড়িয়ে পরলো। খুবই সহজাত তার ব্যবহার যেন সামনে দাড়ানো মানবীকে সে যুগযুগ ধরে চেনে।
ঈশালের এভাবে তাৎক্ষণিক ব্যবহার বদলানোতে মেয়েটি রীতিমতো ভড়কে গিয়ে দুকদম পিছে সরে দাড়ালো। তার এমন ভয় পাওয়াতে ঈশাল খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। যেন খুব মজার কিছু দেখেছে।
” আর ইউ স্কার্ড অফ মি? সরি সরি, ডোন্ট বি স্কার্ড। ইউ লুক রিয়েলি সুইট। হোয়াট’স ইউর নেম?”
বোঝা গেলো ঈশাল নামের মেয়েটি প্রচুর এক্সট্রোভার্ট সাথে কথা বলতে ভালোবাসে, এবং যখন তখন তার মুড চেঞ্জ হয়। কিছুটা ধীর স্থিরভাবে মেয়েটি ছোট করে জবাব দিল –

” আরীবা ঝুম”
বিপরীতে ঈশাল দ্বিগুণ উৎসাহের সাথে বলল –
” ঝুমঝুমি! “ওয়াহ! কামাল হ্যায়। তুমহারি তারাহ তুমহারা নাম ভি বহুত মিঠা হ্যায়। মুঝে বহুত পাসান্দ আয়া।”
এভাবে সরাসরি কারো থেকে নিজের প্রশংসা পেয়ে ঝুম ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পরলো। বলে রাখা ভালো সে খুব ভালো উর্দু না বুঝলেও মোটামুটি বুঝতে ও বলতে পারে। হালকা লাজুক হেসে প্রতিউত্তরে ঈশালকে ধন্যবাদ জানালো।
ঈশাল নামের মেয়েটি বুঝতে পরলো তার সামনে দাড়ালো মেয়েটি স্বল্পভাষী ও লাজুক স্বভাবের। তাই সে এবার নিজেই কথা আগাতে বলল –

( উর্দু সংলাপগুলো এবার থেকে বাংলাতে দেয়া হবে)
” কোথায় যাবে তুমি? তোমাকে কি কেউ নিতে এসেছে?”
এতোক্ষনে ঝুমির মনে পরলো সে বর্তমানে পাকিস্তানের জিন্নাহ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে অবস্থান করছে, যেটি করাচিতে অবস্থিত। সে তড়িঘড়ি করে নিজের হাতের ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নিলো রাত ১২:৩৭ মিনিট। তার মানে বাংলদেশে এখন ১:৩৭ মিনিট। ঝুম একটু চিন্তায় পরে গেলো, এতো রাতে একা করাচি শহরে কিভাবে পৌঁছবে? যদিও এখানে ট্যাক্সি কিংবা উবার/কারীম/ইন্ড্রাইভ কল করে নেয়া যাবে কিন্তু তারপরও একা মেয়ে একটু তো ভয় করেই।

” আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি কিছু কাজের জন্য। তারেক রোড যাবো।”
ছোট করে হেসে জবাব দিলো ঝুম।
” তারেক রোড! আরে বাহ্। আমিও তো ওখানেই যাবো। তোমাকে কি কেউ নিতে আসবে? কোথায় থাকবে তুমি? এই জানো আমি না কখনো বাংলাদেশীদের দেখিনি। তুমিই প্রথম। যদিও আমার বড় চাচি আম্মাও একজন বাংলাদেশী। কিন্তু সে অনেক ছোট থেকে পাকিস্তানে থাকেন।বাংলাদেশীরা বুঝি তোমার মতো মিষ্টি দেখতে হয়? তোমাদের স্কিন এতো সফ্ট কেন? জানো বড় চাচি আম্মার স্কিনও তোমার মতো।”
কথা বলতে বলতে ঈশাল ঝুমের গাল টিপে দিল। এমন কাজে ঝুম কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পরলো।
” না আমাকে কেউ নিতে আসবে না। আমি একাই যাবো কোনো উবার বা ট্যাক্সি ধরে। ভেবেছি তারেক রোডের আশেপাশে কোথাও কোনো হোটেলে থাকবো। আমার কথা ছাড়ো। তুমি ওভাবে করছিলে কেন? সব ঠিক আছেতো? আসলে সবাই কেমন করে যেন তাকাচ্ছিল।”

খুবই ইতস্তত বোধ করছিলো ঝুম কথাগুলো বলার সময়। একসাথে এতগুলো কথা ও খুব একটা বলে না।
” সেকি কথা একা যাবে কেন? আমিও তো একই জায়গা যাচ্ছি। চলো তুমি আমার সাথে যাবে। আর আমার বন্ধু হয়ে কি না একা একা এতটা পথ যাবে? এটা মানা যাচ্ছে না, একদম মানা যাচ্ছে না।”
কিছুটা বাচ্চাদের মতো মাথা নেড়ে ফিল্মি স্টাইলে কথা গুলো বলল ঈশাল। আবার বলল –
” বাকী কথা গাড়িতে বলবো। আমার বাসা থেকে গাড়ি পাঠিয়েছে। তুমি একদম ভয় পেও না। এই ঈশাল থাকতে তোমার কোনো ভয় নেই।”

বলতে বলতে ঝুমের হাত টেনে এয়ারপোর্টের বাইরে ছুটলো। বেচারি ঝুম পরলো মহা বিপদে। চেনা নেই জানা নেই অচেনা একটা মেয়েকে কি বিশ্বাস করা যায়? আজকাল কার যে দিন, কারো বিশ্বাস নেই। আর বলা নেই কওয়া নেই বন্ধু হয়ে গেলো? এ কি মুসিবত আল্লাহ? কেন যে মেয়েটার কাছে এসেছিলো? ভেবেই অদৃশ্য হাতে দুগালে দুটা থাপ্পড় লাগাতে মন চাইলো নিজেকে।
টানতে টানতে এক প্রকার জোর করেই ঝুমকে গাড়িতে তুলল ঈশাল। ভয়ে হোক আর ভদ্রতার খাতিরেই হোক ঝুম টু শব্দটি করতে পারলো না। গাড়ি চলছে আপন গতিতে। এরই মাঝে ঈশাল নামের মেয়েটি অনেক কিছু বলে চলেছে। দুদণ্ড চুপ নেই।

” বুঝলে আমার বিয়ে ঠিক করেছে আমার পরিবার এক বান্দরের সাথে। যদিও বান্দরটাকে আমি ছোট থেকেই চিনি। আমরা একে অন্যকে চার বছর ধরে ভালবাসি। সামনের মাসে আমাদের বিয়ে।”
এতটুকু বলেই লজ্জায় লাল হয়ে গেলো ঈশাল। ঝুম অবাক চোখে দেখল মেয়েটিকে। কি অদ্ভুত! ভালই যখন বাসে তাহলে বিয়ে করবে না কেন বলল? ঝুমের ভাবনার মাঝেই ঈশাল নিজের ভাবমূর্তি বদলে রাগী মুখ করে বলল –
” কিন্তু এখন আমি ওই বান্দর ছেলেকে কখনোই বিয়ে করব না। পাজি, বদ, অসভ্য ছেলে। জানো জানো কি করেছে ও?”
ঝুম দুদিকে মাথা নেড়ে বুঝালো সে জানে না। জানার কথাও তো না। সেতো ইজনমে এদের দেখেনি।
ঈশাল কিছুটা দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল –

” আমাকে রেখে ট্যুরে চলে গেছে। কত বাজে ভাবতে পারছো? তুমি বলো এটা কি ঠিক করেছে? একদম ঠিক করেনি। এইজন্য আমিও আমার খালাজানের কাছে ট্যুরে গেছিলাম।”
বলেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। ঝুম তখনো অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। তার মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। এবার ঈশাল স্পষ্টভাবে বলতে শুরু করলো –
” আমার বাগদত্তা মানে সাদ ইয়াসির আমার ফুপিজানের ছেলে। বিয়ে করব না সেটাতো রেগে বলেছি। রাগ করে আমি আমার বড় খালাজানের কাছে গিয়েছিলাম ইউকে। আজই আসলাম। ওই বদ লোকটাকে একটু শায়েস্তা না করলে চলছিল না। এতো করে বললাম অফিসিয়াল ট্যুরে যেতে হবে না মেয়েগুলো কেমন যেন। শুনলোই না। তাই ভয় দিলাম। বুঝলে?”
ঝুম এবার বিজ্ঞের মতো করে মাথা নাড়িয়ে বুঝালো সে বুঝেছে, আসলেই বুঝতে পেরেছে। সাথে এটাও বুঝেছে মেয়েটি একটু পাগল আছে।

” এবার তোমাকে আমার পরিবারের কথা বলি শোনো। আমার বাসায় আমার দাদাজান – দাদিজান, বড় চাচাজান – বড় চাচী আম্মা, আব্বি – আম্মি, ছোট চাচাজান – ছোট চাচী আম্মা, আর অনেক গুলো ভাইবোন আছে। ওখানে গেলে সবাইকে দেখতে পাবে শুধু বড় ভাইজান আর ছোট ভাইজানকে ছাড়া। ওরা কেউ করাচিতে নেই। কি একটা কাজে গেছে ফিরতে সময় লাগবে। তাছাড়া মোটামুটি সবাইকে পাবে। আমার বড় চাচাজানের এক ছেলে এক মেয়ে। বড় ভাইজান আর সারা আপি। আমার সারা আপি বেস্ট। খুব মিষ্টি তোমার মতো । সারা আপির বিয়ে হয়েছে। আপির ছোট একটি ছেলে বেবি আছে। আর একটা আপকামিং। হিহিহি। সারা আপির হাজবেন্ড মানে জুবাইর ভাইজানের নিজেদের কোম্পানি আছে। সফটওয়ার কোম্পানি। আপির ছেলে হামজা আমাদের সবার খুব আদরের। এবার ৪ বছর চলছে। আর বড় ভাইজানের কথা নাই বা বলি। ভাইজানকে আমরা সব ভাইবোন খুব ভয় পাই। সারাক্ষণ বোকা দেয়। ভাইজান একজন Trauma Specialist। আমরা দুবোন। আমি আর আমার বোন মিশাল। আমি গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে এবার মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছি। মিশাল বিবিএ ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে। আর ছোট চাচাজানের দুই ছেলে। আহির ভাইজান মানে আমার ছোট ভাইজান আর আয়ান। ছোট ভাইজান সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। আর আয়ান এ লেভেলের স্টুডেন্ট। বড় ভাইজান আর ছোট ভাইজান প্রায় একই বয়সের। তারপর সারা আপি তারপর আমি। আমার পরে মিশাল আর আয়ান সবার ছোট। এই হলো আমার পরিবার। এছাড়াও আমার দুজন ফুপি আছেন। তারাও আমার বিয়েতে আসবে খুব তাড়াতাড়ি। এবার বলতো তোমার বাসায় কে কে আছে আর তুমি এখানে কেন এসেছো?”
এতক্ষন ধরে ঈশালের কথা খুব মনে দিয়ে শুনছিল ঝুম। কিন্তু পরিবারের কথা আসাতে কেমন যেন বিষন্ন দেখালো তাকে। কিছুটা রয়েসয়ে উত্তর দিলো –

” আমার আপন বলতে কেউ নেই।”
খুবই ক্ষীণ সংলাপে উত্তর শেষ করলো সে। ঈশালের খুব মায়া হলো কেন যেন মেয়েটির ওপর। ইসস এত্তো সুন্দর মেয়েটার আপন বলতে কেউ নেই? কোথায় সবাই? যদিও মনে অনেক প্রশ্ন তাও ঝুমকে এই বিষয়ে আর না ঘেঁটে বলল –
” আচ্ছা ওসব বাদ দাও। কেন এসেছ তাতো বললে না? ঘুরতে এসেছ বুঝি? কিন্তু একা? একা কেউ ঘুরতে আসে? আগে কখনো এসেছো? দেখেতো মনে হয়না।”
” না না আমি এখানে ঘুরতে আসিনি। তুমি ঠিকই ভেবেছো, আমি এখানে প্রথমবার এসেছি। আসলে বাংলাদেশে আমার একটা ছোট করে ব্যবসা আছে। মেয়েদের কাপড়ের শপ আছে, সাথে আমি একটা পেইজের ওনার ও। সেই সুবাদেই পাকিস্তানে পা রাখা। রিসেন্টলি আমাদের দেশে পাকিস্তানি ড্রেসের ডিমান্ড খুব। আগে আমি ইন্ডিয়া থেকে ড্রেস এক্সপোর্ট করতাম। সেই সুবাদে ইন্ডিয়া বেশ কিছুবার যাওয়া হয়েছে কিন্তু পাকিস্তান এই প্রথম।আমার সাথে আমার এসিস্ট্যান্টেরও আসার কথা ছিল কিন্তু লাস্ট মোমেন্টে ও খুব অসুস্থ হয়ে পরে আর এদিকে আসাটাও খুব দরকার ছিল তাই একাই এসে গেলাম।”

” তার মানে তুমি এখানে পাকিস্তানি ড্রেস কিনতে এসেছো?”
ঈশালের কোথায় ঝুম মৃদু মাথা নেড়ে সায় জানালো।
” কোন মার্কেট থেকে?”
ঈশাল বিস্ময়ে হতভাগ হয়ে প্রশ্ন করে বসলো। যেন এর পরবর্তী উত্তর তার জানা আর তা সঠিক কিনা যাচাইয়ের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে যাচ্ছে। ঝুমের এবার খুব বেশি অস্বস্তি হচ্ছে। মেয়েটি এভাবে তাকিয়ে আছে কেন অদ্ভুত?
” রাবি সেন্টার, তারিক রোড।”
” কিহ্!”
বিকট এক চিৎকারে ঝুম প্রায় লাফিয়ে উঠলো। সামনে বসা ড্রাইভার ও কিঞ্চিৎ থমকে গেলো। ঝুম বুঝতে পরলো না সে কি কোনো ভুল কিছু বলে ফেলেছে?
নিজের ভুল বুঝতে পেরে ঈশাল নিজের গলার স্বর নামিয়ে খুবই উচ্ছ্বাসের সাথে বলল –

” সত্যি! জানো আমরাও ওখানেই থাকি। তারিক রোড , বাহাদুরাবাদে থাকি। ওখান থেকে রাবি সেন্টার মাত্র ৫/১০ মিনিটের পথ। ট্রাস্ট মি। আর মজার ব্যাপার কি জানো? আমার বাবা চাচাদের কাপড়েরই ব্যবসা। রাবি সেন্টারে আমাদের অনেক গুলো শপ আছে। দারুন না?”
ঝুম শুধু মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো।
ঈশাল আবার বলল –
” তুমি এক কাজ করো, যেহেতু আমরা এখন বন্ধু। কি বন্ধু না?”
ঝুম কি বলবে বুঝতে না পেরেও মেয়েটির কথায় সায় জানালো। ঝুমের হ্যাঁ তে যেন মেয়েটি আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেছে এমন খুশি হলো।
” তাহলে তুমি আমার বন্ধু, আমিও তোমার বন্ধু। আর কিছু দিন পরে আমার বিয়ে। তুমিও এখানে নতুন কিছুই চেনো না। আবার যে কাজে এখানে এসেছো তাতে আমি তোমায় সাহায্যও করতে পারব। তারমানে তুমি এখন কোনো হোটেলে উঠবে না সোজা আমার সাথে আমার বাসায় যাবে।”

“কিহ্?”
ঈশালের এমন কথায় ঝুম হতবম্ভে বাকহারা হয়ে গেলো। বলে কী মেয়ে? চেনা নেই জানা নেই অচেনা একটা মেয়েকে তার বাসায় নিতে চাচ্ছে? আর সেও কি ডেংডেং করে চলে যাবে নাকি? কি অদ্ভুত কি অদ্ভুত। এখানে সবাই কি এমনি নাকি এই মেয়েটাই এমন।
” না না তার কোনো দরকার নেই। আমি কোনো হোটেলে ম্যানেজ করে নিতে পারবো। আর তাছাড়া বেশি দিনের ব্যাপার না তো, মাত্র কিছু দিন। কাজ হয়ে গেলে আমি আবার বাংলাদেশে ব্যাক করব। ব্যস্ত হওয়ার কোনো দরকার নেই। থ্যাঙ্ক ইউ।”
মনের কথা প্রকাশ না করে ভদ্রতা রক্ষার্থে কথাগুলো বলল ঝুম।
” আরে তুমি কি ভয় পাচ্ছো আমায়? ভাবছো তোমায় কিডন্যাপ করব কি না? ভয় পেও না। আমার ফ্যামিলি খুব ভালো। তুমি একবার গিয়ে দেখো ভালো লাগবে।”
ঝুমের দিকে ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল ঈশাল।

” না না এমন কিছু না। আসলে আমি তোমায় কষ্ট দিতে চাইনি। সরি।”
” তাহলে আর কি তুমি আমার সাথে আমার বাসায় যাচ্ছো এটাই ফাইনাল।”
খুবই উচ্ছ্বসিত দেখালো ঈশালকে। ঝুম আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে আকাশ দেখায় মন দিল। বুঝতে পারল সে বড় ফাঁসা ফেঁসে গেছে। ঈশাল তাকে এতো সহজে ছাড়বে না। আচ্ছা এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল? কই সে তো এভাবে কিছু ভাবেনি তাহলে? আর কিছু ভাবতে চায় না। যদি খারাপ কিছু হয়েই থাকে তাও তার কিছু বলার নেই। আল্লাহর উপর তার পুরো বিশ্বাস আছে। অতীতের থেকে যে বেশি খারাপ কিছু হবে না তাও সে জানে । সুতরাং, এতো ভেবে কিছু হবে না।

পাশের সিটে বসে ঈশাল ননস্টপ কথা বলে যাচ্ছে। যার কিছুই ঝুম শুনছে না। শুনবে কি করে তার সব চিন্তা ভাবনা ওই আকাশ দেখায় পরে আছে। আচ্ছা বাংলাদেশের আকাশ আর পাকিস্তানের আকাশের মাঝে কি একটু ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে? হ্যাঁ, যাচ্ছে তো। এই আকাশে শুন্যতা নেই, দম বন্ধকরা কষ্ট নেই।
প্রায় ৪০ মিনিট পর গাড়ি এসে কিছুটা আধুনিক ও অনেকটা পুরোনো ধাঁচের বাড়ির সামনে থামলো। ঈশাল চট জলদি বেরিয়ে ঝুমকে বের হতে সাহায্য করলো। ঝুম মেয়েটি কে যতো দেখে ততোই অবাক হয়। একটা অচেনা অপরিচিত মেয়েকে নিয়ে কেউ কিভাবে এত হইহুল্লোড় করতে পারে?
গাড়ি থেকে নেমে ঝুম দেখলো চারি পাশে প্রাচীর তোলা দোতলা একটি বাড়ি।অন্যান্য শহুরে এলাকার মতই কাছাকাছি অনেক গুলো বাড়ি স্বগৌরবে দাড়িয়ে আছে। কিন্তু পরিবেশটা খুব শান্ত, হয়তো রাত বলে তাই। রাতের আধারে ভালো করে না বোঝা গেলেও বাড়ির সামনের কিছু লাইটের জন্য ঝুম বুঝল ঈশালরা বনেদি পরিবার। বাড়ির সামনের ছোট একটি কালো রংয়ের গেট দিয়ে ততক্ষনে ড্রাইভার তার এবং ঈশালের লাগেজ ভিতরে নিয়ে গেছে। হাতে টান পরায় ঝুম নিজের ভাবনা থেকে বের হলো।

” চলো চলো আম্মিজান অপেক্ষা করছে হয়তো।”
দরজা পর্যন্ত এসে ঝুমের হাত ছেড়ে ঈশাল প্রায় ছুটে দৌড়ে গেলো। মুহূর্তে আনুমানিক ৪৫/৪৮ বছরের এক মধ্যবয়সি মহিলাকে জড়িয়ে ধরলো।
” আম্মিজান। কেমন আছেন আম্মিজান? খুব মিস করেছি আপনাকে আম্মিজান।”
” আরে আরে আস্তে ঈশাল। বড় হয়েছেন আপনি, বিয়ে হবে আপনার। এখনো এমন বাচ্চামো করলে হয়?”
স্নেহাতুর ভঙ্গিতে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন উনি। ঝুম বুঝতে পরলো ভদ্রমহিলা ঈশালের মা। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ঝুম কি করবে বুঝতে পারল না। বড়ই অস্বস্তি হচ্ছে তার।
” ওহ আম্মি, আমার বিয়ে হোক বা চার বাচ্চার আম্মি হয়ে যাই না কেন, আমি সবসময়ই আপনার কাছে বাচ্চাই থাকবো। আর তাছাড়া আমি আপনার ওপর রেগে আছি। আপনি আমাকে ঐ খারাপ, বাজে লোকটার সাথে বিয়ে দিয়ে পর করে দিতে যাচ্ছেন।”

” ঈশাল! মুখের ভাষা ঠিক করুন আপনার। দুদিন পর যে আপনার স্বামী হবে তাকে নিয়ে এসব কি শব্দ উচ্চরণ করছেন আপনি? এই আমরা আপনকে শিক্ষা দিয়েছি?”
হঠাৎ ভীষণ কর্কষ ভাষায় পুরো হলরুম শান্ত হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে কোনো ঝড় আসবে। ঈশালের মায়ের বয়সী এক মহিলা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আবার
বলল –
” আর তাছাড়া তাকে আপনি নিজে পছন্দ করেছেন, আমরা কেউ আপনাকে ফোর্স করিনি। এই সম্পর্ক বাদ দিলেও সে আপনার ফুপিজানের ছেলে। সুতরাং সন্মান দিয়ে কথা বলেন সে আপনার বড় হয়।”
ভদ্র মহিলার কঠিন ভাষায় ঈশাল চুপ করে গেলো।

” আপা আপনি ভুল ভাবছেন। ছোট মানুষ বুঝতে পারেনি রেগে আছে তো। আমি বুঝাচ্ছি ওকে।”
” হ্যাঁ বুঝাও ওকে যে আমাদের বাড়ির মেয়েরা এভাবে কথা বলে না, তারা মার্জিত ভাষা ব্যবহার করে।”
” সরি বড় চাচি আম্মা। আমি ওভাবে বলতে চাইনি।”
খুব ই নম্র ভাবে বলল ঈশাল। এতক্ষনের পরিচিত মেয়েটাকে রীতিমত অপরিচিত লাগলো ঝুমের নিকট। এতক্ষন যে উচ্ছ্বাস তার চোখে মুখে ছিল তা আর নেই। মা আর চাচীর মাঝে বুঝি এতটা পার্থক্য থাকে? হ্যাঁ থাকে তো। ঝুম নিজেও সেই বৈষম্যের শিকার হয়েছে।
মৃদু মাথা নেড়ে ভদ্রমহিলা সামনের দিকে তাকালে দরজার কাছে জড়োসড়ো হয়ে দাড়ানো ঝূমকে দেখে আপনা আপনি ভ্রু কুচকে গেলো। নিরবে ঝুমের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে সামনে এগিয়ে জিজ্ঞেস করলো –

” কে আপনি? কাকে চাই?”
এবার ঝুমের ভয় হতে শুরু করলো। কি গুরুগম্ভীর গলার আওয়াজ। হয়তো উনি নরমাল ভাবেই বলেছে তাও ঝুমের কাছে মনে হলো স্কুলের হেড মিস বকা দিচ্ছে। আচ্ছা উত্তরে সে কি বলবে? গলা থেকে তো আওয়াজই বের হচ্ছে না কি বলবে? যদি ওকে বের করে দেয় বা ঈশালের মতো বকা দেয়? এতো কেন ভাবছে ও? ওতো নিজের ইচ্ছায় আসেনি। ঈশাল না নিয়ে আসলে ও যেভাবে ব্যবস্থা করত এখনো না হয় তাই করবে। লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগে ঈশাল বলল –
” বড় চাচি আম্মা, ঝুমঝুমি আমার বন্ধু। বাংলাদেশ থেকে আমার বিয়েতে এসেছে।”
ঈশালের উত্তরে বড় বড় চোখ করে ঝুম তার পানে চাইলো। বলে কী মেয়ে? মিথ্যা কেন বলছে? এদিকে ভদ্রমহিলার কুঁচকে যাওয়া ভ্রু আরও কিছুটা কুচকে গেলো বাংলাদেশের কথা শুনে। সে প্রশ্ন
করলো –

” বাংলাদেশ? এতো দূর থেকে বিয়েতে এসেছে? নাম কি আপনার? বাংলাদেশের কোথায় থাকেন? পরিবারে কে কে আছে?”
এক সাথে এতো প্রশ্নে নিজেকে কাঠগোড়ার আসামীর থেকে কম কিছু মনে হলো না ঝুমের। একবার মনে হলো সত্যিটা বলে দিতে কিন্তু পরমুহুর্তে মনে হলো ঈশাল নামের মেয়েটি তাকে কত আশা নিয়েই না নিয়ে এসেছে তার সাথে এভাবে না করাটাই মানানসই।
এবার সে নিজের সাথে যুদ্ধ করে আস্তে ধীরে উত্তর দিল –

” আরীবা ঝুম। আমি বাংলাদেশের খুলনা থাকি। পরিবারে আমার বলার মতো তেমন কেউ নেই।”
” কেনো? আপনার আম্মি আব্বা তারা?”
” আমার মা বাবা বেঁচে নেই।”

Remedy part 2