অকস্মাৎ প্রণয় শেষ পর্ব
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
স্রুতের মতো চলে গেলো দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর। সময়ের সাথে পাল্লা ধরে ধরণীতে এখন আগমন ঘটেছে বসন্তের। শীতের রিক্ততা কাটিয়ে ধরণী এখন নতুন সাজে সেজেছে। চারিদিকে সদ্য জন্ম নেওয়া কচি পাতার সমারোহে রঙিন হয়ে আছে প্রকৃতি। প্রকৃতির মতোই আজ রঙিন হয়ে আছে সরকার বাড়ির প্রতিটি কোণা। বাড়িময় খুশির জোয়ার নেমেছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে বাহারি রকমের খাবারের সুগন্ধ। তার সবগুলোই এ বাড়ির বড়ো ছেলে নাজদিদ সরকার নিরবের পছন্দের খাবার।
এতো এতো আয়োজন করেও যেন মন ভরছে না সাহেরা বেগমের। গত পাঁচটা বছর ধরে ছেলের জন্য রান্না করেন নি তিনি। সবকিছুই তুচ্ছ মনে হচ্ছে তার। পাশে দাঁড়িয়ে শাশুড়ির কান্ড কারখানা দেখছে তাপসি। মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে সে, পুরো টেবিল জুড়ে খাবারে গাদাগাদি অথচ তার শাশুড়ি এখনো জিজ্ঞেস করছে এগুলো কম হলো কিনা! এই প্রশ্নের জবাবে আদৌ কিছু বলার আছে তার?
“ আম্মু নিরব এসে পড়েছে, আর মাত্র ঘন্টাখানেক লাগবে আসতে। তোমার জামাই মাত্রই ফোন করে বলল। ”
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল রীতি। তারপর তাপসির দিক তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
“ আরে তাপসি তুমি এখনো এই ভেশেই আছো! তোমাকে না বললাম একটা নতুন শাড়ি পরতে। নিরব এক্ষুনি এসে পড়বে, যাও বলছি। ”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
ননসের কথায় আর দেরী না করে বাধ্য মেয়ের মতো নিজের রুমে চলে গেল তাপসি। এমনিতেও সে নিচে থাকতে পারবে না। নিরবের আসার সময় যত এগিয়ে আসছে ততই অশান্ত হয়ে উঠছে তার মন। সে চেয়েও নিজের মনের ভিতরে চলা তোলপাড় থামাতে পারছে না। এমন না হয় নিরবকে দেখে সে সবার সামনেই কেঁদে দেয়- তাই সেখানে তার না থাকাই ভালো। আর নিরবের সামনে সে কখনোই নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে চায় না। বিয়ের একমাস পরপরই নিরব পাড়ি জমিয়েছিলেন দূর প্রবাসে। সেখানে গিয়ে প্রথম কয়েকমাস তো তার সাথন কথাই বলেনন, মাঝে মাঝে সাহেরা বেগমের ফোন দিয়েই একটু আধটু কথা হতো।
তাও সাহেরা বেগমের কথায়।সেই অসহ্যকর দিনগুলোও তো দিব্যি মানিয়ে নিয়েছিলো সে। আর এখন তো নিরবের সাথে তার সম্পর্ক অনেকটা ঘনিষ্ঠ। যদিও নিরবের দিক থেকে সেই ঘনিষ্ঠতা নিত্যান্তই বন্ধুর দিক থেকে। তবুও সেটারই অনেক মূল্য তার কাছে। নিজের সুপ্ত ভালোবাসা চিরজীবন বহন করে পোড়তে রাজি সে, তবে নিরবের থেকে দূরত্ব বাড়াতে সক্ষম নয়। সে তো নিজেই বলেছিলো কখনো ভালোবাসা চাইবে না তাহলে এখন কী করে সেই দাবি নিয়ে নিরবের সামনে যাবে সে? আচ্ছা এতগুলো বছরে কী উনার মনে একটুও ভালোবাসা জন্মায় নি আমার জন্যে? আর কতবছর এভাবে তার ভালোবাসার অপেক্ষায়ই কাটাতে হবে? আদৌ কি এর অপেক্ষার অবসান ঘটবে? এই এতগুলো দিন প্রতিনিয়ত কথা বলার পরেও কী একটু মায়া জন্মায় নি উনার মনে? না হোক তা ভালোবাসার কথা একটু অন্তত মায়া কী জন্মায় নি? কই সে তো ঐ একদিনের এক মিনিটের একটা ভয়েসের মধ্যেই এখনো আটকে আছে!
“ এই সজিব, তুমি ওখানে কী করছো? ”
বাবার কণ্ঠে মাথা ঘুরিয়ে তার দিক তাকাল চার বছরের ছেলে সজিব। মুখে শিশুসুলভ হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ একটু হিশু দিচ্ছি। ”
“ ঘরে ওয়াশরুম থাকতে তুমি বাইরে কেন এসব করছো? ”
“ ঘরে হিশু দিয়ে মজা পাই না আব্বু, চিপায়- চাপায় হিশু দেওয়ার মজাই আলাদা। ”
নিজের ছেলের এমন আশ্চর্যজনক কথায় চোখ ছোটো ছোটো করে তার দিক চাইল সাদিক। সে জন্মের পর থেকেই ছেলেকে শুদ্ধ ভাষা শেখাতে চাইছে অথচ এই ছেলে তার ছোট্ট সাঙ্গু পাঙ্গু দের সাথে চলে এসব ভাষাই ব্যাবহার করে। না করলেও কথা শুনে না। এক নম্বরের ঘাড়ত্যাড়া হয়েছে। মাত্রই কলেজের ক্লাস, কুচিং সব নিয়ে বাসায় ফিরেছে সে। তাই আর কিছু না বলে বাড়ির ভিতর চলে গেলো । বাবা যেতেই বাড়ির পিছনে মাঠে বন্ধুদের সাথে খেলতে চলে গেলো সজিব। দিনের বেশিরভাগ সময় সেখানেই কাটায় সে। হাজার ডেকেও ঘরে আনা যায়না তাকে।
“ বন্ধু তোমার প্রেমে বুক ভাসাইয়া জীবন পেরেশান,
আরে লাভের ঘুড়ি পিপঁড়া খাইল হইল যে লোকসান…! ”
অলস ভঙ্গিতে বিছানা ঝাড়তে ঝাড়তে গুনগুন করে গানের দুটো লাইন বলল কি বলল না তার আগেই পিছন থেকে তার গান মাঝপথে থামিয়ে নিজের মতো করে পরের লাইনগুলো বলে উঠল সাদিক,
“ বিয়ে করে, হায়রে! সুখ নাইরে, নাইরে..!
মন পোড়ে, পোড়ে পাবনা বধূ রে…! ”
লেহ ঠ্যালা, এবার শুরু হবে ওদের সেই নিত্যদিনের যুদ্ধ। আর সবসময়ের মতোই সেই যুদ্ধে জয়ী হবে আনিকা। আর যদি কোনোমতে সাদিক তাকে হারিয়ে দেয়- তাহলে সেদিন আনিকার কাছে ঘেঁষা তার জন্য প্রলয়ংকারী ঝড়ের মধ্যে হেঁটে চলার মতো দশা হয়। তাই ইচ্ছে করেই নিজের হার মেনে নেয় সে। মূল কথা সে আনিকাকে রাগাতেই এসব করে। আনিকাও রেগে বোম, এই যে এখনো একই অবস্থা তার।
“ আমাকে বিয়ে করে আপনার জীবনে সুখ নাই? ”
“ আমার প্রেমে পইড়া তোমার জীবন পেরেশান? ”
“ আমি কি সেটা আপনাকে মিন করে বলেছি, আমি জাস্ট গান গেয়েছি। ”
“ আমিও তাই। ”
“ বান্দর লোক, আপনি আমাকে বোকা মনে করেন? ”
সাদিককে ধাক্কা মেরে বলল আনিকা। তার ধাক্কায় এক ইঞ্চিও নড়লো না সাদিক। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ তুমি বুঝি কখনো চালাক ছিলে? ”
রাগান্বিত শরীরে সাদিকের অপমান কাটা গায়ে নুনের ছিটার মতো কাজ করল আনিকার। সে হাতে থাকা ঝাড়ুটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আঙুল তোলে বলল,
“ আগামীকাল আমাদের বাড়িতে গেলে আমি আর ফিরেই আসবো না এখানে। আপনি থাইকেন সুখে। ”
“ ওকে। ”
গা ছাড়া ভাব নিয়ে উত্তর করল সাদিক। রাগে, দুঃখে, অপমানে এবার কান্না পেলো আনিকার। তবে সে কাঁদবে না এই বদমাইশ লোকের সামনে। কান্না লোকাতে দ্রুত পায়ে রুম ছাড়তে নিলে তাকে থামিয়ে দিলো সাদিক। হেচকা টানে আনিকাকে একদম কাছে নিয়ে এলো নিজের। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“ তুমি ফিরে না আসলে তোমাদের ওখানেই ঘর জামাই থেকে সুখে সংসার করবো। তাই তুমি ফিরে না আসলেও চলবে। ”
বলেই কোলে তোলে নিলো আনিকাকে। বউকে বুকে নিয়ে বিছানায় শুতে নিবে তখনই খাটের মাথায় বারি খেয়ে ব্যাথায় চোখ মুখ বুঁজে ফেলল সাদিক। সাথে সাথেই মৃদু আর্তনাদ করে উঠল আনিকা। বলল,
“ ব্যাথা পেয়েছেন.? ”
“ নারে বউ, অনেক আরাম পাইছি। ”
এমন মুহূর্তেও ত্যাড়া কথা গেল না তার। অন্যসময় হলে রেগে যেত আনিকা এবেলায় তার কথায় হেসে ফেলল। তাকে হাসতে দেখে চোখ ছোটো ছোটো হয়ে গেল সাদিকের বলল,
” খুব হাসি পাচ্ছে না? ”
“ নাহ, খুব কান্না পাচ্ছে। তবে চোখে পানি আসছে না। ”
বলেই সাদিকের মাথা ডলতে ডলতেই হাসতে লাগল। সাদিকও হেসে দিল তার কান্ডে। প্রতিবারের মতোই ঝগড়া শেষে হাসি টাই বজায় রইল তাদের মুখে।
ড্রয়িং রুম জুড়ে শোরগোল পড়ে আছে। নিরবকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সকল সদস্য। সবার ভিড়ে নিরব কাঙ্ক্ষিত একটা মুখ দেখতে না পেয়ে কিছুটা অবাক হলো। তবে কিছু না বলে সবার প্রশ্নের উত্তর করতে লাগল। রুমে ঘামটি মেরে বসে আছে তাপসি, নিচ থেকে ভেসে আসছে সবার কন্ঠ। তন্মধ্যে একটি স্বরই প্রভাবিত করছে তাকে। সেই কণ্ঠের মালিককে কাছ থেকে দেখার বড্ডো ইচ্ছে জাগলেও তা দমিয়ে রুমের মধ্যে নিজেকে আটকে রেখেছে সে। নিরব আসতেই সাহেরা বেগম তাকে ডেকেছিল তবে সে নিচে যায়নি, উপর থেকেই দরজার ফাঁক দিয়ে এক নজর দেখেছে সেই মানুষটিকে। সবার একই ঘ্যান ঘ্যান শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে নিরব। নাসির সরকার বোধ হয় ছেলের বিরক্তিটা বুঝতে পারলেন। তিনি নিজের স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন,
“ পরে কথা বলো, এখন ওঁকে রুমে যেতে দাও। ফ্রেশ হওয়া দরকার। ”
“ আচ্ছা যা, ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি খেতে আসিস। ”
বাবার উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা মূলক হাসি হেসে উঠে দাঁড়ালো নিরব। বড়ো বড়ো পা ফেলে এগিয়ে গেলো নিজের রুমের দিক। করিডোরে স্থির চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে তাপসি, পড়নে তার নীল রঙের হালকা কাজের জর্জেট শাড়ি। কিছুক্ষণ আগে গোসল নেওয়ায় ভেজা চুলগুলো পিঠে পড়ে আছে। নিঃশব্দে তার কাছে এগিয়ে এলো নিরব। পিছন থেকে তার উদর জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে থুতনি ঠেকিয়ে বলল,
“ কেমন আছেন মিসেস. সরকার? ”
সহসা চিরপরিচিত সেই কণ্ঠ মানবের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ছুঁয়ায় কেঁপে উঠল তাপসি, অচল হয়ে পড়লো তার মস্তিষ্কের প্রতিটা ছুটন্ত নিউরন, নির্দেশনা দিতে ভুলে বসলো তারা। তাপসিকে এমন স্ট্যাচু হয়ে থাকতে দেখে তাকে নিজের দিক ঘুরালো নিরব। ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল, “ কী হয়েছে? ” নিরুত্তর সে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে থাকা মানবের দিক। চোখের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে অশ্রুকণা, জোর করেও তাদের আটকানো যাচ্ছে না। সব কিছুই নিঘোর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করল নিরব। তারপর কিঞ্চিৎ হেসে তাপসিকে জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। ঝর ঝর করে কেঁদে দিলো তাপসি। কান্নার বেগে শরীর কাঁপছে তার, তবে মুখে কোনো শব্দ নেই।
“ এভাবে কেঁদেই যাবে, নাকি…! ”
কথার মাঝে নিরবকে থেমে যেতে দেখে মুখ তোলে তাকাল তাপসি। জিজ্ঞেস করল,
“ নাকি…? ”
“ নাকি জামাইকে একটু ভালোবাসাও দেবে? বউয়ের ভালোবাসার অভাবে দিনদিন কাঙাল হয়ে যাচ্ছে তো এই অভাগা স্বামী। ”
কানের কাছে ফিসফিস করে বলল নিরব। লজ্জায় নুইয়ে পরল তাপসি। নিরবের বুকেই মুখ লুকিয়ে বলল,
“ আপনাকে নাগাল পাবো না আমি। ”
হেসে ফেললো নিরব। দুহাতে তাপসির কোমড় জড়িয়ে নিজের মুখ বরাবর তোলে আনল তাকে। তৎক্ষনাৎ নিরবের পুরো মুখ নিজের ভালোবাসার ছুঁয়ায় রাঙিয়ে দিলো সে। পরপর স্বামীর পাল্টা ভালোবাসায় রেঙে উঠল নিজেও। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষের ভালোবাসা পেয়ে তার মাঝে হারিয়ে ফেলল নিজেকে।
এহসান ভবন,
ড্রয়িং রুমের সোফায় ডজন ডজন পুতুল নিয়ে বসে আছেন নাজিয়া বেগম। তার সামনে বসে থাকা আঠারো মাসের শিশুটি একটা একটা করে পুতুল রাখছে তার কাছে। এখনি রাখছে আবার এখনি নিয়ে নিচ্ছে- এভাবেই তার সাথে খেলে হেসে কুটিকুটি খাচ্ছে শিশুটি। নাতনির কান্ডে ভদ্রহিলা নিজেও হেসে যাচ্ছেন অনবরত।
“ বাবা আসচে না কেন, দাদি? ”
পুতুল রেখে সোফায় গা এলিয়ে মন খারাপ করে বলল “ অবন্তিকা এহসান অহি “। তাকে মন খারাপ করতে দেখে পুতুলগুলো সাইডে রেখে তাকে কোলে তুলে নিলেন নাজিয়া বেগম। বললেন,
“ বাবা এক্ষুনি এসে পড়বে। তুমি দাদির সাথে খেলো। ”
তার কথায় তেমন মন ভালো হলো না অহির। বলল,
“ খেলব না, বচে থাকি। বাবা আচবে। ”
উত্তরে কিছু বললেন না নাজিয়া বেগম। নাতনিকে কোলে নিয়ে বসে রইলেন। তিনি জানেন বাবা না আসা অব্দি এই মেয়ের মন আর ভালো হবে না।এমন বাবা পাগল মেয়ে সে আগে কখনো দেখেননি। সব মেয়েদেরই বাবার প্রতি একটু টান থাকে বেশি তবে অহির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। যেখানে সব বাচ্চাদের কথা বলা শুরু হয় “মা” শব্দের মধ্য দিয়ে, সেখান অহির বুলি ফুটেছে “বাবা” শব্দের মধ্য দিয়ে। বাবা ডাক শেখার পর অনিল তাকে মা ডাক শিখাতে গেলে বাবার সাথে মিলিয়ে মামা ডেকে উঠত সে। তাই বাধ্য হয়ে মাম্মাম ডাক শেখানো হয়েছে তাকে, প্রথম প্রথম মামাম ডাকলেও এখন মাম্মাম বলেই ডাকতে পারে।
অনিল তো মেয়ে দুনিয়াতে আসার আগেই মেয়ের জন্য পাগল ছিলো, দুনিয়াতে আসার পর মেয়ের ভালোবাসায় সেই পাগলামি আরও বেড়ে গেছে তার। আর বাড়ির সবাই শুধু মুগ্ধ নয়নে তাদের বাবা- মেয়ের ভালোবাসা দেখে। আর ব্যাচারি হীরা তো ড্যাবড্যাব করে বাবা- মেয়ের কান্ড দেখে আর ভাবে “ দশ মাস পেটে রেখে মেয়ে জন্ম দিলো সে অথচ তার কোনো পাত্তাই নেই। ” অবশ্য এই দশ মাসের প্রত্যেকটা দিন তার থেকে বেশি কষ্ট করেছে অনিল নিজেই। প্রথম প্রথম প্রেগন্যান্সির কথা শুনে কিছুটা রেগেছিল সে। রাগের প্রধান কারণ হীরার এম.বি.বি.এস পরীক্ষা। তবে পরে যেভাবে যত্ন করে রেখেছে তাকে; সে রাত জাগলে তার সাথে রাত জেগেছে, তার একটু কষ্ট হলে যেন তার থেকে বেশি অনিলই কষ্ট পেতো, একটা মিনিটের জন্যেও তার খেয়াল রাখা বাদ পড়েনি- সেসব স্মৃতি মনে পড়লেই মুখে হাসি ফুটে উঠে তার। বাবার এতো যত্নের জন্যেই হয়তো মেয়েটা এতো বাবার ভক্ত হয়েছে।
“ বাবা…..! ”
বাড়ির দরজায় অনিলের পা পরতেই প্রতিদিনের মতো সেই প্রিয় ডাকটি কর্ণপাত হলো তার। বাবাকে দেখেই দাদির কোল থেকে নেমে দৌঁড় লাগাল অহি। নূপুরের ঝনঝন শব্দ মুখরিত হলো চারিপাশ। মেয়েকে এভাবে ছুটতে দেখে অনিল বরাবরের মতোই সতর্ক বাণী ছুঁড়ল,
“ বাবা ধীরে আসো। ”
বাবার আদেশে পায়ের গতি কমিয়ে দিল অহি। বাবা যা বলে তাই অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে সে।পা টিপে টিপে এগোতে লাগল সে। মেয়ের কান্ড দেখে হাসল অনিল, বড়ো বড়ো পায়ে এগিয়ে এসে কোলে তুলে নিলো মেয়েকে।
“ বাবাকে পেয়ে এখন তো দাদি কে ভুলেই যাবে। ”
“ না, ভুলবো না। তকালে ( সকালে) আবাল তোমাল কাচে আচবো। একন বাবা যাই, কেমন? ”
বাবার কোল থেকেই উত্তর করল অহি। নাতনির কথায় হাসলেন নাজিয়া বেগম। বললেন,
“ আচ্ছা, যাও। ”
সিঁড়ি বেয়ে মেয়েকে নিয়ে উঠছে অনিল। এর মাঝেই অহি মৃদু স্বরে বলল,
“ বাবা, লিটল মাম্মম কত্ত পেয়েচে। লাগ কলেচে কুব। ”
হীরাকে লিটল মাম্মা বলে ডাকে সে। অনিল যখন তাকে কোলে নেয় তখন মায়ের থেকে সে অনেক বড়ো হয়ে যায়। আর এটার থেকেই বাবার থেকে শেখা পিচ্ছি শব্দ ব্যাবহার করে হীরাকে পিচ্চি মাম্মাম নাম দিয়েছে সে। আর পিচ্চি মাম্মামকেই ইংলিশে লিটল মাম্মাম বলে সে। পিচ্ছি বলতে মুখে আটকায় দেখে অনিলই লিটল মাম্মাম বলা শিখিয়েছে তাকে।
মেয়ের কথায় তার চুলগুলো ঠিক করে দিতে দিতে অনিল প্রশ্ন করল,
“ কেন বাবা? ”
“ আমি পলে গিয়েচি বলে- তুমি মাম্মামকে বকা দিয়েচিলে তাই। তুমি আর লিটল মাম্মামকে বকো না কেমন? ”
ঘাড় কাত করে বাবার সম্মতি চাইল অহি। মেয়ের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে অনিল বাধ্য বাবার মতো উত্তর করল,
“ ডান মাই প্রিন্সেস, তোমার বাবা তার লিটল মাম্মাম কে আর কখনো বকা দিবে না। এখনই সে তোমার মাম্মামের সকল কষ্ট মুছে দিবে। এরপর থেকে শুধু ভালোবাসবে। ওকে..? ”
“ ওকে। ”
রুমের সামনে এসে থামল অনিল। বাবাকে থামতে দেখে অহি প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো। মেয়ের দৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে অনিল বলল,
“ আগে তোমার মাম্মাম থেকে অনুমতি নিতে হবে। কেউ রাগ করলে তার অনুমতি নিয়ে রুমে প্রবেশ করতে হয়। ”
“ বুঝেচি। ”
বলেই মায়ের উদ্দেশ্যে মিষ্টি স্বরে হাঁক ছাড়ল সে,
“ লিটল মাম্মা, অনুমতি দাও। ”
মেয়ের কথায় শব্দ করে হেসে ফেলল অনিল। বলল,
“ এভাবে না বাবা, বলো “লিটল মাম্মা আমি রুমে আসি? ”
“ তুমি আগে বলো, তালপল আমি বলবো। ”
“ লিটল এঞ্জেল,আমরা কী রুমে আসবো? ”
বাবার কথা কপি করে অহি বলে উঠল,
“ লিটল এঞ্জেল…. ”
“ এঞ্জেল না বাবা, মাম্মাম বলো। ”
“ তুমি যে এঞ্জেল বললে? ”
“ বাবার লিটল এঞ্জেল আর তোমার লিটল মাম্মাম। ”
“ ওকে, লিটল মাম্মাম আমলা কী লুমে আচবো? ”
বাবা- মেয়ের কথা শুনে রুমে বসে হাসছে হীরা। তবে কোনো উত্তর করল না। আজকে বাবা- মেয়ে কারো সাথেই তার কথা নেই। আসলে হয়েছে কি, প্রতিদিনের অভ্যাস মোতাবেক খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছিল হীরা। মায়ের সাথে সাথে অহিও উঠে পড়েছিল। আর অনিল ছিলো ঘুমে। মেয়েকে বাবার সাথে শুয়ে থাকতে বলে সে ওয়াশরুমে চলে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পরেই মেয়ের চিৎকার ভেসে আসল তার কানে। তড়িঘড়ি করে ভেজা গায়েই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখল, মেয়ে তার বিছানা থেকে নামতে নিয়ে পড়ে গিয়ে মাথা ফুলিয়ে ফেলেছে।এতেই হীরাকে ধমকিয়েছে অনিল। আর সেটা নিয়েই সারাদিন গোমড়া মুখ করে ছিলো সে। মেয়ের সাথেও ঠিকমতো কথা বলেনি সে। শুধু সময় করে খাইয়ে দিয়েছে।
“ তোমার মাম্মাম তো অনুমতি দিবে না। ”
মুখে আঁধার নেমে এলো অহির। বলল,
“ লিটল মাম্মাম আমি আল তোমাল কথা না চুনে বিচানা থেকে নামবো না। ”
“ সারাদিন রুমে টইটই করে এখন অনুমতি নেওয়া হচ্ছে! ”
মায়ের উত্তর শুনে বাবার দিক তাকাল অহি। অনিল ফিসফিস করে শিখিয়ে দিলো,
“ বলো মাম্মাম আমার খিদে পেয়েছে। ”
তার কথা মতোই অহি বলল,
“ মাম্মাম বাবার খিদে পেয়েছে। ”
জিভ কাটল অনিল। ওপাশ থেকে হীরার উত্তর আসল,
“ তোমার বাবাকে কী আমি খেতে নিষেধ করেছি! ”
নাহ, অনুমতি নিয়ে রুমে ঢুকতে চাইলে আজকে আর রুমে ঢুকা হবে না তাদের। তাই এবার বাধ্য হয়ে অনুমতি ছাড়াই রুমে ঢুকলো বাবা- মেয়ে। হীরার নিকট এগিয়ে এসে অহিকে তার কোলে বসিয়ে দিলো অনিল। সোফায় বসে ছিলো হীরা, মেয়েকে আগলে নিয়ে অনিলের বিপরীত দিক ঘুরতে নিবে তার আগেই মা- মেয়ে সমেত তাদের কোলে তোলে নিলো অনিল। আচমকা অনিলের এহেন কান্ডে ভরকে গেলো হীরা। মেয়েকে ধরল শক্ত করে। বাবা মেয়ের আগের প্ল্যান হওয়ায় বাবার কথামতো মাকে আগে থেকেই শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে অহি। সে মায়ের দিক তাকিয়ে অনুতাপের স্বরে বলল,
“ সুরি লিটল মাম্মা। ”
পরপরই অনিল মাথা নিচু করে হীরার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“ স্যরি, আমার প্রিন্সেসের লিটল মাম্মাম অ্যান্ড মাই লিটল এঞ্জেল। ”
“ আমি এখন ছোটো নই। ”
“ তুমি আমার কাছে চিরজীবনই আমার লিটল এঞ্জেল ছিলে, আছো, থাকবে। বড়ো তুমি বাইরের দুনিয়ার কাছে আমার দুনিয়ায় তুমি আমার বুক পাঁজরে লুকিয়ে থাকা অবুঝপাখি, অনিল এহসানের পিচ্ছিপরী। ”
বলেই হীরার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ালো সে। পরপর হীরার বুকে মিশে থাকা নিজের মেয়ের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ালো।
নিত্যদিনের মতোই ধরণীতে সূচিত হলো একটা নতুন দিনের। আজকের এই দিনটি এহসান ভবনের প্রতিটি সদস্যদের কাছে একটা অপেক্ষিত দিন। আজ প্রায় দেড় বছরের ফলস্বরূপ অনিল তার নিজস্ব হসপিটাল খুলতে যাচ্ছে। সেটার উদ্বোনের উপলক্ষে আজকে ছোটখাটো একটা আয়োজনের ব্যাবস্থা করা হয়েছে অনিলদের বাড়িতে। খুশির খবর হচ্ছে আজকে পাক্কা পাঁচ বছর পর সরকার বাড়ির অর্থাৎ নিরবদের বাড়ির সকলে আসছে এ বাড়িতে। এতদিন মাঝে মাঝে বোনের সাথে কথা হলেও আগের মতো সম্পর্ক ঠিক হয়নি তাদের। গতকাল রাতেই নিরবকে কল করে আসার জন্য রিকোয়েস্ট করেছে অনিল, নিরব কোনো দেনামুনা ছাড়াই জানিয়েছে তারা আসছে। সেই আগের ঘটনা নিয়ে কারোরি এখন আর মাথা ব্যাথা নেই। মূল কথা হলো যেখানে আনিকা তার ভালোবাসা বা বিয়ের ব্যাপারে কিছুই জানতো না সেখানে এটা নিয়ে অভিমান করার কোনো কারণই নেই। সেই তো নিষেধ করেছিল আনিকাকে কিছু বলতে।ভাগ্যে যা ছিলো তাই হয়েছে। এখন সবাই নিজেদের নতুন জীবন নিয়ে ব্যাস্ত, অতীত নিয়ে পড়ে থাকার কোনো মানে হয়না।
ধীরে ধীরে মানুষ দিয়ে ভরপুর হয়ে উঠছে পুরো বাড়ি। হসপিটালে জয়েনকৃত সকল জুনিয়র, সিনিয়র ডাক্তার, হীরাদের বাড়ির সকল সদস্য তারপর এক সময় নিরবরাও চলে এলো। সকলের সাথে কুশল বিনিময়ের পর্ব শেষ করে খাওয়ায় দাওয়ার পর্বে অংশগ্রহণ করল সবাই। এরপর বিশ্রাম নিয়ে সকলে চললো হসপিটালের উদ্দেশ্যে।
সদ্য তৈরি হওয়া একটা দশতলা ভবনের সামনে গাড়ি থামল সবার। ভবনের নেমপ্লেটো খুদাই করে লেখা “ অহি “। অনিল ও হীরার নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে সৃষ্ট “ অহি ” নামটির মাঝেই সুপ্ত আছে পুরো একটা পরিবারের নাম। গাড়ি থেকে নেমেই অনিল হীরার থেকে মেয়েকে নিলো। বাবাকে পেয়ে তার কোলে লাফ দিয়ে উঠে গেলো সে। এতক্ষন অনিল ড্রাইভিং করছিল বিদায় মায়ের কাছে ছিলো সে।
ভবনটির গেটের সামনে একটা লাল রঙ্গা ফিতা টানানো। সেটার নিকট এগিয়ে গেলো তারা। অতঃপর তিনটি হাতের মাধ্যমে কাটা হলো সেই ফিতাটি। চারপাশে মুখরিত হলো শুভেচ্ছা বাণী। পুরো পরিবার ও গেস্ট দের নিয়ে এক পর্যায়ে ভবনটিতে প্রবেশ করলো অনিল। সকল ডাক্তারদের মতো হীরার গায়েও ডাক্তারি অ্যাপ্রন। সে এখন একজন এমবিবিএস ডাক্তার। মা- বাবার গায়ে একই পোশাক দেখে অহি বলল,
“ লিটল মাম্মামকে বাবার মতো লাগচে। চুন্দল চুন্দল পোচাক চুন্দল চুন্দল বাবা- মাম্মাম। ”
মেয়ের কথায় হেসে উঠল অনিল ও হীরা। হেসে ফেললো আশেপাশে থাকা সকলেই।তাদের এমন সুন্দর বন্ধন দেখে এবার আর মনের মধ্যে থাকা প্রশ্নটা দমিয়ে রাখতে পারল না অন্য ডাক্তারগুলো। একজন মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করেই ফেলল,
“ স্যার, আপনাদের লাভ ম্যারেজ নাকি অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ? ”
প্রশ্ন শুনে হাসি থামল অনিলের। প্রশ্নকর্তার দিক তাকিয়ে মুচকি হাসল সে। পরপর হীরার দিক তাকিয়ে ভরাট স্বরে বলে উঠলো,
“ বোথ আর নট,
ও আমার জীবনে ধেয়ে আসা সেই অকস্মাৎ প্রণয়
যার উপস্থিতিতে ভালোবাসার খাতায় নাম লিখিয়েছে আমি নামক এই গম্ভীর তনয়…!( পুরুষ) ”
সকলেই অবাক নয়নে তাকাল অনিলের দিক। বিস্ময় নিয়ে উচ্চারণ করল “ অকস্মাৎ প্রণয়! ” তবে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না তারা। মনের মাঝে হাজার প্রশ্ন উকি দিলেও অন্যের পার্সোনাল জীবন নিয়ে প্রশ্ন করতে ইচ্ছুক হলো না । এইদিকে সবার মুখে অকস্মাৎ প্রণয় শব্দটা শুনে সেটা মাথায় গেঁথে গেল অহির। সে ছোটো ঠোঁট নাড়িয়ে আওড়াল,
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৯
“ অকচাৎ পলণয় ( অকস্মাৎ প্রণয়)!”
“ ইয়াহ মাই প্রিন্সেস। ”
হীরার হাত ধরে নিজেদের কেবিনের দিক এগিয়ে যেতে যেতে মেয়ের কথার উত্তর করল অনিল। বাবা- মেয়ের কান্ড দেখে হাসল হীরা। মা- বাবাকে হাসতে দেখে উৎসাহ পেলো অহি। আবারও তার মিষ্টি স্বরে ধ্বনিত হলো একই শব্দ, যা চারদেয়ালের মাঝে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল বারংবার
“ অকস্মাৎ প্রণয়..! ”
