Home অগ্নিশিখার অন্তরালে অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৮

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৮

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৮
YASH

রাত তখন এগারোটার কাঁটা ছুঁইছুঁই। চারদিকের কোলাহল কমে এসে পুরো মির্জা বাড়িতে একটা থমথমে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। আবির মির্জা সবেমাত্র তার ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে অফিসের যাবতীয় কাজ সেরে বাড়ি ফিরেছেন। সারাদিনের এত ধকল আর মানসিক চাপের পর উনার মনটা ছটফট করছিল উনার দুই মেয়ে কে দেখার জন্য। দুই মেয়ের নিষ্পাপ মুখটা না দেখলে উনার সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি যেন দূর হয় না।
আজকে আদিল মির্জা বাসায় নেই, ব্যবসার জরুরি এক কাজে উনি চট্টগ্রাম গিয়েছেন। তাই পুরো বাড়ির দায়িত্ব এখন আবির মির্জার ওপর। আবির মির্জা নিজের কোটটা সোফায় রেখে পা টিপে টিপে মেয়েদের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজাটা আলতো করে ঠেলে ভেতরে ঢুকেই উনার চোখ গেল বিছানার দিকে। হালকা ডিম লাইটের আলোয় উনি দেখলেন উনার বড় মেয়ে ইনায়া একপাশে শান্ত হয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু উনার দৃষ্টি যখন বিছানার অন্য পাশে গেল, উনার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বিছানার সেই জায়গাটা একদম ফাঁকা! ছোট মেয়ে কেয়ারা সেখানে নেই!

মুহূর্তের মধ্যে আবির মির্জার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে গেল, কলিজাটা ভয়ে শুকিয়ে কাঠ। রাজনীতি আর ব্যবসার জগতে কত শত শত্রু ওত পেতে থাকে, এই ভয়টাই উনার মাথায় সবার আগে চাড়া দিয়ে উঠল। উনি হন্তদন্ত হয়ে ঘরের এটা-ওটা চেক করলেন, বাথরুমের দরজা খুলে দেখলেন কোথাও কেউ নেই! অস্থিরতা আর আতঙ্ক তখন উনার মাথা গ্রাস করেছে। ঘর থেকে বেরিয়ে উনি করিডোরে এসে একটু জোরে অথচ চাপা গলায় ডাকলেন, “মা? মা কোথায় তুমি?”
পুরো বাড়ি থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। আবির মির্জার কপালে তখন ভয়ের ঘাম জমতে শুরু করেছে। উনার হঠাৎ মনে হলো, কেয়ারা কি তবে ইয়াশের ঘরে? এই ভরসায় উনি দ্রুত পায়ে করিডোর পার হয়ে ইয়াশের ঘরের দিকে গেলেন। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলেন ঘরের ভেতরের আলোটা এখনো জ্বলছে।
উনি তাড়াহুড়ো করে ঘরের ভেতরে পা রাখলেন এবং বিছানার দিকে তাকাতেই উনার শরীরের সমস্ত উত্তেজনা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। উনার কলিজায় যেন পানি আসলো। উনি দেখলেন,
ইয়াশ একপাশে শুয়ে আছে, আর ঠিক তার পাশেই উনার চার বছরের ছোট্ট কেয়ারা একদম গুটিসুটি মেরে, ইয়াশের একটা হাত নিজের ছোট্ট দুহাতে জাপটে ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তখন সন্ধ্যার দিকে ইয়াশের উপর রাগ দেখিয়ে চকলেট খেয়ে ওর রুমেই ঘুমিয়ে পড়েছে।

আবির মির্জা এক বুক স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে পা টিপে টিপে বিছানার পাশে গিয়ে বসলেন। মেয়েটার খুব জেদ হয়েছে। উনাকে শিউলি ফোন করে বলেছে মেয়ের জেদের কথা। পার্কে নাকি সে অনেক কান্নাকাটি করেছে। মেয়ের কপালে হাত বোলাতে গিয়ে উনার চোখ গেল কেয়ারার পা দুটোর দিকে। উনি খেয়াল করলেন, মেয়ের এক পায়ের রুপোর নূপুরটা গোড়ালিতে চকচক করলেও, অন্য পায়ের নূপুরটা সেখানে নেই। হয়তো বিকেলে পার্কে ওই কান্নাকাটি আর ওলটপালটের মধ্যে কোথাও পড়ে গিয়ে হারিয়ে গেছে।
নূপুর হারানোর কথা ভেবে উনি মনে মনে আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কালকে আরেক জোড়া এনে দিবেন। মেয়ে ঠিক থাকলে বাবাও ঠিক থাকে।
ঠিক তখনই বিছানায় সামান্য নড়াচড়া হলো। ইয়াশ আসলে পুরোপুরি ঘুমায়নি, হালকা তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল। চাচার পায়ের শব্দ আর গায়ের চেনা সুবাস পেয়ে সে পিটপিট করে চোখ মেলল। বিছানায় উঠে বসতে যেতেই আবির মির্জা আলতো করে ইয়াশের কাঁধে হাত রাখলেন। উনার গলায় তখন সর তখন একদম এরম। “উঠে পড়লে কেন বাবা? তুমি ঘুমাও।”

ইয়াশ কিছুক্ষণ চোখ কচকে নিজের স্বভাবসুলভ শান্ত গলায় বলল, “কিয়ারা আজকে এইখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তুমি চাইলে ওকে তোমার রুমে নিয়ে যেতে পারো।”
আবির মির্জা ঘুমে কাদা হয়ে থাকা মেয়ের চাঁদের মতো মুখের দিকে তাকালেন। তারপর আলতো হেসে ইয়াশকে বললেন, “নাহ, থাক। এখন ঘুম থেকে তুললে আবার কান্না জুড়ে দেবে, তখন সামলানো দায় হবে। ও যেভাবে ঘুমাচ্ছে, ঘুমাক। তুমি শুধু বোনটাকে একটু দেখে রেখো। মাঝরাতে যদি ঘুম ভেঙে কান্না করে, তবে একটু কষ্ট করে আমার কাছে রেখে এসো, কেমন?”
ইয়াশ চাচার কথার পিঠে আর কোনো কথা বাড়াল না। সে কেয়ারার চাদরটা একটু টেনে দিয়ে মাথা নাড়িয়ে সায় দিল, “হ্যাঁ।”

আবির মির্জা ইয়াশের মাথায় আর কিয়ারার গালে একটা আলতো চুমু খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর ইয়াশ অন্ধকার ঘরের হালকা আলোয় আবার শুয়ে পড়ল, এক হাত দিয়ে কেয়ারাকে আগলে রেখে।
রাত তখন গভীর। পুরো মির্জা বাড়ি নিঝুম অন্ধকারে ডুবে আছে। ঠিক মাঝরাতের দিকে হঠাৎ করেই কিয়ারার ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ মেলেই চার বছরের ছোট্ট মেয়েটি অভ্যাসবশত পাশে হাতড়ালো তার বড় বোন ইনায়াকে খোঁজার জন্য। কিন্তু বিছানার সেই পাশটা একদম খালি ও ঠান্ডা। বোনকে পাশে না পেয়ে কিয়ারার ছোট্ট মনটা মুহূর্তে ভয়ে কুঁকড়ে গেল। সে আর এক সেকেন্ডও সময় নিল না, চোখ বন্ধ করেই অন্ধকারের মাঝে মুখ হাঁ করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না জুড়ে দিল।

কিয়ারার প্রথম কান্নার আওয়াজটা কানে আসতেই ইয়াশ বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসল। আসলে ইয়াশ এতক্ষণ একটুও ঘুমাতে পারেনি। বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে শুয়ে থাকলেও তার কান দুটো খাড়া ছিল। সে মনে মনে এই একটা জিনিসেরই ভয় পাচ্ছিল না জানি কখন মাঝরাতে কিয়ারার ঘুম ভেঙে যায় আর সে কেঁদে ওঠে। শেষমেশ যেটার ভয় পাচ্ছিল, ঠিক সেটাই হলো! উঠে পড়েছে এই মুরগির বাচ্চাটা।
কিয়ারা তখনো চোখ-মুখ কুঁচকে হাউমাউ করে কাঁদছে আর কাঁদতে কাঁদতেই আধো-আধা গলায় বলল,
“আপ্পি যাব… আপ্পি তোথায়? অ্যাঅ্যা…”

ইয়াশ এক মুহূর্তও দেরি না করে কিয়ারার একদম কাছে এগিয়ে এলো। তার নরম কাঁধ দুটো আলতো করে ধরে নিজের গম্ভীর গলায় ডাকল, “বাটারফ্লাই? আমার দিকে তাকাও।”
ইয়াশ ভাইয়ার চেনা গলার আওয়াজ পেয়ে কিয়ারা তার কান্নাটা একটু থামাল। চোখের জল মাখা বড় বড় কালো চোখ দুটো ছোট ছোট করে সে ইয়াশের দিকে তাকাল। তার ঠোঁট দুটো তখনো অভিমানে উল্টে আছে। সে ফুঁপিয়ে উঠে বলল, “পাপাল তাছে যাব। পাপা নিয়ে তলো আমাকে…”
ইয়াশ খুব ভালো করেই জানে এই মুরগির বাচ্চাকে কীভাবে লাইনে আনতে হবে। সে নিজের গলার স্বরটা একটু কড়া করে চটপট একটা চাল চালল। ইয়াশ বলল,
“পাপার কাছে এখন চলে গেলে কিন্তু আমি আর কোনোদিন তোমাকে চকোলেট দিবো না। আর ওই ‘ম্যাও বাচ্চা’টাকেও দেখতে নিয়ে যাবো না, ব্যাস!”

ব্যাস, চকোলেটের চেয়েও ‘ম্যাও বাচ্চা’র নামটা শুনতেই কিয়ারার কান্নার বেগ এক ঝটকায় থমকে গেল। কিয়ারা বিড়াল ভীষণ পছন্দ করে। ওদের বাড়ির ঠিক পাশেই একটা বাড়ি আছে, যেখানে একজন ভদ্রমহিলা অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর বিদেশী বিড়াল পোষেন। কিয়ারা প্রায়ই ইয়াশের হাত ধরে সেখানে বিড়াল মানে ‘ম্যাও বাচ্চা’ দেখতে যায়। ইয়াশকে ছাড়া তাকে কেউ সেখানে নিয়ে যায় না। তাই ইয়াশ ভাইয়া ম্যাও বাচ্চার কাছে নিয়ে যাবে না এই হুমকি কেয়ারার জন্য মস্ত বড় শাস্তি!
কেয়ারা তার চোখের পানি টলমল করা চাউনি নিয়ে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে একটা বড় করে ঢোক গিলল। অবিশ্বাস ভরা গলায় জিজ্ঞেস করল, “তত্যি নিয়ে যাবে নাহ?”
ইয়াশ নিজের গম্ভীর মুখে কোনো হালকা ভাব না এনে সটান জবাব দিল, “নাহ, সত্যি নিয়ে যাবো না। এখন একদম শান্ত হয়ে আমার কাছেই ঘুমাতে হবে তোমাকে।”

চার বছরের কেয়ারা এবার তার ছোট্ট মাথায় মস্ত বড় এক হিসাব-নিকাশ করে দেখল। একপাশে পাপার কোল, আর অন্যপাশে আদরের ম্যাও বাচ্চা আর চকোলেট! লাভ-ক্ষতির অংকটা মিলিয়ে দেখলো তার লাভ লস নাই তার লাইফটাই লস। যাকগে সে আস্তে করে বিড়ালের বাচ্চার মতোই গুটিসুটি মেরে ইয়াশের কোলের ওপর উঠে শুয়ে পড়ল। তারপর নিজের ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে নিজের চোখ দুটো শক্ত করে ঢেকে নিয়ে ধরা গলায় বলল,
“তেয়ারা তাদছে না তেয়ারা লত্তি মেয়ে।”
কিয়ারার এমন কথা আর নিজেকে ‘লক্ষ্মী মেয়ে’ প্রমাণ করার চেষ্টা দেখে ইয়াশের ওই পাথরের মতো গম্ভীর মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। ইয়াশ কেয়ারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, “হ্যাঁ, তুমি তো ইয়াশের লক্ষ্মী…”

কেয়ারা আর বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারল না। সে চোখ বুজে ঘুমে কাদা হয়ে আধো-আধো গলায় কী যেন সব ভুলভাল বকতে বকতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
কেয়ারা ঘুমিয়ে পড়লেও ইয়াশ আর ওভাবে শুয়ে পড়ল না। সে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে সোজা বসে রইল। তার দুটোতে এখন আর তন্দ্রার কোনো লেশ নেই। সে সারারাত জেগে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। কারণ, আবার যদি শেষরাতের দিকে কেয়ারা ঘুম থেকে উঠে যায় আর তখন যদি সে দেখে ইয়াশ ভাইয়াও ঘুমিয়ে আছে? তখন যদি ও আবার ভয় পেয়ে কেঁদে ওঠে? থাক, তার চেয়ে ঘুমানোর কোনো দরকার নেই। একেবারে সকালেই না হয় ঘুমানো যাবে।

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৭

সারারাত জেগে ইয়াশ শুধু একটা কাজই করল। কেয়ারার ডান পায়ের যে রুপোর নূপুরটা এখনো রয়ে গেছে, ইয়াশ হাত বাড়িয়ে আলতো করে সেই নূপুরটা আর কেয়ারার ছোট্ট পা-টা নিয়ে নাড়াচড়া করতে লাগল। নূপুরের ছোট ছোট ঘুঙুরগুলো যাতে টুংটাং শব্দ করে কেয়ারার ঘুম না ভেঙে দেয়, তাই সে খুব সাবধানে, নূপুরটা ধরে সারারাত কাটিয়ে দিল।

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৯