Remedy part 3
মীরা রায়াদ
বেডের হেডবোর্ডের সাথে শরীর এলিয়ে বসে আছে শাইয়ান। দৃষ্টি তার জানালার বাইরে। গুমট গম্ভীর মুখভঙ্গি। আহির সেই কখন থেকে দরজার অভিমুখে দাঁড়িয়ে তাকে দেখে যাচ্ছে, কিন্তু শাইয়ানের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে আপন মনে কিছু একটা ভেবে চলছে। তারা হসপিটাল থেকে বাড়িতে এসেছে। মাঝে একদিন শাইয়ানকে হসপিটালে ডক্টরদের অবজার্ভেশনে রাখা হয়েছিল। গুরুতর কিছু না হলেও বাড়ির সবাই ভীষণ ভয় পেয়েছিল। বিশেষ করে মেহেরুন্নেসা। সেই কাল থেকে ছেলেকে কাছ ছাড়া করেনি।
এইতো কিছুক্ষন পূর্বে নিচে গেল আহিরকে শাইয়ানের কাছে রেখে। আহির নিজে কি ভয় পায়নি? পেয়েছিল। খুব ভয় পেয়েছিল। এই ভাইকে সে খুব ভালবাসে। কাজিন হলেও তাদের সব ভাই বোনদের মাঝে অদ্ভুত এক টান কাজ করে। শাইয়ানকে সে সব থেকে বেশি ভালবাসে। হয়তো বয়সে তাদের খুব বেশি গ্যাপ নেই তাই! তাছাড়া ছোট থেকে দুজন একই সাথে বড় হয়েছে। বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে শাইয়ান কি তাদের জন্য কম করেছে? সেই ভাই কম বন্ধুকে যখন ওমন নিস্তেজ অবস্থায় দেখলো, তখন তার বুক কাপছিল। শক্তি পাচ্ছিল না শরীরে। তার ওমন শক্তপোক্ত ভাইটা যেকিনা কখনও কাউকে বুঝতে দেয়নি তার কষ্ট সে কিভাবে হসপিটাল পর্যন্ত চলে গেল? তাও আবার কোনো মেজর রিজন ছাড়া! এখানেই আহিরের খটকা লাগছে। কিছু একটা ব্যাপার নিশ্চই আছে। নয়তো শাইয়নের মতো তুখোড় মস্তিষ্কের যুবক তার উপস্থিতি বুঝতে পারল না এখনো? কি ভাবছে? কি হয়েছে শাইয়নের?
হালকা শুষ্ক কাশির মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি বোঝালো আহির। শাইয়ান দৃষ্টি সরিয়ে আহিরের পানে চাইল।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” কাম।”
” এখন কেমন লাগছে?”
” বেটার।”
” রিয়েলি!”
এই পর্যায়ে শাইয়ান গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চাইল আহিরের দিকে। নির্নিমেষ কিছু সময় তাকিয়ে বুঝে নিল কি বুঝাতে চেয়েছে।
” মেয়েটিকে?”
সহসাই আহির চমকে উঠল। মেয়ে! কোন মেয়ে? কার কথা বলছে শাইয়ান? সেতো অফিসিয়াল কাজে গেছিল শহরের বাইরে, কোনো মেয়েতো ছিল না সাথে। তাহলে কার কথা বলছে?
” কোন মেয়ে? আমার সাথে কোনো মেয়ে ছিল না শাইয়ান ট্রাস্ট মি।”
মনের অস্থিরতা তারওপর আহিরের অদ্ভুত বেশি বোঝা কথায় মুহূর্তে মেজাজ খারাপ করে দিলো শাইয়ানের। মুখে ‘ চ ‘ আকৃতির বিরক্তি সুচক শব্দ বের হয়ে আসলো আপনা থেকেই।
” আহির। অযথাই বেশি বলবে না। এই বাড়িতে নতুন একটা মেয়ে এসেছে। ঈশালের সাথে। তুমি কিছু জানো এই ব্যাপারে?”
দু দিকে পরপর মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তরে সে জানালো সে জানে না। সত্যিই জানে না। এ বাড়িতে নতুন কোনো মেয়ে এসেছে এই কথাটা মাত্র শাইয়ানের মার্ফলত জানতে পেরেছে। কিন্তু এই মেয়ের ব্যাপারটা কি? জানতে হচ্ছে তো।
” কি ব্যাপার বলতো? তোমার হয়ে ছিল কি কাল? আমরা সবাই কত চিন্তায় পরে গেছিলাম জানো? কি হয়েছে না বলে তুমি কোন মেয়ের কথা বলে যাচ্ছ তখন থেকে। ব্যাপার কি?”
” কিছু না। তুমি এখন আসতে পারো আমি ঘুমাবো।”
বলতে বলতে সে শুয়ে পরলো। এদিকে আহির চোখ ছোট ছোট করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শাইয়ানকে পর্যবেক্ষন করলো।হঠাৎ তার ঠোঁটের কোনে ছোট একটু হাসির আভাস খেলে গেল। তার ভাবনা যদি সত্যি হয় তাহলে কেমন হবে ব্যাপার টা? দেখতে হচ্ছে মেয়েটাকে একবার। পিছু ফিরে যেতে যেতে শাইয়ানকে শুনিয়ে বলতে লাগলো –
” দেখতে হচ্ছে বাসায় আসা নতুন মেয়েটিকে। কে সে যাকে আহির এখনো দেখলো না।”
আহিরের কথায় কপাল কুচকে গেল শাইয়ানের। ভুল করেছে এই বাঁদরের সামনে মুখ খুলে। এখন না জানি কি করে বসে।
শাইয়ানের রুম থেকে বের হয়ে করিডোর পারিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ড্রইংরুমে অদ্ভুত দৃশ্য দেখে থেমে যায় আহির। ভ্রু কুচকে জহুরী চোখে কিছুক্ষন তাকিয়ে আবার সামনে পা বাড়ালো। ছোটো খাটো লিলিপুটের মতো একটি মেয়ে ইতিউতি করে কিছু খুঁজে যাচ্ছে। পরনে তার হালকা গোলাপী রঙের শাড়ি। মাথায় মস্তবড় একটি খোপা। মনে হচ্ছে খোপার ভাড়ে মাথাটা ভেঙে না পরে যায়। মেয়েটি কখনো সোফার কুশন উঠাচ্ছে তো কখনো সোফার নিচে ঝুঁকে দেখছে। আবার সোফার কাছে এসে দেখছে। বড়ই বিচ্ছিন্ন তার কাজের ধরন। মূলত, ঝুম তার মায়ের দেয়া নূপুর খুঁজছিল। যেটি সে আজ ঘুম থেকে উঠে থেকে পাচ্ছে না। সারা বাড়ী খুঁজে দেখেছে কিন্তু পেল না। রাগে দুঃখে মনে হচ্ছে কেঁদে দিবে।আম্মা কত ভালোবেসে পরিয়ে দিয়ে ছিল। কিভাবে সে হারিয়ে ফেলল? আহির ধীরে শব্দহীন পায়ে এগিয়ে দাড়াল ঝুমের ঠিক পিছনে দূরত্ব রেখে। ঝুম তখনো আপন মনে তার হারিয়ে যাওয়া রত্ন খুঁজে চলেছে।
” হ্যালো, কে আপনি? কিছু কি খুঁজছেন?”
নিজের অতি নিকটে কোনো অপরিচিত পুরুষালি কন্ঠে ঝুম রীতিমত আতঙ্কে সিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো। কিন্তু হায় ভাগ্য তাঁর, এইবারও ভাগ্য তার সাথ দিলো না। দূরে সরতে গিয়ে ড্রয়িংরুমে রাখা ছোট্ট টেবিলের সাথে লেগে ধুম করে মেঝেতে পরলো। ব্যাথায় চোখ মুখ কুঁচকে সেভাবেই পরে রইলো সে। এদিকে এহেন আকস্মিক ঘটনায় আহির নিজের বোধবুদ্ধি খুইয়ে হতভম্বের ন্যায় ঝুমের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু সময়।
” আর ইয়ু অলরাইট মিস? দেখি কোথায় লেগেছে আপনার? উঠে আসুন।”
বলতে বলতে এগিয়ে গেল ঝুমের দিকে। আহিরকে নিজের নিকট এগিয়ে আসতে দেখে ওভাবেই দুহাতের ভরে সরে পিছে সড়লো আরো। তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে সে ভয় পেয়েছে, তাই আহির পিছে হেটে বলল –
” ইটস ওকে। ইটস ওকে। রিল্যাক্স প্লীজ আমি সরে দাঁড়িয়েছি। ভয় পাবেন না। কোথায় লেগেছে আপনার?”
ছেলেটিকে সরতে দেখে ঝুম এবার পুরোপুরি ফিরে চাইল তার পানে। ভীষণ লম্বা আর সুন্দর দেখতে ছেলেটি খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে উত্তরের আশায়। হালকা ছাই রঙের ট্রাউজার আর কালো টি শার্ট পরনে। মাথা ভর্তি অগোছালো বাবরি চুল, যা একটি হেয়ার ব্যান্ডের সাহায্যে বাচ্চাদের মতো উপরের দিকে ঠেলে রাখা। ঘাড় পর্যন্ত এতো বড় চুল দেখে ঝুম আবার চোখমুখ কুচকে ফেলল। মনে মনে দুবার উচ্চরণ করে বসলো ‘ বখাটে ছেলে ‘। ঝুমের মুখোভাব দেখে আহির ভীষণ মজা পেল। বুঝতে পারল সামনে বসা বাচ্চা মেয়েটি তাকে ভয় পাচ্ছে। তাই তাকে আরো একটু ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো –
” আপনি এখানে কি করছিলেন? আর কে আপনি? চুরি করতে ঢুকেননি তো? সত্যি করে বলুন আমায়, দয়া হলে কাউকে কিছু না বলে যেতে দিবো নয়তো পুলিশ ডাকবো।”
আহির ভালই বুঝতে পেরেছে এই সেই মেয়ে যার কথা শাইয়ান তার কাছে জিজ্ঞেস করেছিল।
আহিরের এহেন কথায় ভয়ে ঝুমের সুন্দর মুখটি রক্তশূন্য হয়ে গেল। আচ্ছা মুসিবত তো এই ছেলে। একেই নূপুর হারিয়ে যাওয়ার শোক তার ওপর ব্যাথায় কেঁদে দেয়া অবস্থা এখন আবার এই বজ্জাত পাজি ছেলের যন্ত্রণা। এখন এই নমুনাকে সে কিভাবে বুঝাবে সে চোর না। আশে পাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল যদি পরিচিত কোনো মুখ পাওয়া যায়। কিন্তু নাহ্, আজ দিনটা তার জন্য একদম শুভ না। পঁচা দিন আজ। একের পর এক খারাপ ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। না পারতে এবার সে কেঁদেই ফেলল। বড়বড় চোখ দুটি থেকে অঝোর ধারায় টপটপ করে পানি পরতে লাগলো। এ যেন রাজ্যহারা সর্বদুঃখী রাজকন্যা।
আহির বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলো ফোলা ফোলা গালের বাচ্চা মেয়েটির কান্না। আচ্ছা এই মেয়েটির বয়স হবে কত? শাইয়ানের মতো ছেলে এই মেয়েটির কথা কিভাবে খোঁজ করল? এই নরম সরম ভীতু মেয়েটি আর ওমন শক্তপোক্ত পুরুষ? নাহ্ আর ভাবতে চায় না সে। যা হওয়ার তা দেখা যাবে এখন এই মেয়েকে থামাতে হবে নয়তো বাড়ির কেউ জানতে পারলে কেলেংকারী বেঁধে যাবে। আহির কিছু বলবে তার মাঝে মেহেরুন্নেসাকে কিচেন থেকে আসতে দেখা গেল। যে এতো সময় ধরে ছেলের জন্য স্বাস্থ্যকর স্যুপ তৈরি করছিল। দুহাতে খাবারের ট্রে নিয়ে কিচেন থেকে বের হতে ড্রইংরুমে হতবাক আহিরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোখ তীক্ষ্ণ করে ফেলল। আহিরের দৃষ্টি সমান সামনে তাকালে এক কোনায় জড়সড় ঝুমকে মেঝেতে বসে কাদতে দেখে দ্রুত পায়ে ছুটে এসে কোনো রকম ট্রেটি টেবিলে রেখে ঝুমের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পরলো।
” একি! কি হয়েছে আপনার? কাদছেন কেন?”
খাঁখা মরুভূমির মাঝে যেমন একফোঁটা পানি প্রাণ ফিরিয়ে দেয় ঠিক তেমনই মেহেরুন্নেসাকে দেখে ঝুমের কলিজায় যেন কেউ একফোঁটা না না ফুরো এক বালতি পানি ঢেলে দিয়েছে। বিপদের মাঝে আপন মানুষকে পেয়ে যেমন মানুষ প্রাণ ফিরে পায় তেমনই ঝুমও মেহেরুন্নেসাকে পেয়ে আকুল হয়ে কেঁদে ফেলল।
” আণ্টি আণ্টি।”
” এইতো আমার সোনাবাচ্চা। কি হয়েছে? ভয় পেয়েছেন? আপনি শান্ত হন আগে। কিছু হয়নি।”
বলতে বলতে ট্রে থেকে শাইয়ানের জন্য আনা পানির গ্লাসটি ঝুমের মুখে ধরল। ঝুম কোনো মতে পানিটুকু খেয়ে আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে
বলল –
” ব্যাথা পেয়েছি এখানে ( আঙুল দিয়ে নিজের কোমর, হাঁটু ও পায়ের গোড়ালি দেখিয়ে বলল)। আমার আম্মার দেয়া নূপুর খুঁজে পাচ্ছি না।”
” আচ্ছা আচ্ছা শান্ত হন। আমরা দেখছি খুঁজে। ঠিক খুঁজে পাওয়া যাবে। দেখি তাকান আমার দিকে ( বলতে বলতে ঝুমের চোখের পানি মুছে দিল দুহাতে)। আপনিতো বাসার বাইরে যাননি, এখানেই কোথাও আছে। এখন উঠুন দেখি ওষুধ লাগিয়ে দিবো। ঈশাল…. ঈশাল।”
ঝুমকে ধরে সোফায় বসাতে বসাতে ঈশালকে ডেকে উঠলো মেহেরুন্নেসা। উপর থেকে ঈশালের তীক্ষ্ণ কন্ঠ ভেসে আসলো –
” আসছি বড় চাচিআম্মা।”
এতক্ষনে মেহেরুন্নেসা দৃষ্টি ফিরিয়ে আহিলের পানে চাইল। তীক্ষ্ম চোখে চেয়ে বলল –
” উনি এভাবে পরে ব্যাথা পেয়ে কাদছিল আর আপনি ওনাকে সাহায্য না করে ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন? কিছু না করতে পারলে কাউকে ডাকতে তো পারতেন আহির। ঝুম ( খুবই মায়াময় ডাক)। বেশি ব্যাথা করছে?”
ঝুম মাথা উপর নিচ নাড়িয়ে জবাব দিল ব্যাথা করছে। আহির যারপরনাই অবাক হচ্ছে। এই বড় চাচী আম্মাকে সে চিনে না। এতো নরম মায়াময়ী সে একমাত্র শাইয়ানের ব্যাপারেই। অন্য সবার ক্ষেত্রে সে কাঠখোট্টা স্বভাবের। কিছু সময় গভীর ভাবে মেহেরুন্নেসা আর ঝুমকে নীরবে দেখে আবার ভাবলো মেয়েটির নাম তাহলে ঝুম। শাইয়ান কি জানে? মেহেরুন্নেসা ও ঝুমের বন্ডিং দেখে আড় চোখে দোতলার করিডোরে দৃষ্টি দেয়। যেখানে এখন শাইয়ান দাঁড়িয়ে আছে। আহিরের পিছু পিছু সেও রুম থেকে বের হয়ে ছিল। এতক্ষণের সব ঘটনাই তার দেখা।তার হাতে সোনালী কিছু একটা চকচক করছে, যা সে সতর্পনে ট্রাউজারে পকেটে চালান করে দিল। তা দেখে আহির ফিক করে হেসে উঠল। তার বুঝতে আর বাকি নেই ঝুমের সেই কাঙ্খিত বস্তুটির মালিক এখন শাইয়ান নিজে। বোকা মেয়েটি যার জন্য এতো কাদছে, এতো খুঁজছে তা যে বর্তমান মালিকের ইচ্ছে ছাড়া আর পাবে না ভাবতেই ঝুমের জন্য এক বালতি কষ্ট বুক ফেটে উতলে আসতে চাইছে। সারা জীবন কোনো কিছুতে পরোয়া না করা তার ভাইটা এবার বড় ফাঁসা ফেঁসেছে।এদিকে আহিরের হাসিতে ঝুমের চেহারা আরও কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল।
রীতিমত ঘূর্ণিঝড় তুলে দিয়ে ঈশাল ড্রইংরুমে হাজির হল। ঝুমের এই অবস্থায় সে খুবই মর্মহত। হুলুস্থূল কাণ্ড করতে করতে সে আর মেহেরুন্নেসা ঝুমকে নিয়ে ঈশালের রুমের দিকে ছুটল আর যাওয়ার আগে আহিরকে নির্দেশ দেয়া হলো সে যেন খাবারটা শাইয়ানের ঘরে দিয়ে আসে। মেহেরুন্নেসার আদেশে আহিরের ঠোঁট কোণে ফিচেল হাসির রেখা দেখা দিল। ভাবলো এই সুযোগে শাইয়ানের সাথে একটু মজা নেয়া যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ, টেবিল থেকে ট্রে টা তুলে শাইয়ানের রুমের সামনে গিয়ে দেখতে পেল আগে থেকে দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে শাইয়ান বসে আছে। কিন্তু সে আশাহত হল না। কয়েকবার ডেকে উঠল। কিন্তু দরজা না খোলায় এবার সে দরজায় আঘাত করল কিন্তু শাইয়ান দরজা না খোলায় সে বুঝল ভাই তার ক্ষেপেছে তার ওপর। তাই ঝামেলা না করে মানে মানে কেটে পরাই বুদ্ধিমানের কাজ, যা করার তা পরেও করা যাবে পর্যাপ্ত সময় এখনো হাতে আছে।
রাত তখন আনুমানিক ১২:০০ টা কি ১২:৩০ টা। ঝুমের গা কাপিয়ে জ্বর এসেছে। ঈশাল প্রায় দিশেহারা কি থেকে কি করবে বুঝতে পারছে না। তাদের বাড়িতে সবার খুব ভোরে উঠতে হয় বলে দ্রুত ঘুমিয়ে পরে। এখন কেউ জেগে আছে বলে মনে হচ্ছে না। তাই সে জলপট্টি দেয়া শুরু করল। কোনো রকম একটু জ্বর কমলেই হবে সকালে না হয় একটা ব্যবস্থা নেয়া যাবে। কিন্তু কিসের কি? জ্বর যেন আরো বেড়েই চলছে। রাত এখন ১ টার বেশি কি করবে বুঝতে না পেরে চটজলদি দরজা খুলে তার মায়ের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। পথিমধ্যে শাইয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থেমে বলল –
” সালাম আলাইকুম বড় ভাইজান।”
” ওয়ালাইকুমুস সালাম। কি ব্যাপার ঈশাল আপনি এতরাতে এখনো না ঘুমিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?”
ট্রাউজারে পকেটে দুইহাত ভোরে সটান দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল সে। তার কন্ঠে কোনো তারা নেই। নির্নিমেষ ঈশালের পরবর্তী উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে। ঈশাল শুকনো গলা ভিজানোর বৃথা চেষ্টা করল। কিন্তু লাভ কিছু হলো না। তার এই মুহূর্তে মাথা কাজ করছে না।
” আসলে ভাইজান আমি আম্মির কাছে যাচ্ছিলাম। ঝুমঝুমির খুব জ্বর এসেছে। এতক্ষন ধরে জলপট্টিতেও কাজ হয়নি। কি করবো বুঝতে পারছি না। মেয়েটা আমার ভরসায় এখানে এসেছে এখন ওর যদি কিছু হয় আমি নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারব না।”
” ঝুমঝুমি কে?”
যদিও সে জানে তাও প্রশ্নটি করে ‘ ঝুমঝুমি ‘ নামটি বারকয়েক আপন মনে উচ্চরণ করল।
” আমার বন্ধু।”
” ও। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এতরাতে আপনার আম্মিকে ডেকে বিশেষ লাভ হবে না। তাছাড়া সে সারাদিন পরিশ্রম করে ঘুমিয়েছেন। বাকিটা আপনি যা ভালো মনে করেন।”
নিজের কথাগুলো শেষ করে ঈশালকে ফেলে পা বাড়ালো নিজের রুমের দিকে। ঈশাল ভাবলো এটা ঠিক তার আম্মিকে ডেকে কিছু হবে না। তাহলে সে কি করবে? বড় চাচী আম্মাকে ডাকবে? না না কখনোই না। যদি বোকা দেয়? হঠাৎ স্মরণে এলো আরেহ বড় ভাইজান তো একজন ডক্টর। সে তাকে রেখে অন্য কাউকে কেন খুঁজে যাচ্ছে।
” ভাইজান।”
হঠাৎ ডাকে শাইয়ান থেমে গেল। যেন সে এই ডাকের অপেক্ষাতেই ছিল। পিছু না ফিরেই উত্তর দিল –
” হুম।”
ঈশাল ইতস্তত করে বলল –
” আপনি একবার দেখবেন ওকে প্লীজ? মেয়েটার জ্বর কমছে না। খুব চিন্তা হচ্ছে।”
ঈশালের কন্ঠে মিনতি ভরপুর। বোঝা যাচ্ছে সে সত্যিই চিন্তিত। হবে নাই বা কেন? এখানে আসার পর থেকে মেয়েটা কি শান্ত হয়ে থাকে। অল্প কিছুদিনের মাঝে কত আপন হয়ে উঠেছে। এখন মনেই হয় না তাদের এইতো কিছুদিন আগে পরিচয়।
শাইয়ান হয়তো ঈশালের এই কথার অপেক্ষাতেই ছিল। গম্ভীর কাঠখোট্টা মুখের মানুষটার ঠোঁটের কোণে একবিন্দু হাসির দেখা মিলল। খুবই সতর্কতার সাথে তা গোপন করেও নিল। যদিও সে মনে মনে এমনটিই চাইছিল তাও বলল –
” আমি?”
” প্লীজ ভাইজান একটু দেখে নিন। না করবেন না প্লীজ।”
” ওকে।”
এই ছোট্ট শব্দটি যেন ঈশালের বুকের ভার কমিয়ে দিল।
” আমার সাথে আসুন।”
শাইয়ান বাড়তি কোনো কথা বলল না। আলো ঝকঝকে রুমের বেডে ঝুম ঘুমিয়ে আছে। তাকে দেখতে খুবই মুমূর্ষ লাগছে। চোখ বসে গেছে, রক্তশূন্য মুখটি সাদা কাগজের মতো ফ্যাকাশে, ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। শাইয়ান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল মেয়েটিকে। আজ দুপুরেও তো দেখেছে কতই না স্নিদ্ধ লাগছিল। বুকের ভিতর কিছু একটা হলো কিন্তু সেদিকে পাত্তা না দিয়ে বড় বড় কদমে ঝুমের মাথার পাশে গিয়ে বসলো। শান্ত মেয়েটা আরও শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। সে জানতো জ্বর আসবে। ব্যাথা তো আর কম পায়নি। সেই জন্যই তো এত রাতে করিডোরে অপেক্ষা করছিল ঈশালের আগমনের। তার চতুর মস্তিষ্ক তাকে জানান দিয়েছিল আজ রাতে এই মেয়ের সাথে তার আবার সাক্ষাৎ হবে। হলোও তাই। হাত বাড়িয়ে বেড সাইড টেবিল থেকে থার্মোমিটারটা নিল। খুব সাবধানে নরম হাতে ঝুমের দুগালে আলতো চাপ দিয়ে থার্মোমিটার ঢুকিয়ে দিল। এতো নরম? সে একবার তার হাতের দিকে তাকাল। রোদে পোড়া কাটাছেঁড়া করা শক্ত খড়খড়ে হাতের চাপে কি ব্যাথা পেল মেয়েটা? পেতেই পারে। এতো নরম যে মেয়েটা সে তা বুঝতে পারেনি। একবার চাইল নিজের হাতের দিকে আবার ঝুমের দিকে। কিছু নিয়ে তাকে চিন্তিত লাগল। হাত ঘড়ির পানে দৃষ্টি রেখে ঠিক দুমিনিট পর থার্মোমিটার বের করে দেখল। ১০২° এর বেশি। সামান্য ব্যাথায় এতো জ্বর হলে তো তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কিছু একটা ভেবে ঈশালকে বলল –
” আমার রুমে মেডিসিনের বক্স আছে ওটা নিয়ে আসুন।”
মাথা নাড়িয়ে ঈশাল বেরিয়ে যেতেই শাইয়ান ঝুমের নিকট ঝুঁকে ঠিক ঝুমের বাম কানের কাছাকাছি এসে অতি সমর্পণের তীক্ষ্ম অথচ ফিচেল স্বরে বলে উঠল –
Remedy part 2
” ভেবে ছিলাম আপনি নাজুক হবেন কিন্তু এতটাও আশা করিনি। এভাবে সামান্য ব্যাথায় জ্বরে কাবু হয়ে গেলেতো সমস্যা ম্যাডাম। আপনি যা করেছেন তার শাস্তি তো ভয়ানক, সেই ব্যাথা কি করে সহ্য করবেন? আমার দেয়া আঘাত কিভাবে সহ্য করবেন, হুম? আমি কিন্তু মোটেও ভালো ছেলে না। আপনার জন্য আমায় হসপিটাল থেকে ঘুরে আসতে হয়েছে ( মৃদুঃ হেসে), ভেবে দেখেছেন কি ভয়ানক কাণ্ড ঘটিয়েছেন আপনি। এতো বড় একটা কাজ করে সামান্য ব্যাথায় বিছানা নিয়েছেন? আনবেলিভেবল। শুনুন, তৈরি হন সময় কিন্তু বেশি নেই। আমি দয়া করতে জানি না। নিজেকে প্রস্তুত করুন আমার জন্যে। ”
