Home অগ্নিশিখার অন্তরালে অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ২

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ২

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ২
YASH

ছেলেটি নাকে প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে ব্যথায় ককিয়ে উঠলো দুই হাত দিয়ে নাক চেপে ধরলো। ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্লাসরুমে প্রবেশ করলেন তাদের ক্লাস টিচার। ক্লাসের এমন বিশৃঙ্খলা এবং মারামারি দেখে উনার কপাল কুঁচকে গেলো। উনি অত্যন্ত রেগে গিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন
“কী হচ্ছে এখানে? ক্লাসরুম কি মারামারি করার জায়গা?”
ইয়াশের কাছে মার খাওয়া ছেলেটি তখন প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় শিক্ষকের কাছে গিয়ে নালিশ জানালো,
“স্যার, আমি জাস্ট ওর পিচ্চি বোনটাকে একটু আদর করে কোলে নিতে চেয়েছিলাম। আর ও কোনো কথা না বলেই আমাকে এভাবে মারলো!”

শিক্ষক ইয়াশের দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বললেন,
“ইয়াশ, তুমি এমন বেয়াদবি করে একদম ঠিক করোনি। চলো প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে। সব কিছুর একটা সীমা থাকা উচিত।”
ইয়াশ চুপ করে রইলো, ও এক হাত দিয়ে কেয়ারাকে কোলে তুলে নিলো। তারপর গা-ছাড়া ভাব নিয়ে শান্ত পায়ে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো।
৪ বছরের কেয়ারা ইয়াশের গলা জড়িয়ে ধরে বড় বড় চোখ করে চারপাশ দেখছে, সে বুঝতেই পারছে না আসলে কী হচ্ছে।
প্রিন্সিপাল স্যার তখন টেবিলে ঝুঁকে কিছু জরুরি কাজ করছিলেন। ক্লাস টিচার রুমে ঢুকে পুরো ঘটনাটি বিস্তারিত উনাকে খুলে বললেন। সব শুনে প্রিন্সিপাল স্যার আর দেরি না করে সরাসরি ইয়াশের বাবা আদিল মির্জাকে ফোন দিয়ে স্কুলে আসার অনুরোধ করলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আদিল মির্জা হন্তদন্ত হয়ে প্রিন্সিপালের রুমে এসে হাজির হলেন। তিনি কিছুতেই মাথায় মেলাতে পারছেন না, মাত্র কয়েক মিনিট আগে যে ছেলেকে স্কুলের গেটে নামিয়ে দিয়ে গেলেন, সে এতটুকু সময়ের মধ্যে কীভাবে এমন ঝামেলা পাকিয়ে ফেললো!

আদিল মির্জা ইয়াশের দিকে তাকিয়ে কিছুটা হতাশ এবং ক্ষুব্ধ গলায় বললেন, “এসব কী শুনছি ইয়াশ? এটা কেমন বেয়াদবি! তুমি স্কুলে এসে মারামারি করেছ কেন? আমি কি তোমাকে এই শিক্ষা দিয়েছি?”
ইয়াশ গম্ভীর মুখ করে সোজা বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো, “আমি নিজে থেকে ওকে মারতে যাইনি পাপা, ওকে বারণ করার পরেও ও জোর করে কেয়ারাকে কোলে নিতে আসছিল। তাই মেরেছি।”
ইয়াশের মুখে এমন যুক্তি শুনে প্রিন্সিপাল স্যার এবার বেশ রেগে গেলেন। তিনি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
“কেয়ারা যেমন তোমার বোন, ও তো এই স্কুলেরই একটা ছাত্র। ও নাহয় বোন ভেবে একটু কোলে নিতেই চেয়েছিল, তাতেই তুমি এভাবে হাত তুলবে? মিস্টার মির্জা, আপনার ছেলেকে একটু বোঝান।”
পরিস্থিতি শান্ত করতে আদিল মির্জা নরম সুরে প্রিন্সিপালকে বললেন, “অত্যন্ত দুঃখিত, স্যার। ইয়াশ আর কখনো এমন আচরণ করবে না। ওর এই ভুলের জন্য ওর বাবা হয়ে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।”
প্রিন্সিপাল স্যারও আর কথা বাড়ালেন না। তিনি ইয়াশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আচ্ছা ইয়াশ, এবার ক্লাসরুমে যাও। আর কখনো যেন এমন মারপিটের ঘটনা না শুনি, বাবা।”

ইয়াশ মাথা নিচু করে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ালো। তবে যাওয়ার আগে সে আলতো করে কেয়ারাকে আদিল মির্জার কোলে তুলে দিল। কেয়ারা উনার কোলে গিয়েও ইয়াশের চলে যাওয়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। আর ইয়াশ নিজের ক্লাসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ভাবলো যে যাই বলুক, কেয়ারাকে অন্য কেউ স্পর্শ করবে, এটা সে কিছুতেই সহ্য করবে না।
ইয়াশ ক্লাস রুমের দিকে চলে যাওয়ার পর, আদিল মির্জা কেয়ারাকে কোলে নিয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে আসলেন। করিডোর দিয়ে হেঁটে মাঠের দিকে আসতেই কেয়ারা আদিল মির্জার গলা জড়িয়ে ধরে আধো-আধো গলায় নালিশ করতে শুরু করলো। চোখ-মুখ কুঁচকে ইয়াশের বিচার দিয়ে সে বললো “বাপি, ভাইয়া না ওই পঁচা ছেলেতাকে দিসুম দুসুম তরে মেরেচে!”

কেয়ারার মুখে এমন আদুরে ভাষায় মারামারির বিবরণ শুনে আদিল মির্জা নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। তিনি কেয়ারার লালচে গালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে হালকা হেসে বললেন,
“তাই নাকি মা? তার মানে তোমার ভাইয়া খুব পঁচা, তাই না?”
কেয়ারা কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে কী যেন ভাবলো। তারপর ইয়াশের প্রতি তার সব রাগ ভুলে গিয়ে নিজের ছোট্ট হাতের আঙুল দিয়ে একটুখানি জায়গা দেখিয়ে বললো, “উঁহু, এতট্টু পঁচা!”

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ১

মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে আদিল মির্জা এবার শব্দ করে হেসে উঠলেন। যে ইয়াশকে নিয়ে তিনি একটু আগে চিন্তিত ছিলেন, কেয়ারার এই মিষ্টি কথায় তার মনটা একদম হালকা হয়ে গেল। তিনি কেয়ারাকে আরও শক্ত করে কোলে জড়িয়ে ধরে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। এরপর আর দেরি না করে ওকে নিয়ে সোজা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৩