Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 13

Tell me who I am 2 part 13

Tell me who I am 2 part 13
আয়সা ইসলাম মনি

ওদিকে আর কোনো উপায় না পেয়ে ফারহান শেষ পর্যন্ত কারানকে কল করল।
ঠিক তখন কারান আর মিরা আকাশপথে একটি লাইট প্রাইভেট জেটে অবস্থান করছে। জেটটির ভেতরটা পরিমিত অথচ মার্জিত বিলাসে ভরা। মোলায়েম ইতালিয়ান লেদারে মোড়া রিক্লাইনিং সিট, মেঝেতে শব্দ শোষণকারী কার্পেট, দেয়ালজুড়ে উষ্ণ টোনের অ্যাম্বিয়েন্ট লাইট লাগানো। ককপিটের বাইরে স্বয়ংক্রিয় ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেম নিজের কাজ করছে নিখুঁতভাবে।
জানালার বাইরে বিস্তৃত উপরে নীলচে আকাশ, আর নিচে তুলোর মতো সাদা মেঘের স্তর ভেসে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে সূর্যের আলো মেঘের ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকে পড়ছে।
মিরা তখন পুরোপুরি ডুবে আছে নিজের ভাবনার জগতে। এতদিন পর নিজের দেশে ফিরবে, মা-বাবার মুখ, ঘরের চেনা গন্ধ, আর জমে থাকা অসংখ্য না বলা কথা একসাথে ভিড় করছে মনে। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে নরম হাসি লেগে আছে তার।

সে জানালার কাচে কপাল ঠেকিয়ে বসে আছে। চোখ দুটো মেঘের দিকে নিবদ্ধ।
কারান পাশের সিটে বসে অনেকক্ষণ ধরেই ওকে লক্ষ্য করছিল। ওর চোখের স্বচ্ছ উজ্জ্বলতা, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মুগ্ধ হাসি, এই নির্বিকার, প্রশান্ত মুখটা দেখলে তার নিজের ভেতরেও একটা শান্তি নামে। নিজের অজান্তেই কারানের ঠোঁটেও অল্প, স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে কারানের ফোনটা হালকা করে ভাইব্রেট করল। স্ক্রিনে ফারহানের নাম দেখেই কারানের চোখের চাহনি বদলে গেল। এই কলটা মিরার সামনে নেওয়া যাবে না। কারণ ফারহান তো তাদের গোপন কাজের কথাও বলতে পারে।
কিছু না বলে কারান আস্তে করে উঠে দাঁড়াল। মিরার দিকে একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হলো, সে এখনো নিজের জগতে ডুবে আছে। তারপর জেটের ভেতরের ছোট বার এরিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে বিল্ট–ইন আইস বক্স, গ্লাস হোল্ডার আর মিনি ক্যাবিনেট নিখুঁতভাবে সাজানো।
কল রিসিভ করতেই ফারহানের গলা কেটে কেটে এলো, “এত করে বোঝালাম, মেয়েটা বুঝলই না। তোর বোনটা এমন কেন, ভাই?”

কারানের কপালের মধ্যভাগে ক্ষীণ ভাঁজরেখা উদ্ভাসিত হলো। মুহূর্তমাত্রেই তার অন্তর্দৃষ্টি স্পষ্ট করে দিল, ওদের মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো এক অনুচ্চারিত ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। আপাতত মিরার সান্নিধ্য থেকে দূরে অবস্থান করায়, নিজের অস্থির চিত্ত সংবরণ করতে সে ধীরপায়ে আইস বক্স উন্মুক্ত করল, এবং সেখান থেকে একখানা শীতল বিয়ার উত্তোলন করল। মিরা এজাতীয় পানীয় অপছন্দ করে, এই সচেতনতা থেকেই তাকে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হলো। ঢাকনাটি অপসারণ করতেই ক্ষীণভাবে চিক ধ্বনি হলো। এক চুমুক নিয়ে, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “তোর গার্লফ্রেন্ড যে।”
ফারহান বিরক্তির সঙ্গে নিশ্বাস ছাড়ল।
“ধুর বা’ল! তুই আমাকে কোনোদিন সিরিয়াসলি নিবি না, তাই না?”
কারান আর কোনো উত্তর দিল না। বিয়ারে আরেক চুমুক দিয়ে সে সামনের দিকে তাকাল, বার এরিয়ার আড়াল থেকে মিরার দিকটা চোখে রাখা দরকার। সে হঠাৎ এদিকে এলে পরিস্থিতি সামলাতে হবে।
ফারহান কণ্ঠে খানিকটা অনুনয় ধরে আবার বলল, “তুই প্লিজ তোর বোনকে বোঝা, ভাই।”

“কী বোঝাব?”
“ও হুদাই আয়লাকে নিয়ে সন্দেহ করছে।”
কারানের ভ্রূযুগল সূক্ষ্মভাবে সংকুচিত হলো।
“সন্দেহ করার কী আছে?”
ফারহান সংক্ষেপে কিন্তু এলোমেলো গলায় সমগ্র ঘটনাপ্রবাহ বিবৃত করল। বাক্যগুলো কখনো তারান্নুমকে হারিয়ে ফেলার ভয়, কখনো অসহায়তা, আবার কখনো গভীর উৎকণ্ঠা হয়ে কাঁপতে কাঁপতে তার স্বরের অন্তঃস্থল থেকে উঠে আসছে।
কারান বহিরঙ্গে সম্পূর্ণ নির্বিকার থাকলেও, ধৈর্য সহকারে শ্রবণ করে যাচ্ছে। তার মুখমণ্ডলের পেশিতেও সামান্যতম সঞ্চালন নেই। কিন্তু অন্তর্গত চেতনায় কারান বিস্মিত, তবে একটুখানি সন্তুষ্টিও কাজ করছে।
এই ফারহানকে সে শৈশবকাল থেকেই চেনে। যে কোনো কিছুর তোয়াক্কা করে না, না নিজের জীবনের, না অন্যের। হাসতে হাসতেই কতগুলো খু’ন যে করেছে, তার হিসাব কারানের নিজেরও জানা নেই। মানুষের জীবন তার নিকট সর্বদাই ছিল তুচ্ছ উপাদানমাত্র। আর সেই মানুষটাই কিনা আজ একটা মেয়েকে হারানোর ভয় নিয়ে এমনভাবে ভেঙে পড়েছে! যে ব্যক্তি অগণিত নারীর সান্নিধ্যে রাত যাপন করেছে, আবেগকে সর্বদা ভোগ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করেছে, অথচ আজ সে আশঙ্কাগ্রস্ত!

কারানের ঠোঁটের কোণে অতিক্ষুদ্র ব্যঙ্গাত্মক বক্ররেখা উদ্ভাসিত হলো। ভালোবাসা মানুষকে তার সর্বোচ্চ ঔদ্ধত্য থেকে সর্বনিম্ন অসহায়তায় নামিয়ে আনে।
নারীর মোহ যে কতটা ভয়ংকর, তা আজ আবার প্রমাণিত। অনুভূতিশূন্য দানবকেও নারী তার মোহজালে আবদ্ধ করতে সক্ষম।
এইসব ভাবনার আবর্তে থেকেও, ফারহানের বক্তব্য শ্রবণ করতে করতেই কারানের দৃষ্টি অনিচ্ছাকৃতভাবে সরে গেল দূরে উপবিষ্ট মিরার দিকে।
মোলায়েম লেদারের আসনে হেলান দিয়ে বসে আছে সে। জানালার পাশ দিয়ে প্রবেশ করা সূর্যালোকের এক ক্ষীণ রেখা তার গালের ওপর আলতোভাবে স্থির হয়ে আছে। মুখে সেই একই শান্ত সৌন্দর্য, যা দেখলে যে-কোনো মানুষ নিজেকে ভুলে তাকেই দেখতে থাকবে। কারানের বুকের ভেতর একটা অস্বস্তিকর উপলব্ধি কাঁপুনি দিয়ে উঠল।
মিরা কি ভয়াবহ দক্ষতায় কারান চৌধুরীকেও নিজের নিয়ন্ত্রণবৃত্তে আবদ্ধ করে ফেলেছে?
সম্ভবত শুধু কারান নয়, এই নারী চাইলে তার ভুবনমোহিনী উপস্থিতি দিয়ে সমগ্র পুরুষজাতিকেই বশীভূত করতে পারে।

কি ভয়ংকর এই মিরা!
আজও তাকে অপরিমেয় সুন্দর মনে হচ্ছে। এতটাই যে কারান ইচ্ছা করলেও দৃষ্টি সরাতে পারছে না।
ফারহানের বক্তব্য সমাপ্ত হলো। কারানের মুখাবয়বে কোনো রূপান্তর ঘটল না। কেবল দৃষ্টিদ্বয় আরও কঠোর, আরও হিসেবি হয়ে উঠল।
ফারহান পুনরায় সংযোজন করল, “আমি তোকে কল কনফারেন্সে অ্যাড দিচ্ছি।”
উক্তি সমাপ্ত করেই সে তারান্নুমকে কল দিল।
ফোনটা তখন তারান্নুমের ঠিক পাশেই পড়ে ছিল। চারপাশে বিস্তৃত মাঠ, দূরে গাছের সারি, মাথার ওপরে ধূসর আকাশের দিকে তার নজর নেই। হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে এনে সে মাটিতে বসে আছে। থুতনি ঠেকানো হাঁটুর ওপর। শরীরটা ছোট করে গুটিয়ে রাখা। স্ক্রিনে ফারহানের নাম উদ্ভাসিত হলো। তারান্নুম একবার পার্শ্বদৃষ্টিতে নামটি অবলোকন করল।

একবার, দুইবার, বারবার কল এলো। ফোনের ভাইব্রেশন ঘাসের ওপর ক্ষীণ শব্দ তুলল। কিন্তু সে আর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল না। পূর্বেই অশ্রুসিক্ত চক্ষুদ্বয় শূন্য প্রান্তরের দিকে স্থির হয়ে আছে। এখন আর অশ্রুও নিঃসৃত হচ্ছে না। অশ্রু শুকিয়ে গেছে গালের ত্বকে, রেখার মতো জমাট বেঁধে আছে।
বক্ষদেশের হাহাকার স্তব্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।
কেন যে এই সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটতে দিল! যদি শেষটা এমনই হবে…
অবশেষে ফারহান ক্লান্ত, ক্ষয়িষ্ণু স্বরে কারানকে বলল, “ও আমার কল রিসিভ করবে না। তুই একবার কল দে।”
কারান কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল না। ফারহানকে লাইনে রেখেই সে তারান্নুমের নম্বরে কল প্রেরণ করল।
এইবার কী এক অদ্ভুত আকস্মিকতায় তারান্নুমের দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্ক্রিনের দিকে সরে এলো।
কারানের নাম ভেসে উঠতেই সে সহসা চমকে উঠল।
কারান কেন কল করল, সে প্রশ্ন আপাতত তার চিন্তার প্রান্তদেশেও উঁকি দিল না। বিস্ময়টাই সেখানে প্রধান হয়ে দাঁড়াল। কারান নিজে কল করেছে? যে মানুষটি কখনোই প্রয়োজন ব্যতীত তাকে ফোন করার প্রয়োজনবোধ করেনি, আজ সে-ই কল করছে?

ভ্রূযুগল অল্প সংকুচিত হলো। মনে মনে ভেবে নিল, হয়ত কিছুক্ষণ আগের কথোপকথন প্রসঙ্গেই কিছু বলতে চায়। কিন্তু এইসব ভাবনাকে অনতিবিলম্বে নির্বাসনে পাঠিয়ে, সে তাড়াহুড়ো করে হাতের তালু দিয়ে চোখের অবশিষ্ট অশ্রু মুছে ফেলল। যতটা সম্ভব স্বাভাবিক স্বর ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ প্রয়াসে গলা খাঁকারি দিয়ে কণ্ঠনালি পরিষ্কার করল।
ঠোঁটের কোণে জোরপূর্বক একটুকরো হাসি স্থাপন করে বলল, “তোমরা কই এহন?”
কারান হাতে বিয়ার নিয়ে লেদারের আসনে হেলান দিয়ে, এক পা আরেকটার ওপর তুলে বসলো। কেবিনের নরম অ্যাম্বিয়েন্ট আলো তার মুখের রেখাগুলো আরও দৃঢ় করে তুলেছে। সে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে?”
প্রথম মুহূর্তে প্রশ্নটার অন্তর্নিহিত অর্থ তারান্নুম ধরতে পারল না। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উপলব্ধি স্পষ্ট হয়ে উঠল। কারান যেহেতু ফারহানের বন্ধু, ফারহান উপায়ান্তর না পেয়ে নিশ্চয়ই সব জানিয়েছে।
তারান্নুমের মুখ সামান্য বাঁক নিল। ঠোঁট শক্ত হয়ে এলো।
ফারহান কি ভেবেছে, কারানকে দিয়ে কথা বলালেই তারান্নুম গলে যাবে? কখনোই না।
নিজেকে ভিতর থেকে দৃঢ় করে, প্রায় কাটকাট স্বরে সে বলল, “আমি তোমার বন্ধুরে বিয়ে করুম না। ওর চরিত্রে সমস্যা আছে।”

“কীভাবে বুঝলি?”
তারান্নুমের কণ্ঠে চাপা ক্ষোভ প্রকাশ পেল, “ওই মাইয়াটা ওরে বেবি ডাকছে!”
কারান আগের মতোই নিরাসক্ত ভঙ্গিতে উচ্চারণ করল, “তো?”
এই ‘তো’ শব্দটা যেন তারান্নুমের বুকে সজোরে আঘাত করল।
সে প্রায় বিস্ফোরিত হয়ে উঠল, “তো মানে? আমি এমন চরিত্রহীন ব্যাটারে বিয়ে করুম না।”
“ওই মেয়ের সাথে ও ই’ন্টিমেটও হয়েছে। এবার কি বলবি?”
তারান্নুম স্তব্ধ হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের সমস্ত ভাষা বিলুপ্ত হলো। এতক্ষণ যে মুখে সামান্য হলেও প্রাণ ছিল, এই বাক্যটা শোনার পর তা সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেল। নিশ্বাস আটকে আছে। বুকের স্পন্দন থেমে যাবে বলে মনে হচ্ছে। সে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
আর তার থেকেও অধিক বিস্ময়কর, কারান এই কথাগুলো কী অবিশ্বাস্য স্বাভাবিকতায় বলছে! যেন এসব কোনো সাধারণ তথ্য, কোনো তুচ্ছ ঘটনা।
তবে কারান চৌধুরীর কাছ থেকে কিই বা আশা করা যায়!
সে তো অনুভূতিহীন মানুষ। অন্যের মানসিক বিপর্যয় অনুধাবন করার ক্ষমতা তার কোনোদিনই ছিল না।
কিন্তু যেখানে তারান্নুম ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে, সেখানে এই মুহূর্তেই এমন নির্মম সত্য উচ্চারণ না করলেও কি বিশেষ কোনো ক্ষতি হতো?

বুকের ভেতরটা হঠাৎ এত ভারী হয়ে উঠল যে মনে হলো, কেউ যেন পাথরের পর পাথর চাপিয়ে দিয়েছে তার বক্ষদেশের ওপর। চোখে জল নেই, কিন্তু যন্ত্রণার ভারে দৃষ্টিই ঝাপসা হয়ে এসেছে।
এদিকে দীর্ঘ সময় ধরেই উদ্‌বিগ্ন মুখে দাঁতের সহিত নখ কাটতে কাটতে ফারহান কখনো ঘরের একপ্রান্তে, কখনো অন্যপ্রান্তে পায়চারি করছিল। আর কারান আর তারান্নুমের কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ গভীর মনোযোগে শুনছিল।
কিন্তু কারানের শেষ কথাটা কানে পৌঁছাতেই ফারহানের চোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেল। সে আচমকা থমকে দাঁড়াল।
এক হাত মাথার পেছনে তুলে চুল চুলকাতে চুলকাতে বিড়বিড় করে উঠল, “হা’রামি কারান আমাকে তো দেখি ফাঁসিয়ে দিচ্ছে। হে মাবুদ, কার কাছে গেলাম হেলপ চাইতে! ভুলেই গিয়েছিলাম, এটাকে বিশ্বাস করা আর কালসাপের লেজে পা দেওয়া একই কথা। ইয়া আল্লাহ, ভবিষ্যৎ বউটার মনটা একটু গলিয়ে দাও।”
তার কণ্ঠে ব্যঙ্গ আর রসিকতার আবরণ থাকলেও, অন্তর্গত আতঙ্ক আর অসহায়তা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। বুকের ভেতরটা টানটান হয়ে আছে, নিশ্বাস নিতেও কেমন যেন ভার লাগছে।
প্রায় দু’মিনিট পর তারান্নুমের মানসিক ঘোর কিছুটা কাটল। তাও নিজের চেষ্টায় নয়। তার ঠিক পাশ দিয়েই, সামনে বিস্তৃত ভেজা মাঠের ঘাস ভেদ করে একটি ব্যাঙ হঠাৎ লাফিয়ে চলে গেল। আকস্মিক সেই নড়াচড়িতে তারান্নুম শিউরে উঠে বাস্তবে ফিরে এলো।

অনেকক্ষণ পর তার ঠোঁট কাঁপল। অবিশ্বাসে ভেজা কণ্ঠে সে বলল, “কিহ?”
কারান ঠান্ডা, সংযত গলায় বলল, “ওসব ওর পাস্ট জাস্ট। এখন ও শুধু তোকে ভালোবাসে।”
এই কথাটুকু তারান্নুমের ভেতরে যেন আগুন জ্বালিয়ে দিল। ফোন হাতে নিয়েই সে হুট করে দাঁড়িয়ে গেল। রাগে তার বুকের ওঠানামা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। মনে হচ্ছে, আরেক দফা চোখ থেকে অশ্রু ঝরবে, কিন্তু সে দাঁতে দাঁত চেপে সেই আবেগ জোর করে রুদ্ধ করে রাখল।
এক হাত শক্ত হয়ে মুঠোয় পরিণত হলো। অন্য হাতে ফোন কানে তুলে, চোখে তীক্ষ্ণতা এনে সে কটমট করে বলল, “জাস্ট? ভাই, এইটা তুমি কেমনে এত নরমালি বলতেছ?”
“আচ্ছা, ওর কথা বাদ দিলাম। ধর, তুই অন্য কাউকেই বিয়ে করলি। বিয়ের পর জানলি তার পাস্ট এমন। তখন কী হতো?”
তারান্নুম দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল, “তহনেরটা তহন দেখা যাইব। তুমি নিজের চরিত্রহীন বন্ধুর সাফাই গাইয়ো না, বুঝলা?”

কারান ঠোঁটের এক পাশ বেঁকিয়ে হালকা হাসল, “তুই কবে বড়ো হবি বল তো? আমি তোর ফিলিংসটা বুঝি। আর না আমি ফারহানের পাস্ট সাপোর্ট করছি। কিন্তু লজিক্যালি ভাব, এখন তুই ওকে সব জেনেই বিয়ে করবি। আমি যদি না বলতাম, তুই কিন্তু ওকে না জেনেই বিয়ে করতি। অ্যান্ড দিস কুড হ্যাভ হ্যাপেন্ড টু, সারাজীবনেও তুই কখনোই ওর পাস্ট জানলিই না। এর কারণ এই যে, ফারহান তোকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। আমার থেকেও তোকে বেশি ভালোবাসে।”
কারানের শেষ কথাটার অভিপ্রায় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সে ফারহানের অনুভূতির গভীরতা বোঝাতে, কথাটা ভাই-বোনের সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিল। কিন্তু সে তো একবারের জন্যও ভাবেনি, তারান্নুম এখনো তার প্রতি সেই পুরোনো অনুভবটুকু বুকের গভীরে বহন করে রেখেছে। তাই কথাটার অর্থ তারান্নুম নিজের মতো করেই নিজের জমে থাকা ব্যথার দিকেই টেনে নিল।
তারান্নুমের চোখ মুহূর্তের মধ্যেই ছলছল করে উঠল।

হঠাৎ করেই কারানের সামনে নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হলো। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
অবচেতনের অজান্তে সে অতীতের গভীরে হারিয়ে গেল। কথাগুলো আর নিয়ন্ত্রণে থাকল না, “নিজের লগে তুলনা দিও না তো। তুমি তো আমারে কোনোদিনও ভালোবাসো নাই, আর বাসবাও না, এইটা আমি জানি। তাইলে আবার কীসের তুলনা দিতেছ? তুমি কি কোনোদিন জানতে চাইছ, কতগুলা বছর ধইরা আমি তোমার জন্য কানছিলাম? কতগুলা বছর আমি তোমারে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি? কতগুলা বছর তোমার একটা মাত্র ছবি দেইখা দিন কাটাইছি?”
প্রতিটি শব্দের সঙ্গে সঙ্গে যেন তার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘ বছরের অভিমান, অপেক্ষা আর অপমান একে একে বেরিয়ে এলো। চোখের পানি আর আটকে রাখা যাচ্ছে না।
ওদিকে এতক্ষণ যেভাবে কারান যুক্তি দিয়ে তারান্নুমকে বোঝাচ্ছিল, তাতে ফারহানের মনে একটু হলেও স্বস্তি এসেছিল। ভেবেছিল, হয়ত এবার সে বুঝবে। কিন্তু এই মুহূর্তে তারান্নুম যা বলল, তাতে ফারহান মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল।

তার ভালোবাসা… তার ভালোবাসা কিনা তারই বন্ধুকে ভালোবাসে?
গলাটা হঠাৎ করে শুকিয়ে এলো। কণ্ঠ আটকে গেছে। সে সোজা থ মেরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল; পা নড়ছে না, চোখও পলক ফেলছে না। অধর আধ ইঞ্চি ফাঁক হয়ে আছে, শ্বাস নেওয়ার কথাটাও যেন ভুলে গেছে। সে শুধু কারানের উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে।
কারান লেদারের সিটে হেলান দিয়ে নির্ভার দেহভঙ্গিতে আগের মতোই বসে আছে। তবে তার ভ্রূযুগল অল্প কুঁচকে গেছে। সে ভাবেনি, তার একটা কথাকে তারান্নুম এমনভাবে এতদূর টেনে নিয়ে যাবে।
মনে মনে বিরক্তির একটা ক্ষীণ ঢেউ উঠল। অবশ্য, তারান্নুমের মতো গোরু তো আর পরিস্থিতি বুঝে কথা বলতে জানে না!
কিন্তু পরক্ষণেই অন্য একটা হিসাব মাথায় এলো।
যেহেতু তারান্নুম ফারহানের অতীত জেনেছে, ফারহানেরও তো অধিকার আছে তারান্নুমের অতীত জানার।
তাই ইচ্ছে করেই সে একটা দীর্ঘ, ভারী নিশ্বাস ছাড়ল। তারপর স্বরটাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল, “তুই ভুল করতে পারিস, আর ফারহান করলেই দোষ?”
তারান্নুম হালকা করে কপাল কুঁচকে তাকাল।

“কি ভুল করছি আমি?”
কারান এবার একটু সোজা হয়ে বসল।
“এই যে তুই সব জেনেও এখনো আমাকে আগের মতোই মনে রেখেছিস। এই যে তুই আকুলতা দেখাচ্ছিস। এই যে তুই মিরার কথা একবারও ভাবলি না। এই যে এখনো আমাকেই ভালো—”
কথাটা শেষ করল না সে। দুই আঙুলে কপাল ডলতে ডলতে কণ্ঠের উত্তেজনা নামিয়ে এনে বলল, “এটা কি তোর ভুল না? কিছুদিন পর তোর বিয়ে হতে যাচ্ছে। অথচ তুই কী করছিস? আমাকে নিয়ে এসব ভাবছিস… আই মিন, তার মানে তো তোরও একটা পাস্ট আছে, রাইট?”
এদিকে তারান্নুমের আবেগ আর কোনো সংযমের শাসন মানতে চাইছে না। এতক্ষণ পরিস্থিতির ভারে সে নিজেকে দৃঢ় অনুশাসনে আবদ্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু অনুভূতির তো বয়স নেই, কোনো পরিমিত হিসাবও তা মানে না। কারানকে সে আজীবনই চেয়ে এসেছে। বছরের পর বছর সঞ্চিত ভালোবাসা কি কেবল একটি পরিস্থিতিগত চাপে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে? না, কখনোই না। আজও তারান্নুমের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু কারানই। সেই শূন্য আসনে ফারহানকে বসানো একেবারেই অসম্ভব। ফারহানের প্রতি তার মনে পৃথক এক অনুরাগ রয়েছে বটে, কিন্তু তা কারানের প্রতিস্থাপন নয়, কখনোই নয়।

কারানকে ঘিরে তারান্নুমের অতীতের যাবতীয় উন্মাদনা একে একে চেতনার পর্দায় ভেসে উঠতে লাগল। নানির ফোনে সারাদিন ধরে উৎকণ্ঠিত হয়ে প্রতীক্ষিত থাকত, কখন কারানের ভিডিয়ো কল আসবে। ছোট্ট ডায়েরির পাতায় পাতায় কারানকে কেন্দ্র করে আঁকা কত রঙিন কল্পলোক। একদিন কেবল কারানের দৃষ্টিতে সুন্দর হয়ে ওঠার আশায় দিনের পর দিন নিজেকে গড়ে তোলার নীরব সাধনা করেছে। সে কারণেই আজ সাজসজ্জার পর চারপাশ থেকে অগণিত প্রশংসা ধ্বনিত হলেও, তার অন্তর্গত চিত্ত এক মুহূর্তের জন্যও স্থিরতা খুঁজে পেল না; ব্যাকুল উৎকণ্ঠায় সে অধীর প্রতীক্ষায় ছিল, কারান কী বলবে?
এইসব ভাবনার ভার আর বহন করতে না পেরে তারান্নুম অবশেষে ভেঙে পড়ল। দীর্ঘক্ষণ সঞ্চিত কান্না এবার বাঁধ ভাঙল। ফরসা গাল বেয়ে অবিরাম অশ্রুধারা নেমে এলো। চোখ ফুলে উঠলো, দৃষ্টির স্বচ্ছতা লুপ্ত হয়ে চোখের মণি রক্তাভ রং ধারণ করল।
কাঁপা কণ্ঠে সে বলে উঠল, “তুমি আমার পবিত্র ভালোবাসার সাথে তার অপবিত্রতারে মিলাইতে পারলা? কেমনে পারলা?”

কারান এক মুহূর্ত নীরব রইল। তারপর শান্ত স্বরেই বলল, “নিজেকে খু’ন করতে চাস কি?”
তারান্নুম ঠোঁট কামড়ে ধরে উত্তর দিল, “করিনি কি?”
“আমাকে পেয়ে মিরা ভুল করেছে। আর তুই না পেয়ে বরং শান্তিতেই আছিস। তবুও এত ভালোবাসা পেয়েও কেন সেটাকে পায়ের নিচে মাড়িয়ে দিচ্ছিস, তরু?”
তারান্নুম কোনো উত্তর দিল না। শুধু শুনে গেল। কারণ জীবনে এই প্রথম কারান তার সঙ্গে এমন স্নেহমাখা স্বরে কথা বলছে। এই অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যেও অদ্ভুতভাবে তার মনে হলো, আজ অন্তত সে কিছু একটা অর্জন করেছে।
কারান হালকা হাসল; সেই হাসিতে আত্মবিদ্রুপের ছাপ স্পষ্ট।
“আমাকে পেলে তোর সাদা খাতায় বড়োজোর দু-একটা লাইনই জুটত। আর সেই ক’টা লাইনেও আসল কারান চৌধুরীকে ধরতে পারতি কিনা, সেটাও সন্দেহ। অথচ ফারহান তোকে পেলে নিজের গোটা উপন্যাসটাই তোকে উৎসর্গ করে দিত।”

কথা থামিয়ে কারান জানালার বাইরে তাকাল। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল, “আমি খুব জটিল মানুষ, তরু। ঠিক তোর ভাবির মতো। ওর মতো কেউ আমাকে সামলাতে পারবে না…”
ঠিক সেই মুহূর্তেই তারান্নুম আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। সমস্ত আকুলতা উজাড় করে দিয়ে বলে উঠল, “আর আমার মতো কেউ তোমারে ভালোবাসতে পারবে না।”
কারান দীর্ঘ এক নিশ্বাস ত্যাগ করল। তার ধৈর্যের বাঁধ ক্রমশ শিথিল হয়ে ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। মিরা ব্যতীত আর কোনো মানুষের জন্য সে কখনোই নিজেকে এভাবে ব্যাখ্যার দায়ে বাঁধেনি। অন্য সবার ক্ষেত্রে কারান চৌধুরি বরাবরই কঠোর, হিসেব করে কথা বলে, অনুভূতিকে দৃঢ় সংযমে আড়াল করে রাখে। অথচ এই তারান্নুমের কারণেই আজ তাকে কত দীর্ঘ, কত অপ্রয়োজনীয় বাক্যব্যয় করতে হচ্ছে।
আর মেয়েটা? বোকা মেয়েটা কিছুই উপলব্ধি করছে না। কারানের সময়ের কি কোনো মূল্য নেই নাকি? বউকে একা রেখে বোনকে বাস্তবতা বোঝাতে এসেছে, তার উপর সে আবার খামখেয়ালিপূর্ণ একগুঁয়েমিতে অটল!
কারান চোখ বন্ধ করে ক্ষণিক নিজেকে সংবরণ করল। তারপর চোখ মেলে কঠোর স্বরে বলল, “কথার মাঝে কথা বলা অভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে। বারবার তোকে একই কথা বুঝানোর দায় আমার নেই। এতই যদি আফসোস হয়, আমার কাছে আয়—তোকে মে’রে ফেলি। হাজারটা চিন্তার ভিড়ে তোর এই বাচ্চামিগুলো এখন কেবল অতিরঞ্জন বলে মনে হচ্ছে।”

তারান্নুম কাঁপতে থাকা কণ্ঠে বলল, “যদি পারতাম… তোমার কোলে ম’রতাম।”
কারান কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে রুক্ষ স্বরে ছুঁড়ে দিল, “তুই সিঙ্গেলই থাক। বেয়াদব মেয়ে কোথাকার!”
এই কথার পর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে কারান কল বিচ্ছিন্ন করল।
ওদিকে তারান্নুম আর এক সেকেন্ডও সেখানে স্থির থাকতে পারল না। বুকের গভীরে সঞ্চিত কান্না এবার উন্মত্ত স্রোতের মতো বেরিয়ে আসতে চাইছিল। সে জামার দুই পাশ মুঠো করে ধরে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে চলল। হিল জুতো, মোবাইল রাস্তার ধারেই পড়ে রইল। কাদামাখা কাঁচা রাস্তায় পা ডুবিয়ে, দিকজ্ঞানহীন অবস্থায় সে দৌড়াতে থাকল।
তালহা আর সোফিয়ার সামনে দিয়েই সে ঘরের দিকে ছুটে গেল। সোফিয়া ভ্রূ কুঁচকে কিছু বলতে উদ্যত হয়েছিল, ঠিক তখনই তালহা দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “ওর যথেষ্ট বয়স হয়েছে। নিজেরটা নিজেকেই সামলাতে দাও।”
আসলে আর ক’দিন পরই তাদের অস্ট্রেলিয়া রওনা দেওয়ার কথা। তারান্নুমকে এখন থেকেই নিজের দায়িত্ব নিজে অনুধাবন করতে হবে। যদিও এতদিন সে অনেকটা নিজেই সামলে এসেছে, আর অবশিষ্ট অংশটা কারান দেখেছে। তালহা এটুকু অনুমান করেছে, ফারহানের সঙ্গে হয়ত তারান্নুমের কিছু একটা ঘটেছে। তাই বোনের ব্যক্তিগত পরিসরে সে হস্তক্ষেপ করতে চায়নি।

তারান্নুম ছুটে গিয়ে নানির ঘরের ভেতরে ঢুকল। কান্নায় ভেজা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল, আম্বিয়া জমাদ্দার নামাজের পাটির উপর বসে তসবি জপ করছেন।
তারান্নুমের প্রবল ইচ্ছে হলো নানির সামনে সব ভেঙে বলতে, অশ্রু উজাড় করে দিতে। কিন্তু এই বয়সে নানিকে উদ্‌বিগ্ন করতে চায় না। তাই চোখ মুছে, নাক টেনে, নিঃশব্দে নানির গা ঘেঁষে বসে পড়ল।
তারান্নুমের স্পর্শে আম্বিয়া সামান্য নড়লেন, পাশে তাকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না। তসবিহর শেষ দানাটি গুনে নিয়ে ধীরে সেটার শেষ প্রান্তে চুম্বন করলেন। তারপর তা যত্ন করে বাটার মধ্যে গুছিয়ে রাখলেন। তারান্নুমের দিকে তাকাতে যাবেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই তারান্নুম নানির কোলের মধ্যে শুয়ে পড়লো।
আজকের সজ্জিত তারান্নুমকে দেখে আম্বিয়ার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল; সাথে কুঁচকানো কপোলে একটু ভাঁজ দৃশ্যমান হলো। কিন্তু নাতনির অন্তরের ভার যে অস্বাভাবিক, সেটাও তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করলেন। মনে মনে ভাবলেন, হয়ত গতকালের মায়ের ঘটনারই রেশ। কিছু না বলে তিনি ধীরে ধীরে তারান্নুমের মাথায় স্নেহমাখা হাত বোলাতে লাগলেন।

সেই প্রশান্ত স্পর্শের আবেশেই তারান্নুম বিষণ্ন কণ্ঠে বলল, “একটা গপ্প কও না, নানি।”
আম্বিয়া জমাদ্দার একটি দীর্ঘ, ভারী নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। তারপর অত্যন্ত কৌশলে কথার স্রোত ঘুরিয়ে আনলেন ফাতিমার কাহিনিতে। প্রথম দিকে তারান্নুম চোখে কৌতূহল, মুখে নীরব আগ্রহ নিয়ে গভীর মনোযোগে শুনছিল। কিন্তু গল্পের শেষ প্রান্তে এসে যখন আম্বিয়া শান্ত স্বরে জানালেন, এ কাহিনি আসলে তার মায়েরই জীবনগাঁথা, ঠিক তখনই তারান্নুম যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। মুহূর্তের মধ্যেই চট করে নানির কোল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ অবিশ্বাস আর চাপা যন্ত্রণা নিয়ে স্তব্ধ দৃষ্টিতে নানির শান্ত মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে রইল। নানিকে কিছু বলা উচিত কি না, সে চিন্তার অবকাশ না রেখেই সে দৌড়ে চলে গেল মায়ের কক্ষে।
আম্বিয়া ম্লান হেসে ঊর্ধ্বপানে আঁখি পল্লব নিবদ্ধ করে তা নিমীলিত করলেন; খোদাতায়ালার কাছে ফরিয়াদ জানালেন, এবার যেন মাতৃ-কন্যার সম্পর্কে সকল জটিলতার অবসান ঘটে।

তারান্নুম ঘরে ঢুকে দেখল, ফাতিমা তুব্বার পাশে বসে, নিস্তেজ কণ্ঠে মেয়েকে পড়াচ্ছেন। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে অনুচ্চারিত বিষাদের ছায়া স্পষ্ট। এই মায়ের জীবনে যে এত গভীর, এত দীর্ঘ কষ্ট জমে ছিল, তা তারান্নুমের কল্পনার সীমার বাইরেই ছিল। বিস্ময়ের সঙ্গে আরেকটা অনুভূতিও এসে আছড়ে পড়ল, এতগুলো বছর কী নিপুণ অভিনয়েই না ফাতিমা নিজের যন্ত্রণা আড়াল করে রেখেছেন!
নিঃশব্দে মায়ের পাশে গিয়ে বিছানার এক কোণে চোখ নামিয়ে বসল তারান্নুম। মেয়েকে দেখেই ফাতিমার ঠোঁটে চওড়া একটা হাসি ফুটে উঠল। তিনি জানতেন, গতকালের ঘটনায় মেয়েটা তার ওপর কতটা অভিমান করে আছে। কিন্তু নিজের মেয়েকে তিনি ভালো করেই চেনেন। যেহেতু তারান্নুম নিজেই এসে পাশে বসেছে, তার মানে মেয়ের কঠিনতা খানিকটা হলেও গলে গেছে। তাই তিনি আর পুরোনো প্রসঙ্গ টানলেন না। স্নেহভরে মেয়ের গাল ধরে ঠোঁটে চুমু খেলালেন।

তারপর হাসিমুখে বললেন, “কি সুন্দরই না লাগতেছে তোরে, মা! আমার সোনার মেয়ে পরিটা! একদম তোর বাপের মতোন হইছিস। জানিস, ও এতটাই সুদর্শন আছিল যে গ্রামের মাইয়ারা ওর লাইগা…”
পুরো কথাটা শেষ করতে দিল না তারান্নুম। চোখ কুঁচকে বিরক্ত স্বরে বলে উঠল, “কি বা’লের কথা শুরু করছ? আইছি একটু শান্তির জন্য! এইসব বা’লের প্যাঁচাল বাদ দাও তো।”
এরপর সে একটু এগিয়ে এসে মায়ের শীতল, শ্যামল হাতটি নিজের উষ্ণ মুঠোর মধ্যে বন্দি করল। অদ্ভুতভাবে মেয়ের স্পর্শে ফাতিমা কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠলেন। তারান্নুম মায়ের হাতের রেখাগুলো মুগ্ধ চোখে দেখতে লাগল, সেই রেখায় লুকিয়ে থাকা না বলা গল্পগুলো যেন সে প্রথমবারের মতো পড়ছে। জোর করে ঠোঁটে স্নিগ্ধ হাসি টেনে আকুল কণ্ঠে বলল, “নিজের কথা কও না, মা। তুমি তো জানোও না, ছোটোকালে তোমার দিকে হা কইরা তাকাইয়া থাকতাম আমি। ভাবতাম, এত সুন্দর ক্যান আমার আম্মা! আর তুমি কি যে কও!”
মেয়ের মুখে নিজের রূপের এমন নিখাদ প্রশংসা শুনে ফাতিমার চোখে অশ্রু জমে উঠল। থুতনি কেঁপে উঠল অদম্য আবেগে। হঠাৎ করেই তিনি তারান্নুমকে বুকে টেনে নিলেন। টলমল করে মা-মেয়ের দুজনের চোখ থেকেই অশ্রু ঝরতে লাগল।

পাশে বই হাতে বসে থাকা তুব্বাও আর চুপ করে থাকতে পারল না। উঠে এসে মা আর আপুর কাছে গিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল, “আমারে তো দেখোই না তোমরা। কাট্টি।”
এই কথা বলে সে সরে যেতে উদ্যত হতেই ফাতিমা দ্রুত হাত বাড়িয়ে ছোট মেয়েটার হাত ধরে টেনে নিলেন। মুহূর্তের মধ্যেই দুই মেয়েই মাকে জড়িয়ে ধরল। ঘরটা ভরে উঠল উষ্ণ আবেগে, যেখানে অতীতের কষ্ট, বর্তমানের ক্লান্তি আর ভালোবাসার নিরাপদ আশ্রয় একাকার হয়ে গেল।
যদিও এ পুরো ঘটনাটাই তুব্বার পড়াশোনা এড়ানোর এক নিপুণ কৌশল ছিল। ভেতরে ভেতরে সে কুটিকুটি হেসে উঠল। মনে মনে ছন্দ মিলিয়ে গুনগুন করে গান ধরল,
“ওরে লেখাপড়ায় মন বসে না,
লেখাপড়ায়… মন বসে না।
ইচ্ছা করে প্রেম করি, ওরে প্রেম করি…
কোথায় রইলেন, প্রেমের ব্যাপারী?
দুঃখে মরি…
কোথায় রইলেন, প্রেমের ব্যাপারী?”
এই সামান্য আবেগের পরশেই আগের জমে থাকা সব অভিমান, অভিযোগ আর যন্ত্রণা ধীরে ধীরে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ফাতিমা তুব্বাকে অন্য কক্ষে পাঠিয়ে দিলেন—পড়াশোনায় মন দিতে বললেন।
তুব্বা বাহ্যত মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেও, ভেতরে ভেতরে তার মন তখন অন্য আনন্দে মশগুল। পাশের ঘরে গিয়ে নানির সঙ্গে গল্প করার এই সুযোগ! এই ভাবনায় সে লাফাতে লাফাতে, গুনগুন সুরে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে গেল।

তুব্বা চলে যেতেই ফাতিমার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল তারান্নুমের দিকে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি মেয়ের অবসন্ন, ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন, সেখানে লুকিয়ে থাকা না-বলা কষ্টগুলো পড়ার চেষ্টা করছেন। তারপর আলতো করে দুই হাতের আঁজলায় মেয়ের মুখটা তুলে ধরে স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন, “ছেলেটা তোরে অনেক ভালোবাসে রে, মা।”
হঠাৎ এমন কথা কানে আসায় তারান্নুম কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইল। কারণ শব্দগুলো তার চেতনায় পৌঁছাতে সময় নিচ্ছে। ফাতিমা মৃদু হেসে আবার বললেন, “এই রহমের ভালোবাসা আর কোনোখানে পাইবি না। হারাইতে দিস না। সেইদিন কত আকুতি নিয়া তোরে চাইছে আমার কাছে… ওর চোখে তোর লাইগা যে টান দেখলাম, বুকটা ভইরা উঠছিল।”
এরপর ফাতিমা হাসিমুখে বলতে লাগলেন, ফারহান কী কী বলেছে, কীভাবে সে তারান্নুমকে যত্নে রাখবে, কীভাবে আগলে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। শব্দগুলো ছিল স্নেহে মোড়া, আশ্বাসে ভরা। কিন্তু তারান্নুম চুপচাপ শুধু শুনে গেল। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, কোনো প্রতিবাদও নেই। তবু তার ভারাক্রান্ত হৃদয়ের গভীরে কোথাও যেন ক্ষীণ এক আশার প্রদীপ জ্বলে উঠছিল।

ওদিকে কল কেটে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ফারহান আবার কারানকে ফোন করল। গলা থমথমে, মুখে চাপা বিরক্তি নিয়ে শুধালো, “এই তোর সলিউশন? মা’রা খাওয়ালি, ভাই।”
কারান ভালো করেই জানত, যাই হয়ে যাক, ফারহান তাকে ভুল বুঝবে না। তারান্নুম যা কিছু বলেছে, তাতে ফারহানের মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক; কিন্তু কারানকে নিয়ে সে কোনো নিন্দাজনক ধারণা পোষণ করবে না। আর কারানও কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন অনুভব করল না। তারান্নুমের ভালোবাসা একতরফা, এই সত্যটি নিশ্চয়ই এতক্ষণে ফারহান নিজেই উপলব্ধি করেছে। তাই সে শান্ত, স্থির কণ্ঠে বলল, “ওয়েট কর। একটু পর ও নিজেই কল করবে। বোনটা তো আমার, ভালোই চিনি।”
এই বলে কারান কল বিচ্ছিন্ন করল এবং সোজা মিরার দিকে এগিয়ে গেল।
কারানকে দেখে মিরা স্বাভাবিক স্বরে প্রশ্ন করল, “কোথায় গিয়েছিলে?”
কারান কোনো উত্তর দিল না। আচমকা এক অদম্য তাড়নায় মিরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মিরা সামান্য কপাল কুঁচকালেও, মুহূর্তের মধ্যেই স্বামীর আলিঙ্গনে নিজেকে সঁপে দিতে ভুলল না। কিছুক্ষণ পর কারান তার বাহুবন্ধন আরও দৃঢ় করল; এই একটিমাত্র আলিঙ্গনের মধ্যেই সে নিজের সমস্ত ক্লান্তি, বিরক্তি আর অব্যক্ত চাপ ঢেলে দিতে চাইছিল। মিরার শরীরের উষ্ণতা, তার নিশ্বাসের মৃদু কম্পন—সবকিছুই কারানের অস্থির মনকে অচিরেই স্তব্ধ করে দিল।

তারান্নুমের কলের প্রতীক্ষায় ফারহান কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে কারানের কথামতো ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। দাঁত দিয়ে চিন্তার বশে নখ কাটছিল সে; তবু ফোনে কোনো ইনকামিং কলের কোনো ছাপ দেখা যাচ্ছিল না। চিন্তার তীব্রতায় তার কপাল ঘামতে শুরু করল, যদিও ঘরে আধুনিক এসি কাজ করছিল। হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুতগতিতে চলছিল। ঘরের সামনের অংশ কাচের গ্লাস দিয়ে আবদ্ধ, যার মধ্য দিয়ে দুবাইয়ের অসংখ্য দৃশ্য ভেসে ওঠে। অ্যাপার্টমেন্টটি পঁয়ত্রিশ তলায় হওয়ায় ওই অংশে দাঁড়িয়ে আশেপাশের সবকিছুই ক্ষুদ্র মনে হয়।
ফারহানের চোখ ধীরে ধীরে কাচের ওপাশের ছোট রুফটপটির দিকে গড়াল। সে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো। এখান থেকে ‘এমিরেটস হিল্‌সে’-র সুশৃঙ্খল ভিলাগুলোর সারি, সবুজ গলফ কোর্স, এবং দূরবর্তী লেকের আড়ম্বরসহ প্রায় সার্বিক দৃশ্য দেখা যায়। ভিলাগুলো এতটাই পরিমিত এবং সমন্বিত যে মনে হয়, কৃত্রিমভাবে সাজানো কোনো মডেলের অংশ।
কিন্তু ফারহানের স্থির দৃষ্টি ছিল চিন্তায় মগ্ন, মন ছিল ব্যাকুল। বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল, তবু সময় ক্রমে ক্রমে কেটে যাচ্ছিল, কিন্তু কল আসছিল না। নিজের পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ডের জন্য নিজেকেই অপরাধী মনে হতে লাগল। তারান্নুমের রাগের কারণ যথাযথ, ফারহানও তা মানতে পারছিল; তবু মন মানছিল না। অবশেষে সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, ঘরের ভিতরে ফিরে গেল। এক গ্লাস পানি পান করে শুকনো গলাটাকে একটু ভিজিয়ে নিল।
গ্লাস হাতে ধরে থাকা অবস্থাতেই হুট করেই আয়লার কথা মনে পড়ল। সত্যিই তো, সে মেয়েটাকে একটু বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলেছে, নাহলে আয়লা এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাত না। তাই গ্লাসটা ঠক করে টেবিলের উপর রেখে, ফোন নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

প্রায় দীর্ঘ সময় অ্যাপার্টমেন্টের প্রতিটি কোনা, প্রতিটি ঘর খুঁজে দেখলেও আয়লার সন্ধান পায়নি। অবশেষে লিফটে উঠে ছাদে গেলে দেখল, বিল্ডিংয়ের এক কোনে, পিঠের সাথে দুই হাত একত্র করে দাঁড়িয়ে আছে সে। ফারহান দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল, ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে কিছুটা দূরে দুই হাত ট্রাউজারের পকেটে রেখে দাঁড়াল।
ফারহানের সুঠাম ও পেশিবহুল শরীরের ঊর্ধ্বাংশ আপাতত অনাবৃত। তার গাত্রবর্ণ অতিরিক্ত গৌর হওয়ায় ত্রিভুজাকৃতির দেহের গঠনের কোমরের নিম্নাংশে থাকা ক্ষতচিহ্নটি আজ বেশ প্রকট হয়ে উঠেছে। যদিও এই অবস্থায় আয়লা তাকে আগেও দেখেছে, না দেখলেও বা কি? বস্তুত, লজ্জা নামক শব্দটির সাথে ফারহানের পরিচয় চিরকালই যৎসামান্য। অতীতে যখন তার রাতগুলো বিচিত্র সব নারীর সান্নিধ্যে অতিবাহিত হতো, তখন পরিধেয় বস্ত্রকে তার কাছে কেবলই এক অনর্থক আবরণ বলে মনে হতো।

​ফারহানের নেত্রদ্বয় অতল সমুদ্রের ন্যায় নীল। সেই গভীর দৃষ্টির অন্তরালে মাঝে মাঝে বিষাদের সূক্ষ্ম রেখা ফুটে উঠলেও, তাতেও চৌম্বকীয় আকর্ষণ বিদ্যমান। সে যখন কথা বলে, তখন প্রতিটি শব্দ আদেশের ন্যায় প্রতিধ্বনিত হয়। অথচ সেই কঠোরতার মাঝেও যখন সে প্রাণখোলা হাসি দেয়, তখন যে কেউ তার মোহে আবিষ্ট হতে বাধ্য। মূলত এই দুর্মর আকর্ষণ এবং আভিজাত্যের কারণেই অজস্র নারী তার পৌরুষদীপ্ত ব্যক্তিত্বের চরণে অবলীলায় নতজানু হয়েছে।
আয়লা স্বভাবতই একটি সাহসী, গম্ভীর, আত্মবিশ্বাসী মেয়ে। শ্যামলা ত্বক, দীর্ঘ আঙুল, মুখের গঠন সূক্ষ্ম, চোখগুলো গভীর, এবং গলার উপর হালকা রেখায় কিছু কাটা চিহ্ন তাকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
ফারহান জানত, তার দিকে তাকানো তো দূর, আয়লা দুবাইয়ের কোনো সুদর্শন ছেলের দিকেই তাকাবে না। কারণ গত পাঁচ বছর ধরে তার মনে একমাত্র ব্যক্তি কারান চৌধুরি বিরাজমান।
ছাদের ওই কোনে রেলিং নেই, তবুও দুজনই ছাদের একদম কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। হালকা বাতাসে দুজনের গায়ের পোশাক আলতোভাবে দোলায়মান। ফারহানের দিকে না তাকালেও আয়লা বুঝতে পারছিল ফারহান এসেছে। কিছুক্ষণের জন্য দুজনই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
দুবাইয়ের বিকেলের আলো ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এসেছে। ষাট তলা ভবনের ছাদের কিনারা থেকে এমিরেটস হিল্‌সের ভিলাগুলোকে খেলনার ঘরের মতো ক্ষুদ্র মনে হলো।
আয়লার দিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে শেষাবধি ফারহানই নীরবতা ভাঙল। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করল, “সরি।”

মাত্র এই একটি শব্দেই তার বাক্য থেমে গেল। অথচ আয়লার ঠোঁটও একচুল সঞ্চালিত হলো না। অতঃপর আরো সাত মিনিট দু’জনেই নীরব, স্থবির দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর আয়লা ধীর লয়ে ফারহানের দিকে মুখ ফেরাল। তার দৃষ্টি ঈগলের ন্যায় প্রখর ও অনিবার্য। সেই দৃষ্টির তীক্ষ্ণতায় ফারহানের থমথমে মুখাবয়ব, চাহনির স্থৈর্য, কণ্ঠস্বরের অবদমিত কম্পন মিলিয়ে তার অন্তর্গত অনুভব অনুধাবনে আয়লার এক মুহূর্তও বিলম্ব হলো না।
সে প্রশান্ত স্বরে বলল, “তারান্নুমকে তুমি অত্যধিক ভালোবাসো, তাই তো?”
ফারহান উত্তর দিতে গিয়ে আয়লার দিকে দৃষ্টিপাত করল না। তার চোখ স্থির রইল সম্মুখে বিস্তৃত অনন্ত আকাশে। অতঃপর দৃঢ় উচ্চারণে বলল, “আমার অন্ধকার ঘরের দরজায় হঠাৎ কড়া নেড়ে আলোর দিশা মিলিয়েছে তারান্নুম। তুমি সমুদ্রের পানির উচ্চতা, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ কিছুই মাপতে পারবে না। তাই আমাকে এই প্রশ্ন করো না। ওর প্রতি আমার ভালোবাসাও সমুদ্রের মতোই অঢেল, অথৈ, অন্তহীন।”
আয়লা কিঞ্চিৎ হাসল। সে সাধারণত হাসে না বললেই চলে। অতি বিরল পরিস্থিতিতেই তার অধরে হাসির আভাস দেখা যায়, তাও মূলত সামাজিক সৌজন্য রক্ষার প্রয়োজনে।
পুনরায় দৃষ্টি সম্মুখে স্থাপন করে আয়লা বলল, “আমার খুব আফসোস হয়। আমাকে কেউ কখনো এভাবে ভালোবাসেনি। এমনকি আমি মৃ’ত্যুবরণ করলেও হয়ত আমার জন্য এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলার মতো মানুষও থাকবে না।”

এই বক্তব্যের পর ফারহান আর কোনো প্রশ্ন করল না। কেবল আয়লার হঠাৎ ম্লান হয়ে যাওয়া মুখাবয়বের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কারণ আয়লাকে সে জানে, অন্য সবার চেয়েও বহুগুণে গভীরভাবে জানে।
আয়লা ছিল তার পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। সে যে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য বছরের পর বছর নিজের জীবন উৎসর্গ করে চলেছে, তার পেছনে কেবল পেশাগত দায়বদ্ধতা নেই, নিহিত রয়েছে এক ভয়ংকর ব্যক্তিগত ইতিহাস।
আয়লার বয়স তখন মাত্র বারো। নিজের চক্ষে সে প্রত্যক্ষ করেছিল পিতা-মাতার নির্মম পরিণতি। কেবল মৃ’ত্যু নয়; কে’টে খাওয়া, ছিঁ’ড়ে ফেলা, ক’লি’জা বের করে নেওয়ার সেই নৃশংস দৃশ্য তার শৈশবকে মুহূর্তে পাথরে পরিণত করেছিল।

সেই সময়ে তার পরিবারসহ আরও দুটি পরিবার বনভ্রমণে বেরিয়েছিল। ভ্রমণশেষে পথভ্রষ্ট হয়ে তারা অরণ্যের আরও গভীর অন্ধকারে প্রবেশ করে। ঠিক তখনই তারা পতিত হয় বনবাসী আদিবাসীদের কবলে। বিষলিপ্ত তীরের আঘাতে একে একে সবাই অচেতন হয়ে পড়ে; এরপর তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় আদিবাসীদের গোপন আস্তানায়।
সেখানেই আয়লা ছাড়া সকলকে হ’ত্যা করে ভক্ষণ করা হয়। আয়লাকেও হ’ত্যা করা হতো, যদি না আদিবাসী প্রধানের মৃ’ত কন্যার সঙ্গে তার বিস্ময়কর সাদৃশ্য আবিষ্কৃত হতো। সেই সাদৃশ্যের কারণেই আয়লাকে তারা প্রধানের কন্যার প্রতিস্থাপনা হিসেবে জীবিত রাখে।
নিজের পিতা-মাতাকে চোখের সামনে এমন নিষ্ঠুরভাবে মৃ’ত্যুবরণ করতে দেখার যন্ত্রণা ভাষায় সম্পূর্ণরূপে প্রকাশযোগ্য নয়। সে যন্ত্রণা না কেউ পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারবে, না আয়লার পক্ষে তা বর্ণনার উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। সেবার কোনোভাবে সে তাদের হাত থেকে পালিয়ে বেঁচে ফিরেছিল। জায়গাটির স্মৃতি আজও তার মনে অক্ষত, কিন্তু ঠিকানা মনে নেই।
সেই ঘটনার পর থেকেই আয়লা ধীরে ধীরে কঠোর হয়ে উঠেছে। নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য অনুভূতিগুলোকে সে শানিত অস্ত্রের মতো ধার দিয়েছে। এখন তার জীবনের একটাই উদ্দেশ্য— ওদেরকে খুঁজে বের করা।
আয়লা ফারহানের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। ফারহানের ক্লান্ত, ম্লান মুখটা দেখে সে ঠোঁটের কোণে একরাশ তীর্যক রেখা টেনে বলল, “এবার বলো, কাহিনি কী?”
ফারহান গাল দুটো সামান্য ফুলিয়ে দীর্ঘ এক নিশ্বাস ছাড়ল। তারপর ধীরে ধীরে পুরো ঘটনাটা খুলে বলল। সবটা শুনে আয়লা কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। কথাগুলো মাথায় ঢুকছে, কিন্তু সে দেওয়ার মতো ঠিক প্রতিক্রিয়াটা খুঁজে পাচ্ছে না। খানিকক্ষণ পর ঠোঁট কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে, প্রায় অবিশ্বাসের সুরে বলল, “জাস্ট ‘বেইবি’ বলার কারণে এত কিছু! আমি তো ভেবেছিলাম—”

বাকিটুকু আর শেষ করল না। বরং হালকা ভ্রূ উঁচিয়ে ব্যঙ্গ আর হতাশায় মিশ্রিত একরাশ নিশ্বাস ছেড়ে দিল। কিন্তু ফারহান কণ্ঠ ভারি করে আওড়ালো, “এটা আমাদের কাছে জাস্ট মনে হলেও তারান্নুমের কাছে তা নয়। শি ডাজেন্ট বিলং টু আওয়ার কালচার, শি’জ জেনুইনলি পিউর অ্যাট হার্ট। এতটাই পিওর যে, ওর সামনে দাঁড়ালে আমার নিজেকে ক্রি’মিনাল মনে হয়।”
কথাগুলো শুনে আয়লার মুখের ব্যঙ্গ মিলিয়ে গেল। সে চোখ নামিয়ে নিল। গলার স্বর নরম হয়ে এলো, “সরি। তোমাকে… তোমাকে ওইভাবে আঘাত করা উচিত হয়নি।”
ফারহান কোনো উত্তর দিল না। সে চুপচাপ দূরের অন্ধকারের দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল। আয়লা বুঝে গেল, চড় দেওয়ায় ফারহানের সত্যিই মন খারাপ হয়েছে। আয়লা এক পা এগিয়ে এসে দুই হাত মেলে বাড়িয়ে বলল, “হয়েছে, বাবা। নাউ জাস্ট হাগ মি অ্যান্ড লেট ইট অল গো।”
কিন্তু ফারহান সামান্য দূরে সরে গেল। এই প্রতিক্রিয়ার কারণ বুঝে আয়লা এক ভ্রূ উঁচিয়ে, বিস্ময় আর ঠাট্টা একসাথে মিশিয়ে ট্রাউজারের পকেটে দু’হাত গুঁজে বলল, “উঁহুঁ উঁহুঁ। বাবাহ! লয়াল! এটা যে সেইইই ফারহান, আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।”

কথাটা শুনে ফারহান খানিকটা লজ্জা পেল। ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে নিয়ে সে অন্যদিকে তাকাল। যদিও তার গালের হালকা লালচে ভাব আয়লার চোখ এড়াল না। ঠিক তখনই হঠাৎ ফারহানের ফোনে কল এলো।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। নিশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল। আয়লাও দেখে ফেলল ফোনের নামটা —My Queen।
ফারহানের মাথায় তখন একটাই আশঙ্কা ঘুরছে, হয়ত বিয়ে ক্যানসেল করার কথাই বলবে তারান্নুম। সেই ভয়ে সে কল রিসিভ করার সাহস পাচ্ছিল না। ঢোক গিলে বারবার আয়লার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। পরিস্থিতি বুঝে আয়লা আর সময় নষ্ট করল না। দৃঢ় হাতে ফোনটা ফারহানের হাত থেকে নিয়ে নিল। কল রিসিভ করে কানে তুলল।
ফারহান তখন অজান্তেই অধর কামড়ে ধরেছে। বুকের ভেতর অস্থিরতা তুফানের মতো ঘুরছে, যদিও আয়লার উপর তার অগাধ আস্থা আছে। ওদিকে ফোনের ওপাশে তারান্নুম কোনো কথা বলছে না।
নিঃশব্দে ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সে।
বাংলাদেশের গ্রাম তখন অন্ধকারে সম্পূর্ণ মিশে গেছে। চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধুমাত্র দূরে জ্বলজ্বল করছে কয়েকটা দুর্বল লণ্ঠনের আলো। কিন্তু বাহিরের অন্ধকারের থেকেও তারান্নুমের মন আরও গভীরভাবে আচ্ছন্ন।
বুদ্ধিমতী আয়লা তার বিচক্ষণ প্রজ্ঞা ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশক্তির বলেই অনুধাবন করতে পারছিল, তারান্নুম আসলে কিছু বলতে চায় না, সে শুধু ফারহানের কণ্ঠস্বর শুনতে চায়।
তাই আয়লা নিঃশব্দে ফোনটি মিউট করল। তারপর কয়েক পা এগিয়ে ফারহানের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “Just say hello.”

এই বলে ফোনটা তার হাতে ধরিয়ে দিল।
ফারহান চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়, অপরাধবোধ আর অনিশ্চয়তার ভার থেকে সামান্য সাহস সঞ্চয় করার ব্যর্থ চেষ্টা করল। তারপর অসহায়, নিরুপায় দৃষ্টিতে আবার আয়লার দিকে তাকাল। আয়লা চোখের ইশারায় কথা বলতে বলল।
ফারহান ঠোঁট দিয়ে অধর ভিজিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল, “হ্যালো, কুইন।”
এইটুকু বলতেই তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। ওদিকে ফোনের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা তারান্নুমের অস্থির মন আরও ব্যাকুল হয়ে উঠল। কী বলা উচিত, সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। দু’জনের মাঝেই নেমে এলো এক ভারী, নিবিড় নীরবতা; যে নীরবতায় কথা নেই, অথচ অজস্র না-বলা অনুভূতি জমে আছে।
এই অবস্থা দেখে আয়লা ব্যঙ্গভরা এক নিশ্বাস ছাড়ল। চোখ সরু করে মনে মনে বলল, “প্রেমে পড়লে যা হয় আরকি! মা’লদুটো এভাবেই চুপচাপ নিজেদের ভুল বোঝাবুঝি মিটাবে নাকি? যদিও প্রেমের নাকি হাজার রকম টেকনিক হয় শুনেছি।”

সময় নষ্ট হবে ভেবে সে আর দেরি করল না। আচমকাই ফারহানের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল।
ফারহান বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আয়লার দিকে। কিছু বলল না। সে জানে, আয়লা অসম্ভব ম্যাচিউর, অসম্ভব বুঝদার একটা মেয়ে। এই মুহূর্তে সে ভুল কিছু করবে না—এই বিশ্বাসটুকু তার আছে।
আয়লা এবার কণ্ঠস্বর নরম করে বলল, “হাই, আমি আয়লা দেমির। ফারহানের একমাত্র আপন শত্রু।”
আয়লার এমন স্বর শুনে তারান্নুম অনিচ্ছাসত্ত্বেও কপাল কুঁচকে আপনমনে বিড়বিড় করল, “আয়লা-কয়লা না ছাই! অন্যের সংসার ভাইঙা আবার ঢং করতে আইছে।”
এবার নাক ফুলিয়ে মুখ খুলল, “শত্রু আবার আপন হয় কীভাবে?”
“উমমম!” আয়লা হালকা টান দিয়ে বলল, “আমি কি আসলেই মিস তারান্নুমের সাথেই কথা বলছি?”
তারান্নুম কণ্ঠ শক্ত করল, “কেন, আপনার কি মনে হচ্ছে?”
আয়লা হাসি চাপা দিয়ে বলল, “আসলে কী জানো, তারান্নুমের আমি এত বেশি প্রশংসা শুনেছি, বিশেষ করে তার ভাষার। কিন্তু এখন সেটাই শুনতে পাচ্ছি না।”
তারান্নুম মুখ খানিকটা তীর্যক করে উত্তর দিল, “অচেনা মানুষের সাথে আমি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলি না।”
এইবার আয়লা হুট করেই নির্ভার হাসিতে হেসে উঠল, “অবশ্যই বলবে। কারণ তোমার মুখে ওই ভাষাটা শুনতে চরম লাগে। আর শুনো, তোমাকে তুমি করে বলছি বলে মাইন্ড করো না। আমি তোমার থেকে বয়সে সিনিয়র। এমনকি তোমার ওই হাবলা ফিউচার জামাই থেকেও বড়ো হতে পারি।”

একটু থেমে নাটকীয় গলায় যোগ করল, “আর হ্যাঁ, ওর সাথে আমার সম্পর্ক মারামারি-কাটাকাটির। তোমার জন্য মায়া হয় বলে পারছি না শুধু; নাহলে কবেই ওর পেটে কয়েকটা ছুরির গুঁতো মেরে, তোমারই দেশের বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিতাম। আর তুমি কিনা ওর মতো একটা বেত্তামিজের সাথে আমাকে মিলাচ্ছ? ছ্যা ছ্যা! আমার ইজ্জত যাবে যে!”
তারান্নুম এবার কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা ছড়িয়ে বলল, “এতই যহন অপছন্দ, তাইলে ‘বেবি’ ডাকলেন ক্যান? আর এমনিতেও আপনার বন্ধুর চরিত্র গোবরের চেয়েও দুর্গন্ধযুক্ত।”
ফারহান বিমূঢ় হয়ে কপালে হাত দিল। তার চোখের সামনেই তার হবু স্ত্রী তার সম্মান ও ব্যক্তিত্বের তেরোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। আয়লা অবশ্য পরিস্থিতিটা বেশ উপভোগ করছে; অট্টহাসি দিতে গিয়েও অনেক কষ্টে তা দমন করল। নিজের গম্ভীর ভাবটা পুনরুদ্ধার করে আয়লা বেশ দাপটের সাথেই বলল, “তা মন্দ বলোনি। ঠিক আছে, ফারহানের জন্য অন্য কোনো সুশীলা মেয়ে দেখে বিয়ে দিয়ে দেব। আর তোমার জন্যও তো চমৎকার কোনো সুদর্শন পাত্রের ব্যবস্থা করতে হবে।”

আয়লার প্রস্তাব শুনে তারান্নুমের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে হাত মুঠো পাকিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে বেশ তীব্রস্বরে প্রতিবাদ করে উঠল, “অন্য মেয়ে খুঁজে দেবেন মানে? আমি কি ভাইসা আইছি নাকি? তাছাড়া আমার চোখে উনিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুদর্শন পুরুষ, আর কোনো হ্যান্ডম্যান্ডু দিয়া আমি কী করুম? আপনার দায়িত্ব শুধু উনারে চোখে চোখে রাখা, যেন উনি কোনো মেয়ের দিকে তাকাইতে না পারে। যদি তাকায়, তার চোখদুইটা উপড়ে নেবেন! আর…”
আয়লা ভ্রূ নাচিয়ে গলার স্বর কিছুটা গম্ভীর করে জিজ্ঞাসা করল, “আর?”
“আর আপনি নিজেও অতিরিক্ত নজর দেবেন না। তাকাইলেও ভাইয়ের নজরে তাকাইবেন!”
তারান্নুমের এমন শিশুসুলভ কিন্তু প্রবল অধিকারবোধ দেখে আয়লা ঠাট্টা মিশিয়ে বিদ্রুপের সুরে বলল, “ওর দিকে তাকানোর টাইম আমার কোথায়, বেবিগার্ল? দুবাইয়ের অগণিত বিত্তশালী আর রাজপুত্রের ভিড়ে ওকে তো আমার চোখেই পড়ে না। আর তাকালেও কেন তাকাই জানো? হয় চড় মারার জন্য, না হয় মুখে থুথু দেওয়ার জন্য!”
এ কথা শুনে তারান্নুমের মন বিচলিত হয়ে উঠল। কাতর স্বরে বলল, “না না, থাপ্পড় মারবেন না, ব্যথা পাইব তো। আর আপনিই বা ক্যান তারে স্পর্শ করবেন? তার একখানা রূপবতী হবু স্ত্রী আছে তো। হাহ!”
তারান্নুমের এই প্রবল ঈর্ষা আর অন্ধ মায়া দেখে আয়লা রীতিমতো বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। মেয়েটা যে এত দ্রুত তার কথার জালে আটকা পড়বে, তা সে কল্পনাও করেনি। বিজয়ী হাসি হেসে ফোনটা ফারহানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে আয়লা বলল, “মিশন সাকসেসফুল, সোনা। কাজ হয়ে গেছে। এবার তোমার এই জেলাস বান্দির সাথে কথা বলে বাকি মান-অভিমান মিটিয়ে সেটিং করে নাও। তোমাদের প্রেমালাপের মাঝে আমি আর হাড়গিলা হতে চাই না, ব্রো।”
ফারহান মৃদু হাসল। তার চোখের কৃতজ্ঞতাপূর্ণ চাহনি স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল যে সে আয়লার ওপর কতটা খুশি। আয়লা নিচে নেমে যেতেই ফারহান নিজের সেই চিরচেনা মোহনীয় স্বরে তারান্নুমের সাথে কথোপকথন শুরু করল।

দীর্ঘ বিশ ঘণ্টার ক্লান্তিকর ও অবিশ্রান্ত সফর শেষে গৃহকোণে পদার্পণ করল কারান ও মিরা। অবসাদগ্রস্ত কারান ঘরে ঢুকেই প্রসাধনকক্ষে আশ্রয় নিল। মিরা আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হাতমুখ ধৌত করে মমতাজের জন্য সযত্নে আনা চুরির বাক্সটি খুঁজতে শুরু করল। ড্রয়ার থেকে আলমারির প্রতিটি নিভৃত কোণ তন্নতন্ন করে খুঁজেও কাঙ্ক্ষিত বস্তুর দেখা মিলল না। কপালের ঘাম মুছে ক্লান্ত কণ্ঠে বিড়বিড় করে উঠল মিরা, “অদ্ভুত তো! রাখলাম কোথায়?”
হতাশার চাদর গায়ে জড়িয়ে যখন সে আবারও অনুসন্ধানে মগ্ন, তখনই অতর্কিতে কারান পিছন থেকে তার কোমরবেষ্টন করে নিজের বলিষ্ঠ বক্ষের দিকে টেনে নিল। মিরার পিঠ কারানের তপ্ত বুকে ঠেকতেই সে এক মুহূর্তের জন্য আড়ষ্ট হয়ে গেল। ঘাড়ের ওপর কারানের উষ্ণ নিশ্বাসের পরশ মিরার মনে গত রজনীর সেই অদম্য উন্মাদনার স্মৃতি জাগিয়ে তুলল। সে কিছুটা শঙ্কিত হয়ে ঢোক গিলল। কারান মিরার কোমরের আঁচলটি অবহেলায় সরাতে সরাতে গাঢ় স্বরে শুধালো, “এত অধৈর্য হয়ে কী খুঁজছ?”
মিরা নিজের অস্থিরতা সামলে নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে শ্রান্ত নয়নে কারানের দিকে তাকাল। বলল, “মায়ের জন্য কেনা চুরি দুটো হন্যে হয়ে খুঁজছি, কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না।”
কারান অপলক দৃষ্টিতে মিরার পরিশ্রান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মিরার সান্নিধ্য যেন এক দুর্নিবার আকর্ষণ, যা বারবার তাকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে। তবে এই মুহূর্তে নিজের আদিম বাসনাগুলোকে সংবরণ করে সে পিছন থেকে কারুকাজ করা চুরির বাক্সটি মিরার সম্মুখে ধরল। মিরা একরাশ বিস্ময় ও আনন্দ নিয়ে হেসে উঠল, “তুমি কোথায় পেলে এটা?”

কারান তাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে আকুল কণ্ঠে বলল, “কালই যাবে? আর কিছুদিন থাকো না, মিরা।”
কারানের কণ্ঠের সেই আকস্মিক আর্তি মিরার হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করল। সে ক্ষণিক থমকে গিয়ে কিছু একটা ভাবল; তার অবাধ্য মনটাও যে কারানের এই সান্নিধ্য-সুধা আরও কিছুদিন পান করতে চাইছে। মিরা এবার ধীরলয়ে কারানের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তার দুই হাত কারানের গ্রীবায় অর্পণ করল; মিরার আঙুলের সেই স্পর্শ ছিল যেমন স্নিগ্ধ, তেমনি চঞ্চল। পায়ের পাতায় ভর দিয়ে কারানের কর্ণের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “কারান, অনেকদিন ধরে একটা শখ পুষে যাচ্ছি। পূরণ করবে?”
কারান গভীর ও সংকল্পবদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে মিরার কাঁধে হাত রাখল। প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে বলল, “আপনার প্রতিটি অভিপ্রায় পূরণ করা কারান চৌধুরীর কর্তব্য। বলুন, কী আপনার সেই সুপ্ত বাসনা?”
মিরা এক চিলতে মায়াবী হাসি ছড়িয়ে বলল, “আমার হাতে তোমার নামের অক্ষর দেখতে চাই।”
শুনে কারানের ভ্রূযুগল কুঁচকে গেল, ওষ্ঠাধরে ফুটে উঠল চতুর হাসি। সে মিরার আরও কাছে সরে এসে ধীরলয়ে শুধালো, “শুধু হাতে? অন্য কোথাও না?”
মিরা দুষ্টু হেসে কারানের কানের লতির ঠিক নিচে আলতো করে দংশন করল। কারানের ফরসা ত্বকের সেই অংশটুকু মুহূর্তেই রক্তিম হয়ে উঠল, কিন্তু তার কোনো হেলদোল নেই। সে পাথরের মূর্তির মতো স্থির থেকে অপলক দৃষ্টিতে মিরার মোহময় মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। মিরা খানিকটা লজ্জা পেয়ে শাসনের সুরে বলল, “অ’সভ্য লোক! হাতে মেহেদি দিয়ে দাও।”

কারানের চোখে-মুখে তখন একরাশ বিস্ময়। অর্থাৎ তার অভ্যাসবিরুদ্ধ এই আবদার শুনে কিছুটা হতবাক। মিরা মৃদু হেসে কারানের মুখমণ্ডল নিজের দুই হাতের অঞ্জলিতে আগলে ধরল। তার চোখের তারায় তখন চপল আবদারের ঝিলিক। সে গাম্ভীর্যের ছলে বলল, “এভাবে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থেকে কোনো লাভ নেই। আমার স্বামী একজন পেইন্টার, আর আজ সেই শিল্পীসত্তার পরিচয় দেবে সে আমার হাতে মেহেদি পরিয়ে।”
“সুইটহার্ট, মজা করো না তো। ক্যানভাসে তুলি চালানো আর হাতের তালুতে মেহেদির রেখা টানা—দুটো কি এক হলো?”
মিরা কৃত্রিম অভিমানে ঠোঁট উলটে বলল, “ওসব আমি জানি না। এখন বলো, কবে পরিয়ে দেবে?”
“কিন্তু এই অসময়ে মেহেদি পাবে কোথায়?”
কারানের এই প্রশ্নে মিরা বিজয়ের হাসি হাসল।
“এখানে আসার আগেই গতকাল ফরিদ কাকাকে দিয়ে আনিয়ে রেখেছিলাম। এখন আর অযথা প্রশ্ন না করে কাজ শুরু করো।”

কারান এবার মিরাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সান্নিধ্যে টেনে নিল। তাদের দুজনের উদর মিলিত হলো। তার চোখের মণিতে তখন নেশাতুর উষ্ণতার খেলা। সে মিরার কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিশ্বাস ফেলে বলল, “কাল থেকে তোমার সব শখের লিস্ট তৈরি করবে। একে একে সব পূরণ করব। আবার যেন চাঁদ এনে দিতে বলো না।”
“যদি বলি?”
কারান কোনো দ্বিধা না রেখে ধীরস্থিরভাবে মিরার কপালে গভীর এক চুম্বন এঁকে দিল। তারপর বলল, “তথাস্তু! আপনার জন্য ওই নীলিমার চাঁদকেও ধরাশায়ী করব, হে আমার হৃদয়ের মহারানি ভিক্টোরিয়া!”
কারানের এই অতিশয়োক্তি শুনে মিরা হেসে ফেলল। তার আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে ঘরের অন্য প্রান্তে যেতে যেতে সে বিদ্রুপের সুরে বলল, “আমি মজা করে যাই বলি, সবই তুমি সিরিয়াসলি নিয়ে নাও কেন বলো তো? চাঁদ আনবে কীভাবে শুনি? ওটা কি তোমার পৈতৃক সম্পত্তি? আর এখন যদি বলি আমায় মঙ্গল গ্রহে নিয়ে চলো, তবে কি বলবে, হ্যাঁ নিয়ে যাব?”

“হ্যাঁ, নিয়ে যাব।”
কারানের এই অবিচল ও গম্ভীর অভিব্যক্তি দেখে মিরা বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলল। কৃত্রিম বিরক্তি নিয়ে বলল, “বুঝেছি, মাথার তারগুলো সব ছিঁড়ে গেছে। ওসব আমি এমনিতেই বলেছি। এখন ওসব আকাশছোঁয়া চিন্তা বাদ দিয়ে এদিকে এসো, আর লক্ষ্মী ছেলের মতো আমাকে মেহেদি পরিয়ে দাও।”
কারান কোনো উত্তর না দিয়ে ধীরপদে অগ্রসর হয়ে বিছানায় উপবেশন করল। মিরা তার পাশে বসার উপক্রম করতেই কারান এক হ্যাঁচকা টানে তাকে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল। এই আকস্মিকতায় মিরা কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও পরক্ষণেই ড্রেসিং টেবিল থেকে মেহেদির টিউবটি বাড়িয়ে দিল কারানের দিকে। তারপর লাজুক হাসিতে অধর রঞ্জিত করে মিরা বলল, “জানো কারান, পুরো ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজতে গিয়ে আমি অপ্রত্যাশিত একটা জিনিসের হদিশ পেয়েছি।”
কারান তখন অত্যন্ত নিবিষ্ট মনে পাশে রাখা একটি সংবাদপত্রের ওপর মেহেদি দিয়ে দু-একটি রেখা টেনে হাত মকশো করছিল; সে পরখ করে দেখছিল তার তুলির টান মেহেদির সরু ছিদ্রে কতটা কার্যকর। মিরার কথা শুনে সে খুব একটা ভ্রূক্ষেপ করল না। মিরার ডান হাতটি নিজের বাম হাতের তালুর ওপর সযত্নে বিছিয়ে নিয়ে অতি সূক্ষ্ম নকশা করতে করতে নির্লিপ্ত কণ্ঠে শুধালো, “কি পেয়েছ?”
“তোমার খুব ব্যক্তিগত একটা জিনিস!”

কারান তখনো মগ্ন তার শৈল্পিক কার্যে। মিরার হাতের ত্বকে মেহেদির শীতল স্পর্শে অদ্ভুত শিহরন জেগে উঠছে। কারান ভাবলেশহীন স্বরেই বলল, “অহেতুক হেঁয়ালি আমার একদমই পছন্দ না, মিরা। যা বলার স্পষ্ট করে বলো।”
কারানের কণ্ঠের আকস্মিক কাঠিন্যে মিরা কিছুটা থতোমতো খেয়ে গেল। তার চঞ্চলতা নিমেষেই ম্লান হয়ে এলো। সে কিছুটা আমতা আমতা করে নিচু স্বরে বলল, “আসলে… আমি তোমার একটা ডায়েরি পেয়েছি।”

Tell me who I am 2 part 12

কারানের হাতের মেহেদির টিউবটি স্থির হয়ে গেল। তার শিরদাঁড়া দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল, গায়ের লোমগুলো যেন তড়িৎস্পৃষ্ট হয়ে খাড়া হয়ে উঠল। সে হাতের কাজ ফেলে এক ঝটকায় মিরাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ধরল। কারানের চোখে-মুখে তখন দুর্ভেদ্য আতঙ্ক ও অস্বস্তি কাজ করছে। শুষ্ক কণ্ঠে ঢোক গিলে সে প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, “পড়েছ নাকি ওটা? ওর ভেতরে যা লেখা আছে সব পড়ে ফেলেছ?”
কারানের এই রুক্ষ ও অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখে মিরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। যে মানুষটা একটু আগে চাঁদ এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল, এক নিমিষেই সে যেন এক অচেনা মানুষে রূপান্তরিত হলো।

Tell me who I am 2 part 14