Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 8

Tell me who I am 2 part 8

Tell me who I am 2 part 8
আয়সা ইসলাম মনি

প্রায় অনেকক্ষণ মা-মেয়ে নির্বাক অশ্রুপাত করল। তারপর ফাতিমা ধীরে ধীরে আম্বিয়ার বুক থেকে মাথা তুলে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন। আম্বিয়া শাড়ির আঁচল দিয়ে মেয়ের চোখের কোণে জমা অশ্রু আলতোভাবে মুছে নিজেরটাও মুছে নিলেন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন, “তার পরের কাহিনি ক। আইজকা আমার হাতে বহুত সময় আছে। এত্তগুলা বৎসর যে সময় তোরে দিতে পারি নাই, ওই সময় আইজ আমার ধারে আছে। ক, মা…”
ফাতিমা কাঁপা থুতনিতে মায়ের দিকে তাকালেন। এতকাল ধরে কঠোরতার দুর্গপ্রাচীরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই কোমল রূপ তিনি কখনো দেখেননি। সুন্দরী হলেও সেই সাতটি হ*ত্যাকাণ্ডের পর তার দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে এমন এক দৃঢ়তা এসেছিল, যা গ্রামের মানুষের কাছে তাকে প্রায় পুরুষোচিত করে তুলেছিল। তার মুখের ওপর একটি কথা বলার সাহস কেউ পেত না। এমনকি আসাদের মতো জেদি মানুষও একবারের বেশি তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করেননি। যেদিন আম্বিয়া তাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন, সেও মাথা নীচু করে চলে গিয়েছিলেন। মায়ের দিকে চোখ তুলে তাকানোর পর্যন্ত দুঃসাহসও ছিল না আসাদের। কারণ জানতেন, তাহলে তিনি তার চোখই তুলে ফেলবেন।

কিন্তু আজ, সেই মানুষটির মুখে এমন নেতিয়ে পড়া ক্লান্তি, দুঃখের রং মাখা অনুতাপ দেখে ফাতিমার আফসোসই হলো। বারবার বিস্ময়ে ডুবে গেলেন তিনি।
আম্বিয়া মেয়ের চোখে সেই বিস্ময়ের স্ফুলিঙ্গ পড়তে পারলেন। মনে পড়ল নিজের অতীতের অপূর্ণতা। শৈশব থেকেই পড়াশোনায় তুখোড় ছিলেন, কিন্তু অকালবিবাহে উড়ে যায় সেই স্বপ্ন। স্বামীর কঠোরতা ছিল লৌহদণ্ডের মতো; নিজের আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে গেলেই সহ্য করতে হয়েছে নির্মম প্রহার। তবুও মেধা ও বুদ্ধিমত্তা দমে যায়নি। গৃহবন্দী জীবনেও তিনি ছেলের বই থেকে জ্ঞান আহরণ করেছেন। তাই তার চিন্তাভাবনা সবসময় আলাদা, তীক্ষ্ণ ও চাতুর্যমণ্ডিত।

তবুও সেই বুদ্ধি দিয়ে নিজের ভাগ্য, কিংবা মেয়ের নিয়তি রক্ষা করতে পারলেন না। অসহায় কণ্ঠে আম্বিয়া বললেন, “তোর মারে ক্ষমা করিস, মা। আমি তোর জীবনটারেও কলঙ্কে রঙাইলাম, নিজের মতোনই খু*নি বানাইলাম। না পারলাম তোরে প্রকৃত শিক্ষা দিতে, না পারলাম সুন্দর একখানা সংসারে পাঠাইতে। পুরাটাই আমার ব্যর্থতা! আমার দোষেই আইজকা তোর এত কষ্ট সহ্য করোন লাগল। পারলে ক্ষমা করিস।”
কথাগুলো শুনে ফাতিমার আবারও চোখের পাতা ভিজে উঠল, কিন্তু অশ্রু ঝরলো না। তীক্ষ্ণ উপলব্ধির সাথে বুঝতে পারলেন, মা কত গভীর বেদনাকে বুকের ভেতর গোপন রেখে এই স্বীকারোক্তি করেছেন। তিনি মায়ের গলা জড়িয়ে ধরলেন, মাথা রাখলেন সেই শক্ত, স্নেহসিক্ত কাঁধে। বয়সের ভারে কাঁধের হাড়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তবু তার দৃঢ়তা এমন যে মনে হয়—ফাতিমার নিজের কাঁধও এতটা শক্ত নয়। অথচ সেই কাঁধে লুকিয়ে আছে অদ্ভুত প্রশান্তি, যা ক্ষণিকের জন্য সব অস্থিরতাকে নিঃশেষ করে দেয়।

ফাতিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ের কাঁধ থেকে মাথা তুললেন। গলার কাঁপন সামলে ধীরস্বরে বলতে লাগলেন, “এক বছরের মাথায় তারান্নুমও আমার গর্ভে আইল। নিজের ওপর খুব ক্ষোভ হইছিল। যেইহানে একজনরে সামলাইতেই হিমশিম খাইতেছি, আবার নতুন প্রাণ পেটটারে ভারী করল। এমনিতেই ছেলেটারে পুষ্টিকর খাওন খাওয়াইতে পারি না। শ্যাষ ছয় মাসে তোমার জামাই মাত্র দুইবার ওই বাড়তে পা রাখছিল। যারে কিনা সামনাসামনিই তেমন দেখবার সুযোগ পাই না, তারে কেমনে অভিযোগ দিই? জানতাম, এমন কিছু কইলে হয়ত তার মনের ভরসাটাও ভাইঙা যাইত। সেই কারণেই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কহনো তার মা বা বোনের কথা তুলি নাই।
জানো, তোমার জামাইরে আমি প্রতি সপ্তাহে দুইটা চিঠি লেখতাম। আর উনি এক মাস পর পর একটা চিঠি দিতেন। সেই চিঠিই আছিল আমার বাঁইচা থাকার অবলম্বন। ওনার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য আমি মুখস্থ কইরা ফেলছিলাম। চিঠি হাতে নিয়া কতবার যে পড়ছি, গুনতি নাই। ওনার লেখার ভঙ্গিমায় এমন মায়া আছিল যে মনে হইত—চিঠির ভিত্রেই ওনার ভালোবাসা মিশশা আছে। তবু মন চাইত লিখি, ‘এইখানে আমার আর ভাল্লাগে না, আমারে সঙ্গে নিয়া যান।’ কিন্তু…”

এবার আম্বিয়া কণ্ঠে আকস্মিক কঠোরতা এনে বললেন, “তাইলে লিখতে পারলি না ক্যান? তোর হাত কি কেউ বাঁইন্দা রাখছিল, না চাইপা ধরছিল? আমার মাইয়া তো এমন হইতে পারে না। একবার জানাইলেই তো জামাই তোরে নিয়া যাইত। নিত না?”
ফাতিমা হালকা কষ্টমিশ্রিত হাসলেন। চোখের কোনে অশ্রু চিকচিক করছিল। বললেন, “নিত না। নিত না, আম্মা। ঠিকই কইছ, আমি তো তোমারই মাইয়া। তাই একবার চিঠিতে কইছিলাম, ‘আমারে নিয়া যান। আপনারে ছাড়া এই ঘরে মন টিকে না। আমার বুকটা শূন্য শূন্য লাগে। আর ছেলেটা… ও তো সবসময় আপনারে খুঁজে, কানতে থাহে। কিছু জবাব দিতে পারি না। আমারে না নিলেও ওরে নিয়া যান।’

চিঠিতে এই কথাগুলা অনেক সুন্দর কইরা গুছাইয়া লিখছিলাম। ওইটুকু ছেলেরে উনি কেমন কইরা পালত, ওগুলো আমি জানি না। কিন্তু ঠিকঠাক খাওন তো দিতেই পারত, যা আমি দিতে পারি নাই। আর আমি জানতাম, তার মা তার পরানের পরান। তার নামে সামান্য অভিযোগ করলেও উলটা আমারে গাল দিব। তাই বুঝাইয়া কইলাম।
কিন্তু উত্তরে? দুই মাস কোনো চিঠিই আইল না। আমি তহন বুঝবার পারি নাই, ক্যান উনি আমারে চিঠি লিখতেছেন না। প্রতিদিন ডাকবাক্সের দিকে তাকাইতাম, বুক ধড়ফড় করত। ভাবতাম, হয়ত তার কিছু হইছে। দোয়া পড়তাম, কান্না ধরত। আমি নিজেরে দোষারোপ করতাম। কইতাম, ‘ফাতিমা, তুই নিশ্চয়ই কোনো ভুল করছিস, নইলে ক্যান উনি আর চিঠি পাঠাইতেছে না?’ দিনের পর দিন শুধু সেই চিন্তাতেই কাটত।

যহন দুই মাস পর সে নিজে ঘরে আইলো, আমি হাউমাউ কইরা তারে জড়াইয়া ধরলাম। বুক ফাটানো কান্নায় কইলাম, ‘আমারে চিঠি দেন নাই ক্যান? জানেন, প্রতিদিন কেমনে দিন গুনছি? নিজেরে কত অপরাধী ভাবছি? এমনকি ভাবছি, আপনার আবার কিছু হইয়া গেল নাকি? ক্যান এত চিন্তায় রাখলেন?’
কিন্তু উনি… উনি কইল, ‘আর যেন কখনো আমার সাথে যাওয়ার কথা না শুনি তোর মুখে! সুখে রাখি তাতেও হচ্ছে না? সাথে যাবি মানে কি? আমি কি সেখানে কাজ করি না? বসে বসে তোকে পালব? এই ঘর সামলাবে কে? আমার বৃদ্ধ মাকে কে দেখবে? তোকে বিয়ে কি রাজরানি করে পায়ের উপর পা তুলে খাবি দেখে এনেছি নাকি? ফারদার মুখে এই কথা যেন না শুনি।’

এরপর আমারে ধাক্কা দিয়া অন্য ঘরে চইলা গেল। আমি মেঝেতে বইসা পড়লাম। হতভম্ব হইয়া গেলাম।
তার মুখের এমন উচ্চারণ… এমন তুই তোকারি… কেমনে এমন কথা কইতে পারল? এইটা রমজানই তো? আমার কইলজা যেন ছিঁইড়া গেছিল, আম্মা। চোখের পানি থামছিল না, অন্তরটা ছ্যাঁত ছ্যাঁত কইরা উঠছিল। মনে হইল, আমি বুঝি খুব বেশি ভুল কইরা ফেলছি! কিন্তু কি ভুল করছি? এতটুকু ইচ্ছা প্রকাশ করাও কি অপরাধ? ক্যান এমন কইল? কেমনে এত বদলাইয়া গেল সে? ক্যান আমার ভালোবাসা, আমার অপেক্ষা, এতই ছোট মনে হইলো তার কাছে? আমার বুকটা ফাইটা যাইতেছিল।”
ফাতিমা এমন অভিযোগ দিয়েই যাচ্ছিলেন, কিন্তু আম্বিয়া মুখ খুললেন না। শুধু ভ্রূ কুঁচকে কঠোর অভিব্যক্তি দেখালেন, কিন্তু মেয়ের অনুভূতিতে কোনো বাঁধা দিলেন না। ফাতিমা নিজের অন্তরের কষ্ট থামাতে পারছিলেন না, সেই ব্যথা ধীরে ধীরে ভেতরের সবটা কেড়ে নিল।

“আমি ওনারে কিছু কইবার পারলাম না। তারান্নুম তহনো আসে নাই। এই সময় স্বামীর লগে ঝগড়া খাটে না। আমি নিজেরে বুঝাইয়া দাঁত চিপ্পা রইলাম। জিগাইলাম না, আমি কি ভুল করছি? জিগাইলাম না, আমার অপরাধ কি? জিগাইলাম না, ক্যান আমারে নিতে চান না? জিগাইলাম না, ছেলেটারে নিলে কি সমস্যা হইব?
কয়দিন পর উনি আবারও ওনার কাজে চইলা গেল। এইদিকে তারান্নুম পেটে থাকা অবস্থাতেও আমার কাম করণ লাগত। তাই এইবারও তোমার কাছে আইতে চাইলাম।
শাউড়ী আম্মারে কইলাম এই কথা। কিন্তু উনি সাফ সাফ কইয়া দিলেন, ‘ইয়া গয়না নইলে টিঁয়্যা-ফইসা নো আনিলে গরত ডুকিন্ন ফারিবি।’

(‘এবার গয়নাগাটি বা টাকাপয়সা না আনলে ঘরে ঢুকতে পারবা না।’)
তাই আর গেলাম না। তোমারে পারলাম না মনের কথা কইতে। এরমধ্যে তুমি মাইয়ার অবস্থা জানতে আকবররে পাঠাইলা। আকবর আইলো ঘরে। কত কিছু নিয়া আইলো সাথে… তাকাইয়া আমার চোখ দুইটা ছলছল করছিল। কতদিন পর এই বাড়ির মানষের দেখবার পাইছি, আপনই লাগল। খুব আপন লাগল।
সে আমারে দেখল। দেখল আমার অযত্ন। মুখ শুকাইয়া গেছে, গালিচাপড়া ভাইঙা গেছে। শরীর দেখলে মনে হইত, কয়েক মাসের রোগী। আমার হাতে যহন তোমার পাঠাইনা অত খাওন, কাপড়, ছেলের জিনিসপত্র সহ একটা বিশাল ব্যাগ তুইলা দিল— দেখল আমার রগরগা হাতখানা।
সে হাসিখুশি মুখ নিয়াই ঘরে প্রবেশ করছিল, কিন্তু আমারে দেখার পরমুহূর্তেই মুখটা চুপসাইয়া গেল। আমি চাইছিলাম তারে বুঝাইতে দিতে যে আমি ভালো নাই, কিন্তু পারলাম না। শউরবাড়ির অপমান হইব, স্বামীর নাম খারাপ হইব দেইখা কইলাম না কিছুই। জোরপূর্বক হাসি দিলাম, ব্যাগটা হাত থেইকা নিয়া পাশে রাখলাম।
কইলাম, ‘আকবর ভাই যে, আহেন। আপনে আইবেন, জানাইবেন না? কতগুলা দিন পর আইলেন। বিয়ের দিনও আপনারে দেখবার পারি নাই। কই ছিলেন ওইদিন?’

কইতে কইতে গলা কেমন কাঁইপা উঠল আমার। মনে হইতেছিল, আরেকটু হইলেই কান্না ফসকে পড়ব।
সে হাসল। কইল, ‘তোরে অনেকদিন পর দেখলাম, ফুলপরী। কিন্তু… কিন্তু আমি যারে চিনতাম, তুই সে না।’
মুখ নামাইয়া রাখলাম আমি। মুহূর্তেই মুখখানা পানসা হইয়া গেল। তবুও জোর কইরা হাসি তুললাম। বুকটা ব্যথায় কাঁপতেছিল, কিন্তু দেখাইলাম না। কইলাম, ‘ভিতরে আহেন, বসেন… কত কথা জইমা আছে জানেন? আপনার উপর আমার অনেক অভিযোগ। কেন যে বিয়ার দিন একবারের জন্যও দেখা দিলেন না, আইজকা সব জাইনা ছারুম। এইবার বসেন বিছানায়।’
সে মুখটারে নত কইরা কইল, ‘বসার জন্য আসি নাই। খালাম্মা এইসব পাঠাইছে তোর জন্য। আজকাল নাকি বাসায় তোর চিঠিও যায় না। চিন্তা করে সবাই।’

প্রতিটা কথাই সে চোখ নামাইয়াই কইল। কেন জানি আমার দিকে তাকাইবার পারছিল না। কেমনে পারব? নিজের ভালোবাসার মানুষটারে এমন দেখতে কার চোখ চায়? হয়ত লোকটার বুকের মধ্যিখানটায় হাহাকার করছিল, মুখ ফুইটা আমারে গাল দিতেও পারত। কিন্তু আমার শউর বাড়ি দেইখা কিছুই কইল না। শুধু দাঁড়াইয়া রইল।”
ফাতিমার হৃদয় ভিতর থেকে চূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। চোখ ভিজে যাচ্ছিল। তিনি কেবল ভেতরে গেঁথে থাকা ক্ষোভ আর আকুলতাকে চেপে ধরলেন।
এরপর কাঁধ থেকে মাথা তুলে স্থির দৃষ্টিতে আম্বিয়ার দিকে তাকালেন। দেখলেন, মায়ের মুখে গভীর অবসাদের রেখা। মুখের দিকে তাকানোও যেন কষ্টকর। তবু চোখে চোখ রেখে ফাতিমা উচ্চারণ করলেন, “ও আম্মা… তুমি কি জানতা না আকবর আমারে ভালোবাসত? জানতা না, আমারে পাওনের লাইগা কত রাইতের পর রাইত সে মোনাজাতে চোখের পানি ফালাইছে? তুমি কি জানতা না, সে আমারে রানির মতোন আগাইয়া রাখতে চাইছিল? কও না, আম্মা… জানতা না?”

আম্বিয়া প্রথমে কোনো উত্তর দিলেন না। মেয়ে’র আকুতি ভরা দৃষ্টির গভীরে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে রইলেন। তারপর এক গহিন নিশ্বাস ছেড়ে নিজের ভেতরের ভার নামালেন। বললেন, “জানলে কোনোদিনও তোরে অত দূরে বিয়ে দিতাম না। আকবর যে ভালা পোলা, ওইটা আমি জানি। ও যদি একবারের লাইগাও মুখ ফুইটা কইত, ‘খালাম্মা, ফাতিমারে আমার চাই, দিয়া দ্যান।’ আমি নিজেই দাঁড়াইয়া তোগোরে এক লগে বাঁধতাম। কিন্তু… কিন্তু ও তো কোনোদিনও কইল না। একবারের লাইগাও আমারে বুঝাইল না যে ও তোরে পছন্দ করে।”
ফাতিমার মুখ হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠল। মনে হয়, সঞ্চিত অভিমান গলায় এসে জমলো। গভীর ক্ষোভের সুরে বললেন, “কেমনে বুঝাইত? তোমার স্বামী… তোমার স্বামী যে একখান প্রাচীর আছিল, যারে অতিক্রম করা অসম্ভব। উনি কি কোনোদিনও ড্রাইভারের ছেলের লগে বিয়া দিতে রাজি হইতেন? তোমার কি মনে হয়, উনি দিতেন অনুমতি?”
“আমি দিতাম। তানার অনুমতি লাগত না। এই আম্বিয়া কোনোদিন কারো অনুমতি নিছে, দেখছস? আকবর ভুল করছে, এই সত্য ঢাকবার যাইস না।”

ফাতিমার গলা হঠাৎ ভারী হয়ে এল। মায়ের দিকে এগিয়ে এলেন। ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন, “ভুল করে নাই সে। আব্বার কাছে হাত পাতছিল। কইছিল আমার কথা। কিন্তু আব্বা… আব্বা কি করলেন, জানো?”
এই খবর আম্বিয়ার অজানা। তাই হঠাৎ চমকে উঠলেন। কপাল কুঁচকে, থরথর গলায় প্রশ্ন করলেন, “কি করছে?”
ফাতিমা ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফেললেন। নিশ্বাস ঘন হয়ে এলো। তারপর স্তিমিত কণ্ঠে বললেন, “আকবর যে কবিতা লিখত, গান লিখত… এইটা তো তুমিও জানো।”
আম্বিয়া মাথা নাড়িয়ে মেয়ের দিকে স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন।
ফাতিমা নীচু গলায় বললেন, “আকবর আমার কথা আব্বারে কওয়ার পর, আব্বা কইছিল, ‘চেয়ারম্যানের মেয়ের দিকে তাকানোর সাহস দেখাইছিস, তাও কিছু বললাম না। কিন্তু আমার ফাতিমারে চাওয়ার দুঃসাহস করছিস! অবাক হইছি বটে। আগে একবার নিজের যোগ্যতার দিকে তাকাইলি না?’
আকবর তখন ঠোঁট কামড়ায়ে হাইসা কইল, ‘নিজের যোগ্যতা আমি বানাব ওর জন্য। আপনে শুধু সময় দেন। আমারে সামর্থ্যবান হতে দেন।’

তারপর হইতে উনি রাত জাগা শুরু করলেন। কবিতা লেখার দিকে মন দিলেন। দিনরাত লিখত, পরিশ্রম করত। শুধু একটাই বাসনা—আমারে পাওয়ার। কলমের খোঁচায় যেন নিজের ভাগ্য লিখতে চাইল।
কিন্তু লাভ? লাভ কি হইল? যেদিন ওনার কবিতা নিউজপেপারে ছাপাইলো, উনি আনন্দে উড়তেছিলেন। মনে করছিলেন, এবার আব্বারে প্রমাণ করব, উনি আমার যোগ্য। কিন্তু ওইদিনই আমগো বাড়ির দরজায় দাঁড়াইয়া দেখলেন, আমারে শউরবাড়ি নিয়া যাইতেছে।
উনি চাইলেও আর আমার সামনে আইলেন না। আব্বার মুখোমুখিও হইলেন না। বুকভরা দুঃখ নিয়া ওইখান দিয়া চইলা গেলেন। যে গাছের তলায় বইসা আমারে নিয়া চিঠি লিখত, কবিতা লিখত, ওইখানে বইসাই নাকি কানতেছিল একটানা। আমি এহন বুঝি, ওনার কষ্টটা কতটা গভীর আছিল!”
ফাতিমার চোখ ছলছল করে উঠল। কাঁপা গলায় দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন।
কিছুক্ষণ স্তব্ধতার পর আম্বিয়া মৃদুস্বরে বললেন, “এইগুলা আকবর কইছে তোরে?”
ফাতিমার গলার স্বর নীচু হয়ে এলো, “হুঁ।”
তারপর গভীর শ্বাস টেনে স্বর ভারী করলেন, “তো ওই দিনের পর উনি কবিতা লেখা ছাইড়া দেয়। দেওনেরই কথা, যার জন্য কবিতা লিখত, তারেই তো পাইল না।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা যেন আটকে এলো। ঠোঁটে ফুটল অসহায় হাসি। চোখের কোণে জমাটবাঁধা অশ্রু ঝিলমিল করল আলোর প্রতিফলনে।
আম্বিয়া তার কাঁধে হাত রাখলেন। মেয়ের কণ্ঠের কম্পন আর দৃষ্টির শূন্যতা তার অন্তরকে বিদীর্ণ করল।
কিছুক্ষণ নীরবতা ভর করল। অবশেষে আম্বিয়া কণ্ঠে সামান্য দৃঢ়তা এনে বললেন, “শউরবাড়ির কাহিনি থাইমা গেলি হুট কইরা। তারপর ক।”

ফাতিমা আবার দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, “আকবররে আমি হাইসা কইলাম, ‘চিঠি দিছিলাম তো আগের মাসে—ওই তো একই কথা, কেমন আছি, ছেলে কেমন আছে। এইবার হাতে কাজ আছিল, তাই লিখবার সময় পাই নাই।’
আকবর হালকা হাসল। কইল, ‘তা তোরে দেখেই বুঝছি, প্রচুর কাজ করিস। আমি তাহলে আসি।’
আমি তহন তার সামনে দাঁড়ায়ে গেলাম। কইলাম, ‘আপনার মনে হয়, আপনারে এইভাবে যাইতে দিউম? আগে বসবেন, খাইবেন; পরে না হয় যাওয়ার কথা হইবে।”
সে রাজি হইতে চাইল না। কিন্তু আমি একরকম জোর কইরাই তারে নিজের ঘরে নিয়া গেলাম। বিছানার উপর বসতে কইলাম। সে বসল, কিন্তু মুখটা নামাইয়া রাখল। একবারও আমার দিকে তাকাইল না।
আমি হাসতে হাসতে রসুইঘরে গেলাম। তার জন্য রান্না বসাইলাম। সে যদিও মানা করছিল, কইছিল, ‘এই অবস্থায় রান্নাঘরে যাস না।’
কিন্তু আমি হাইসা কইলাম, ‘আমি পারুম। অভ্যাস আছে…’
তার জন্য ভরপুর খাওনের আয়োজন করলাম। মনে আনন্দের ঢেউ খেলছিল সেদিন। চোখগুলা আমার উজ্জ্বল হইয়া উঠছিল। তার পছন্দের গুড়ের পাটিসাপটা বানাইলাম কয়েকটা।
এরপর পিঠার প্লেট সাজাইয়া ঘরে গিয়া রাখলাম তার পাশে। হাইসা কইলাম, ‘শুরু করেন। এরপর দুপুরের খাবার খাইবেন।’

সে মুখ নামাইয়াই কইল, ‘পাশে বস।’
আমি বসলাম তার থেকে একটু দূরে। সে আমার দিকে না তাকাইয়াই কইল, ‘কয় মাস?’
আমি হাইসা কইলাম, ‘সাত মাসে পড়ব কয়দিন পর।’
সে মন খারাপ কইরা কইল, ‘তালহাই তো এখনো ছোট। এত জলদি আরেকটা নেওয়ার কি খুব দরকার ছিল? নিজের দিকে তাকাইছোস? নিজেরেই সামলাইতে পারো না, আবার দুইটা সন্তান!”
‘ও গেরামের সব মাইয়ারাই পারে।’
‘কিন্তু তোরে তো আর গ্রামে বিয়া দেয় নাই। তোরে জমিদার ঘরে বিয়া দিছে। ঘরটাও বড়সড়। তোর জামাই এত বড় চাকরি করে। তাইলে?’
‘তাইলে আবার কি? জমিদার গিন্নিরা বুঝি দুই তিনটা ছাওয়াল নেয় না?’
সে হালকা ঠোঁট বাঁকাইয়া কইল, ‘ভালো বলছিস! তুই তো জমিদার গিন্নীই। যাক, দুপুরের খাবার খেতে পারব না রে, যেতে হবে। তবে তোর হাতের পিঠা গুলো খেয়ে যাই।’

সে একটা পিঠেতে হাত দিল, ঠিক তহনই হুড়মুড় কইরা শাউড়ী আম্মা আইল। আকবরের সামনে থেইকা প্লেটটা ঝট কইরা নিয়া নিল। আর সাথে আকবরের হাত থেইকা পিঠাটাও ছিনাইয়া নিল।
আকবর অবাক হইয়া তাকাইল তার দিকে। আমিও হতভম্ব হইয়া গেলাম।
শাউড়ী ফোঁস ফোঁস করতে করতে কইলেন, ‘যারত্তুন নিজে হনের হেডাম নাই, ইতে আবার বরো বাড়ির মাইনষেরে কেনে হাবায়? তাও আঁর ফুঁয়ার টিয়্যা দি এনে!’
(‘যার নিজের খাওয়ার মুরোদ নাই, সে আবার বাপের বাড়ির মানুষকে কেমনে খাওয়ায়? তাও আমার ছেলের টাকায়!’)

আকবর এইবার আমার দিকে তাকাইল। তার চোখে বিস্ময় ফুটল। সে তো কল্পনাতেও আনতে পারে নাই এমন কিছু শুনবে।
আমার রাগ জমতে লাগল। তার সামনে গিয়া দাঁত চাইপা কইলাম, ‘আপনার ছেলে কিন্তু আমার স্বামী। টাকার গরম আমিও দেখাইতে পারি।’
এই বইলা প্লেট টানতে গেলাম তার হাত থেইকা। তখনি সে আমারে একটা থাপ্পড় মারল।
ব্যথায় গালটা টনটন করল। চোখ থেইকা পানি ঝরলো কয়েক ফোটা। আমি ছলছল চোখে তাকাইলাম তার দিকে।
তার ঠোঁট থেইকা বিষাক্ত উক্তি ঝরল, ‘সুরুতের তো এইল্লা ডক, আবার এত্তোর বড় হতা কেনে হইয়্যু তুঁই?’
(‘চেহারার তো এই শ্রী, আবার এত বড় কথা কোন সাহসে বললি তুই?’)
গর্ভবতী মাইয়ার গায়ে হাত দিছে, তাও কিনা আকবরের ভালোবাসার মানুষ!

রাগে আকবরের মুখখানা লাল হইয়া উঠল। তার হাতের রগ ফুইলা গেল, চোখ দুইটা জ্বলজ্বল করতেছিল।
সে লাফ দিয়া উইঠা দাঁড়াইল। চেতেমেতে কইল, ‘আপনি কি অমানুষ নাকি? আমার সামনে থেকে আমার বাপও কখনো প্লেট টান দেয় নাই, আপনি দিছেন; তাও কিছু বলি নাই। কিন্তু ওর গায়ে হাত দেওয়ার অধিকার আপনাকে কে দিছে? ফাতমার শাশুড়ি না হলে এইখানেই পুতে রাখতাম।’
শাউড়ী আমার দিকে কিড়মিড় কইরা তাকাইলেন। হাতের প্লেটটা ধপ কইরা নীচে ফালাইলেন। কাচের শব্দে ঘরটা গুমরাইয়া উঠল। খাবার চারপাশে ছড়াইল।
রেগেমেগে কইলেন, ‘বেডির তো দেহি লাং আছে। এগিন কি বিয়া ওইবার আগেত্তে আছিল? নাকি নতুন গরি এনে ওইয়্যে?’

(‘মাইয়ার দেখি লাং আছে। তা শুনি, এগুলো কি বিয়ের আগে থেকেই ছিল, নাকি নতুনে হইছে?’)
লজ্জায় আমার মাথা নুইয়া গেল। কিন্তু রাগ আরও বাড়ল। আমি ছ্যাঁত কইরা উঠলাম, ‘মুখ সামলাইয়া কথা বলেন, আম্মা। আমি কিন্তু ভুলে যাব আপনি আমার শাশুড়ি।’
তিনি মাথা নাড়তে নাড়তে ফুঁসতে ফুঁসতে কইলেন, ‘যিয়ান হনের দরকার, আঁই রমজানরে হইয়্যুম।’
(‘যা বলার দরকার, আমি রমজানকেই বলব।’)
তারপর মুখ ঝামটি দিয়া চইলা গেলেন অন্য ঘরে।
আকবর শুধু আমার অসহায় মুখটার দিকে তাকাইয়া রইল। একটু পর আমার কাছে আইসা সে কইল, ‘ব্যাগপত্র গুছানো শুরু কর।’

আমি বোকার মতোন তার দিকে তাকাইলাম।
সে আবারও কইল, ‘তোরে বাড়িতে নিয়ে যাব। খালাম্মা যদি জানে, এই বাড়িতে তোর কি অযত্ন হয়, প্রত্যেকটারে কোপাইয়া ফালায় দিবে। চল। এমন জায়গায় চৌধুরি বাড়ির মেয়ের থাকা মানায় না।’
‘আপনি যা দেখছেন, সব ভুইলা যাইবেন। মনে করবেন, কিছুই দ্যাখেন নাই।’
সে বিস্ময়ে কইল, ‘তোর মাথা ঠিক আছে, ফাতমা? এক্ষুনি আমার সাথে আসবি। আর কোনো কথা শুনতে চাই না।’
আমি আকুতিভরা চাহনিতে কইলাম, ‘আপনি চইলা যান। দয়া কইরা চইলা যান। এইসব যেন ওই বাড়ির কেউ না জানে। আল্লাহর কসম কাটেন। দোহাই আপনার। দুইটা ছেলে-মেয়ে নিয়া—’
সে আমারে কথা শেষ করতে দিল না। কইল, ‘দুইটা ছেলে-মেয়ে তো কি হইছে? তোরে কি কেউ চৌধুরী বাড়ি থেকে বের করে দিবে? দিবে না তো। আর এই জা’নোয়ারদের মাঝে আমি তোরে একা ছেড়ে যেতে পারব না। আমারে জোর করতে বাধ্য করিস না, ফুলপরী।’

আমি চোখের পানি মুছলাম। কইলাম, ‘আপনি যদি এগুলা ওই বাড়তে কাউরে কন, আর এহন না চইলা যান… ভাববেন ফাতিমা আপনার জন্য মারা গেছে।’
কথাটা শুইনা সে হতবাক হইয়া গেল। চেঁচাইল, ‘ফাতমা…’
আমি মুখ ঘুরাইয়া রাখলাম। অন্তরটা খাইয়া যাইতেছিল, থুতনি কাঁপতেছিল। কিন্তু নিজেরে শক্ত রাখার চেষ্টা করলাম। দুইটা ছেলেমেয়ে নিয়া গেরামে গেলে সমাজ কি কইবে, আমি ভালো কইরাই জানতাম। কিন্তু আকবর বুঝে নাই ওইসব।

আমারে নির্বাক দেইখা শ্যাষে সে মাথা নীচু কইরা কইল, ‘কাজটা ভালো করলি না। কিন্তু আমি তোরে অবশ্যই দেখতে আসব। তুই চাইলেও আটকাতে পারবি না।’
আমি ঘুইরা কিছু কইবার আগেই দেহি, সে অলরেডি ঘরের চৌকাঠে পা দিছে। শেষ বার আমার দিকে একবার তাকাইল, আমি চোখ নামাইয়া রাখলাম। এরপর সে রক্তিম মুখে তড়তড় কইরা চইলা গেল।”
এতক্ষণ ধরে বলার পর ফাতিমা গভীর নিশ্বাস ছেড়ে একটানা কিছু মুহূর্ত স্থবির হয়ে বসে রইলেন। শরীরটা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে নুইয়ে পড়েছে। বোঝা যাচ্ছিল, ভিতরটা ভাঙন খেয়ে গেছে, কিন্তু মুখাবয়ব এবং হাত-পা জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। মায়ের মুখের দিকে একবার তাকালেন, খুঁজলেন কোনো প্রতিক্রিয়া। কিন্তু না, আম্বিয়ার চোখে কোনো প্রকাশ লক্ষ্য করা গেল না। কারণ বোঝা যাচ্ছিল, অন্তরে তিনি অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ। ফাতিমা মায়ের নির্বাক, অন্যমনস্ক ভঙ্গি লক্ষ্য করে হঠাৎ তার কাঁধে হালকা একটা ধাক্কা দিলেন।
চমকে উঠলেন আম্বিয়া, চোখে ক্ষণিকের বিস্ময় ফুটল। তারপর ধীরে ধীরে স্থির হয়ে বললেন, “থাইমা গেলি যে বড়…”

ফাতিমা হালকা হেসে বললেন, “কি ভাবতাছ? দোষ তো আমার ভাগ্যের, আম্মা। আমার ভাগ্যেই আছিল এগুলা…”
আম্বিয়া তার কথাকে কেটে বললেন, “দোষ আমার। আমি ক্যান সচেতন হই নাই? ক্যান আরো জাইনাশুইনা তোর বিয়া দেই নাই? নিজেরে কি শাস্তি দেওন যায়, তাই ভাবতাছি!”
ফাতিমা হঠাৎই দুই হাতে মাকে আঁকড়ে ধরলেন। চোখে অশ্রু নিয়ে কাঁপা গলায় বললেন, “এতগুলা বছর নিজের জীবনের সমস্ত স্বপ্ন ও সুখ ভাইঙা ফালাইয়া তুমি এই জমিনটায় থিতু থাকছ, শুধুমাত্র কৌশিকা ভাবির লাইগা। এর চাইতে বড় শাস্তি আর কী হইতে পারে? তোমার কোনো অপরাধ নাই, আম্মা। সব দোষ নিয়তির, ওই লিখন তো খণ্ডাইবার সাধ্যি কারোর নাই।”
ফাতিমা আরও খানিকক্ষণ মাকে আঁকড়ে ধরে বসে রইলেন, যেন দুই প্রজন্মের বেদনাকে একত্রিত করে কোনোভাবে শিথিল করার চেষ্টা করছেন।

মিরা বিস্ময়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। কারানের পাশে এসে কপাল কুঁচকে বলল, “কিহ! কিন্তু কীভাবে জানলে?”
কারান কোনো উত্তর দিল না। চুলার ধারে রাখা কলাপাতা ধুয়ে শুকিয়ে হালকা আঁচে সেঁকে নিল। তারপর পাতার মাঝে ইলিশের রুপালি টুকরো রেখে সরিষা বাটা, লবণ, কাঁচা মরিচ আর সামান্য সরিষার তেল মেখে দিল। আঙুলের নিপুণ স্পর্শে মশলা মেখে পাতাগুলো ভাঁজ করে সুঁতোয় বেঁধে নিল।
মিরা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে সেই হাতের কাজ পর্যবেক্ষণ করছিল। তার চোখে মুগ্ধতা থাকলেও মনে অস্থিরতার ঝড় বইছে। কারান প্যাকেটগুলো ভাপে বসিয়ে শান্ত গলায় বলল, “এটা স্টিম হতে থাকুক। ততক্ষণে তোমার মন থেকে টেনশনটা সরাই।”

“হ্যাঁ… এবার বলো, কারান। তুমি কীভাবে জানলে?”
কারান কিচেন কাউন্টারের সঙ্গে হেলান দিয়ে বলল, “তালহা বলেছিল।”
মিরা অবাক হয়ে বলল, “সে এসব জানত?”
“পুরোটা বললে বুঝবে। ওই বাড়িতে এক রাতে দুঃস্বপ্নের কারণে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে আমি বাইরে বেরিয়ে হাঁটতে যাই। তখনই সামনে ফুফাকে দেখলাম—পুরোপুরি জীবন্ত মনে হলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই নিজেকে বোঝাতে থাকি যে ওটা কিছুক্ষণ আগের স্বপ্নেরই প্রভাব। যদিও বুঝতে পারছিলাম না বাস্তব না মায়া।”
মিরার ভ্রূ কুঁচকে গেল। কারান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে এগিয়ে এসে বলল, “পরদিন আমি সব তালহাকে বলি। তখন ও চুপচাপ শুনল, তারপর বলল, ফুফাকে ফুফি মেরেছে।”

শব্দগুলো যেন বজ্রাঘাতের মতো আঘাত করল মিরার অন্তরে। সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর শ্বাস যেন আটকে গেল। কাঁপা গলায় বলল, “হোয়াট? কি বললে?”
কারান শান্ত গলায় জবাব দিল, “হাইপার হয়ো না। এর পেছনে অনেক গভীর কারণ লুকিয়ে আছে।”
ফাতিমার সাথে কি কি হয়েছিল সবকিছু কারান ধীরে ধীরে খুলে বলল। কথাগুলো শোনার পর মিরা যেন দিশাহারা। মাথায় হাত রেখে চেয়ারে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “কিন্তু… কিন্তু তালহা ভাইয়া এত কিছু জানল কীভাবে?”
কারান গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, “ওকে ফুফি ঢাকায় চৌধুরি বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল পড়াশোনার জন্য। তখন চট্টগ্রামে ওর দাদাবাড়িতে ফুফির সাথে কী হচ্ছে, ও কিছুই জানত না।”
“আচ্ছা, একটা কথা বলো, আমি তো শুনেছি, ভাইয়া অস্ট্রেলিয়ায় থাকত…”
“ওটা ইন্টারমিডিয়েট শেষ করার পর গিয়েছিল।”
“আচ্ছা, বাকিটা বলো।”

কারান অতি শান্ত গলায় সবকিছু বলতে শুরু করল, “ফুফা প্লেন ক্র্যাশের আগেই প্যারাসুট দিয়ে নেমে প্রথমেই তালহাকে ফোন করেছিল। ফোনে বলেছিল, সে বাড়ির পথে, ড্যাড আর কাকাইকে যেন খবর দেয় যে সে মোটামুটি সুস্থ আছে, জাস্ট কিছু স্থানে আঘাত লেগেছে। তালহা যেহেতু ওর দাদাবাড়ির পথ চেনে, তাই ড্যাড বা কাকাইকে কিছু না জানিয়েই সরাসরি ফুফাকে দেখতে ছুটে যায়। কিন্তু পৌঁছে দেখে, ফুফাকে ইতোমধ্যেই ফুফি আর আকবর কাকা মার্ডার করে ফেলেছে। দেহটিকে গোপনে কবর দেওয়ার জন্য তারা বাড়ির পিছনের দূরের নির্জন বাগানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তালহা তীব্র উত্তেজনা আর আতঙ্কের মাঝেও তাদের পিছু নেয়। প্রথমে মনে মনে ভয় পেলেও শিগগিরই উপলব্ধি করে, তার সরলমনা মা নিশ্চয়ই বিনা কারণে এমন ভয়াবহ কাজ করবে না। এরপর পরদিন সরাসরি আকবর কাকাকে প্রশ্ন করে। আকবর কাকা সবকিছু স্বীকার করে এবং ফুফার অপকর্মের প্রমাণও দেয়। অর্থাৎ সেই দ্বিতীয় বাড়িতে তালহাকে নিয়ে গিয়েছিল আকবর কাকা। পরে তালহা ওর ফুফি ও দিদার আচরণ লক্ষ্য করে আরো শিওর হয়ে যায় যে এভ্রিথিং ইজ আ হার্শ ট্রুথ।”

কথাগুলো যেন মিরার বুকের ভেতর পাথরের মতো আছড়ে পড়ল। সে হঠাৎ করেই চেয়ারে বসে পড়ল। মুখে বিমূঢ়তা আর শ্বাসে অস্থিরতা ধরা পড়ল। কিছুক্ষণ পর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে নিস্তরঙ্গ গলায় বলল, “আমি ভাবতেই পারছি না; আসলে মানুষের জীবন উপন্যাসের থেকেও জটিল। ফুফি… তার মানে তিনি আমাকে সবকিছুই মিথ্যা বলেছিলেন! অথচ তার জীবন ছিল অসহনীয় যন্ত্রণা আর গোপন ক্ষতের সমাহার। আমার ফুফার জন্য সামান্যতম আফসোসও হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, এটাই তার প্রাপ্য পরিণতি। কিন্তু ফুফির জন্য বুকের ভেতর আলাদা ব্যথা ফিল করছি—কতটা বেদনাময় জীবন কাটিয়েছেন তিনি, অথচ তার হাসিখুশি মুখের আড়ালে কেউ তা বুঝতেই পারেনি।”
কারান গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “প্রতিটি মানুষেরই এক অমোচনীয় বেদনাময় অতীত থাকে, মিরা। জীবন কখনো সম্পূর্ণ সুখের হয় না। তুমিই একবার বলেছিলে, ‘জীবনের অন্ধকার দিকটি মেনে নেওয়া অপরিহার্য; কারণ তা না হলে আলোর প্রকৃত সৌন্দর্য অনুভব করা যায় না। দুঃখের অনলে পুড়লেই সুখের সত্যিকারের দীপ্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’ এখন দেখো, ফুফি কতটা শান্তিতে দিন কাটাচ্ছে। হয়ত তার সেই কালো অতীতটা অপরিহার্য ছিল, সেই যন্ত্রণা না হলে আজকের এই প্রশান্তি কখনো পূর্ণতা পেত না।”

মিরা ঠোঁটের কোণে স্বচ্ছন্দ হাসি টেনে বলল, “জীবনচক্রে ওঠানামা থাকবেই। জীবন যদি চিরকাল একই ছন্দে চলে, তার একঘেয়েমি আত্মাকে জড়িয়ে ফেলবে। আমার মনে হয়, আমাদের জীবনেও সামনে কোনো অনিবার্য মোড় অপেক্ষা করছে, কারান।”
কারান এক ভ্রূ উঁচিয়ে কণ্ঠে মৃদু রহস্যের পরশ রেখে বলল, “মেইবি।”
মিরা মাথা নেড়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। কারান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে হঠাৎই তার কপালে আলতো চুম্বন রাখল। সেই স্পর্শে মিরার ঠোঁটের কোণে আরও গভীর হাসি ফুটল।
কারান বলল, “আমি ততক্ষণে বাকি রান্নাগুলো শেষ করি। তুমি ড্রয়িংরুমে গিয়ে একটু রেস্ট নাও।”
মিরা মুচকি হেসে প্রশ্ন করল, “তুমি সত্যিই একশোটা আইটেম রান্না করবে?”
“ইয়েস।”
মিরা হালকা নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “ঠিক আছে। আটকালাম না। কারণ জানি, তুমি শুনবে না আমার কথা।”
কারান নরম হাসি ছড়িয়ে দিল। মিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আচ্ছা, তোমাকে আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করি?”

“পারমিশন নেওয়ার কী আছে, জান?”
“না মানে, আমি যতটুকু জানি, বিলিয়নিয়াররা খুব আলাদা ধরনের আড়ম্বরপূর্ণ লাইফস্টাইল পছন্দ করে। হয়ত আমার ধারণা ভুলও হতে পারে। কিন্তু তুমি ট্রিলিয়নিয়ার হয়েও…”
কারান কথার মাঝেই থামিয়ে গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল, “ফার্স্টলি, যে বিপুল সম্পদ আমার নামে আছে, তা সম্পূর্ণ আমার মালিকানাধীন নয়। দেয়ার আর কমপ্লেক্স ফ্যাক্টর্স অ্যাট প্লে হিয়ার, হুইচ আই অ্যাম আনএবল টু রিভিল অ্যাট দ্য মোমেন্ট। সেকেন্ডলি, আমি ট্রিলিয়নিয়ার—এই গোপন তথ্যটি তুমি ছাড়া কেবল ফারহান আর এমেকা জানে। তাছাড়া যে-সব আর্থিক হিসাব তোমাকে দিয়েছি, সেগুলো একে চৌধুরীর প্রোফাইলের আওতায়।”
মিরা ভ্রূ কুঁচকে হালকা বিস্ময়ে বলল, “কিন্তু একে তো তুমিই।”
“হ্যাঁ, কিন্তু আমার এখানে দুটি স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে। একটি পরিচয়ে আমি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির ওনার কে. ছি; আরেকটিতে একে চৌধুরি। ইন কনক্লুশন, আমি যত বেশি লাক্সারি লাইফ লিড করব, তত দ্রুত ও তীব্রভাবে শত্রুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।”
“এগুলোর মানে কী, কারান? আমি তো পুরো টালমাটাল হয়ে যাব।”
“তুমি একে চৌধুরীর প্রোফাইলের জীবনযাত্রা কখনও কে. ছি-এর স্বাভাবিক জীবনধারার সঙ্গে মিলাতে পারবে না। আমি যদি একে চৌধুরীর পরিচয়ে বাইরে বেরোই, আমার পেছনে থাকবে আশিরও বেশি বুলেটপ্রুফ গাড়ির কনভয় এবং অন্তত তিনশ’ জন আরম্ড বডিগার্ড।”

মিরার চোখে বিস্ময়ের আভা আরও ঘনীভূত হলো।
“সব বুঝলাম, তবে তোমার ফেইস তো একই থাকবে, তাই না?”
কারান মাথা নাড়ল। “পুরোপুরি নয়। সেই প্রোফাইলে আমার মুখে দাড়ি থাকবে না, চোখে থাকবে ভিন্ন রঙের লেন্স, চুলের স্টাইল সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। এমনকি বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পর্যন্ত শার্প ও শীতল হয়ে উঠবে। কথার ভঙ্গি হবে সংক্ষিপ্ত ও গম্ভীর। অধিকাংশ সময় আমার মুখে মাস্ক থাকে। যদিও প্রয়োজন হলে তা সরানো হয়।”
“তবুও এতটা পরিবর্তন কি যথেষ্ট?”
“একে চৌধুরীকে দেখেছে—এমন মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা। তাছাড়া পৃথিবীতে প্রতি ট্রিলিয়নের মধ্যে অন্তত দু’জন একই চেহারার জন্ম নেয়। তাদের বলা হয় ‘ডোপেলগ্যাঙ্গার’। এই ধরনের ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো বায়োলজিকাল রিলেশনশিপ থাকে না। তবুও তাদের মুখাবয়ব এতটাই অভিন্ন হয় যে মনে হয় তারা প্রকৃত যমজ। আর অনেকে তো ভেবেই নিয়েছে, একে চৌধুরি কে.ছি-এর টুইন ব্রাদার। আমি এই বিভ্রম দূর করার প্রয়োজন বোধ করিনি। আমার প্রফেশনাল ওয়ার্ল্ড এত বিস্তৃত ও কমপ্লেক্স যে এইসব বিভ্রান্তি দূর করার সময় হয়নি।”
মিরার চোখ বড় হয়ে উঠল, বিস্ময়ে মাথা হালকা ঘুরছে।

“আচ্ছা… দুটি… দুটি পরিচয়ের প্রয়োজনই বা কেন?”
কারান এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে তার দিকে তাকাল। গভীর স্বরে বলল, “টু কালেক্ট সিক্রেট ইনফরমেশন অ্যাবাউট দ্য ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট পাওয়ারফুল পিপল, নিজেকেও বিশাল এবং প্রভাবশালী হতে হয়।”
মিরা কিছুটা হতবাক হয়ে বলল, “আমি এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছি না।”
“বুঝানোর পরেও বুঝবে না। তাই বোঝার চেষ্টাও করো না। এটা বিলিয়নিয়ারদের জগতের গোপন খেলা। আর সেই পরিচয়ে তুমি হয়ত আমাকে কখনো সামনাসামনি দেখবেও না। কারণ বাংলাদেশে যাওয়ার আগেই সেই প্রোফাইল হাইড করে রেখেছি। প্রয়োজন পড়লে আবার সক্রিয় করব।”
মিরা ভ্রূ কুঁচকে হেসে বলল, “আসলে তুমি আমাকে বোকা বানাচ্ছ, কারান। আমি কিন্তু এতটা অবুঝ নই।”
কারান রান্নার কাজের ফাঁকে বাঁকা হেসে বলল, “তুমিও আমাকে বোকা বানাচ্ছ। আমার তো মনে হয়, তোমারও দুটি নয়, অন্তত তিনটি পরিচয় আছে—যেটা আমি আগে দেখেছি, যেটা এখন দেখছি, আর ভবিষ্যতে হয়ত আরেকটি দেখতে পাব।”
মিরা অবাক হয়ে বলল, “সন্দেহ করছ তুমি আমাকে?”

আরিয়ান ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় স্নান সেরে বারান্দায় এসে বসল। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ ধরা। গায়ে একটি থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ও হালকা টি-শার্ট পরিহিত, উন্মুক্ত পা দুটো অস্বাভাবিকভাবে ফরসা ও লোমশ। সে কাচের গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দিগন্তরেখার শ্যামল সৌন্দর্য উপভোগ করছিল। শীতল বাতাসে শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে সতেজতা অনুভব করছিল। গভীর নিশ্বাসের সঙ্গে মনে হলো, যেন পুরো দেহে প্রাকৃতিক উচ্ছ্বাস প্রবাহিত হচ্ছে। এরমধ্যে হঠাৎই চোখে পড়ল, রোমানা গেইট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকছে। কপাল ভাঁজ করে বিড়বিড় করে বলল, “এত সকালে কোথায় গিয়েছিল রোমানা?”
সে কিছুক্ষণ বিস্মিত চোখে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। ঘরের ভিতর দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ কানে এলো। দ্রুত ভেতরে গিয়ে দেখল, রোমানা ইতোমধ্যেই বাথরুমে চলে গেছে। আরিয়ান সোফায় গিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসল।
মিনিট দুই পরে রোমানা বাথরুম থেকে বের হয়ে এলো। যে পোশাকে আগে এসেছিল, তা বদলে এবার পরেছে ঘরোয়া শাড়ি। আরিয়ান শান্ত চেহারায় তার পানে তাকিয়ে রইল। রোমানা নির্বিকারভাবে বলল, “ঘুমাবে নাকি অফিসে যাবে?”

বলতে বলতেই সে ফার্স্ট এইড বক্স খুলে অ্যান্টিসেপটিক মলম বের করে হাতের কাটা জায়গায় আলতোভাবে মলম লাগাতে শুরু করল। আরিয়ান কপাল ভাঁজ করে সোফা থেকে উঠে এসে তার হাত ধরল। উদ্বিগ্ন গলায় বলল, “কীভাবে কেটেছে, প্রিয়দর্শিনী?”
রোমানা ঠোঁটের কোণে হালকা বিদ্রূপের হাসি ফুটিয়ে বলল, “খুব মায়া দেখাচ্ছ যে?”
আরিয়ান চট করে তার মাথায় হালকা চাপড় মারল। রোমানা মাথা ডলতে লাগল। আরিয়ান চোখ-মুখ কুঁচকে বলল, “তোর উপর মায়া দেখানোও পাপ। হা’রামজাদি প্রেমের ভাষা তো বুঝিস না।”
রোমানা ঠোঁট কামড়ে মিডেল ফিঙ্গার তুলে দেখালো। আরিয়ান দাঁত চেপে ধরে আঙুলটি বেঁকিয়ে দিল। রোমানা চিৎকার করে উঠল, “আআআ! ছাড়, আরিয়ান! শালার পুত, ছাড়! লাগছে—আআআ!”
রোমানার চোখে-মুখে ব্যথার কুঁচকানো ভাঁজ দেখে আরিয়ান হাত ছেড়ে দিল। তারপর আলমারির গায়ে হেলান দিয়ে নেশালু চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। রোমানা এক ভ্রূ উঁচিয়ে তার চেহারার সূক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষ্য করল। বুকের উপর দুই হাত বেঁধে গম্ভীরভাবে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।

আরিয়ান চুল ব্যাকব্রাশ করতে করতে শান্ত কণ্ঠে বলল, “হাত কেটেছে কীভাবে?”
রোমানা অন্য দিকে ফিরে বলল, “তোর বা’লে কেটেছে।”
আরিয়ান বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, “বলো কি! আমার বা’লের এত ধার?”
“পড়ে গিয়েছিলাম, তাই কেটে গেছে।”
আরিয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রশ্ন করল, “কীভাবে পড়লে? আর কোথায় গিয়েছিলে এত ভোরে?”
“হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। তখন পরে গিয়ে কেটে গেছে।”
“তুমি গিয়েছিলে এত সকালে হাঁটতে, আর সেটাও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?”
রোমানা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো তার দিকে। এক হাত আরিয়ানের পাশে আলমারিতে ভর দিয়ে রেখে মুখটা তার দিকে নিয়ে গম্ভীরভাবে বলল, “তো কি খু’ন করতে গিয়েছিলাম?”

আরিয়ান বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না। বরং তার শাড়ির ভাঁজ সরিয়ে কোমরে হাত রাখল। রোমানা ভ্রূ কুঁচকে নিচে তাকাল। মুহূর্তেই তার কোমরটা টেনে আনল আরিয়ান। তাদের উদর একসঙ্গে মিশে গেল।
রোমানা কোনো কথা বলল না, শুধু আরিয়ানের চোখে চেয়ে রইল। সেখানে তীব্র, রোমান্টিক উত্তাপ লেগে আছে। আরিয়ান ধীরে ধীরে তার কানের কাছে ঝুঁকল। রোমানার নিশ্বাস ভারি হয়ে উঠল; বুকের ওঠানামা তীব্র হয়ে গেল। আরিয়ানের নিশ্বাস তার কানের কাছে আছড়ে পড়ছিল।
আরিয়ান গভীর স্বরে বলল, “করতেও পারো। যে এক্সকে ওরকম নৃশংসভাবে খু’ন করতে পারে, সে যে দ্বিতীয়বার করবে না—তার নিশ্চয়তা কি?”

রোমানার কপালের সূক্ষ্ম রেখাগুলো কুঁচকে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সে আরিয়ানের কানে দাঁত বসিয়ে দিল। আরিয়ান ব্যথার তীব্রতায় চিৎকার দিয়ে দ্রুত তার কোমর থেকে হাত সরিয়ে কানটি আঁকড়ে ধরল। ক্ষুদ্র অংশটি রক্তাভ হয়ে উঠেছে; আরিয়ানের স্বচ্ছবর্ণ চেহারায় লালচে দাগটি কেমন শিশুর আঁচড়ের মতো দেখাচ্ছে।
রোমানা শীতল স্বরে বলল, “হ্যাঁ, গিয়েছিলাম সুন্দরীদের শেষ করতে যেন আমার মতো আর কোনো সুন্দরী বেঁচে না থাকে। এখন শুধু মিরাকে শেষ করলেই কাহিনি খতম।”
আরিয়ান স্থির দৃষ্টিতে তার মুখশ্রী পর্যবেক্ষণ করল। সন্দেহের দ্যোতনায় এক ভ্রূ অল্প উঁচু হলো। ধীরগতিতে এগিয়ে এলো তার দিকে। রোমানা বিরক্তি মিশ্রিত বিরোধিতায় ধাক্কা দিতে গেল আরিয়ানের বক্ষস্থলে, কিন্তু সে নিজেই ভারসাম্য হারিয়ে সোজা তার বুকেই এসে ঠেকল। আরিয়ান ঠোঁটে কৌতুকের সূক্ষ্ম রেখা টেনে বলল, “আমারও তোমাকে দেখে সন্দেহ হচ্ছে। এই দেখি তো, তোমার শরীর থেকে র’ক্তের স্মেল আসছে কিনা!”
সে নিকটবর্তী হলো আরও। রোমানার দেহের গোপন সুবাস টের পেতে পেতে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামতে লাগল। কোমরের সীমান্তে এসে থামল, শাড়ির আভরণ হালকাভাবে সরিয়ে উন্মোচিত করল চিকন লতানো কোমররেখা। ঠোঁট ভিজিয়ে ফিসফিস করে বলল, “উফফফ, আমার চিকনা বউয়ের সে’ক্সি ফিগার!”

তৎক্ষণাৎ সেখানে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। রোমানা শিরশিরে অনুভূতিতে কেঁপে উঠল। সরে যেতে চাইলো, কিন্তু আরিয়ান তার কোমর অবরুদ্ধ করে একের পর এক চুম্বনের বর্ষণ নামিয়ে দিল। ওই অংশে আর্দ্রতা ছড়িয়ে পড়ল, স্পর্শের কারণে তাপ জমে উঠলো। শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হতে লাগল রোমানার, তবুও তীব্র আত্মসংযমে আকস্মিকভাবে পায়ের ফাঁক দিয়ে আরিয়ানের অ*ণ্ড*কো*ষ বরাবর লাথি মারল; যদিও আঘাত ছিল পরিমিত।
ব্যথার দমকে আরিয়ান চিৎকার করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। জায়গাটায় দুই হাত রেখে যন্ত্রণায় গড়াতে গড়াতে মুখ বিকৃত করে বলল, “কু’ত্তারবাচ্চা, শু’য়ারের বাচ্চা। হা’রামজাদি তোর… উফফ মাগো… শালী, তোর কপালে চুমু জুটবে না।”

রোমানা প্রবলভাবে হাসতে হাসতে টেবিলের সঙ্গে ভর দিয়ে দাঁড়াল। হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে হেসে বলল, “যদি আমি ভুল করে থাকি, আল্লাহ আমাকে বিধবা বানিয়ে দিক; আর যদি তুমিই আমাকে চুমু খেয়ে ভুল করে থাকো, তো আমার স্বামীকে উপরে তুলে নিক।”
তারপর আরিয়ানের দিকে হেলে বলল, “তাছাড়া খু’ন করলে পরের খু’ন তোকেই করব, শালা।”
আরিয়ান মেঝেতে শুয়ে থেকেই মাথার নিচে হাত রাখল। এক পা তুলে আরেক পায়ের হাঁটুর ওপর রেখে অলস ভঙ্গিতে হেসে বলল, “সত্যিই করবে?”
রোমানা ভেংচি কেটে সরে যেতে চাইলো, কিন্তু আরিয়ান দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে তার হাত চেপে ধরল। রোমানা পিছনে তাকাতেই আরিয়ান নিঃশব্দে হেসে বলল, “আমার একটা ইচ্ছে পূরণ করো।”
রোমানা কপাল কুঁচকে বলল, “কি ইচ্ছে?”

Tell me who I am 2 part 7 (3)

আরিয়ান ঠান্ডা গলায় ফিসফিস করে বলল, “আমাকে মে’রে ফেলো।”
রোমানা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, তারপর?”
“আমি সিরিয়াস, রোমানা। আমি তোমার হাতে ম’রতে চাই।”
“এতে কি হবে?”
আরিয়ান মাথা সামান্য নীচু করে বলল, “আমি মুক্তি পেয়ে যাব এই দমবন্ধ করা অস্তিত্ব থেকে।”
“আচ্ছা, হঠাৎ এসব ভূত চাপার কারণ?”

Tell me who I am 2 part 8 (2)