ইনায়া আসার পর দেখতে দেখতে বেশ অনেকটা সময় কেটে গেছে। দুই বোন একসাথে বসে গল্প করতে করতে দুপুরের খাওয়া-দাওয়াও শেষ করেছে । কিন্তু ঘড়ির কাঁটা যতই এগোচ্ছে, ইনায়ার মনটা ততই খচখচ করতে লাগল
কারণ ইয়াশ এখনো বাড়ি ফিরছে না।
কিয়ারা ইতিমধ্যে ইয়াশকে বেশ কয়েকবার ফোন করে ফেলেছে। কিন্তু ওপাশ থেকে ফোনটা কেবল বেজেই যাচ্ছে, ইয়াশ কল ধরছে না। এবার কিয়ারার নিজের বুকেও একটা অজানা ভয় আর টেনশন দানা বাঁধতে শুরু করল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ছ্যাৎ করে উঠছে। কী হচ্ছে আসলে? ইয়াশ কেন ফোন ধরছে না? এমন তো কখনো করে না। তাহলে রাস্তায় কোনো বিপদ-আপদ হলো না তো?
বোনের মুখের ওমন ফ্যাকাশে ভাব দেখে ইনায়া ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল,
“আরে বুনু, তুই এত টেনশন করিস না তো। হয়তো ফোনটা সাইলেন্ট করা আছে, কিংবা রেস্টুরেন্টে এখন কাস্টমারের খুব চাপ, তাই কাজের ব্যস্ততায় ফোনের কাছে নেই। একটু পর ঠিকই ব্যাক করবে।”
তাও কিয়ারার মন কিছুতেই মানছে না কোথাও একটা খারাপ লাগা কাজ করছে তবু । সে ফোনটা হাতে নিয়ে পায়চারি করতে লাগল। এদিকে ইনায়ারও একটা দরকারি কাজ পড়ে গেছে, ওকে এখনই বের হতে হবে। কিন্তু বোনকে এই অবস্থায় একা ফেলে রেখে যেতেও ওর পা সরছে না। ওপাশে ইয়াশের ফোনও ঢুকছে না। কিয়ারার মনটা একটু হালকা করার জন্য আর ওর মনোযোগটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য ইনায়া হুট করেই হেসে উঠে বলল,
“আচ্ছা কিয়ারা, তুই জানিস ছোটবেলায় ইয়াশ একটা কী কাণ্ড করেছিল?”
কিয়ারা অস্থির চোখে বোনের দিকে তাকিয়ে মলিন গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী করেছিল?”
ইনায়া বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলতে শুরু করল, “এটা আমি বাপির মুখে শুনেছিলাম। যেদিন তুই জন্মালি, তোর জন্মের ঠিক দুই ঘণ্টা পর ইয়াশ হসপিটালে যায়। তখন ও তো একদম পিচ্চি। ও নাকি তোকে প্রথমবার কোলে নিয়ে সোজা ছোট আম্মুর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলেছিল
‘ছোট আম্মু, এই বাবুটা এতদিন কোথায় ছিল? আমি বড় হয়ে ওকে বিয়ে করব!’
কথাটা শেষ করেই ইনায়া খিলখিল করে হেসে দিল। কিন্তু কিয়ারার মুখে কোনো হাসির রেখা ফুটল না, সে একদম চুপ করে রইল। এই মুহূর্তে এই সমস্ত পুরনো প্রেমের গল্প শোনার মতো মানসিকতা ওর নেই
পুরো মনটা শুধু একরাশ দুশ্চিন্তায় ডুবে আছে। একই সাথে ওর ইয়াশের ওপর প্রচণ্ড রাগও হতে লাগল। মনে মনে ভাবল, একটা মানুষের কি ন্যূনতম কমন সেন্সটুকুও নেই? কেউ একজন যে ওপাশ থেকে এভাবে ব্যাকুল হয়ে এতবার কল করছে, অন্তত একবারের জন্য ফোনটা রিসিভ করে তো বলা যায় যে সে ব্যস্ত আছে! কিয়ারা কি এখন ওর সাথে পিরিত মারানোর জন্য ফোন দিচ্ছে নাকি? আসুক আজকে বাড়ি, ওর এই কাণ্ডজ্ঞানের একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই কিয়ারার হাতের ফোনটা সজোরে কেঁপে উঠে চেনা রিংটোনে বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখল ইয়াশ নামটা জ্বলজ্বল করছে। কিয়ারা আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে কলটা রিসিভ করেই একদম ঝাঁঝালো গলায় বলতে শুরু করল, “কী ব্যাপার আপনার? ফোনটা ধরতে কি হাতি-ঘোড়া লাগে? ব্যস্ত আছেন ভালো কথা, অন্তত দুই সেকেন্ডের জন্য কলটা রিসিভ করে বলতে তো পারতেন যে আপনি ব্যস্ত আছেন!”
কিয়ারার এই অনর্গল বকুনির জবাবে ওপাশ থেকে ইয়াশের খুব শান্ত আর ক্লান্ত একটা গলার আওয়াজ ভেসে এলো। সে একটু লজ্জিত সুরে বলল, “আই অ্যাম রিয়ালি সরি বাটারফ্লাই! বিশ্বাস করো, আমি এতক্ষণ ফোনের ধারের কাছে ছিলাম না। রাগ কোরো না, তোমার জন্য একটা দারুণ সুখবর আছে।”
সুখবর শব্দটা শুনতেই কিয়ারার ভেতরের সমস্ত রাগ আর টেনশন এক পলকে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ও মুখে হাত দিয়ে ঠোঁটের কোণে চওড়া হাসি ফুটিয়ে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী সুখবর? জলদি বলুন!”
ওপাশ থেকে ইয়াশ বেশ তৃপ্তির সাথে এক বুক নিশ্বাস ফেলে বলল, “আমি চাকরি পেয়ে গেছি বাটারফ্লাই! অবশেষে আমাদের কষ্টের দিন শেষ হতে চলেছে।”
চাকরি পাওয়ার কথা শুনে কিয়ারা খুশিতে একদম আত্মহারা হয়ে গেল। আনন্দের আতিশয্যে ও যে ইয়াশকে জিজ্ঞেস করবে চাকরিটা আসলে কিসের, সেই কথাটাই ওর মাথা থেকে পুরোপুরি গায়েব হয়ে গেল। ও চোখ বন্ধ করে মনে মনে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে কাঁপানো গলায় বলল, “আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ! আমি জানতাম আপনি পারবেন। আজকে একদম দেরি করবেন না, বাসায় খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবেন কিন্তু!”
ইয়াশ ওপাশ থেকে মৃদু হেসে বলল, “আচ্ছা, আমি কাজ গুছিয়েই রওনা দিচ্ছি।”
ফোনটা কেটে কিয়ারা যখন আনন্দের জোয়ারে ভাসছে, তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়া ওর এই হুট করে বদলে যাওয়া চেহারার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে রে কিয়ারা? ওপাশ থেকে জামাই কী বলল যে তুই এক নিমেষেই খুশিতে গদগদ হয়ে গেলি?”
কিয়ারা ফোনের ওপার থেকে ইয়াশের কথা শুনে খুশিতে নাচতে নাচতে বলল, “ও চাকরি পেয়ে গেছে আপ্পি!”
ইনায়াও আনন্দ ধরে রাখতে পারল না, ও হাততালি দিয়ে বলল, “কী বলিস? আলহামদুলিল্লাহ! তা… কিসের চাকরি হয়েছে রে?”
কিয়ারা তখন দাঁত দিয়ে নিজের জিব কামড়ে ধরল। চোখ দুটো গোল গোল করে বলল, “আরে! আমি তো খুশির চোটে কিসের চাকরি সেটাই জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি! দাঁড়াও, আবার কল দিয়ে শুনি।”
ইনায়া হেসে ওর হাতটা চেপে ধরে বলল, “থাক, এখন আর ওকে ডিস্টার্ব করতে হবে না। ও বাসায় ফিরলে একবারে সারপ্রাইজ হিসেবেই শুনিস।”
এই বলে ইনায়া দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। ওর যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আচ্ছা রে বাবু, এবার আমাকে বের হতে হবে। একটা দরকারি কাজ আছে। পরে আবার আসব।”
কিয়ারা এক নিমেষে মুখটা ছোট করে ফেলল। একদম নিষ্পাপ বাচ্চাদের মতো ও মন খারাপ করে বলল, “এত তাড়াতাড়ি চলে যাবা আপ্পি?”
বোনের ওই মায়াবী আর করুণ মুখটা দেখে ইনায়ার খুব মায়া হলো। ও কিয়ারার গাল দুটো টেনে দিয়ে বলল, “যেতেই হবে রে পাগলী। আমি আবার খুব জলদি আসব, প্রমিজ।”
কিয়ারা অগত্যা একটু হাসল। তারপর ইনায়াকে দরজা পর্যন্ত গিয়ে বিদায় দিয়ে এলো। বড় বোন চলে যাওয়ার পর কিয়ারার ঘরের ভেতরের একাকীত্ব উধাও হয়ে গেল এক অজানা আনন্দে। আজ ইয়াশের এত বড় একটা খুশির দিন, ও কি যেমন তেমন ভাবে বরের সামনে যাবে? ও আলমারি খুলে ওর সবচেয়ে সুন্দর লাল রঙের শাড়িটা বের করে পরে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে একটু গাঢ় করে কাজল আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক দিল। কপালে পরল একটা ছোট্ট লাল টিপ। প্রথমে চুলগুলো হাত দিয়ে পেঁচিয়ে একটা খোপা করতে চাইল, কিন্তু পরে কী ভেবে চুলগুলো পিঠের ওপর ছেড়ে দিল। আয়নায় নিজেকে দেখে ওর নিজেরই মনে হলো, ওকে একদম নতুন বউয়ের মতো লাগছে। খুশিতে বেচারি কী করবে, কীভাবে ঘর সাজাবে, কিছুই মাথায় আসছিল না।
হঠাৎ ওর মনে হলো, এত বড় খুশির একটা দিনে মুখ মিষ্টি না করলে তো একদমই চলে না! ও ঘরের কোণে থাকা টেবিলের কাছে গেল। সেখানে একটা মাটির ব্যাংক রাখা ছিল, যেখানে ও গত কয়েক মাস ধরে সংসারের খরচ বাঁচিয়ে অল্প অল্প করে কিছু টাকা জমিয়েছিল। ও একটা ছোট পাথর দিয়ে মাটির ব্যাংকটা ঠাস করে ভেঙে ফেলল। খিলখিল করে জমানো টাকাগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। সেখান থেকে ঘরের প্রয়োজনের জন্য কিছু টাকা আলাদা রেখে, বাকি টাকাগুলো হাতে নিল
আজ ও ইয়াশের জন্য নিজের জমানো টাকায় মিষ্টি কিনবে।টাকাগুলো আঁচলে বেঁধে কিয়ারা ঘর থেকে বের হয়ে গেল। ততক্ষণে বিকেল হয়ে এসেছে। আকাশে মিষ্টি তামাটে রোদ, কিন্তু রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম আর মানুষের ভিড়। এই ঘিঞ্জি আর ব্যস্ত রাস্তার মাঝখান দিয়ে যখন লাল শাড়ি পরা কিয়ারা হেঁটে যাচ্ছিল, তখন আশেপাশের পথচারীরা সবাই ওর দিকে হা করে তাকিয়ে দেখছিল। খোলা চুলে, লাল শাড়িতে মেয়েটাকে আজ অপ্সরার মতো সুন্দর লাগছিল। আর ওর নিজের মুখ থেকেও যেন এক চিলতে মিষ্টি হাসি কোনোভাবেই সরছিল না।
ও একটা বড় মিষ্টির দোকান থেকে ইয়াশের পছন্দের মিষ্টি কিনে প্যাকেটে ভরল। দোকান থেকে বের হয়ে যেই না ও বাসার দিকে ফিরতি পথ ধরবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা অচেনা কুটিল কণ্ঠস্বর বলে উঠল,
“হেই বেবিবার্ড!”
কিয়ারা চমকে উঠে পেছনে তাকাতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা কালো রঙের স্পিডি গাড়ি তীব্র গতিতে এসে ওকে সজোরে ধাক্কা দিল। ধাক্কা খাওয়ার সাথে সাথে মিষ্টির প্যাকেটটা হাত থেকে ছিটকে ধুলোয় পড়ে গেল। কিয়ারার চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা এক সেকেন্ডে ওলটপালট হয়ে গেল। ও শুধু চোখের সামনে ঘন অন্ধকার দেখতে পেল। নিমিষেই ওর দুটো চোখ বন্ধ হয়ে এলো এবং ও রাস্তার শক্ত পিচের ওপর রক্তাভ শরীরে লুটিয়ে পড়ল। চেতনা হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তে, দূর থেকে একটা অস্পষ্ট গলার আওয়াজ ওর কানে বাড়ি খেল। কেউ একজন যেন পাগলের মতো চিৎকার করে উন্মাদের মতো বলছে, “আমার বার্ড এক্সিডেন্ট করেছে! ওকে এখনই গাড়িতে তোলো, হসপিটালে নিয়ে চলো!”
এরপর কিয়ারার আর কিছুই মনে নেই, চারপাশটা সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
