অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৫
YASH
কেয়ারা এবার ব্যথার চোটে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। তার সেই কান্নায় ইয়াশের ভেতরের পাথর শক্ত মনটা যেন এক নিমেষেই চুরমার হয়ে গেল। কেয়ারাকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল। ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিজের ব্যাকুল হয়ে বললো, “কাঁদে না বাটারফ্লাই! কিচ্ছু হয় নি তো। আমি অনেক মারবো ওই বেডকে প্রমিজ করছি। তুমি প্লিজ কেঁদো না।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই ঝড়ের গতিতে ঘরের ভেতর ছুটে আসলো কেয়ারার বোন ইনায়া। কেয়ারার ওই হাউমাউ করে কান্নার আওয়াজ পেয়ে ইনায়ার আত্মা কেঁপে উঠেছো। সে ঘরে ঢুকেই মেঝের ওপর বসা ইয়াশের বুকে কেয়ারাকে কাঁদতে দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। এক প্রকার দৌড়ে গিয়ে ইয়াশের বুক থেকে এক টানে কেয়ারাকে নিজের কোলে তুলে নিলো। ইনায়ার মন এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে, ইয়াশই কিছু একটা করেছে! কাল রাতেই সে কত করে কেয়ারাকে বারণ করলো এই ঘরে না আসতে, তাও এই জেদি মেয়েটা সাত সকালে এই ছেলের কাছেই চলে এসেছে।
ইনায়া কেয়ারাকে নিজের কোলের মধ্যে শক্ত করে বসিয়ে নিয়ে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কোথায় লেগেছে বুনু? ও কোথায় মেরেছে তোমাকে, দেখাও আমাকে?”
কেয়ারার কোনো উত্তর না পেয়ে ইনায়া এবার ইয়াশের দিকে তাকিয়ে চরম ক্ষোভ আর রাগ মিশিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, “তুই ওকে মেরেছিস ইয়াশ? ও তোর থেকে কত ছোট, তোর নিজের বোন হয় না? তুই এতটুকু একটা বাচ্চাকে মারলি কেন? আমি আর কোনোদিন, কোনোদিন কেয়ারাকে তোর আশেপাশেও আসতে দিবো না!”
ইয়াশ একদম চুপ করে রইলো। তার মুখে কোনো কথা নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই। সে এমন একটা নির্লিপ্ত ভান করে রইলো যেন ইনায়ার কোনো কথাই তার কান অব্দি পৌঁছায়নি। ইয়াশের পুরো মনোযোগ তখন স্থির হয়ে আছে কেয়ারার ঠোঁটেট দিকে, যেখানে মেঝের কাঠের কোণার আঘাতে চামড়াটা কেটে গিয়ে সামান্য রক্ত জমতে শুরু করেছে। ইয়াশের চোখ দুটো ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছিল।
কেয়ারা তখনো চোখ বন্ধ করে ইনায়ার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে আধো-আঁধো গলায় নালিশ করলো, “বেদ মেলেচে… (বেড মেরেছে)”
ইনায়া ঠিক বুঝতে না পেরে কেয়ারার চোখের পানি মুছে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কে মেরেছে বুনু? পরিষ্কার করে বলো।”
কেয়ারা তার ছোট্ট এক হাত দিয়ে বিছানার শক্ত কোণা আর নিচের কাঠটাকে দেখিয়ে দিল। এতক্ষণে ইনায়ার ভুল ভাঙলো। সে বুঝতে পারলো ইয়াশ তাকে মারেনি, কোনোভাবে খাট থেকে নামতে গিয়ে কেয়ারা নিজে নিজেই পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে। কিন্তু তারপরেও ইনায়ার মনের ভেতর থেকে ইয়াশের প্রতি রাগটা কমলো না। সে মনে মনে ভাবলো কেয়ারা নাহয় বাচ্চা, কিন্তু ইয়াশ তো বড়! ও কেন একটু খেয়াল রাখলো না? ও সামনে থাকতে কেয়ারা কীভাবে খাট থেকে পড়ে যায়?
ইনায়া আর কথা না বাড়িয়ে কেয়ারাকে কোলে নিয়ে হনহন করে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। পুরো ঘরটা আবার এক নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। ইনায়া চলে গেলেও ইয়াশ মেঝের ওপর ঠিক একইভাবে হাঁটু গেড়ে বসে রইলো। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেঝের ঠিক সেই জায়গাটার দিকে, যেখানে কেয়ারা একটু আগে পড়ে গিয়েছিল। ইয়াশের নিজের হাতের মুঠি দুটো তখন শক্ত হয়ে আসছিল, যেন সে নিজের ওপরই প্রচণ্ড রেগে আছে।
ইনায়া কেয়ারাকে নিজেদের ঘরে এনে ঠোঁটের কাটা জায়গায় মলম লাগিয়ে দিল। কান্নাকাটি করার কারণে কেয়ারার শরীরটা বেশ ক্লান্ত ছিল, তাই মলম লাগানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে চোখ বুজে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। বোন ঘুমিয়ে পড়তেই ইনায়া পা টিপে টিপে ঘর থেকে বের হয়ে নিচে চলে গেল।
এদিকে ইয়াশ শান্ত থাকতে পারছিল না। সে ধীর পায়ে কেয়ারার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো। দরজার আড়াল থেকে আলতো করে একটু উঁকি দিয়ে দেখলো ভেতরের পরিস্থিতি। ইয়াশের মতো ছেলের অভিধানে উঁকিঝুঁকি দেওয়ার মতো কোনো শব্দ কোনোদিন ছিল না। কিন্তু প্রসঙ্গটা যখন তার বাটারফ্লাইয়ের, তখন সে তার সব নিয়ম ভেঙে চোরের অপবাদ গায়ে মাখতে রাজি।
ঘরটা একদম ফাঁকা দেখে সে গুটিগুটি পায়ে ভেতরে ঢুকে খাটটার পাশে গিয়ে বসলো।
ঘুমে মগ্ন কেয়ারার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে ইয়াশের ভেতরের সব অস্থিরতা যেন জুড়িয়ে গেল। সে কেয়ারার মাথায় আর কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। পকেট থেকে একটা চকোলেট বের করে খুব ওর মাথার বালিশের পাশে রেখে দিল। তারপর কেয়ারার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস বললো, “তোর নিজের দোষেই তুই ব্যথাটা পেয়েছিস। এরপরে যদি আর কখনো তোকে এইসব ফালতু শাড়ি-টাড়ি পরে ঘুরঘুর করতে দেখেছি, তাহলে তোর খবর আছে বলে দিলাম!”
কথাটা বলেই সে কেয়ারার গালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে চুমু খেল। তারপর যেভাবে নিঃশব্দে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। নিজের ঘরে গিয়ে একটা ঠান্ডা পানির শাওয়ার নিয়ে সে-ও বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য চোখ দুটো বুজলো।
বিকেল বেলা…
ঘুম থেকে উঠে কেয়ারা আবার সোজা চলে এলো ইয়াশের ঘরে। ইয়াশ তখন মাত্র ঘুম থেকে উঠে আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে আয়নায় চুল ঠিক করছিল, বাইরে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল সে। কেয়ারা ভাবলো ইয়াশ বোধহয় তাকে রেখে একা একাই কোথাও ঘুরতে চলে যাচ্ছে। সে চট করে এগিয়ে গিয়ে ইয়াশের জিন্সের প্যান্টটা খামচে ধরলো। মুখটা ভীষণ গম্ভীর করে অভিমানের সুরে বললো, “ভাইয়া, আমাতে রেকে তুমি একা একা গুরতে যেও না!”
ইয়াশ আয়না থেকে চোখ সরিয়ে নিচের দিকে তাকালো। দেখলো কেয়ারা একটা নীল রঙের জামা পরে দাঁড়িয়ে আছে। নীল রঙটায় ওকে এত বেশি মায়াবী লাগছে যে ইয়াশের চোখ জোড়ো কিছুক্ষণের জন্য আটকে গেল। সব রাগ-অভিমান ভুলে ইয়াশ এক ঝটকায় কেয়ারাকে মেঝের থেকে নিজের কোলের ওপর তুলে নিলো। এরপর হেসে বললো, “নাহ্! আমি কি কখনো আমার বাটারফ্লাইকে ছেড়ে একা একা ঘুরতে যেতে পারি? আমি যেখানে যাবো, আমার মুরগির বাচ্চাও সেখানে যাবে, তাই না?”
কেয়ারা ইয়াশের কথায় খুশিতে ডগমগ হয়ে নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে ইয়াশের চুলগুলো খামচে ধরলো। বড় বড় চোখ দুটো পিটপিট করে আবদারের সুরে বললো,
“তেয়ারাকেও নিয়ে চলো ভাইয়া, তেয়ারা তোমাতে এত্তুও বিলক্ত (বিরক্ত) তরবে না।”
ইয়াশ কেয়ারার এই চুলের টান উপভোগ করে মৃদু হাসলো। তারপর বেশ গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললো, “আচ্ছা নিয়ে যাবো। কিন্তু তার আগে তোর আপুর থেকে পারমিশন নিয়ে আয়। সে যদি তোকে আমার সাথে ছাড়তে রাজি হয়, তবেই যাবি।”
আপ্পির পারমিশনের কথা শুনে কেয়ারা এক মুহূর্তও দেরি করলো না। ইয়াশের কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করে আধো-আধো গলায় চেঁচিয়ে বললো,
“এথুনি যাচ্চি!”
ইয়াশ ওকে সাবধানে মেঝেতে নামিয়ে দিতেই কেয়ারা নীল জামার ঘেরটা দুই হাতে ধরে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে ছুটে চলে গেল ইনায়ার ঘরের দিকে। আর ইয়াশ দরজার দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে হাসলো।
কেয়ারা ইনায়ার ঘরে ঢুকেই দুই হাত নেড়ে জেদ ধরে বসলো। তার এক কথা সে ইয়াশ ভাইয়ার সাথে সামনের পার্কে ঘুরতে যাবেই যাবে। দুপুরের ঘটনার পর ইনায়ার মনের ভয়টা এখনো কাটেনি, তাই সে সরাসরি হাত নেড়ে না করে দিল, “না, তুমি কোথাও যাবে না। আমি কিছুতেই তোমাকে ইয়াশের সাথে বাইরে ছাড়বো না।”
কেয়ারা থামলো না। সে ইনায়ার কোলের ওপর বসে পা দুলিয়ে অনবরত জেদ করতেই লাগলো। ইনায়া চুপচাপ বসে থেকে ওকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু বাচ্চা মেয়েকে কি এত সহজে শান্ত করা যায়? সে নিজের জেদে একদম অটল। অবশ্য পার্কটা বাড়ি থেকে বেশি দূরে না, একদম সামনের রাস্তাটুকু পার হলেই দেখা যায়। তবুও ইয়াশের কথা ভেবে ইনায়া একা ছাড়তে রাজি হলো না। বোনের এই অনড় জেদ দেখে ইনায়া একটা বুদ্ধি খাটালো। সে কেয়ারার গালটা টেনে দিয়ে বললো, “আচ্ছা বাবা ঠিক আছে, চল। আমিও তোদের সাথে যাবো। আমি সাথে থাকলে আর সমস্যা নেই।”
তবে বাইরে যাওয়ার আগে পাপার অনুমতি নিতে হবে। তাই ইনায়া নিচে নেমে ড্রয়িংরুমের ল্যান্ডফোন থেকে চট করে তার পাপা আবির মির্জাকে একটা কল দিল। ফোনে আবির মির্জা যখন ছোট মেয়ের এই পার্কে যাওয়ার বায়নার কথা শুনলেন, তখন তিনি হেসে ফেললেন। তিনি ইনায়াকে বললেন, “মা, ও যখন এত জেদ করছে, তাহলে নিয়ে যাও। তবে একা যেও না। ড্রাইভার আঙ্কেল আর শিউলি আন্টিকে সাথে নাও। তারা তোমাদের সাথে থাকবে। আর হ্যাঁ, ৩০ মিনিটের মধ্যে কিন্তু একদম বাসায় চলে আসবে, মনে থাকবে?”
পাপার অনুমতি পেয়ে ইনায়া বেশ খুশি মনে রাজি হয়ে গেল। ফোনটা রেখে সে কেয়ারার হাত ধরে আবার ইয়াশের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরে ঢুকতেই কেয়ারা খুশিতে ডগমগ হয়ে ইয়াশকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে উঠলো,
“ভাইয়া! আপ্পিও যাবে আমাদেল সাতে।”
ইনায়ার যাওয়ার কথা শুনে ইয়াশের ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠলো। সে ইনায়ার উপস্থিতিকে পাত্তা না দিয়ে, তার চোখের সামনেই কেয়ারাকে এক টানে নিজের কোলের ওপর তুলে নিলো। কোল নেওয়ার পর ইয়াশের নজর গেল কেয়ারার ঠোঁটের দিকে। কাটা জায়গাটায় মলম দেওয়া থাকলেও ঠোঁটের বাকি অংশে তখনো হালকা গোলাপি রঙের আভা লেগে আছে। ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“ঠোঁটে এসব কী দিয়েছিস রে মুরগির বাচ্চা?”
কেয়ারা নিজের চোখ দুটো গোল গোল করে লাজুক হেসে বললো, “নিপিসটটিস!”
ইয়াশ কেয়ারার এই সাজ একদম পছন্দ করলো না। সে বেশ কড়া গলায় বললো, “এসব ফালতু জিনিস দিলে ঠোঁটে ইনফেকশন হবে। এরপর থেকে এসব আর কখনো ঠোঁটে দিবি না, মনে থাকবে কথাটা?”
বোনের ওপর ইয়াশের এমন খবরদারি দেখে ইনায়া আর চুপ থাকতে পারলো না। সে চট করে মাঝখান থেকে বলে উঠলো, ” এগুলো ক্ষতিকর কিছু না। এগুলো বাচ্চাদের জন্য তৈরি বেবি লিপস্টিক।”
অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৪
ইনায়ার কথার পিঠে ইয়াশ এক মুহূর্তও দেরি করলো না। সে সোজা ইনায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে ভারী গলায় বললো, “বেবি লিপস্টিক হোক আর যাই হোক, তাও ও এসব ঠোঁটে দিবে না। ব্যাস, এটাই শেষ কথা।”
ইনায়া কেমন যেন দমে গেল। সে আর কথা বাড়ানোর সাহস পেলো না, চুপচাপ মুখ নামিয়ে নিলো।
এরপর আর কেউ কোনো কথা বাড়ালো না। ইয়াশ কেয়ারাকে কোলে নিয়েই ঘর থেকে বের হলো। নিচে নেমে শিউলি আন্টি আর ড্রাইভার আঙ্কেলকে সাথে নিয়ে তারা সবাই মিলে বাড়ির সামনের পার্কটার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
