Tell me who I am 2 part 7 (2)
আয়সা ইসলাম মনি
মিরার হৃদয়ের অন্তঃস্থলে প্রবল ঝঞ্ঝা আছড়ে পড়ল। কপালের ভাঁজ ক্রমশ গাঢ়তর হলো, গলা শুকিয়ে এলো।
“তুমি… তুমি এসব আজেবাজে কথা কেন বলছ, কারান? এসব-এসব নিছকই বিভ্রান্তি। আমি তো এখন তোমাকে নিয়েই সন্দেহ করছি। তুমি আমার কারানই তো? বাহির থেকে আসার পর থেকেই তোমার আচরণ বদলে গেছে। তুমি ঠিক আছো তো? তোমার মাথায় এসব কে ঢুকিয়েছে?”
কারান তর্কে আর প্রবেশ করল না। তার কণ্ঠস্বর নীচু হয়ে এলো, “আমার স্পর্শ পেয়েও কি তোমার মনে হয় আমি অন্য কেউ?”
মিরা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। সত্যিই তো, এ যে নিঃসন্দেহে তার কারানই—তবুও তার মাকে নিয়ে উচ্চারিত সেই নির্মম বাক্য মনের গভীরতায় প্রবল অস্বস্তি সৃষ্টি করছে। কথাগুলো মিরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।
কারান আবার বলল, “হয়ত আজ বিশ্বাস করতে পারবে না। তবুও শুধু এটুকু মনে রেখো, যা-ই ঘটুক না কেন, যত গভীর আঁধারেই ডুবে যাক জীবন, আমার প্রতি তোমার বিশ্বাস যেন ভাঙে না। আমি তোমাকে ভালোবাসি, মিরা। নিজের জীবন, আত্মা, অস্তিত্বের চেয়েও বেশি ভালোবাসি।”
এরপর মিরার ঠোঁটে আলতো করে বুড়ো আঙুল ছুঁয়ে কণ্ঠস্বর আরো কোমল করে বলল, “I love you endlessly. I’m madly and hopelessly in love with you. I love you more than words can express. You’re the only one my soul aches for. Loving you is the only thing I’m certain of. Even if the whole world turns against me, I will still love you. Do you even realize how deeply I love you?”
মিরার শ্বাস গাঢ় হয়ে এলো। ফিসফিস করে বলল, “তুমি আমাকে যেন হিপনোটাইজ করে ফেলছ, কারান।”
কারান অনড় চোখ বলল, “তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাওনি, মিরা।”
চোখ নামিয়ে নিল মিরা। বুকের ভেতর জমে থাকা অজস্র কথা তার ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এলো, “আমি জানি, তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো। সত্যিই আমি তা বুঝতে পারি। তুমি যেন এক সীমাহীন মহাসাগর, আর আমি কেবল তটরেখায় দণ্ডায়মান। তোমার ঢেউয়ের আঘাত অনুভব করি বটে, কিন্তু গহ্বরের গভীরতা স্পর্শ করতে পারি না। আমার ভালোবাসা হয়ত তোমার মতো প্রবল ও বিধ্বংসী নয়; কিন্তু প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি প্রার্থনা, প্রতিটি অশ্রুবিন্দুতে আমি শুধু তোমাকেই খুঁজে ফিরি।”
মিরার কণ্ঠ থেমে যেতেই কারান হঠাৎ এক ঝটকায় তার ঠোঁটযুগল নিজের ঠোঁটের মাঝে বন্দি করে ফেলল। অপ্রস্তুত মিরা প্রথমে খানিকটা কেঁপে উঠল। কিন্তু সে দ্রুতই নিজেকে সামলে নিল। কারানের ঠোঁটের তীব্রতা ক্রমেই গভীর হলো। মিরা শুধু তাকিয়ে রইল। সে ইচ্ছাকৃতই নিজেকে এই আবেগঘন মুহূর্তে ছেড়ে দিয়েছে, যাতে কারান নিজের মতো করে তার ঠোঁটটিকে আগলে ধরতে পারে। তবু কারান চুম্বনকে দীর্ঘায়িত করল না; একটি আলতো, মায়াময় স্পর্শের পর সরে মিরার দিকে তাকিয়ে রইল। মিরার ঠোঁটে অনিচ্ছুক মধুর হাসি ফুটে উঠল। সে হালকা শ্বাস ফেলে জানালার দিকে মুখ ফেরাল। দেখল, আকাশের প্রান্তে ম্লান অন্ধকারের ভেতর থেকে আলো ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। জানালার কাচে ধূসর আলো প্রতিফলিত হলেও ভারী পর্দার কারণে ঘরের ভেতর অন্ধকার প্রায় অটুট।
কারান লক্ষ্য করল, মিরা আর তার দিকে তাকাচ্ছে না। সেও ধীরে ধীরে মিরার মতোই দৃষ্টি ফেরাল জানালার দিকে। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে কাচ খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে ঢুকে পড়ল সকালের স্নিগ্ধ বাতাস।
মিরাও উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কারান মিরার পেছনে এসে ধীর কণ্ঠে বলল, “এবার কাজে লেগে পড়ি, বেগম।”
মিরা জানত, কারানকে বারণ করলেও সে শুনবে না। তাই ঠোঁটের কোণে হাসি রেখেই বলল, “চলো, দুজনে মিলে করলে অনেক দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।”
কারান গম্ভীর মুখে কঠিন গলায় বলল, “মিরা, এক বছর আগে তোমাকে দিয়ে কাজ করানোর অর্থটা ভিন্ন ছিল। কারণ আমি চাই তুমি এমনভাবে শেখো, যাতে আমি না থাকলেও তুমি আমার সাম্রাজ্য শাসন করতে পারো একাই। কিন্তু আমি থাকতেও যদি তোমাকে পরিশ্রম করতে দিই, তবে আমি কীভাবে তোমার রক্ষক হলাম? আর তুমি আমার রানি, আমার মহারানি ভিক্টোরিয়া, তোমার জন্য সুরক্ষা ও আরামের রাজত্ব গড়ে তোলাই আমার কর্তব্য। অথচ তুমি আমার কথার মানেই বুঝতে পারো না।”
মিরা তার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে শান্ত কণ্ঠে বলল, “একসাথে কাজ করার মধ্যেই তো প্রকৃত আনন্দ, কারান। দুজনের খুনশুটি, দুষ্টুমিভরা আলাপ, কাজের ফাঁকে একটু কাছে আসা—এই যে স্পর্শের ক্ষণস্থায়ী উষ্ণতা, এই শান্তি আর কোথায় পাবে বলো?
তুমি হয়ত বলবে, আমাকে ‘প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট’ দিতে চাও। কিন্তু আমি তো কখনো এটা চাইনি যে আমি রাজকন্যার মতো বসে থাকব, আর তুমি সব বোঝা একা কাঁধে নেবে। আমার কাছে আদর-যত্ন মানে হলো বোঝাপড়ার সুন্দর সমীকরণ। তার উপর তোমার হাতে ব্যথা। এই অবস্থায় তুমি এত এত রান্না করবে, তা মেনে নিলে আমি তো নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে যাব। আমি যদি তোমার ক্লান্তি অনুভব না করি, কষ্টকে ভাগ না করি, তবে কেমন স্ত্রী আমি? কেন কেবল স্বামীকেই স্ত্রীর খেয়াল রাখার দায়িত্ব নিতে হবে?”
কারান ঠোঁটের একপাশে হেসে মিরার কোমল গাল দুটো হাতের মাধ্যমে বন্দি করল। কণ্ঠে খানিকটা খামখেয়ালিপনা নিয়ে বলল, “Such a mature wife.”
মৃদু হাসি সহ গাল ছেড়ে দিয়ে নরম গলায় আবার বলল, “But I’ll manage, Starling.”
“এটা কি নতুন নাম?”
“I’ve given you a hundred already. And you noticed just this one?”
“বুঝলাম। কিন্তু আমি মোটেও তোমাকে একা একা কাজ করতে দিচ্ছি না।”
কারান ভ্রূ কুঁচকে বলল, “বেশি জেদ করলে আপনাকে সেন্সলেস করে রেখে রান্না করতে যাবো।”
“এতক্ষণ যে এত বড় বড় বানী ছাড়লাম। কোনো কাজেই আসল না দেখছি।”
কারান প্রগাঢ় মৃদু হাসি নিয়ে পাঞ্জাবি খুলে রাখল। ক্লোজেট থেকে তুলে আনল একখানা সরল টিশার্ট, পরে নিল তার সঙ্গে একটি ঢিলেঢালা ট্রাউজার। মিরাও ততক্ষণে বোরকা অপসারণ করল। তারপর আলতো হাতে গায়ে জড়াল কারানের কালো শার্ট, যার বুকের দুইটি বোতাম খোলা। সেই ফাঁক গলে উজ্জ্বল শ্বেতবর্ণ বক্ষখণ্ডের রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শার্টটি তার হাঁটুর কাছ পর্যন্ত নেমে এসেছে, আর নিম্নাঙ্গের প্রকাশ্য অংশ আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
মাথার উপরে চুল তুলে কাঁকড়া ব্যান্ডে জড়ো করতে শুরু করল মিরা।
কারান দুই হাত ট্রাউজারের পকেটে গুঁজে, দৃষ্টিকে নিবিষ্ট করে মিরাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। মিরা সেই দৃষ্টির প্রগাঢ়তা অনুভব করে কিঞ্চিৎ সলজ্জ হাসল।
কারান রান্নাঘরে প্রবেশ করে গায়ে অ্যাপ্রোন জড়িয়ে নিল। মিরা এগিয়ে এসে নরম স্বরে বলল, “এবার বলো, আমি কী করব? আচ্ছা, সবজিগুলো বরং কেটে দিই।”
কারানের ভ্রূ কুঁচকে উঠল। একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল, “চুপচাপ গিয়ে সোফায় বসো।”
“তুমি একা সামলাতে পারবে না। তার উপর হাতের এই অবস্থায়…”
“যেতে বলেছি।”
মিরা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে তার খামখেয়ালি রাগের অন্তরালে লুকোনো স্নেহ বুঝে নিল। অবশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গিয়ে সামনের সোফায় বসে পড়ল। কারান নিষ্ঠাভরে মাংস ধুয়ে নিল, তারপর সমান আকারে টুকরো করতে লাগল।
সোফায় বসে মিরা কিছুক্ষণ তার কাজ লক্ষ্য করল। পরে গলা উঁচু করে বলল, “কারান, এখান থেকে তো কথা বলার জন্য আমাকে গলা উঁচু করতে হয়। বরং আমি একটা চেয়ার টেনে কিচেনেই বসি।”
কারান মাথা না তুলে ছুরি চালাতে চালাতেই বলল, “তোমার উন্মুক্ত পদযুগল আমাকে সি’ডি’উস করে ফেলবে, তাই দূরে বসিয়েছি।”
লজ্জায় মিরার গাল রক্তাভ হয়ে উঠল। সলজ্জ ভঙ্গিতে সে সোফা থেকে একটি কুশন তুলে নিল। চেয়ার টেনে রান্নাঘরের কোণে বসল, আর কুশনটা পায়ের ওপর রেখে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল, “এবার চলবে?”
কারান ছুরি থামিয়ে এক মুহূর্ত তার দিকে তাকাল। তবে সে নিজেকে সংযত করল। পুনরায় কাজে মন দিয়ে অর্ধহাসি হেসে বলল, “আমার তো গিনেস বুকে নাম ওঠা উচিত। বউ এত হট ফিগার নিয়ে সামনে বসে আছে, আর আমি নির্বিকারভাবে কুকিং করছি।”
মিরা মুচকি হেসে কথাটাকে এড়িয়ে মাথা কাত করল, “কারান, আমি তো তোমার থেকে ছয় বছরের ছোট, তাই না?”
“হ্যাঁ, বাচ্চা তুমি।”
“বাচ্চা? তুমি চাইলে আমি বাচ্চার মাও হয়ে যেতে পারি। আর ভালো কথা মনে করিয়ে দিলে, আমাদের বেবি কবে আসবে, কারান?”
“দুইটা বেইবি সামলাতে পারবে না, সুইটহার্ট।”
মিরা চোখ কপালে তুলল, “দুইটা? টুইন বেবি আসবে নাকি?”
“উঁহুঁ। একটা বাচ্চার নাম কারান, আর যে আসবে তার নাম হবে কায়রা।”
মিরার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে হাতদুটো একসঙ্গে জড়িয়ে নরম স্বরে বলল, “মা শা আল্লাহ! নামটা কিন্তু দারুণ, হানি। কারান প্লাস মিরা সমান কায়রা, তাই তো?”
কারান নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। মিরা হঠাৎ ভ্রূ কুঁচকে কণ্ঠে বিদ্রুপ নিয়ে বলল, “আর তুমি বাচ্চা?”
কারান হেসে মাংস গুলো পাত্রে রাখল। এরপর পেঁয়াজ রসুন কাটতে কাটতে বলল, “বাচ্চাই তো। তুমি সবদিক থেকে বিবেচনা করলে দেখবে, আমার মতো ইনোসেন্ট, অবুঝ, নির্দোষ, শিশু আরেকটা নেই।”
মিরা চোখ পাঁকাল, নাক ফুলিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল, “হুম, দামড়া শিশু! কিন্তু কারান, এবার আমি সিরিয়াস। খুব বেশি সিরিয়াস কিন্তু।”
“কি নিয়ে?”
মিরা ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এরপর লাজুক হেসে বলল, “আমরা বেবি নিচ্ছি কবে?”
ফাতিমার কথা শুনে আম্বিয়ার পায়ের নীচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। হঠাৎ মনে হলো, তার বয়সজীর্ণ শরীরের ভিতরকার সমস্ত শক্তি এক নিমেষে নিঃশেষ হয়ে গেছে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো, মাথা ঘুরে উঠল; তিনি পড়ে যাচ্ছিলেন ঠিক তখনই ফাতিমা উঠে দাঁড়িয়ে তাকে জাপটে ধরলেন। তার গলায় চিৎকার ভেসে এলো, “আম্মা!”
ক্লান্ত অস্থি, কাঁপা শরীর, তবু মনের দিক থেকে আম্বিয়া ছিলেন অনমনীয়। মেয়ের হাত নিজের শরীর থেকে সরিয়ে দিতে দিতে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “আমারে ধরিস না। আমি ঠিক আছি। ক্যান মারলি ছোড়াটারে? কী দোষ আছিল ওর? তোরে তো ভালা ঘরেই বিয়া দিছিলাম। ক্যান মারলি, মুখপুরি?”
এই প্রশ্নে মুহূর্তের মধ্যে ফাতিমার চেহারা আগুনের লেলিহান শিখায় রূপ নিল। চোখে জ্বলে উঠল দাউ দাউ অঙ্গারের শিখা, ঠোঁট কেঁপে উঠল বহুদিনের ক্ষতবিক্ষত অভিমানে।
তিনি থেমে থেমে উচ্চারণ করলেন, “ভালো ঘর? কোন দিক দিয়া ভালো ঘর? জানোয়ারের থাবার নিচে ফালাইয়া দিছিলা, আম্মা! ওর চোখের চাহনি, ওর হাতের ছোঁয়া—সব আছিল রক্তপিপাসু হায়েনার মতোন। আমারে বিয়া দিছিলা একটা অমানুষের লগে, একটা দানবের লগে। ক্যান দিছিলা? হ্যাঁ? কীসের অভাব আছিল তোমার? তোমার মাইয়ারে দু-মুঠো খাওয়াইতে এত খরচ হইত?”
কথাগুলো শুনে আম্বিয়ার বুকের ভেতর ঝড় বইতে লাগল। ফাতিমার চোখে তখন জল চিকচিক করছিল, অথচ সেই জলের গভীরে দুঃসহ অন্ধকার ইতিহাস লুকিয়ে আছে—এমনই ধারণা হলো আম্বিয়ার। তার কুঁচকে যাওয়া আঙুল ধীরে ধীরে বাড়ালেন মেয়ের কাঁধের দিকে। হাতের ছোঁয়া ভারী হলেও তাতে মমতা মিশে ছিল। কণ্ঠটা আগের মতো কঠোর রইল না, “বয়।”
বুকভরা ক্রোধ আর চোখভরা কান্না নিয়ে ফাতিমা ধীরে ধীরে বসলেন। আম্বিয়া মাটির দিকে দৃষ্টি নামিয়ে বসে পড়লেন মেয়ের পাশে।
সামান্যক্ষণ নীরব থাকার পর তার চোখ গভীর হয়ে উঠল, গলার স্বর আরো নরম হয়ে এলো, “এইবার সব খুইলা ক। আমি শ্যাষ পোরযোন্ত শুনবার চাই।”
ফাতিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে শুরু করলেন, “ওই বাড়তে যাওয়ার পর পোরথোম দিকে মনে হইছিল, আল্লাহ কী সুন্দর সংসার দিল আমারে! সবাই এত্ত ভালো, এত্ত যত্ন করত আমারে… তোমার জামাই তো এক মুহূর্তও চোখের আড়াল করতে চাইত না। শাউড়ী, ননদ—সবাইর আদরের যেন কেন্দ্রবিন্দুই আছিলাম আমি। রান্নাঘরে গেলেও কামে হাত দিতে দিত না। বলতেন, ‘এতাগ্গিন হামের বেডি তাইকতে, তোঁয় কিল্লাই হষ্ট হইত্তা লাইগ্গু, বউ?’
(এতগুলো কাজের লোক থাকতে, তুমি কেন কষ্ট করবে, বৌমা?’)
তহন মনে হইছিল, সত্যি আমি কত ভাগ্যবতী! এমন সংসার কয়জনে পায়!
আমি তহন নতুন জায়গায় দেইখা চট্টগ্রামের ভাষা বুঝবার পারতাম না ভালো কইরা, শুধু রমজানের মুখের কথাই ধরতে পারতাম। তাই স্বামীরে নিয়াই স্বস্তি খুঁজতাম।
এরপর যখন দুই মাসের মাথায় তালহা পেটে আইলো, তহন তো আরও আপন কইরা নিল সবাই। পোরথোম সন্তান ছেলে হইছে, এই আনন্দে সারা বাড়িই মাতোয়ারা। আমি নিজেও খুশি হইছিলাম খুউউব—কে না চায় এরম শুউরবাড়ি?
কিন্তু আম্মা… ওই আনন্দ বেশিদিন টিকল না৷ আমি অচিরেই বুঝতে পারলাম, ওইসব সবই মুখোশ আছিল, সবই অভিনয় আছিল। সব… সব মিথ্যা আছিল, আম্মা। ওদের ভালোবাসা আসলে আমার উপর না, আমার বাপের ক্ষমতার উপর আছিল। আমি চেয়ারম্যানের মাইয়া বইলাই তহন এত আদর দিছিল সবাই। তালহা পেটে, অথচ তোমার জামাই তহন চাকরির লাইগা ঘরে নাই। ঠিক তহনই বাড়ির সবাইর আচরণ এক্কেবারে পাল্টাইয়া গেল। ভিত্রে ভিত্রে দম বন্ধ হইয়া আইতে লাগল।
আমি ভাবলাম, থাক, এই অবস্থায় বাপের বাড়ি গেলে শান্তি পাব। কিন্তু শাউড়ী তহন এমন কথা কইলেন, যেটা শুইনা বুকটা হিম হইয়া গেছিল। কইলেন, ‘যাইতা লাইগ্গ্যু দে বালা হতা, তইলে লগে কিছু লই আইন্ন্যু।’
(যাবে তো ভালো কথা, তাহলে সাথেও কিছু নিয়ে এসো।’)
আমি কিছুই বুঝবার পারলাম না। হাদার মতোন তাকাইয়া রইলাম শুধু। তহন শাউড়ী সরাসরি কইলেন, ‘গয়নাগাটি লই আইচ্চু। বুইজ্জ্যু নে?’
আমি হতভম্ব হইয়া গেলাম। এতদিনের আদরটা যে আসলে আছিল লোভের মুখোশ, সেইটা তহন পোরথোম বুঝলাম। তুমি তো জানোই, তোমার মাইয়া সরল-সোজা, তোমার মতোন অত শক্ত না, তাই মুখ খুলতে চাইয়াও কিছুই কইতে পারলাম না। মনের ভিত্রে ঝড় উঠলেও তহন কোনো প্রতিবাদ করতে পারলাম না। শুধু গিল্লা ফালাইলাম।
এরপর তালহার জন্য এই বাড়তে পা রাখলাম। মনে মনে ভাবতাছিলাম, এইবার হয়ত সবকিছু বদলাইয়া যাইব, কিন্তু বুকের গভীরে তহনও শাউড়ীর তির্যক কথাগুলা বাজত। যহনই চিঠি পাঠাইতো, পোরথোমে ভালো ভালো কথা কইয়া লাস্টে বলতেন, ‘গয়না আনতে ভুলে যাবে না কিন্তু!’
আমি চুপচাপ চিঠিখান পইড়া যাইতাম, কিন্তু চিঠির উত্তর পাঠাই নাই কোনোদিন। ভাবছিলাম সময় গেলে হয়ত শান্ত হইব, ভুইলা যাইব।
তারপর তালহা হওয়ার পর যহন পোরথোম ওই বাড়তে পা রাখলাম, জামাই আদরের মতোন আমারেও বরণ করা হইলো। দু’দিন মনে হইলো, হয়ত সত্যিই এইবার আগের মতোন ভালোবাসা জুটবো, ঘরটা আলোকিত হইব। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন রইল না। কিছুদিন যাইতেই ননদ আর শাউড়ি মিল্লা আমারে ঘিররা ধরল। তীক্ষ্ণ চোখে তাকাইয়া জিগাইল, ‘গয়না আনছো তো?’
তাদের কণ্ঠে তহন আনন্দ দেহি নাই, দেখলাম পশুর মতোন দুইটা চোখ, যার মধ্যে দাবি জ্বলজ্বল করতাছে। ছেলে জন্মের খুশিতে এতদিন চাইপা রাখছিল কথাগুলান। আমি গভীর শ্বাস নিয়া সাফ সাফ উত্তর দিলাম, ‘আম্মা, এই বাড়িতে আসার সময় আমার বাপ-মা যতটুকু সামর্থ্য আছিল, সব দিয়া দিছে। আমার মায়ের হাত বালা, কানের দুল, গলার হার, কোমরের বিছাটা পোরযোন্ত দিয়া দিছে। এ ছাড়াও পাঁচখান আংটি, হাতপাটি, মনিহার, গলার পাতি, নথ, মাথার মুকুট, আপনার ছেলেরে চওড়া চেইন—কম তো দেয় নাই; সেই গয়না দিয়াই আপনার সারাটা জীবন সুখেই কাইটা যাইব, লগে আপনার মাইয়াটারেও দিতে পারবেন। এহন আর আমি কিছুই আনতে পারব না বাপের বাড়ি থেইকা।’
কথাটা কওয়ার সময় বুকটা কাঁইপা উঠছিল। কারণ আমার বাপের ঘাম ঝরানো টাকায় কেনা গয়না ওগুলা, আমার মায়ের গায়ের গন্ধ মিশানো গয়না ওগুলা—এতকিছু দেবার পরও ওগো চোখে সামান্য মনে হইল? সবসময় শুধু আরও চাই, আরও দেও। শুধু চাই আর চাই। আমার চোখ ভিইজা উঠছিল, তবুও নিজেরে শক্ত রাখলাম।
কিন্তু আমার মুখে অমন কথা শুইনা শাউড়ির চোখ লাল হইয়া গেল, তেড়ে আইসা মুহূর্তেই আমার গালে একখান জোরে থাপ্পড় দিল। সঙ্গে সঙ্গে গালটা ফুইলা উঠল। ব্যথায় চোখে পানি চইলা আইছিল, বুকের ভিত্রে আগুন জ্বলতাছিল, তবুও কিছু কইলাম না। কারণ তুমি তো শিখাইছ, ‘বড়রা রাগে অনেকসময় টুকটাক কটু কথা বা কটু আচরণ করতেই পারে, কিন্তু জবাবে যদি সেও একই আচরণ করে, তাহলে সে প্রকৃত শিক্ষা পায় নাই। অভদ্রতা পারিবারিক দিকেও আঙুল তুলে, বংশের উপরও কথা ওঠে।’ এই কথা মনে কইরা সব সহ্য কইরা নিলাম।
কিন্তু তার বিড়বিড় করা কথাগুলান আমার কানে এহনও বাজে। উনি কইছিলেন, ‘যেত্তর বড় গাল নো, এত্তোর বড় হতা! সুরুতের নাই কোনো ফুয়াদ, নাই কোনো ঢং, এনে তো কাইল্ল্যে মাইয়া। আবার আঁরে হতা উনাইতু আইচ্চে দে! রমজান আইয়্যুক এক্কানা…’
(‘যত বড় মুখ না, তত বড় কথা! চেহারার তো না আছে রূপ, না আছে ঢং, তার উপর কালো মেয়ে, আবার আমাকেই কথা শোনায়! রমজান আসুক শুধু।’)
আম্মা, তখন মনে হইছিল মাটি ফাইটা গেলে তলায়ে যাইতাম। আমার গায়ের রং শ্যামলা দেইখা মাইরের দাগটা বাইর থেইকা বোঝা যায় নাই, কিন্তু ভিত্রের ক্ষত তো কোনোদিন সারল না। ঘরের ভিত্রে একা বইসা কাঁনতেছিলাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বুকের ভিত্রেটা ভাইঙা যাইতেছিল, তার কথাগুলান কুঁড়ে কুঁড়ে খাইতে লাগল। ইচ্ছা করছিল তহনই তোমার কাছে ছুইটা যাই, তোমারে জড়াইয়া ধরি। তোমার কাছে যাইতে তো মানা নাই, কিন্তু পারলাম না। বাপটার লাইগা পারলাম না। তার সম্মানের লাইগা পারলাম না। গেরামের মানষের চোখের লাইগা পারলাম না। তারা তো বলত, ‘চেয়ারম্যানের মেয়েরে স্বামীর বাড়ি থেইকা তাড়াইয়া দিছে’—এই কথার বোঝা তোমার ঘাড়ে চাপাইতে ইচ্ছে করে নাই। কারণ বাপটারে তো চিনি, সব দোষ তোমারেই দিত, তোমার পেটরেই দিত। তাই যন্ত্রণা বুকের ভিত্রে চাপা দিয়া মুখে কুলুপ আঁটলাম। নিজেরে সান্ত্বনা দিলাম, ‘রমজান একবার আসুক, ও তো আমারে মেলা ভালোবাসে, ওর লগে চইলা যামু আমি। থাকুম না এই শয়তানের ঘরে, থাকুম না…’”
আম্বিয়া হঠাৎই হাত উঠিয়ে মেয়ের মুখের ধারা থামিয়ে দিলেন। ফাতিমা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন মায়ের দিকে। দেখলেন, রাগের তীব্রতায় আম্বিয়ার মুখমণ্ডল থরথর করে কাঁপছে, তা দেখে বুক কেঁপে উঠল তার। বয়সের ভারে শরীর ঝুঁকে গেলেও চোখে-মুখে যে প্রখর দম, যে অটল দৃঢ়তা—তা একটুও ম্লান হয়নি।
কাঁপা গলায় কঠোর স্বরে আম্বিয়া বলে উঠলেন, “তার মানে তুই আমারে মিথ্যা কইছিলি? আমার লগে নাটক করছিলি? কি রে, তোর এত্ত সাহস! মার লগে অভিনয় করলিছি, হতচ্ছাড়ি? তুই আমারে ধোঁকা দিছস? ওই মাইয়া, কথা কস না ক্যান? মুখ খোল, ফাতমা…”
ফাতিমা মুখ নামিয়ে রাখলেন। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল, অথচ শরীর কাঁপছিল ঠান্ডায়। চোখের কোনা থেকে এক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ে বুকের আঁচল ভিজে গেল। প্রতিটি নিশ্বাস যন্ত্রণায় দগ্ধ মনে হচ্ছিল তার কাছে। সে ধীরে ধীরে মাথা রাখল মায়ের কাঁধে। নাক টেনে কেঁপে কেঁপে বলল, “করতাম, আম্মা… করতাম অভিনয়। তোমার চোখে সুখ দেখাইবার জন্য করতাম। চাই নাই তুমি কষ্ট পাও। চাই নাই তুমি আমার যন্ত্রণা বুঝ! তাই হাসতাম, মিথ্যা আনন্দ দেখাইতাম…”
কথাগুলো বলেই সে নিথর হয়ে গেল। কিন্তু আম্বিয়া মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন না। বুক ভরা অভিমান তাকে শীতল বরফে পরিণত করেছে। কর্কশ গলায় বললেন, “আহহ! সুখের মুখোশে আমার মাইয়া আমারে ধোঁকা দিল, মিথ্যা মুখ দেখাইয়া রাখল! তোর অভিনয় আমার বুক বিদীর্ণ করছে, ফাতমা।”
ফাতিমা স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। মুখ খুললেন না৷ আম্বিয়া একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে কণ্ঠটা আরো গভীর করে বললেন, “তুই এহনও আসল কথা কইলি না। রমজানরে মাইরা ফালাইবার কারণ—ওইটা কিন্তু অহনো লুকায়া রাখছস।”
ফাতিমা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন। হতাশ নিশ্বাস ফেলে খানিক চুপ থেকে কাঁপা গলায় বলতে শুরু করলেন, “এরপর শুরু হইল তোমার মাইয়ার উপ্রে আসল নির্যাতন। খাওয়া নিয়া খোঁটা, কথায় কথায় খারাপ কথা, রূপের খোঁচা দিত আইতে যাইতে। পাতে খাবার উঠলেও মুখে তুলতে পারতাম না, বুক ভরা অপমানের তিক্ততায় গলা শুকাইয়া যাইত। কত রাত এক্কেবারে না খাইয়াই শুইয়া পড়ছি, হিসাব নাই। পেটের ভিত্রে যতখানি ক্ষুধা জ্বালাতন করত, তার চেয়েও অধিক মনের ক্ষুধা দগ্ধ করত।
কিছুদিন পর রমজান আইলো। তার আগমনে ভাইবা লইলাম, সে বুঝি আমারেও লগে নিয়া যাইব, আপন কইরা নেব। ছেলেরে দেইখা সে খুশি হইছিল বৈকি, আমার মাথায় হাতও বুলাইয়া দিছিল, তালহার কপালে চুমু খাইছিল। তখন মনে হইছিল—এইবার হয়ত আমার কষ্টের শ্যাষ, আল্লাহ আমার দিকে মুখ তুইলা চাইল অবশেষে। কিছুদিন সে যত্নও নিল, কিন্তু আমি কওয়ার সাহস করলাম না যে, ‘আমারেও সাথে নিবেন এইবার।’
অবশেষে তার ফিররা যাওয়ার দিন কী পাইলাম জানো? সে আমার হাতে গুঁইজা দিল হাজারখানেক টাকা, তালহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিয়া কইল, ‘মিলেমিশে থাকবে, মায়ের কথা শুনবে, ঘরে শান্তি রাখবে। আর আমার ছেলের যত্ন নিও। দূরে কাজে যাচ্ছি, ঘরের তর্কাতর্কি যেন কানে না আসে। আর হ্যাঁ, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, ফাতিমা। চললাম, দোয়া করবে।’
তারপর একটুও না থাইমা আবার চইলা গেল তার কাজে। আমি গলা খোলার সাহসও পাইলাম না, মুখ ফুটে কইতেও পারলাম না, ‘আমারেও নিয়া যাও। ওগো, আমারে নিয়া যাও। আমারে না হইলেও ছেলেটারে নিয়া যাও।’
কইলাম না কিছুই, শুধু দরজার আড়ালে দাঁড়াইয়া চাইয়া চাইয়া তার যাওন দেখলাম।
বুকের ভেতরটা শূন্য শূন্য ঠেকছিল, মনটা আনচান আনচান করছিল। তহনই বুঝলাম, আবারও দুঃখের দিন সামনে দাঁড়াইয়া রইছে। তবুও মনটারে শক্ত করলাম। ভাবলাম, ‘না, এইবার ছেলের জন্য এই টাকাগুলোই ভরসা হইবে। মনের মতো খাওয়ানো তো যাইব।’
কিন্তু মা, তোমার মাইয়ার ভাগ্যটাই বুঝি অভিশপ্ত। রমজান যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই শাউড়ী হুট কইরা আমার হাত থেইকা টাকাগুলা ছিনাইয়া নিল। আমি চোখ লাল কইরা দাঁড়াইয়া গেলাম। দাঁতে দাঁত চাইপা কইলাম, ‘ওই টাকা আমার স্বামী দিয়া গেছে, ছেলের জন্যই রাইখা গেছে। টাকাটা ফেরত দেন, আম্মা।’
কিন্তু উনি ফিরাইয়া দিলেন না। উলটো ঠান্ডা হাসি দিয়া কইলেন, ‘আগে আঁর ফুঁয়ার যোগ্য বৌ ওই দেহাও, ইয়ারফর আঁর ফুঁয়ার ট্যিঁয়াত হাত দিয়্যু।’
(‘আগে আমার ছেলের যোগ্য বউ হওয়ার প্রমাণ দেও, তারপর না হয় আমার ছেলের টাকায় হাত দিবে।’)
আমি ভেতর থেইকা শক্ত হইয়া হাত বাড়াইলাম আবার। দৃঢ় কণ্ঠে কইলাম, ‘টাকাটা দ্যান, দয়া কইরা দ্যান। আমার ছেলের খাওয়ার ব্যবস্থা করোন লাগব, ছেলেটা শুকাইয়া গেছে একদম। মা হইয়া ওর এমন চেহারার দিকে তাকাইতে পারি না। টাকাটা ফেরত দ্যান, আম্মা…’
সে তখন এক ঝটকায় আমার হাত সরাইয়া দিল। এমন এক ঝটকা দিল যে হাতে মোচড় খাইলাম। ব্যথায় মুখটা কুঁচকাইলাম একটু৷ উনি আমার চোখে চোখ রাইখা বিষের মতো কইলেন, ‘ফুঁয়া তো তুঁয়ার ডইল্লা ফটোকফি বাইর ওইয়্যেদে এনা। ডেকসির তলাও বহুত পরিষ্কার আছে। আর ফুঁয়ার দুল্লাহ দলা ফুঁয়া জন্ম দিতা এক্কানা, তইলে এনা দিতাম দে এনা ট্যিঁয়া। হালা মাইনষের তুন এতো হাইবার দরহার নাই।’
(‘ছেলে তো তোরই ফটোকপি বের হয়েছে। পাতিলের তলাও এর চেয়ে ফরসা। আমার ছেলের মতো সুন্দর ছেলে যদি জন্ম দিতে, তাহলে না হয় দিতাম টাকাটা। কালো মানুষের এত খাওয়ার দরকার হয় না।’)
তহন মনে হইলো, পৃথিবীটা যেন হঠাৎ আমার উপ্রে ভাইঙা পড়ছে। নিজের রং নিয়া কতদিন কত কথা শুনছি, গায়ে লাগত, তবুও মুখ বুইজা সহ্য করতাম। কিন্তু ওইদিন… ওইদিন ওরা যখন আমার নিরীহ, নিষ্পাপ বাচ্চা ছেলেটারেও ছাড়লো না—বুকটা যেন চৌচির হইয়া গেছিল। চোখ দিয়া টপটপ কইরা পানি ঝরছিল, বুকের ভিত্রেটা পুড়তাছিল আগুনের মতোন।
ক্যান, আম্মা? কও না, আমি ক্যান কালা হইলাম? তুমি তো এত সুন্দর, তোমার মুখের রূপে গেরামের লোক মুগ্ধ হইত, তাইলে তোমার মাইয়া ক্যান কালা হইল? ভাইজানও তো ধবধবা, ইসহাকও ফরসা; কারোর গায়ের রং তো কালা হয় নাই। তাইলে আমি ক্যান হইলাম, আম্মা? কালা হইয়া জন্মাইয়া কি পাপ করছিলাম? কালা রংটা কি অভিশাপ? কালা হইয়া অপরাধ করছি, আম্মা? ও আম্মা…চুপ ক্যান? কও না…”
আম্বিয়ার চোখ থেকে অজান্তেই জলপাত পড়ল। এত বছরের অভিজ্ঞতা আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা—সব কিছু ভেঙে পড়ল এক মুহূর্তে। মেয়ের শ্যামলা গায়ের কারণে তিনি চারপাশ থেকে অহেতুক মন্তব্য শুনে এসেছেন বহু আগেই, কিন্তু কখনো ছোট করার সুযোগ দেননি। তার মুখের ভাব আর চোখের আগুন এত শক্তিশালী ছিল যে, কেউ সরাসরি কিছু বলতে সাহস পায়নি। তবু পিছপিছু শোনা অবহেলাসূচক বাক্যগুলো কানে বাজত। কিন্তু ভাবতে পারেননি, তার মেয়ে শ্বশুরবাড়িতেও এসব কটু কথার শিকার হবে। বড় ঘরে বিয়ে দিয়েছেন, শোভা দেখেছেন, তবু ভাগ্যের অভাব মায়ের চোখে ধরা পড়ল। এই নিস্পৃহ নিয়তি কি সমাজে যুগে যুগে চলতে থাকবে? কেন থাকবে?
আম্বিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তার গলাটি নরম হয়ে গেছে, কণ্ঠের কঠোরতা বজায় রেখে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করলেন। হঠাৎ নুয়ে নুয়ে পা ফেলে তিনি বাড়ির দিকে এগোতে লাগলেন। ফাতিমা মায়ের এই আচরণ দেখে চোখ তুলে তাকালেন।
আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, “কই, কই যাও, আম্মা?”
আম্বিয়া কিছুক্ষণ থেমে গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন, “তুই বয়, তুই বয় ফাতমা। আইজকা আমি পুরা দুনিয়াটারে দেখাইমু। আইতাছি…”
এই বলে তিনি আবার পা বাড়ালেন। কিন্তু ফাতিমার মন বিষাদমিশ্রিত হয়ে উঠল। মায়ের কথা বুঝতে পারলেন না কিছুই, বোঝার চেষ্টাও করলেন না। বুকের মধ্যে অজানা উত্তেজনা, আতঙ্ক আর প্রত্যাশার মিশ্রণ খেলা করছে। নিজের সমস্ত অনুভূতি মায়ের সামনে খুলে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলেন। নিজেকে প্রশ্ন করলেন, “আমি যে রমজানরে মারলাম, ওরে মারার কারণ কি আসলেই যথাযথ আছিল? আম্মা কি আমারে ভুল বুঝব? না, আম্মা তো আমার মতোন বোকাসোকা না। সাহস রাখ, ফাতিমা। তোরে আম্মা বুঝবেন, বুঝবেনই।”
ফাতিমা শ্বাস নিয়ে ঘাড় সোজা করে বেঞ্চে বসলেন। হাত শক্ত করে বেঞ্চ আঁকড়ে ধরলেন। চোখে-মুখে নীরব সংকল্প ফুটে উঠল। এখন যেহেতু সুখের দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, সেহেতু অতীতের ক্ষতগুলোকে মনে করে কষ্ট নেওয়ার দরকার নেই। তিনি অল্প হাসার চেষ্টা করলেন।
কিছুক্ষণ পরই আম্বিয়া কাঁপতে কাঁপতে বাগানে আবার ফিরে এলেন। মায়ের দৃঢ়, কঠোর, সতর্ক অবয়ব দেখে ফাতিমা উঠে দাঁড়ালেন। আম্বিয়া ধীরে ধীরে বললেন, “দাঁড়াইলি ক্যান? বয়।”
মায়ের মনে কি চলছে, ফাতিমা কিছুই বুঝতে পারলেন না। শুধু মায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে তার নির্দেশ অনুযায়ী বসে গেলেন। হঠাৎ ধূসর শাড়ির নীচ থেকে আম্বিয়া কুঁচকে যাওয়া কাঁপা কাঁপা হাত বের করে ফাতিমার বাম গালে কালি মেখে দিলেন। ফাতিমা হতবাক হয়ে রইলেন। মুহূর্তের মধ্যে কষ্ট ও অভিমানের ঢেউ বুকে ধাক্কা দিল। চোখ দিয়ে অজান্তেই পানি ঝরতে লাগল। মায়ের দিকে তাকিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বললেন, “এইটা কি করলা, আম্মা? তুমিও প্রমাণ করলা যে, তোমার মাইয়া কালা? ও আম্মা, তুমিও এমন করলা? মা গো, ক্যান করলা?”
আম্বিয়া কিছুই বললেন না। তিনি অন্য হাত থেকে আয়না বের করে ফাতিমার মুখের সামনে ধরলেন। ফাতিমা দেখলেন, মুখের এক পাশে কালির দাগ। চোখের পানিতে কালি ধুয়ে গলায় এসে পড়ছে। গায়ে পড়া হলুদ শাড়িটাও কালো ছোপে ভিজে যাচ্ছে।
আম্বিয়া থমথমে মুখশ্রীতে হালকা কণ্ঠে বললেন, “পাতিলের তলির কালি মাখাইলাম আমার সোনার টুকরা মাইয়ার গালে। মিলাইয়া দেখ—আমার মাইয়া আদৌ কালা?”
ফাতিমা প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আম্বিয়া থরথর চেহারায় ফাতিমার পাশে বসলেন। তারপর হাতে থাকা কালি হালকা করে ফাতিমার বাম হাতের উলটো পাশে মেখে দিলেন। চোখে গভীর ভাব লুকিয়ে রেখে ঢোক গিলে বলে উঠলেন, “এই কালির লগে আমার কইলজার মাইয়ার রঙের কোনো মিল আছে কি? আছে মিল?”
ফাতিমা শ্বাস আটকে ডানে বামে মাথা নেড়ে বললেন, “মিল নাই, আম্মা। মিল নাই…”
আম্বিয়ার চোখ থেকে অজান্তেই জল পড়ল। তিনি ফাতিমাকে কোমরে জড়িয়ে ধরলেন। ফাতিমা মায়ের বুকে মাথা রেখে কান্নায় ভেসে গেলেন। আম্বিয়া হাতের উলটো পাশ দিয়ে নিজ চোখের পানি মুছলেন, তারপর সান্ত্বনামূলক, কোমল গলায় বললেন, “আমার মাইয়া কালা না। ওগো মন কালা। এই জাতি কালা, এই সমাজ কালা, এই দ্যাশ কালা। আমার মাইয়া কালা না—বুইঝছোস তুই? তুই আমার চাঁদের টুকরা। তোর গায়ের রং চাঁদেরও নাই, চাঁদও তোরে দেইখা হিংসা করব। তুই আমার লাল সূর্যাস্তের আঁচল, তোরে দেইখা আকাশও লাজে রাঙা হইয়া যাইব। তুই আমার রক্তরাগ গোলাপ, তোরে দেইখা বাগানের সব ফুলগুলানও সম্মানে নুইয়া পড়ব। তোর গায়ে আলো পড়লে যে চমক দেয়, ওই চমক হীরায়ও দেয় না। তাইলে কেমনে অমানুষের জাত কয়, আমার মাইয়া কালা! ওগো চোখ দুইটা নষ্ট হইয়া গেছে, জমজমের পানিদা ধুইয়া দেওন লাগব।”
Tell me who I am 2 part 7
ফাতিমা মায়ের গায়ে ফোঁপাতে থাকলেন। বুকটা ধকধক করছিল, গলাটা ঘামে ভিজে গেছে। বহুদিন জমে থাকা কষ্ট, ভয়, লজ্জা—সব অবশেষে মায়ের কাছে খুলতে চলেছেন। বুক থেকে যেন পাথরের ভার অবশেষে নামতে শুরু করল।
আম্বিয়া উপরের দিকে তাকিয়ে আপনমনে অভিযোগ দিলেন, “যেইহানে দুনিয়ার অগণিত সুরাতের রং কালা, সেইহানে আমার মাইয়া কালা না হইয়াও ক্যান অপরাধীর মতোন দাগি হইলো, আল্লাহ? তোমার কুরআনের বানী তো কালা, হাজরে আসওয়াদ তো কালা, এমনকি তোমার সান্নিধ্য খুঁইজা পাওয়া তাহাজ্জুদের গভীর রাত্রিরও কালা। তাইলে আমার মাইয়ার রং ক্যান ওর অপমানের কারণ হইলো? দোষ কি আমার, আমার প্যাটের? ওর তো কোনো অপরাধ নাই। তাইলে ক্যান ওরে এত্ত তিরস্কার, এত্ত আঘাত সইতে হইলো?”
